অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
ইতিহাস পরীক্ষা দিয়ে এসেই টিপলু একটা 'হুম' করে হুংকার ছুড়ে দিল, 'দেখে নেব কে আমার মার্কস আটকায়,' বলল সে দাদু-দিদা, মামনি, ঝান্টুপিসি আর ছোট্ট বোন টুপুরের সামনে৷ তাঁরা তখন বিকেল বেলার চা-টা খাচ্ছিলেন, টিপলুও চেয়ার টেনে বসে পড়ে বলল, 'ওহ কী দুর্দান্ত পরীক্ষা দিয়েছি৷ প্রাণ খুলে, মন খুলে, হৃদয় চিচিং ফাঁক করে লিখে গেছি৷ লুজ শিটের পর লুজ শিট নিয়েছি আর লিখে গেছি৷'
'তাহলে তুই এক-শোয় এক-শো পাবি?' বলল সিক্সে-পড়া ছোট্ট টুপুর, বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে৷ দিদা বললেন, 'ইতিহাসে কি এক-শোয় এক-শো পাওয়া যায়, কী জানি বাপু আজকাল কী হচ্ছে?'
'ওই তো, বড়োজোর এক নম্বর কাটতে পারে,' বলল টিপলু বিস্কুট খেতে খেতে, 'নিরেনব্বই ঠিক ঠিক পাচ্ছি৷'
কিন্তু ইতিহাসে টিপলুর, হায় কপাল মন্দ, একেবারে নিরেনব্বই-ই কাটা গেল৷ পেল মাত্র এক৷
'এক? তুই এক পেয়েছিস? এক-শোতে মোটে এক,' বললেন দাদু-দিদা৷
'ইস এক! মোটে এক? ছি-ছি-ছি, এ বাড়িতে এক কেউ কোনোদিন পায়নি৷' বললেন টিপলুর বাপি, তারপর গাটটুকাকুকে বললেন, 'গাটটু, দেখ তো কী ব্যাপার, ইতিহাসে কী করে এক পায়?'
গাটটুকাকু তিন-তিনবার বি.এসসি.-তে গাড্ডু খাবার পর তিন-তিন বার বি.কম. পরীক্ষাতেও গাড্ডু খেয়ে এইবারেই বি.এ. পরীক্ষা দেবার জন্যে খুব পাঁয়তারা কষছিল, সে এসেই টিপলুর মাথায় গোটা কয়েক গাঁট্টা ঠুকেই চিকন চিঁহি স্বরে ধমকাতে ধমকাতে নিজের ঘরে নিয়ে গেল টিপলুকে৷ বলল, 'কই তোর হিসটিরি পরীক্ষার খাতা? বের কর৷'
বলির পাঁঠার মতো টিপলু, তখনও গাঁট্টা-খাওয়া মাথায় হাত বুলোচ্ছিল, তাড়াতাড়ি নড়েচড়ে স্কুলের ব্যাগ থেকে খাতাটা বের করে দিল, 'এই যে৷'
'সব নম্বরগুলো প্রশ্ন অনুসারে ঠিকঠাক পড়েছে তো,' খাতাটা নিয়ে চশমা নাকে এঁটে ভুরু-টুরু কুঁচকে গাটটুকাকু খাতাটা দেখল৷ খাতার ওপর লাল কালিতে লেখা রয়েছে '১'৷ পাতা উলটিয়ে বলল, 'নম্বরগুলো অ্যাডিশন করে ভালো করে চেক করে দেখেছিস? '১' হয়?'
তারপর খাতাটা টেবিলের ওপর রেখে টেবিল ও ল্যাম্প জ্বেলে পাতা উলটিয়ে উলটিয়ে পড়তে শুরু করল গাটটুকাকু-
প্রথম প্রশ্নের উত্তর
গোল টেবিল বৈঠক
১৮৩৫ সাল থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে কোনো এক সময় বিশাখাপত্তনাম অর্থাৎ ভাইজাগে একটি রৌপ্য নির্মিত তাজমহলের অভ্যন্তরে একটি শ্বেত পাথরের গোল টেবিল দেখতে পাওয়া যায়৷ সেই গোলটেবিলের একপাশে মহাত্মা গান্ধী ও অন্য পাশে মহারানি ভিক্টোরিয়া বিকেলবেলা চা পান করিতেন৷ ইতিহাসে ইহাকে গোল টেবিল বৈঠক বলা হয়৷
ইতিহাস স্যার হুতাশনবাবু নম্বর দিয়েছেন শূন্য৷
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
গৌড় বাংলার মাৎস্যন্যায় অবস্থা
রাজা শশাঙ্কের পর দুই শত বৎসর ধরিয়া গৌর-নিতাইয়ের বাংলাদেশে অরাজকতা রোগ দেখা দেয়৷ এই রোগ রাজাদের হইতে লাগিল ও তাহারা জীর্ণ-শীর্ণ কঙ্কালসার হইয়া যুদ্ধ করিতে না পারিয়া দলে দলে মরিতে লাগিল৷ ফলে যে সকল রাজা তখনও মরিল না তাহারা যার যার রানি লইয়া এদিক-ওদিক পলাইতে শুরু করিল৷ ফলে রাজ্যে আদৌ রাজা না থাকিলে যাহা হয় তাহাই হইতে থাকে, কেহ কাহারও কথা শুনিল না৷ ফলে জঙ্গল কাটার লোক জঙ্গল কাটিল না৷ সারা দেশে বনজঙ্গলে ঢাকিয়া গেল৷ আবহাওয়াতাত্ত্বিকগণ বলিয়া থাকেন দেশে অধিক বনজঙ্গল থাকিলে অধিক বৃষ্টি হয়৷ তাহাদের কথা সেকালে অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়া গেল (আজকাল ফলে না)৷ বঙ্গদেশে প্রচুর বৃষ্টি হইতে লাগিল৷ নদী-নালা-খাল-বিল-পুকুর সব জলে ভরিয়া গেল৷ পদ্মা, মেঘনা, গঙ্গা, ভাগীরথী, হুগলি, মাতলা, মাথাভাঙ্গা, করতোয়া, ইছামতী, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, যমুনা, জলঙ্গী, জলঢাকা, দামোদর, ভৈরবী, রূপনারায়ণ, মহানন্দা, কুন্তী, বিদ্যাধরী, আদিগঙ্গা, ধানসিঁড়ি, কপোতাক্ষ, ফুলহার, তিস্তা, তোর্সা, দ্বারকা, কোপাই ইত্যাদি ইত্যাদি বঙ্গদেশে যত নদ-নদী আছে সব ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিল৷ ফলে নদ-নদী, খালে, বিলে, পুকুরে, ডোবায়, জলায় এবং শহরের রাস্তায় বৃষ্টির জমা জলে এন্তার ছোটো ছোটো মাছ দেখা দিল৷ ফলে ওই সকল ছোটো ছোটো মাছ গিলিয়া খাইতে মাঝারি আকৃতির এন্তার মাছ দেখা দিল৷ ফলে মাঝারি আকৃতির মাছগুলিকে গিলিয়া খাইবার জন্য বড়ো বড়ো মাছ দেখা দিল৷ ফলে বড়ো মাছগুলিকে গিলিয়া খাইবার জন্য তিমিমাছ ইত্যাদি বিশাল বিশাল আকৃতির মাছ দেখা দিল৷ ফলে বঙ্গদেশে ছোটো বড়ো মাঝারি বিশাল মাছ গিজগিজ করিতে লাগিল, ইহাকে বলে মাৎস্যন্যায় অবস্থা৷ এই অবস্থায় বড়ো বড়ো মাছ ছোটো ছোটো মাছ গিলিয়া খাইয়া নিঃশেষ করিল৷ বিশাল বিশাল মাছগুলি বড়ো বড়ো মাছ গিলিয়া খাইয়া নিঃশেষ করিয়া আর কোথাও মাছ দেখিতে পাইল না৷ তখন ক্ষুধার তাড়নায় ডাঙায় উঠিয়া খুঁজিয়া পাতিয়া যেটুকু রাজারানি অবশিষ্ট ছিল গিলিয়া খাইল৷ খাইয়া রাজারানিদের হজম করিল বটে, কিন্তু রাজারানিদের গায়ের হিরে, মুক্তো, মণি, মরকতখচিত সোনা রুপার মুকুট, হার, বালা কঙ্কন, নূপুর, নথ, কানের দুল, বর্ম, শিরস্ত্রাণ, বল্লম, তির, ধনুক, বন্দুক, কামান, মেশিনগান, তরোয়াল, লাঠি ইত্যাদি হজম করিতে পারিল না৷ সেইগুলি তাহাদের পেটে গিজগিজ করিতে লাগিল৷ ইতিমধ্যে দুই শত বৎসর কাটিয়া যাওয়াতে প্রজারা গোপালদেবকে ঘিরিয়া ধরিয়া বলিল, 'এই মাৎস্যন্যায় অবস্থা থেকে আমাদের রক্ষা করুন৷' গোপালদেব তখন বিশাল বিশাল মাছগুলির পেট কাটিয়া ফেলিলেন এবং তক্ষুনি পেট থেকে ঝরঝর করিয়া সোনা, দানা, গয়না, রত্নরাজি বিপুল ধনসম্পদ এবং বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র মাটিতে পড়িতে লাগিল৷ এই ভাবে সারা বঙ্গদেশের রাজসম্পদ মৎসের পেট থেকে পাইয়া গোপালদেব রাজা তো দূরে থাক, সম্রাটই হইয়া গেলেন এবং পাল বংশ স্থাপন করিলেন৷
ইস এতটা লিখেছে টিপলু তবু হুতাশন স্যার বসিয়েছেন শূন্য৷
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর
আকবর ও আওরঙ্গজেবের চারিত্রিক পার্থক্য
আকবরের দাদুর নাম বাবর৷ কিন্তু আওরঙ্গজেবের দাদুর নাম জাহাঙ্গির৷ আকবর হুমায়ুনের পুত্র৷ কিন্তু আওরঙ্গজেব শাহজাহানের পুত্র৷ আকবর দিন-ইলাহি লিখিয়েছেন৷ কিন্তু আওরঙ্গজেব কোরান লিখিয়াছেন৷ আকবর হা-হা-হা-হা করিয়া দিলখোলা হাসি হাসিতেন৷ কিন্তু আওরঙ্গজেব 'দাঁতে দাঁত চেপে' আস্তে আস্তে হেঁ-হেঁ-হেঁ-হেঁ করিয়া হাসিতেন৷ ইহাদের হাসি কেবল মাত্র যাত্রা থিয়েটার সিনেমা ও টি.ভি.-র পর্দায় প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়৷ আকবর হিন্দুপ্রিয় ছিলেন কিন্তু আওরঙ্গজেব মুসলিমপ্রিয় ছিলেন৷ ফলে উঁহাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি মারপিট এবং শেষে যুদ্ধ বাধিয়া যায়৷ ইতিহাসে নাতিপুতির সহিত দাদু বা দাদুর বাবার সঙ্গে অনেক যুদ্ধ ঘটিয়াছে৷ মহাভারতেই আছে ভীষ্মের সহিত ভীমপুত্র ঘটোৎকচের যুদ্ধ৷ আকবরের সঙ্গে আওরঙ্গজেবের প্রবল যুদ্ধ চলিয়াছিল৷ শাহজাহান তাজমহলে বসিয়া জানালা দিয়া এই যুদ্ধ দেখিয়াছিলেন৷ অবশেষে আওরঙ্গজেবের হাতে আকবরের পরাজয় ঘটে ও তাঁহাকে গৃহবন্দি থাকিতে হয়৷ ইহা দেখিয়া শাহজাহানের চোখে অশ্রুজল দেখা দেয়৷ অশ্রুজল দেখিয়া কবিগুরু কাগজের ওপর হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া তর তর করিয়া 'শাহজাহান' কবিতাটি লিখিয়া ফেলেন,
'এ কাণ্ড জানিতে তুমি ভারত ঈশ্বর শাহজাহান . . .'
ইতিহাস স্যার হুতাশনবাবু এবারেও বসিয়েছেন শূন্য৷
চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর
মুঘল সম্রাজ্যের পতনের কারণ
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লর্ড কার্জন বলিয়াছেন, 'সম্রাটগণের পতন ঘটিলেই সম্রাজ্যের পতন ঘটে৷' এই উক্তি অনুসারে মুঘল সম্রাটগণের পতন ঘটিয়াছিল বলিয়াই মুঘল সম্রাজ্যের পতন ঘটিয়াছিল৷ মুঘল সম্রাটগণের পতনের কারণ নাদির শাহ৷ এই নাদির শাহ মুঘল আমলে ভারতে আসিয়া বার বার লুঠ করিয়াছিলেন এবং লুঠ করিতে বার বার আসিয়াছিলেন৷ প্রতিবারই ময়ূর সিংহাসন লুঠ করিয়া লইয়া যাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন৷ পারিতেছিলেন না৷ কারণ ময়ূর সিংহাসনের পায়াগুলি ভারী ছিল৷ এত ভারী যে তুলিতে পারিতেছিলেন না৷ তাই এর পরের বার লুঠ করিতে আসিয়া নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসনের একটি পায়া ভাঙিয়া লইয়া যান৷ ফলে মুঘল সম্রাটদের যিনিই ওই সিংহাসনে বসেন, তাঁহারই পতন ঘটিয়া যায়৷ এই ভাবে মুঘল সম্রাটগণের ক্রমাগত পতন ঘটিতে থাকে৷ অবশেষে শেষবার লুঠ করিতে আসিয়া নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসনটি পেছনে না তাকাইয়া বসিতে গিয়া একেবারেই ধরাশায়ী হইতে থাকেন৷ এইভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে৷
এবারেও হুতাশনবাবুর মার্কস শূন্য৷
পঞ্চম প্রশ্নের উত্তর
মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি
ফাঁসির মঞ্চে বাঙালি তরুণগণ যাহাতে জীবনের জয়গান গাহিয়া যাইতে পারে সেই উপলক্ষ্যে ব্রিটিশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ডালহৌসি স্কোয়ারে (বর্তমান বিনয় বাদল দীনেশ বাগ) লাল দিঘির ধারে একটি ফাঁসির মঞ্চ স্থাপন করিয়াছিল৷ মহারাজ নন্দকুমারকে সেখানে ফাঁসিতে লটকাইয়া লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস সর্ব প্রথম ফাঁসির মঞ্চ উদবোধন করেন এবং বঙ্গদেশে ফাঁসির প্রবর্তন করেন এবং ইহার একশত বৎসর পরে ক্ষুদিরামের ফাঁসি দিয়া বঙ্গদেশ ফাঁসির শতবার্ষিকী পালন করেন৷ ফলে বাঙালির ঘরে ঘরে তরুণ যুবকগণ 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি' গানটি গাহিতে গাহিতে যাহার যাহার মায়ের নিকট হইতে বিদায় লইয়া ফাঁসিতে ঝুলিয়া পড়িতে শত শত সংখ্যায় ফাঁসির মঞ্চে যেই না উঠিতে শুরু করিল, অমনি তাহাদের ভারে মঞ্চ মর মর করিয়া ভাঙিয়া পড়িল৷ ফাঁসির দড়ি ছিঁড়িয়া গেল৷ ফাঁসির কাঠের খুঁটি, পোস্ট সব এদিক ওদিক ছিটকাইয়া পড়িল৷ ব্যাপার দেখিয়া ইংরেজরা প্রমাদ গুনিল এবং আর বাঙালি তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফাঁসিতে লটকাইয়া মারা যাইবে না দেখিয়া, দেশ ছাড়িয়া পালাইবার জন্য বাঁধা-ছাঁদা শুরু করিয়া দিল৷ তখন ছোটো লাটের ছোটো মেয়ে জামাইয়ের বাঁধা-ছাঁদায় দড়ি কম পড়িয়া যাইতেছিল বলিয়া ফাঁসির ছেঁড়া দড়িগুলি তিনি কুড়াইয়া লইয়া কাজে লাগাইয়াছিলেন৷ তাই ওয়ারেন হেস্টিংস প্রতিষ্ঠিত ফাঁসির মঞ্চের দড়িগুলিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে পাওয়া যায় নাই৷ কাঠের খুঁটি পোস্টগুলিও পাওয়া যায় নাই৷ কাঠের যা দাম-'
নাহ, হুতাশন স্যার এতেও এক দেননি৷ শূন্যই দিয়েছেন৷ মাথা চুলকায় গাটটুকাকু৷ তা হলে টিপলু এক পায় কী করে? পাঁচটা শূন্য যোগ করলে তো শূন্যই হয়৷ তা ছাড়া উত্তরগুলো সঠিক হয়ছে কি না-মার্কসগুলো যথাযথ কি না? সেটা গাটটুকাকু ভুরু কুঁচকে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখ মুখ নাক ভেরি ভেরি সিরিয়াস মতন করে বুঝবার চেষ্টা করে৷ নাহ বোঝা সম্ভব নয়৷ তিন-তিনবার বি.এসসি. পরীক্ষা ও তিন-তিনবার বি.কম. পরীক্ষা দিয়ে গাটটুকাকু সায়েন্স ও কমার্সে একেবারে যাকে বলে 'ইসপিশ্যালিসট'৷ কিন্তু এ যে 'হিসটিরি'-'আটস' সাবজেক্ট৷ অবশ্য এ বছরেই গাটটুকাকু বি.এ. পরীক্ষা দেবার জন্যে ওয়ার্ম আপ শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু তাতে যে সব কম্বিনেশন সাবজেক্ট পড়তে হবে (এখনও পড়া শুরু হয়নি অবশ্য) তার মধ্যে ওই 'হিসটিরি'টাই তো নেই৷ তা যাই হোক ধরে নেওয়া গেল টিপলুদের হুতাশন স্যার ঠিকঠাকই মার্কস বসিয়েছেন অর্থাৎ পাঁচটি শূন্য৷ কিন্তু পাঁচটি শূন্য যোগ করলে কি 'এক' হয়?
এটা নিশ্চয়ই হুতাশন স্যারের একটা 'ক্ষমার অযোগ্য' মারাত্মক 'মিসচিভোওউস মিসসট্যাক'৷ তাঁর ছাত্ররা যদি এইরকম করে ভুল যোগ করতে শেখে তাহলে খুউব খারাপ ব্যাপার৷ গাটটুকাকু খাতাটা নিয়ে হুড়মুড় করে ছুটে চলে গেল টিপলুর বাপির কাছে৷ বলল, 'দাদা, খাতার সব ঠিক আছে, উত্তরও ঠিক আছে, মার্কসও ঠিক আছে, শুধুমাত্তর, হে-হে-হে, যোগে ভুল হয়েছে, হে-হে-হে৷'
'যোগে ভুল?' টি.ভি.-তে তখন চিকিরমিকির হচ্ছিল, নব ঘুরিয়ে অ্যাডজাস্ট করতে করতে টিপলুর বাপি বলল, 'যোগে নিরেনব্বই হবে বুঝি?'
'না-না ধ্যাৎ,' মাথাটা জোর জোর নাড়তে থাকে গাটটুকাকু৷
'টিপলু যে বলেছিল নিরেনব্বই পাবে৷'
'আরে না-না, ওটা জিরো হবে, জিরো৷ আমাদের বাড়ির টেরেডিশন, এ বাড়ির সবাই কোনো-না-কোনোটাতে জিরো পেয়ে এসেছে, টিপলুও তাই পাবে৷ খালি ওদের হিসটিরি স্যার হুতাশনবাবু, বি.এসসি., বি.কম. তো পড়েননি, তাই অঙ্কে ভুল করে ফেলেছেন, হে-হে৷ পাঁচটা শূন্যের যোগফল এক লিখে ফেলেছেন৷'
সুতরাং ভুলটার সংশোধন হওয়া দরকার৷ পরীক্ষার খাতা গারজেনকে দেখিয়ে তাঁর সই নিয়ে স্কুলে জমা দিতে হবে৷ ঠিক হল জমা দেবার সময় টিপলু হুতাশনবাবুকে বলবে যে তাঁর যোগে ভুল হয়েছে৷ ওটা 'এক' হবে না 'জিরো' হবে৷ তাই শুনে টিপলু ঢোক গিলতে শুরু করল, শেষে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল৷
না কেঁদে উপায় নেই৷ এযে হুতাশন স্যার৷ পুরো নাম 'হুতাশন অন্ধোপাধ্যায়,' কিংবা 'হুতাশন অ্যানার্জি'৷ 'অন্ধোপাধ্যায়' কারণ তিনি চোখ বুজে পড়ান, চোখ বুজে পড়া ধরেন, চোখ বুজে খাতা দেখেন, কেবল হাঁটেন চোখ খুলে৷ আর শাস্তি দেবার সময় মুখ খোলেন, বলেন, 'আমার ভুল ধরা হচ্ছে৷ ইয়ারকি পায়া হায়, আমার যথেষ্ট অ্যানার্জি আছে৷ দেখতে চাস কতটা অ্যানার্জি?' বলতে বলতে ছাত্রটির চুলের মুঠি ধরে, তার মাথাটা নামিয়ে পিঠে ধু-ধুম, ধু-ধুম . . .৷
টিপলুর চিৎকার টাইপের ভ্যাঁ-ভ্যাঁ কান্না শুনে ঝান্টুপিসি আর থাকতে পারেননি৷ ছুটে এসে টিপলুকে আদর করে কাছে টেনে 'না-নারে কাঁদিস নে, অত বড়োটি হয়েছিস না' বলতে বলতে চোখ কটমট করে গাটটুকাকুকে ধমকে দিলেন, 'কেন তুই ওকে গাট্টা মারিস, কেন ওকে খালি খালি টচচার করিস . . .'
'ঝান্টু পিসি, আমি কাল ইশকুলেই যাব না৷'
'আচ্ছা, আচ্ছা, কাল তুই ইশকুলে যাস না৷'
ঝান্টুপিসি টিপলুর বাপির চেয়েও বড়ো৷ নিজের ছেলেপুলে নেই৷ তাই টিপলু তাঁর খুব আদরের৷ তাঁর সামনে টিপলুকে কেউ কিছু বলতে পারেন না৷ এমনকী টিপলুর বাপিও ঝান্টুপিসির মুখ ঝামটা খেয়ে থাকেন৷
গাটটুকাকু তাই কী আর করে, টিপলুর পরীক্ষার খাতাটা গার্জেনস সিগনেচার হয়ে গেলে, জমা দিতে পরের দিন নিজেই যায় স্কুলে৷ কারণ হুতাশনবাবুর ভুলটা তো সংশোধন করতে হবে৷
হুতাশনবাবু চোখ বুজে সব শুনে বললেন, 'পাঁচটা শূন্য যোগ করলে যে শূন্য হয় তা আমি জানি৷ খাতার যেখানটায় এক বসিয়েছি বলছেন, ওটা আদপেই '১' নয়৷ ওটা আপনার ভাইপোর কান এঁকে দিয়েছি৷ হ্যাঁ কান৷ ঠিক আস্ত কান নয়, কানের যেটুকু ধরে আচ্ছা করে মুলে দিতে হয় সেটুকু শুধু এঁকে দিয়েছি৷ আপনার ভাইপো যা উত্তর লিখেছে তাতে ওর কানমলাই প্রাপ্য৷ ওরই সংশোধন দরকার! এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে ওর কানটা আচ্ছা করে মুলে দিন, যান৷'
উত্তরে গাটটুকাকু বলল একটি ছোট্ট শব্দ, 'কোররেকট৷' তারপর মিলিটারি কায়দায় অ্যাবাউট টার্ন হয়ে সটান বাড়ি চলে এল৷ কান মুলে দেওয়ার জন্যে হাতটা বাড়িয়ে রেখে গাটটুকাকু টিপলুর খোঁজ শুরু করল৷ কোনো ঘরেই তাকে পাওয়া গেল না ঝান্টুপিসির ঘর ছাড়া৷ ঝান্টুপিসির ঘরে খাটের তলায় বসে আছে টিপলু মাথায় বাপির স্কুটারের হেলমেট চেপে৷ কান ঢাকা হেলমেট৷
শারদীয়া ১৪০৬

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন