অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
মাধ্যাকর্ষণ প্রতিরোধকারী মলম আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে নানারকম উড়ান যন্ত্র আবিষ্কারের একটা খুব হিড়িক পড়ে গেছে৷ কেউ ডাইনিদের বাহন ডান্ডাওলা ঝাঁটার মতো, কেউ নারদের ঢেঁকির মতো, কেউ কার্পেটের মতো, কেউ কার্তিকের বাহন ময়ূরের মতো উড়ান যন্ত্র আবিষ্কার করে তাতে চড়ে বিষয়কর্মে যাতায়াত করছে৷ আকাশে তাই সবসময়েই নানারকম জিনিস উড়তে দেখা যায়৷ এমনকী কৃত্রিম পাখনাওলা মানুষকেও৷
সালটা ৩৫৮৯৷ ইতিমধ্যে চাঁদ, মঙ্গল এবং শুক্রগ্রহে মানুষ ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, সূর্যের আরও দু-টি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং জানা গেছে আর কোনো গ্রহ নেই, মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে হাজার হাজার মানুষ আলোর চেয়েও গতিবেগসম্পন্ন মহাকাশযানে রওনা হয়ে গেছে এক-দেড়-শো বছর আগে থেকে এবং এখনও অনেকে যাচ্ছে৷ কাছেপিঠে যারা গেছে তাদের ফেরার সময় হয়ে এল৷ তবে সেটা এক মিনিট পর না এক-শো বছর পর তা জানবার উপায় নেই৷ তা বলে পৃথিবীর মানুষেরা হাল ছাড়েনি৷ সেই এক-দেড়-শো বছর আগে যারা জন্মেছিল তারা সকলেই সশরীরে বর্তমান৷ আজকাল পৃথিবীতে মানুষ মরে না৷ যারা মহাকাশে গেছে তারা ফিরে এসে সেই আমলের লোকেদের দেখতে পাবে৷ তবে সব মানুষই বেঁচে আছে বলে নতুন মানুষের জন্মও আর হচ্ছে না৷ গত দেড়-শো বছরের মধ্যে কেউ পৃথিবীতে শিশুর কান্না শোনেনি৷
এদিকে ঘরে ঘরে মানুষ এত বেশি বিজ্ঞান নিয়ে বুঁদ হয়ে আছে যে, প্রতিঘরের প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো বিজ্ঞানের বিজ্ঞানী৷ বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো চর্চাই নেই৷ কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা এসব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না৷ ওসব অনাবশ্যক ভাবাবেগ কোনো কাজেই লাগে না৷ খামোখা সময় নষ্ট৷
খেলাধুলোর পাটও চুকে গেছে৷ অলিম্পিক উঠে গেছে৷ বিশ্বকাপ বিলুপ্ত৷ আছে শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান৷ পূর্ণিমার চাঁদ দেখলে, কোকিলের ডাক শুনলে বা পলাশ ফুল ফুটলে কেউ আর আহা উহু করে না৷ বর্ষাকালের বৃষ্টি দেখলে কারও মন আর মেদুর হয় না! ওগুলোকে প্রাকৃতিক কার্যকারণ হিসেবেই দেখা হয়! গোলাপ ফুলের সৌন্দর্যের চেয়ে তার অ্যানালাইসিসটাই বেশি জরুরি৷ দয়া মায়া করুণা ভালোবাসা ইত্যাদিরও প্রয়োজন না থাকায় এবং চর্চার অভাবে মানুষের মনে আর ওসবের উদ্রেক হয় না৷
ব্যতিক্রম অবশ্য এক-আধজন আছে৷ যেমন পাগলা গণেশ৷ পাগলা গণেশের বয়স দু-শো বছর৷ পঞ্চাশ বছর বয়সে, অর্থাৎ আজ থেকে দেড়-শো বছর আগে মৃত্যুঞ্জয় টনিক আবিষ্কার হয়৷ গণেশও আর সকলের মতো টনিকটা খেয়েছিল৷ ফলে তার মৃত্যু বন্ধ হয়ে গেল৷ দেড়-শো বছর আগে যখন সুকুমার শিল্পবিরোধী আন্দোলন শুরু হল এবং শিল্প সংগীত সাহিত্য ইত্যাদির পাট উঠে যেতে লাগল তখন গণেশের ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি৷ তা ছাড়া বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা দরকার বলে তার মনে হল৷ গণেশ অনেক চেষ্টা করে যখন দেখল কালের চাকার গতি উলটোদিকে ফেরানো যাবে না তখন সে সভ্য সমাজ থেকে দূরে থাকার জন্য হিমালয়ের একটি গিরিগুহায় আশ্রয় নিল৷
তা বলে হিমালয় যে খুব নির্জন জায়গা তা নয়৷ এভারেস্টের চূড়া চেঁছে অবজার্ভেটরি হয়েছে, রূপকুণ্ডে বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি, কে টু, কাঞ্চনজঙ্ঘা, যমুনোত্রী গঙ্গোত্রী, মানস সরোবর সর্বত্রই নানা ধরনের গবেষণাগার৷ সমুদ্রের তলাতেও চলছে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ অর্থাৎ ভূগর্ভে, ভূপৃষ্ঠে এবং অন্তরীক্ষে কোথাও নিপাট নির্জনতা নেই৷ পৃথিবীর জনসংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়৷ কিন্তু তারা সমস্ত পৃথিবীতে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে, নির্জনতা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন কাজ৷
এই তো আজ সকাল থেকে গণেশ বসে কবিতা লিখছে৷ একটু আগে একটা ঢেঁকি আর একটা ভেলায় চড়ে দুটো লোক এসে বলল, 'এই যে গণেশবাবু, কী করছেন?'
'কবিতা লিখছি৷'
'কবিতা? হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ! তা আপনার কবিতা শুনছেই বা কে আর পড়ছেই বা কে?'
'আকাশ শুনছে, বাতাস শুনছে, প্রকৃতি শুনছে৷ কবিতার পাতা বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছি৷ যদি কেউ কুড়িয়ে পায় আর পড়তে ইচ্ছে হয় তো পড়বে৷'
'হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ!'
ক-দিন আগে সন্ধ্যে বেলা গণেশ একদিন গলা ছেড়ে গান গাইছিল৷ তার গানের গলা বেশ ভালোই৷
হঠাৎ দুটো পাখাওলা লোক লাসা থেকে ইসলামাবাদ যেতে যেতে নেমে এসে রীতিমতো ধমক দিয়ে বলল, 'ও মশাই, অমন বিকট শব্দ করছেন কেন?'
'শব্দ কী! এ যে গান!'
'গান! ওকেই কি গান বলে নাকি! ধুর মশাই, এ যে বিটকেল শব্দ!'
একদিন পাহাড়ের গায়ে যান্ত্রিক বাটালি দিয়ে পাথর কেটে ছবি আঁকছিল গণেশ৷ হঠাৎ একটা ধামা নেমে এল৷ এক মহিলা খুব আগ্রহের সঙ্গে বলে চলেন, 'এটা কীসের সার্কিট ডিজাইন বলুন তো! বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে!'
'ডিজাইন নয়, ছবি! খেয়ালখুশির ছবি৷'
ভদ্রমহিলা চোখের পলক না ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, 'খেয়ে-দেয়ে আর কাজ নেই! ছবি হচ্ছে! হুঁঃ!'
গণেশ জানে, একা সে পৃথিবীর গতি কিছুতেই উলটে দিতে পারবে না৷ কিন্তু একা বসে বসে যে নিজের মনের মতো কিছু করবে তারও উপায় নেই৷ এই মৃত্যুহীন জীবন, এই অন্তহীন আয়ু কি এভাবেই যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হবে? সুইসাইড করে কোনো লাভ নেই৷ আজকাল মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা শক্ত কাজ তো নয়ই, বরং পৃথিবীর জনসংখ্যার ভারসাম্য রাখতে তা করা আবশ্যিক৷
গণেশের তিন ছেলে, এক মেয়ে৷ বড়ো ছেলের বয়স এক-শো চুয়াত্তর বছর, মেজোর এক-শো একাত্তর, ছোটো ছেলের এক-শো আটষট্টি এবং মেয়ের বয়স এক-শো ছেষট্টি৷ প্রত্যেকেই কৃতী বিজ্ঞানী৷ তারা অবশ্য বাপের কাছে আসে না৷ অন্তত গত এক-শো বছরের মধ্যে নয়৷ গণেশ তাদের মুখশ্রী ভুলে গেছে৷ গণেশের স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়া মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করতেন, দেড়-শো বছর আগে তিনি অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে রওনা হয়ে যান৷ এখনও ফেরেননি৷
আজ সকালে গণেশকে কবিতায় পেয়েছে৷ কবিতা লিখছে আর ভাসিয়ে দিচ্ছে বাতাসে৷ কবিতার কাগজগুলো বাতাসে কাটা ঘুড়ির মতো লাট খাচ্ছে, ঘুরছে ফিরছে, ভাসছে, পাক খাচ্ছে, তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূর৷ প্রতিদিন যত কবিতা লিখেছে গণেশ সবই এইভাবে ভাসিয়ে দিয়েছে৷ যদি কারও কাছে পৌঁছোয়, যদি কেউ পড়ে৷
আকাশে একটা পিপে ভাসছিল৷ গণেশ লক্ষ করেনি৷ পিপেটা ধীরে ধীরে নেমে এল৷ নামল একজন পুলিশম্যান৷ গণেশকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করে বলল, 'স্যার, এককালে আপনি যখন কলকাতার সায়েন্স কলেজে মাইক্রো ইলেকট্রনিকস পড়াতেন তখন আমি আপনার ছাত্র ছিলাম৷ কিন্তু এসব আপনি কী করছেন? পাহাড়ময় কাগজ ছড়াচ্ছেন কেন? এটা কি নতুন ধরনের কোনো গবেষণা?'
গণেশ মাথা নাড়ল, 'না হে না, ওসব গবেষণা-টবেষণা আমি ভুলে গেছি৷ আমি পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি৷'
'তার মানে? পৃথিবী তো দিব্যি বেঁচে আছে৷ মরার কোনো লক্ষণই নেই৷'
'মরছে৷ পৃথিবী মরছে৷ পরে টের পাবে৷'
'এ কাগজগুলো কি কোনো প্রেসক্রিপশন? পৃথিবীর বাঁচবার ওষুধ?'
'ঠিক তাই৷ ওগুলো কবিতা৷ তুমি পড়ে দেখতে পার৷'
লোকটা মাথার হেলমেট খুলে মাথা চুলকে হতভম্বের মতো বলল, 'কবিতা!'
'হ্যাঁ৷ কবিতা৷ পড়ো৷'
লোকটা পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা পাক-খাওয়া কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷
'কিছু বুঝলে?'
লোকটা অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে বলল, 'কিছু বুঝতে পারছি না স্যার৷ কোনোদিন এ জিনিস পড়িনি৷'
'তোমার বয়স কত?'
'এক-শো একান্ন বছর৷'
'বাচ্চা ছেলে৷'
'আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার৷ আমাদের আমলে শিক্ষানিকেতনে এসব পড়ানো হত না৷ শুনেছি তারও অনেক আগে কবিতা নামে কী যেন ছিল৷'
লোকটা নিরীহ এবং ভালোমানুষ দেখে গণেশবাবু হুকুমের সুরে বলে উঠল, 'মনে মনে পড়লে হবে না৷ জোরে জোরে পড়ো৷'
লোকটা কাগজটার দিকে চেয়ে থেমে থেমে পড়তে লাগল, 'গ্রহটি সবুজ ছিল, গাঢ় নীল জল, ফিরোজা আকাশ . . . কোকিলের ডাক ছিল, প্রজাপতি, ফুলের সুবাস . . . আধো আধো বোল ছিল, টলে টলে হাঁটা ছিল, শিশু ভোলানাথ-শৈশব ভাসায়ে জলে, কবি যে বৃহৎ হলে, নামিল আঘাত৷-'
'থামো, বুঝলে কিছু?'
লোকটি মাথা নেড়ে বলে, 'কিছুই বুঝিনি স্যার৷'
'একটুও না?'
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, 'শুধু মনে পড়ছে একসময়ে আমিও টলে টলে হাঁটতে শিখেছিলুম-'
গণেশ হতাশ হল৷ কবিতা তার ভালো হয়নি ঠিকই, কিন্তু না বুঝবার মতো নয়৷
লোকটা গণেশকে অভিবাদন করে চলে গেল, যেন একটু ভয়ে ভয়েই৷
পরদিন সকালে রোজকার মতো কবিতা লিখতে বসেছে গণেশ৷ এমন সময় একটা বড়োসড়ো পিপে এসে সামনে নামল৷
'স্যার৷'
গণেশ তাকিয়ে দেখে, সেই লোকটি, সঙ্গে দুই মহিলা৷
'আমার স্ত্রী আর মাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম৷ আমার মা কবিতার ব্যাপারটা খানিকটা জানে৷ এরা দু-জনেই কবিতা শুনতে চায়৷'
গণেশ অবাক এবং খুশি দুইই হল৷ তবে কবিতা শুনিয়েই ছাড়ল না৷ গান শোনাল, ছবি দেখাল৷
তিনজন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে রইল৷
'কিছু বুঝতে পারছ তোমরা?'
তিনজনেই মাথা নেড়ে জানাল, 'না!'
লোকটা বিনীত ভাবেই বলল, 'না বুঝলেও আমার মধ্যে কী যেন একটা হচ্ছে৷'
'কী হচ্ছে?'
'ঠিক বোঝাতে পারব না৷'
পরদিন লোকটি ফের এল৷ সঙ্গে আরও চারজন পুলিশম্যান৷
'এরা স্যার আমার সহকর্মী, কবিতা গান ছবির ব্যাপারটা বুঝতে চায়৷'
গণেশ খুব খুশি, 'বোসো বোসো৷'
পাঁচজন শ্রোতা ও দর্শক ঘণ্টা দুই ধরে গণেশের কবিতা শুনল, গান শুনল, ছবি দেখল৷ কেউ ঠাট্টা বিদ্রূপ করল না৷ গম্ভীর হয়ে রইল৷
পরদিন লোকটা এল না৷ কিন্তু জনাদশেক লোক এল, পুলিশ আছে, বৈজ্ঞানিক আছে, টেকনিশিয়ান আছে৷
পরদিন আরও কিছু লোক বাড়ল৷
পরদিন আরও৷
আরও৷
এক সপ্তাহ পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব তাঁর বিমান থেকে নামলেন গণেশের ডেরায়৷ 'এ আপনি কী কাণ্ড করেছেন? পৃথিবী যে উচ্ছন্নে গেল! লোকে গান গাইতে লেগেছে, কবিতা মকশো করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে৷'
গণেশ হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বলল, 'যাঃ, তাহলে আর ভয় নেই৷ দুনিয়াটা বেঁচে যাবে . . .'
শারদীয়া ১৩৯৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন