ভূত মরলে কী হয়

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

একটা সমস্যা বটে! এর উত্তর কেউ জানে বলে আমি তো জানি না৷ কে বা ভেবেছে এ সমস্যা নিয়ে? কিন্তু এই অজানা রহস্য আমার কাছে এখন জলের চেয়ে পরিষ্কার৷ অনেক কাল আগে ভাগীরথীর জল যেমন পরিষ্কার ছিল৷

গরমের সময় ভাগীরথীর জল কমে যেত৷ আমরা স্নান করতে যেতাম৷ সাদা বালির ওপর দিয়ে বয়ে যেত জল৷ চোখ নামালে দেখা যেত বালির ওপর বেলে মাছ খেলা করছে জলে৷ ফলগু বলত, তাদের নাম যখন বেলে, ওরা বালির একটু ওপরেই খেলে বেড়াবে৷

যা হোক, ভূত মরলে কী হয়, এ নিয়ে আমার গভীর চিন্তা ছিল৷

এখন আর নেই৷

আমার চেয়ে অনেক ছোটো দেবর্ষি, অথবা দাড়ুর ছেলে রাজর্ষি অথবা ঢ্যাবা, টাউনের 'কুন্তল সু স্টোর্স' থেকে 'বাই অ্যান্ড ফ্লাই', অর্থাৎ 'কেনো এবং ওড়ো' নামের টেকসই অথচ আরামদায়ক জুতো না কিনলে এ সব কথা জানাই যেত না৷

দোকানটি অশান্ত মাসচটকের৷ ঢ্যাবা ওর দোকান থেকেই জুতো কেনে৷ একটু ঘন ঘনই কেনে৷ কেন না হাঁটাই ওর নেশা৷ যখন-তখন শুনবে, 'ঢ্যাবা? ও তো তিন দিন আগে হেঁটে অযোধ্যা পাহাড় গেছে৷'

নয়তো চাইবাসা৷

নইলে কাঁদোডাবর৷

দাড়ু দুঃখ করে, 'কেন যে হাঁটে, কে জানে! আমার সাতটা বাস, আটটা ট্রাক আছে৷ তুই হেঁটে মরিস কেন? কাঁদোডাবরে কে যায়? সেখানে দেখার মতো আছেটা কী? ছোট্ট একটা গ্রাম?'

যদি বলো, ঢ্যাবা নির্ঘাত বলবে, 'পা আছে তাই হাঁটি৷ সব সময়ে মন্দির রে, পিকনিকের জায়গা রে, বেছে বেছে যেতে হবে?'

দাড়ুর বউ বলে, 'হাঁটছে হাঁটুক না৷' বলবেই৷ বউ আরও বলে, 'তোমার মতো আলসে হয়নি তো৷ ও একটা কেউকেটা হবেই হবে, আমার মামা তাই বলেছেন৷'

বকাঝকাও চলে না৷ ঢ্যাবা হল বাড়ির একমাত্র সাতরাজার ধন এক মানিক৷ একদিন ও 'শ্রীগুরু রোড ট্রান্সপোর্ট'-এর মালিক হবে৷ তবে ঢ্যাবা বলে, 'বয়ে গেছে৷ চালায় তো বিনোদজ্যাঠা৷ তখনও বিনোদজ্যাঠাই চালাবে৷'

বলেই ও ডায়েরি লিখতে বসে৷ কোথায় যাচ্ছে, কী করছে স-ব লিখে রাখে৷

টাউন থেকে কত কত লোক প্যাকেজ ট্যুরে ভারত ভ্রমণ করছে, তেমন ভ্রমণ ও করবে না৷

বাবাকে বলে, 'আমাদের জেলায় কত রাস্তা, কত জায়গা পাহাড়ের মতো ঢেউ খেলানো, কত পরব হয়, মেলা হয়, হেঁটে না দেখলে দেখা হত?'

বিনোদ বিয়ে করেনি৷ ভূতের মতো খাটে, বাস ও ট্রাকের ব্যাবসার ওপর নজর রাখে৷ কবে যেন এসেছিল, থেকে গিয়েছিল দাড়ুর বাবার কাছে৷ বলেছিল, বর্ধমানে বাড়ি৷ বাপের জমিজমা আছে, ভাইরা দেখে৷ ওর ও সবে মন নেই৷ তাই ভাসতে ভাসতে চলে এসেছে৷

তারপর তো বাড়ির অভিভাবক হয়ে বসল৷ এই যে ঢ্যাবা বলল, 'মিশন স্কুলে উচ্চ-মাধ্যমিক পড়লাম৷ এখন আমি টাউনের কলেজে পড়ব৷ সবাই কলকাতা যাবে কেন?'

বিনোদ বলল, 'কী বুঝলি দাড়ু৷ একে বলে দেশপ্রেম! তোর বাবা থাকলে বুঝতেন৷'

'হেঁটে হেঁটে দেশপ্রেম হচ্ছে?'

'গাড়ি চেপে কি দেশ দেখা যায়?'

'দেশ আবার কী? কাঁদোডাবর, বেগুনকোদর, আরসা, এ সব কি, যাকে বলে হিমাচল, ব্যাঙ্গালোর, হেন তেন? দেশ!!!'

হাজার হলেও দাড়ুর বাবার স্বরচিত কবিতা বিনোদ এক সময়ে প্রত্যহ শুনেছে৷ ও বলল, 'এই জন্যেই দেশের এই দুর্দশা! ছোটো ছোটো জায়গা, পায়ে-হাঁটা পথ, কংসাবতী ড্যাম, কেশরগড়ের জঙ্গল, এ সবই হল গে দেশ! গাল দিচ্ছ যে! জেলার রাস্তা এমন ভালো না হলে, বাস-ট্রাক এত কম না হলে তোমার কোম্পানি চলত?'

'যত্তো সব!'

'আরে, আমি বলে দিচ্ছি ও পায়ে হেঁটে দুনিয়া ঘুরবে৷ দাড়ুর নাম লোকে ভুলে যাবে৷ দাড়ুর ছেলে ঢ্যাবা নয়৷ ঢ্যাবার বাবা দাড়ু, এ জন্যেই তোর নাম হবে৷'

ইত্যাদি বলে বিনোদ কাটল৷

আর দাড়ু ঢ্যাবাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'মিশনে পড়লে৷ বন্ধুরা গেল কলকাতা৷ তুমি বললে টাউনের কলেজে পড়ব৷ তা কলেজে কি যাও?'

ঢ্যাবা কোনোদিন চেঁচিয়ে কথা বলে না৷ ওর চেহারা ছিপছিপে, রং শ্যামলা, চুল সদাই নেড়ামুড়ো করে ছাঁটা৷ একটু বড়ো হতেই ছেঁটে নেয়৷ নিজেই ছাঁটে৷ ওর হন্টন-সঙ্গী জিন কাপড়ের ব্যাগ নিজেই মেরামত করে৷ ব্যাগে ছুঁচ সুতো, তেলের শিশি, গামছা, 'বহু উদ্দেশ্য' সাধক লাইফবয় সাবান (স্নানও করো, কাপড়ও কাচো) এ সবই পাবে৷

ওর চোখে সর্বদা গভীর চাহনি৷ ও আস্তে বলল, 'মাঝে মাঝে যাই৷'

'এই যে বহরমপুর থেকে দিদিমা, মঃজফরনগর থেকে বড়োপিসি, আসানসোল থেকে ছোটোপিসি, এরা তোকে একবারটি যেতে লেখে, যাস না কেন? ও, তুই তো আবার ট্রেনে চাপবি না৷'

ঢ্যাবা বলল, 'জুতো কিনব বাবা৷'

'ছিঁড়ে গেছে তো?'

ঢ্যাবার মা বলল, 'হচ্ছেটা কী? একমাত্র সন্তান তোমার! টাকায় ছাতা পড়ছে! এক জোড়া জুতো কিনবে তাতে এত কথা? আমি ওকে দশ জোড়া জুতো কিনে দেব৷'

তারপর বলল, 'যা ঢ্যাবা, নাইতে যা!'

স্বামীকে বলল, 'দেখো, ওর কুষ্ঠীতে লেখা আছে, ও জগজ্জয় করবে৷ তুমি এত খুঁটো না তো৷ কী-বা বয়েস, সবে উনিশে পড়েছে৷ সিগারেট খায় না, টি.ভি. দেখে না, আড্ডা মারে না৷ ভিজে ছোলা খায়, ব্যায়াম করে, ওর মতো হাঁটতে পারে ক-জন?'

দাড়ু বলল, 'তুমি বুঝবে না৷'

কিন্তু জুতো কেনার সময়ে বিনোদ বলল, 'ও কিনবে বাই অ্যান্ড ফ্লাই৷ কেনো আর ওড়ো৷ কী সুন্দরী জুতো! দেখলে মনে হয় ফেয়ার্যান লাবলি মেখেছে৷ বুঝলে?'

'দাম?'

'তেমন আর কি! বুঝি সাত-শো না আট-শো! অশান্তর দোকানে দেখগে ছেলেদের ভিড়৷'

'বটে?'

'অশান্ত বলেছে, ঢ্যাবা হল পয়মন্ত খদ্দর৷ ও আগে কিনবে, মানে যাকে বলে উদবোধন গো! তারপর সবাই আপসে কিনবে৷'

'পয়মন্ত তো বলবেই৷ বছরে দশ জোড়া জুতো কেনে তো! সব্যস্ব টাকা ওই অশান্ত নিয়ে যাচ্ছে৷'

'বাজে বোকো না দাড়ু৷ কিছু ভক্তিগীতির ক্যাসেট চাই৷ তারকেশ্বর যাবে নন্দরা৷'

'ধুত্তোরি!'

তা ঢ্যাবা গেল, ফেব্রুয়ারির বাইশ তারিখে জুতো কিনল৷ মাকে বলল, 'জুতোটা দেখেই মা আমি কেমন হয়ে গেলাম৷ মনে হল, ওই জোড়াটাই কিনতে হবে৷ এবার দৌড়ের রেসে নামব৷'

'নামিস৷'

'উড়ে বেরিয়ে যাব৷'

এসব কথাবার্তা হয় বাইশ তারিখ রাতে৷ মনে রাখতে হবে, অত রাতে কোনো ট্রেন ছাড়ে না৷ খেয়ে দেয়ে জুতো জোড়া বিছানার পাশে টেবিলে রেখে ঢ্যাবা ঘুমিয়ে পড়ল৷

দেখো, এ পর্যন্ত যা বললাম, সবই বিনোদের কাছে শোনা কথা৷

পরের ব্যাপারটা হল, 'বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না৷' ঘটনাটা যদি কলকাতা-দিলি×-বোম্বে-ব্যাঙ্গালোরে ঘটত, ঢ্যাবা ঋত্বিক রোশনের চেয়ে অনেক নাম করে ফেলত৷ আমেরিকা থেকে লোকজন চলে আসত৷ শহরটা পুরুলিয়া বলেই কেউ গুজব ছড়াচ্ছে না৷ শহরটার বুদ্ধি আছে তো!

তেইশে সকালে দেখা গেল ঢ্যাবা তার জুতো, ব্যাগ, সোয়েটার নিয়ে উধাও৷ নেই মানে কোথাও নেই৷

নতুন জুতো পরে হাঁটতে গেছে, তাও বলা যাবে না৷ বড়ো দরজা তালা বন্ধ, কোলাপসিবল গেট তালা বন্ধ, শুধু ছাতের দরজাটা খোলা৷

ঢ্যাবা এবং নতুন জুতোর যোগাযোগে এমন ব্যাপার হতে পারে৷ তবু রেগেমেগে দাড়ু ছেলেকে গাল দিল না৷ বউকে বলল, 'এই তো ফিরল দলমা পাহাড় থেকে সেদিন৷ এসে যাবে৷ এসে যায় তো৷'

আর বিনোদকে বলল, 'থানা গারদের মতো একটা ঘর বানাব৷ রাতদিন আটকে রেখে দেব৷'

বিশ্বাস করবে, পঁচিশের ফেব্রুয়ারি সৈদাবাদ থেকে ঢ্যাবার দিদিমা ফোন করলেন৷

'হ্যাঁ বাবা দাড়ু! এ কী ব্যাপার? কাল রাত এগারোটায় ঢ্যাবা এসে হাজির!'

'যাক, আপনার কাছে গেছে!'

'আমার কাছে! রাতে ফুলকো লুচি, আলুর দমপোক্ত, ছানার পায়েস খেল৷ সকালে লিখে গেছে, আমি হাজারদুয়ারি দেখব, খোশবাগ দেখব৷ তারপর যাব রাজমহল৷ চিন্তা করো না৷'

'গেল কীসে?'

'বলে, হেঁটে এলাম৷ কী জুতো কিনেছি দিদিমা! যেন উড়িয়ে নিয়ে চলে এল৷ বলে কি, জুতোটাই বলল, ছাতে চলো, আমি তোমায় উড়িয়ে নিয়ে যাব৷ দেখো বাবা! কাপালিকের কবলে পড়েনি তো?'

দাড়ুর প্রাণ উড়ে গেল৷ কোথায় পুরুলিয়া, কোথায় বহরমপুর! এ কি অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার! দাড়ু আর দাড়ুর বউ দৌড়োল পুজো দিত৷ বিনোদ কী যেন ভাবতে থাকল৷ বলল, 'আমি ধরে ফেলব কী হচ্ছে৷'

তা বিনোদ পারে বটে৷ একসময় ছানাভূতদের বোতলে পুরে গৌরীকুণ্ডে ফেলে এসেছিল বলে গল্প মারে৷

কিন্তু আঠাশে ফেব্রুয়ারি আসানসোল থেকে ঢ্যাবার ছোটো পিসে এসে হাজির৷ বলল, 'পরশু ভোরে ঢ্যাবা গিয়ে হাজির৷ আমরা তো জানি ওকে৷ বললাম, কোথা থেকে?'

ও বলল, 'বহরমপুর থেকে৷' আপনার বোন চোখ টিপল আমিও কথা বাড়ালাম না৷'

'সে কোথায়?'

'তাই তো জানতে . . . এবং জানাতে এলাম৷ পরশু ভোরে . . . মানে ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি৷ দিব্যি খাওয়া-দাওয়া করল৷ বলল, আসতে বল, এসে গেলাম৷ তারপর মুর্শিদাবাদে কী কী দেখেছে, সে সব গল্প করল৷ খুব ঝরঝরিয়ে হাসছে, অনর্গল কথা বলছে, যেন বদলে গেছে৷ বহরমপুর থেকে আসানসোল কী করে এলি৷ বলে কী, কী জুতো পরেছি, দেখছ? যেন উড়িয়ে নিয়ে যায়৷'

'সে কোথায়?'

'আস্তে বউদি! পরশু দিন রাত, কাল সারা দিন, তারপর সন্ধ্যে থেকে নেই৷ এই দেখুন, লিখে রেখে গেছে, পিসি! মা-বাবাকে বলে দিয়ো যেন চিন্তা না করে৷ ও কি না বলে . . . মানে . . .'

বিনোদ বলল, 'চেহারা কেমন দেখলে?'

'ঝকঝকে, ফিটফাট৷'

দাড়ু বলল, 'পুলিশে যাবে না কি?'

'এই চিঠিটা দেখুন৷'

'আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরো না৷ আমি ঠিক ফিরে আসব৷ হইচই বাধালে জাওরে-বিশপুর চলে যাব৷'

'সে কোথায়?'

'কোরাসে চেঁচাবেন না৷ আমি জানি না৷'

অঃতপর মজফফরনগর-উত্তরপ্রদেশ থেকে বড়োপিসির টেলিফোন পাঁচই মার্চ৷

টেনশানে দাড়ুর মাথায় ভিজে গামছা৷ বড়দির গলা কী গদগদ৷ রাত বারোটায় স্বয়ং ঢ্যাবা৷ বলল, কাদের গাড়ি চেপে এসেছে৷ তোরাও আচ্ছা! একটা ব্যাগ দিয়ে ছেলে পাঠিয়ে দিয়েছিস?'

'সে কোথায়?'

'তা কী করে জানব? বলল, কোথায় কোন জায়গায় যাবে৷'

'কোথায়?'

Cov185

'দাড়ু! টাকাই বানিয়ে গেলি৷ তোরা দু-জন কোথাও বেড়ালি না, দেশ দেখলি না, যাক গে! ওর পিসে বলছে, এমন ছেলে আর দেখিনি৷ বাসে উঠব না, ট্রেনে উঠব না, পায়ে হেঁটে ভারত দেখব৷ উচ্চাদর্শ যাকে বলে!'

'উচ্চাদর্শ৷ এবার ফিরলে ওর ঠ্যাং কেটে দেব৷'

দাড়ু বউকে বলল, 'আর কি! জুতো পরে উড়ছে, এ কথা পুলিশকে বলা যায়?'

'জানি না৷ ঢ্যাবাকে এনে দাও৷'

'বিনোদ৷ অশান্তর দোকানে ক-জোড়া জুতো আছে দেখ৷ সবগুলো কিনে আন, তারপর ওগুলো জ্বালাব৷'

'মাথা ঠান্ডা করো৷ যতজনা জুতো কিনেছে, সবাই কি দৌড়োচ্ছে?'

'এ সব ভাগ্যের প্রহার৷'

বুঝতেই পারছ, সে সময়টা কী অশান্তিতে না কেটেছে ওদের৷ ঘুম নেই, খাওয়া নেই, বেজায় অশান্তি৷

ভাবতে পারবে না, মার্চ মাসের বিশ তারিখে বিনোদ বলল, 'আমি ক-দিন বাইরে যাব৷'

'তা আর যাবে না, কোথায় যাবে শুনি?'

'বেনারস যাব৷'

'কেন? তুমি তো চটি পরো৷'

'অত জবাব দিতে পারব না৷'

দাড়ুর বউ স্বামীকে ফিসফিস করে বলল, 'উনিও তো পাগল হয়ে যাচ্ছে৷ যাক৷ ঘুরে আসুক! আর পনেরো দিন দেখব, তারপর আমিও নিরুদ্দেশ হয়ে যাব৷'

'আমিও যাব, চিন্তা নেই৷'

সত্যি বলতে কী, শহরে ওদের চেনামহলে টেনশান এসে গিয়েছিল৷ অশান্ত তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাচ্ছিল৷ গ্যারেজের লোকজন পাত্তা লাগাচ্ছিল৷ ড্রাইভার নরসিং বলছিল, ও স্বপ্ন দেখছে, ত্রিশূল হাতে ঢ্যাবা হরিদ্বারে হাঁটছে৷

দাড়ু বলছিল, 'সব আমার বাবার দোষ! চিরকাল মুনি ঋষির নাম দেবার ঝোঁক৷ বাড়িতে জ্যেষ্ঠ, কেউ কিছু বলতে গেলে দু-বার ভাবত৷ গুষ্টিতে ছেলে জন্মালেই কণ», ভরদ্বাজ, গৌতম, বশিষ্ঠ, শেষে আমি দেবর্ষি, ছেলে রাজর্ষি৷ ও ঋষি তো হবেই৷ নইলে ঘর ছেড়ে হেঁটে বেড়ায়?'

ঢ্যাবার মা কাঁদল, 'অমন কথা বোলো না গো৷ সেদিনই টি.ভি.তে দেখেছি নিমাই সন্ন্যাস নিচ্ছে!'

'তিনি তো আর জুতো পরে হাঁটত না! ওঃ, টুপি পরায় এ কথা শুনিও বটে, বলিও বটে৷ অশান্ত কী সর্বনেশে জুতো পরাল বলো তো? ছি ছি ছি! তোর দোকানে ঢ্যাবা বছরে এত জোড়া জুতো কেনে, কী জুতোই না পরালি!'

বলে রাখাই ভালো, ঢ্যাবার মা আর বাবা এ সময় ঝগড়া করছিল না৷ দাড়ু ঢ্যাবার কোষ্ঠী জেরক্স করিয়ে জ্যোতিষীদের কাছে পাঠাচ্ছিল, ওদের বাড়ি মাংস ঢুকছিল না৷ দাড়ু বিড়বিড়িয়ে বলছিল, 'আর জুতো নয়৷ চটি!'

এমন সময়েই বিনোদ একদিন ঢ্যাবাকে নিয়ে ফিরে এল৷

মুখ তুলে ঢ্যাবাকে দেখে দাড়ুই মূর্ছা গেল৷ ঢ্যাবার মা? সে যে কী করল, তা ভেবে নাও৷

বিনোদ বলল, 'ওর পা দেখো৷ চটি কিনে পরিয়ে এনেছি৷'

ঢ্যাবা ফোন করেছিল বিনোদকে?

নয় তো কি ওর বাবাকে ফোন করবে? বিনোদ কখন গ্যারেজে, কখন বাড়িতে, সে তো ঢ্যাবা জানত, ঢ্যাবা ফোনে যেই বলল, 'জ্যাঠা, আমি রাজর্ষি!' তখনই বিনোদ বুঝে গেল৷

বিনোদ ঢুকেই বলেছিল, 'কেউ ওকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করবে না৷ স্নান করে নিক৷ ট্রেনে আমি ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে এনেছি৷ স্নান করে ঘুমোক৷'

এ পর্বে সবটাই বিনোদ কাহিনি৷ ঢ্যাবা দশাশ্বমেধ ঘাটেই বসেছিল, আর বিনোদের হাত ধরে বাধ্য ছেলের মতো চলে এসেছিল হোটেলে৷ সেদিন রাতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ও সব কথা বলেছিল৷

সব একরকম জুতো৷ কিন্তু ঢ্যাবা জানত ওকে ওই জোড়াটাই কিনতে হবে৷ কেমন করে জানল, তা ঢ্যাবা জানে না৷ পরে শুনেছে, কার কাছে যেতে চায়, তা কোনো কোনো জুতো জানতে পারে৷ তখন একটা জাদু ঘটে যায়৷

বিনোদ বলেছিল, 'এসব তোকে বলল কে?'

'কেন, ও?'

বিনোদ ভেবেছিল, ওকে খুঁচিয়ে লাভ নেই৷ মাথারই ঠিক নেই ওর৷ আবার মায়াও হচ্ছিল৷ ঢ্যাবা ওর গায়ে হাত রেখে চোখ বুজে এমন স্বপ্ন দেখা গলায় কথা বলছে! দুগগা! দুগগা! কালই ফিরতে হবে৷

'ও কে?'

'আমার . . . জুতো . . .'

'জুতো কথা বলে?'

'বলে তো! ও অনেক কথা বলত৷ যেদিন কিনলাম, সেদিনই ঠিক একটা ছোট্ট ছেলের গলায় বলেছিল, বাব্বা! বাঁচলাম তোমার চোখ কখন পড়বে তাই ভাবছিলাম, এখন নিশ্চিন্ত৷

'তারপর বলল, ভয় পেয়ো না৷ আমি তোমায় . . . হাঁটাব, কিন্তু মনে হবে উড়ে চলছ৷'

'হ্যাঁ রে, তুই আসানসোল . . . বহরমপুর . . . মজফফরনগর . . . অতগুলো জায়গা . . .'

ঢ্যাবা স্বপ্ন স্বপ্ন দুঃখী গলায় বলল, 'হৃষিকেশ, লছমনঝোলা, হরিদ্বার . . . চামোলি . . . কত জায়গা . . . যেই পা দিতাম রাস্তায় . . . ঝড়ের মতো চলতাম . . . জানো বাসের চেয়ে জোরে . . . ট্রেনের মতো স্পিডে . . .'

'শেষে এখানে এলি?'

'ছিঁড়ে যাচ্ছিল . . . ও আসতেও চাইল . . . বলত, যেদিনে ছিঁড়ে যাব . . . সেদিনে একটা নদীতে ফেলে দিয়ো . . . সেই জন্যেই . . .'

'গঙ্গায় ফেলে দিলি?'

'গায়ে হাত বুলিয়ে . . . আদর করে . . .'

'কী বলছিস ঢ্যাবা?'

'কেন বলব না জ্যাঠা? শোনো, ও কী, তা জানো? ও একটা ছোট্ট ভূত৷ ছোটো ভূতরা মরলে জুতো হয়, বড়ো ভূতরাও৷'

'ভূত মরলে জুতো হয়?'

'কিছু তো একটা হতে হবে৷ ওরা জুতোই হয়, সবাই ওদের কিনতে পারে না৷ মনের মতো খদ্দের ঢুকলেই ওরা টের পায়৷ তখন তোমার বাঁচোয়া নেই৷ ওই জুতোই কিনতে হবে৷'

'আর হাঁটতে হবে৷'

'নিশ্চয়৷'

'আর ছিঁড়ে গেলে?'

'ও তো নদীতে ভেসে যেতে চেয়েছিল৷'

'তোকে ভয় দেখায়নি?'

'না না৷ ও তো ভালো ছিল৷ দুষ্টু ভূতরা যখন জুতো হয়, তখন . . . কতরকম অ্যাকসিডেন্ট না হয়! সেরকম তো ছিল না ও৷'

'তোর দুঃখ হয়েছে!'

'ভীষণ! নীলতাপুরের মেলায় নাগরদোলা চড়ে ও কী খুশি না হয়েছিল . . .'

'আর ভাবিস না৷ ও তো সমুদ্রে চলে যাবে, তাই না?'

'জানি৷ কিন্তু দুঃখ তো হবেই৷ বেরোবার দিন ছাত থেকে এক লাফে রাস্তায় নেমেছিলাম!'

'ভাগ্যে আমায় ফোন করেছিলি৷'

'ও বলেছিল৷ তোমার গল্প তো ওকে করতাম৷ তুমি শালিকের ডানা ভাঙলে সারিয়ে তুলতে . . . শীতকালে লালটুকে সোয়েটার কিনে দিয়েছিলে . . . ও বলেছে, এরপর ভালো জুতোরাই, মানে ভালো ভূতেরা আমাকে খুঁজে নেবে৷ জানো, নৌসেরাবাগে টিয়া পাখি আসে, তাদের ডানাগুলো লাল!'

'কী খেতিস?'

'জন্মদিনের টাকাটা দিদমা . . . ছো-পিসি . . . দিয়েছিল না? জ্যাঠা! ওর কথা তুমি কাউকে বোলো না৷ কেমন?'

ঢ্যাবা ঘুমিয়ে পড়ল৷

হাঁটে, ঢ্যাবা এখনও হাঁটে৷ তবে এমন অ্যাডভেঞ্চার করে আর হাঁটে না৷ কী জুতো পরে তাও জানা নেই৷ তবে বিনোদ এখন জানে, আবার ও তেমনি কোনো জুতো কিনবে৷

আর আজ মনিপুর, কাল জম্মু, পরশু বিজয়ওয়াড়া তো তরশু অমরনাথ ঘুরে বেড়াবে৷

ওই জুতোটা ঢ্যাবা কিনল বলেই না জানা গেল, ভূত মরলে জুতো হয়!

শারদীয়া ১৪০৮

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%