রামভজনের ঘোড়া কেনা

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

পাটনা জেলার এক গ্রামে রামভজনের বাস৷ সে লেখাপড়া জানে না, চাষবাস করিয়া খায়৷ সে কৃপণ নয়, বেশ হিসেবি লোক-মিতব্যয়ী, অনর্থক বাজে খরচ করে না৷ তাহার পরিবার বৃহৎ হইলেও পরিমিত ব্যয়ে সংসার চালাইয়া অনেক টাকা জমা করিয়াছে৷ বড়ো ছেলেটিকে সেই গ্রামের পাঠশালায় লেখাপড়া শিখাইয়া পাটনার হাই স্কুলে ভরতি করিয়া দিয়াছে৷ ছেলেটি সেই স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকে আর ফোর্থ ক্লাসে পড়ে৷

সেই গ্রামে আরও অনেক সংগতিপন্ন লোক বাস করে৷ রামভজন দেখিল যে, গ্রামের যাহাদের যথেষ্ট টাকাপয়সা আছে তাহাদের অনেকেরই গাড়িঘোড়া আছে৷ যাহাদের গাড়ি নেই তাহাদের অন্তত একটি করিয়া ঘোড়া আছে, তাহারা ঘোড়া চড়িয়া যাওয়া-আসা করে৷ তাই দেখিয়া রামভজনেরও একটা ঘোড়া কিনিবার শখ হইল৷ নানা দেশ হইতে সওদাগরেরা নানা প্রকারের ঘোড়া লইয়া বিক্রয়ের জন্য পাটনা শহরে আসে৷ রামভজন গ্রাম হইতে এক বন্ধুকে সঙ্গে করিয়া ঘোড়া কিনিতে পাটনায় আসিল৷ সেইদিন শহরের মধ্যে ঘুরিয়া চার-পাঁচ দিনের জন্য এক বাসা ভাড়া করিয়া লইয়া পর দিবস প্রাঃতকালে ঘোড়া কিনিতে বাহির হইল৷

এক সওদাগরের আড্ডায় অনেক ঘোড়া ছিল৷ সেইসব ঘোড়ার মধ্যে একটি ঘোড়া দেখিয়া রামভজনের ভারি পছন্দ হইল৷ ঘোড়াওয়ালা পাঁচ-শো টাকা দাম চাহিল৷ একটা ঘোড়ার জন্য অত টাকা খরচ করিতে রামভজনের মন সরে না, অথচ অমন সুন্দর পছন্দসই ঘোড়াটা লইতেও তার ভারি ইচ্ছা৷ তাই অনেকক্ষণ দাম কষাকষি করিল, কিন্তু ঘোড়াওয়ালা পাঁচ-শো টাকার কমে কিছুতেই সেই ঘোড়া বেচিতে রাজি হইল না৷

রামভজনের ঘোড়াটা কিনিবারও বিশেষ আগ্রহ আছে, অথচ সে পাঁচ-শো টাকা বড্ড বেশি মনে করিয়া ইতস্তত করিতেছে-ইহা বুঝিতে পারিয়া সওদাগর বলিল, 'আচ্ছা বাবুজি, আমি একটা ভারি সুবিধার কথা বলে দি, দেখুন তাতে যদি আপনি কিনতে পারেন৷ দেখুন, ঘোড়ার চারটে পা, প্রত্যেক পায়ে একটা করে লোহার নাল বাঁধানো আছে, প্রত্যেকটা নাল পাঁচটা করে পেরেক দিয়ে খুরের সঙ্গে আঁটা আছে৷ সবসুদ্ধ মোটে কুড়িটি পেরেক আছে৷ আপনি আমায় সামান্য পেরেকের দামে ঘোড়ার দাম দিন৷ পেরেকের দামটা কিন্তু এইরকমে হিসেব করতে হবে৷ প্রথম পেরেকের দাম এক পয়সা, দ্বিতীয় পেরেকের দাম দুই পয়সা, তৃতীয় পেরেকের দাম চার পয়সা, চতুর্থ পেরেকের দাম আট পয়সা-এইরকমে প্রত্যেক পেরেকের দাম তার পূর্বের পেরেকের দ্বিগুণ হিসাবে দিতে হবে৷ এই রকমে পয়সা হিসাব করে দাম দিলেও হবে৷ মোটে কুড়িটা পেরেক বই তো নয়, ওই হিসাবে যে কয়টা টাকা হয় তা দিলেও আমি ঘোড়াটা দিতে পারি৷ দেখুন, এতে যদি আপনার সুবিধা হয়, এখনই বেচা-কেনার লেখাপড়া করে দিয়ে যান৷'

ওই কথা শুনিয়া রামভজন মনে করিল লোকটা নিশ্চয় পাগল নতুবা অমন সুন্দর ঘোড়াটাকে কয়েকটা পেরেকের দামে, পয়সা হিসাবে, মাটির দরে কেন বিক্রয় করিবার খেয়াল হইবে৷ সে বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিল, 'কী বল হে, এই শর্তে ঘোড়াটা নেব? কতই-বা পয়সা হবে? এক হাজার পয়সা হলেও তো ১৫ টাকার বড়ো বেশি হয় না৷'

বন্ধু বলিল, 'আরে ভাই, দশ হাজার পয়সা হলেও তো দেড়-শো টাকার বড়ো বেশি হয় না, অত পয়সাও কি হবে? আর বিলম্ব না করে চট করে ওর সঙ্গে একটা লেখাপড়া করে নাও, কী জানি যদি আবার মত বদলায়৷'

ওই শর্তে ঘোড়া কেনার লেখাপড়া হইয়া গেল৷ রামভজন তখনই একশত টাকা গণিয়া দিল, এবং বাকি যে কয়-টাকা হিসাব করিয়া হইবে তাহা কল্য প্রাতে দিয়া যাইবে বলিল৷

রামভজন ঘোড়া লইয়া মনের আনন্দে বাসায় চলিয়া গেল৷ বৈকাল বেলা পুত্র বোর্ডিং হইতে পিতার সহিত দেখা করিতে আসিল৷ সুন্দর ঘোড়া দেখিয়া তাহারও ভারি আনন্দ হইল৷ কত দাম হইয়াছে পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল৷ পিতা বলিল, 'তুই আন্দাজ কর দেখি কত দাম হতে পারে?' পুত্র বলিল, 'পাঁচ-শোর তো কম নয়?' পিতা বলিল, 'অত নয়৷' পুত্র বলিল, 'তবে চার-শোর কম হতেই পারে না৷' পিতা বলিল, 'তোরা লেখাপড়া শিখে শহুরে বড়োলোক হচ্ছিস, এমনি করে সব টাকা ওড়াবি৷ আমি কি এত বোকা যে চার-শো টাকা দিয়ে একটা ঘোড়া কিনি৷ আমি খুব সস্তায় কিনেছি, লোকটা হয় বোকা নাহয় পাগল৷' তাহার পর সওদাগরের সঙ্গে যেসব কথা হইয়াছিল এবং যে শর্তে ঘোড়া কিনিয়াছে সেসব পুত্রকে বলিল৷ তারপর বলিল, 'তুই তো ইশকুলে ঢের লেখাপড়া শিখেছিস, কত অঙ্ক কষিস আচ্ছা একবার কাগজ-কলম নিয়ে হিসেবটা কষে ফেল দেখি, দু-শো না তিন-শো কত হয় দেখ, কাল বাকি দামটা চুকিয়ে দিয়ে আসতে হবে৷'

Cov23

পুত্র যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ সব শিখিয়াছে, কাগজ পেনসিল লইয়া হিসাব করিতে বসিয়া গেল৷ সে যতই অঙ্ক লিখিতেছে, ততই তাহার মুখ গম্ভীর হইয়া যাইতেছে, কপাল দিয়া ঘাম বাহির হইতেছে৷ অবশেষে পুত্র জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবা তুমি সত্যি সত্যিই কি এই শর্তে ঘোড়া কিনেছে?' পিতা বলিল, 'হ্যাঁ রে হ্যাঁ, সত্যি না তো কি মিথ্যা বলেছি, এমন দাঁও কি ছাড়া যায়, লোকটা কী বোকা৷' পুত্র বলিল, 'এ যে ষোলো হাজার টাকার উপর হয়ে গেল!' পিতা বলিল, 'বলিস কী রে? এক পয়সা, দুই পয়সা, চার পয়সা, আট পয়সা-এইরকম করে তো মোটে কুড়িটি পেরেকের পয়সা-অতটাকা কখনোই হতে পারে না, তোর হিসাব করতে ভুল হয়েছে, ভালো করে দেখ৷' পুত্র তখন এক এক করিয়া কুড়িটা পেরেকের দাম লিখিয়া যোগ করিয়া কত পয়সা হইল এবং সে পয়সার কত টাকা হইল পিতাকে বুঝাইয়া দিল৷ ঘোড়ার দাম হইয়া গেল (১৬৩৮৩-১৫-৩) ষোলো হাজার তিনশত তিরাশি টাকা পনেরো আনা তিন পয়সা৷

রামভজনের তো চক্ষুস্থির! বলিল, 'সে পাঁচ-শো টাকায় ঘোড়া দিচ্ছিল আমি নিলাম না, আমার বোকামিতে এখন ১৬ হাজার টাকার উপর দিয়ে সেই ঘোড়াটা নেওয়ার লেখাপড়া করে দিয়ে এলাম৷ আমার জমিজমা ঘরদোর সব বেচলেও তো অত টাকা হবে না!' রামভজন মাথায় হাত দিয়া কাঁদিতে লাগিল৷ সমস্ত রাত্রি চিন্তায়, অনাহারে অনিদ্রায় কাটাইল৷ পরদিবস সকাল বেলা ছুটিতে ছুটিতে হাঁপাইতে হাঁপাইতে সওদাগরের নিকট গিয়া তাহার পায়ে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল৷ সওদাগর লোকটি ছিল ভালো আর রসিক৷ সে হাসিয়া বলিল, 'আচ্ছা বাবুজি, আমি সব ছেড়ে দিচ্ছি, আমায় সেই পাঁচ-শো টাকাই দিন, লেখাপড়ার কাগজখানা ছিঁড়ে ফেলছি৷' রামভজন তখন বাকি চার-শো টাকা দিয়ে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল৷

ভাদ্র ১৩২৩

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%