অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
'জয়রাম, ও জয়রাম . . .'
'বলেন কী বেপার . . .'
'জয়রাম, আমাদের দরজার ছিটকিনিটা ঢিলে হয়ে গেছে!'
'আসছি আমি . . .'
'জয়রাম, নোটিশ বোর্ডটাও টাঙাতে হবে বাইরের দেওয়ালে!'
'দাঁড়ান, আসছি . . .'
জয়রাম হনহন করে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে গেল, রোদের মধ্যে, তার হাতে দেড়ফুট তার৷
জেনারেটার রুমে কারিগর দাঁড়িয়ে আছে, জয়রাম এলে বিজলি বাতির ছেঁড়া কানেকশন জুড়ে দেবে৷
জয়রামের মুখখানি গোল, দু-টি চোখ সবসময়েই বিস্ময়ে বড়ো হয়ে আছে, বড়ো কপাল, চ্যাপটা নাকের নীচে পুরু গোঁফ৷ গায়ে সারাবছর নীল শার্ট, নীল ফুলপ্যান্ট৷ যেভাবে হাত দুলিয়ে বেরিয়ে গেল জয়রাম, তাতে মনে হল, সে কিছুই শোনেনি, এবং ফিরেও আসবে না শিগগির৷ পৃথিবী জুড়ে শয়ে শয়ে লোক নানা দিক থেকে জয়রামকে ডাকছে৷ এবং জয়রাম তাদের কাউকেই 'না' বলছে না৷ কাজেই, পরদিন সকালে যখন একতলার করিডরে আবার জয়রামের সঙ্গে দেখা হল, তখন প্রথমেই বললাম, 'জয়রাম, ছিটকিনিটা আজ টাইট না করে কিন্তু . . .' জয়রাম জুতো রাখার মস্ত র্যাকের একটা দিক পালিশ করছিল, আমার দিকে চোখ গোল করে তাকিয়ে রইল৷
'উপরে গেছলেন আপনি?'
'না এখনও যাইনি, এবার যাব৷'
'তাহলে, আগে উপরে যান, তারপর কথা বলব-'
সকাল দশটা৷ তিনতলায় গিয়ে দেখি ঝকঝকে নতুন নোটিশ বোর্ড টাঙানো হয়ে গেছে, ছিটকিনিটাও দিব্যি টাইট৷
জয়রাম নিশ্চয়ই গতকাল ঘোর সন্ধ্যে বেলা ফিরে এসেছিল, অথবা আজ সকালে৷ কাজ সেরে না ফেললে তার নিশ্চিন্তি নেই৷ ইতিমধ্যে ও আবার উঠে এসেছে, পকেটে রাখা ছোট্ট হাতুড়ি বার করে নোটিশ বোর্ডের কোনায় মারছে ঠক ঠকাং . . .
ভুরু দুটো কুঁচকে রয়েছে . . .
'কী করছ কী, জয়রাম, নতুন বোর্ড . . .'
'কোনায় প্রেক (পেরেক) উঠে রয়েছে একটা, সমান করে দিচ্ছি-কারও হাতে লেগে গেলে তখন তো বলবেন জয়রাম এটা কীরকম কাজ করল . . .'
'তা তো বটেই৷'
'ভালো গামার কাঠ দিইছি, ভেলবেট কিনেছি চাঁদনি থেকে৷ কোনায় কোনায় বিট দিইছি . . . এবার পঁচিশ-ত্রিশ বছর মজাসে চলে যাবে . . .'
'একটু ভারী হয়ে গেল না কি, নোটিশ বোর্ড হিসেবে . . .'
'হালকা কাজ তো হামিও করতে পারি, পাঁচ-ছ বরসের মধ্যে ভেঙেচুরে যাবে . . . তখন তো জয়রামের বদনাম হয়ে যাবে . . .'
জয়রাম কোনো কাজই অল্পদিন টেকার জন্য করে না . . . তার কাজ মানেই পঁচিশ-ত্রিশ বছর . . . অথবা পচাস-ষাট বছর আর বদনাম হবে এমন কোনো কাজ সে হাতেই নেবে না . . .৷ তবু হাজার রকম ফন্দি-ফিকির জানে বলে সবাই তাকে ডাকাডাকি করে৷ আর ওই সব ছোটোখাটো কাজে জয়রাম কখনো না বলে না৷ কাজেই নীল শার্ট-নীল প্যান্ট সারাদিন এখানে ওখানে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে৷ পকেটে হাতুড়ি, চকখড়ি, ছোটো তার, বাটালি, লাট্টুর সুতো . . .
'জয়রাম, দেখ তো দেওয়াল ঘড়িটা চলছে না কেন . . .'
'জয়রাম, যামিনী রায়ের প্রিন্টটা টাঙাতে হবে . . .'
'কাচে কালো ফিলম না লাগালে কিন্তু গরমে বসা মুশকিল হবে এবার . . .'
জয়রাম কাউকে তক্ষুনি সমাধান বাতলে দেয়, কাউকে বলে-'চাঁদনি যেতে হবে . . . মাল না আনলে কী করে করব হামি . . .' তার আসল কাজ যেখানে, সেখানে সে একটা মস্ত বট গাছের মতনই অনড় . . . যদিও গাছেদের নাম্বার ওয়ান দুশমনই বলা যায় তাকে৷ জয়রাম আসলে ছুতোর৷ তার জাতব্যাবসা কাঠের কাজের৷ কিন্তু এত চটপটে আর সমাধান-প্রিয় জয়রাম যে, মেরামতি ডিজাইন কাচ কাঠ লোহা চুন সুরকি যেকোনো মালমশলা দিয়ে তাকে মাতিয়ে দেওয়া যায় . . .
শহরের এদিকটায় বসন্ত আসে অনেক বেশি টগবগিয়ে৷ শীতও অবশ্য পড়ে জাঁক করে৷ সন্ধ্যের পর বেরোতে গেলে পৌষ-মাঘে মনে হয় নাকের ডগা জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে৷ শীত ফুরোনো-গরম না পড়া দিনগুলো কাটে দিব্যি মৌরসি পাট্টায়৷ প্রথমে তো ফুটে ওঠে নানারঙের গাঁদা, ডালিয়া, জিনিয়া ও প্রজাপতির মতো দেখতে সব বিলিতি ফুল যাদের গালভরা নাম মালিরা জিভেই আনতে পারে না৷ এরপর আসে সূর্যমুখী ফুলেরা; তারা সূর্যের দিকে আহ্লাদি গাল ফিরিয়ে হাসাহাসি করে সারাদিন৷ তেঁতুল, শিরীষ ও গুলমোহরের পাতা হাওয়ায় জড়িয়ে উড়তে থাকে৷ এইরকম একটি দিনে হঠাৎই বাতাস চিরে ডেকে ওঠে বসন্তের কোকিল৷ তার ডাকে হিমঘুম ছেড়ে সাপেরা আড়ামোড়া ভাঙে৷ কু-উ-কু-হু-উ . . . কোকিল ডাকে৷ তার ডাকে অন্য সব গাছ থেকে কোকিলদের ডাকাডাকি আরম্ভ হয়ে যায়৷ তারপর পর্দা চড়তে থাকে সুরের, হাওয়ায় রোদের তেজ যতই বাড়ে, ততই যেন পাগলা হয়ে ওঠে কোকিলরা, তাদের ডাক হয়ে যায় হুংকার কিংবা হাহাকারের মতন . . . যে শোনে তারই কষ্ট হয় বড্ড৷
ওই সব ডাকাডাকির সময় জয়রামকে দেখা যাবে কখনো-সখনো ঘাড় কাত করে ছায়ায় দাঁড়িয়ে৷ ও কি জানে যত গাছ আছে এ তল্লাটে সবাই নিজেদের জয়রামের শত্তুর বলে জানে? শিরীষ, আম, জাম, বকুল . . . এরা কেউ দু-চক্ষে দেখতে পারে না জয়রাম ছুতোরকে৷ জয়রামের বয়স এখন পঞ্চান্ন৷ গত তিরিশ বছরে যত টেবিল চেয়ার আলমারি সিন্দুক দরজা জানালার ফ্রেম আর পার্টিশন তৈরি করেছে জয়রাম, তাতে কত যে নিরীহ গাছের গুঁড়ি ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে করাতে চেরা হয়েছে ভাবতে শিউরে ওঠে গাছেরা৷ এই বাড়ি ও বাগানের চৌহদ্দিতে দাঁড়িয়ে তারা অনবরত ফিসফিসিয়ে জয়রামকে শাপশাপান্ত করে৷
জয়রাম অবশ্য সে শাপমন্যি শুনতে পায় না৷ শুনতে পায় মোতি কুকুর, যে এই বড়ো বাড়িটার চৌহদ্দিতে ছানাপোনা নিয়ে থাকে৷ হাওয়া বইলে এবং সে হাওয়ায় গাছেদের ফিসফাস ভেসে এলে মোতি কট কট করে মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে, আর জয়রামের দিকে মুখ তুলে হুঁউ হুঁউ করে ডাকে৷ জয়রাম কিছু বোঝে না৷ ততক্ষণে গোটানো মাপের ফিতে দিয়ে তার লম্বা বারান্দার লম্বাই-চওড়াই মাপা হয়ে গেছে৷ ছোটো পেনসিল দিয়ে সে কাগজে মাপের হিসেব কিতেব লিখতে লেগেছে৷ দাঁড়িয়ে, বসে, হাঁটতে হাঁটতে, যেকোনো সময় জয়রাম কাজ করতে থাকে৷ গাছেদের শাপশাপান্ত শুনতে পেলেও জয়রাম বলত, হামি কী করব? হামি কাঠ না কাটলে দুসরা কেউ কাজ করত; সে যদি আচ্ছা কার্পেন্টার না হত, তবে গাছেদের আরও বেশি কষ্ট হত৷ 'গাছ মরল, কাম ভি ভালো বনল না . . .৷'
মোতি জয়রামকে বেশ পছন্দ করে৷ নতুন তৈরি করা বারান্দার এক কোণে সে দিব্যি ছিল, তার ছোট্ট ছোট্ট তিনটি ছানা হয়েছে তখন৷ এমন সময় অর্ডার হল ওখানে নতুন পার্টিশন হবে৷ জানালায় এসি মেশিন বসবে৷ খ্যাঁস খ্যাঁস কাঠ চেরার শব্দে, কাঠের গুঁড়ো আর রঙের গন্ধে সদ্য-জন্মানো বাচ্চারা অতিষ্ঠ৷ জয়রাম সেটা লক্ষ করেছিল, অন্য কেউ না করলেও৷ দেখা গেল ওরই মধ্যে সে বাড়তি কাঠ, পেরেক, বাঁশের টুকরো এইসব জুড়ে মোতির জন্য একটা থাকার ঘর বানিয়ে ফেলেছে৷ গুলমোহরের নীচে দিব্যি বাড়ি, জলখাবার কাঠের গামলা, খাবার রাখার বাঁশের প্লেট৷
মোতি খুব খুশি৷ জয়রামকে দেখলেই সে প্রথমে একছুটে এসে 'ভু-উ-উ' করে ডেকে নেয়৷ পরপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে, শেষে, জয়রামের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বালিভরা মাটিতে কুণ্ডলি পাকিয়ে একটু শুয়ে নেয়৷
আমরা যখন বললাম, 'বাঃ, জয়রাম, দারুণ কাজ করেছ একখানা . . .' তখনও জয়রামের মুখে কোনো বদল দেখা গেল না৷ জয়রাম একটা স্ক্রর মাথা পরিষ্কার করতে করতে বলেছিল, 'তা, ওর ঘরটা নষ্ট করে দিলাম, ওকে একটা জাগা না দিলে কী করে চলবে? ফেমিলি আছে, বাচ্ছারা আছে . . .'
যেকোনো নতুন কাজ আরম্ভ করার সময়টা ভীষণ মুশকিলের-একবার আরম্ভ হলে অবশ্য আর কোনো চিন্তা নেই৷
কারণ, জয়রাম ফাঁকি দেয় না, গল্প করে না, রেডিয়ো শোনে না, সাত বার পানের পিক ফেলতে বাইরে যায় না, কর্মসংস্কৃতি তার মজ্জায় মজ্জায়৷ কিন্তু গোড়াতে-
'ছ-টা আলমারি হবে, জয়রাম, কী কাঠ দেবে ভাবছ-'
'ভালো সিজনড টিক দেবেন . . .'
'সেগুন কাঠের আলমারি, অফিসে . . .'
'তাহলে রোজউড দিন . . .'
'নাহলে শালকাঠেও চলবে . . .'
'অত খরচ করবেন না? তবে স্টিল কিনে নিন না . . .' শেষে যখন আমকাঠে রফা করার চেষ্টা হচ্ছে, জয়রাম হতাশ হয়ে চলেই গেল৷
'ও আমি পারব না . . . ভালো হবে না . . . লোকে দেখে বলবে জয়রাম এটা কী করল? দু-পাঁচ বছরে ভেঙে যাবে . . . বদনাম হবে আমার . . .'
মাঝে মাঝেই জয়রাম নানা রঙের শেড নিয়ে আসবে অ্যাপ্রুভ করাতে, নানা ধরনের সানমাইকা মেলে ধরবে, বলবে, বেছে নিন, পালিশ নিয়ে কথা বলতে আসবে দশ বার . . . যতক্ষণ জিনিস রেডি না হবে জয়রামের সঙ্গে অফিসের কর্তারা খেটে অস্থির৷ জয়রামের বাড়ির লোককে কেউ কখনো দেখেনি৷ মালিও বাড়ি যায়, ওয়াচম্যান শম্ভু সিং ছেলের পইতে দিয়ে ন্যাড়ামাথা ছেলে আর বেণী দোলানো মেয়েকে নিয়ে ফিরল, এসি অপারেটারের বউ মাঝে মাঝেই হলুদ ফুল ফুল শাড়ি পরে লুচি ভাজে দুপুর বেলায়৷ জয়রাম না বাড়ি যায়, না তার বাড়ির লোককে কেউ দেখেছে৷ তা নিয়ে জয়রামের অবশ্য কোনো দুঃখ আছে বলে মনে হয় না৷ কারণ সবার বাড়িতেই তার যাতায়াত, সত্যনারায়ণের সিন্নি থেকে আরম্ভ করে ইদের ফিরনি, সবতাতেই তার বরাদ্দ বাঁধা৷
মস্ত বড়ো এই অফিস বাড়িটা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে জয়রামকে৷ কত কাজ এখানে৷ কোন কাজটা করে-তা নিয়ে জোর হিসেব কিতেব চলতে থাকে, তখন জয়রামই গায়ে পড়ে করে দেয়৷ কাজ করতে কত সময় লাগে? ঝগড়া করতে তার চেয়ে ঢের বেশি সময় বরবাদ- এই হচ্ছে জয়রামের মত৷
কোথাও জলের পাইপ লিক করছে, কোথাও শার্সি ভাঙল ঝড়ে৷ চেয়ারের হাতল ভেঙে ক্যাশিয়ারের জামা ছিঁড়েছে, ক্যাশিয়ার জামা নিয়ে জয়রামের কাছে হাজির৷ 'দেখো, জয়রাম দেখো, পুজোয় নতুন কিনলাম, 'ফাল্গুনী' মিলের কাপড় . . .' দোষটা যেন জয়রামের! মেঝের চটা উঠেছে কোথাও, নতুন ঘড়ি টাঙানো হবে লাইব্রেরিতে, লাইব্রেরিয়ান বেরোবার আগে জয়রামকে ঘড়ি গছিয়ে গেল . . . অফিস যখন চলে তখন ঠক ঠক শব্দ অথবা আসবাব টানাটানি করলে বিরক্ত হয় লোকজন, তাই সবাই বাড়ি যাবার পরও অনেকটা কাজ বাকি থাকে জয়রামের৷
অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে মোড়ের ঠেলাওয়ালার রুটি-সবজি খেয়ে জয়রাম ঘুমোতে যায়৷ যতক্ষণ ফিরে না আসে, মোতি দাঁড়িয়ে থাকে গেটের কাছে৷
অফিসের চৌহদ্দিরই মধ্যে ছোটো ছোটো পাঁচ-ছ-খানি ঘরের একটি কামরা জয়রামের৷ তক্তপোশে বিছানা পেতে সে শোয়৷ সারা ঘরে ছড়ানো থাকে তার কাজের সরঞ্জাম, দড়ি, মোমবাতি, দেশলাই, তার, করাত, কাঠের টুকরো, বার্নিস, কাঁচি, স্ক্র-ড্রাইভার, টেস্টার . . .
সেবার অফিসের হেড হয়ে এলেন ত্রিবিক্রম সিং সান্ধু৷ এর আগে হেড ছিলেন জয়মঙ্গল ভট্টাচার্য, রিটায়ার করেছেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, আদ্যোপান্ত ভালো মানুষ৷ ত্রিবিক্রম সিং এসেই লাফঝাঁপ হম্বিতম্বি করে অফিসের ভোল পালটাতে আরম্ভ করলেন৷ 'অ্যাকটিভ ইয়াং ম্যান' জয়রামের ডাক পড়তে লাগল ঘন ঘন৷ শিগগির সাহেব বুঝলেন, 'ওয়ার্ক কালচার' যাকে বাংলায় বলে 'কর্মসংস্কৃতি' তা আছে এই একটি লোকেরই৷ 'সিন্দুক' পর্বের আরম্ভও এই সময়েই৷ নানারকম দুষ্প্রাপ্য মেশিন পার্টস-এর একটা সংগ্রহ ছিল অফিসে৷ ত্রিবিক্রম সিং বললেন, এর জন্য চাই বড়ো ও মজবুত সিন্দুক৷ ওই সব ফঙ্গবেনে স্টিলের আলমারি কোনো কাজের নয়৷ মুখের কথা খসার যা অপেক্ষা-আর জয়রামকে পায় কে? সাহেব নিজে বলেছেন, শক্ত, বড়োসড়ো, মজবুত . . . ভালো সিজনড সেগুন কাঠ, ঝকঝকে নীল-সবুজ রং, কারুকার্য করা হাতল সব দিয়ে জয়রাম বিস্তর খেটে একখানা সিন্দুক বানিয়ে ফেলল৷ যত সহজে লেখা হল, তত সহজে অবশ্য কাজটা হয়নি৷ এর মধ্যে জয়রাম দশ বার ফরেস্টের কাঠ ডিপো গেছে কাঠ বাছতে, একুশ বার বউবাজার গেছে ভালো মিস্ত্রির খোঁজে, চাঁদনি গেছে তিপ্পান্ন বার, বারবার 'কোটেশন' তৈরি হয়েছে, তিন বার 'অডিট' পার্টি এসে অবজেকশন দিয়েছে, পরিবেশবাদীদের মোর্চা 'জয়রাম গো ব্যাক' 'জয়রাম হায় হায়' লিখে গেছে কম্পাউন্ডওয়ালে৷
ছ-মাস লেগেছে সিন্দুক শেষ হতে৷ ত্রিবিক্রম সিংহ আর জয়রাম দু-জনেই নির্বিকার৷
শেষ হবার খবর পেয়ে সাহেব বলেন, 'সিন্দুকটা তাহলে আনো, এবার দেখা যাক৷' জয়রাম আরও দিন সাতেক নিল পালিশের ফিনিস ও নানা খুঁটিনাটিতে৷ সোমবার, বেলা বারোটায় ঠিক হল সাহেব সিন্দুক ইন্সপেকশন করবেন৷ সেদিন জয়রাম কাচা নীল জামা-প্যান্ট পরে এসেছে, সাহেবের পরনে কোট, নেকটাই, গ্রে ট্রাউজার্স৷ খিদিরপুরের ছ-জন খালাসি এসেছে, বাঁশ দড়ি-দড়া নিয়ে৷ সিন্দুক তুলবে দোতলায়৷
সারা অফিসে ছুটির আমেজ, আমরা চীনেবাদাম মুড়ি খেয়ে কম্পাউন্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কেউ বকছে না, অনেকটা বিশ্বকর্মা পুজোর মেজাজ চারদিকে . . .
বলতে ভুলে গেছি, ফাঁকা জায়গা দরকার বলে জয়রাম সিন্দুকটা বানাচ্ছিল অফিসের গেটের কাছে, যেখানে সিকিউরিটির লোকেরা বসে; গেটটা অফিস বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজের মতো দূর৷ যাই হোক, দড়িদড়া দিয়ে বাঁশের চৌদোলা হল, সিন্দুকটা (দশ ফুট লম্বা, চার ফুট চওড়া, ঘনত্ব সাড়ে তিন ফুট) ধাক্কাধাক্কি দিয়ে টানাটানি করে নানাভাবে দেখা হল-সেটা একচুলও নড়ল না৷ সিন্দুকটা না নড়ায় জয়রামের মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠেছিল, ভাবখানা, এইরকমই তো হওয়া দরকার . . . শক্তপোক্ত জিনিস, পচাস-ষাট বছর টিকবে . .. কিন্তু ঘণ্টা খানেক পর যখন কুলিরা হয়রান হয়ে ঘামতে ঘামতে বসে পড়েছে, জয়রামের ভুরু কুঁচকোনো, মুখ গম্ভীর বিড়বিড় করে কিছু বলছে . . . হয়তো ভাবছে গাছের ভূত তার উপর শোধ তুলল কি না! দিন গড়িয়ে বিকেল হল৷ সাহেবের কাছে খবর গেল, সিন্দুক তোলা যাচ্ছে না৷ সাহেব আশ্চর্য হয়ে নিজেই গেটের কাছে নেমে এলেন, সিকিউরিটির গানম্যান নার্ভাস হয়ে আকাশে গুলি চালায় আর কি . . . আমরা অবাকই হলাম, যখন ত্রিবিক্রম সিং সান্ধু খুব তারিফ করতে লাগলেন সিন্দুকটার, লম্বা চওড়া মজবুতির, তার কাঠের পালিশের, রঙের হাতলের . . .
জিনিসটা নড়ানো যাচ্ছে না দেখে তিনিই সিদ্ধান্ত নিলেন, 'হাউ ডাজ দ্যাট ম্যাটার? টুলসগুলো বরং নিয়ে এসো, ওগুলো নাড়ানো সোজা, এখানেই থাকবে, তালাবন্ধ অবস্থায়৷' তাই হল৷
অনেকদিন পর আমি ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম৷ বছর পঁচিশ কেটে গেছে এর মধ্যে৷ বছর পনেরো আগে আমিই অফিস বদলেছি৷ আমাদের পুরোনো অফিসটার কাজকর্ম কমে যাওয়ায় সেটা ছোটো হয়ে গেছে৷ বাড়িটা এখন বেশ পুরোনো৷ একটা ব্লক ভেঙে নতুন মাল্টিস্টোরিড তোলার কাজ চলছে৷ সিন্দুকটা নিয়ে কৌতূহল ছিল৷ তাই গেটের সামনে দাঁড়ালাম৷ নতুন সিকিউরিটির লোকেরা আমাকে কেউ চেনে না৷ আশ্চর্য সিন্দুকটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে৷ রং আগের মতনই জ্বলজ্বলে, ভালো পালিশ, তালাবন্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে৷ তবে কি জয়রামও আছে? যত্ন নেয় সিন্দুকের?
পাঁচিলের ধারে এত গাছগাছালি আগে ছিল না৷ আমাদের সময়ে তো নয়ই৷ সুবলমালি ফুলগাছের যত্ন করেই কুলিয়ে উঠতে পারত না৷
এখন দেখছি কম্পাউন্ডের দেওয়াল ঘেঁষে সুপুরি গাছের সারি, ভিতরে আম, জাম, আতা, নিম ইত্যাদি বড়ো হচ্ছে৷ রোদ কমে গেছে৷ গাছের ছায়ায় ঝুপসি জায়গাটা৷ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না৷ ভিতর থেকে মাঠ পেরিয়ে হনহন করে যে হেঁটে আসছে তাকে প্রথমে চিনতে পারিনি৷ তারপরে বুঝলাম, জয়রাম৷
একটু কুঁজো হয়ে গেছে এই যা, চেহারা বদলায়নি৷ আগের মতনই গোল গোল চোখ, বড়ো কপাল, নির্বিকার চেহারা৷ তফাত এই যে, হাফপ্যান্ট পরেছে৷ হাতে, কনুইয়ে, পায়ের পাতায় মাটি লাগা৷
'কী করছ এখানে জয়রাম?'
'আমি এখন মালির কাজ করি৷' জয়রাম যেন মজার খবর দিচ্ছে এইভাবে বলল৷ 'কত গাছ লাগিয়েছি দেখেন৷ নার্সারি বানিয়েছি এখানে, দেখুন৷' সত্যিই, পলিথিনের ঠোঙায় কত ছোটো ছোটো গাছ বাড়ছে৷
'এত গাছের কাঠ কেটেছি, গাছেরা কত গালমন্দ করেছে আমাকে বলেন তো! তাই এখন পুণ্যকাম করছি, নতুন গাছ লাগাচ্ছি৷'
'ওই পিছনে সেগুন বাগান হচ্ছে বড়ো৷ দু-শো, আড়াই-শো সেগুন গাছ . . . আসুন না, দেখুন . . .'
'গাছ বড়ো হলে তো আবার কে কেটে নেবে . . .'
'আরে না, আমি থাকতে কে কাটবে . . .'
জয়রাম আমাকে উৎসাহের সঙ্গে বাগান দেখাতে নিয়ে চলল৷
শারদীয়া ১৪১০

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন