অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

'কী বললেন সুলতান, আপনি এই দিন-দুনিয়ার নতুন পয়গম্বর হতে চান? নতুন ধর্মের প্রচারক হবেন আপনি?' আলাউদ্দিনের সামনে বসে প্রশ্ন করলেন কাজি আলা-উল-মালিক৷ এ সময়ের হিন্দুস্তানের সবচেয়ে জ্ঞানী এবং শ্রদ্ধেয় মানুষ৷

'কেন কাজিসাহেব, আমি কি যোগ্য নই?' সুলতান আলাউদ্দিন সুরার পাত্রে চুমুক দিয়ে বললেন, 'একমাত্র আপনিই পারেন আমার এ স্বপ্ন পূরণ করতে৷ আপনি যদি আমার প্রজাদের সামনে ঘোষণা করেন . . .৷'

কাছেই বসেছিল মালিক কাফুর, সুলতানের প্রধান পার্শ্বচর এবং সেনাপতি৷ সে বলল- 'মনে করুন কাজিসাহেব, কাফেররাও মনে করে, রাজা সুলতানরা ঈশ্বরেরই প্রতিনিধি, তাই যদি হবে . . .'

কাফুর কথাটা শেষ করার আগেই তাকে হাত তুলে নীরবে নিরস্ত করলেন কাজি আলা-উল-মালিক৷ সারা দেশ তাঁর পাণ্ডিত্যকে শ্রদ্ধা জানায়৷ আর সে কারণেই আজ দিল্লি সুলতান আলাউদ্দিন তাঁকে এই দরবার-ই-খাশে আমন্ত্রণ করে এনে কাজিসাহেবের সাহায্য চেয়েছেন৷

কাফুরকে কিন্তু থামানো যায় না, গদগদ কন্ঠে সে বলতেই থাকে-'এই সঙ্গে আমাদের আর একটা নিবেদন আছে কাজিসাহেব৷ এ আমাদের সবার দাবি৷ আমাদের আলা হজরত সুলতানকে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ঘোষণা করা হোক৷'

'দ্বিতীয় আলেকজান্ডার?' বিস্মিত প্রশ্নটা যেন ছিটকেই বেরিয়ে আসে কাজিসাহেবের প্রশ্ন থেকে৷

'হ্যাঁ হুজুর, মনে করুন আমাদের দিগ্বিজয়ী সুলতান ইতিমধ্যে প্রায় সারা হিন্দুস্তান জয় করে ফেলেছেন৷ খুব শিগগির দুনিয়া জয় করতেও বেরোবেন, হিন্দুস্তানের অন্য কোনো সুলতান আজ পর্যন্ত যা পারেননি . . .৷'

হ্যাঁ, একথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়! কথাটা ভাবতেই একটা তীব্র ঘৃণা যেন কাজী আলা-উল-মালিকের বুকের মধ্যে ঠেলে ওঠে৷

আজ সারা হিন্দুস্তানের মাটি ভিজে আছে রক্তস্রোতে৷ মাটি খুঁড়লেই উঠে আসছে দুর্গন্ধযুক্ত পচা লাশ৷ বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় স্বজনহারা অসহায় মানুষের কান্না৷ বনাঞ্চল থেকে হিংস্র শ্বাপদকুল বেরিয়ে আসছে লোকালয়ের মধ্যে৷ মাটি খুঁড়ে প্রকাশ্যে খুবলে খাচ্ছে মানুষের পচা শরীর৷

ভারত ইতিহাসে সময়টা ত্রয়োদশ শতাব্দী৷ সেদিন দিল্লির মসনদে ছিলেন আফগানবংশীয় সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি৷ তখন তিনি বয়সে বৃদ্ধ৷ স্বভাবে সাদাসরল মানুষ৷ নিজের দুই পুত্র আরকালি আর রুকনউদ্দিনের চেয়েও সুলতানের প্রিয় ভাইপো আলাউদ্দিন৷ সেদিন আলাউদ্দিন ছিল প্রকৃতই সুলতানের আলালের ঘরের দুলাল৷ তার বায়নার শেষ নেই৷ তবে হ্যাঁ, এই ভাইপোটি কর্মঠ, দক্ষ যোদ্ধাও বটে৷ সেই সঙ্গে প্রচণ্ড উচ্চাকাঙ্খী৷ তা সুলতান জালালুদ্দিন ভাইপোর সব বায়নাই মিটিয়ে চলতেন৷ তবে একটা মিটলে আবার নতুন বায়না৷ আর এ ব্যাপারে তার প্রধান পরামর্শদাতা মালিক কাফুর৷ একসময় সুলতানই এক দাস বাজার থেকে এই তরুণ দাসটিকে কিনে ভাইপোকে উপহার দিয়েছিলেন৷ কে জানে, কী জাদুতে প্রথম দিন থেকেই এই ক্রীতদাসটি আলাউদ্দিনকে বশ করেছে৷ এখন তো তার পরামর্শ ছাড়া একপাও নড়ে না আলাউদ্দিন৷

দিনে দিনে আলাউদ্দিনের এই বোলবোলাও কিন্তু জালালুদ্দিনের প্রধান বেগম মালিকা জাহান গোড়া থেকেই পছন্দ করতেন না৷ বারবার তিনি তাঁর স্বামীকে সতর্ক করেছেন- 'সুলতান, আপনি কিন্তু নিজের দুই ছেলে থাকতেও ভাইপোকে বড্ড বেশি মাথায় তুলছেন৷ এজন্য একদিন হয়তো আপনার মাথার তাজটাই . . .৷'

'না, না, এ তুমি কী বলছ মালিকা৷' বৃদ্ধ সুলতান প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছেন৷ 'আলাউদ্দিনের ক্ষমতাটাও দেখ, সারা হিন্দুস্তানে একটার পর একটা জং ফতে করে আমার রাজ্যের সীমানা বাড়িয়েই চলেছে৷'

'সুলতান আপনি স্নেহে অন্ধ, তাই বুঝতে পারছেন না৷ আলাল আপনার জন্যে লড়ছে না৷ লড়ছে ভবিষ্যতে নিজের ফায়দার জন্য৷'

এবার জালালউদ্দিন একটু গম্ভীর হন৷ নিজের পাকা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন-'তোমার আশঙ্কার কারণ বুঝতে পারছি মালিকা৷ ঠিক আছে, এর বিহিত আমি করব৷'

কী বিহিত করলেন সুলতান? নিজের এক মেয়ের সঙ্গে ভাইপো আলাউদ্দিনের বিয়ে দিয়েছিলেন৷ ইসলাম ধর্মে এ বিবাহে বাধা নেই৷ সরল ভালো মানুষ সুলতান ভাবলেন এভাবেই তিনি ভাইপোকে আরও নিবিড় বন্ধনে বেঁধে বেগমকে আশঙ্কামুক্ত করতে পারলেন৷ কিন্তু বাঘ যে ততদিনে সত্যিই রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে৷ সে রক্ত ক্ষমতার৷

আলাউদ্দিন বিয়ের পরই তার বেগমকে নিয়ে চলে গেল কারায়৷ এলাহাবাদের কাছে যমুনার তীরে এক বিশাল কেল্লায় বাস করে সে তার হুকুমত চালাতে শুরু করল৷ মালিক কাফুর এখন তার ক্রীতদাস নয়, প্রিয় পার্শ্বচর, সেনাপতি৷ সে নিয়মিত আলাউদ্দিনের কানে বিষ মন্ত্রণা দিয়ে চলেছে৷

ইতিমধ্যে অবশ্য আলাউদ্দিন তার রাজ্য জয়ের ভেলকিও দেখিয়ে চলল৷ সুলতানি সেনার নেতৃত্ব দিয়ে একে একে জয় করল মালোয়া, ভিলসা, দেবগিরি৷ শুধু দেবগিরি জয় করে সে লুঠ করল পঞ্চাশ মন সোনা, সাত মন মুক্তো, চল্লিশটা হাতি আর কয়েক হাজার ঘোড়া৷

দূতের মুখে একথা শুনে বৃদ্ধ সুলতান জালালুদ্দিন আনন্দেই আটখানা৷ বললেন- 'আলাল আমার গর্ব, আমি নিজে যাব কারায় তাকে অভিবাদন জানাতে৷'

সেখানে অপেক্ষা করছিল আলাউদ্দিনের আর এক ভেলকি৷ বেগম মালিকা জাহান কিন্তু পইপই করে বারণ করলেন৷ গুপ্তচরের মুখে তিনি তাঁর এই ভাইপো-জামাইটির মতিগতির যে খবর পাচ্ছেন তা মোটেই ভালো নয়৷

জালালুদ্দিন বেগম মালিকা বা অন্য কোনো হিতাকাঙ্খীর পরামর্শকে পাত্তাই দিলেন না৷

কিন্তু রাজনীতিতে অন্ধ বিশ্বাস আর স্নেহের বুঝি সত্যি কোনো স্থান নেই৷ আলাউদ্দিনও সেই সুযোগটাই নিল৷ এ ব্যাপারে তার দোসর এবং প্রধান পরামর্শদাতা অবশ্যই মালিক কাফুর৷

দিল্লি থেকে যাত্রা শুরু করে ১২৯৬ সালের ১৯ জুলাই তারিখে সুলতান জালালুদ্দিন খিলজির বজরা এসে হাজির হল এলাহাবাদের গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গমে৷ এ মহা পবিত্র স্থানে সুলতানকে অভ্যর্থনা করার জন্যে অপেক্ষা করছিল ভাইপো আলালের বজরা৷ সুলতানের বজরা এগিয়ে আসতে দেখে আলাউদ্দিন তার বজরায় দাঁড়িয়ে বার বার কুর্নিশ করে কাকা সুলতানকে নিজের বজরায় আমন্ত্রণ জানাল৷

জালালুদ্দিন ভাইপোকে দেখে এতই অভিভূত হলেন যে তাঁর প্রিয় দেহরক্ষী আদম খাঁকে পর্যন্ত সঙ্গে না নিয়ে ভাইপোর বজরায় গিয়ে উঠলেন৷

সেখানে বজরার মধ্যে ভাইপো বৃদ্ধ সুলতানের মনোরঞ্জনের জন্য হরেক ব্যবস্থাই করে রেখেছিল৷ উত্তম সুরা, নর্তকী, সংগীত . . . জালালুদ্দিন ভাইপোকে পাশে নিয়ে ফুর্তিতে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন সারা রাত ধরে৷

এদিকে বজরা ছুটে চলেছে কোনো অনির্দিষ্ট পথে৷

এরপর যখন রাত শেষ হয়ে এল, নর্তকীরা পায়ের ঘুঙুর বাজাতে বাজাতে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল, গায়িকার কন্ঠ স্তব্ধ হল৷ সুলতান জালালুদ্দিন সুরার নেশায় এলিয়ে পড়লেন সুখাসনে . . .৷ পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল মালিক কাফুর, তার দু-চোখে হিংস্র দৃষ্টি, হাতে চকচকে ধারালো ছুরি৷ সে ছুরি আমূল বিদ্ধ করল সুলতানের বক্ষ পিঞ্জরে৷ ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল৷ সে রক্ত বজরা থেকে চুঁইয়ে গিয়ে মিশে গেল পবিত্র গঙ্গার জলে৷ জেগে ওঠার আগেই চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন সুলতান৷

Cov202

এবার আলাউদ্দিন বজরার কক্ষে ঢুকে মালিক কাফুরের দিকে তাকিয়ে বলল-'শাবাশ! বহুৎ খুব৷'

মালিক কাফুর সোৎসাহে উচ্চ কন্ঠে প্রভুর জয়ধ্বনি করল-'সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি জিন্দাবাদ৷'

অলক্ষ্যে হাসল মহাকাল!

কিন্তু তখনও তো শুরু৷ বেগম মালিকা জাহান তাঁর সুলতান স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে সাত-তাড়াতাড়ি ছোটো ছেলে রুকনউদ্দিনকে দিল্লির মসনদে বসিয়ে দিয়েছিলেন৷ বড়ো ছেলে আরকালি অবশ্য সুফিসন্ত ধরনের মানুষ৷ এসব রাজনীতির হানাহানি তার ধাতে সয় না৷ তাই আল্লার নাম জপতে জপতে সে মুলতানে চলে গেল৷ সেখানে সাধন ভজনেই দিন কাটাবে এই বাসনায়৷

কিন্তু তাতে কি সব দিক রক্ষা হল?

বাঘ যখন তাজা রক্তের স্বাদ পেয়েছে, দিল্লির তাজ মাথায় না তোলা পর্যন্ত তার শান্তি কোথায়?

খুব শিগগির আলাউদ্দিন তার বিশাল ফৌজ নিয়ে দিল্লি আক্রমণ করল৷ মালিকা জাহান বুঝলেন এই রক্তলোভী হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে তিনি পেরে উঠবেন না৷ সুতরাং দিল্লির মসনদ ছেড়ে ছোটো ছেলে রুকনউদ্দিনকে নিয়ে চলে গেলেন বড়ো ছেলে আরকালির কাছে, তার মুলতানের আশ্রমে৷

কিন্তু আলাউদ্দিন পিছু ছাড়ল না৷ প্রয়াত সুলতানের বংশধর বেঁচে থাকতে সে নিশ্চিন্ত হতে পারল না৷ তার হুকুমে ছোটো ভাই উলুঘ খাঁ সৈন্য নিয়ে ছুটে গেল মুলতানে৷

আরকালি তখন সবেমাত্র দিনের নামাজ শেষ করেছে, আলাউদ্দিনের সেনাদল ঘিরে ফেলল আরকালির আশ্রম৷ তারপর আর দেরি না করে উলুঘ খাঁ নিজে সেই আশ্রম থেকে টেনে বার করে নিয়ে এল প্রয়াত সুলতানের বেগম আর দুই ছেলেকে৷ হিংস্র উল্লাসে তাদের অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হল৷

এ সংবাদ নিয়ে উলুঘ খাঁ যখন দিল্লি ফিরল, নতুন সুলতান আলাউদ্দিন ভাইয়ের পিঠ চাপড়ে বলল-'শাবাশ ভাইজান৷ আর আমার কোনো পথের কাঁটা রইল না৷'

এবারও অলক্ষ্যে হাসল মহাকাল৷

এরপর শুধু সেনা অভিযান৷ সারা হিন্দুস্তান জুড়ে বইতে লাগল রক্তস্রোত৷ একের পর এক শত্রুর দুর্গের পতন ঘটতে লাগল-গুজরাট, রণথম্ভোর, চিতোর, মালোয়া . . . এমনকী সুদূর দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত হল আলাউদ্দিনের রাজ্যসীমা৷

এ সময়ই একদিন তার প্রিয় সেনাপতি মালিক কাফুর আলাউদ্দিনকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল- 'আল্লা হজরত, আমার একটা আবেদন আছে আপনার কাছে৷'

'কী আবেদন, বলো কাফুর?' পানপাত্রটা ঠোঁটের কাছে তুলে প্রশ্ন করেছিল আলাউদ্দিন৷

'শুনেছি কাফেররা তাদের রাজা-মহারাজকে বলে ঈশ্বরের প্রতিনিধি৷'

'বেশখ! আমি সুলতান, আমিও তো পয়গম্বরের দূত,' আলাউদ্দিন জড়িত কন্ঠে বলল৷

'তাহলে হুজুর আপনি পয়গম্বরের মতো একটা নতুন ধর্ম প্রচার করুন না কেন?'

'নতুন ধর্ম!'

'হাঁ হজরত৷ মনে করুন আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রজাকে সে ধর্ম গ্রহণ করতে হবে৷ আপনি হবেন দুনিয়ার নতুন পয়গম্বর৷'

'আঁ!' মালিক কাফুরের প্রস্তাবটা শুনে প্রথমটা একটু বুঝি-বা বিষম খেয়েছিল আলাউদ্দিন৷ তারপর ভেবে দেখল মতলবটা মন্দ নয়৷

'আর জাঁহাপনা, এই সঙ্গে আপনি নিজেকে দ্বিতীয় আলেকজান্ডারও ঘোষণা করে দিন৷'

'আলেকজান্ডার! সে আবার কে হে?'

মালিক কাফুর দাস ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ার আগে এককালে পাঞ্জাব অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল৷ সেখানে সে দিগ্বিজয়ী গ্রিক আলেকজান্ডারের কাহিনি শুনেছিল৷ সারা বিশ্বজয়ের চমকপ্রদ সে সব ঘটনার কথা এতযুগ বাদেও সেখানকার মানুষ মনে রেখেছে৷ মালিক কাফুর সে সব গল্প শোনাল আলাউদ্দিনকে৷ তারপর বলল-'সুলতান হজরত, আলেকজান্ডারের চেয়ে আপনার কৃতিত্বও কি কম কিছু? সারা হিন্দুস্তান আপনি জয় করেছেন৷ আপনার আগে অন্য কোনো সুলতান কি . . .৷'

'দাঁড়াও, দাঁড়াও হে৷' সুরার পাত্রটা ঠক করে নামিয়ে রেখে আলাউদ্দিন বলল-'তোমার সব কথা সত্যি কাফুর৷ কিন্তু এসব ঘোষণা তুমি বা আমি করলে হবে না৷ এমন একজনকে চাই, যার কথা বিশ্বাস করবে সারা হিন্দুস্তানের মানুষ৷ এ কাজটা তো শুধু তলোয়ার ধরে হবে না হে . . . বলো, আছে কেউ এমন মানুষ, যে আমায় সাহায্য করতে পারে?'

'আছে জনাব৷' একটু ভেবে মালিক কাফুর বলল-'কাজি আলা-উল-মুলুক৷ লোকটার শুধু দিল্লি নয় সারা হিন্দুস্তানে খুব প্রভাব সৎ আর জ্ঞানী মানুষ হিসাবে৷ তার ভাইপো জিয়া বারনি একজন নামকরা ঐতিহাসিক৷'

'হ্যাঁ, এই লোককেই আমার চাই৷ কখনো কখনো কলম তলোয়ারের চেয়েও বেশি ধারালো হয়ে ওঠে৷ কাফুর, তুমি আজই নিজে যাও৷ কাজিসাহেবকে আমার 'পয়গামভেজ'৷ আমন্ত্রণ করে আনো আমার কাছে৷'

'জি হজরত৷'

'কী হল কাজিসাহেব, কিছু বলছেন না যে?'

কাজি আলা-উল-মালিকের চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল৷ এতক্ষণ তিনি এই সুলতানের সামনে বসে ভাবছিলেন এর যাবতীয় কীর্তির কথা৷ ভাবতে ভাবতে মনের ভেতরটা বিরূপ হয়ে উঠছিল৷ কী স্পর্ধা! শুধু নিষ্ঠুরতা আর ক্ষমতার দম্ভে সুলতান ঈশ্বরের আসনে বসতে চায়!

'কাজি সাহেব কিছু বলুন৷ আলা হজরত আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন৷'

এবার মালিক কাফুর বলল-'সুলতানকে পয়গম্বর ঘোষণার দায়িত্ব তো আপনাকেই নিতে হবে৷'

'হ্যাঁ, সে দায়িত্ব আমি নিতে পারি৷' কাজি আলা-উল-মালিক বললেন-'কিন্তু এজন্যে প্রথমেই সুলতানকে একটা কাজ করতে হবে৷ অভয় দেন তো বলি৷'

'হ্যাঁ, নির্ভয়ে বলুন৷'

'আপনাকে মসনদ ত্যাগ করতে হবে সুলতান৷ কারণ পৃথিবীর কোনো ধর্মপ্রচারক বা পয়গম্বর কোনোদিন মসনদে বসেননি৷'

শুনে চমকে উঠল আলাউদ্দিন৷ ফিরে তাকাল মালিক কাফুরের দিকে৷

মালিক কাফুর শশব্যস্তে বলল-'না, না৷ সুলতানের পক্ষে মসনদ ত্যাগ করা সম্ভব নয়৷'

'তাহলে উনি পয়গম্বর হবেন কী করে?'

'দরকার নেই তবে পয়গম্বর হয়ে৷' আলাউদ্দিন বলে, 'কিন্তু দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তো হতে পারি? খুব শিগগির আমি তার মতো দুনিয়া জয় করতে বেরোব৷'

'কিন্তু কার ভরসায় সুলতান?' আলাউদ্দিনের কথা শেষ হবার আগেই কাজি আলা-উল-মুলুক বললেন৷

'তার মানে?'

'তার মানে, আলেকজান্ডারের এক শিক্ষাগুরু ছিলেন৷ তাঁর নাম অ্যারিস্টটল৷ গ্রিস দেশের সেরা পণ্ডিত৷ অত্যন্ত সৎ এবং বুদ্ধিমান মানুষটি ছিলেন একাধারে আলেকজান্ডারের প্রধান মন্ত্রী এবং পরম ভরসাপাত্র৷ আলেকজান্ডার তাঁর হাতেই রাজ্য এবং সিংহাসনের সব দায়িত্ব ছেড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশ্বজয়ে বেরোতে পেরেছিলেন৷ সুলতান, আপনি কি কারও ওপর এমন ভরসা করতে পারবেন?'

আলাউদ্দিন মাথা নীচু করলেন-না, এমন কোনো বিশ্বাসী মানুষ তার কাছে নেই৷ কারণ বিশ্বাসের মর্যাদা সে নিজেই কোনোদিন রাখেনি৷ কাজি আলা-উল-মুলুক বুঝলেন তার মনের কথা৷ নিঃশব্দে শুধু হাসলেন৷

আলাউদ্দিনের দ্বিতীয় আলেকজান্ডার আর হয়ে ওঠা হল না৷ তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে সুলতান তার মুদ্রায় এক নতুন খেতাব নিজেই মুদ্রিত করল, 'দ্বিতীয় সেকেন্দার শাহ'৷

আলাউদ্দিনের শেষ পরিণতিও হয়েছিল ইতিহাসের অনিবার্য রায় মেনেই৷ যে ভাবে এই সুলতান তার কাকা জালালউদ্দিনকে তাঁর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে হত্যা করে মসনদ দখল করেছিল, ঠিক তেমনই তার প্রিয় পার্শ্বচর মালিক কাফুর একদিন তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে দিল্লির মসনদ কেড়ে নিয়েছিল৷

সেদিনও আর একবার অলক্ষ্যে হেসেছিল মহাকাল!

শারদীয়া ১৪১৯

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%