ঘঙ্গোপাধ্যায়

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

কটকটচন্দ্র ঘঙ্গোপাধ্যায় আমাদের খিড়কির পুকুরঘাটের ব্যাং কোলাবতীর ছেলে৷ একদিন ঘাটে আঁচাতে গিয়ে বাবুল স্পষ্ট তার নিজের কান দুটোয় শুনল যে কটকট তার মাকে বলছে, 'এইবার শোনো তো, কেমন গলাটা খুলেছে!'

এই বলেই ক্যাট ক্যাট ক্যাট করে গলা দিয়ে একরকম শব্দ বার করতে লাগল-যেন এক গাদা মাছের পেটের পটকা কে নোড়া দিয়ে মাটিতে বাটছে৷

কোলাবতী তখন কী একটা কথা ভাবছিল৷ তাই অন্যমনস্কভাবে বলল, 'চমৎকার!' এই বলেই সে যে পদ্মপাতাটায় বসেছিল তার ওপর থেকে এক লাফে জলে পড়ে, কোথায় নিতল হয়ে ডুব দিল৷

কটকটচন্দ্র পদ্মপাতাটায় একলা বসে বসে বার কয়েক সেই পটকা-ফাটানো রাগিনী গাইল৷ তারপর তীরের দিকে সাঁতরে ছুট দিল৷

তার গলার সুরে তার ভারি আনন্দ হচ্ছিল৷ কেননা, এত কাল পর্যন্ত তার গলা থেকে কোনো শব্দই বার হচ্ছিল না৷ এখন তার বিশ্বাস হল, সে ওস্তাদ গায়ক, ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা তার গলায়৷

তখন সবে বসন্তের মলয় বইছে৷ ঘাস তখনও খুব সবুজ৷ চার দিকে কচি কচি চারা গাছ, তাতে বিচিত্র ফুল৷ কটকটচন্দ্র যেতে যেতে কিছু ঘাসের আর ফুলের রস খেয়ে নিল৷ ফুর্তি তার আর ধরছিল না৷ আনন্দে কী যে করবে ভেবে না পেয়ে, সে নরম ঘাসের ওপর খুব খানিক 'লং জাম্প' করল৷

এমনি করে লাফাতে লাফাতে সে একটা ডালিম গাছের তলায় এসে পড়ল৷ সেখানে দেখল, গাছের মাথায় দিব্যি এক গানের আসর জমে গেছে৷

তখন হরবোলা পাখি গান ধরেছে৷ সে এক অদ্ভুত সুন্দর গান! কী তার সুর! কী তার ঝংকার! সারা পুকুর পাড়টা সুরের ঝরনাধারায় উপছে উঠছে৷ আকাশের ভাসন্ত ফুরফুরে মেঘ গান শুনতে থমকে থেমে গেছে৷ পুকুরের মাছেরা ঘাটের ধারে ভিড় করে এসেছে গান শুনতে৷

কটকটচন্দ্র খানিক শুনে আর স্থির থাকতে পারল না৷ কেমন করেই বা চুপ করে থাকে? সে উপস্থিত থাকতে কিনা ল্যাবাকান্ত হরবোলা পাখিটা যত প্রশংসা পাবে! তোমরাই বলো এ কি কেউ সহ্য করতে পারে!

তারপর প্রাণপণে গলা ফুলিয়ে কটকটচন্দ্র করাত দিয়ে কাঠ চেরার মতো একরকম খ্যাঁশখেঁশে বিশ্রী আওয়াজ করতে লাগল৷ তারপর গলা যতই চড়তে লাগল ততই সুরটা তার ভীষণ গোঙানির মতো মনে হতে লাগল৷ কটকটচন্দ্র ভাবল-কী সুরই না ধরেছি! এমন কাঠকাটা রাগিনী এদেশে কেউ কি ছাই শুনেছে!

এদিকে সেই বিদঘুটে আওয়াজ শুনে তো গাছের ওপর হরবোলার গান থমকে থেমে গেল৷ কটকটচন্দ্র ভাবল, 'দেখেছ দেখেছ, যেই খাঁটি ওস্তাদ তান ধরেছে অমনি মেকির দল চুপ!' তার বুক ফুলে দশ হাত হয়ে উঠল৷

উৎসাহের চোটে তার গোঙানি এত বিশ্রীভাবে বেড়ে উঠল যে হরবোলা পাখি আর স্থির থাকতে পারল না৷ সে ময়নাকে বলল, 'দেখ ভাই, গাছের তলায় কার বুঝি প্রাণ ওষ্ঠাগত!' দোয়েল বলল, 'আহা, ফড়িং খেতে গিয়ে বেচারার গলায় আটকে গেছে বোধ হয়, আহা!' হরবোলা মিষ্টি সমবেদনার সুরে বলল, 'ভাই কটকটচন্দ্র, তোমার কী হয়েছে?'

কটকটচন্দ্র ভারি বিরক্ত হয়ে বলল, 'কিছু না, আমি একটু গলা সাধছিলাম৷'

এই কথা শুনে চারপাশ থেকে এক হাসির হররা উঠল; এমনকী ফড়িংগুলোও চিড় চিড় করে হেসে উঠল৷ মাকড়সারা এত জোরে হেসে উঠল যে তাদের জাল থরথর করে কাঁপতে লাগল৷ মৌমাছিরা এমন হাসিটা হাসল যে, তাদের হাত-পা থেকে সোনালি ফুলরেণু ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল৷ প্রজাপতিরাও বেদম হাসল, তবে ওরা সব তাতেই হাসে কিনা!

এতে কেই বা না দমে যায়!

কটকটচন্দ্রের বুকভরা আশা নিমেষে নিভে গেল৷ মুখ হাঁড়ি করে বেচারা নলখাগড়ার বনের আড়াল দিয়ে কোনোরকমে গা ঢাকা দিয়ে পিটটান দিল৷

খিড়কির পুকুরে ফিরে এসে সে দেখল, তার মা কোলাবতী তখন চোখ বুজে আরাম করে জলের ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে৷ কটকটচন্দ্র কাঁদো-কাঁদো সুরে তার মাকে বলল, 'দেখো মা, আমি কেমন চমৎকার কাঠকাটা রাগিনীটা গাইছিলাম, আর ওরা সব আমায় ঠাট্টা করল!' বিরক্তভাবে চোখ চেয়ে কোলাবতী বলল, 'ওরা সব মানে? আবার বুঝি ব্যাঙাচিদের লেজ ধরে টানতে গেছিলে?'

'তা কেন,' কটকটচন্দ্র বলল, 'হরবোলা, ময়না, ফড়িং, মাকড়সা, মৌমাছি, প্রজাপতি- ওরা আমার গলার নিন্দে করল৷ ওই লেজ-দুলানো আহ্লাদি হরবোলাটার চেয়ে আমার গিটকিরিটা খারাপ নাকি!'

ঠাট্টার সুরে কোলাবতী বলল, 'ওঃ, তুমি বুঝি হরবোলার দেখাদেখি গান গাইতে গেছিলে?'

কটকটচন্দ্রের একটু লজ্জা হল৷ সে তবু বলল, 'কেন যাব না? আমি কম কীসে?' কোলাবতী খানিক চুপ করে কী ভাবল৷ তারপর বলল, 'আচ্ছা ভাবো দেখি, হরবোলা যদি তোমার মতো সাঁতার কাটতে যায়, তবে কেমন মানাবে!'

কটকটচন্দ্র ছ্যাড়ছ্যাড় করে হেসে উঠল, ঠিক যেন কচুপাতায় বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে৷ তারপর বলল, 'হ্যাঁঃ, পারবে নাকি? জলে ভিজে একেবারে জুজুবুড়ির পিসশাশুড়িটি হয়ে যাবে না!'

কোলাবতী বলল, 'সাঁতার কাটবার তার দরকার নেই৷ তার কাজও নয় সাঁতার কাটা৷ তার ছোটো ছোটো নখ আছে, কিন্তু আমাদের মতো পাতলা চামড়ায় ঢাকা পা সে পাবে কোথা? ওর গায়ে একবোঝা অদরকারি পালক৷ জলে ভিজলে আর রক্ষা থাকবে? আর আমাদের কেমন রবারের মতো পেছল গা-জলে এর কিচ্ছুটি হবে না৷'

কটকটচন্দ্রের এই কথা ভারি পছন্দ হল৷ খ্যাঁশখ্যাঁশ করে আবদারে হাসি হাসতে লাগল৷

তারপর আবার সাঁতরাতে সাঁতরাতে ডালিম গাছটার কাছাকাছি এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, যাতে লেজ-দোলানি দুলালি হরবোলা আর কানে-মাকড়ি কালিন্দী ময়নাটা শুনতে পায়-

'জলো ডাঙার বাদশা আমি

ব্যাঙের ছাতি মাথে,

হরবোলা আর কালিন্দী গো,

সাঁতরাবে মোর সাথে!-

ঘ্যা-ঘ্যাং-ঘ্যাং

কট কটর কট-ঘ্যা-ঘ্যাং-ঘ্যাং!'

মাঘ ১৩৪১

Cov101
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%