দাশুর কীর্তি

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

নবীনচাঁদ স্কুলে এসেই বললে, কাল তাকে ডাকাতে ধরেছিল৷ শুনে স্কুলসুদ্ধ সবাই হাঁ-হাঁ করে ছুটে আসল৷ 'ডাকাতে ধরেছিল৷ বলিস কী রে?' ডাকাত না তো কী? বিকেল বেলায় সে জ্যোতিলালের বাড়িতে পড়তে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরবার সময় ডাকাতেরা তাকে ধরে তার মাথায় চাঁটি মেরে, তার নতুন কেনা শখের পিরানটিতে কাদাজলের পিচকিরি দিয়ে গেল৷ আর যাবার সময় বলে গেল, 'চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক, নইলে দড়াম করে তোর মাথা উড়িয়ে দেব৷' তাই সে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে রাস্তার ধারে প্রায় বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল; এমন সময় তার বড়োমামা এসে তার কান ধরে বাড়িতে নিয়ে বললেন, 'রাস্তায় সং সেজে এয়ার্কি করা হচ্ছিল!' নবীনচাঁদ কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে উঠল, 'আমি কী করব? আমায় ডাকাতে ধরেছিল-' শুনে তার মামা প্রকাণ্ড এক চড় তুলে বললেন, 'ফের জ্যাঠামি!' নবীনচাঁদ দেখলে মামার সঙ্গে তর্ক করাই বৃথা-কারণ, সত্যিসত্যিই তাকে যে ডাকাতে ধরেছিল, এ কথা তার বাড়ির কাউকে বিশ্বাস করানো শক্ত! সুতরাং তার মনের দুঃখ এতক্ষণ মনের মধ্যেই চাপা ছিল৷ স্কুলে এসে আমাদের কাছে বসতে-না-বসতেই সে দুঃখ একেবারে উথলিয়ে উঠল৷

যাহোক, স্কুলে এসে তার দুঃখ বোধ হয় অনেকটা দূর হতে পেরেছিল কারণ, স্কুলের অন্তত অর্ধেক ছেলে তার কথা শুনবার জন্য একেবারে ব্যস্ত হয়ে ঝুঁকে পড়েছিল, এবং তার প্রত্যেকটি ঘামাচি, ফুসকুড়ি আর চুলকানির দাগটি পর্যন্ত তারা আগ্রহ করে ডাকাতির সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে স্বীকার করেছিল৷ দু-একজন যারা তার কনুয়ের আঁচড়টাকে পুরোনো বলে সন্দেহ করেছিল, তারাও বলল যে হাঁটুর কাছে যে ছড়ে গেছে সেটা একেবারে টাটকা নতুন৷ কিন্তু তার পায়ের গোড়ালিতে যে ঘায়ের মতো ছিল সেটাকে দেখে কেষ্টা যখন বলল, 'ওটা তো জুতোর ফোসকা', তখন নবীনচাঁদ ভয়ানক চটে বলল, 'যাও তোমাদের কাছে আর কিচ্ছু বলব না!' কেষ্টাটার জন্য আমাদের আর কিছু শোনাই হল না৷

ততক্ষণে দশটা বেজে গেছে, ঢং ঢং করে স্কুলের ঘণ্টা পড়ে গেল৷ সবাই যে-যার ক্লাসে চলে গেলাম, এমন সময় দেখি পাগলা দাশু একগাল হাসি নিয়ে ক্লাসে ঢুকছে৷ আমরা বললাম, 'শুনেছিস? কাল নবুকে ডাকাতে ধরেছিল!' যেমন বলা, অমনি দাশরথি হঠাৎ হাত-পা ছেড়ে, বই-টই ফেলে, খ্যাঃ খ্যাঃ খ্যাঃ খ্যাঃ করে হাসতে হাসতে একেবারে মেঝের ওপর বসে পড়ল! পেটে হাত দিয়ে গড়াগড়ি করে, একবার চিত হয়ে, একবার উপুড় হয়ে, তার হাসি আর কিছুতেই থামে না৷ দেখে আমরা তো অবাক! পণ্ডিতমশাই ক্লাসে এসেছেন, তখনও পুরোদমে হাসি চলছে৷ সবাই ভাবল, 'ছোঁড়াটা খেপে গেল নাকি?' যাহোক, খুব খানিকটা হুটোপাটির পর সে ঠান্ডা হয়ে বই-টই গুটিয়ে বেঞ্চের উপর উঠে বসল৷ পণ্ডিতমশাই বললেন, 'ওরকম হাসছিলে কেন?' দাশু নবীনচাঁদকে দেখিয়ে বলল, 'ওই ওকে দেখে৷' পণ্ডিতমশাই খুব কড়া রকমের ধমক লাগিয়ে তাকে ক্লাসের কোনায় দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷ পাগলার তাতেও লজ্জা নেই, সে সারাটা ঘণ্টা থেকে থেকে বই দিয়ে মুখ আড়াল করে ফিক ফিক করে হাসতে লাগল৷

টিফিনের ছুটির সময় নবু দাশুকে চেপে ধরল, 'কী রে দেশো! বড়ো যে হাসতে শিখেছিস!' দাশু বলল, 'হাসব না? তুমি কাল ধুচুনি মাথায় দিয়ে কীরকম নাচটা নেচেছিলে, সে তো আর তুমি নিজে দেখনি? দেখলে বুঝতে কেমন মজা!' আমরা সবাই বললাম, 'সে কীরকম? ধুচনি মাথায় নাচছিল মানে?' দাশু বলল, 'তাও জান না? ওই কেষ্টা আর জগাই-ওই যা! বলতে-না বারণ করেছিল!' আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, 'কী বলছিস ভালো করেই বল না?' দাশু বলল, 'কালকে শেঠেদের বাগানের পেছন দিয়ে নবু একলা একলা বাড়ি যাচ্ছিল, এমন সময়ে দুটো ছেলে-তাদের নাম বলতে বারণ-তারা দৌড়ে এসে নবুর মাথায় ধুচুনির মতো কী একটা চাপিয়ে তার গায়ের উপর আচ্ছা করে পিচকিরি দিয়ে পালিয়ে গেল!' নবু ভয়ানক রেগে বলল, 'তুই তখন কী করছিলি?' দাশু বলল, 'তুমি তখন মাথার থলি খুলবার জন্য ব্যাঙের মতো হাত-পা ছুড়ে লাফাচ্ছিলে দেখে আমি বললাম, ফের নড়বি তো দড়াম করে মাথা উড়িয়ে দেব৷ তাই শুনে তুমি রাস্তার মধ্যে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলে, তাই আমি তোমার বড়োমামাকে ডেকে আনলাম৷' নবীনচাঁদের যেমন বাবুয়ানা, তেমনি তার দেমাক-সেইজন্য কেউ তাকে পছন্দ করত না, তার লাঞ্ছনার বর্ণনা শুনে সবাই বেশ খুশি হলাম৷ ব্রজলাল ছেলেমানুষ, সে ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে বলল, 'তবে যে নবীনদা বলছিল, তাকে ডাকাতে ধরেছে?' দাশু বলল, 'দূর বোকা! কেষ্টা কি ডাকাত?' বলতে-না-বলতেই কেষ্টা সেখানে এসে হাজির৷ কেষ্টা আমাদের উপরের ক্লাসে পড়ে, তার গায়েও বেশ জোর আছে৷ নবীনচাঁদ তাকে দেখামাত্র শিকারি বেড়ালের মতো ফুলে উঠল৷ কিন্তু মারামারি করতে সাহস পেল না, খানিকক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে সেখান থেকে সরে পড়ল৷ আমরা ভাবলাম গোলমাল মিটে গেল৷

Cov25

কিন্তু তার পরদিন ছুটির সময়ে দেখি, নবীন তার দাদা মোহনচাঁদকে নিয়ে হনহন করে আমাদের দিকে আসছে৷ মোহনচাঁদ এনট্রান্স ক্লাসে পড়ে, সে আমাদের চাইতে অনেক বড়ো, তাকে ওরকমভাবে আসতে দেখেই আমরা বুঝলাম, এবার একটা কাণ্ড হবে৷ মোহন এসেই বলল, 'কেষ্টা কই?' কেষ্টা দূর থেকে তাকে দেখেই কোথায় সরে পড়েছে, তাই তাকে আর পাওয়া গেল না৷ তখন নবীনচাঁদ বলল, 'ওই দাশুটা সব জানে, ওকে জিজ্ঞাসা করো৷' মোহন বলল, 'কী হে ছোকরা, তুমি সব জান নাকি?' দাশু বলল, 'না সব আর জানব কোত্থেকে-এই তো সবে ফোর্থ ক্লাসে পড়ি, একটু ইংরিজি জানি, ভূগোল, বাংলা, জিয়োমেট্রি-' মোহনচাঁদ ধমক দিয়ে বলল, 'সেদিন নবুকে যে কারা সব ঠেঙিয়েছিল, তুমি তার কিছু জান কি না?' দাশু বলল, 'ঠ্যাঙায়নি তো-মেরেছিল, খুব আস্তে মেরেছিল৷' মোহন একটুখানি ভেংচিয়ে বলল, 'খুব আস্তে মেরেছে, না? কতখানি আস্তে শুনি তো?' দাশু বলল, 'সে কিছুই না-ওরকম মারলে একটুও লাগে না৷' মোহন আবার ব্যঙ্গ করে বলল, 'তাই নাকি? কীরকম মারলে পরে লাগে?' দাশু খানিকটা মাথা চুলকিয়ে তারপর বলল, 'ওই সেবার হেডমাস্টারমশাই তোমায় যেমন বেত মেরেছিলেন সেইরকম!' এ কথায় মোহন ভয়ানক চটে দাশুর কান মলে দিয়ে চিৎকার করে বলল, 'দেখ বেয়াদব৷ ফের জ্যাঠামি করবি তো চাবকিয়ে লাল করে দেব৷ তুই সেখানে ছিলি কি না৷ আর কীরকম কী মেরেছিল সব খুলে বলবি কি না?'

জানই তো দাশুর মেজাজ কেমন পাগলাটে গোছের, সে একটুখানি কানে হাত বুলিয়ে তারপর হঠাৎ মোহনচাঁদকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে বসল৷ কিল, ঘুসি, চড়, আঁচড়, কামড়, সে এমনি চটপট চালিয়ে গেল যে আমরা সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম৷ মোহন বোধ হয় স্বপ্নেও ভাবেনি যে ফোর্থ ক্লাসের একটা রোগা ছেলে তাকে অমনভাবে তেড়ে আসতে সাহস পাবে-তাই সে একেবারে থতমত খেয়ে কেমন যেন লড়তেই পারল না৷ দাশু তাকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে চিতপাত করে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'এর চাইতেও ঢের আস্তে মেরেছিল৷' এনট্রান্স ক্লাসের কয়েকটি ছেলে সেখানে দাঁড়িয়েছিল৷ তারা যদি মোহনকে সামলে না ফেলত, তাহলে সেদিন তার হাত থেকে দাশুকে বাঁচানোই মুশকিল হত৷

পরে একদিন কেষ্টাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'হ্যাঁ রে, নবুকে সেদিন তোরা অমন করলি কেন?' কেষ্টা বলল, 'ওই দাশুটাই তো শিখিয়েছিল ওরকম করতে৷ আর বলেছিল, 'তাহলে এক সের জিলিপি পাবি!' আমরা বললাম, 'কই আমাদের তো ভাগ দিলিনে?' কেষ্টা বলল, 'সেকথা আর বলিস কেন? জিলিপি চাইতে গেলুম, হতভাগা বলে কিনা, আমার কাছে কেন? ময়রার দোকানে যা, পয়সা ফেলে দে, যত চাস জিলিপি পাবি৷'

আচ্ছা, দাশু কি সত্যি সত্যি পাগল, না কেবল মিচকেমি করে?

চৈত্র ১৩২৪

Cov26
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%