দুই পড়শি

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

এক গ্রামে একজন মস্ত বড়োলোক আর একজন ভারি গরিব লোক পাশাপাশি বাড়িতে থাকত৷ বড়ো লোকটির নাম সেরিঙ্গ; সে ছিল বেজায় অহংকারী আর কিপটে৷ গরিব লোকটির নাম ছিল চাম্বা; সে ভারি দয়ালু আর পরোপকারী৷

একদিন একজোড়া চড়ুই পাখি চাম্বার সদর দরজার এক ফাটলে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ল৷ সময়মতো ডিম ফুটে ছোট্ট ছোট্ট ছানা বের হল৷

একদিন চড়ুই পাখি দু-টি যখন ছানাগুলোর খাবারের সন্ধানে গেছে তখন তাদের একটি বাচ্চা বাসা থেকে চাম্বার দরজার গোড়ায় পড়ে গিয়ে একটি পা ভেঙে ফেলল৷ কিছুক্ষণ বাদে চাম্বা বাড়ি ফিরে চড়ুই ছানাটিকে দেখতে পেল৷ এরকম অসহায় অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখে তার ভারি মায়া হল৷ সে সাবধানে ছানাটিকে তুলে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে যত্নের সঙ্গে একটুকরো সুতো দিয়ে তার ভাঙা পা-টি বেঁধে দিল৷ তারপর খুব সাবধানে তাকে তার বাসায় তুলে রেখে দিয়ে এল৷

পাখিটা বড়ো হলে পরে একদিন হঠাৎ সে কোথা থেকে তার ঠোঁটে করে গুটি কয়েক ধান এনে চাম্বার সামনে রাখল৷ চাম্বা তো অবাক! চড়ুইটা তখন কিচির কিচির করে বলল, 'তুমি একদিন আমার বড়ো উপকার করেছিলে, সে কথা আমি ভুলিনি৷ তোমার বাগানে এই ধান ক-টি পুঁতে দেখো কী হয়৷' বলেই সে ফুড়ুত করে উড়ে পালিয়ে গেল৷

চড়ুইয়ের মুখে কথা শুনে চাম্বা তো থ! তারপর সে ভাবল, 'বলেছে যখন তখন দেখাই যাক না৷'

বাড়ির সামনের বাগানেই ধান ক-টি সে খুব যত্ন করে পুঁতল৷ ক্রমে ক্রমে তার থেকে ধানের গাছ হল, দিনে দিনে গাছগুলি বড়ো হতে লাগল৷ চাম্বার কিন্তু ততদিনে আর ধানের কথা মনেই নেই৷ একদিন বাগানে বেড়াতে বেড়াতে, বড়ো বড়ো ধান গাছগুলোর ওপর চোখ পড়তেই সে থমকে দাঁড়াল! একী, ধানের গাছে ধান তো নেই! তার বদলে প্রত্যেক গাছে ঝলমলে সব মণিমুক্তো ঝুলছে! এতে আর কে খুশি না হয় বল! চাম্বা তো মহাআনন্দে পাথরগুলো নিয়ে শহরে বিক্রি করে অনেক টাকা পেল৷ সেই টাকায় দেখতে দেখতে চাম্বার অবস্থা ফিরে গেল৷

এদিকে তার বড়োলোক পড়শি সেরিঙ্গ গরিব চাম্বার হালচাল জাঁকজমক দেখে হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে! একদিন সে মনে মনে ঠিক করল যে যেমন করে হোক চাম্বার বাড়িতে গিয়ে তার এই হঠাৎ বড়োলোক হওয়ার কায়দাটা জেনে আসবে৷

যেমন কথা, তেমনি কাজ৷

চাম্বার বাড়িতে গিয়ে সেরিঙ্গের সে কী খোশামোদ! এখন তো আর চাম্বা গরিব নয়, তাই সেরিঙ্গ এমন ভাব দেখাতে লাগল, যেন সে চাম্বার কতদিনের বন্ধু৷ আগে হলে তো চাম্বার দিকে সে ফিরেও তাকাত না৷ চাম্বা বেচারি নেহাত ভালোমানুষ, সেরিঙ্গের ফন্দি সে বুঝবে কী করে? সেরিঙ্গ অতি সহজেই চাম্বার কাছ থেকে তার বড়োলোক হবার ইতিহাসটুকু জেনে নিল৷ ফেরার পথে তার বারবার মনে হতে লাগল, 'আহা, আমার ভাগ্যে এমনটি যদি হত৷'

Cov116

কী আশ্চর্য! সেরিঙ্গ যা চেয়েছিল ঠিক তাই হল! একদিন সকালে উঠে সে দেখল তার সদর দরজার উপরে চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছে৷ তখন আর তাকে পায় কে! সেদিন থেকে সে খুব কড়া নজর রাখল সেই বাসাটার উপর৷ চড়ুইয়ের ডিম হল, ডিম ফুটে বাচ্চা হল৷ এবারে বাচ্চার পা ভাঙা চাই৷ সেরিঙ্গের আর তর সয় না৷ সে একদিন করল কী, চালার উপর উঠে একটা বাচ্চাকে বাসা থেকে তুলে মাটিতে ফেলে দিল৷ সঙ্গেসঙ্গে ছানা বেচারির একটা পা ভেঙে গেল৷ তখন সেরিঙ্গ ঠিক চাম্বা যেরকম করেছিল সেইরকম সুতো দিয়ে পা বেঁধে ছানাটাকে আবার তার বাসায় রেখে দিয়ে এল৷

এই ছানাটিও বড়ো হয়ে একদিন ঠোঁটে করে সেরিঙ্গের জন্য ধান নিয়ে এল৷ সেরিঙ্গ তো এইজন্যই অপেক্ষা করছিল৷ মহাআনন্দে সে তক্ষুনি বাগানে গিয়ে ধানগুলো পুঁতে ফেলল৷ তারপর থেকে সারাদিন পোঁতা ধানগুলোর আশপাশে সে ঘুরে বেড়ায়-আর তাড়াতাড়ি বড়ো হচ্ছে না কেন ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে৷ সময়মতো ধান গাছগুলো বড়ো হয়ে উঠল৷ সেরিঙ্গ রোজ ভাবে আজই বোধ হয় দেখবে গাছগুলো মণিমুক্তোর ভারে নুয়ে আছে৷

একদিন সে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বাগানে গিয়েই থমকে দাঁড়াল৷ কোথায় তার ধান গাছ! যেখানে গাছ পোঁতা হয়েছিল সেখানে তার আর কোনো চিহ্ন নেই৷ তার বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিরাটকায় বিকট এক মানুষ, বগলে তার একতাড়া কাগজ৷

সেরিঙ্গকে দেখেই সেই মানুষটি দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, 'আমাকে ফাঁকি দেবে ভেবেছিলে, না? সেটি হচ্ছে না৷ আমি তোমার আগের জন্মের পাওনাদার৷ দলিলপত্র সব আমার কাছে৷ সুদে আসলে প্রতিটি পয়সা তোমার কাছ থেকে আদায় না করে আমি ছাড়ছি না৷' ভয়ে সেরিঙ্গের মুখ দিয়ে কথা বেরোল না৷ লোকটা তার বাড়ি ঘরদোর, ধনসম্পত্তি যেখানে যা-কিছু ছিল সব নিয়ে সেরিঙ্গকে প্রায় পথের ভিখিরি করে ছেড়ে দিল৷

এর কিছুদিন বাদে চাম্বা বিদেশ যাবে৷ এখন তার প্রচুর টাকা৷ যাবার আগে এক থলি-ভরতি সোনা এনে বলল, 'ভাই সেরিঙ্গ, এগুলো তোমার কাছে রেখে গেলাম৷ ফিরে এসে আবার নেব৷'

সেরিঙ্গের অবস্থা এখন এত খারাপ যে, সে আর লোভ সামলাতে পারল না৷ চাম্বা যাবার পর অল্প অল্প করে সব সোনা সে খরচ করে ফেলল৷ চাম্বার থলি খালি হয়ে গেল৷ সেরিঙ্গ তখন সেই খালি থলি বালি দিয়ে ভরে রাখল৷

চাম্বা ফিরে এসে যখন থলি ফেরত চাইল, সেরিঙ্গ ওই বালি-ভরতি থলি তার হাতে তুলে দিল৷ থলি খুলেই তো চাম্বার চক্ষুস্থির! বলল, 'ভাই, বন্ধু বলে বিশ্বাস করে তোমার কাছে যা রেখে গেলাম, তার বদলে তুমি এ কী ফেরত দিলে?'

সেরিঙ্গ এমন ভাব দেখাল যেন এ সবের সে কিছুই জানে না; খুব অবাক হবার ভান করে সে কেবলই বলতে লাগল, 'ভাই, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না-তোমার সোনাই বালি হয়ে গেছে, তোমার সোনাই বালি হয়ে গেছে৷' চাম্বা মনে মনে খুব দুঃখ পেলেও মুখে কিছু না বলে বাড়ি ফিরে এল৷

কিছুদিন পর সেরিঙ্গের হঠাৎ বিদেশ যাওয়ার দরকার হল৷ যাবার সময় বলল, 'ভাই চাম্বা, আমি বিদেশ যাচ্ছি৷ আমার ছেলে তোমার কাছে রইল৷ তুমি ওর একটু দেখাশোনা কোরো৷'

কিছুদিন পরে বিদেশ থেকে ফিরে এসে সেরিঙ্গ সোজা চাম্বার বাড়িতে গিয়ে হাজির৷ তখন চাম্বার বাড়িতে ইশকুল বসেছে, চাম্বাই ছেলেদের পড়াচ্ছে৷ এদিক-ওদিক চেয়ে সেরিঙ্গ নিজের ছেলেকে কোথাও পেল না৷ শুধু দেখল ছেলেদের সঙ্গে একটা বাঁদর বসে রয়েছে৷ সেরিঙ্গ চাম্বাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'ভাই, আমার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? সে কোথায়? লেখাপড়া ঠিকমতো করছে তো?

চাম্বা তখন কোনো কথা না বলে সেই বাঁদরটাকে সেরিঙ্গের কাছে এনে দিল৷ সেরিঙ্গ বলল, 'এ তো বাঁদর! আমার ছেলে কোথায়?'

বাঁদরটা তখন সেরিঙ্গের দিকে ফিরে বলে উঠল, 'বাবা, আমি বাঁদর হয়ে গেছি-'

বাঁদরটা আসলে চাম্বার পোষা এবং সেরিঙ্গ যতদিন বাইরে ছিল চাম্বা ততদিনে বাঁদরটাকে ওই একটা কথা বলতে শিখিয়েছিল৷ সেরিঙ্গ যতই বলে, 'আমার ছেলে কোথায়?' বাঁদর ততই বলে, 'বাবা, আমি বাঁদর হয়ে গেছি-বাবা, আমি বাঁদর হয়ে গেছি৷'

সেরিঙ্গ ভয়ানক রেগে গেলেও মনে মনে বুঝতে পারল চাম্বা তাকে উচিত শিক্ষাই দিয়েছে৷ সে তখন চাম্বার কাছে তার অন্যায়ের জন্য অনেক করে ক্ষমা চাইল আর প্রতিজ্ঞা করল যে সে নিশ্চয়ই চাম্বার সোনা ফেরত দিয়ে দেবে৷

বন্ধুকে শিক্ষা দেওয়া ছাড়া চাম্বার মনে আর কোনো অভিসন্ধি ছিল না, তাই সে তক্ষুনি সেরিঙ্গের ছেলেকে ঘর থেকে বার করে আনল৷ বিদায়ের সময় চাম্বা বলল, 'বন্ধু সেরিঙ্গ, আর কখনো কাউকে এভাবে ঠকাতে যেয়ো না৷'

(তিব্বতি উপকথা)

শ্রাবণ ১৩৬৮

Cov117
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%