অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
সকাল বেলা৷ গোবিন্দ ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল৷ এক ভদ্রমহিলা এসে ঢুকলেন, বললেন, 'আপনার নাম শুনে আপনার কাছে এসেছি৷ আপনি আমার একটা উপকার করুন৷'
মহিলা সামনের চেয়ারখানিতে বসে পড়লেন৷ বললেন, 'আমার ছেলেটাকে নিয়ে বড়ো মুশকিলে পড়েছি৷ ভালো ছেলে, কাজকর্ম করছিল, হঠাৎ তার মাথায় সিনেমা ঢুকল৷ প্রায়ই রাতে বাড়ি ফেরে না, বলে সুটিং ছিল, পরদিন আপিস কামাই হয়ে যায়৷ কারখানার চাকরি, কর্তারা বলে দিয়েছেন-এভাবে কামাই করলে চাকরি থাকবে না৷ চাকরি গেলে, খাব কী? ওই টাকাটাই আমাদের একমাত্র সম্বল, আপনি যেভাবেই হোক, ছেলেটাকে রক্ষে করুন৷'
গোবিন্দ বলল, 'আপনার ছেলে তো সাবালক, সে যদি নিজের নিজের ভালোমন্দ না বুঝে, ইচ্ছেমতো চলে তো আমি কী করতে পারি? তা ছাড়া এসব আমার কাজ নয়, আমি উকিল, ওকালতি করি, ফৌজদারি ব্যাপারে কোনো গোলমাল থাকলে সেগুলি সমাধানের চেষ্টা করি৷'
'আমার ধারণা ছেলেটা কোনো কুসংসর্গে পড়েছে৷ কেননা আমি খবর পেয়েছি, যেদিন সুটিং বলে সে রাতে বাড়ি ফেরেনি সেদিন সে সুটিং-এ যায়নি, তার কোনো সুটিং সেদিন ছিল না৷ পর পর তিনবার আমি নিজে গিয়ে খবর নিয়েছি৷ আমি জিজ্ঞেস করলেও সে কিছু বলতে চায় না৷ চুপ করে থাকে৷ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি সংশোধনের ব্যবস্থা করে দিন৷'
'আপনার ছেলের বয়স একুশ বছর পার হয়ে গেছে, সে সাবালক, সে যদি নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করে, তাকে কিছুই বলার নেই৷ তবে সে যদি কোনো সময় বেআইনি কোনো কাজ করে বসে তখন পুলিশ তার সমাধানের ব্যবস্থা করবে, আমার এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই৷'
'সে যখন কোনো বেআইনি কাজ করবে তখন তো পুলিশ ধরে তাকে জেলে দেবে, তখন তো করার কিছুই থাকবে না, তেমন কিছু যেন না করে সেইজন্যেই তো আপনার শরণ নিয়েছি, আপনি তাকে তার আগেই ধরে এনে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটা ব্যবস্থা করুন, আপনি তো অনেক লোকের উপকার করেন৷'
গোবিন্দ মায়ের মুখের পানে তাকিয়ে ক্ষণেক কী যেন ভাবল, তারপর বলল, 'আপনি আপনার ছেলের নাম ঠিকানা, আপিসের নাম ঠিকানা আমার কাছে রেখে যান৷ আমি সুবিধামতো খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করব, এই ধরনের ব্যাপারে কোনো সুরাহা হবে বলে আমার মনে হয় না৷'
'এই ঠিকানাতেই আপনি সব পাবেন,' বলে মা একখানি চিঠি গোবিন্দের সামনে ধরে দিলেন৷ চিঠিখানি একখানা টাইপ করা পোস্ট-কার্ড৷ এক পাঞ্জাবি কারখানার ম্যানেজার বিশ্বনাথ নন্দীকে জানাচ্ছে যে এই মাসে প্রত্যেকটি শনিবার তার কামাই হয়েছে, এভাবে কামাই করলে কারখানায় কাজের ক্ষতি হয়, ভবিষ্যতে সে যেন সতর্ক হয়, নইলে কর্তৃপক্ষ তাকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হবেন৷
গোবিন্দ বিশ্বনাথ নন্দী ও কারখানাটির নাম ঠিকানা ডায়েরিতে লিখে নিয়ে চিঠিখানা মায়ের হাতে ফেরত দিল৷ মা বললেন, 'আমি গরিব বিধবা, ওই আমার একমাত্র ছেলে, ওই আমার বুড়ো বয়সের ভরসা৷ আপনি আমার একটা সুরাহা করুন, ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন৷'
মা চলে গেলেন, গোবিন্দ আবার খবরের কাগজে চোখ মেলল৷ এই ধরনের কত ছেলেই তো বাপ-মায়ের মুখের পানে না তাকিয়ে নিজের মনোমতো পথে চলে, বাপ-মায়ের কত দুঃখের কারণ হয় তাদের মন শোধরাবার কোনো রীতিই আজ অবধি বের হয়নি৷ গোবিন্দ আর কী করবে?
গোবিন্দ ব্যাপারটাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি৷ কয়েকটা দিন কেটে গেল৷ তারপর একদিন আবার সেই মহিলা এসে দেখা করলেন৷ বললেন, 'আপনি হয়তো আবার অযথা ঘোরাফেরা করবেন তাই আপনাকে খবরটা জানিয়ে যাই৷ আমার ছেলে বিশ্বনাথ সম্পর্কে আপনাকে আর কিছু করতে হবে না৷ আমিই তার একটা ব্যবস্থা করেছি৷'
মহিলা যা করেছেন, বললেন৷ কোম্পানির ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে ছেলের চাকরি তিনি বদল করে নিয়েছেন রানিগঞ্জে৷ খনি নিয়েই কোম্পানির কারবার সেখানে কোম্পানির এক আপিস আছে, কারখানাও আছে৷ বিশ্বনাথ সেই কারখানায় বদলি হয়েছে, আসছে সোমবার থেকে বিশ্বনাথ সেখানে চলে যাবে, মা-ও যাবে তার সঙ্গে৷ দূরে থাকলে এখানকার অসৎসঙ্গ আর থাকবে না৷
'আপনার সমস্যা আপনি নিজেই সমাধান করে নিয়েছেন, এ খুব আনন্দের কথা,' বলে গোবিন্দ মাকে বিদায় দিল৷ যে ব্যাপারে সে মোটেই মাথা ঘামায়নি সে ব্যাপারে সংক্ষেপে সমাপ্তি ঘটাই ভালো৷

কিন্তু বারো ঘণ্টার মধ্যেই সেই সংক্ষিপ্ত ব্যাপারই জটিল হয়ে উঠল৷ মা এসেছিল সকাল ন-টায়, ছেলে এল রাত ন-টায়৷
আদালত থেকে ফিরে এসে একটা মামলার কী ভাবে জেরা করা চলে গোবিন্দ তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, এমন সময় ধুতি পাঞ্জাবি পরনে এক যুবক এসে ঘরে ঢুকল৷ সামনের চেয়ারখানিতে বসে বলল, 'আমার নাম বিশ্বনাথ নন্দী, আমি সর্দার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে কাজ করি৷ আমার মা আপনাকে ধরেছে, আপনি আমাকে এখান থেকে বদলি করার জন্য হুকুম বের করে দিয়েছেন৷ চাকরি বজায় রাখতে হলে সোমবার আমাকে রানিগঞ্জে চলে যেতে হবে৷ আমি কিন্তু রানিগঞ্জে যেতে চাই না, সেখানে খরচপত্র এখানকার চেয়ে অনেক বেশি, আমি চালাতে পারব না৷ আপনি একবার গিয়ে ম্যানেজারকে বলে এই অর্ডারটা কাটিয়ে দিয়ে আসুন৷ আমি সেই কথাটাই আপনাকে বলতে এলাম৷'
গোবিন্দ বিরক্ত হল, বলল, 'তোমার কারখানা বা তার ম্যানেজার কাউকেই আমি চিনি না, তুমি এখানে থাকো বা বদলি হও তাতে আমার কিছুই যায় আসে না৷'
'আপনি এখন অস্বীকার করলেও আমি জানি, আমার মা আপনাকে ধরে এই সব করিয়েছে৷ আমি তাই আপনাকে বলতে এসেছি, যদি আমাকে রানিগঞ্জে যেতে হয়, তাহলে আপনাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে৷ আমি আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাব৷'
'তোমার সঙ্গে বাজে বকার অবসর আমার নেই তুমি এখন যেতে পার৷'
'ভালো কথা, তাহলে আমার সঙ্গে আপনি রানিগঞ্জে যাচ্ছেন, সেজন্য তৈরি থাকবেন৷'
বিশ্বনাথ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ তার আচরণে এমন একটা ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেল যা গোবিন্দের ভালো লাগল না৷ তবে ফৌজদারি আদালতের উকিল হয়ে গুন্ডা-বদমায়েসদের ঔদ্ধত্য যে ইতিপূর্বে অনেক দেখেছে, সে ভয় পেল না৷ তবে ব্যাপারটা পুলিশে একটু জানিয়ে রাখা ভালো মনে করে সে থানায় টেলিফোন করল৷
স্পেশাল ব্রাঞ্চের সুধীরবাবু পরিচিত মানুষ, সব শুনে বললেন, 'সোমবারের মধ্যে রানিগঞ্জে নিয়ে যাবে বলে যখন ভয় দেখিয়েছে, তখন দুটো দিন একটু সাবধানে থাকুন৷ শনিবার রাত তো কেটে যাবে কাল রবিবার আর বাড়ি থেকে বেরুবেন না৷ আজকালকার ছেলেছোকরারা বেপরোয়া হয়ে গেছে, কখন কী করে কিছু বলা যায় না৷ যদি বলেন তো আমি একদিনের জন্য একটা লোককে আপনার বাড়ির সামনে মোতায়েন করে রাখতে পারি, কোনো হুজ্জুত করে কেউ সরে পড়তে পারবে না৷'
'না, লোকের দরকার হবে না৷'
'যাক, রাতে সাবধানে থাকুন, কখন কী হয় ঠিক নেই, আপনার জানালা দিয়ে একটা কিছু ছুড়ে মেরে গেল, তখন ঘরে আগুন ধরে যাবে৷ হাসপাতালে ছুটতে হবে৷ গুন্ডা-বদমায়েসদের পিছনে লেগেছ, দু-এক চোট খাবে না তা কি হয়? অবশ্য চোট খাবার পরে তখন আমরা তদন্ত করব, তখন তুমি আমাদের আইনের আওতায় এসে গেলে৷ কোনো বিপদ বা দুর্ঘটনা না ঘটলে তো পুলিশ কিছু করতে পারে না৷'
'ছোকরাকে দেখে তো ভদ্রলোক বলেই মনে হল, অতটা সাহস করবে বলে মনে হয় না৷'
'আজকাল পাড়ায় পাড়ায় ভদ্র গুন্ডা দেখা দিয়েছে৷ দিশি ধুতি আর আদ্দির পাঞ্জাবি পরে পকেট মারতে বেরোয় টেরিলিন-টেরিকটের সুট পরে বোমা ছোড়ে৷ পোশাক দেখে মানুষ চেনা এখন শক্ত৷ যাক, তোমার সম্পর্কে একটা দুশ্চিন্তা রইল, কাল সকাল আটটার পরে একটা ফোনে জানব কেমনভাবে রাত কাটল৷'
সুধীরবাবু ফোন ছেড়ে দিল, গোবিন্দ আবার মামলার জেরার মুসাবিদা করতে লেগে গেল৷
রাত কেটে গেল নির্বিবাদে৷ সকালও কাটল৷ আহারাদির পর রবিবার দুপুরে গোবিন্দ খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়৷ বিকালের দিকে যায় ময়দানে হাওয়া খেতে৷ ঘুম থেকে উঠে খান চারেক বিস্কুট ও এক কাপ কফি খেয়ে সে বেরোবার উদ্যোগ করছে এমন সময় এক ছোকরা এসে ঘরে ঢুকল, বলল, 'আপনার নাম কি গোবিন্দবাবু?'
গোবিন্দ মাথা নাড়তেই ছোকরা গরগর করে বলে গেল, 'এইমাত্র একটা দুর্ঘটনা হয়েছে, ট্রামে ঝুলে এক ছোকরা যাচ্ছিল পাশ থেকে বাস ধাক্কা মারায় সে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যায় আমি তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছি৷ ছোকরার হাতে হাতঘড়ি, পকেটে পেন ও মানিব্যাগ ছিল, আমি সে সব সঙ্গে নিয়ে এসেছি, মানিব্যাগে একখানা কাগজে আপনার নাম ঠিকানা ছিল, আপনাকে খবর দিতে এলাম৷ এসব আপনি রাখুন৷' হাতঘড়ি, পেন, মানিব্যাগ টেবিলের উপর রাখল, বলল, 'এখনই যান, আজকালকার হাসপাতালে জানেন তো তদ্বির না করলে কোনো ব্যবস্থাই হবে না৷'
গোবিন্দ অবাক হল, বলল, 'তার নাম কী জান?'
'নাম বলবে কে? তার তো জ্ঞান নেই৷'
'বয়স কত?'
'বছর কুড়ি-পঁচিশ৷'
'তার এই ব্যাগের মধ্যে আমার নাম ঠিকানা লেখা কাগজ ছিল?'
'তাই তো দেখুন না-'
একখানি সাধারণ চিরকুটে গোবিন্দবাবুর নাম ঠিকানা লেখা৷ তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না৷
গোবিন্দ মানিব্যাগটা খুলল, বারোটা টাকা ও খুচরো কিছু পয়সা ছাড়া কিছুই নেই৷
পঁচিশ বছরের যুবক কোনো আত্মীয়ের কথা গোবিন্দ মনে করতে পারল না৷ বলল, 'একবার মানুষটিকে তো দেখতে হয়৷'
'ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে এমার্জেন্সি ওয়ার্ড!'
'আমি তো মানুষটাকে চিনি না, তুমি সঙ্গে থাকলে ভালো হয়৷'
'চলুন৷'
মানিব্যাগ, পেন, হাতঘড়ি একটি ফোলিও ব্যাগে ভরে নিয়ে গোবিন্দ বেরিয়ে পড়ল৷ সামনেই ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে দু-জনে উঠে পড়ল৷
কিছুটা গিয়ে ট্যাক্সি থামল এক পেট্রোলের দোকানে৷ পেট্রোল ভরছে এমন সময় একজন মিস্ত্রি উঠে পড়ল, গাড়িতে বসল তার পাশে৷ গোবিন্দ বলল, 'এ কী?'
মিস্ত্রিটি কিন্তুভাবে বলল, 'আমি ওই মোড়েই নেমে যাব৷ একটা পার্টস ফেলে এসেছি৷'
কালিঝুলি মাখা মানুষটির পাশে গোবিন্দ একটু সংকুচিত হয়ে বসল৷
একটা মোড় পার হয়ে ট্যাক্সি দ্বিতীয় মোড়ও ছাড়িয়ে গেল, মিস্ত্রির নামবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না৷
গোবিন্দ বলল, 'কী, তুমি তো নামলে না?'
'তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে নামব,' বলে মিস্ত্রি হাসল৷
গোবিন্দ দেখল তার হাতে একখানি ধারালো ছোরা৷
লোকটি বলল, 'ভালো ছেলের মতো মুখ বুজে চলো৷'
গোবিন্দ সঙ্গী ছোকরাটির মুখের পানে তাকাল, সে পাশে বসেছিল৷
ছোকরাটি তার হাত থেকে ফোলিও ব্যাগটি কেড়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, 'আমার নিজের জিনিসগুলো, এবার আমি নিজের কাছেই রাখি৷'
গোবিন্দ বলল, 'এ তাহলে একটা ষড়যন্ত্র!'
ওরা বলল, 'ষড় মানে তো ছয়, আমাদের যন্ত্রে তার চেয়ে অনেক বেশি মেম্বর আছে৷ আপনি শতযন্ত্র বলতে পারেন৷'
গোবিন্দ গুম হয়ে গেল, এভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা ঠিক হয়নি, এখন কী করে এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, সেই হল চিন্তা৷
মোটর বরাবর এল উলটোডাঙ্গা স্টেশনের কাছে৷ ফাঁকা মাঠের উপর পর পর অনেকগুলি সরকারি বাড়ি তৈরি হচ্ছে৷ চারিপাশে ইট কাঠ চুন সুরকির স্তূপ৷ সেইখানে মোটর থামল, লোক দু-টি সেখানে গোবিন্দকে নামাল, বলল, 'কোনোরকম গোলমাল করলেই ছুরি খেতে হবে, মুখ বুঝে চলো৷'
একটা বাড়ির একটি তলা সম্পূর্ণ হয়েছিল এরা তিনজন তার মধ্যে ঢুকল৷ সন্ধ্যা হতে তখন বিশেষ দেরি নেই৷
দুটো ছেলে লবণ হ্রদ দেখে ফিরছিল৷ সন্ধ্যা হয়ে আসছে, এদিকটায় আলো নেই, ফাঁকা মাঠের উপর বরাবর রাস্তা গেছে মানিকতলার দিকে, দু-বন্ধু সেই আবছা অন্ধকারে গল্প করতে করতে ফিরছিল৷ তাদের নজরে পড়ল, একটা নতুন বাড়ির সামনে মোটর থামল, তিনজন লোক নামল, মোটর চলে গেল৷ বাড়িটার কাছে যখন এল তখন সেই নির্মীয়মান বাড়ির মধ্যে কোথাও কোনো মানুষ তাদের নজরে পড়ল না৷ দেবু উঁকিঝুঁকি মেরে বলল, 'আশ্চর্য, তিনটে মানুষ এই সময় এই বাড়ির মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হল বল দিকি? ট্যাক্সি চলে গেল, বাড়িতে থাকার মতো জায়গা নেই, কোথাও কোনো আলো নেই, এ যেন এক রহস্য বলে মনে হচ্ছে৷ একটু দেখে যেতে হয়৷'
দেবুর সঙ্গী নীরু বলল, 'হয়তো মদ চোলাইয়ের একটা আড্ডা হয়েছে এখানে৷'
দেবু৷ 'একটু দেখে যেতে হবে৷'
নীরু৷ 'গুন্ডাদের হাতে পড়লে কিন্তু মুশকিল বাধবে৷'
দেবু৷ 'কীসের মুশকিল, এত ভাঙা ইট পড়ে আছে কী জন্য? কোনো ব্যাটাকে কাছে ঘেঁষতে দেব না৷ ক্রিকেট খেলায় অনেক বল দিয়েছি, এক-একখানি ইট তাগ করে ঝাড়ব, এক এক ব্যাটা ঘুরে পড়ে যাবে৷'
দু-জনে বাড়িটার দিকে এগোল৷
নতুন বাড়িটার আগাগোড়াই একতলার গাঁথুনি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, ছাদও ঢালাই করা হয়েছে, জানলা দরজার পাল্লা বসানো বাকি৷ বাঁশের ভারা পাশ কাটিয়ে ছেলে দু-টি খোলা জানলা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে লাগল৷ অন্ধকারে কোথাও কোনো সাড়া নেই৷ লোক তিনটে হাওয়ায় মিশে গেল নাকি?
নীরুর মনটা ছমছম করে উঠল, বলল, 'দরকার নেই, ফিরে চল৷'
দেবু বলল, 'এ পাড়াগাঁয়ের শ্মশান নয় যে ভূতের ভয় করব, ব্যাপারটা না দেখে যাচ্ছি না৷ যতক্ষণ হাতের কাছে এই ইট আছে ততক্ষণ আমার কোনো ভয় নেই, এ দিশি গোলা!'
দেবুর সাহস বেশি, কোনো একসময় সে একখানি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল, ফিসফিস করে বলল, 'আয় ওদিকে আলো দেখা যাচ্ছে৷'
পিছন দিকের একটা ঘরে বাতি জ্বলছিল, অতি মৃদু তার আলো৷ সেই আলোয় জানলার এক ধাপের উপর বসে, এক বয়স্ক লোক৷ সামনে গোবিন্দকে ধরে দাঁড়িয়েছিল দু-জন সহযাত্রী৷ বয়স্ক লোকটি বেশ মুরুব্বিয়ানার ভঙ্গিতে বলছিল, 'তুমি উকিল হয়ে শখের গোয়েন্দাগিরি শুরু করে অনেক অনেক ক্ষতি করেছ, ক-বার তুমি সহজে পার হয়ে গেছ বলে মনে করেছ এই ভাবেই চলবে, তা চলবে না৷ তোমার জন্য বিশ্বনাথকে চাকরি ছাড়তে হচ্ছে, রানিগঞ্জে গেলে তার চলবে না, আমরাও এখান থেকে তাকে ছেড়ে দিতে পারছি না৷ এখন তাহলে তার চলবে কীসে? একটা দোকান-পাট করে তাকে বসতে হবে৷ একখানা দোকান ভাড়া নিতে তার দু-হাজার টাকা সেলামি দিতে হবে, সে টাকা তুমি এখনই তাকে দেবে, তারপর একমাস পরে তুমি তাকে পাঁচ হাজার টাকা দেবে মালপত্তর কেনার জন্য৷'
গোবিন্দ বলল, 'আমি তার চাকরি-বাকরির ব্যাপার কিছুই জানি না, আমাকে অনর্থক দায়ী করা হচ্ছে৷'
বয়স্ক বলল, 'ওসব আজেবাজে কোনো কথা আমি শুনব না৷ আমার লোক তোমার সঙ্গে যাবে, বাড়ি পৌঁছেই তুমি দু-হাজার টাকার চেক লিখে দেবে৷ কোনো চালাকি করার চেষ্টা করলে আজ রাত্রেই তোমাকে আমরা শেষ করব৷'
'সে যা করতে হয় করো, টাকা আমি দেব না৷ আর আমাকে খুন করে তোমরা রেহাই পাবে না, পুলিশে সব কথা জানানো আছে৷'
'পুলিশ কিছুই করতে পারবে না, তোমার হাত মুখ বেঁধে রাত দুপুরে খালের জলে ফেলে দেব৷ মাত্র সাত হাজার টাকার জন্য জলে ডুবে মরাটা যুক্তিযুক্ত কি না, তুমি ভেবে দেখো৷ বাঁচলে তুমি অনেক সাত হাজার উপায় করতে পারবে৷'
'আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই৷'
'বেশ! তাহলে ওর হাত-পা মুখ বেঁধে এখানে ফেলে রাখ, রাত দুপুরে সাফ করে দিবি৷'
একজন বলল, 'দড়ি?'
'দড়ির অভাব? এই বাঁশের ভারা থেকে খুলে দিচ্ছি,' বলে বয়স্ক লোকটি বাইরে বেরিয়ে এল৷
বাঁশের ভারা থেকে সে দড়ি খুলছে, এমন সময় দেবু তাগ করে একখানি আধলা ইট ছুড়ল৷ দম করে ইটখানা পিঠে পড়তেই সে গঁক করে মুখ থুবড়ে পড়ল৷ ভিতর থেকে সাড়া এল, 'কী হল?'
'একেবারে জখম হয়ে গেছি রে, ভারার উপর ইট ছিল, পিঠে পড়েছে উঠে দাঁড়াতে পারছি না৷'
বয়স্ক লোকটি কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়াল৷
'তুই দেখ, আমি দেখে আসি,' বলে ঘরের ভিতর থেকে মিস্ত্রি ছোকরা বেরিয়ে এল৷ সে এসে দাঁড়াতেই দেবুর হাতের আরেকখানি ইট এসে পড়ল তার পিঠে৷ 'বাপস' বলে সে সেইখানেই বসে পড়ল৷ ভিতর থেকে সাড়া এল, 'তোর আবার কী হল?'
'কোন শালা আশপাশ থেকে ইট ছুড়ছে রে!'
'আশপাশ থেকে ইট ছুড়ছে?'
দুম করে খোলা জানলা থেকে ঘরের মধ্যে একখানা ইট এসে পড়ল৷ ঘরের ভিতরে ছোকরা চমকে উঠল৷ গোবিন্দ ঠিক সেই মুহূর্তে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ছুট দিল৷
ছোকরা পিছনে তেড়ে আসতেই ইট বৃষ্টি শুরু হল৷ কয়েকটা ইট ছোকরার গায়ে লাগল৷ ছোকরা থমকে দাঁড়াল৷ গোবিন্দ শশকের মতো ক্ষিপ্রপদে, ইট কাঠ ডিঙিয়ে লাফিয়ে এসে পড়ল সামনের ফাঁকা মাঠে৷ পিছু পিছু এসে পড়ল দেবু ও নীরু৷
তিনজনে এসে উঠল উলটোডাঙ্গা স্টেশনে৷
তারপরের ব্যাপার খুব সাধারণ৷ গোবিন্দ সেখান থেকে লালবাজারে ফোন করল৷ পুলিশ ভ্যান এল আধঘণ্টা পরে৷ সুধীরবাবু পুলিশ নিয়ে বাড়িগুলো তল্লাশ করলেন কিন্তু কাউকেই পেলেন না৷ অবশ্য ধরা পড়বার জন্য ইচ্ছা করে সেখানে ততক্ষণ কেউ বসে থাকবে এমন কথা নয়৷
দেবু ও নীরুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গোবিন্দবাবু বাড়ি ফিরল, দশ মিনিটের মধ্যে টেলিফোন এল, 'আপনি বাড়ি ফিরেছেন দেখলাম৷ বিশ্বনাথের টাকাটার কথা মনে রাখবেন৷ আপনার কাছ থেকে টাকাটা না পেলে ও কারবার শুরু করতে পারছে না৷ টাকাটা আপনি হাতে রাখবেন৷ ও গেলেই যেন পায়৷ মনে রাখবেন-এক পৌষেই শীত যায় না৷'
গোবিন্দ কিছু বলতে চাইছিল, ওদিকের বক্তা তার আগেই লাইন কেটে দিয়েছে৷
গোবিন্দ হাসল, বুঝল-এই দলটি তাকে সহজে ছাড়বে না৷ সাবধান হতে হবে৷
শারদীয়া ১৩৭৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন