অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
'জন্টি রোডসকেও কিন্তু রানটা করতে হয়, আর তুই তো নন্তু বোস!' দেশপ্রিয় পার্ক ক্রিকেট ক্যাম্পে এই ঝাঁকুনি গোপাল স্যারের৷ নেটে ব্যাট করানোর সময়েও মনে মনে নম্বর দিতেন৷ পরপর চারদিন আমি ফেল৷ গোপাল স্যার বললেন, 'এ সপ্তাহে যা ব্যাট করলি, তোর অ্যাভারেজ বড়োজোর চোদ্দো৷ যতই ভালো ফিল্ডিং করিস আর সে জন্য যতই হাততালি পাস, ব্যাটে বা বলে কিছু না করে গেলে তোকে টিমে নেবে কেন? ফিল্ডিংটা তখনই প্লাস পয়েন্ট, যখন চল্লিশ-পঞ্চাশ রান বা দু-তিনটে উইকেট টিমকে দিয়ে যেতে পারছিস৷ দশ বছর আগে ছেলেদের বোঝাতে হত, ফিল্ডিংয়ে জোর দে, না হলে এখন চলবে না৷ তোকে আর লাল্টুকে দেখে মনে হচ্ছে, এখন এক্কেবারে শুরুতেই সবাইকে বলে দিতে হবে, যতই ভালো ফিল্ডিং কর বাবা, ব্যাটিং-বোলিং ছাড়া চলবে না৷'
তিন বছর আগের কথা৷ ষোলো বছর বয়সেই বেশ লম্বা হয়ে গেছি, সবাই ফিল্ডিংয়ের প্রশংসা করে, কিন্তু ব্যাটে-বলে একদম ছিলামই না-তা নয়৷ একটু জোরের ওপর অফব্রেক বল করি ছোটোবেলা থেকে, সোজা ব্যাটেই তবে একটু চালিয়ে খেলি, নেটে মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে ফেলতেন স্যার৷ যখন তেরো-সাড়ে তেরো বয়স, উইকেটকিপার হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল৷ বাবার বন্ধু বাদশাকাকা লন্ডন থেকে উইকেট কিপিং গ্লাভস এনে দিয়েছিলেন, কেন এনেছিলেন বাদশাকাকাই জানেন, দেখতে এত ভালো যে উইকেটকিপার হওয়ার ইচ্ছে হল৷ সম্বরণ ব্যানার্জি একাডেমির সঙ্গে খেলা যাদবপুর স্টেডিয়ামে, আমাদের উইকেটকিপার সায়ম জ্বরে ফ্ল্যাট, চান্স এসে গেল৷ দুটো ক্যাচ নিলাম, তার মধ্যে একটা যাকে বলে ডাইভিং ক্যাচ৷ চুয়াল্লিশ করেছিলাম সেদিন, লাল্টু একান্ন, কিন্তু পাঁচ রানে হেরে গেলাম৷ মন খারাপ৷ আবার মনটা ভালোও হয়ে গেল, যখন সম্বরণ ব্যানার্জি নিজে এসে আমাকে ডাকলেন৷ বললেন, 'আজ বেশ ভালো ব্যাট করেছ৷ আগে একদিন দেখেছি, খুব ভালো ফিল্ডিং কর৷ বলটাও মন্দ নয়৷ তুমি উইকেটকিপিং করতে যেয়ো না৷ ব্যাটে যা করার করবে, বলে একটু, ফিল্ডিংয়ে অনেকটা৷ কিপিং সবার জন্য নয়৷ একটা ভালো ক্যাচ নিয়েছ, তবু বলছি৷ লম্বাটে গড়ন তোমার, আরও অনেক লম্বা হবে-অ্যাটলিস্ট পাঁচ দশ, সাধারণত লম্বারা ভালো কিপার হয় না৷ তা ছাড়া, তোমার ধৈর্য মনে হল একটু কম, বেশ ছটফটে, উইকেটকিপারের কিন্তু প্রচণ্ড ধৈর্য লাগে৷' বাড়ি ফিরে ফোনে বড়দাকে কথাগুলো বললাম৷ বড়দা বলল, 'একদম ঠিক বলেছে৷ তা ছাড়া, তুই যখন কিছুতেই অ্যালান নট বা কিরমানি হচ্ছিস না, টিমকে তোর ভালো ফিল্ডিংটা দিবি না কেন?' এত কথা বড়দা বলে না৷ পাঁচটা কথার জবাবে একটা কথা বলে৷ বড়দা মানে, আমার জেঠতুতো দাদা৷ হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করে৷ ভালো ব্যাট করত, দুটো রনজি ম্যাচও খেলেছে পঁচিশ বছর আগে৷ বাবা বলে, 'আমাদের ফ্যামিলিতে অনেক ভালো ভালো ক্রিকেটার, কিন্তু শক্ত বলে ফেলুর পরেই নন্তু৷ বাদবাকি আমরা টেনিস বল ক্রিকেটার৷' কিন্তু বাবা, জেঠু, কুট্টিকাকু-এই টেনিস বল ক্রিকেটারদের কাছে যত টিপস পেয়েছি, বড়দার কাছে নয়৷ একে তো মামলা-টামলায় ব্যস্ত, তার ওপর, এখনকার ক্রিকেটের ওপর ভীষণ রাগ বড়দার৷ নানা কারণে রাগ৷ তবু মাঝে মাঝেই ফোন করি, বুঝতে পারি, কিছু লিখতে লিখতে বা পড়তে পড়তে 'হুঁ হ্যাঁ' করে যাচ্ছে, তবু সব কথা বলি৷ আমার ক্রিকেটের কথা৷ আমার যে উইকেটকিপার হওয়া উচিত নয়, সেটা অবশ্য বেশ মন দিয়ে বলেছিল৷ এত কথা বলে না বড়দা৷
আমার মা কেমন? এক কথায়, সবার মা যেমন৷ বলে, আরও খাওয়া-দাওয়া করা উচিত৷ বলে, আরও পড়াশোনা করা উচিত৷ বলে, পাশের ফ্ল্যাটের অঙ্কুর অনেক বেশি পড়ে (অঙ্কুরের মা-ও বলে, আমি অনেক বেশি পড়ি)৷ মা বকে রোজ, গায়ে লাগে না৷ বাবা বকে বছরে দু-তিনবার, ঠান্ডা বকুনি, কিন্তু কী মারাত্মক! দু-চারটে কাপ মেডেল তো কবে থেকেই পাচ্ছি৷ মা গুছিয়ে রাখে৷ সাজিয়ে রাখে৷ টেলিভিশনে যখন খেলা চলে, মা-ও দু-একবার চোখ রাখে৷ হয়তো ভাবে, একদিন আমাকেও টিভিতে দেখা যাবে৷ শুধু একটা দুঃখ, ফেলু কিন্তু এর চেয়ে অনেক বড়ো বড়ো কাপ পেত৷ তা পেত৷ বড়দার বাড়িতে এখনও ক্রিকেটের বই প্রচুর৷ আর প্রচুর বড়ো বড়ো কাপ, দুটো শিল্ডও৷ বড়োবউদি পালিশ করায় প্রতি বছর৷ বড়ো কাপ না, আন্ডার থার্টিনের একটা ফাইনালে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়ে যা পেলাম, মার হাতে দিলাম, তা বড়দা কখনো পায়নি৷ টাকা৷ পাঁচ-শো টাকা৷ মা খামটা গুছিয়ে রেখে দিল, ছোটো ছোটো কাপগুলোর পাশে৷ বাবা বলল, 'পাঁচ-শো টাকার নোটটা বাঁধিয়ে রাখবে নাকি!' তিন-চার বছরের মধ্যে আরও টাকা৷ মা একদিন হিসেব করে বলল, 'সাড়ে পাঁচ হাজার, এবার তো ব্যাঙ্কে রাখতে হয়৷' পাঁচ-শো টাকা জুড়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিল বাবা৷ বলল, 'আর লেখাপড়া করে কী হবে, তোমার রোজগেরে ছেলে৷' যখন-তখন কাঁদতে ভালোবাসে মা, কিন্তু কাঁদল না৷ বলল, 'এ আবার কেমন কথা! যদি দেয়, নেবে না!' আর তারপর আমাকে বলল, বলতেই থাকল, চার-পাঁচদিন টানা বলে গেল, 'নন্তু, পড়ছিস না, একদম পড়ছিস না৷' . . . একদম পড়ছি না, তা নয়৷ কিন্তু যতটা পড়লে বাবার ভালো লাগত, যতটা পড়লে আমার মার্কশিট সবাইকে দেখাতে পারত মা, ততটা নয়৷ হায়ার সেকেন্ডারিতে বিচ্ছিরি কিছু করিনি৷ ফার্স্ট ডিভিশন৷ আমার বন্ধুরা অনেকে অনেক বেশি পেয়েছে৷ কিন্তু মা-বাবাকে তো বলা যায় না, অনেকে কমও পেয়েছে৷ কিন্তু, কলেজে আসার পর বুঝেছি, মন দিয়ে ক্রিকেট খেললে মন দিয়ে পড়াশোনা করা কঠিন৷ রীতিমতো মিটিং হয়ে গেল একদিন৷ সন্ধ্যের মধ্যে এসে গেল জেঠু, বড়োমা, কুট্টিকাকু, কাকিমা, দিদি, জামাইবাবু৷ একটু দেরিতে বড়দাও৷ জন্মদিন-টন্মদিন নয়, তবু হেভি ডিনারের ব্যবস্থা কেন, বাবা নিজে সকালে গোটা বাজার তুলে আনল কেন, মা একেবারে মুগডাল থেকে বড়ো ম্যাচ ধরে এগোচ্ছে কেন, বুঝিনি৷ ডিনারের আগে মিটিং৷ সাবজেক্ট আমি৷ এত রান্না করে শুয়ে পড়ার কথা, কিন্তু আমার মা তোমার মা (সবার মা-ই বোধ হয় এরকম), মিটিংয়ের ফাটাফাটি শুরুটা করল এইভাবে 'নন্তু পড়ছে, কিন্তু পড়ছে না৷ খেলছে, খেলেই যাচ্ছে৷ ওর বাবা মাঝে মাঝে কিছু বলছে, কিন্তু বলছে না৷ তোমরা সবাই মিলে ঠিক করো, নন্তু কী করবে, কীসে ওর ভালো হবে৷' একেবারে ম্যাকগ্রাথের ফার্স্ট ওভার! দিদি বলল, 'ফাজলামি নাকি, পড়বে, পড়বে, একটু একটু খেলবে৷ খেলবে না পড়বে, এটা কোনো প্রশ্ন হল?' জামাইবাবু ঠান্ডা মানুষ, কলেজে ইতিহাস পড়ায়, বলল, 'কে কী করবে, সেটা অন্যরা বলে দিচ্ছে বুঝি আজকাল!' কিন্তু মিটিং প্রবল বেগে এগোল পড়াশোনার দিকেই৷ বড়দা, ক্রিকেটার বড়দাও মনে হল ওইদিকে৷ বাবা প্রায় কিছুই বলছে না কেন? বোঝা গেল, প্রায় শেষে এসে৷ মা-র দিকে তাকিয়ে বলল, 'খেতে দাও, সবার খিদে পেয়েছে৷ মিটিংটা খুব ভালো৷ কিন্তু যাকে নিয়ে মিটিং, তাকেই কিছু বলতে দেওয়া হল না৷ বলতে দেওয়ার দরকারও নেই৷ লেখাপড়াটা চালিয়ে খেলে যেতে পারে, ক্ষতি কী?'
ব্যাটে এখনও হয়নি, কখনো হবে কি না জানি না, কিন্তু লোগোওয়ালা টুপি তো এসে গেছে সেই কবে৷ এখন নতুন ক্যাপ এলেই মা জিজ্ঞেস করে, এটা কোন কোম্পানির? আমার খেলার শার্টেও লোগো৷ বড়দা কম কথা বলে, তবু একদিন বলে ফেলল, 'শেন ওয়ার্নের দুঃখটা ভেবে নে, ব্যাটে লোগো লাগানোর জন্য টাকা পাচ্ছে না, বলে তো লোগো লাগানো যায় না!' বাবা বলে, 'বুটে লোগো লাগায় না কেন? বুটটা বড়ো করে নিলেই তো হয়!' আমি কিছু বলি না৷ ভাবি, এ সব কথার কোনো মানে হয়? আন্ডার থার্টিনে যখন পঞ্চাশ করছি কি না করছি, তখন থেকেই আমার জামা, প্যান্ট, টুপি সব কোম্পানির৷ সেই যে একদম ছোটোবেলা থেকেই প্রাইজ মানি পাচ্ছি, সেও তো কোম্পানির৷ টিম ট্রফি পায়, কোম্পানির৷ পঙ্কজ রায় পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, ট্রফি দিচ্ছেন কোম্পানির মালিক, খারাপ লাগলে তো কিছু করার নেই৷ দিচ্ছে যখন৷ ট্র্যাকস্যুট, ব্যাগেও লোগো৷ এখনই৷ কুট্টিকাকু মজা করে বলে, 'ইন্ডিয়া প্লেয়ারদের বুক চিরলেও লোগো পাওয়া যাবে৷' গত বছর যখন বুচিবাবু টুর্নামেন্টে সি.এ.বি. টিমের হয়ে একদিন ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়ে পনেরো হাজার টাকা পেলাম, প্রথম ফোন করলাম বড়দাকে৷ পনেরো হাজারটাকে গুরুত্বই দিল না, বলল, 'বাঃ, ম্যান অফ দ্য ম্যাচ? কত করেছিস? কত ঠেকিয়েছিস?' হায়দরাবাদ থেকে ফিরে যখন মা-র হাতে চেকটা তুলে দিলাম, খুশিই দেখাল৷ বাবার ব্যাপারটা বোঝা কঠিন, বোঝা গেল না৷ দিদি অবশ্য বলে গেল, 'নন্তুর খেলা নিয়ে উলটোপালটা বলেছি আগে, আজ ভালো লাগছে-ভাগ্যিস মন দিয়ে খেলছিস৷' জামাইবাবু, মনে হয়, বড়দাপন্থী৷ মেডেলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দেখল, পনেরো হাজার নিয়ে একটা কথাও না৷ গত বছর যখন আন্ডার নাইনটিন বেঙ্গল টিমের হয়ে সেঞ্চুরি করলাম, বড়দা ফোন করল৷ বলল, 'কনগ্র্যাটস৷ এ জন্য কত পেলি, বলিস না, প্লিজ৷' রাগ হয়৷ কষ্টও হয়৷ আমি যদি খেলে, ভালো খেলে কিছু টাকা পাই, খারাপ কী? কথাটা একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম বড়দাকে৷ সাহস মানে, ফোনে সাহস৷ বড়দা বলল, 'খেলে টাকা তো খারাপ নয়৷ এখন আর খেলে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে না, যে খেলে তাকে তো খেলেই রোজগার করতে হবে৷ তবে, আমি চিরকাল রান, উইকেট আর ক্যাচের কথাই জানতে চাইব৷' কার ঘাড়ে ক-টা মাথা, কে বোঝাবে বড়দাকে, দিনকাল পালটে গেছে৷ বড়দারা খেলেছে খেলার জন্য, খেলার মজায়৷ এখন খেলাটাও একটা কাজ৷ কঠিন কাজ৷ আর কাজ তো মানুষ করে কিছু পাওয়ার জন্যই৷ এবার মোহনবাগানে সই করে আমি যে নব্বই হাজার টাকা পেয়েছি, তা আর বলিনি বড়দাকে৷ মা বলেছে৷ বাবা ইদানীং আমার লেখাপড়া নিয়ে প্রায় কিছুই বলে না, খেলা নিয়েও না৷ শুধু মাঝেমাঝে বলে, কেন বলে বাবাই জানে, 'ডিসিপ্লিনটাই আসল নন্তু, সে যা-ই করিস৷' আমার রাগ হয়৷ কষ্টও হয়৷ ডিসিপ্লিন ছাড়া এগোচ্ছি? খাটতে হয় না আমাকে? শরীরটাকে এক-শোয় এক-শো রাখতে হয় না? মনটাকে এক-শোয় অন্তত আশি রাখতে হয় না? বিরাট একটা কথা-সাধনা, আমার নেই? কুট্টি কাকিমার অপারেশনের সময় আমার টাকা থেকে যে মা পঁচিশ হাজার দিয়ে এল, তা কি আমার খেলার জন্য নয়? টাকা কি এতই ঘেন্নার জিনিস? বড়দাকে বলতে পারিনি৷ পারি না৷
শুধু টাকা বা লোগো-টোগোই তো নয়, বড়দার আসল আপত্তি ওয়ান ডে ক্রিকেট নিয়েই৷ অনেকেই বলে, বড়দা বড়ো জোর দিয়ে বলে, 'এটা কোনো ক্রিকেট নয়৷' তারপর বলে, 'হতে পারে এটা একটা মজার খেলা, তবে ক্রিকেট নয়৷' তর্ক করে পারব না, করার দরকারও নেই৷ বেঙ্গসরকার লিখেছেন, এবার হাফ-ডে ক্রিকেট আসবে এবং জমবে৷ আমি ছোটোবেলা থেকেই ওয়ান ডে ক্রিকেট ভালোবাসি, মনে মনে ভেবেছি একদিন বাংলার হয়ে খেলব, ভারতের হয়ে খেলব, একদিনের ম্যাচেই খেলব৷ টিভিই ছোটোবেলাতেই মাথাটা খারাপ করে দিয়েছে, বড়দা হয়তো ভাবে, বলেনি কখনো৷ আমিও কিছু বলিনি৷ কাউকেই বলি না৷ কিন্তু জানি, টিভিতে খেলা দেখে আমার মাথা খারাপ হয়নি৷ বরং উৎসাহ পেয়েছি, বড়ো বড়ো ক্রিকেটারদের খেলা দেখে আর কথা শুনে টুকটুক করে বেশ কিছুটা জেনেছি৷ গোপাল স্যার বলেন, এরকম হতেই পারে যে, কোনো ক্রিকেটার ওয়ান ডে স্পেশালিস্ট, যেমন মাইকেল বিভান, যেমন রবিন সিং, যেমন নিকি নাইট, কিন্তু সেটা তো অনেকদিন খেলার পর বোঝা যাবে৷ শুরু থেকেই নিজেকে ওয়ান ডে ক্রিকেটার ভাবার কী মানে হয়? একসঙ্গে গাভাসকার আর ভিভ রিচার্ডসের সই-করা একটা ব্যাট আছে গোপাল স্যারের কাছে৷ আমাকে বলে রেখেছেন যে, কোনো ম্যাচে আমি যদি সেঞ্চুরি করি অন্তত ১০০ বলে (৯৯ বলে করা চলবে না), ব্যাটটা পেয়ে যাব৷ মানে, ১০০ করলেই হবে না, ধৈর্য ধরে করতে হবে, সময় নিয়ে করতে হবে৷ পরীক্ষায় এখনও পর্যন্ত পাশ করতে পারিনি৷ গতবার এরিয়ানের সঙ্গে ম্যাচে যখন ১০৩ বলে ৯৯, ওই ব্যাটটা দেখতে পাচ্ছিলাম৷ আমার তো ১০০ বল পার করা নিয়ে চিন্তা, করে দিয়েছি, কিন্তু ১০০ রান যে হল না৷ ৯৯, রান আউট৷
এবার বুচিবাবু টুর্নামেন্টে সি.এ.বি. টিমে রেখেছিল৷ একটা ম্যাচে চান্স পেলাম, ম্যাচটা হেরে যাওয়ায়, আমাদের শেষ ম্যাচ৷ পাঁচ নম্বরে নেমে ৫৭ বলে ৬৬ করেছি, সাত ওভারে ১৯ রানে দুটো উইকেট পেয়েছি, ক্যাচ না পেলেও রান বাঁচিয়েছি অনেক৷ একদিনের ম্যাচে বাংলা দলে জায়গাটা মনে হয় করে নিতে পারব এবার৷ গত বছর সিজনের শেষ দিকটা ভালো গেছে৷ মোহনবাগান তখনই কথা বলে নেয়, এবার ওরা নিতে চায়, ভালো টাকাও দেবে৷ এবার ক্রিকেটেও দারুণ স্পনসর ওদের, অন্য অনেক সুবিধেও পাওয়া যাবে৷ ঢাকায় তিনটে ম্যাচ খেলে এলাম আবাহনীর হয়ে৷ কিছু রান পেলাম, কিছু উইকেট, বেশ কিছু টাকা৷ টাকা আরও, টাকিতেও৷ লোকাল দুটো ক্লাব ফাইনালে, দু-দিকেই বেশিরভাগ ক্রিকেটার কলকাতার৷ ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়ে পেলাম একটা টিভি আর পাঁচ হাজার টাকা৷ টাকা উড়ছে!
এবার ঠিকঠাক সিজন শুরু হতে এখনও দেরি আছে৷ নিজেকে তৈরি রাখছি, ওয়ান ডে ম্যাচ শেষ টিমে থাকতেই হবে৷ নতুন একটা টুর্নামেন্ট চালু করল সি.এ.বি.৷ পঙ্কজ রায় কাপ৷ ইস্ট জোনের সব টিম নিয়ে, তিন দিনের খেলা, আসলে ফার্স্ট ইনিংস লিডের খেলা৷ পনেরো জনের স্কোয়াডে আমার নাম দেখে অবাক হলাম৷ গোপাল স্যার হননি৷ বললেন, তুই ভাবছিস তুই শুধু ওয়ান ডে ক্রিকেটার, সিলেক্টররা ভাবছে না৷ হয়তো ফার্স্ট টিমে থাকবি না, কিন্তু এটা বুঝে নে যে, বেশি সময়ের ক্রিকেটেও তুই আছিস৷ থাকতে হবে৷ আসামকে হারিয়ে এক ধাপ এগোল ত্রিপুরা, সেমিফাইনাল ওড়িশার সঙ্গে৷ এদিকে বাংলা আর বিহার৷ ওড়িশা হেসেখেলে জিতে ফাইনালে৷ বাংলা চার উইকেটে হারাল বিহারকে৷ আমি খেলিনি৷ খেলানোর কথাও নয়৷ ফাইনালে মুখোমুখি বাংলা আর ওড়িশা৷ ঠিকই ধরেছেন, ফাইনালে টিমে ঢুকে গেলাম৷ খেলার দিন সকালে হঠাৎ, এসব হঠাৎই হয়, পেটে গণ্ডগোল ক্যাপ্টেন রোহন গাভাসকারের৷ সামলে মাঠে এল, কিন্তু চিনচিনে ব্যথা, খুব দুর্বল৷ বলল, ফিট কেউ খেলুক৷ উৎপল চ্যাটার্জি ক্যাপ্টেন৷ ম্যাচটা তো জিততে হবে৷ টসে জিতে আমাদের ব্যাট করতে বলল ওড়িশা৷ বলবে না কেন? ইডেনের সকাল, ওদের নতুন বলের লোক দেবাশিস মোহান্তি৷ ছ-নম্বরে গেলাম, তখন বাংলার চার উইকেটে ৭৩৷ দেবাংদা দারুণ শুরু করেছিল, কিন্তু বিচ্ছিরিভাবে রানআউট হয়ে গেল৷ নিখিল হলদিপুর বলল, 'শোন নন্তু, উলটোপালটা চালাস না, আমি যতটা পারি দেখছি, তুই ধরে খেলে যা৷ অ্যাট লিস্ট ৩০০ করতে হবে আমাদের৷' ধরে খেলা? আমি? চেষ্টা করলাম৷ উইকেটে একেবারে পিঁড়ি পেতে বসে গেলাম তা নয়৷ প্রথম দিন চায়ের সময় বাংলা ১৪৫, চার উইকেটেই৷ মাঝে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট ওয়ান ডে ক্রিকেট খেলে ফেলছিলাম, রানও আসছিল এবং হলদিপুর বলে যাচ্ছিল, হচ্ছেটা কী? কিন্তু ও-ই আউট হয়ে গেল কিছুক্ষণ পর৷ উৎপল চ্যাটার্জি, ডেভিডদা, ক্রিজে এসে বলল, 'দু-শোর কাছাকাছি তো এসেই গেছি, ৩০০ হবে না কেন? দেখেশুনে, তবে তুই তোর খেলা খেলে যা৷' ক্যাপ্টেনের কথা বলে কথা, কিছুটা চালালাম৷ মিড উইকেটে একটা হাফ চান্স বাদ দিলে, ভালোই৷ দিনের শেষে নট আউট ৭৩, ডেভিডদা নট আউট ২১৷ বাংলা ৫ উইকেটে ২২৩৷ না৷ সেঞ্চুরি হয়নি৷ তবু বাংলার ৩০০ হল, ৩১৩, আমি ৮২, উৎপল চ্যাটার্জি ৫৫৷ দেবাশিস মোহান্তির পাঁচ উইকেট ৬৩ রানে, কিন্তু আমি ওই পাঁচের মধ্যে নেই, ডেভিডদাও না৷ দেবাশিস মোহান্তির পালা চুকল, কিন্তু এবার শিবসুন্দর দাস৷ সৌরভ গাঙ্গুলির পর ইস্ট জোনের বেস্ট ব্যাটসম্যান৷ আমি বড়ো প্লেয়ার, তোমরা কে হে, এরকম হাবভাব নেই৷ তিন ঘণ্টায় ওড়িশা এক উইকেটে ১০১৷ শিবসুন্দর দাস ব্যাটিং ৫৪৷ ডেভিডদা একবার কাছে এসে বলল, তোকে দু-তিন ওভার দেব কি না ভাবছি৷ দেখেনি তো তোকে, গোলমাল করে ফেলতে পারে৷ বলল, কিন্তু বল দিল চায়ের পরে৷ ততক্ষণে ওড়িশা দু উইকেটে ১৩৭, শিবসুন্দর দাস ব্যাটিং ৭৪৷ চমৎকার বল করছিল রণদেব, রণদেব বসু৷ কাঁটায় কাঁটায় বল করে যাচ্ছিল ডেভিডদা, কিন্তু নড়ানো যাচ্ছিল না শিবসুন্দর দাসকে৷ চায়ের পর সঞ্জীব সান্যালকে বলটা দিতে গিয়েও হঠাৎ কী মনে হল ডেভিডদার, আমাকে ডাকল৷ বলল, 'তিন ওভার পাবি, পারলে শিবসুন্দরকে নে, অন্তত প্রহরাজকে নে৷ চার নয়, তিন ওভার৷ আঠারো বল৷ যা করিস, তা-ই করবি৷ তেড়ে অফ ব্রেক৷ চল নন্তু৷'
চল নন্তু৷ গোপাল স্যারের কথা মনে পড়ল, আউট করার মতো বল করতে পারলে আউট করা যাবে, সে একদিনের ম্যাচে হোক বা লম্বা ম্যাচে৷ চেনে না তো আমাকে, গোলমাল করে ফেলতেও পারে, ডেভিডদা ঠিকই বলেছে৷ মনের জোরে গায়ের জোরে তিনটে বল ফেললাম বেশ ভালো জায়গায়৷ ঢোকার মুখে দুটো বল ঠেকাল৷ তিন নম্বর বলটা স্কোয়ার লেগে ঘোরাল এমন জায়গায়, যেখানে কোনো লোক নেই৷ বাউন্ডারি৷ বলটা, সত্যি বলছি, বেশ ভালো ছিল৷ ডেভিডদা পিঠে হাত রেখে বলল, ঘাবড়াস না, এটাই দিয়ে যা, হয়ে যেতে পারে৷ এতটা ভণিতা করলাম বলে নিশ্চয় বুঝে ফেলেছেন, পরের বলটায় কিছু ঘটতে চলেছে৷ কিছুই ঘটল না৷ বাকি ওভারটা দেখেশুনে ঠেকিয়ে গেল৷ এমনি এমনি ইন্ডিয়া খেলছে? সঞ্জীব সান্যাল এল উলটো দিক থেকে, ওভারে মাত্র একটা রান৷ আমার সামনে প্রহরাজ৷ যথেষ্ট পেটাতে পারে৷ এবং পেটাতে গেল৷ এবং প্রথম বলটাতেই গোলমাল হয়ে গেল৷ ব্যাটের কোণায় লেগে উঁচু ক্যাচ, অনেক উঁচু, অনেক পেছনে, প্রায় পঁচিশ মিটার দৌড়ে দুর্দান্ত ক্যাচ দীপ দাশগুপ্তর৷ দৌড়ে ব্যাটিং এন্ডে এসে গেছে শিবসুন্দর দাস৷ কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, কথা হল, পরের বলেই শিবসুন্দর দাস বোল্ড৷ ওড়িশা চার উইকেটে ১৪৫৷ ডেভিডদার দুর্দান্ত ক্যাপ্টেন্সি৷ আমাকে তিন ওভারও দিল না৷ দু-জন নতুন ব্যাটসম্যান, দু-দিকে জোরে বোলার এসে গেল, রণদেব আর শিবশঙ্কর, শিবশঙ্কর পাল৷ দ্বিতীয় দিনের শেষে ওড়িশা ৭ উইকেটে ১৯৩৷ বাকি তিন উইকেটে বাকি ১২০-১২১ রান করা কঠিন৷ তিন দিনের ম্যাচ, যা হওয়ার ফার্স্ট ইনিংসেই হবে৷ শেষ দিনে একটু লড়ল ওড়িশা, হীরেন ধল মারকাটারি ৪৩ করল, ওকে চিনি, কলকাতা লিগে সালকিয়া ফ্রেন্ডসের হয়ে খেলতে আসে৷ চমৎকার খেলে গেল৷ কিন্তু ওড়িশা অল আউট ২৫২৷ আমরা জিতে গেছি৷ পেয়েই গেছি পঙ্কজ রায় কাপ৷ গড়াতে গড়াতে খেলা শেষ৷ ফার্স্ট ইনিংস লিডেই বাংলা চ্যাম্পিয়ন৷ উৎপল চ্যাটার্জির হাতে যখন ট্রফি, ইডেনে কম করে দশ হাজার দর্শক৷ ম্যান অফ দ্য ম্যাচ? ২ ওভারে ২ উইকেট, ৮২ রান, তিনটে ক্যাচ৷ বেশ বড়ো কাপ আমার হাতে তুলে দিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বেশ বড়ো, বড়দার বাড়িতে যেমন আছে-তেমন৷ টাকা-ফাকার ব্যাপার নেই৷ দশ হাজার দর্শকের হাততালি, হইহই৷ চাপড়ানিতে পিঠে ব্যথা৷ সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অভিনন্দন উৎপল চ্যাটার্জির৷ ক্যাপ্টেন৷ ডেভিডদা বলল, 'পারিস তো!'
বাড়িতে ঢুকেই কাপটা তুলে দিলাম মা-র হাতে৷ বড়দার পাওয়া কাপগুলোর মতোই বড়ো৷ বাবার হাসির মাপটাও যেন একটু বড়ো৷ 'খেতে দাও' তো বলতে হয় না, খেতে বসে গেলাম৷ বড়দার ফোন, 'কীরে, কত টাকা পেলি আজ? টিভির খবরে দেখলাম, কাপটা বড়ো, তাতেই বা কী এসে যায়? এত দর্শক তোকে ভালোবাসল, বাংলার হয়ে একটা বড়ো ম্যাচ জিতে দিলি, এর চেয়ে বড়ো কিছু হয়? . . . বেশ, বেশ, শুনে ভালো লাগছে, উৎপল চ্যাটার্জি তোকে বলল যে, পারিস, এর চেয়ে বড়ো কিছু হয়? এর পরেও না পারলে তোকে ক্রিকেটার বলা যাবে নন্তু?'
শারদীয়া ১৪০৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন