অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
জীবনে সেই যা আমার পুরস্কার লাভ-সেই প্রথম আর সেই শেষ৷ কিন্তু এরকমটা যেন তোমাদের কারও কখনো না ঘটে . . .
ক্লাস টেনে প্রমোশন পেয়েই মামাকে গিয়ে জানালাম৷
'টেনে উঠেছিস! বলিস কী রে!' মামা তো হতবাক৷ 'টেনে উঠলি? বাঃ৷'
'এখনই বাঃ কি মামা? আসছে বছর এনটেন্স পরীক্ষা দেব, তা জানো?'
'বলিস কী রে! আমাদের বংশে কেউ যে কখনো এনটেন্সের চৌকাঠ মাড়ায়নি! সাত জন্মে না৷ সাত পুরুষে নয়৷'
সাত পুরুষের খবর রাখি না, তবে তিন পুরুষের জানি৷ আমার মামা বাংলা পাঠশালার পড়ুয়া, ছাত্রবৃত্তি পাশ৷ তারপর তিনি আর এগোননি৷ নিজের ব্যাবসা নিয়েই রয়েছেন৷
আর আমার দাদামশাই ছিলেন টোলের পণ্ডিত৷ ইংরেজির ধার ধারতেন না৷ সংস্কৃত নিয়ে থাকতেন, টোল ছিল তাঁর৷ তাঁর ধাক্কায় টোলে পড়তে পড়তে খুব আমি টাল সামলেছিলাম৷
আর তাঁর বাবার আমলে এনটেন্সের পাটই ছিল না৷ তিনি জানতেন শুধু ফারসি৷ মৌলভিদের মক্তবে পড়েছিলেন৷ নবাব সিরাজউদ্দৌলার লেখা কী একটা ফারসি চিঠি পড়ে দিয়ে কোনো এক সাহেবের কাছ থেকে একটা সোনার ঘড়ি নাকি বখশিশ পেয়েছিলেন তিনি৷
সেই সনাতন বংশে প্রথম 'এ-বি-সি-ডি' নিয়ে এলাম আমি৷ কেবল নিয়ে আসা নয়, এনটেন্স পাশ করে সেই 'এ-বি-সি-ডি'-র ছেরাদ্দ করে ছাড়ব৷ বি এল এ ব্লে থেকে শুরু করে এতদূর যখন টেনে-হিঁচড়ে নিজেকে আনতে পেরেছি, তখন বাকিটুকুও কোনোরকমে ঠেলেঠুলে উৎরে যেতে পারব আশা করি৷
মেজোমামার আনন্দ ধরে না৷ 'কী পুরস্কার চাস বল?'
'কী দেবে দাও,' আমি তো লাফিয়ে উঠি৷
'এই সোনার ঘড়িটা নে৷' বলে মামা জেব থেকে চেন-লাগানো ঘড়িটা বার করলেন, 'দেখেছিস? মোকবের সোনার ঘড়ি৷ পাঁচ-শো টাকা দাম৷ আমার ঠাকুরদাকে দিয়েছিল এক সাহেব৷ বেঞ্জামিন সাহেব৷ ভেবেছিলাম তুই এনটেন্স এগজামিন পাশ করার পর বেঞ্জামিনের ঘড়িটা তোকে দেব৷ তার আগেই নে তুই৷ ক্লাস টেনে তো উঠেছিস! যাঁহা বাঁহান্ন, তাঁহা তিপান্ন৷'
'ঘড়ি নিয়ে কী করব মামা? ধুয়ে ধুয়ে খাব?' আমি বললাম, 'ঘড়ি তোমার থাক৷'
'তাহলে কী চাস তুই?'
'টাকা দাও বরং আমায়৷ ওই ঘড়ির দামের টাকাটা দিয়ে দাও৷'
'পাঁচ-শো টাকা! পাঁচ-শো টাকা নিয়ে কী করবি রে তুই?'
'খাব৷'
'খাব! পাঁচ-শো টাকার কী খাবি? এমন কী খাবার আছে?'
'কেন, রসগোল্লা, সন্দেশ, জিবে গজা, জিলিপি, চানাচুর, চকোলেট, চীনে বাদাম . . .'
'পাঁচ-শো টাকার চীনে বাদাম! তা খেলে আর বাঁচতে হয় না৷ আর যদি বাঁচিসও, তোর চেহারা চীনেদের মতন হয়ে যাবে৷ কিংবা একটা বাদাম হয়েও দাঁড়াতে পারিস৷'
'তাহলে রেখে দেব৷'
'রাখবি কোথায়? তোর কি ব্যাক্স-প্যাঁটরা আছে? টাকা রাখতে হয় সিন্দুকে৷'
'কেন আমার পকেটে রাখব৷' সিন্দুকে আমি বিন্দু জ্ঞান করি৷ বিন্দুমাত্র আমল দিই না-'আমার এই বুক পকেটে৷'
'পকেটে! পকেটে টাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াবি যেখানে-সেখানে?'
'বেড়াবই তো৷ দেখিয়ে বেড়াব সবাইকে৷ বা রে! বন্ধুদের দেখাতে হবে না? তা না হলে আবার কীসের টাকা!'
'তবেই হয়েছে৷ চারদিকে যা পিকপকেট! কলকাতায় কি পা বাড়াবার জো আছে রে কোথাও! পকেটমাররাই টাকাটা মেরে দেবে তোর৷'
'তা আর মারতে হয় না৷ আমার পকেটে হাত দেবে এমন মানুষ এখনও জন্মায়নি মামা৷'
'চার ধারেই তো ঠকজোচ্চোর৷ ঠক বাছতে গাঁ উজোড় এই কলকাতায়৷'
'দিয়ে দেখো না আমায়?'
'নে তাহলে৷' আয়রন সেফ খুলে পাঁচখানা এক-শো টাকার নোট আমার হাতে তুলে দেন, 'দেখিস যেন বেহাত না হয় কখনো৷'
'আমার টাকা আর হাত সাফাই করতে হয় না কাউকে৷ এত বড়ো ম্যাজিশিয়ান এদেশে নেই৷'
'টাকাটা পকেটে নিয়ে ঘুরবি বলছিস৷ বাড়ি ফিরে রোজ রোজ দেখাবি আমায় কিন্তু৷ পাঁচখানা নোট গুণে গুণে দেখব আমি৷'
'দেখাব দেখাব,' বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম-বন্ধুদের দেখাবার জন্য৷ তাদের কারও পাঁচ টাকার বেশি মুরোদ নেই, পাঁচ-শো টাকায় কেমন তাদের তাক লেগে যায় সেটা দেখতে হবে৷
পাড়ার হুদ্দা পার হয়ে একটা পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় এক ভদ্রলোক ডাকলেন-
'খোকা তোমার আদ্দির পাঞ্জাবির ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে সব৷'
'অ্যঁা?' চমকে গিয়ে আমি থমকে দাঁড়াই৷
'নোটগুলো সব দেখা যাচ্ছে যে৷' আমার ঘাড়ে হাত রেখে তিনি বললেন, 'অমন করে টাকা রাখতে নেই ভাই৷ পকেটমারের নজরে পড়লে আর রক্ষে নেই৷ মানিব্যাগের মধ্যে রাখবে টাকা৷'
ঘাড়কে হস্তচ্যুত করে আমি হটে যাই 'কিনব ব্যাগ' জানিয়ে দিই সংক্ষেপে৷
'নোটের নম্বরগুলো তোমার টোকা আছে তো সব?' তিনি শুধোন৷
'নোটের নম্বর?' অবাক হতে হয়৷
'হ্যাঁ, নোটের কোনার দিকে নম্বর থাকে, বড়ো বড়ো নোটের নম্বর টুকে রাখতে হয় আলাদা কাগজে৷ ধরো, বলা তো যায় না, টাকাটা তোমার খোয়া গেল৷ তখন তুমি থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাতে পারবে নোটের নম্বর দিয়ে৷ পুলিশ তখন খবরটা জানিয়ে দেবে সবাইকে৷ কেউ ওই নম্বরের নোট বাজারে চালাতে গেলে ধরা পড়ে যাবে হাতে হাতে৷ টাকাটা তোমার উদ্ধার হবে তখন৷'

লোকটা ভালো কথা বলছে বলে আমার মনে হল৷ কিন্তু আমার কাছে এখন কাগজ কলম কিছুই নেই তো!
'এই নাও কাগজ কলম দিচ্ছি,' বলে তিনি তাঁর ডায়েরি বইয়ের থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে দিলেন৷
'এই নাও আমার কলম৷ নোটগুলো আমার হাতে দাও আমি নম্বর বলে বলে যাই আর তুমি টুকে নাও৷'
বললেই টাকাগুলো ওর হাতে অমনি তুলে দিলাম কিনা তেমন বোকা আমি নই৷ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে আমি তাকাই৷ তেমন যেন সুবিধে নয় লোকটা৷
'আচ্ছা আচ্ছা৷ তুমি নম্বরগুলো বলো, আমি তোমায় টুকে দিচ্ছি নাহয়৷'
আমি বলে বলে গেলাম, নম্বরগুলো তিনি টুকে নিলেন৷
'এইবার আমার এই মানিব্যাগটা তুমি রাখ৷ ব্যাগের মধ্যে টাকাকড়ি কিচ্ছু নেই, খালি ব্যাগ৷ ব্যাগটা আমি তোমায় উপহার দিলাম৷ এর ভেতরে তোমার নোটগুলো সাজিয়ে রাখো৷ তাহলে কারও নজর পড়বে না৷'
'আপনার ব্যাগ আমি নিতে যাব কেন?' আমি আপত্তি করি, 'আমার ব্যাগ আমি কিনে নেব৷ আমার কি টাকা নেই?'
'আহা রাগ করছ কেন? আমি কি তাই বলেছি৷ আমার চেয়ে তোমার এখন বেশি টাকা৷ আমি কি তোমাকে একেবারে দিচ্ছি ব্যাগটা? জন্মের মতো নিতে বলছি কি? তোমার ব্যাগ কেনার পর আমাকে এটা তুমি ফিরিয়ে দিয়ো নাহয়৷ ব্যাগের মধ্যে আমার নামের কার্ড রয়েছে! নরহরি সামন্ত, বৈঠকখানা রোড, ওই ঠিকানায় তুমি দিয়ে এসো আমাকে৷'
তবু আমার দোনামোনো যায় না৷
'ওই দেখো, একটা পুলিশের লোক আসছে৷ ছেলেপিলেদের হাতে টাকা থাকা ওরা ভারি অপছন্দ করে, ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখে৷ ভাববে তুমি হয়তো বাড়ির ক্যাশ ভেঙে পালিয়েছ, পাকড়ে নিয়ে যাবে থানায়৷ নাও চট করে পুরে ফেলো টাকাটা৷'
পুলিশ দেখে ব্যগ্র হয়ে আমি টাকাগুলো ব্যাগস্থ করি৷
তারপরেই যেন কী ঘটে গেল!
'আমার ব্যাগ, আমার মানিব্যাগ! কোথায় গেল আমার মানিব্যাগ!' লোকটা চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ৷ 'অনেক টাকা ছিল যে আমার ব্যাগে৷ কে পকেট মারল আমার!'
পুলিশ ইন্সপেক্টর থমকে দাঁড়ালেন আমার কাছে এসে৷
'কী হয়েছে মশাই? কী হয়েছে?'
'আমার মানিব্যাগ পকেট থেকে কে তুলে নিয়েছে দেখুন৷' আর্তনাদে ফেটে পড়ল লোকটা, 'পাঁচ-শো টাকা আমার তাতে৷ সব খোয়া গেল আমার৷'
ইন্সপেক্টর খপ করে এসে হাত চেপে ধরলেন আমার, 'এই ব্যাগ কি আপনার দেখুন তো?'
'হ্যাঁ, এই তো সেই ব্যাগ৷ দেখুন দেখুন, ওর ভেতর আমার নোটগুলো সব আছে কি না দেখুন, এক-শো টাকার পাঁচখানা নোট-এই এই নম্বর-পকেট থেকে কাগজখানা বার করে নম্বরগুলো তিনি আউড়ে গেলেন-আমার নামের কার্ডও রয়েছে ব্যাগের ভেতরে৷ নরহরি সামন্ত, বৈঠকখানা রোড৷'
'হ্যাঁ, রয়েছে৷ সবই মিলে যাচ্ছে, এই নিন আপনার মানিব্যাগ৷ ছেলেটাকে অ্যারেস্ট করছি৷ আপনি থানায় চলুন আমার সঙ্গে৷ আপনার অভিযোগ ডায়েরি করবেন৷'
'আমার অভিযোগ! আমার কীসের অভিযোগ? পেয়ে তো গেলাম৷ তা ছাড়া অভিযোগ করবার আমি কে? আমি কি বিচার করবার মালিক? মানুষ কি মানুষের বিচার করতে পারে? কেউ নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে সে কথা?'
'আপনি কী বলছেন মশাই?' ইন্সপেক্টর তো অবাক৷
'ঠিকই বলছি, ছেলেরা সব দেবতুল্য৷ কেউই তাদের খারাপ হয়ে জন্মায় না৷ সঙ্গ দোষে, শিক্ষার ত্রুটিতে খারাপ হয়ে যায়৷ এর জন্য দায়ী সমাজ, সংসার, পরিবেশ৷ রাষ্ট্র দায়ী এর এই অপরাধের জন্য৷ এ নয়, দায়ী হচ্ছে ওর বাবা, কাকা, পিসে, মেসো, মামা৷ এই আমার অভিমত৷'
'কিন্তু আইন মাফিক,' বলতে যান ইন্সপেক্টর৷
'আমি যদি ছোঁড়াটাকে জেলের মুখে ঠেলে দিই, সেখানে ও ওস্তাদ বদমায়েশদের পাল্লায় পড়ে তাদের হাতে শিক্ষালাভ করে পাকা চোর হয়ে বেরোবে জেল থেকে৷ তখন পকেটমার থেকে চোর হবে, চোর থেকে ডাকাত হবে, ডাকাত থেকে খুনি হবে, তারপর খুনি থেকে . . .'
'ফাঁসি হবে৷ তা ছাড়া আর কিছুই হবে না৷'
'আমি ছেলেটাকে ফাঁসিয়ে যেতে চাই না৷ আপনি দয়া করে ওকে ছেড়ে দিন৷' বলে তিনি আমায় মার্জনা করে চলে যান৷
আমিও ইন্সপেক্টরেরও মার্জনা লাভ করি৷
এখন মামা মার্জনা করলে হয় আমায়৷
বৈশাখ ১৩৭১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন