অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এলাহাবাদের লুকারগঞ্জে রোজকার মতো সেদিনও সন্ধ্যের পর আমরা বেঙ্গলি ক্লাবে জড়ো হয়েছি৷ নামে বেঙ্গলি ক্লাব হলেও বেশ কিছু অবাঙালি ভদ্রলোক এই ক্লাবের সদস্য, মি. মালহোত্র তাঁদের একজন৷ ভদ্রলোকের বয়স ষাটের কোঠায়, মাথার চুল ধবধবে সাদা, কিন্তু শরীরের বাঁধুনি এখনও মজবুত৷ বয়সকালে তিনি যে রীতিমতো বলিষ্ঠ ছিলেন তা এক নজরেই বোঝা যায়৷ খুব অমায়িক ভদ্রলোক৷ বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর তাঁর গভীর শ্রদ্ধা, ফাঁক পেলেই চলে আসেন৷
ডিসেম্বর মাস, জাঁকিয়ে শীত পড়েছে৷ আমরা সব গরম পোশাকে নিজেদের ঢেকেঢুকে কনকনে হাওয়ার ছোবল থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছি৷ মি. মালহোত্র তাঁর হাতের মোটা লাঠিটা দোলাতে দোলাতে ক্লাবঘরে এসে ঢুকলেন৷ এত শীতেও তাঁর গায়ে কিন্তু একটা গেরুয়া রঙের সুতির পাঞ্জাবি আর একটা সাদা খদ্দরের চাদর৷ স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি হেসে আর 'নমস্তে' বলে তিনি চেয়ার টেনে বসলেন৷
আমাদের আলোচনা হচ্ছিল অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে৷ আলোচনা থেকে তর্ক, তর্ক থেকে চেঁচামেচি৷ দিব্যেন্দু আমাদেরই বয়সি৷ গোলমালের মধ্যে সে একসময় মি. মালহোত্রের দিকে ফিরে বলে উঠল, 'আচ্ছা মালহোত্র সাহেব, আপনি কি এসব অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করেন?'
আচমকা এই প্রশ্নে ভদ্রলোক বোধ হয় ক্ষণিকের জন্য কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না, তারপর একটু হেসে বললেন, 'আমি বরং জীবনের একটা ঘটনা বলি৷ আপনারা তা থেকেই জবাবটা খুঁজে নেবেন৷'
আমরা সবাই জমাটি এক গল্পের আশায় তাঁকে ঘিরে বসলাম৷ মি. মালহোত্র তাঁর কাহিনি শুরু করলেন,
'আমার বয়স তখন ষোলো কি সতেরো, ভরাট স্বাস্থ্য৷ হঠাৎ কী খেয়াল হল, কাউকে কিছু না বলে একদিন লোটা-কম্বল নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লুম৷ প্রথমে গেলুম হৃষীকেশ৷ এখন হৃষীকেশের ভোল পালটে গেছে, বিরাট অ্যান্টিবায়োটিক কারখানা, বিজলি বাতি, রীতিমতো শহর৷ আমি যখনকার কথা বলছি, তখন এসব কিছুই ছিল না৷
'হৃষীকেশ থেকে সরু এক বনপথ ধরে গাড়োয়াল অধ্যুষিত টিহরিতে পৌঁছোলাম৷ তখন পথ ছিল দুর্গম, মাঝে মাঝে ঝোলানো দড়ির সেতু৷ টিহরি থেকে ভাগীরথীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে প্রায় মাইল কুড়ি হাঁটা পথ দেবপ্রয়াগে গিয়ে মিশেছে৷ ওটাই ছিল তখন গঙ্গোত্রীর পথ৷ দেবপ্রয়াগ থেকে ধরাসু হয়ে একটা পথ উত্তরকাশী ছুঁয়ে আরও উত্তরে চলে গেছে৷ ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলেছি৷ চোখে পড়ে হিমালয়ের বরফঢাকা ধবল শিখরে শিখরে সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে৷ অপূর্ব দৃশ্য৷
'উত্তরকাশী প্রাচীন তীর্থস্থান৷ ওখান থেকে গঙ্গোত্রী উত্তরে প্রায় ষাট-বাষট্টি মাইল৷ উত্তরকাশী ছাড়িয়ে দুর্গম পথ ধরে আমি চলেছি৷ প্রায় বারো মাইল কঠিন চড়াই পেরিয়ে কমলহাটি চটি৷ এরপর শুরু হল সাপের মতো আঁকাবাঁকা বিপুল চড়াই৷ সত্যি কথা বলতে কী, পরিশ্রম হচ্ছিল খুবই, কিন্তু এভাবে পথ চলাতে যে কী আনন্দ তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না৷ হরশিল উপত্যকায় পৌঁছোলুম৷ এটা হল গঙ্গার তীরভূমি৷ যে দিকে চোখ ফেরাই ঘন নিবিড় পাইন বন আর সামনে ধবল তুষারে ঢাকা গিরিমালা, নীচে ভাগীরথী কলধ্বনি তুলে বয়ে চলেছে৷ চঞ্চল নীল জলরাশি, পাইন বনের ঘন সবুজের সমারোহ আর গিরিশৃঙ্গের তুষার শুভ্রতা-যেন বিরাট এক ক্যানভাসে মনের খুশিতে রং বুলিয়েছে জাদুকর শিল্পী৷
'হরশিলে পাহাড়ের মাথায় ঝুলন্ত সেতুর উপর দিয়ে নদী পার হয়ে ধরালি পৌঁছোলুম৷ এখন অবশ্য শক্ত ব্রিজ তৈরি হয়েছে৷ পথ আরও শ্রীময়ী হয়ে উঠল৷ চারদিকে নাম-না-জানা নানা রঙের অজস্র ফুল ফুটে আছে৷ রঙের সে যে কী বাহার তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, যেন অমরাবতীর দৃশ্য৷
'আমি এগিয়ে চলেছি৷ কঠিন বরফের উপর দিয়ে সরু পথ, তারপর আবার দুরন্ত চড়াই৷ আমার সঙ্গী ছিলেন জনা কয়েক তীর্থযাত্রী আর তাঁদের মালবাহক কুলিরা৷ তীর্থযাত্রীরা পাহাড়ি ঘোড়ার পিঠে চেপে চলেছিলেন৷ আমার অত পয়সাকড়িও ছিল না, তা ছাড়া আমার তখন জোয়ান বয়স, রক্ত গরম, পথকষ্টকে জয় করার দুর্দম বাসনা আমাকে পেয়ে বসেছিল৷'
মি. মালহোত্র একটু থামলেন, তারপর শ্রোতাদের মুখের উপর চকিত দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন, 'আপনারা ভাববেন না আমি নিছক একটা ভ্রমণকাহিনি আপনাদের শোনাচ্ছি৷ আমার কাহিনির এটা হল পটভূমিকা৷' মৃদু হেসে একটু যেন কৌতুক করেই তিনি বললেন, 'জানেন তো, পটভূমিকা ছাড়া কোনো কিছুই সর্বাঙ্গ সুন্দর হয় না৷'
আমরা কাহিনির গতি কোনদিকে মোড় নেবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে মাথা হেলিয়ে তাঁর কথায় সায় দিলাম৷

'চড়াই পেরিয়ে,' মি. মালহোত্র আবার শুরু করলেন, 'পাহাড়ের চূড়ায় ভৈরবঘাটি চটিতে পৌঁছোলুম৷ ওখানে নাগা সাধুই বেশি চোখে পড়ল৷ গঙ্গোত্রী ভৈরবঘাটি থেকে মাইল ছয়েক পথ, কিন্তু এই ছ-মাইল শুধু দুর্গম নয়, বিপদজনক চড়াই৷ মাঝে মাঝে ধস নামছে৷ কত তীর্থযাত্রী যে এই ধসের মুখে প্রাণ হারিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই৷ অনেক নীচে, বেগবতী ভৈরবী উত্তাল ভাগীরথী সগর্জনে ছুটে চলেছে৷ গঙ্গাগর্ভ থেকে প্রায় দু-হাজার ফুট উঁচু খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল৷
'অবশেষে ভাগীরথীর উৎসলোক গঙ্গোত্রী পৌঁছোলুম৷ গঙ্গোত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দশ হাজার ফুট উঁচু, যোগ-তপস্যার লীলাভূমি৷ আগে যেমন ভাগীরথীর জল নীল দেখেছি, এখন কিন্তু তা নয়, অনেকটা যেন গৈরিক৷ ভোরের দৃশ্য ভোলবার নয়৷ অভ্রের কুচির মতো তুষারপাত হচ্ছে, চারদিকে তুষার শুভ্রতা৷ সূর্যের আলো হিমালয়ের বরফের উপর প্রতিফলিত হয়ে লক্ষ কোটি হিরের মতো জ্যোতি ঠিকরে বেরুচ্ছে৷ ধ্যানমগ্ন হিমালয়ের যেন শুভ্র তপস্বীর বেশ৷ গঙ্গার উত্তর তীরে গঙ্গামাইর মন্দির৷ মন্দিরের পাশেই গঙ্গার কোল ঘেঁষে ভগীরথের মন্দির৷ সামান্য কয়েকটা আশ্রম ছাড়া নির্জন, জনশূন্য অঞ্চল৷
'এখানেই আমার আসল কাহিনি শুরু৷ গঙ্গোত্রী পৌঁছে সাধুদের মধ্যে একটা উত্তেজনা লক্ষ করে আমি কৌতূহলী হয়ে উঠলুম৷ পরে জানতে পারলুম গত ক-দিন ধরে ওই অঞ্চলে এক বিরাটাকৃতি পুরুষের দেখা পাওয়া গেছে৷ কোথা থেকে তিনি এসেছেন, কোথায় তাঁর আস্তানা, কেউ জানে না৷ তাঁকে সবসময় দেখাও যায় না৷ খুব ভোরে আবছা অন্ধকারে দু-জন সাধু তাঁকে দেখেছেন কিন্তু চোখের পলকেই তিনি যেন মিলিয়ে গেছেন৷ বরফের উপর তাঁর মস্ত পায়ের ছাপও দেখা গেছে৷ এই ব্যাপারে সাধুদের মধ্যে একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে শুনে আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলাম৷
'গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ প্রায় বারো মাইল৷ শেষের দু-মাইল সরু এক ফালি পায়ে-চলা পাহাড়ি পথ৷ উপল খণ্ডের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে হয়, একবার পা হড়কালেই গভীর সলিলসমাধি৷ আমি ভাবলুম এতটা পথ যখন এসেছি, গোমুখের উৎস না দেখে ফিরব না৷ আমার সংকল্প শুনে এক বৃদ্ধ তীর্থযাত্রী আমার সঙ্গী হতে চাইলেন৷ বয়সের ভারে তিনি ঝুঁকে পড়েছেন, কিন্তু অসাধারণ তাঁর মনোবল৷
'ভোর রাতে আমরা যাত্রা করলুম৷ জনশূন্য তুষারলোক দিয়ে আমরা এক শিলাখণ্ড থেকে আর এক শিলাখণ্ডে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছি৷ বিকেলের দিকে গোমুখ পৌঁছোলুম৷ সামনে প্রকাণ্ড হিমবাহ৷ সেই হিমবাহের নীচেই একটা গহ্বর, ওটাই গঙ্গার উৎস৷ কলকল শব্দে ভাগীরথীর গৈরিক জলধারা বেরিয়ে আসছে ওই গহ্বরের মুখ থেকে, তারপর বয়ে চলেছে আপন গতিপথে৷ সে এক অপরূপ শোভা৷
'গোমুখ সমুদ্রপিঠ থেকে প্রায় তেরো হাজার ফুট উঁচু৷ প্রচণ্ড হাড়-কাঁপানো শীত৷ আমরা কম্বল মুড়ি দিয়ে কোনোমতে রাতটা কাটালুম৷ যে পথে এসেছি, ভোর বেলা সে পথেই ফিরব৷ সারা রাত আমি দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি৷ প্রচণ্ড ঠান্ডা আর বিচিত্র পরিবেশ আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল৷ আমার বৃদ্ধ সঙ্গী কিন্তু পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে আপাদমস্তক কম্বলে মুড়ি দিয়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছিলেন৷
'তখনও ভোরের আলো ফোটেনি, চারদিকে ঘন কুয়াশা৷ আমি একটু ঘুরে বেড়াবার লোভ সংবরণ করতে পারলুম না৷ জীবনে দ্বিতীয়বার হয়তো এমুখো হবার সৌভাগ্য হবে না৷ সঙ্গীর ঘুমের ব্যাঘাত না করে আমি এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগলুম৷ ভয় ছিল, একটু অসাবধান হলেই নীচে পড়ে যাব আর তাহলেই নির্ঘাত গঙ্গাপ্রাপ্তি৷
'কতক্ষণ এভাবে কেটেছে খেয়াল নেই, হঠাৎ আমি থমকে দাঁড়ালুম৷ আমার কয়েক গজ দূরে কুয়াশা ভেদ করে কী যেন একটা আকার নিচ্ছে৷ দেখতে দেখতে সেটা এক মানুষের আকৃতি ধারণ করল৷ বিরাট এক পুরুষ, মাথায় রুক্ষ জটা৷ আমি হতভম্ব! দু-চোখ কচলালুম; স্বপ্ন দেখছি না তো!
'যখন নিঃসন্দেহ হলুম যে চোখের ভুল নয়, তখন আমার দারুণ কৌতূহল হল৷ তবে কি ইনিই সেই পুরুষ যাঁকে দেখে সাধুদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে? আগেই বলেছি, আমার বয়স ছিল কম, বুকে ছিল প্রথম যৌবনের দুঃসাহস৷ সেই বিরাট পুরুষ আমার দিকে পিছন ফিরে স্থির দৃষ্টিতে অসীম দিগন্তের পানে তাকিয়েছিলেন৷ আমি পায়ে পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলুম৷ বোধ হয় আমার উপস্থিতি টের পেয়েই তিনি ফিরে দাঁড়ালেন৷ দীর্ঘ শ্মশ্রু৷ ঘন ভুরুর তলায় দীর্ঘায়ত পিঙ্গল দু-চোখে কী অন্তর্ভেদী দৃষ্টি৷ আমি চমকে উঠলুম৷ স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমার বুকের ভেতরটা যেন হিম হয়ে গেল৷ কিছু না ভেবেই দু-হাত কপালে ঠেকালুম৷
'মুহূর্তকাল তিনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, তারপরই জমাট কুয়াশা তাঁকে ঢেকে ফেলল৷ তিনি মিলিয়ে গেলেন, না কুয়াশায় ঢাকা পড়লেন, তা আজও আমি জানি না৷ তবে তাঁর মুখে যে অভিব্যক্তি সেদিন আমি লক্ষ করেছিলুম, তা কোনোদিনই আমি ভুলতে পারব না৷'
মি. মালহোত্র চুপ করলেন৷
'কী দেখেছিলেন আপনি?' আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম৷
মি. মালহোত্র সঙ্গেসঙ্গেই জবাব দিলেন না৷ একটু থেমে আপন মনেই যেন তিনি বললেন, 'নিদারুণ হতাশা আর ব্যর্থতার এক ছবি৷ পুঞ্জীভূত বেদনা যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল সেই করুণ মুখে৷'
দিব্যেন্দুই প্রশ্ন করল, 'কিন্তু কে সেই বিরাট পুরুষ?'
মি. মালহোত্র একটু রহস্যময় হাসি হাসলেন, তারপর বললেন, 'পরে দেশ-বিদেশের নানান কাগজে ওই ঘটনা ফলাও করে ছাপা হয়েছিল, আরও কয়েক জায়গায় তাঁর পায়ের ছাপ নাকি দেখাও গিয়েছিল৷ এখন যাঁরা বয়সে প্রবীণ, তাঁদের হয়তো মনে থাকতে পারে, কারণ সে সময় ওই ঘটনায় খুব হইচই পড়ে গিয়েছিল৷'
'কিন্তু তিনি কে, সে কথা আপনি কেন বলছেন না?' এবার অধৈর্য কন্ঠে বললাম আমি৷
মি. মালহোত্র একটু মুচকি হেসে সবার উপর দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিলেন, তারপর বললেন, 'কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন উনি আর কেউ নন, মহাভারতে বর্ণিত অশ্বত্থামা, যিনি অমর হয়ে আজও পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷'
মুহূর্তকাল চুপ করে থেকে মি. মালহোত্র আবার বললেন, 'এই বিশাল পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ জীবন যে কী বেদনাময়, অমরত্ব যে কত বড়ো অভিশাপ, তাই বোধ হয় ফুটে উঠেছিল তাঁর মুখের রেখায় রেখায়৷'
পৌষ ১৩৮৮

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন