অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বিধাতা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ সৃষ্টি করেন তবু মানুষ বলে আমরা নিজে মানুষ তৈরি করব৷ তাই খেলা শুরু হল পুতুল নিয়ে, সেগুলো মানুষের নিজের গড়া মানুষ৷ তারপরে ছেলেরা বলে গল্প বলো, তার মানে, মানুষ বানাও৷ গড়ে উঠল কত রাজপুত্তুর মন্ত্রীর পুত্তুর সুয়োরানি দুয়োরানি, মৎস্যনারীর উপাখ্যান, আরব্য উপন্যাস, রবিনসন ক্রুসো৷ বুড়োরাও আপিসের ছুটির দিনে বলে, মানুষ বানাও-অমনি আঠারো পর্ব মহাভারত প্রস্তুত৷ তার পরে আরও কত কী!
নাতনির ফরমাসে কিছুদিন থেকে মানুষ গড়ার কাজে লেগেছি৷ তার বয়স ন-বছর আর আমি পড়েছি সত্তরে৷ কাজটা প্রথমে একলাই শুরু করলুম, তারপর সেও তাতে লেগে গেল৷
অনেক গল্প শুরু হয়েছে এই বলে যে, এক যে ছিল রাজা৷ আমি আরম্ভ করে দিলুম এক যে আছে মানুষ৷ তারপরে লোকে যাকে বলে গল্প, তারও কোনো আঁচ নেই৷ সে মানুষ ঘোড়ায় চড়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে গেল না৷ একদিন রাত্রি দশটার পর এল আমার ঘরে৷ আমি বই পড়ছিলুম৷ সে বলল, 'দাদামশায় খিদে পেয়েচে৷'
রাজপুত্তুরের গল্প অনেক শুনেছি; কখনো তার খিদে পায় না৷ কিন্তু এর খিদে পেয়ে গেল গোড়াতেই, শুনে খুশি হলুম৷ ওর সঙ্গে ভাব হতে আর দেরি হল না৷
দেখলুম লোকটার দিব্যি খাবার শখ আছে৷ ফরমাস করে মুড়োর ঘণ্ট, লাউচিংড়ি, কাঁটাচচ্চড়ি; বড়োবাজারের মালাই পেলে বাটিটা বেশ চেঁচেপুঁছে খায়৷ এক-একদিন শখ যায় তার আইসক্রিমের৷ খায় বসে, মজা লাগে দেখতে৷
একদিন ঝমাঝম বৃষ্টি৷ বসে বসে ছবি আঁকচি৷ এখানকার মাঠের ছবি৷ উত্তরদিকে বরাবর চলে গেছে রাঙা মাটির রাস্তা-দক্ষিণ দিকে পোড়ো জমি, উঁচু-নীচু ঢেউ-খেলানো, মাঝে মাঝে ঝাঁকড়া বুনো খেজুর৷ দূরে দুটো তাল গাছ আকাশের দিকে কাঙালের মতো তাকিয়ে৷ তারই পিছনে জমে উঠেছে ঘন মেঘ, যেন একটা প্রকাণ্ড নীল বাঘ ওত পেতে আছে, কখন এক লাফে মাঝ-আকাশে উঠে সূর্যটাকে দেবে থাবার ঘা৷ বাটিতে রং গুলে তুলি বাগিয়ে এই সব এঁকে চলেচি৷
দরজায় পড়ল ঠেলা৷ খুলে দেখি ডাকাত নয়, দৈত্য নয়, কোটালের পুত্তুর নয়-সেই লোকটা৷ সর্বাঙ্গ বেয়ে জল ঝরছে, ময়লা ভিজে জামা গায় লেপটে গেছে, কোঁচার ডগায় কাদা, জুতোয় কাদার পিণ্ডি৷ আমি বললুম, 'একী!'
সে বললে, 'যখন বেরিয়েছিলুম খটখটে রোদ্দুর৷ আদ্ধেক পথে আসতে বৃষ্টি নামল৷ তোমার ওই বিছানার চাদরটা যদি দাও, তো কাপড় ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে বসি৷'
হুকুম পাবার সবুর সইল না৷ চট করে খাটের থেকে বেগনি রঙের ছিটের ঢাকাটা টেনে নিয়ে তাই দিয়ে মাথাটা মুছে কাপড় ছেড়ে সেটা গায়ে জড়িয়ে বসল৷
বললে, 'দাদামশায়, তোমাকে একটা গান শোনাব৷'
কী করি, ছবি আঁকা বন্ধ করতে হল৷
সে শুরু করলে-
ভাবো শ্রীকান্ত নরকান্তকারীরে
নিতান্ত কৃতান্ত ভয়ান্ত হবে ভেবে৷
আমার মুখের ভাব দেখে তার কী মনে হল জানিনে, জিজ্ঞাসা করলে, 'কেমন লাগচে?'
আমি বললুম, 'আরও অনেক কাল তোমাকে গলা সাধতে হবে, এর বেশি আর কিছু বলতে ইচ্ছে করিনে৷'
সে বললে, 'পুপেদিদিও (আমার নাতনি) হিন্দুস্থানি ওস্তাদের কাছে গান শেখে সেইখানে আমাকে বসিয়ে দিলে কেমন হয়৷'
আমি বললুম, 'পুপেদিদিকে যদি রাজি করাতে পারো তাহলে কথা নেই৷'
সে বললে, 'পুপেদিদিকে আমি বড়ো ভয় করি৷'
এই পর্যন্ত শুনে আমার শ্রোতা খুব হেসে উঠল৷ তাকে কেউ ভয় করে এতে সে ভারি খুশি৷
দয়াময়ী আশ্বাস দিয়ে বললে, 'ভয় নেই, আমি তাকে কিছু বলব না৷' আমি বললুম, 'তোমাকে ভয় কে না করে! দু-বেলা দু-বাটি করে দুধ খাও-গায়ে কি কম জোর! মনে আছে তো তোমার হাতে লাঠি দেখে সেই বাঘটা লেজ গুটিয়ে একেবারে নুটু পিসির বিছানার নীচে গিয়ে লুকিয়েছিল৷'
বীরাঙ্গনা ভারি খুশি৷ মনে করিয়ে দিলে ভালুকটার কথা-সে পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল নাবার ঘরের স্নানের জলের টবের মধ্যে৷
সেই যে মানুষটার ইতিহাস গড়ে উঠছিল আমার একলার হাতে এখন থেকে পুপেও তাতে যোগ দিলে৷ আমি যদি-বা বলি, একদিন বেলা তিনটের সময় সে এসেছিল আমার কাছে দাড়ি কামাবার ক্ষুর চেয়ে নিতে, পুপে খবর দেয় সে ওর কাছ থেকে এক বাক্স চকোলেট নিয়ে গেছে৷
সব গল্পেরই একটা আরম্ভ আছে, শেষ আছে, কিন্তু ওই যে 'এক যে আছে মানুষ' তার আর শেষ নাই৷ তার দিদির জ্বর হয় ডাক্তার ডাকতে যায়৷ টনি কুকুর আছে, বেড়ালের নখের আঁচড় লেগে নাক যায় ছড়ে৷ পিছন দিক থেকে গোরুর গাড়ির উপর চড়ে বসেছিল, তাই নিয়ে গাড়োয়ানের সঙ্গে হল বিষম ঝগড়া৷ উঠোনে কলতলায় পিছলে পড়ে বামুন ঠাকরুনের মাটির ঘড়া দিয়েচে ভেঙে৷ মোহনবাগানের ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল, পকেট থেকে সাড়ে তিন আনা পয়সা কে নিয়েছে তুলে৷ ভেবেছিল ফিরতি রাস্তায় ভীমনাগের দোকান থেকে সন্দেশ কিনে খাবে, সে আর হল না, বন্ধু আছে কিনু চৌধুরী, তার ওখানে গিয়ে পাঁপর ভাজা খেয়েচে৷ এমনি একটার পর একটা চলচে দিনের পর দিন৷ এর সঙ্গে পুপে জুড়চে, কোনদিন দুপুর বেলায় ওর ঘরে গিয়ে বলেছে 'শিশু' বই থেকে ওকে বেড়ালের কবিতা শোনাতে, আর একদিন পুপের ছোট্ট হাঁড়িতে ছোট্ট আলুভাজা হয়েছিল তাই শেষ করে ছোট্ট পেয়ালায় চা খেয়ে গেল, আর একদিন দিনদার ওখানে গান শুনতে গেল দিনদা তখন তাকিয়া ঠেসান দিয়ে ঘুমিয়ে৷
এই যে আমাদের এক যে আছে মানুষ, এর একটা নাম নিশ্চয়ই আছে৷ সে কেবল আমরা দু-জনেই জানি, আর কাউকে বলা বারণ৷ এইখানটাতেই গল্পের মজা৷ এক যে ছিল রাজা, তারও নাম নেই, রাজপুত্র তারও নেই, আর রাজকন্যা, যার চুল লুটিয়ে পড়ে মাটিতে, যার হাসিতে মানিক, চোখের জলে মুক্তো তারও নাম কেউ জানে না৷
এই যে আমাদের মানুষটি-একে আমরা শুধু বলি, 'সে'৷ বাইরের লোক কেউ নাম জিজ্ঞাসা করলে আমরা দু-জনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসি৷ পুপে বলে আন্দাজ করে বলো দেখি, প দিয়ে আরম্ভ৷ কেউ বলে, প্রিয়নাথ, কেউ বলে পঞ্চানন, কেউ বলে পাঁচকড়ি, কেউ বলে পীতাম্বর, কেউ বলে পরেশ৷ কেউ বলে পিটার্স, কেউ বলে প্রেস্কট, কেউ বলে পিরবক্স, কেউ বলে পিয়ার খাঁ৷
এইখানে এসে কলম থামতেই একজন বললে, গল্প চলবে তো! কার গল্প? এ তো রাজপুত্তুর নয়, এ হল মানুষ, এ খায়-দায় ঘুমোয় আপিসে যায়, সিনেমা দেখবারও শখ আছে৷ দিনের পর দিন যা সবাই করচে তাই এর গল্প৷ মনের মধ্যে যদি মানুষটাকে স্পষ্ট করে গড়ে তোলো তাহলে দেখতে পাবে এ যখন দোকানের রোয়াকে বসে রসগোল্লা খায় আর তার রস দু-চার ফোঁটা পড়তে থাকে তার ময়লা ধুতিতে, সেটাই গল্প৷ যদি জিজ্ঞাসা করো, তার পরে? তাহলে বলব, তার পরে ও ট্রামে চড়ে বসল, হঠাৎ জ্ঞান হল পয়সা নেই, টপ করে লাফিয়ে পড়ল৷ তার পরে? তার পরে এইরকমই আরও কত কী, 'বড়োবাজার থেকে বহুবাজার, বহুবাজার থেকে নিমতলা'৷
এর মধ্যে পুপে দিদি গেছে দার্জিলিঙে৷ 'সে' এখন একলা আমার জিম্মায়৷ তার ভালো লাগচে না৷ আমিও জ্বালাতন হয়েচি৷ বলে, 'আমাকে দার্জিলিঙে পাঠাও৷' আমি বললুম, 'কেন?' সে বললে, 'পুপে দিদি বেতের মোড়ায় দড়ি বেঁধে যে-ঘোড়া বানিয়েচে সেইটেতে দু-বেলা চড়ে বেড়াব৷' এক ধমক দিয়ে বললুম, 'চুপ করো, গোল কোরো না৷ এখন হুঁহাউ উপদ্বীপের ইতিহাস লিখচি৷' তখন 'সে' মস্ত একটা হাই তুলে বললে, 'পুত্তুলালকে বলে দাও মোটর গাড়িটা নিয়ে আসে, আমি দিদির বাড়িতে যাই৷' জিজ্ঞাসা করলুম, 'তোমার দিদি থাকে কোথায়৷' বললে, 'তেরো মাইল দূরে, চৌচাকলা গ্রামে, উনকুণ্ডু পাড়ায়৷'
আমাকে বলে, 'তুমিও চলো৷ দিদি আমসত্ত দিয়ে উচ্ছেসিদ্ধ চমৎকার রাঁধে আর তার সঙ্গে ওভালটিন দিয়ে কুলের চাটনি৷'
শুনে ভারি লোভ হল৷ গাড়িতে চড়ে বসলুম৷ ঘোর অন্ধকার৷ পুকুরের ধারে আসশেওড়ার ঝোপ ছিল৷ হঠাৎ তার ভিতর থেকে খেঁকশিয়ালি ডেকে উঠল৷ তখন রাত সাড়ে তিনটে হবে৷ যেমনি ডাকা, ভয়ে পুত্তুলাল চমকে উঠে গাড়িসুদ্ধ গিয়ে পড়ল এক-গলা জলের মধ্যে৷ ভাগ্যে একটা হাঁড়ি ভাসছিল সেইটে ধরে সে তো উঠল ডাঙায়৷ এদিকে তার পিঠের কাপড়ের ভিতরে একটা ব্যাং ঢুকে লাফালাফি করচে৷ আর পুত্তুলালের সে কী চেঁচানি! আমি গাড়ির ছাদের উপর দাঁড়িয়ে ডাক দিচ্চি, 'বনমালী বনমালী৷' ইস্টুপিডের কোনো সাড়া নেই, সে তখন শান্তিনিকেতনে নাক ডাকিয়ে ঘুমচ্চে৷ ভারি রাগ হল৷ জলে আমার চুলগুলো গেচে ভিজে৷ না আঁচড়ে নিয়ে ওর দিদির ওখানে যাই কী করে৷ হঠাৎ শুনি পুকুর পাড়ে হাঁসগুলো প্যাঁক প্যাঁক করে ডেকে উঠেচে৷ এক লাফ দিয়ে পড়লুম তাদের মধ্যে, ধরলুম তাদের একটাকে৷ চেপে ধরে তার ডানা দিয়ে ঘষে ঘষে চুলটা একরকম ঠিক করে নিলুম৷ ওদিকে তখনও পুত্তুলাল এক হাঁটু পাঁকের মধ্যে দাঁড়িয়ে সর্বাঙ্গ আঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাউ হাউ করচে৷ পিঠের কাপড়ের মধ্যে ব্যাংও যত লাফায় তারও তত লাফানি৷ শেষকালে আমি গিয়ে পকেট থেকে একটা ফাউন্টেন পেন বের করে দু-চার খোঁচা মারতেই এত বড়ো একটা সবুজ রঙের কোলা ব্যাং লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল৷
তার পরে যাওয়া গেল ওর দিদির বাড়িতে৷ খিদে খুব পেয়েচে৷ ওর দিদিকে বললুম, 'বের করো তো তোমার ওভালটিন দিয়ে কুলের চাটনি৷' সে বললে, 'হায়রে, আমার পোড়া কপাল, এই গেল মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবারে ফাটা ফুটবল ভরতি করে সমস্তটা পাঠিয়ে দিয়েচি বুজু দিদির ওখানে-সে ওটা খেতে ভালোবাসে ছাতুর সঙ্গে মেখে৷
মুখ শুকিয়ে গেল, বললুম, 'আমরা খাই কী?'
সে বলে, 'কমলালেবু দিয়ে চিংড়িমাছের মোরব্বা ওই ভাঁড়ের তলায় অল্প একটুখানি আছে, বাছারা খেয়ে নাও, নইলে পিত্তি পড়ে যাবে৷'

ভাঁড় চেঁচেপুঁছে তিন জনে তিন চামচ খেয়ে কোনোমতে বাড়ি ফিরে এসে বাঁচি৷ চটিজুতো ভিজে, গা-ময় কাদা৷ বনমালীকে ডাক দিয়ে বললুম, 'বাঁদর, কী করছিলি৷' সে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'বিছে কামড়েছিল, তাই ঘুমচ্ছিলুম৷'-ধমক দিয়ে বললুম, 'খেতে দিবিনে?' সে বলে, 'পাব কোথায়? সকালে তোমার জন্যে রুটি টোস্ট করেছিলুম, তারই কিছু ছাল আছে আর আছে কাঁচকলা ভাতে৷' কী করি, তাই খেয়ে পুপুদিদিকে সমস্ত খবর দিয়ে চিঠি লিখতে বসেছি৷
'পুপুদিদি,
'সে' তো চলে গেল, বললে, 'পুপুদিদি নেই, আমি এখানে থাকব না৷' দু-দিন পরে তার মাসতুতো দিদির বাড়ি থেকে একজন লোক এসে উপস্থিত৷ মস্ত লম্বা, ঘাড় মোটা, মোটা পিপের মতো গর্দান, বনমালীর মতো রং কালো, ঝাঁকড়া চুল, খোঁচা গোঁফ, চোখ দুটো রাঙা, গায়ে ছিটের মেরজাই, কোমরে লাল রঙের ডোরাকাটা লুঙির উপরে হলদে রঙের তিন কোণা গামছা বাঁধা, হাতে পিতলের কাঁটামারা লম্বা একটা বাঁশের লাঠি, গলার আওয়াজ যেন কুঞ্জবাবুদের মোটর গাড়িটার শিঙের মতো৷ আমি সকাল বেলা খোওয়া-ফেলা আধ-মেরামত করা এবড়োখেবড়ো রাস্তাটায় প্রাণপণে পনেরো মিনিট পায়চারির পর জুতোর তলা জখম করে ঘরে এসে লিখতে বসেচি, হঠাৎ পিছন দিক থেকে সাড়ে তিন মন ওজনের গলায় কে ডেকে উঠল, 'বাবুমশায়!'
চমকে উঠে কলমের খোঁচায় খানিকটা কাগজ ছিঁড়ে গেল৷ পিছন ফিরে দেখি সেই প্রকাণ্ড এক তাল মানুষ৷
বললুম, 'কী হয়েচে, কে তুমি?'
সে বললে, 'আমার নাম পাল্লারাম, দিদির বাড়ি থেকে এসেচি, জানতে চাই 'সে' কোথায় গেল৷'
আমি বললুম, 'আমি কী জানি৷'
পাল্লারাম চোখ পাকিয়ে হাঁক দিয়ে বললে, 'জানো না বটে! ওই যে তাঁর তালি-দেওয়া আঁশ বের করা সবুজ রঙের এক পাটি পশমের মোজা কাদাসুদ্ধ শুকিয়ে গিয়ে মরা কাঠবেড়ালির কাটা লেজের মতো তোমার বইয়ের শেলফে ঝুলচে ওটা ফেলে সে যাবে কোন প্রাণে!'
আমি বললুম, 'লোকসান সইবে না, যেখানে থাকে ফিরে আসবেই৷ কিন্তু হয়েচে কী!'
পাল×ারাম বললে, 'পরশুদিন সন্ধ্যের সময় দিদি গিয়েছিল লাট সাহেবের বাড়ি করিম শেখের সীতার বনবাস পাঁচালি শুনতে-ফিরে এসে দেখে, একটা ঘটি একটা ছাতা এক জোড়া তাস, হারিকেন, লন্ঠন, আর একটা পাথুরে কয়লার ডালা নিয়ে কোথায় 'সে' চলে গেছে; দিদি বাগান থেকে এক ঝুড়ি বাঁশের কোঁড়া, লাউডগা আর বেতে শাক তুলে রেখেছিল তাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ দিদি ভারি রাগ করচে৷'
আমি বললুম, 'তা আমি কী করব!'
পাল্লারাম বললে, 'তোমার এখানে কোথায় সে লুকিয়ে আছে, তাকে বের করে দাও!'
আমি বললুম, 'এখানে নেই, তুমি থানায় খবর দাও গে৷'
'নিশ্চয় আছে৷'
আমি বললুম, 'ভালো মুশকিলে ফেললে দেখচি-বলচি সে নেই৷'
'নিশ্চয় আছে, নিশ্চয় আছে, নিশ্চয় আছে,' বলতে বলতে পাল্লারাম আমার টেবিলের উপর দমাদ্দম তার বাঁশের লাঠির মুণ্ডুটা ঠুকতে লাগল৷ টেবিলে ভীষণ ভূমিকম্প৷ পাশের বাড়িতে একটা পাগল ছিল সে শেয়াল ডাকের নকল করে হাঁক দিল হুক্কাহুয়া৷ পাড়ার সব কুকুর চেঁচিয়ে উঠল৷ বনমালী আমার জন্যে এক গ্লাস বেলের সরবত রেখে গিয়েছিল, সেটা উলটিয়ে, বোতল ভেঙে বেগনি রঙের কালির সঙ্গে মিশে রেশমের চাদর বেয়ে আমার জুতোর মধ্যে গিয়ে জমল৷ একটা ভাঁড়ে কিছু রেখেছিলুম ফিটকিরি, খয়ের, গেরিমাটি, ভুসো, তুঁতে আর হিরেকষ গুঁড়িয়ে, খুব একটা নূতন রকম কালি বানিয়ে বাজারে চালাবার মতলব ছিল৷ সেটা উড়ে আমার চুলে আমার দাড়িতে এসে ছড়িয়ে পড়ল৷ চিৎকার করতে লাগলুম, 'বনমালী, বনমালী৷' বনমালী ঘরে ঢুকেই পাল্লারামের চেহারা দেখে 'বাপরে মারে' বলে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড় দিলে৷
আমি বললুম, 'পাল্লারাম, রাগ কর কেন, নরম আওয়াজে বলো কী চাই তোমার৷'
পাল্লারাম হাউমাউ করে বললে, 'আর কিছু না হোক, যেখান থেকে পাই সেই লাউডগা ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই হবে-লাউডগা দিয়ে করমচা দিয়ে তার সঙ্গে ভিনিগার আর বার্লির গুঁড়ো মেখে নিয়ে দিদি রোজ সাড়ে তিনটের সময় জলখাবার খায়৷ একটু এদিক-ওদিক হলেই তার ডান পায়ের গিঁটে ঝিলিক মারতে থাকে৷ জোঁক বসিয়ে তবে সারাতে হয়৷'
আমি প্রতাপকে ডেকে বললুম, 'প্রতাপ, যেমন করে পারো এই লোকটাকে কিছু লাউডগা জোগাড় করে দাও, নইলে আমাকে মেরেই ফেলবে৷'
প্রতাপ মীরাপিসির বাগান থেকে ঝুড়িতে করে লাউডগা শাক নিয়ে এল৷ পাল্লারাম সেটা নিলে, তার সঙ্গে নিলে জলের কুঁজোটা, একটা গঁদের শিশি, একখানা পুরোনো প্রবাসী, এক পাটি খড়ম পড়েছিল সেটা, সবগুলো ভরতি করলে একখানা ছেঁড়া কাগজ ফেলবার চুপড়িতে৷ একটা তলাভাঙা বালতি ছিল সেটাও নিলে৷
আমি বললুম, 'বালতি নিয়ে কী হবে৷'
পাল্লারাম বললে, 'বড়ো রোদ্দুর, ওটা আমি টুপির মতো করে পরব৷'
এই বলে সে চলে গেল, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি৷ কাপড়খানা তখনই কাচতে দিলুম৷ সাবান দিয়ে গরম জল দিয়ে স্পিরিট দিয়ে এমোনিয়া দিয়ে মাথা যতই ধুই, চুল থেকে সেই আমার অসামান্য কালির মশলার রং কিছুতেই যেতে চায় না৷ মহা মুশকিলে পড়েছি৷ কুনো মিস্ত্রি এসে কাঠের গুঁড়োর সঙ্গে বালি মিশিয়ে মাথা ঘষে দিচ্ছে৷ বলছে, এমন করে তিন দিন তিন বেলা ঘষলে মাথা বেশ সাফ হয়ে যাবে, চুলও বেশি বাকি থাকবে না৷ 'সে' যদি এখনও দার্জিলিঙে থাকে তবে তাকে বলে দিয়ো তার দিদির বাঁশের কোঁড়া আর বেতো শাক যেন শিগগির ফিরিয়ে দেয়, লাউডগা আমি দিয়ে দিয়েছি৷ ভয় হচ্ছে আবার কালই পাল্লারাম এসে পাছে উৎপাত করে৷ ইতি ৮ই বৈশাখ ১৩৩৮৷
-দাদামশাই
আশ্বিন-অগ্রহায়ণ ১৩৩৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন