অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
হ্যাঁ, বৃষ্টি বটে সেদিন-ঝড়ও কী তেমনি! যাকে বলে প্রলয় কাণ্ড৷ বাইরে বার হয় কার সাধ্য!
এই জলঝড়ের মধ্যে জমাট আড্ডা বসেছে বিনয়দের উপরের ঘরে৷ ওদের বাড়িতেই এত লোক যে আড্ডা জমাতে আর বাইরের লোকের দরকার হয় না৷ এত লোক যে ওদের বাড়ি রোজই ভোজ বলা চলে৷ খাওয়ার সময় হলে প্রকাণ্ড একটা ঘণ্টা বাজানো হয়, ঘণ্টা শুনে সকলে খেতে আসে, দুটো লম্বা বারান্দা ভরতি হয়ে যায়৷ তিনজন মুদিতে তাদের চাল ডাল দেয়, চারজন ঠাকুর রাঁধে, ছ-জন চাকরে বাসন মাজে৷ কোথাও যেতে হলে তিন-চারখানা 'বাস' রিজার্ভ করতে হয়-ট্যাক্সি বা গাড়িতে কুলায় না৷
যাক সে কথা! আজ আড্ডা বসেছে খুব জোর! তার উপর আবার বিনয়ের এক মামা এসেছেন আজ ক-দিন হল, তিনিও আজ আড্ডার একজন৷ কত খোশগল্পই যে হল তার আর ঠিক নেই-খেলার গল্প, ছোটোবেলাকার দুষ্টামির গল্প, ভূতের গল্প-এমনি কত কী৷ ছোটো ছোটো যারা তারা তো সব চারপাশে ঘিরে বসেছে-শুনছে অবাক হয়ে!
এমনিধারা গল্প করতে করতে শেষে গল্প এসে দাঁড়াল-বরযাত্রী গিয়ে কে কীরকম কষ্ট পেয়েছে৷ কেষ্ট বলল, 'হ্যাঁ বাবা, বরযাত্রী গিয়েছিলাম বটে, দু-দিন স্রেফ উপোস করিয়ে রাখল৷ একদিন খেতে দিল মুড়ি আর নারকেল আর একদিন দিল চিঁড়ে গুড় আর কলা-৷' বাধা দিয়ে বিনয় বলল, 'আরে খাওয়ার কষ্ট তবু সহ্য হয়, দু-দিন যাহোক খেয়ে কাটানো যায়৷ কিন্তু সেবার গেলাম পশ্চিমে আমার এক বন্ধুর বিয়েতে বরযাত্রী৷ কী শীত! যাকে বলে হাড়-কাঁপানো শীত! আমরা কুড়িজন লোক, অথচ কনে বাড়ির লোকে না দিল বিছানা, না দিল লেপ-স্রেফ বসে বসে শীতে সারারাত কেঁপে কাটাতে হল!' একপাশ থেকে বিনোদ গম্ভীর চালে বলল, 'ওসব তো কনের বাড়ির অভদ্রতা, কিন্তু জায়গা-যেখানে বরযাত্রী গিয়েছে-সেই জায়গার জন্য কষ্ট পাওয়া কী ভীষণ বলো তো? কনের বাড়ির লোকের কোনো হাত নেই সে ক্ষেত্রে৷ একজায়গায় বরযাত্রী গিয়ে শুনলাম আমাদের সকলকে পুকুরে স্নান করতে হবে, বাড়ির কুয়োর জল নাকি শুকিয়ে গেছে৷ গেলাম সকলে মিলে পুকুরে স্নান করতে৷ দেখি দু-তিন জন লোক এসে খুব মিহি একটা জাল দিয়ে পুকুরের খানিকটা জল অন্য জলখানি থেকে ছেঁকে আলাদা করে দাঁড়াল; বলল, 'আপনারা এই জলে স্নান করে নিন৷' কারণ জিজ্ঞাসা করায় কোনো উত্তর দিল না৷ আমাদের বন্ধু নীরদ সাঁতারটা জানত ভালো৷ সে তাদের কথা না শুনে ঝাঁপিয়ে চলে গেল পুকুরের মাঝে৷ কিন্তু যখন উঠে এল তখন তার শরীরের চারিদিকে অজস্র জোঁক ঝুলছে৷ নুন দিয়ে দিয়ে সে জোঁক তো ছাড়ানো হল, কিন্তু বেচারার গা থেকে রক্তপড়া আর থামতেই চায় না৷ অনেক কষ্টে রক্ত বা যদি থামল তো আবার জ্বর এল ভীষণ!'
হঠাৎ ঘরের আরেক পাশ থেকে দিলীপ বলে উঠল, 'আরে তবুও সেখানে পুকুরে স্নান না করলেই আর কোনো হাঙ্গামা হত না, একদিন স্নান না করলে মানুষ মরে যায় না৷ কিন্তু আমরা যে মুশকিলে পড়েছিলাম তা আর কহতব্য নয়-একরকম প্রাণ নিয়ে টানাটানি বললেই হয়৷' সকলেই দিলীপের কথায় অবাক, শুনবার জন্য সকলেই উদগ্রীব হয়ে রইল৷ দিলীপ বলল, 'গেলাম তো বরযাত্রী৷ দিনের শেষে পাড়াগাঁয়ের মাঝে সন্ধ্যা নামল৷ সঙ্গেসঙ্গে দেখি কনে যাত্রীর লোকেরা এসে বললেন, 'মশাই, শিগগির মশারির ভিতর ঢুকে পড়ুন৷' ওরে বাবা, কী জোয়ান মশা! মনে হল যেন পাখাওয়ালা নেংটি ইঁদুর উড়ছে সব! যাই হোক, মশারির ভিতর বসে তো গল্প করতে লাগলাম৷ শেষে যখন খেতে গেলাম তখন দেখি বারান্দায় লম্বা লম্বা প্রকাণ্ড মশারি টাঙানো৷ তার মধ্যে খাবার দেওয়া হয়েছে, আর যারা পরিবেশন করছে তারা মশারির 'বোরখা' পরে আছে৷ শুনলাম এখানকার মশা এমন কিছু নয়, কামড়ালে জ্বর-টর হবার ভয় নেই-তবে সারা গায়ে দগদগে ঘা হয়ে ওঠে, এই মাত্র!'
দিলীপের গল্পটাই বোধ হয় অন্য সকলের গল্পকে ছাড়িয়ে গেল৷ সত্যিই তো মশার কামড়ে দগদগে ঘা-কী ভীষণ! বিনয়ের মামা এতক্ষণ ঘরের এক কোণে একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে গল্প শুনছিলেন৷ তিনি এবার একটু সোজা হয়ে উঠে বসে বললেন, 'আমার জীবনেও ওরকম ঘটনা এক ঘটেছিল৷' বলেই আবার চুপ করে বসে চুরুট টানতে লাগলেন৷ সকলেই এক সঙ্গে ধরে বসল, 'বলুন না, বলুন না৷' মামাবাবুর চুরুটটা ততক্ষণ শেষ হয়ে এসেছিল, তিনি আর একটা নতুন চুরুট ধরিয়ে বললেন, 'তবে শোন! একদিন আমার এক বন্ধু এসে জানাল যে তার বিয়েতে আসামের কাছে কোথায় আমাকে বরযাত্রী যেতে হবে৷ শুনে তো আমি অবাক! এত দেশ থাকতে শেষে কি আসামের কালাজ্বর নিয়ে আসব নাকি? যাই হোক, শেষ পর্যন্ত গেলাম বরযাত্রী-একা আমি নয়, অনেকেই৷ তবে তাদের মধ্যে আমরা পরিচিত ছিলাম কয়েকজন-বাকি সব অচেনা, তাঁরা নাকি সব বিদেশ থেকে এসেছেন৷
কী বন রে বাবা সে দেশে! কোথাও বার হওয়ার জো নাই৷ শুনলাম নাকি রাত্রে বেজায় বাঘ ভাল্লুক বাড়ির আনাচেকানাচে বেড়াল কুকুরের মতো ঘুরে বেড়ায়৷
'বিয়ের লগ্ন রাত বারোটায়, কাজেই তার আগে আমাদের খাওয়ার বন্দোবস্ত হল৷ একটা প্রকাণ্ড হলের মধ্যে আমাদের খাওয়ার জায়গা করা হয়েছে৷ সকলে আসনে বসলাম৷ সকলেই ভাবছি, এবার লুচি আসবে, কিন্তু যা এল তা দেখে সকলে স্তম্ভিত৷ চার-পাঁচ জন গুণ্ডার মতো লোক এসে গম্ভীরভাবে দরজার কাছে বসল, তাদের হাতে তেল দিয়ে পাকানো এই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড লাঠি! কনেদের বাড়ির এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করা হল, 'মশাই, লাঠি কী হবে?' তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, 'দেখতে পাবেন পরে?' বলে তিনি চলে গেলেন৷ অতগুলি লোক, সকলে চুপ! যেন সেখানে একটা ভয়ানক কিছু ঘটবে এমনি একটা আশঙ্কায় সকলে বসে আছে-ঝড়ের আগে যেমন সব নিস্তব্ধ হয়ে যায় তেমনি৷
'আমাদের আমোদ তো সব মাথায় উঠে গেছে-সকলের বুক ভয়ে ধড়াস ধড়াস করছে৷ আমার ডান দিকে যে অপরিচিত ভদ্রলোকটি বসে ছিলেন তাঁকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলাম, 'মশায়, ব্যাপার বুঝছেন কিছু, মারধোর করবে না তো?' সে ভদ্রলোক বললেন, 'কী জানি মশাই, এদের দেশে কি বরযাত্রীদের লাঠি-পেটানোর রীতি আছে নাকি?' আমি বললাম, 'তা তো জানিনে৷ পৃথিবীর এক-এক দেশে অভিবাদনের এক-এক রকমের রীতি আছে শুনেছি৷ কোন এক দেশে নাকি দু-জনে দেখা হলে পরস্পরের হাতে থুতু দিয়ে পরস্পরকে অভিবাদন করে৷ কিন্তু বরযাত্রীদের নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে লাঠিপেটা করে তা তো শুনিনি কখনো৷ তবে হাতে থুতু দিয়ে যদি অভিবাদন করা যেতে পারে, তাহলে লাঠি পিটিয়ে আদর অভ্যর্থনা বা হবে না কেন-এ বুনো দেশে হয়তো এই প্রথা৷'
'আমার বাঁ-পাশে ভোলা বসেছিল; তার গোল মুখটি ভয়ে লম্বা হয়ে গিয়েছিল৷ সে কাঁদো-কাঁদো মুখে হাসবার চেষ্টা করে বলল, 'দূর, তা কী হয়, মারবে কেন?' আমি বললাম, 'মারবে কেন তা জানিনে, তবে মারবে নিশ্চয়৷' ভোলা সঙ্গেসঙ্গে সভয়ে কাঁদো-কাঁদো সুরে আর্তনাদ করে উঠল, 'না'৷ ভোলার ওপাশে বসেছিল নীলু৷ সে বলল, 'দেখ, ও-বেটারা বসেছে একেবারে ওদিকে-যেই ওরা ওদিকে মারতে আরম্ভ করবে অমনি আমরা এই দিকের দরজা খুলে পালিয়ে যাব৷' আমার পাশের ভদ্রলোকটি একটু ম্লান হেসে বললেন, 'পালাবেন কোথায় মশাই এ রাত্রে? বাইরে বার হলেই যে বাঘের পেটে যেতে হবে৷ তার চেয়ে দু-ঘা লাঠি খাওয়া ভালো-একেবারে মেরে তো ফেলবে না৷'
'যাই হোক, আমরা তো পাতা সামনে নিয়ে বসে আছি-ওদিকে সেই লোকগুলি বসে আছে লাঠি নিয়ে৷ লুচি দিয়ে গেল৷ খাব কী-গলা যে ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ কনে বাড়ির আর একটি ভদ্রলোক আমাদের এদিকে আসতেই ভোলা যেন কিছুই হয়নি এইরকম ভাব দেখাবার চেষ্টা করে জোর করে একটু কাষ্ঠ-হাসি হেসে বলল, 'হ্যা, হ্যা মশাই, লাঠি কী হবে, অ্যাঁ?' ভদ্রলোক শুধু বললেন, 'একটু পরেই বুঝবেন৷' ভোলার থুতনিটা নীচের দিকে ঝুলে পড়েছে, বোধ হয় মুর্ছা যাবে৷ আমারও শরীরে ঘাম দেখা দিয়েছে৷ পাশের ভদ্রলোকটি এবার বোধ হয় কেঁদেই ফেলবেন৷
'লুচি-তারপর এল ভাজা, তারপর ডালনা, তারপর ডাল-৷ তারপরই সব চুপ- খানিকক্ষণ ওপক্ষের কারও দেখাই নেই৷ একটু পরে কনেবাড়ির কে একজন এসে ওই লোকগুলিকে কী বলে গেল৷ ওরাও তক্ষণি লাঠিগুলি বাগিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল৷ আমরা সকলে তখন কী করব ভেবে ঠিক করতে পারছি না৷ সকলের মুখে সে কী অসহায় ভাব! গুরুমশায়ের হাতে বেদম প্রহার খাওয়ার আগের মুহূর্তে ছাত্রের মুখে যেমন ভাব হয় ঠিক তেমনি!

'এবার বালতি করে একজন মাছ নিয়ে এল৷ যেই দু-একজনের পাতে মাছ পড়েছে, অমনি মধ্যে থেকে কে চিৎকার করে উঠল, 'লাগাও, লাগাও! মার, মার!' এদিকে মুহূর্তের মধ্যে কী যে ঘটল তা বর্ণনা করাই একরকম অসম্ভব৷ ওই চিৎকারের সঙ্গেসঙ্গে লোকগুলি আমাদের সামনে দমাদম লাঠি আছড়াতে লাগল৷ এদিকে আমাদের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেছে৷ কেউ দু-হাতে নিজের মাথা ঢেকে উবু হয়ে পড়ল, কেউ ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল, কেউ-বা পালাবার জন্যে ছুটোছুটি করতে লাগল৷ ভোলাটা তো মড়ার মতো চোখ কপালে তুলে নিশ্চল হয়ে বসে রইল, ওর গলা দিয়ে খালি একটা অদ্ভুত রকমের ঘড়র, ঘড়র, শব্দ হতে লাগল৷
'এমন সময় কনের বাপ ছুটতে ছুটতে এসে বললেন, 'আপনারা তাড়াতাড়ি মাছটা খেয়ে নিন দয়া করে, নইলে এখনই সব মাছ বন বেড়ালে-৷' তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখি ওদিকের দরজা দিয়ে, এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ অসংখ্য শুয়োরের বাচ্চার মতো বুনো বেড়াল আমাদের পাতের দিকে ছুটে আসছে৷ তাদের চোখের দিকে চাইলে ভয় হয়-খেয়ে ফেলবে নাকি আমাদের?
'কনের বাপের সে কী অবস্থা! একবার কড়া সুরে ওই লোকগুলোকে হুকুম করছেন, 'আরও জোরসে লাঠি চালাও,' আর এদিকে হাত জোড় করে আমাদের করুণ সুরে অনুনয় করছেন, 'দয়া করে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন মাছটা৷'
'লাঠি চলতে লাগল সজোরে বেড়ালের উপর দমাদম৷ বেড়ালগুলো আর আমাদের পাতের দিকে এগোতে পারল না৷ তবে সহজে হটবার পাত্র নয় তারা৷ তাদের আটকে রাখতে লোকগুলো একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠল৷ বেড়ালে আর মানুষে সে কী বিষম দাঙ্গা৷ যাই হোক, আমরা তো কোনোরকম করে মাছ খেয়ে নিলাম; সঙ্গেসঙ্গে সেই বন বেড়ালগুলিও হল অন্তর্হিত, আর সেই লোকগুলিও তাদের লাঠি ক-টি নিয়ে করল প্রস্থান৷
'ব্যাপার দেখে সকলেই অবাক-এ কী কাণ্ড রে বাবা! তবে অবাক হলেও হাসি ফুটে উঠেছে সকলের মুখেই৷ সকলেই বোধ হয় তখন ভাবছিল-'যাহোক মারেনি তো!' ভোলার সেই ভয়ে লম্বা হয়ে যাওয়া মুখ আবার গোল হয়ে এসেছে, যে চোখ কপালে উঠেছিল তা আবার স্বস্থানে ফিরে এসেছে৷ সে গম্ভীর ভাবে দুলে দুলে বলছে, 'দেখলি তো মারলে না, তখনই বলেছিলাম, তোরা তো ভয়েই অস্থির!''
মামার গল্প শেষ হতে না হতেই খাবার ঘণ্টা বেজে উঠল৷ সবাই নীচে গিয়ে প্রকাণ্ড দুটো বারান্দায় খেতে বসল৷ চারজন ঠাকুর পরিবেশন করছে৷ ভাত, ডাল, ভাজা সব খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর সকলের পাতে যখন মাছের তরকারি দিল, তখন সকলেরই একসঙ্গে মনে হল-বন বেড়াল আসবে না তো আবার?
শ্রাবণ ১৩৪০

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন