অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
ছেলেবেলা থেকেই চানু শয়তানের একশেষ, আশপাশের লোকজন তার জ্বালায় অস্থির৷ চানুর বাবা বড়ো গরিব ছিল, চানু ভাবল-বিদেশে গিয়ে টাকাপয়সা রোজগার করে আনবে৷ যেমন ভাবা তেমনি কাজ, একদিন সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল৷ খানিক দূরে গিয়েই বনের ভিতর দিয়ে একটা নির্জন রাস্তা-চানু সেই রাস্তা ধরে চলল৷ সমস্ত দিন বৃষ্টিতে ভিজে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যার সময় পথের ধারেই একটি কুঁড়ে ঘর ছিল, সেখানে এসে উপস্থিত৷
ঘরের ভিতরে আগুনের পাশে একটি বুড়ি বসেছিল, চানুকে দেখে সে জিজ্ঞাসা করল, 'কী চাই বাপু তোমার?'
চানু বলল, 'চাইব আর কী, কিছু খাবারদাবার চাই, আর একটি বিছানা চাই৷'
বুড়ি বলল, 'সরে পড়ো বাপু, এখানে কিছু পাবে না৷ আমার ছয়টি ছেলে, সারা দিন খেটেখুটে তারা এখনই বাড়ি ফিরবে৷ তোমাকে এখানে দেখতে পেলে তারা তোমার গায়ের চামড়া তুলে ফেলবে৷'
চানু৷ 'সেটা আর বেশি কথা কী? এই ঠান্ডায় বাইরে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মরার চাইতে গায়ের চামড়া তুলে ফেলবে, সেইটাই বরং ভালো৷'
বুড়ি দেখল, সে সহজ লোকের পাল্লায় পড়েনি৷ কী আর করে, তখন চানুকে পেট ভরে খেতে দিল৷ শুতে যাবার সময় চানু বুড়িকে বলল, 'দেখো বুড়ি! তোমার ছেলেরা এসে যদি আমার ঘুম ভাঙায়, তাহলে কিন্তু বড্ড মুশকিল হবে বলছি৷'
পরের দিন ঘুম ভাঙলে পর চানু দেখল, ছয় জন অতি বদ চেহারার লোক তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে-সে তাদের দেখে গ্রাহ্যও করল না৷
দলের সর্দারটি তখন জিজ্ঞাসা করল, 'তুমি কে হে বাপু? কী চাও এখানে?'
চানু৷ 'আমার নাম সর্দার চোর, আমার দলের জন্য লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি৷ তোমরা যদি চালাক চতুর হও, তাহলে তোমাদের অনেক বিদ্যে শিখিয়ে দেব৷'
সর্দার বলল, 'আচ্ছা বেশ, তুমি তাহলে এখন উঠে একটু খাও-দাও, তারপর দেখা যাবে এখন, কে সর্দার৷'
বিছানা থেকে উঠে সকলের সঙ্গে বসে চানু খেল৷ ঠিক তারপরই সকলে দেখল, একটা সুন্দর ছাগল সঙ্গে নিয়ে একজন কৃষক বনের পাশে যাচ্ছে৷ তখন চানু বলল, 'আচ্ছা, তোমাদের কেউ কোনোরকম জবরদস্তি না করে শুধু ফাঁকি দিয়ে ওই লোকটার ছাগলটা নিয়ে আসতে পার?' একজন একজন করে সকলেই বলল, 'না ভাই, আমরা কেউ তা পারব না৷'
চানু৷ 'ব্যস, তাহলেই দেখো আমি তোমাদের সর্দার কি না-আমি এখনই ছাগলটা নিয়ে আসছি৷' এই বলে তো তখনই বনের ভিতর দিয়ে গিয়ে রাস্তার মোড়ে তার ডান পায়ের জুতোটা রেখে দিল, তারপর ছুটে গিয়ে কিছু দূরে রাস্তার আর একটা মোড়ে বাঁ পায়ের জুতোটাও রেখে রাস্তার ধারে বনের ভিতর চুপ করে লুকিয়ে রইল৷
খানিক পরেই সেই কৃষক এসে প্রথমে জুতোটা দেখে মনে করল, 'খাসা জুতোটা পড়ে রয়েছে, কিন্তু এক পাটি দিয়ে কী হবে, আর এক পাটিও থাকলে ভালো হত৷'
খানিক দূরে এগিয়ে গিয়ে কৃষক আর এক পাটি জুতো দেখে ভাবল, 'আমি কী বোকা, ও পাটিটা যদি নিয়ে আসতাম৷ যাই, তাহলে ওটা নিয়ে আসি গিয়ে৷' একটা গাছে ছাগলটা বেঁধে সে চলল জুতো আনতে৷ এদিকে চানু কিন্তু ছুটে গিয়ে আগেই সেটা নিয়ে এসেছে৷ তারপর কৃষক ছাগলটাকে বেঁধে রেখে যখন চলে গেল, তখন চানুও বাঁ-পায়ের জুতোটা নিয়ে ছাগলটার বাঁধন খুলে সেটাকেও নিয়ে বনের ভিতর দিয়ে বুড়ির কুটিরে এসে উপস্থিত৷
কৃষক গিয়ে প্রথম জুতোটাও পেল না, ফিরে এসে পরের জুতোটাও পেল না৷ তার উপর আবার যখন দেখল যে ছাগলটিও সেখানে নেই, তখন সে ভাবল, 'এখন করি কী? গিন্নিকে যে বলে এসেছি, বাজারে ছাগলটা বেচে তার জন্যে একখানা গায়ের চাদর কিনে নিয়ে যাব! যাই তাহলে, চুপচাপ গিয়ে আর একটা জন্তু নিয়ে আসি, তা নইলে যে ধরা পড়ে যাব-গিন্নি ভাববে, আমি বোকার একশেষ৷'
এদিকে চানু ছাগল নিয়ে বুড়ির বাড়িতে যখন গেল, তখন সেই চোরেরা তো একেবারে অবাক! চানুকে কত করে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু কিছুতেই সে বলল না, কী করে সেই ছাগল আনল৷
খানিক বাদেই সেই কৃষক একটা মোটাসোটা সুন্দর ভেড়া নিয়ে এসে উপস্থিত৷ চানু বলল, 'যাও দেখি, কে জবরদস্তি না করে ভেড়াটা আনতে পার৷' ছয় চোরের সকলেই অস্বীকার করল৷ তখন চানু বলল, 'আচ্ছা, দেখি আমি পারি কি না৷ আমাকে একটা দড়ি দাও দেখি৷' দড়ি নিয়ে চানু বনের ভিতরে ঢুকে পড়ল৷
এদিকে কৃষকটি তার ছাগল চুরির কথা ভাবতে ভাবতে রাস্তা দিয়ে চলেছে, মোড়ের কাছেই এসে দেখে, গাছের ডালে একটা মড়া ঝুলছে৷ মড়া দেখেই তার গায়ে কাঁটা দিল, 'রক্ষা করো বাবা৷ খানিক আগে তো এখানে মড়া-টড়া কিছু দেখতে পাইনি!' সামনের মোড়ে গিয়ে কৃষক দেখল আর একটা মড়া গাছের ডালে ঝুলছে৷ 'রাম রাম রাম-এ হল কী? আমার মাথাটা গুলিয়ে যায়নি তো?' কৃষক তাড়াতাড়ি চলল৷ কিন্তু কী সর্বনাশ! রাস্তার আরেকটা মোড়ে গিয়ে দেখে, সেখানেও একটা মড়া ঝুলছে৷ পর পর তিন-তিনটে মড়া এতটা কাছাকাছি ঝুলছে দেখে তার মনে সন্দেহ হল-'নাঃ, এ কখনোই হতে পারে না৷ আমারই বোধ করি মাথা খারাপ হয়েছে৷ আচ্ছা, দেখে আসি আগের মড়া দুটো এখনও গাছে ঝুলছে কি না৷' কৃষক সবে মাত্র মোড়টা ফিরেছে, তখন ডালের মড়া চট করে নেমে এসে বাঁধন খুলে ভেড়াটাকে নিয়ে বনের ভিতর দিয়ে একেবারে বুড়ির বাড়ি গিয়ে হাজির৷

এদিকে কৃষক গিয়ে দেখল, মড়া-টড়া কিছুই গাছে ঝুলছে না৷ ফিরে এসে দেখল তার ভেড়াটাও নেই, কে জানি দড়ি খুলে নিয়ে চম্পট দিয়েছে৷ তখন তার মনটা কেমন হল তা বুঝতেই পার! বেচারি মাথা খুঁড়তে লাগল-'হায়, হায়৷ কার মুখ দেখে আজ বেরিয়েছিলাম! এখন গিন্নি কী বলবে? সমস্ত সকালটাই মাটি হয়ে গেল, ছাগল ভেড়া দুটোই গেল৷ এখন করি কী? একটা কিছু এনে বাজারে বিক্রি করে গিন্নির শাল না কিনলেই চলবে না৷ আসবার সময় দেখেছিলাম, ষাঁড়টা মাঠে চরে বেড়াচ্ছে৷ যাই, সেটাই গিয়ে নিয়ে আসি-গিন্নিও দেখতে পাবে না৷'
চানু যখন চোরদের বাড়ি ভেড়া নিয়ে গিয়ে উপস্থিত, তখন চোরদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল৷ সর্দার চোরটি বলল, 'আর একটা যদি এরকম চালাকি খেলতে পার, তাহলে তোমাকেই আমাদের সর্দার করব৷'
ততক্ষণে কৃষকটিও ষাঁড় নিয়ে এসে উপস্থিত৷ চানু বলল, 'যাও তো, জবরদস্তি না করে কে ষাঁড়টা ফাঁকি দিয়ে আনতে পার?' কেউ যখন ভরসা পেল না, তখন সে বলল, 'আচ্ছা দেখি, আমি পারি কি না৷' চানু বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল৷
কৃষকটি খানিক দূর এগিয়ে গিয়েই বনের মধ্যে একটা ছাগলের ডাক শুনতে পেল৷ ঠিক তার পরেই একটা ভেড়াও ডেকে উঠল৷ আর তাকে রাখে কে! একটা গাছে ষাঁড়টাকে বেঁধে রেখে ছুটল বনের ভিতর৷ কৃষক যত যায়, ততই শোনে এই একটু আগেই ডাকছে, দেখতে দেখতে প্রায় আধ মাইল দূরে চলে গেল৷ তখন হঠাৎ সব চুপচাপ, ভেড়া ছাগলের ডাক আর শুনতে পাওয়া গেল না৷ এদিক-ওদিক খুঁজে কৃষক একেবারে হয়রান হয়ে গেল-কোথা বা ছাগল আর কোথাই বা ভেড়া৷ বেচারি কাহিল হয়ে আবার ফিরে এল৷ কিন্তু সর্বনাশ! এসে দেখে, ষাঁড়টিও সেখানে নেই৷ বন উলটপালট করে ফেলল, কিছুতেই আর ষাঁড়ের খোঁজ পেল না৷
চানু যখন ষাঁড় নিয়ে এসে উপস্থিত, তখন আর কথাটি নেই৷ চোরেরা চানুকে তাদের সর্দার করল৷ তাদের আনন্দ দেখে কে, সমস্তটা দিন আমোদ করেই কাটিয়ে দিল৷ লুটপাট করে চোরেরা যা-কিছু আনত, একটা গহ্বরের মধ্যে সব লুকিয়ে রাখত, রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর তারা চানুকে নিয়ে সেই সমস্ত টাকাকড়ি সব দেখিয়ে দিল-চানুই যে এখন তাদের সর্দার, তাকে সব না দেখালে চলবে কেন৷
দলের সর্দার হবার প্রায় এক সপ্তাহ পরে চোরেরা একদিন চানুকে বাড়ির জিম্মায় রেখে চুরি করতে গেল৷ খালি বাড়ি, চানু সেই শয়তান বুড়িকে জিজ্ঞাসা করল, 'আচ্ছা, তুমি যে এদের ঘর-সংসার দেখ, এরা তোমাকে তার দরুন কিছু বকশিশ-টকশিশ দেয় না?'
বুড়ি৷ 'বকশিশ দেয়, না ওদের মাথা দেয়!'
চানু! 'বটে, কিছু দেয় না৷ আচ্ছা এসো আমার সঙ্গে, আমি তোমাকে ঢের টাকা দেব৷' বুড়িকে সঙ্গে করে চানু টাকার ঘরে গেল৷ জন্মেও বুড়ি এত ধন কোনোদিন দেখেনি-মুখ হাঁ করে সেই রাশি রাশি টাকা মোহরের দিকে বুড়ি খানিকক্ষণ চেয়ে রইল৷ তারপর বুড়ির আহ্লাদ আর ধরে না৷ হাঁটু গেড়ে মাটিতে পড়ে দুই হাতে টাকাগুলো ঘাঁটতে লাগল৷ সময় বুঝে চানুও তার পকেট বোঝাই তো করলই, তারপর একটা থলে মোহর দিয়ে ভরতি করে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের দিক থেকে দরজায় চাবি লাগিয়ে দিল৷ বুড়ি সেই টাকার ঘরেই আটকা পড়ে রইল৷
বেরিয়ে এসেই চানু সুন্দর একটা পোশাক পরল, তারপর সেই ছাগল, ভেড়া আর ষাঁড়টাকে নিয়ে একেবারে সেই কৃষকের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত৷ কৃষক তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির দরজায়ই বসেছিল, তারপর সেই হারানো জন্তুগুলিকে দেখে আহ্লাদে লাফিয়ে উঠল৷

চানু বলল, 'এ জন্তুগুলো কার বলতে পার কি?'
'এগুলো যে আমাদের, আপনি কোথায় পেলেন মশায়?'
'এই বনের ভিতর চরে বেড়াচ্ছিল৷ আচ্ছা, ছাগলটার গলায় একটা থলে ঝুলছে, তাতে দশটা মোহর রয়েছে-ওগুলিও কি তোমাদের?'
'না মশায়৷ আমরা গরিব দুঃখী লোক, মোহর কোথা পাব?'
'আচ্ছা, মোহরগুলোও তোমরা নাও, আমার কিছু দরকার নেই৷' মোহরগুলি নিয়ে দুই হাত তুলে কৃষক চানুকে আশীর্বাদ করল৷
সমস্ত দিন চলে চানু প্রায় সন্ধ্যার সময় তার বাড়িতে এসে উপস্থিত৷ বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখল, তার মা-বাবা বসে আছে৷ চানু বলল, 'ভগবান আপনাদের ভালো করুন, আজ রাতটা আপনাদের বাড়ি থাকতে পারি কি?'
'আপনার মতো ভদ্রলোক কি এখানে থাকতে পারবেন? আমরা যে বড্ড গরিব৷'
চানু আর চুপ থাকতে পারল না, 'বাবা, তুমি কি তোমার ছেলেকেও চিনতে পারছ না?'
চানুর মা-বাবা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে রইল, তারপর চানুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'এমন সুন্দর পোশাক তুমি কোথায় পেলে বাবা?'
চানু৷ 'পোশাক দেখেই অবাক হয়ে গেলে, তাহলে এই টাকাগুলো দেখে কী করবে?' এই বলে চানু পকেট খালি করে সব মোহর টেবিলের উপর রাখল৷
এতগুলো মোহর দেখে চানুর বাবার বড্ড ভয় হল৷ চানু তখন সব কথা খুলে বলল৷ তার আশ্চর্য বুদ্ধির কথা শুনে চানুর মা-বাপের আনন্দ আর ধরে না৷
পরের দিন সকালে চানু বাবাকে বলল, 'বাবা, যাও জমিদারবাড়ি৷ বলো গিয়ে, আমি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করতে চাই৷'
চানুর কথা শুনে তার বাবার চোখ বড়ো হয়ে গেল, 'বলিস কী রে বেটা! তাহলে যে আমার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেবে৷'
'না! তুমি বোলো যে আমি সর্দার চোর, আমার মতো ঝানু চোর দুনিয়ায় নেই, জবরদস্ত ও ওস্তাদ চোরদের ফাঁকি দিয়ে লাখ টাকা রোজগার করে এনেছি৷ দেখো বাবা, যখন দেখবে জমিদারের মেয়েও সেখানে আছে, তখনই এসব কথা বোলো৷'
'আচ্ছা, এত করে যখন বলছ, যাচ্ছি৷ কিন্তু কিছু হবে বলে মনে হয় না৷' প্রায় দুই ঘণ্টা পরে চানুর বাবা ফিরে এল৷ চানু বলল, 'কী করে এলে, বাবা?'
'নেহাত মন্দ নয়৷ মেয়েটি যে বড়ো অনিচ্ছুক, তা তো মনে হল না৷ বোধ করি বাবাজি তুমি এর আগেও তার কাছে এ প্রস্তাবটি করেছ-না? যাহোক, জমিদার বললেন, আসছে রবিবারে তাঁরা নাকি একটি হাঁস ভেজে খাবেন৷ তুমি যদি কড়া থেকে হাঁসটা বেমালুম চুরি করতে পার, তাহলে তিনি তোমার কথা ভেবে দেখবেন৷'
'এ আর তেমন শক্ত কাজ কী? দেখা যাবে এখন৷'
রবিবার দিন জমিদার এবং বাড়ির সকলে রান্নাঘরে রয়েছেন৷ হাঁস ভাজা হচ্ছে, এমন সময় রান্নাঘরের দরজা খুলে গেল৷ একটা অতি কুৎসিত বুড়ো ভিখারি, পিঠে তার একটা মস্ত বড়ো থলে ঝুলছে, সে এসে রান্নাঘরের দরজায় উঁকি মেরে বলল, 'জয় হোক বাবা! আপনাদের খেয়ে-দেয়ে কিছু থাকলে আমি বুড়ো ভিখারি কিছু খেতে পাব কি?'
জমিদারমশায় বললেন, 'অবশ্যি পাবে৷ রান্নাঘরের দাওয়ায় একটু বোসো৷'
জানালার পাশে একজন লোক বসেছিল৷ খানিক পরে সে চেঁচিয়ে উঠল, 'আরে, মস্ত বড়ো একটা খরগোশ ছুটে বাগানের দিকে যাচ্ছে-এটাকে মারলে হয় না?'
জমিদার ধমক দিয়ে বললেন, 'খরগোশ মারবার ঢের সময় মিলবে, এখন চুপ করে বসে থাকো৷'
খরগোশটা বাগানে গিয়ে ঢুকল৷ ভিখারি পোশাক-পরা চানু থলের ভিতর থেকে আর একটা খরগোশ ছেড়ে দিল৷ একটু পরেই চাকর আবার চেঁচিয়ে উঠল, 'বাবু বাবু, খরগোশটা এখনও রয়েছে-এখনও চেষ্টা করলে মারা যায়৷'
আবার জমিদার ধমক দিলেন, 'চুপ করে থাকো বলছি৷'
খানিক বাদে চানু আরও একটা খরগোশ থলে থেকে বের করে ছেড়ে দিল৷ চাকরও চেঁচিয়ে উঠল-আর যায় কোথা! একজন একজন করে সব ক-টি চাকর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খরগোশের পেছনে তাড়া করল, জমিদারমশায়ও বাদ পড়লেন না৷
খরগোশ তাড়িয়ে সকলে ফিরে এসে দেখে, ভিখারিও নেই, কড়ার মধ্যে হাঁসও নেই৷ জমিদারমশাই বললেন, 'আচ্ছা ফাঁকিটা দিয়েছে চানু, সত্যি সত্যি আমাকে জব্দ করেছে৷'
একটু পরেই চানুদের বাড়ি থেকে একজন চাকর এসে জমিদারমশায়কে বলল, 'আজ্ঞে, আমার মনিব বলে পাঠিয়েছেন, আপনারা অনুগ্রহ করে আমাদের বাড়ি গিয়ে খাবেন৷'
জমিদার বড়ো চমৎকার সাদাসিধে লোক ছিলেন, মনে একটুও অহংকার ছিল না৷ স্ত্রীকে ও মেয়েকে নিয়ে চানুদের বাড়ি গেলেন৷ চানুর চালাকির কথা বলে জমিদারমশায় হাসতে হাসতে পাঁজরে ব্যথা ধরিয়ে ফেললেন৷ মেয়েটি তো আগে থেকেই চানুকে পছন্দ করত, এখন তার পোশাক দেখে এবং তার আদবকায়দা দেখে মনে মনে আরও খুশি হল৷
খাওয়া-দাওয়ার পর জমিদার বললেন, 'চানু, শুধু হাঁস চুরি করেই আমার মেয়ে পাবে না৷ কাল রাত্রে আমার আস্তাবল থেকে আমার ছয়টি ঘোড়া যদি চুরি করতে পার, তাহলে দেখা যাবে এখন৷ ছ-জন সহিস কিন্তু ছয়টি ঘোড়ার পিঠে চড়ে পাহারা দেবে মনে রেখো৷'
চানু বলল, 'আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখব এখন৷'
সোমবার রাত্রে জমিদারের আস্তাবলে ছয়জন সহিস ছয়টি ঘোড়ার পিঠে বসে আছে৷ বেজায় ঠান্ডা, রক্ত যেন জমে যেতে চায়৷ তাই প্রত্যেকের জামার পকেটে একটি করে মদের বোতল, খানিক পরে পরে একটু করে মদ খেয়ে গা গরম করে নিচ্ছে৷ ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না, তাই সকলে মিলে মহা গল্প জুড়ে দিল৷ চানুর জন্য আস্তাবলের দরজা খোলাই রেখেছিল৷ রাত যত বেশি হতে লাগল, ঠান্ডাটাও যেন বাড়তে লাগল৷ মদে আর শানায় না, গায়ে কাঁপুনি ধরে গেল৷ এমন সময় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে একটা কদাকার বুড়ি এসে দরজায় উঁকি মেরে বলল, 'বাবাসকল, শীতে জমে গেলাম, একমুঠো খড় দাও তো, আস্তাবলের এককোণে রাতটা পড়ে থাকি৷ তা না হলে বুড়ো মানুষ- শীতে মরেই যাব৷' বুড়ির পিঠে ছয়টা থলে, মুখে প্রায় দু-আঙুল লম্বা দাড়ি-চেহারাটি কুৎসিতের একশেষ!
বুড়ি আস্তাবলের দরজায় উঁকি মেরে বলল, 'লক্ষ্মী বাপ আমার, বুড়ো মানুষ শীতে মরে গেলাম, ওই কোণটাতে একটু জায়গা দাও, একমুঠো খড় নিয়ে পড়ে থাকব এখন৷'
সহিসরা ভাবল, 'এলই-বা বুড়ি, বেচারি শীতে জমাট বেঁধে গেল, ও তো আর কোনো অনিষ্ট করবে না৷' আস্তাবলের কোণে খড় পেতে বুড়ি বেশ আরামে বসল৷ সহিসরা দেখল, বুড়ি খানিক পরেই একটা কালো বোতল বের করে একটু মদ খেল৷ তার মুখে আর হাসি ধরে না, যেন সে খুবই আরাম বোধ করছে৷ সহিসদের বুড়ি বলল, 'বাবা, তোমাদের সব বোধ করি শেষ করে ফেলেছ, তা আমার কাছে ঢের আছে৷ তবে কিনা তোমরা পাছে কিছু মনে কর, তাই তোমাদের দিতে ভরসা পাচ্ছি না৷' একে বেজায় শীত, তার উপরে সত্যি সত্যি তাদের মদ শেষ হয়ে গেছে, বুড়ির কথা শুনে সহিসরা যেন হাতে চাঁদ পেল-'সে কি বুড়িমা, তুমি যদি দাও তাহলে তো বেঁচে যাই৷ ঠান্ডায় মরে গেলাম৷'
বুড়ির বোতলটি দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল, তবুও সহিসদের শীত গেল না৷ শয়তান বুড়ি তখন আর একটি বোতল বের করে তাদের দিল৷ এ বোতলটার মদের সঙ্গে কী মেশানো ছিল, খাওয়ামাত্র সব ক-টা সহিস ঘোড়ার পিঠে গদির উপরে বসেই নাক ডাকিয়ে ঘুম দিল৷
তখন বুড়ি উঠে সব ক-টা সহিসকে খড়ের উপর শুইয়ে ঘোড়াগুলোর পায়ে মোজা পরিয়ে দিল৷ তারপর সবগুলিকে নিয়ে একেবারে চানুদের বাইরের একটা ঘরে গিয়ে হাজির৷
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জমিদারমশায় প্রথমেই কী দেখলেন? তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে চানু ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে, আর তার ঘোড়ার পিছনে পিছনে অপর পাঁচটা ঘোড়াও চলেছে৷
জমিদারমশায় অবাক হয়ে রইলেন৷ মনে মনে বললেন, 'গোল্লায় যা তুই চানু, আর যাদের চোখে ধুলো দিয়েছিস সে বেচারারাও গোল্লায় যাক৷' আস্তাবলে গিয়ে সহিস বেটাদের জাগাতে জমিদারমশায়কে বেগ পেতে হয়েছিল৷
সকাল বেলা জমিদারমশায় খেতে বসেছেন, চানুকেও ডেকে এনেছেন, খেতে খেতে চানুকে বললেন, 'কতগুলো বোকা পাঁঠার চোখে ধুলো দিয়েছ৷ এতে তেমন বাহাদুরি নেই৷ আচ্ছা, আজ বেলা একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত আমি ঘোড়ায় চড়ে বাড়ির সামনে ঘুরে বেড়াব৷ নিয়ো দেখি বাপু আমার ঘোড়াটা চুরি করে! তাহলে বুঝব তুমি বাহাদুর এবং আমার জামাই হবার উপযুক্ত৷'
চানু মাথা নীচু করে উত্তর করল, 'যে আজ্ঞে, একবার চেষ্টা করে দেখব এখন৷'
একটার পর থেকে জমিদার ঘোড়ায় চড়ে পাইচারি করে করে একেবারে কাহিল হয়ে পড়লেন৷ তিনটে বেজে গেল, চানুর টিকিটিও দেখতে পেলেন না৷ মনে করলেন এবারে বাড়ি ফিরে যাবেন, এমন সময় তাঁর একটা চাকর পাগলের মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে হাজির- 'কর্তা শিগগির বাড়ি যান, মা ঠাকরুনকে বুঝি-বা আর দেখতে পেলেন না৷ সিঁড়ির উপর থেকে তিনি পড়ে গেছেন৷ বোধ করি হাত-পা সব ভেঙে গেছে, তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন৷ আমি চললাম ডাক্তারের বাড়ি৷'
জমিদারের চোখ বড়ো হয়ে গেল, 'বলিস কীরে বেটা, কী সর্বনাশ! ডাক্তারের বাড়ি যে ঢের দূর-তাই আমার ঘোড়াটা নিয়ে ছোট শিগগির৷' ঘোড়ায় চড়ে চাকর তখন ডাক্তারের বাড়ি ছুটল৷
জমিদারমশাই হোঁচট খেতে খেতে বাড়ি এসে উপস্থিত৷ এসে দেখলেন, সাড়াশব্দ কিছু নেই, সব চুপচাপ৷ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে গেলেন, সেখানে বসবার ঘরে গিন্নি আর মেয়ে দিব্যি আরাম করে বসে আছেন৷ ততক্ষণে জমিদারমশায়ের চৈতন্য হল৷ তিনি বুঝতে পারলেন, এসব চানু বেটারই চালাকি-বেটা তাঁকে আচ্ছা ঘোল খাইয়েছে৷
খানিক পরেই দেখলেন চানু তাঁর ঘোড়ায় চড়ে বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে৷ সেই চাকর বেটার কিন্তু আর কোনো উদ্দেশ পাওয়া গেল না৷ চাকর তার জন্য একটুও কেয়ার করে না, নাই-বা করল তার চাকরি-চানু যে তাকে দশটা মোহর দিয়েছিল, তা দিয়ে তার অনেক দিন চলবে৷
পরের দিন চানু এসে জমিদার বাড়ি উপস্থিত৷ জমিদার বললেন, 'তুমি বাপু এবারে নেহাত ফাঁকি দিয়েছ, ওতে তোমার উপর আমার বড্ড রাগ হয়েছে৷ যাহোক আজ রাত্তিরে যদি আমাদের বিছানার থেকে চাদরখানা চুরি করতে পার, তাহলে কালকেই বিয়ের আয়োজন করব৷'
চানু বলল, 'আজ্ঞে আচ্ছা, একবার চেষ্টা করে দেখব৷ কিন্তু এবারেও যদি ফাঁকি দেন তা হলে কিন্তু আপনার মেয়েকেই চুরি করে নিয়ে যাব৷'
রাত্রে জমিদার আর তাঁর গিন্নি শুয়েছেন৷ দিব্যি জ্যোৎস্না৷ কাচের জানালার ভিতর দিয়ে চাঁদের আলো এসে ঘরে পড়েছে৷ জমিদারমশায় দেখলেন, হঠাৎ যেন একটা মাথা জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে যাচ্ছিল, তাঁদের দেখতে পেয়েই আবার সরে পড়ল৷
জমিদার গিন্নিকে বললেন, 'দেখলে তো? এ বেটা নিশ্চয় চানু৷' তারপর বন্দুকটা হাতে করে নিয়ে বললেন, 'দেখো, আমি বেটাকে এখনই চমকে দিচ্ছি৷'
বন্দুক দেখেই জমিদার গিন্নি ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'কর কী, চানুকে গুলি করবে নাকি?'
জমিদার বললেন, 'আরে না, তুমি কি পাগল হলে নাকি? বন্দুকে কি আর গুলি পুরেছি- শুধু বারুদ৷'
খানিক পরেই আবার জানালায় মাথা উঁকি মারল, দড়াম করে জমিদার বন্দুক ছুড়ে দিলেন-সঙ্গেসঙ্গে শুনতে পেলেন, ধপ করে কী নীচে পড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লেগেছে৷

জমিদার গিন্নি চেঁচিয়ে উঠলেন, 'হায় ভগবান, বেচারি বোধ করি মরে গেছে, আর নাহয় জন্মের মতো খোঁড়া কানা হয়ে থাকবে৷'
জমিদারমশায় কেমন জানি থতমত খেয়ে গিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলেন-দরজা খোলাই পড়ে রইল৷
জমিদারমশায় বোধ করি তখনও বাইরের জানালার কাছে পৌঁছোননি, কিন্তু গিন্নিঠাকরুন শুনলেন, কর্তা ফিরে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলছেন, 'শিগগির বিছানার চাদরখানা দাও৷ বেটা মরেনি বোধ হয়, কিন্তু বেজায় রক্ত পড়ছে-একটু পরিষ্কার করে বেঁধে-টেঁধে ওকে নিয়ে আসব৷'
গিন্নিঠাকরুন একটানে চাদরখানা বিছানা থেকে তুলে দরজায় ছুড়ে দিলেন৷ চাদর নিয়ে জমিদারমশায় আবার ছুটলেন৷ কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই মুহূর্তেই তিনি ফিরে এসে ঘরে উপস্থিত-সে সময়ের মধ্যে বাগানে জানালার কাছে গিয়ে ফিরে আসা একেবারে অসম্ভব৷
ঘরে ঢুকেই জমিদার রেগে-মেগে বলতে লাগলেন, 'বেটা পাজি চানু, তোকে ফাঁসি দেওয়া দরকার৷'
কর্তার কথা শুনে গিন্নি অবাক হয়ে বললেন, 'বেচারির বেজায় লেগেছে আর তুমি কিনা তাকে গালাগালি দিচ্ছ!'
'ওর বাস্তবিক লাগাটাই উচিত ছিল৷ বেটার বদমাইশি দেখেছ? খড় দিয়ে একটা মানুষ বানিয়ে সেটাকে কাপড়চোপড় পরিয়ে এনে জানালায় ধরেছিল৷'
'কী ছাই মাথামুণ্ডু বলছ, আমি বুঝতেই পারছি না৷ খড়ের মানুষ হলে তার রক্ত মুছবার জন্য আবার বিছানার চাদর চেয়ে নিয়ে গেলে কেন?'
'বিছানার চাদর-বলছ কী! আমি তো বিছানার চাদর-টাদর চাইতে আসিনি৷'
'চাদর চাইতে আস আর না আস, আমি সেসব কিছু জানি না৷ তুমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে চাদর চাইলে, আর আমিও তোমাকে দিয়েছি৷'
গিন্নির কথা শুনে জমিদারমশায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন-'কী ভীষণ শয়তান রে বাবা চানু৷ ওর সঙ্গে আর পেরে উঠব না৷ কাল সকালেই বিয়ের বন্দোবস্ত করতে হবে দেখছি৷'
এরপর চানুর সঙ্গে জমিদার কন্যার বিয়ে হয়ে গেল৷ বিয়ের পর চানু খুব ভালো হয়ে গেল৷ তার মতো জামাই সচরাচর মেলে না৷ জমিদারমশায় এবং তাঁর গিন্নি শতমুখে চানুর সুখ্যাতি করেন আর লোকের কাছে বলেন, 'আমার ঝানু চোর চানু৷'
অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৩২১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন