অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক ছিল দাঁড়কাক৷ তার নামধাম গুণগ্রাম চক্ষুলজ্জা কথার দাম এসব কিচ্ছু ছিল না৷ কারও সঙ্গে ভাব তো ছিলই না, এমনকী আড়ি পর্যন্ত ছিল না৷ মাথার ঘাম পায়ে ফেলত না, কারও কথা কানে তুলত না৷ রোজ খুব ভোরে উঠত, সারাদিন রোদে পুড়ত, কারও কাছে কিছু চাইত না, বৃষ্টির জল ছাড়া নাইত না, খুব খিদে পেলে এঁটোকাঁটা নোংরাঝোংরা যাহোক একটা কিছু খেয়ে নিয়ে সন্ধ্যে হলে হাটে মাঠে ঘাটে বাগানে বাথানে দোকানে যেখানে হোক একটি নিরিবিলি কোণ বেছে নিয়ে শুয়ে পড়ত৷
একদিন দাঁড়কাকের শরীরটা খারাপ, নামমাত্তর একটু মিরগেলের ঘেসো তেল মুখে ঠেকিয়ে বেলাবেলি এসে সে-ই যে-বাগানে মালিক নেই শালিক নেই মালি নেই তিনটে গাছে ডালই নেই, সেই বাগানের এককোণে একটা গাদা-গুপপো ভাঙা বাক্সোর ওপর শুয়ে শুয়ে-
'টক আমড়ার কামড়া ডাল, স্বপ্নে যাবি কাংড়া কাল
বইয়ের পাতা দুমড়ো না, শুকনো কাপড় নিংড়ো না
ডুমরাওনের দামড়া ষাঁড় হুমড়ে ভাঙে কুমড়ো ঝাড়
আমরুলের জ্বর তাংড়াবেই সোনাব্যাঙের চামড়া ওই-'
এই ছড়াটা বলতে বলতে নিজেই নিজেকে ঘুম পাড়াচ্ছে, এমন সময় কানে গেল চিল গলায় খিলখিল কথাবার্তা৷ মাথা যেমন কাত তেমনি কাত, বোজা চোখ সোজা করে সামনের দিকে তাকাতেই দাঁড়কাক দেখল-পাঁচিলের পাঁচ ফাটলে গজানো অশ্বত্থ ডালে পাশাপাশি বসে দু-টি ধবধবে শঙ্খচিল৷
একটি হচ্ছে জলটুঙ্গির মেঘতুঙ্গীদের কনে-মেয়ে সবে-উড়তি মহাফুর্তি ডানা ঝাড় তো আরও-বাড় তো টরটরে খরখরে একচক্রা, আদুরে নাম একা৷
আর-একটি-বালিয়াড়ির দূরপাড়িদের নতুন ছেলে শুধু খেলা-নেই-কাজ খুব সাজ ওড়বাজ পালকে-পালকে-খাঁজ রাতদিন-সুর ভাঁজ পাকচক্র, রাগানো-কিন্তু রাগে না নাম পাকা৷
একবার দেখে নিয়েই চোখটা প্রায় বুজিয়ে দাঁড়কাক চুপচাপ শুয়ে শুয়ে শুনতে লাগল ওদের কথাবার্তা৷
পাকচক্র- 'এককা দোককা
আমাদের একরানি বড়ো একরোক্কা'
না-তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে ঘাড় ঝাঁকিয়ে একচক্রা বলল-
'এটুকু বুঝতে গেল দু-টি দিন পাক্কা?
কী আছে মগজে দেখি দিতে দে তো ধাক্কা'
পাকচক্র মাথাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
'একা একা একানি- চারানির বদলেতে দেব তোকে একানি
ইকড়ি মিকড়ি কান নেই তোকে তাই দিইনি কো মাকড়ি
একলা একলি কিছুই করিনি তবু শুধু শুধু বকলি
আঁকাবাঁকা আঁকনি- পোলাওয়ে মশলা দিতে দিয়েছিস ছাঁকনি'
একচক্রা একচোখে কটমট করে তাকিয়ে আর এক চোখে মিটমিট করে হাসতে লাগল৷ পাকচক্র আবার ধরল-
'এক-এককে একা, একা বড়ো বোকা
ধোঁকা ছোঁকা ঠেলে ফেলে শোঁকে শুঁয়োপোকা
মাছ বড়ো আক্রা, তাই একচক্রা
মনে মনে বক্রা
তবুও সাতটি চড়ে কাড়ে না কো এক রা-'
কথা কেড়ে নিয়ে ডানা দুলিয়ে একচক্রা বলে উঠল-
'রা কাড়ব কাড়বই
নইলে বিপাকে পাকেচক্রে যে পড়বই
মুখ বুজে চোখ বুজে থাকবার ফাঁক কই?
ঢাক ঢাক গুড় গুড় আর নয়-দুর দুর
হাঁকডাকি জাঁক করি বাজাই দে ঢাক কই?'
পাকচক্র বলল- 'একে একে এক কই? হাঁস আছে প্যাঁক কই?
রাঁধব যে ঝিক কই? শুধু ক্লিক, দিক কই?
দেখবার চোখ কই কইবার লোক কই
সখ কই সুখ কই
এত পড়ে শুধু শিখি ঐক্য না, বাক্যই-'
একচক্রা বলল-'তুমি আবার পড়লে কবে গো? তোমাকে তো খালি উড়তেই দেখছি জ্ঞান হয়ে ইস্তক?'
পাকচক্র বলল-'ওই উড়তে উড়তেই অনেক কিছু পড়ে নিয়েছি৷ পড়তে পড়তে সামলেও নিয়েছি৷ যাক এখন বাড়ি যাই চল৷ সূয্যি ডুবল বলে, রোদ উবল বলে, শন শন পুবে হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে ঝিনুকঝিলের মাথায় অনেক অনেক অ-নে-ক-ক্ষ-ণ ধরে একটা লম্বা চক্কর দিয়ে চল ঘরে ফিরি৷'
একা বলল-'তার আগে একটা কথা বলি শোন৷'
পাকা বলল-'কী?'
'এ . . . ই বলছিলুম কি আমাদের যদি নাম না থাকত, তাহলে বেশ হত, না?'
পাকা বলল- 'সে কী রে একী রে
এ তো ভারি অদ্ভুত শখ তোর কিম্ভূত
তুই যদি হেথা আর আমি হোথা থাকতুম
নাম না থাকলে তোকে কী বলে বা ডাকতুম'
'কেন? বানানো নাম দিয়ে?'
'-আগে তো জানানো চাই, তারপর বানানো
আগে শোন শান চাই, তারপরে শানানো
জল চাই, ঢেউ চাই, তবেই না ফেনানো
কান চাই, মন চাই, তবে গান শোনানো'
নাম না থাকলে কখনো হয়? নাম থাকে না কাদের? যাদের মা নেই বাবা নেই ভাই নেই বোন নেই বন্ধু নেই বউ নেই বর নেই কেউ নেই কিছু নেই, সেই তাদের৷
একা বলল-'আহা, এমন বেচারাও আবার কেউ কোথাও আছে নাকি গো?'
পাকা বলল-'কেন? সেই দাঁড়কাকটি?'
দাঁড়কাক চমকে উঠল৷ একা-পাকা উড়ে গেল৷
সারারাত ধরে দাঁড়কাকের ঘুম হল না৷ এই সেদিনের একা-পাকা . . . কবেই বা ইয়ে হল কবেই বা বিয়ে হল, তাদের মুখে এই কথা? তাদের মুখে এমন কথা? ইস তাকে লোকে এমন চোখে দেখে? . . . ভাবতে ভাবতে শেষরাতের অন্ধকার যখন একটুখানি চিচিং ফাঁক, সেই সময় দাঁড়কাকের মনটা একেবারে আছাড়িপিছাড়ি করে উঠল, দাঁড়কাক আস্তে আস্তে আপনমনে বলল-
'সেই কাকই আছি তবু যেন সেই কাক নই
শুক নই শুক নই নই সেই শুকনোই
একা একা কা কা করি কাকী কই কাকী কই?
মনের প্রাণের যত বাকি কথা কাকে কই?'
আরও বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা খুব সুন্দর আওয়াজ ভেসে আসতে দাঁড়কাক চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল- পাঁচিলের ওই ওধারে ঝুলোন কালো তারে ন্যাজ ঝুলিয়ে বসে একটি ফিঙে পাখি শিস দিয়ে দিয়ে গান গাইছে৷ দাঁড়কাক উড়ে গিয়ে পাঁচিলের ওপর বসল, ফিঙে তাকে দেখতেও পেল না, নিজের মনে গান গাইতে লাগল-
'নামে নামে নামতা সামতা বেড়েতে যেতে আমতেল খামচালি
হাওড়া টু আমতা যাস কেন নিমতা? নামতে না নামতেই
সব তাতে এত কেন জামতাড়া থামতেই ঘামতেলে ঘুম তাড়া
আমতা-আমতা? তা ধিন তা ধিন তা? তুম তেরে তুম তেই-'
দাঁড়কাক বলল-'এই যে শুনছেন?'
ফিঙে চমকে ঘুরে তাকিয়ে দাঁড়কাককে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল-'ওঃ, আচমকা ডেকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন যা হোক-'
'রাস্তাঘাটে খুব দেখেছি, কে বলুন তো আপনি?
এই সেদিনের ছোকরা আমি, আমায় আবার আপনি?'
দাঁড়কাক বলল-'তা কী আর করি? কথা বলা তো তেমন অভ্যেস নেই, তা ছাড়া নাম জানি না, ধাম জানি না-'
ফিঙে বলল-'নাম?'
'আমার নাম তো সবাই জানে পাড়ায়
রাদ্দিনই তো কলসি থেকে জলের মত গড়ায়
পটলভাজার মতন কড়ায় চড়ায়
গঙ্গাজলের মতন রাখে ঘড়ায়
আবার হাতে পায়ে মাড়ায়
ইচ্ছে হলে ছোটো করে ইচ্ছে হলে বাড়ায়
এর ওর তার নামের সঙ্গে ইচ্ছেমতন জড়ায়
ছড়ায় হারায় তাড়ায়
এমনকী দরকার পড়লে ভাঁড়ায়ও৷'
'আর ধাম?'
'ধাম ওই ক্যানা ঝোপে
যার পাশে ধোপে ধোপে
বোঝাই কাপড় সোডা সোপে
ধপধপ ধোপা থোপে
মালীরা মাটি কোপায় ছেলেটা ঝাঁপাই ঝোঁড়ে
পায়রা ডাকে খোপে খোপে হাঁপিয়ে হাতপা ছোঁড়ে
মালি বউ ফুল দে খোঁপায় সারাদুপুর টাপে টোপে
মেহেদিতে হাত-পা ছোপে মাছ বেঁধে গুলতি লোফে . . .'
. . . . . .?
দাঁড়কাক বলল-'ও৷'
ফিঙে বলল-'তা, আপনার নামধাম?-অন্তত দাঁড়কাক না পাঁড়কাক সেটুকু . . .?'
দাঁড়কাক তবুও চুপ৷
ফিঙে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে থেকে থেকে শেষকালে বলল-
'আলাপ কি হয় দাদা চুপ করে থাকলে?
দেখাদেখি হয় শুধু চোখ দিয়ে দেখলে?
সকাল হয়েছে তবু ঝাঁপ কেন দোকানে
এত গান তবু কেন ঠুলি আঁটা দু-কানে
তরোয়ালে খাপ কেন মনে এত চাপ কেন
মা-বাপ কি ছোটোবেলা শুধু শুধু আপনাকে বকতেন ঝকতেন হাঁকতেন ডাকতেন . . .'
দাঁড়কাকের চোখ ছলছল করে উঠল৷ আটকানো গলায় বলল-'বকলে-ঝকলেও তো বুঝতুম একটা কিছু করলেন৷'
ফিঙে বলল-'তার মানে?'
-'তার মানে . . . তাঁরা ছিলেনই না৷'
ফিঙের মুখে আর কথা জোগাল না৷ অনেকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে বলল-'সেই ঝড়ের সময় বুঝি . . .'
-'হ্যাঁ ভাই, সেই ঝড়ে আমার সব গেছে৷ এমনকী এমনকী-আমার একটা নাম পর্যন্ত নেই'-বলতে বলতে দাঁড়কাকের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল৷ ফিঙের চোখও ছলছলিয়ে এল, দাঁড়কাকের ডান ডানার পালকে ঠোঁট বুলিয়ে ফিঙে বলল-'দুকখু করবেন না দাদা৷ জানেন তো, ঠিক দুকখুর বেলা ভূতে মারে ঢেলা? কুয়ো-ভূত, দুয়ো-ভূত, তোর-সাজাতে ডুকরে-হাসি, দেখতে-মজা-দৌড়ে-আসি আর তুই-বাড়লে-গাবিষবিষ হাত-নিশপিশ চোখ-পিটপিট মন-খিটখিট-এই পাঁচ ভূতের ঢেলা খেতে যদি না চান তো দুক্ষু-টুক্ষু সব মনের একতলাতে ভূষুণ্ডীর মা বড়াইবুড়ির জিম্মায় রেখে সাততলার খোলা বারান্দায় লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করুন, রং খুলবে, গলা খুলবে, চোখ জ্বলবে, শঙ্কর গারুড়ির আসন টলবে৷ আর নামের জন্যে আবার ভাবনা? ডাকবার লোক হলেই নাম আপনি হবেখন৷'
'কত নাম চাই দাদা কতগুলো নাম চাই? এখান ওখান থেকে যত পারি খামচাই
চামচিকে চামচেয় খায় যদি চমচম নামচেবাজারে গিয়ে দেখি যদি রংচং
রামছাগলের শিঙে বেঁধে নিয়ে মোমছাল গামছায় আমচুর ভাঙচুরে রাংঝাল
তৈরি করব সব যার যত নাম চাই কত চিঠি লিখবেন? কতগুলো খাম চাই?'
দাঁড়কাক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল-'চামচিকেতেও চমচম খেয়েছে, আর আমারও নাম হয়েছে৷ নাম কি সোজা কথা?'
'গাছের ফল নয় যে পেড়ে দেবে, পরের ধন নয় যে কেড়ে আনবে
হাতের মোয়া নয় যে তুলে দেবে, বাড়তি ঘর নয় যে খুলে দেবে-'
ওদিক দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটি চড়ুই৷ ফরফরিয়ে এসে বলল-'ঘর খোলাখুলির কথা কী হচ্ছে একটু শুনতে পারি? ঘরে পোস্ত-টোস্ত আছে কি? নিদেনপক্ষে দু-টি তুলসি পাতা
কলসি যদি থাকে তো থাক আলসেরা সব জলসা করুক
খলসে পুঁটিও থাক না কালসাপেতে মালসা ভরুক
গলসি হয়ে হালসিবাগান ভুলশিলেতে বাটনা বেটে
যে যেতে চায় যাক না কালশিরে পড়াক না
চালশেরা সব চশমা বিনে উলসে উঠে তারপরেতে
হোলসেলেতে হিলশা কিনে মাল টাল সামলাক না-'
'আমার ওসবে দরকার কি? আবার বাপু খোলসা কথা, শুধু দু-টি তুলসিপাতা চাই, ঝলসানো হলেও চলবে! আছে নাকি?'
দাঁড়কাক বলল-'এই আর একটি ছড়ুই এলেন৷' চড়ুই একপাক ঘুরে নেচে নিয়ে বলল-
'পেছল থাক না পথে, তবু কেন হড়কাবি তুই না লড়ায়ে ঘোড়া? তবে কেন ভড়কাবি
হুড়কো দিয়েছে ঘরে আড়কাঠি, সাড় কই এই বেলা তিন লাফে পেরিয়ে যা গড়খাই
'বরং তেপান্তরে ছুটে ছুটে ঝড় খাবি
সে-ও ভালো, তবু কেন খড়কের চড় খাবি?
ভিড়কে ভয় কি তোর? বেড় দিয়ে বাঁধ জোড়-'
ফিঙে বলল-'থামো বাপু, একেবারে ড়য় ড়য় ড়য়াক্কার৷ সকালটা মাটি করলে৷'
দাঁড়কাক বললে-'একসঙ্গে এত ড় জীবনে এই প্রথম৷'
'র-ই বা কম কি? মাথা ঝিমঝিম করছে৷ এত রড়ারড়ি কীসের?'
চড়ুই বললে-'দেখলুম আপনি একটু মনমরা হয়ে রয়েছেন৷ তাই মেজাজটা একটু রগড়ে দিলুম আর কি৷ আসল রগড় যদি দেখতে চান তো চলুন ওই যেখানে-
'বেলা এখন সাড়ে দশটা-হলদে বাড়ির বেঁটে কেষ্টা কিছুতেই না পেরে শেষটা
এই কলাটা মুলোটা মাছটা আশটা আনবার নাম করে একটা বাজারের থলি হাতে ঝুলিয়ে কাছারির দিকে চলেছে, ওর উলটোপথে উজানে উড়ি৷ দেখা যাক কী হয়৷'
দাঁড়কাক বলল-'চলো৷' ফিঙে বলল-'চলো৷'
পাঁচ রাস্তা দশ বাগান কলার কাঁদি এক-শোখান পেরিয়ে ঢেউ বেশ-তো হাঁস-ব্যস্ত মস্ত পুকুরের পাড়ে ধত্তোদের গাছপালা-খোলামেলা রেলিঙেতে-ঢেউ-তোলা কাপড় বারান্দায় মিনি-ঘোরে পায়ে পায় খাবারের ধান্দায় রোয়াকে বেঞ্চি পাতা কোণ বেয়ে নীল অপরাজিতার লতা ফোড়নের গন্ধ তেল ঝালটকে খাসা আচারের জারে ঠাসা তেতলার চিলেকোঠা তালাচাবি বন্ধ দক্ষিণদ্বারী সৌখিন বাড়ি৷ ধত্তোগিন্নির একটি ছেলে একটি মেয়ে৷ ছেলের নাম ধত্তো বেতোল-ধরো-না৷ মেয়ের নাম ক ধাপ বলো না৷ ছেলের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে, বউয়ের নাম ইশ-বিশ-ধানের শিষ৷
ধত্তোবাড়ির পাশেই সায়বাড়ি৷ সবই প্রায় ওই একইরকম, শুধু অপরাজিতার জায়গায় তরুলতা, মিনির বদলে ভুলো, আর চিলেকোঠায় আচারের বদলে একরাশ সমাচার-দর্পণ৷ সায়কত্তা পড়তেও পারেন না, বাবার জিনিস প্রাণ ধরে ফেলতেও পারেন না৷
সায়গিন্নির একটি মেয়ে একটি ছেলে৷ মেয়ের নাম ইঁকড়ি-মিকড়ি-চাম-চিকড়ি৷ ছেলের নাম চামেকাটা মজুমদার৷ কত্তা খুব আপত্তি করেছিলেন, সায়বাড়ির ছেলের নাম মজুমদার কেন হবে? গিন্নি বললেন-তা আর কী হবে৷ তাহলে তো মেয়ের নামও পালটাতে হয়৷ সে সময় মনে ছিল না?
মেয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে৷ জামাইয়ের নাম ধেয়ে-এল দামোদর৷ বিয়ের পর অবশ্য তাকে আর ধাইতে হয় না, বউই ধেয়ে যায়৷
দুই গিন্নিতে খুব ভাব৷ রোজ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ি ঢোকার মুখে দু-ঘণ্টা ধরে কথাবাত্তা হয়৷ চড়ুই দাঁড়কাক আর ফিঙেকে নিয়ে পুকুর ধারের বকুলগাছের ওপর বসতে বসতে বলল-'অন্যদিন হলে এতক্ষণে কথার তোড়ে বাতাস পাক দিত, আজ সব গেলেন কোথায়?' ফিঙে বলল-'তা চুপচাপ বসে না থেকে টুকটাক চালালেই তো হয়৷'
দাঁড়কাক বল-'এবার কি ঢয়ে শূন্য ঢ়? তাহলে আমি বাপু ওর মধ্যে নেই৷' ফিঙে বলল-'যা বলেছেন দাদা৷
'থামলে মিষ্টি ঢাকের বাদ্যি-ওনার ঢঙের কথা বাদ দি
ব্যাজার এক ঢোঁক ওষুধ গিলতে? কী ঢপ শুনছিস ঢুলতে ঢুলতে?
মৌচাকে কে মারলে ঢিল, ঢাকায় ঢোকে তিমিঙ্গিল
ঢের খেয়েছি ঢোঁড়ার ঢুঁ-আর বাবা নয় হা-ডু-ডু'
চড়ুই বলল-'ফাঁকতালে বেশ ঢেইয়ে নিলেন, এবার একটু থামুন তো-
'কাজ তোর এত কেন টিমে তেতালায়-কী আছে খোঁড় তো দেখি ঢিবির তলায়
ঢালু বেয়ে ঢল নামে, ফুলে ভরে মৌ-ঢিমে-আঁচে পাতুড়িটা খাসা রাঁধে বউ'
দাঁড়কাক বলল-'রোসো ভায়া, শোনাশুনি আমারও কেমন যেন ছড়াছড়া পাচ্ছে৷ দেখো তো একটু, সবে-আড়-ভাঙা জিভে ছড়াটা কেমন দাঁড়াল-
'মরা গাঙে ঢেউ কেন দিতে দিতে দেয় না ঢ্যাঁটাগুলো ঢিট কেন হতে হতে হয় না
(রাগ ধরে, দেখ দিকি) হতে হতে হয় না (দুর ছাই)-(ধ্যাৎ তেরি)
ঢাউশ ঢালের আড়ে নিধি-রাম সর্দার
জল ফেলে জল ঢালে যত হুঁকাবরদার
সবাইকে কাটব ঢেঁকি ছুঁড়ে মারব-'
মগডালের ওপর থেকে সিলসিলে গলায় কে যেন বলল-'নতুন জিভে ছড়াখানি তো বেশ হয়েছে, ঠিক জিবেগজার মতো, শুধু আর একটু ভাজলে হত, এই যেমন ধরুন-
'আঢ্যিবাড়ির বেঢপ খোকা-ন্যালবেলে গা, চক্ষু ঢোকা
তিন-ঢ্যাঙা এক শেলফে বসে-সাত-সকালে ঢ্যাঁড়স চোষে
'কিংবা যদি আর একটু মুচমুচে করতে চান, তাহলে বলবেন-
'ঢিকিস ঢিকিস চলতে দেখে ডেকে বললুম কী নাম?
ওমা আমায় মাঝরাস্তায় ঢিপ করে এক পেন্নাম!'
দাঁড়কাক ফিঙে চড়ুই একসঙ্গে ওপর দিকে তাকিয়ে বলল-
'আড়াল থেকে ছড়া ছুড়ছেন, বেশ তো আপনার আন্দাজ
মুখটা একবার দেখান দেখি কেমন ছড়ন্দাজ
'অন্তত দাদা বলব, না মশাই বলব, না বাবু-'
ছড়ন্দাজ নামতে নামতে বলল-
'বাবুয়ানা? বাবু-ই না, আমি তো বাবুই-ঝড়জল কিছুতেই হই না কাবুই
ঠাসবুনুনিতে খাসা বাসা বুনি উঁচু গাছে-যখন যেমন খুশি ওড়ার আকাশ আছে
জ্বরজারি জানি নে কো, খাইনি সাবু-ই-একে যদি বাবু বল, তাহলে বাবু-ই'
দাঁড়কাক বাবুইয়ের গা পা চোখ ঠোঁট পালক আলোক সব নিরীক্ষণ করে বলল-'বাঃ,
'বাবুই তো নয়, ভাবুই তুমি, বেশ তো ভেবে কাজ করো,
এখন যদি কাজ না থাকে তা হলে এক কাজ করো'
বাবুই বলল-'বলুন কী কাজ?
'যদিও গিন্নি বলেও যাননি
তবুও ফুর্তি মনটা ভরতি
এই সকালটা পুবং খালটা
রোদের শার্সি আকাশ-আরশি
পাতা-তা তা থৈ কথা-কই-কই'
'এক কথায় বেশ লাগছে-
'কীসের গর্ত কী খুশি ঘাসরা
পিঁপড়ে, সর তো তুলছে হররা
দুলছে ফলসা কাঁটারা ফুটছে
জমছে জলসা মাটি-গা খুঁটছে
কাঠকে ঠুকছে ডাল কি? ডাল না
ফোকরে ঢুকছে ছড়ার দোলনা
জল না, জাল তো উড়তে উড়তে
কাঁপছে আলতো ঝরতে ঝরতে
হাওয়ার গন্ধে পাতারা বাদামি
খানায় খন্দে ভাবছে কী দামি
'এখন- খই ভাজতে বলেন যদি তাতেও আমি রাজি
সাধ গিয়েছে আজকে হব সকল কাজের কাজি'
দাঁড়কাক বলল- 'অ্যাদ্দিন তো ছিল আমার কাজের মধ্যে দুই
যেখান থেকে যা পাই খেয়ে ছেঁড়া কাঁথায় শুই
'আজ থেকে আর সে কাজ নয়৷ এসো আমরা সবাই মিলে একটু খোলা প্রাণে গল্প করি, আড্ডা মারি, গুলতুনি পাকাই৷ মুখ-গোমড়া যাও তোমরা, চোখনাককান তালা বন্ধ জিভ উশখুশ ফুটো ফুসফুস মনে-সন্দ, দোরে ধরনা, আমি-বাড়লে-একা-বাড়ব তুই-মর না, কিল-খাচ্ছি খিল-দিচ্ছি খুব করলে-তড়পাচ্ছি৷ অতএব কিছুতেই তল পাচ্ছি না-এসব তো অনেক হল৷ এবার একটু অন্যরকম হোক৷'
বাবুই বলল- 'বেশ বলেছন, ঠিক বলেছেন,
গড্ডালিকায় আর যাব না, জমিয়ে আসুন আড্ডা দি
হো-হো হি-হি হা-হা হাসি, হেসে-ঘাড়ে রদ্দা দি'
ফিঙে বলল- 'খেয়ে বাবা পস্তাই দিল্লিকা লাড্ডু
না খেয়ে পস্তাগ ওই ওপাড়ার গাড্ডু'
চড়াই বলল- 'উড্ডয়নে না-ও যদি যাই, মুরাডডি তো যাবই
লক্ষ্মীরে হারাই-ও যদি, লকখিকে তো পাবই'
দাঁড়কাক বলল-'উঁহু উঁহু উঁহু৷ লক্ষ্মীও চাই, লকখিও চাই, পক্ষীও চাই, পঙ্খিও চাই, বিহঙ্গম, বালুচর, বালুচরি, শাঁখা শাড়ি সাঁকো সিঁড়ি শিকে পিঁড়ি সব শিখি পড়ি, তারপর ময়ূরপঙ্খি চড়ে সাগর পাড়ি দেব৷
'ময়ূরপঙ্খী দে এনে দে চাই না ময়ূরপুচ্ছ বামুন যদি অচেনা হয়, পইতে দিয়ে চিনবে?
বয়েই গেছে দেখতে আমায় পুছছ কি না পুঁছছ বামুন যদি খুব চেনা-হয়, পইতে দিয়ে
চিনবে?'
দাঁড়কাকের কথা শেষ হতে না হতে একটা ঝিঁ ঝিঁ আওয়াজ পাওয়া গেল৷ সবাই নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা ঝিঁঝি আর একটি ঝিঁঝিনি মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কী যেন করছে৷ সবাই কান খাড়া করলে, ঝিঁঝিনি বলল-
'মুখ-ঝামটা ঝোপ কদ্দুর ঝড় ঝাপটা
আড়-ঘোমটা জগঝম্প ফেল ঝাঁপটা
জ্বর বাড়ছে লাগে কম্প ঝোঁক ছাড় না
ঝামরাচ্ছে ঝুনো নারকোল ঝুলি ঝাড়না
ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর ঝেঁকে দেখ খোল'
ঝিঁঝি বলল-'ঝগড়া কেন? লোকটা ঝানু ঝুল কী কালো
থাক বাঁকানো ঝোল রেঁধেছ সামলে চল
বক্রজানু চুল বেঁধেছ? পাগলা-ঝোরা'
তুঁতগাছের পাতার আড়াল থেকে মুখ বার করে শুঁয়োপোকা বলল-'থাম না ছোঁড়া৷'
ঝিঁঝি থতমতিয়ে বিষম খেয়ে উলটে পড়তে পড়তে সামলে নিল৷ ঝিঁঝিনি কটমটিয়ে বিষম রেগে পালটে বলতে বলল-'থামলে চলে?'
বাবুই চড়ুই ফিঙে দাঁড়কাক সকলেই অবাক৷ ফিঙে বলল-'আহা কেমন দুটিতে ছড়াছড়ি করছিল, থামিয়ে দিল গা!
'বেটার ভারি তো বিশ্রী ব্যাভার ধার ধারব না বাছার বাবার
উচিত বেটার জিভ ধরে টানা যুৎসই চড় দুগালে দু-খানা'
শুঁয়োপোকা বলল-'আমার গালফাল নেই বাপু, গালাগাল দিয়ো না৷ কী এমন করেছি শুনি? দু-দিন বাদে প্রজাপতি হব, তার মোহড়া দিতে হবে না?
'উত্তর কাড়ব মধুটি লুটব বেছে বেছে ভালো ফুলটি খুঁটব
ডালে ঘোরা ছেড়ে ঘুরব পাতায় ঝাপটা মারব কথায় কথায়
পাখি দেখলেই পাখাটি গুটিয়ে মরার মতন থাকব শিঁটিয়ে
শিখে নেব যা যা আছে কেরামতি এই না হলে-প্রজাপতি?'
দাঁড়কাক বাবুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল-'এ বলে কী গো!'
বাবুই বলল- 'আ-র কী বলে গো ব্যাটা যেন আরকিপেলেগো
চরগুলো সব রয়েছে উঁচিয়ে কী আছে জানি না জলের নীচে এ'
ফিঙে বলল-'আপনি যে বাবুই ভাষা আরম্ভ করলেন মশাই? আরকিপেলেগো আবার কী? সাদা বাংলায় বলুন৷'
বাবুই একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল-'সাদা বাংলা ঠিক জানি না, কালো বাংলায় 'দ্বীপপুঞ্জ'৷ আর সরাসরি জল-বাংলায় বলতে পারেন 'চরাচরি'!'
চড়ুই উত্তেজিত হয়ে হাত-পা ছুড়ে বলল-'গোলকধাঁধিয়ে দিলেন৷ সোজা কথা বোঝাতে বোঝাতে একেবারে বোঝা করে ছেড়েছেন৷ আর বেশি চালালে ওঝা ডেকে আনতে হবে৷ দয়া করে জ্ঞানমার্গের ফুটোটি একটু বোজাবেন কি?'
দাঁড়কাক বলল-'আহাহা কর কী, কর কী, তোমাকেও দেখছি শুঁয়োর ছোঁয়াচ লাগল, অমন করে কি বলতে আছে?'
চড়ুই বলল-'কেন বলব না শুনি? এঁকে ওঁকে তাঁকে কাউকে ছেড়ে কথা কইব না, এই তো বলছি- শুঁয়ো শুঁয়ো শুঁয়ো দুয়ো দুয়ো দুয়ো
ভেতর-বার সব ভুয়ো খোলসখানাও খুয়ো'
ফিঙে বলল-'সব্বোনেশে৷ সাত সকালে বাসিমুখে হাসিমুখে ঝগড়াপোকা খেয়ে ফেলেছিলে না কি? এতক্ষণে হজম হল?'
চড়ুই জিভ কেটে বলল-'তাই তো, ঠিক তো বলেছেন, মুখটা একটু তেতো তেতো লাগছিল বটে, তা ভাবলুম বউ বুঝি আমার জন্যে সুক্ত রেঁধেছে৷ কী কাণ্ড, ইস-'
ফিঙে বলল-'তাতে আর হয়েছে কী?
'বউ দিলে চিরেতারই তার কী! যদি বলে টাকী, যাই টার্কি
বউ যদি পাই তবে রেফ করে রাখি তাকে, নিজেকে র-ফলা, তাতে কার কী?'
কোটরের ভেতর থেকে হেঁড়ে-গলায় কুটুরে প্যাঁচা বলল-'কথোপকথনে অনাবশ্যক অপ্রাসঙ্গিকতা অর্বাচীনতার লক্ষণ৷ তত্রাপি চ শতং বদ মা লিখ৷ মা দিবা স্বাপ্সীঃ'-বলেই ঘঁড়র ঘঁড়র করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লাগল৷
চড়ুই বোঁ করে দাঁড়কাকের গা থেকে একটি পালক খুলে নিয়ে প্যাঁচার ডাকা নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে বলল-'ও মা দিবা স্বাপ্সী-ঝুপসি বাসায় ভেপসে গেছেন, লপসি খাবেন? লপসি?'
প্যাঁচা ঘুম-জড়ানো গলায় বলল-'স্বধর্মে নিধনং শ্রেঃয় পরধর্মো ভয়াবঃহ৷ সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ-'
যেই না বলা, অমনি 'ওরে অ ব্রজ, কোথা গেলি রে' বলতে বলতে ধত্তোগিন্নি একবার বেরিয়ে এসেই আবার বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন৷ তার একটু পরেই দু-হাতে চাবির গোছা উলটেপালটে লুফতে লুফতে বেরিয়ে এল ধত্তো-বেতাল ধরো-না ওরফে বেতোল৷ তার পেছন পেছন বিনুনি দোলাতে দোলাতে ক-ধাপ-খাবে-বল না, ওরফে বলনা৷
বলনা বলল- 'এতোল বেতোল তামাক তেতোল মাছের ভেতর দেমাক চিতল
তার ভেতরে পেটি, ঝিনুক দিয়ে খুঁটি! তার ওপরে তেল
সরষে বাটা লঙ্কাকুচি, আটটার ট্রেন ফেল'
বেতোল বলল-'আটটার ট্রেন যদি ফেল হয় হোক না, বারোটার ট্রেনে যাব আমি যে-সে লোক না৷
বুকনির জোরে চিঁড়ে ভেজাবই ভেজাব, টাকলামাকানে গাছ গজাবই গজাব, তাতেও যদি না হয়, তাহলে না-হয় কাল থেকে বোকনোর ঢাকনার টাকনা দিয়ে শুকনো শাকনা খেয়ে আপিস যাব,-ভারি তো আপিস নকলের কল, মাথাপেষা জাঁতা ফাইলের ফাইলেরিয়া-রাবিশ, তার জন্যে আবার-৷ ওসব বাজে কথা ছেড়ে একটা ছড়া দেখি কেমন পারিস, বেশ বুজে সুজে ছড়া৷'
বলনা হাত নেড়ে নেড়ে বলল-
'মাছঝাল মজে ভালো কালোজিরে ফোড়নে, লজঝড় গাড়ি চড়ে কে কে যাবি বেড়ানে
একা একা বসে বসে কাঁদছিস কেন বউ, তার চেয়ে পড় বসে ঝভঞ নাজঝলৌ৷
সত্যি হয় না তোর নিতি বকাঝকা এ, কী আছে জানি না বাপু মজঝিমনিকায়ে
ঠাকুমার ঝুলি পড়েছিস কিনা আগে বল কোনোদিন খাওয়াব না নইলে মরিচ ঝোল
কেয়ার ঝাড়ের আড়ে ন্যাজঝোলা পাখি ওই'-এই পর্যন্ত বলতেই, বেতোল, বাবুই, দাঁড়কাক, ফিঙে, চড়ুই সব একসঙ্গে কেয়ার ঝাড়ের দিকে ঘুরে তাকাল, ফিঙে 'ওই তো আমার বেশ হবে বউ' বলে লাফিয়ে উড়ল, আর বেতোলের বউ ইশবিশধানেরশিষ দোতলার কোণের ঘরের জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল-
'ঠাকুঝঝি, লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে টাকাটা কই?'
বলনা বলল- 'ঘুগনিদানা ঝালছোলা চিনেবাদাম ছালতোলা
বুড়ির মাথার পাকাচুল কুলপি মালাই টোপাকুল
মশলামুড়ি মুচমুচে-'
বউ বলল-'আর বলতে হবে না, দাঁড়াও যাচ্ছি৷'
বলনা বলল-'দাদাও ছিল৷'
বউ দুম করে জানলা বন্ধ করে দিয়ে আঁচলের ঝটকায় লক্ষ্মীর পেতলের থালা বাতাসাসুদ্ধ উলটে ফেলে ঝন ঝন গন গন হন হন শাশুড়ির কাছে চলল৷ বেতোল আস্তে আস্তে উঠে খুট করে খিড়কির শেকলটা তুলে দিয়ে বলনাকে বলল-আয় আমরা চোর চোর খেলি৷
বলনা বলল-'চোর-চোর খেলবি তো গুনতে হবে না?'
বেতোল বলল-'এই তো গুনছি-উবু দশ কুড়ি তিরিশ চলি×শ
কেন বল ইলিশ মাছকে বল্লি হল্লিশ?
থামবাপু পঞ্চাশ ষাট সত্তর আশি যাই তো বাইরে কে কথা কয় দেখে আসি
পরে যাস নিরে নব্বুই! কিরে? শ -আরে বাবা কাতরাস কেন? আরও স'
বলনা বলল- 'কাতরাস কেবল কাতরাস গেলেই পারিস হাথরাস
যা চাস একটু হাতড়াস দেখে শুনে সাঁতরাস'
বেড়ার ওপাশ দিয়ে খড়ম খট খটাং করতে করতে যাচ্ছিল সাতকড়ি সাঁতরা, বলল- 'গুরুজনদের নিয়ে মশকরা হচ্ছে? কন্যা একেবারে যশস্করী, এই বয়সেই এই, পাশ করলে না জানি কী দাঁড়াবে৷'
দাঁড়কাক বলল-'আর যাই দাঁড়াক, তুমি না দাঁড়ালেই হল৷'
সাতকড়ি বলল-'কথার পৃষ্ঠে কাক ডাকল, লক্ষণ তো ভালো দেখি না৷ কার মুখ দেখে আজ গাত্রোত্থান করেছি?'
বাবুই বলল-'কার আবার? নিজের৷ নিজের ও মুখ নিজেই দেখছ টাকেতে লক্ষ্মীবিলাস মাখছ
'মন খুঁতখুঁতে চোখ কুতকুতে হঠাৎ দেখলে আঁৎকাবে ভূতে,
আমরা তো তবু দাঁড়িয়ে আছি৷'
সাতকড়ি আপনমনে গজগজ করতে করতে পোস্টাপিসের দিকে চলে গেল৷ চড়ুই ফুরুৎ করে মগডালে উড়ে গিয়ে সাতকড়ির যাওয়া সবটা দেখে তারপর নামতে নামতে বলল-
'খাওয়া ফেলে আঁচালে, যাক বাবা বাঁচালে
ভয় হয় ঘুরে এসে ফিরে চাল না চালে'
দাঁড়কাক বলল-'ভগবান আছেন না?'
ফিঙে পেছন থেকে বলল-'আর ভগবান৷ হতভাগাদের কপালে ভগবান সাত-সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে ভাগবান৷'
দাঁড়কাক চড়ুই বাবুই একসঙ্গে ঘুরে তাকিয়ে বলল-'ওমা, একি একা যে? বউ আনলে না?'
ফিঙে বলল-'তাহলে আর বলছি কী! পাত্তাই দিল না,
আমি যাওয়া মাত্তর বলে কিনা, 'ধুত্তোর
রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়নি তা ভাবলুম
শত্তুর মুখে ছাই দিয়ে টুকু হাওয়া খাই
বাত্তুরে বুড়োগুলো তাতেও জ্বালাতে এল'
'আমিও তেমন গুরুর ছাত্তর না, ছেড়ে কথা কইবার পাত্তর নই, বললুম
'থত্থর গাল নেড়ে থুত্থুরে বুড়িগুলো
কী যে ছাই বকে যায়-'
বাবুই বলল-'সব্বোনাশ, করেছ কী?'
ফিঙে হকচকিয়ে বলল-'কেন? কী বলা উচিত ছিল?'
বাবুই বলল- 'বলা উচিত ছিল,
যেমন ডানটি তেমনি বাঁ-চোখ যেমন ডানাটি তেমনি পালক
মাথা ও তো নয়, বুদ্ধির সাজি হার মেনে যায় গাজি হাজি কাজি
কথার ছাঁদ কী! টান কী! সুর কী! উড়কি ধানের যেন রে মুড়কি
কোথায় বাড়ি গো? পরে হবেখন, মা-বাবা আছেন? কটি ভাইবোন?'
ফিঙে হাঁ করে রইল৷ দাঁড়কাক বলল-'আচ্ছা?'
চড়ুই বলল-'ঠিক ঠিক৷' এমন সময় খিড়কির দরজা খটাং খট ঘটঘটাং করে বেজে উঠল, বলনা-বেতোল হাঁসঘরের দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল, আর সায় গিন্নি মাথায় ঝুঁটি হাতে বঁটি নাকে নথ-মস্ত-ফুটো কোমরে-আঁচলগুটো মুখে পান-চুনখয়েরি দু-কানে-ঝুমকোঢেঁড়ি সিঁথিটাক-চওড়া-সিঁদুর-জোড়াভুরু-ধেড়ে ইঁদুর চোখ দুটো ধপ্পনাচন প্রাণটি গপ্পবাঁচন হেলতে দুলতে এগিয়ে এসে খুট করে শেকলটি খুলে দিয়ে একগাল হেসে-'বঁটিখানা ফেরত দিতে এলুম৷ কে বন্ধ করে রেখেছিল ভাই৷'
ধত্তোগিন্নি ভাবখানা যেন দেখে-দেখেননি শুনে-শোনেননি মনে মনে নিজেকে বলিহারি বাহা বাহবা ধন্যি সাত-সাবাসি দিয়ে টাটকা-হাসি মুখ করে বললেন-'তোমার সিন্নি কটার সময় ভাই?'
সায়গিন্নি বললেন-'সেই সাতটায়৷ বলনাকে বউমাকে নিয়ে যাবেন সকাল সকাল৷'
তারপর কানের কাছে মুখ এনে বললেন-'বউ কেমন হয়েছে?' ধত্তোগিন্নি বললেন-
'সে আর বলতে? সে আর বলতে? যেমনি কইতে তেমনি বলতে
দেখতে শুনতে নাচতে গাইতে-সাধ করে এটা কি সেটা চাইতে
সাজতে সাজাতে, মজাতে বাজাতে
রাঁধতে বাড়তে গড়তে ভাঙতে, কী যে বউ দিদি সে যদি জানতে
সাতে না পাঁচে না যাবার মুখে হাঁচে না
যে সে বললেই নাচে না
নেই চাল তো তেল চুকচুকে
হাঁটে আল তো রাঙা টুকটুকে
গালে টোল তো হাসি খুঁকখুঁকে
রেঁধে ছাড়া যা তা খায় না কেঁদে ছাড়া কথা কয় না
ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে বেঁধে আনতে বললে মেরে আনে
দিনভর বউ উচ্চস্বরে চ্যাটাং চ্যাটাং বাক্যি ঝাড়ে'
সায়গিন্নির চোখ আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছিল৷ শেষটা শুনে বললেন-'অ্যাঁ?'
ধত্তোগিন্নি বললেন-'দেখেছ কাণ্ড, কী বলতে কী বলেছি৷ শাশুড়ি দিনরাত বলতেন কিনা, শুনে শুনে মুখস্ত হয়ে গেছে, তাই ওই সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে আর কি৷ তা এবার ভাই তোমার জামাইয়ের কথা বলো৷'
সায়গিন্নি বাঁ-হাতের ডিবেখানি খুলে একটি পান নিজে নিয়ে ধত্তোর হাতে একটি দিয়ে সিঁড়ির ধাপে বাগিয়ে বসে বললেন-'বেশ হয়েছে ভাই জামাইটি৷ ঠিক আর পাঁচজনের মতন৷
'শীতকালেতে সুটবুটি গ্রীষ্মকালে ছটফটি
ট্যাক্সি করে আপিস যায়
না গিয়ে আর করবে কী? ভিড় বাসট্রাম যা কলকাতায়
আবোল তাবোল কাগজ পেলে আপন মনে বিল্লি আঁকে
মাস ফুরোতে-না-ফুরোতে এক-শো টাকা ব্যাঙ্কে রাখে
এদিকে-খুব ডিবেটি, হাতে লোফে চীন টিবেটই
কাজের কথা উঠলে কাশে ধরে পড়লে কাষ্ঠ হাসে'
ধত্তোগিন্নি বললেন, 'যাই ভাই পিকটা ফেলে আসি', বলে উঠে বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে বললেন-'বি তি কি চ্ছি রি৷' তারপর ফিরে এসে বললেন-'তারপর?'
-'তারপর আর কী৷ ভালোই চলছিল, দু-হাতে তালি বাজাত না, চা না পেয়ে চেঁচাত না, ছুতো পেলেও প্যাঁচাত না, বাজে খরচ বাঁচাত, পাকা গণ্ডুষ কাঁচাত, খাওয়া জলেই আঁচাত-এই ইদানীং সবে ক-দিন হল বেচারা একটু মনমরা হয়ে রয়েছে৷'
-'কেন-কী হল আবার?'
-'মেয়ের আমার পায়ের তলায় দু-ইঞ্চি লম্বা খুর গজিয়েছে৷ বাড়ির ভেতর যেমন তেমন, বাইরে বেরোলে জামাই আর পাশাপাশি হাঁটতে পারে না৷ বড়ো মনকষ্টে আছে, বলছে একজোড়া রণপা কিনবে৷ তা ছাড়া-'
ধত্তোকত্তা বাড়ির ভেতর থেকে হেঁকে বললেন-কই গো কোথায় গেলে? রান্নাঘরে যে ইলিশে-তেঁতুলে-কিসমিসে একেবারে ইলতুৎমিস হয়ে আছে-'
ধত্তোগিন্নি বললেন-'দেখেছ ভাই কাণ্ড? একদম ভুলে বসে আছি৷ যাই আবার দেখি গে৷'
সায়গিন্নি বললেন-'আমিও তাহলে উঠি৷ সিন্নির জোগাড় পড়ে রয়েছে৷'
দু-জনে উঠে দু-দিকে চলে যেতেই কেয়ার ঝাড়ের আড়াল থেকে বেতোল বেরিয়ে এসে বলল-
'কেন? রান্নাঘরে আরও খানিকক্ষণ দাসরাজত্ব চালালেই তো হত৷'
বলনা বলল-'হ্যাঁ দামোদরের কথাটা আধকপালে হয়ে রইল৷'
তারপর একপাক ঘুরে নেচে নিয়ে বলল-
'দামোদরের জারিজুরি রোয়াকে বসে ডালপুরি
ডাল পুড়তে, হল বেলা ভাত খাও সে-ই দুপুর বেলা
তাতে পড়ল হাঁচি, ইঁকড়ি এলে বাপের বাড়ি কোঁদল ফুয়ে নাচি'
বলতে-না-বলতেই সায়েদের লাল ফটক দিয়ে ঠুন ঠুন করতে করতে একটি রিকশা ঢুকল, রিকশার পাদানিতে ইঁকড়ির বাদামি সুটকেশ, ছইয়ের তলায় ঘোমটা-মাথায় গোমড়ামুখে ইঁকড়ি বসে, পেছন পেছন ছোকরা চাকর গদাই৷
বলনা ছুটটে চলে গেল সায়বাড়ির দিকে, বেতোল একা একা দাঁড়িয়ে রইল৷ সব চুপচাপ দাঁড়কাক, ফিঙে, চড়ুই, বাবুই উড়ব উড়ব করছে, এমন সময়-
চোখ কুটুরে রাম-ঘেঁটুরে ময়লা ধুতি কে আর মেপে দেখতে গেছে নয়হাতি না কয়হাতি আধ ফতুয়া দু-কানছোঁয়া গোঁফওলা একটা লোক ধত্তোবাড়ির রেলিঙের গায় কাগজঝোলা সাইকেল ঠেসান দিতে দিতে হাঁক দিলে-টে লি গ্রা ম৷ তাই না শুনে যেই না সবাই বিটলে ব্যাঙা পটলি গবাই ছুট দিয়েছে পড়ি-কি-মরি, অমনি সেই ধাক্কায় পড় পড় খোড়ো-চাল না? ঝোড়ো বাংলাবাড়ির আশ দরজা পাশদরজা মুখদরজা, বুকদরজা, খিল জানলা নীল জানলা সব হুড়হাড় দুদ্দাড় খুলে গেল, আর ভেতর থেকে হাত ঝুমঝুম পাঝুমঝুম দু-হাতে দুই রুই কাতলা মুখ চিক চিক হাসি ফিকফিক আধা চাঁদার টিপ কপালে, ফোপরা পানের খিলি গালে, কামরাঙা ঠোঁট শামলা রং একমুখে রা সাতরকম ভাষুড়ে বুড়ি ছড়াই বুড়ি ওড়ফুলের মালা গলায় গাছমাটি জল-নাচছে ঝোলায় এককাঁখে বুড়ো আংলা আর কাঁখে পুরো বাংলা ঝুমুর ঝুমুর বেরিয়ে এসে চড়া গলায় ছড়া গলায় ছাড়া গলায় ডাক পাড়ল-'আর কতক্ষণ লাগাবি রে তোরা?
'আউল বাউল চালতা চাউল সাপ-খোপে জল জ্যান্ত নেউল
অন্নপূর্ণা ডাকে মায় বাছারা সব ঘরে আয়'
সবাই বলল-'আর একটুখানিস সবুর করো মা, এই হল বলে৷'
বুড়ি তখন ওপর নীচ আগাপাশতলা সব একনজরে নেক নজরে দেখতে দেখতে যেই দাঁড়কাক দেখা অমনি একগাল হেসে বলল-'অ কালোমানিক, পেলি?'
কালোমানিক বলল-'না পেতে না পেতে পাচ্ছি মা, আবার পেতে পেতে যাচ্ছি না, তাই সাঁতরাচ্ছি হাতড়াচ্ছি আর কাতরাচ্ছি৷'
তখন ওরা বলল-'ঃএ হে হাতড়াও? তুমি হাতুড়ে নাকি হে? ভালো চাও তো শিগ্রি ডিগ্রি বার করো বলছি, নইলে-'
কালোমানিক কিছু না বলে ডানার খাঁজ থেকে একটি চুকচুকে কুচকুচে পালক বের করে ফেলে দিল, ওরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল-
'হাতুড়ে নই তো আমি, আমি শুধু হাতড়াই একঘেঁয়ে জিবে-গজা চিনি-রসে ওখড়াই
(ফের চিনি, ফিরে চিনি, চিনে রস ওখড়াই) হাতুড়িটা নিয়ে করি স্যাকরার ঠুকঠুক
এগোতে এগোতে সারি সারিসারি ভুলচুক দেয়াল পাথর মাটি পলি সবি দাবড়াই
দুয়ে দুয়ে মিললেই চারে মাছ ধরলেই
কামারের এক ঘায় ত্রিভুবন ঘাবড়াই হাতুড়ে নই তো ভাই, আমি শুধু হাতড়াই৷'
তবু যখন ওরা ঘ্যানর ঘ্যানর করতে লাগল, তখন কালো কী আর করে একে ওকে তাকে নিজেকে সব্বাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল-
'ইতিহাসে কেন তুই গোল্লা পেলি খোকন? কী করব খোঁচালে যে বল্লালি বল্লম
বরং বাড়িয়ে দিই জাঁল্লার পাল্লা কী হবে বানিয়ে ভাই পেল্লাই কেল্লা?
এ বাড়ির বিল্লি কি কল্লে সে হল্লায় পাল×া না দিয়ে খাই এঁচোড়ের ডাঁল্লা
কমলার মধু খেতে আসবেই ভাল্লুক তাই বলে বল লোকে যাবে না কি তমলুক?
মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্তই ভরা নদী পার করে মাল্লার স্বাস্থ্যই
জল্লাদ কুলে তুই পেল্লাদ বল্লি? নিবো দেখি দেশময় রাবণের চুল্লি?'
যেই না বলা অমনি দুম পটাস করে কাগজের ঠোঙাটা ফেটে গিয়ে তার ভেতর থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে এল একতাল জট-পাকানো খুলবে-কেন-খুলবে-নাকি? খুলবে না-কি? হোক না-খুঁতো নোংরা সুতো৷ 'ওমা, ওই তো আমার গুলিসুতোর বল' বলতে বলতে রিদয় মার কাঁধ থেকে লাফিয়ে নেমে সেটাকে বগলদাবা করে দৌড়ে বাড়ির মধ্যে চলে গেল৷ পেছন পেছন ছোট্ট হয়ে ঢুকে গেল বাকি সবাই, বাকি স-ব, মায় ওই আকাশখানা পর্যন্ত৷ আর সেই কুঁচ-পারা আকাশের ছুঁচ-পারা ফুটোয় ফালতো চোখখানি রেখে কালোমানিক মার কোল ঘেঁষে বসে বসে দেখতে লাগল ওপাশ থেকে শব্দ-টব্দ কিছু শোনা যায় কি না৷
শারদীয়া ১৩৭৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন