আলি ভুলির দেশে

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

একটি মেয়ে আছে তার নাম হচ্ছে ননু৷ আর তার দুই বন্ধু আছে, তাদের নাম হচ্ছে আলি আর ভুলি৷ কিন্তু তার সেই আলি আর ভুলি বন্ধুদের আজ পর্যন্ত আমরা কেউ দেখিনি৷ সে যখন একলা বসে খেলা করে, বকর বকর করে কত কথাই বলে৷ যদি জিজ্ঞাসা কর, 'কার সঙ্গে কথা বলছিস?' বলবে, 'আলি ভুলির সঙ্গে৷' খাবার সময়ে তাকে ডেকে ডেকে পাওয়া যায় না, যদি বল, 'কোথায় গিয়েছিলি?' বলবে, 'আলি ভুলির দেশে গিয়েছিলাম, তাদের সঙ্গে খেলা করতে করতে দেরি হয়ে গেল৷' একদিন সে আমাকে বলল, 'দেখো, ওই যে ঘাসের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা দেখা যাচ্ছে, ওইখান দিয়ে, ওই ছোট্ট ঢিপি পার হয়ে, ওই গাছের পিছন দিয়ে আলি ভুলির দেশে যেতে হয়৷' তাদের দেশে নাকি কুড়িতলা, পঁচিশতলা বাড়ি আছে৷ সেই বাড়িতে কত আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস আছে৷ আলি ভুলি যখন-তখন এসে ননুকে তাদের দেশে ডেকে নিয়ে যায়৷ ভাত খেতে খেতে যদি আলি ভুলি আসে ননু ভাত খাওয়া ভুলে তাদের সঙ্গে চলে যায়৷ আমরা দেখি সে ভাতের গ্রাস হাতে নিয়ে কোন দিকে চেয়ে বসে আছে৷ কাজেই বুঝতে পার এই আলি ভুলি বড়ো সর্বনেশে বন্ধু৷ তোমরা যেন তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ো না৷ আলি ভুলির দেশ থেকে একদিন ননুর নিমন্ত্রণ এল-

উকুনে বুড়ির বিয়ে হবে পায়েস হবে বেশ

উকুনে বুড়ির মাটির কড়া,         পায়েস হবে তাতে ভরা

পাড়ার লোকে পায়েস খাবে, পায়েস হবে শেষ৷

তখন সন্ধ্যে বেলা৷ ননু বই নিয়ে পড়তে বসেছে, তার মা বলেছেন, 'ভালো করে পড়বে, আলি ভুলির দেশে চলে যাবে না৷' কিন্তু নিমন্ত্রণ পেয়ে ননু মায়ের কথা ভুলে আলি ভুলির দেশে চলে গেল৷ উকুনে বুড়ির বিয়ে হবে সেই কুড়িতলা পঁচিশতলা কত আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে, দূর থেকে যেন ঠিক কালীপুজোর দেয়ালির মতো দেখাচ্ছে৷ বাগানে মস্ত উনুনে মাটির কড়া ভরে পায়েস রান্না হচ্ছে৷ পায়েসের গন্ধে কত দেয়ালি পোকা, ঘুরঘুরে পোকা, ফড়ফড়ে ফড়িং, ডোরাকাটা ফড়িং সব সেখানে জড়ো হয়েছে৷ জোনাকি পোকারা গাছের মাথায় দেয়ালির আলো জ্বেলেছে৷ ননু সেখানে যেতেই আলি ভুলি কত আদর করে তাকে ডেকে নিয়ে গেল৷ কিন্তু সেদিন তারা ভারি ব্যস্ত; কাজেই তারা ননুকে তেলি বেলি ফেলিদের কাছে রেখে চলে গেল৷ ননুর সেখানে ভালো লাগল না৷ খানিক বসে বসে সে ভাবল, 'যাই দেখে আসি কেমন পায়েস রান্না হচ্ছে৷'

এর মধ্যে হয়েছে কী একটা মস্ত বড়ো চার পাখাওয়ালা ফড়িং পায়েসের গন্ধে মাথা ঘুরে কড়ার মধ্যে পড়ে গিয়েছে৷ ননু ছুটে গিয়ে আঙুল দিয়ে ফড়িংটাকে তুলে ফেলল৷ বেচারার একপায়ে একেবারে ফোসকা পড়ে গিয়েছে৷ তখনই আরও দু-চারটে ফড়িং এসে ঘাস দিয়ে খাটিয়ার মতো বানিয়ে সেই চার পাখাওয়ালা ফড়িংকে তাতে তুলে নিল; তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে৷ একটা জোনাকি পোকা আগে আগে লন্ঠন দেখিয়ে চলল৷ ননুও তাদের সঙ্গে চলল৷

Cov38

একটা চামেলি ফুলের ঝোপের নীচে হাসপাতাল৷ সেখানে আরও অনেক ফড়িং রয়েছে৷ কারও হাত ভাঙা, কারও পা ভাঙা, কারও ডানা ছেঁড়া৷ ননু দেখল কতগুলো ছোট্ট ছোট্ট সাদা ফড়িং তাদের সেবা করছে, ওষুধ দিচ্ছে৷ আর একটু ভালো করে দেখে ননু বুঝল, সেগুলো ফড়িং নয়, ছোট্ট ছোট্ট পরি৷ তাই তো!' এরকম সাদা ফড়িং তো তাদের বাগানে অনেক আছে; সে তো মোটেই জানত না যে তারা ফড়িং নয় পরি৷ তাদের বাগানেও চামেলি ফুলের ঝোপ আছে৷ সে ভাবল, এবার থেকে যত ডানাভাঙা পোকা দেখবে চামেলি গাছের নীচে রেখে দেবে৷

রোগীদের ঘুম পাড়িয়ে ফড়িং পরিরা ঘাসের ওপর নেমে এল৷ চারদিকে চাঁদের আলো ফুটফুট করছে৷ ঘাসের মাঝে কত ছোটে ছোটো সাদা নীল ফুল ফুটেছে৷ পরিরা সে ফুল তুলে মাথায় পরল, তারপর হাত ধরাধরি করে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল৷ তাই তো! ননুদের বাগানে যে আলো জ্বলে, তার চারধারে যে এমনি করে কারা ঘুরে ঘুরে নাচে৷ এক-একসময় এমন তাড়াতাড়ি ঘোরেও যে মনে হয় যেন আলোর চারধারে একটা আলোর চাকা ঘুরছে৷ ননু ভাবছে, 'এবার একদিন রাত্রির বেলা বাগানে গিয়ে দেখতে হবে৷' এমন সময়ে ঘাসের মধ্যে কী যেন সড়সড় করে উঠল৷ সে চমকিয়ে গিয়ে যেই সরতে যাবে অমনি একটি গর্তের ভিতর পা পড়ে পা-টা ভীষণ মচকিয়ে গেল৷ সে মাটিতে বসে পায়ে হাত বুলোচ্ছে, হঠাৎ কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল, 'তোর ঠ্যাং, তোর ঠ্যাং৷' সে আওয়াজ শুনে পরিরা যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল৷ ননু দেখল, তার সামনে প্রকাণ্ড বড়ো একটা গিরগিটির মতো জন্তু বড়ো বড়ো চোখ বার করে তার দিকে চেয়ে আছে৷ আর 'তোর ঠ্যাং, তোর ঠ্যাং' করে চেঁচাচ্ছে৷

আর ঠিক সেই সময়ে আলি ভুলি এসে পড়ল৷ তারা ননুকে বলল, 'তুমি এখানে বসে আছ? কই পায়েস খেতে যাবে না? চলো ৷' সে বলল, 'না, ভাই আমার বড়ো ঘুম পাচ্ছে৷ আমি বাড়ি যাব৷' বলতে বলতেই সে তার বাড়ি এসে পড়ল৷ তার সামনে বই খোলা পড়ে আছে৷ ওই যাঃ! নিমন্ত্রণ তো খাওয়াই হল না, না পড়াও হল, মা কত রাগ করবেন৷ সেদিন ননুর মা তার ওপর খুব রাগ করলেন৷ রাত্রে তাকে আলাদা বিছানায় শুতে হল, মার কাছে শুতে পেল না৷ সেই থেকে ননু মনে করেছে, এবার থেকে পড়ার সময় যদি আলি ভুলিরা ডাকতে আসে তাদের সঙ্গে যাবে না, খালি খেলার সময়ে যাবে৷

কার্তিক ১৩২৯

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%