অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
গ্রামের বাইরে নদীর পথে একটা নির্জন মাঠ৷ সেই মাঠের পাশে একটা বড়ো গাছের নীচে চোখ বুজে বসে, একটি যুবক আপন মনে কী ভাবছিল৷ সে কী যে ভাবছিল তা কেউ বলতে পারে না৷ গাছটাতে বসে পাখিরা ময়লা ফেলে ফেলে, তার সারা শরীরটাকে বিশ্রী করে দিচ্ছিল; কিন্তু সে দিকে তার মোটেই খেয়াল নেই৷
পথ দিয়ে কত লোক যাওয়া-আসা করল, কিন্তু কেউ তার দিকে একবার ফিরেও চাইল না; আর যারা-বা চাইল-পাগল বলে সরে পড়ল; তা না হলে, কে এমন পাগল যে, পাখির ময়লা গায়ে নিয়ে চোখ বুজে এমন ধারা বসে থাকবে?
ক্রমে বেলা পড়ে এল, অস্তগামী সূর্যের শেষ সোনালি রশ্মিটুকু এসে তার মুখের উপর পড়ল, দিনান্তরের পাখিরা আপন আপন কুলায় ফিরল, যুবক কিন্তু উঠল না৷ মন্দিরে মন্দিরে সান্ধ্য-শঙ্খঘণ্টা বেজে উঠল, সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে ধরণীর বুক ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলল, যুবক ঠিক তেমনি ভাবে বসে রইল৷
ক্রমেই রাত বেড়ে চলল, কিন্তু একটি প্রাণীও তার খোঁজ নিল না-আর নেবেই বা কে? ঘরে এক বুড়ো মা ছাড়া তো তার আর কেউ ছিল না৷ মায়ের মন কত দুর্ভাবনা ভেবে ছটফট করে উঠল, আহা! সাত নয় পাঁচ নয়, এই যে তার সাত রাজার ধন এক মানিক; কিন্তু উপায় কী? এত রাতে অন্ধকারের মাঝে কে তাকে খুঁজতে বেরুবে?
এমনি ভাবেই রাত কাটল৷ ভোরের আলোয় আবার দশদিক আলোময় হয়ে এল-আবার পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে পড়ল; যুবক তখনও তেমনি ভাবেই বসে আছে৷
সেই ভোরে প্রায় এই বয়সের আর একটি যুবক এই পথ দিয়ে নদীতে নাইতে চলেছিল; দূর থেকে একে দেখেই সে চিনতে পারল-তোমরাও চিনতে পারবে, ইনি বাঙলার সেই কানাছেলে রঘুনাথ, আর অন্যজন তাঁর প্রিয় সাথী ও সহাধ্যায়ী প্রেমাবতার চৈতন্যদেব৷
রঘুনাথের শরীরের অবস্থা দেখে আর তেমনি ভাবে বসে থাকতে দেখে, চৈতন্যদেবের বুঝতে বাকি রইল না যে, ন্যায়শাস্ত্রের কোনো জটিল প্রশ্নের মীমাংসা করবার জন্যই রঘুনাথ এমনিভাবে রাত কাটিয়েছেন, আর এ আজ নূতনও নয়, কোনো গুরুতর প্রশ্নের সিদ্ধান্ত করতে হলে প্রায়ই এমনি ঘটে থাকে, চতুষ্পাঠী গৃহে নির্জন কোণটা তিনিই প্রায় স্থায়ী বন্দোবস্তে দখল করে নিয়েছেন, তবে কোনোদিন ব্যাপার এতদূর গড়ায়নি৷
চৈতন্যদেব তখন পরিহাসচ্ছলে হাতের জল-পাত্র থেকে খানিকটা জল রঘুনাথের গায়ে ঢেলে দিয়ে বলে উঠলেন, 'এক গা পাখির ময়লা নিয়ে বসে বসে মাথামুণ্ডু কী ভাবছ?' হাজার হোক ঠান্ডা জল তো, তার উপর আবার সকাল বেলা৷ রঘুনাথের তন্ময়তা ছুটে গেল, চোখ খুলে নিজের অবস্থা আর সমুখে চৈতন্যদেবকে দেখে, তিনি বড়ো অপ্রতিভ হয়ে পড়লেন৷ ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত হয়েছিল, আবার কখন যে তাও শেষ হয়ে গিয়ে ভোর হয়েছে-কখন যে পাখিরা তাঁর গায়ে ময়লা ফেলেছে তা তো তিনি জানতে পারেননি!
তিনি কী ভাবছিলেন জানবার জন্য চৈতন্যদেব খুব জেদ করতে লাগলেন৷ শেষটা যেই তিনি প্রশ্নটা বললেন, চৈতন্যদেব শুনেই তার সুমীমাংসা করে দিলেন৷ রঘুনাথ ভারি আশ্চর্য হয়ে গেলেন, সারা দিনরাত বসে ভেবে ভেবে যার সিদ্ধান্ত তিনি করতে পারেননি, চৈতন্যদেব এক মুহূর্তে তা বলে দিলেন৷
কিন্তু রঘুনাথ নিরাশ হননি; তাঁর এই সাধনাও একেবারে নিষ্ফল হয়নি-এই চিন্তাশীলতাই ছিল তাঁর জীবনের একটি বিশিষ্ট৷ তিনি তেমন অস্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেননি বটে কিন্তু শিখবার এই প্রবল একাগ্রতা ও চিন্তাশীলতা দ্বারাই তিনি নিজের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে নিয়েছিলেন এবং এরই ফলে তিনি একদিন সমগ্র ন্যায়শাস্ত্র আয়ত্ত করে বাঙালির মুখরক্ষা আর বাংলার গৌরব বাড়িয়েছিলেন-জগৎবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন৷ কোনো জিনিস জানবার এই যে প্রবল একাগ্রতা আর তার জন্য এমন প্রাণপাত সাধনা তা কখনো নিষ্ফল হয় না৷
এই ঘটনাটি ঘটেছিল সাড়ে চারিশত বৎসর পূর্বে-নবদ্বীপে, গঙ্গার ধারে একটি নির্জন মাঠে৷ রঘুনাথের জীবনে এরূপ আরও কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে আর অনেক শিখবার কথাও তাতে আছে৷
পৌষ ১৩৩২

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন