অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
প্রস্তাব
সবাইকে দিয়ে সব কিছুই হয় না-সবাই সব কাজ পারেও না৷ তাই তো পরাণেকে বলা৷ অথচ রোদ কোথায় উঠে এল-একটু পরে বাপ জাল কাঁধে ঘরে ঢুকবে, আর সে লবাবের পাত্তাই নেই৷ অথচ শম্ভু উঠছে শেষ রাতে৷ বাপের হাতে সব জুগিয়ে তৈরি হয়ে বসে আছে৷ কোথায় পরাণে! এ যদি ইদ্রিসকে বলত-ছোটো হলে কী হবে-গামছাটা জড়িয়ে ঠিক মাঝ রাতে উঠে আসত-'শম্ভা! এয়েচিরে৷' কিন্তু ইদ্রিসকে দিয়ে হবে না-একে চিপুরির বিল-তার ওপর মহাশোলের ব্যাপার৷ চিপুরির বিল-শুধু যে এখান থেকে দূরে তাই নয়, এই ভোরের ভাঁটায় ভাঁটায় রসুল নগরের খাল ধরে গেলেও ঘড়ি দুই তিন৷ এখন গরম পড়ছে-বিলের জল টানটান-জল সরে কোথাও কাদা, ভেলা নিয়ে চলা মুশকিল; কখন যে কোথায় আটকে যাবে! দিন দুপুরে পাকা মাঝিদেরও ঘোল খাইয়ে দেয়৷ আসলে এই মস্ত বিল যার বেশ খানিকটা হাওড় আর বাওড়-তার অনেকখানে নৌকো যাবে না৷ এমনি ঘন হোগলা আর নলখাগড়ার বন-জায়গায় জায়গায় বুক অবধি ডুবে যায় এমনি পাঁক-ছোটো-বড়ো চর-এরই মাঝে নাকি এঁকেবেঁকে আছে সেই মরা নদী-পরাণেটা বলে মায়া নদী-তার কোথাও তাল গাছ ডুবে যায় এত গভীর৷ আর এই বিলেরই কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দলবল নিয়ে মহাশোল৷ পরাণে কত বার গিয়েছে; বাপ যখন বেঁচে-তার সঙ্গে নৌকোয় ওই বিলে মাছ ধরতে৷ সে কী মাছ এক-একটা গায়ে শ্যাওলা ধরে গেছে-এই হুমদোপারা মুখ, জল থেকে টেনে তুলতেই দু-তিন জন লোক লাগে৷ তেমন একটা মাছ ধরেছিল পরাণের বাপ-অনেক দামে বিক্রি হয়েছিল৷ আরেকদিন ডোঙ্গা নিয়ে ধরল এক কচ্ছপ-ওজন কী! ডোঙ্গার মাঝে রেখে দিল৷ সে কী সহজে থাকে-কেবলই গড়িয়ে এদিক-ওদিক৷ শেষে ভুলকিলতা দিয়ে তিন গেরো ডোঙ্গার সঙ্গে; বিক্রি হল ষাট টাকায়৷ নাঃ, মহাশোলের দেখা পায়নি ওরা৷ মহাশোল আসলে 'ঠাকুর'-হাজার বয়স তাঁর৷ তাঁকে ধরে কার সাধ্যি৷
চিপুরির ধারে কুসুমগঞ্জ-পরাণের সইমার বাড়ি৷ 'সানযাত্তার' মেলায় দেখবে কুসুমগঞ্জের ঘাটে কত লোক মহাশোল ঠাকুরকে মুড়ি ভোগ দিচ্ছে-খই বাতাসা ছিটিয়ে দিচ্ছে-জেলেবউরা পান সুপুরি দেয়-সন্ধ্যা বেলা ঘাটে প্রদীপ দেখায়৷ এই নদী নালা জলায় জলায় সারা বচ্ছর ঠাকুরের আশীর্বাদ না হলে চলে?
মহাশোলকে ধরা নয়-ওর আশেপাশে কত তিন কেজি চার কেজি সব 'দোষ পাওয়া' মাছ৷ তাদের দু-একটা ধরতে পারলেই হল৷ কিন্তু পরাণেকে ছাড়া গিয়ে লাভ নেই; পরাণে বাপের সঙ্গে অনেক গেছে-বিলের হাল হদিশ জানে-হাওড় বাওড়ের মাঝে মরা নদীর সোঁতা চেনে-কোথায় ডোবা কোথায় পাঁক সে জানা না থাকলে সারাদিন ভেলা কেঁদরে বসেই থাকবে-শ্যাওলা-ধরা মাছের গল্প শুনেই ফিরে আসবে৷
শম্ভুর বাপও তো জেলে; বাপের সঙ্গে কি যাওয়া যেত না? তিন বচ্ছর রোগে ভুগে ভাগের নৌকো বেচে এখন এই রসুলনগরের খালের ধারে ভোর ভোরে জাল টানে আর এথা-ওথা মজুরি করে৷ সে জালে আর কী ওঠে-বড়োজোর কুচো চিংড়ি পোটাক-দু-চারটে নলা কি গালই৷ কত দিন বলেছে শম্ভু চিপুরি যাওয়ার কথা৷ বাপ চুপচাপ শোনে, রা দেয় না৷ এই সেদিন ভোর রাতে জাল গুছিয়ে দিতে দিতে শম্ভু বলেছে, 'আজ চলো না, চিপুরি'- একেবারে খা খা করে উঠল-কী যেন একটা খারাপ কথাই বলেছে৷ কিন্তু কার্তিক মোড়লের পো শম্ভু মোড়ল যা স্থির করে তা স্থির-চিপুরি ও যাবে-ওই ঠাকুরের ঝাঁক থেকে মাছ ও ধরে আনবে-পরাণে আসুক চাই না আসুক৷ আর এক দিন শুধু দেখবে তারপর ওই ইদ্রিসকে নিয়ে ভেলা ঠেলে যদি না গিয়েছে৷
আয়োজন
পরাণে এল বিকেল নাগাদ৷ দাঁত বার করে হাসছে-'আগ করিস না! সককালে মা পেঠিয়ে ছিল ভাঁড়ারি মাস্টারের খেতে-এই এনু৷ তুই ভাবিস না-এট্টা বুদদি এল৷ একেন থেকে যাব কুসুম গনজো-সই মার ঘর৷ তারপর বড়দার শালতি ধরে বিলে৷ ই ভেলা মেলা ধরে কি অদ্দূর যাওয়া চলে?' শম্ভুর রাগ আরও চড়ল-এত খেটে সে ভেলা বানাল-এখন বলছে এ ভেলা চলবে না! 'তুই যাবি কবে?' ভাঁড়ারি মাস্টারের খেতে আর দু-দিনের কাজ আছে! পরশু এই বিকেল বিকেল হাঁটা লাগাব-বেশ রাত হবার আগেই কুসুমগঞ্জ৷ পরদিন ভোরেই বিলে নেমে যাব৷ কিন্তু শম্ভুর বাপ তো ছাড়বে না৷ ভোরে বেরিয়ে দুপুর নাগাদ ফিরে আসা যায় না? অসম্ভব৷ বিলের মাঝে যেখানটা মায়ানদীর মজা দহ সেখানে পৌঁছোতেই দুপুর৷ বাপকে যদি বলে সই মার বাড়ি যাচ্ছি 'ভুজ' খেতে-বাপ ছাড়বে না? মনে হয় না-রাঁধা-বাড়া ঘরের কাজ সবই তো শম্ভুকে করতে হয়৷ পরাণে বলল-'আমি মেসোকে আজি করাব৷'
কিন্তু মেসোকে রাজি করাতে হল না৷ রাতের বেলা বাপ এসে বলল পরশু সদরে যেতে হবে, কোটে সাক্ষী আছে৷ চৌধুরীবাবুরা নে যাবে নে আসবে-ধুতি, শার্ট, পঞ্চাশ টাকা এমন সুযোগ জীবনে ক-টা আসে বাপ! বাপ হয়তো ভয় পাচ্ছিল শম্ভু বায়না ধরবে 'আমো যাবো'- তাহলে পাঁচটা টাকা দিয়ে বুঝিয়ে যেত৷ কিন্তু শম্ভু যখন বলল, সে পরাণের সইমার বাড়ি যাবে 'ভুজ' খেতে-বাপ ভুরু কোঁচকাল-'কুসুমগঞ্জ! খবরদার! বিলে নাববিনি!'
'ক্যানো?'
'আবার কতা? না তো না! কী? দেঁড়িয়ে রলি যে! আত হয়নি? ভাত লাগা৷' শম্ভু দু-ঠোঁট চেপে খাবার জোগাড় করে৷
ল্যাটা মাছের ঝোলটা নাকি ভালো হয়েছে৷ শম্ভু নাকি এখন ওর মার মতোই প্রায় রাঁধে৷ খেতে খেতে বাপ বলে-চিপুরি জায়গাটা ভালো নয়৷ ওইখানে কত যে দুঘঘটনা ঘটেছে! বাপ ছেলেবেলায় তাঁর দাদুর মুখে শুনেছিল-কত রাজার সুলুপ সওদাগর বজরা ডুবেছে ওখানে৷ একসময় একটা নদী ছিল ওখানে-মায়ামতী-মস্ত বড়ো নদী৷ এক রাজকন্যেকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল ফিরিংগি ডাকাতরা৷ রাতে নোঙর ফেলে সবাই ঘুমাচ্ছে-এই মেয়ে কী করে জলে ঝাঁপ দিয়ে মরে৷ শাপ লেগেছিল তার৷ পরদিন ভরা কোটালের বান-জলে 'ঘুন্নি'-সব নৌকো উথালপাতাল-একটা তো কামান-টামান সুদ্ধোই তলিয়ে গেল৷ বাকিরা অনেক করে পালিয়ে যায়৷ সে কন্যে এখন সরে গেছে অন্যদিকে কিন্তু ওখানকার লোকেরা বলে কখনো কখনো নাকি 'সোত' আসে বিলের জলে, একেবারে দুজ্জয় সাতসমুদ্দুর বান-শালতি ডোঙা উলটেপুলটে যায়! কোত্থেকে কেমন করে আসে কেউ বলতে পারে না৷ ওই বিশাল বিল-দশ গাঁয়ের মাজে ছড়ানো-এপার-ওপার করতে দিন যায়৷ এর কোনখানে জল কম-কোথায় গভীর, পাকা মাঝিরাও ঠাহর পায় না৷ মাসি বাড়ি 'ভুজ' খেয়ে আসুক শম্ভু৷ কিন্তু খবরদার বিলে যেন মাছ ধরতে না যায়৷
বাপ গেল সকালে৷ পরদিন সাক্ষী দিয়ে রাত রাত ফিরবে৷ শম্ভু যেন তার আগে ফিরে আসে৷ পরাণে এল দুপুরের কিছু পরে৷ ভাঁড়ারি মাস্টারের বউ খুশি হয়ে একটা প্রায় নতুন গেঞ্জি দিয়েছে-ছাপ ছাপ আঁকা-দ্যাখাচ্ছে যেন নেড়ি ভুলির দাদাভাইটি৷ পরাণে বলেছে 'হাসচিস? এই দ্যাখ একটা পাঁচ টাকার নোট৷' মার কাছ থেকে দু-টাকা আর মাস্টারের বউ তিন টাকা৷ শম্ভুও পেয়েছে দু-টাকা বাপের কাছ থেকে৷ 'কিন্তু খবরদার, ওসব ভাজামাজা খাওয়া চলবেনি৷ মাছের মশলা বানাতে হবে৷ মাছ কি এমনি এমনি আসবে?'
হাঁটাপথে হাসিমপুর, রায়বসুর চক হয়ে কুসুমগঞ্জ পৌঁছোতে রাত আঁধার৷ কতদিন পরে আসা; পরাণেকে গাঁয়ে পৌঁছেও জিজ্ঞাসা করতে হল 'সমীর হালদার-রঘু হালদারের বাড়িটা কোতায়?' সইমা কাজ কাম সেরে ঘাটে গেছে৷ বড়দা মেজদা বাড়ি নেই৷ সইমার শ্বশুরবুড়ো চৌকিতে বসে ছোটো কত্তাল বাজিয়ে হরিনাম করছে৷ বড়োপিসিও প্রথমটা পরাণেকে চিনতে পারেনি৷ সোনার গাঁ বলতে বুঝল 'উঠে এসো-বড়ো বউ আসচে৷' সইমা কি খুশিটাই না হল পরাণেকে দেখে৷ পরাণের বন্ধু বলে শম্ভুও খুব খাতির পেল৷ খেতে খেতে রাত-চাঁদ উঠে এসেছে নারকেল গাছের ওপর৷
বড়দা এসেই খেয়ে শুয়ে পড়ল-কাল ভোরের ট্রেন ধরে সদর যেতে হবে৷ পরাণে গুটিপায়ে গিয়ে দাঁড়াল-'কাল সকালে একটু শালতিটা-'
বড়দা সঙ্গেসঙ্গেই ধমক৷ তারপর বলল, 'ভালো করে ঘাড়টা টিপে দে তো-বেদম টনটনাচ্ছে!' শম্ভুকে ইশারা করে পরাণে দু-জনে মিলে ঘাড় পিঠে এমনি টিপতে লাগল-বড়দা বলল, 'যা যা হয়েছে৷ যা ফনেকে বলিস আমি নিতে বলেছি৷'
আসার পথে রায়বসুর চক থেকে মাছের মশলা কেনা হয়েছিল৷ সেসব তৈরি করে শুতে আরও রাত৷ তাদের শোবার জায়গা হয়েছে বড়োপিসির খাটে৷ শুয়ে শুয়ে বড়োপিসির গল্প- পিসির স্বচক্ষে দেখা ঘটনা৷ পিসির তখনও বিয়ে হয়নি-চারদিকে খোঁজখবর চলছে৷ খুব ভোরে একদিন ঘাটে গিয়ে দেখে-ওই পারে এক সাধু যেন বুক জলে দাঁড়িয়ে ধ্যান করছে৷ পিসি গিয়ে তার মাকে খবর-'দেকে যাও ঘাটে এক সাধু-জলে দেঁড়িয়ে-এই জটা!' মা শুনে চমকে উঠল-'চল তো দেখি কেমন সাধু-ঘাটে সাধু!' সবাই ঠাট্টা করছে পিসিকে৷ শুধু মা এল তার পিছু পিছু-ও-ও মা! সাধু কোথায়, এই মস্ত একটা মাছ-জলের ওপর মাথাটা তুলে ভাসছে-লাল টকটকে গায়ের রং-মুখ-ভরতি দাড়ি-গোঁপ-মাথাটা মানুষের মতো কি তার চেয়ে বড়ো! মা সেখানেই মাটির ওপর উবুড় হয়ে গড় করছে- 'ঠাকুর-ঠাকুর! আমার মেয়েটা ভালো ভাবে পার করে দাও!' বলছে আর কাঁদছে৷ সেই মাছ এগিয়ে এল একদম ঘাটের কাছে-পিসি ভয়ে তিন হাত পিছিয়ে গেছে-ঠিক যেন সোনার বরন সন্ন্যেসি ঠাকুর৷ তারপরে সে ভুস করে এক ডুব-আর উঠল না৷
মাছ ঠাকুরের আশীর্বাদে খুবই ধুম করে পিসির বিয়ে হয়ে গেল-রাজপুত্রের মতো বর৷ পরপর দুই সন অজন্মা হয়ে পিসির বাপের অবস্থা তখন খুবই খারাপ৷ কিন্তু কী করে টাকা জোগাড় হল-কিছুতেই আর আটকাল না৷ গল্প শুনতে শুনতে ওরা কখন ঘুমিয়ে গেল৷ মাঝরাতে হাওয়া উঠেছে-ঘরের চালে মটমট, শনশন-ওদের ঘুম ভাঙল না-যদিও এই শব্দটা ওদের ঘুমের ভেতরে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির আকার নিল-বিল যেন এখন এক সমুদ্র-জল উথাল পাতাল নৌকো ডুবছে নাকি-না বড়দা নৌকো ঠেলছে৷ শম্ভুকে বকছে বাবা, না করেছিল না বিলে নাবতে৷
অভিযান
পরাণের ঘুমই আগে ভাঙল৷ তখন চাঁদ নেমে গেছে৷ বাইরে হালকা অন্ধকারে ঝিঁঝি পোকার স্বর৷ সাবধানে শম্ভুকে ঠেলল-পাছে পিসি জেগে যায়৷ শম্ভু উঠল প্রায় লাফিয়ে এবং পিসি 'কে রে!' বলে দেশলাই হাতড়াচ্ছে৷
'কিছু না, আমরা!'
'কী হয়েছে?'
'নাঃ, এই বাইরে যাব৷'
শালতিটা ঘাটেই বাঁধা৷ সামনে দশ-পনেরো হাত জল তারপর ও কি ধান খেত? না ওগুলো বিলের জলে ঘাস হয়ে আছে৷ জল ওখানে কম-ওই দিকে গভীর-ও দিকেই বেরোবে ওরা৷ শালতিতে ওঠার আগে জলের ধারে গিয়ে পরাণ মাথা নীচু করে গায়ে মাথায় একটু জল ছিটিয়ে নিল-কী বিড়বিড় করছে?
'কচ্ছিস কী?' শম্ভু হাসে৷
'হাসবি নে৷ তুইও কর৷ বল জলে হাত দে বল :
'জলরাজ মীনরাজ
সিদধ কাম হই আজ৷
দোষ নালইও আশীর্বাদ দেও৷
হরি হরি বলো ঠাকুর হরি হরি বলো৷'

শম্ভু তবু হাসছে৷ এটাই ওর দোষ৷ কিছুই মানবে না, সব কথাতেই বলবে 'পেরমান কী? পেরমান দ্যাকা!'
শালতিতে বইঠা একটা৷ শম্ভু একটা বাঁশের লগি নিয়েছে হাত ছয় লম্বা৷ বিলে লগিটারই ভরসা বেশি-কোথায় ঘাস কোথায় পানা, কোথায় দাম-তাতে কি আর বইঠা চলবে? তবে আছে, মাঝে অনেকখানি ফাঁকা-যেকান যেকান দিয়ে নৌকো কি ভটভটি এগাঁ থেকে ওগাঁ যাতায়াত করে-যাতায়াতের পথে মাঝিরা পানা বা দাম দু-পাশে ঠেলে সরিয়ে পথটা পরিষ্কার রাখে৷ সা বাবুরা ভটভটি নামিয়েছে হরিগঞ্জ থেকে কেনার গাঁ-সারাদিনই যাতায়াত করছে লোকজন মালপত্র নিয়ে৷ তারাও অনেকখানি পরিষ্কার করিয়েছে৷
পানা ঠেলে ঠেলে ওরা এসে পড়ল সেই ভটভটির রাস্তায়-বিলের মাঝে মাঝে ডাই করা পানা৷ এখানে জল বেশি-পরাণে বইঠা চালাল-শম্ভু লগি তুলে দাঁড়িয়ে৷ পরাণে শেষ এসেছিল দু-বছর আগে৷ দু-পাশে দেখছে-এই বিল কি তেমনি আছে? তেমনি পানা ঘাস হোগলা নলখাগড়ার মাঝে লুকোনো-মাঝে মাঝে নৌকো চলার পথ৷ কী দেখে বুঝবে এর কোথায় সেই মরা নদীর সোঁতা? কোনটা বাওড়? কোন জলে মহাশোল ঘুরে বেড়ায় তাঁর শিষ্য সেবক দলবল নিয়ে?-সে দলে কোনটা 'দোষ লাগা' যে নাকি অন্যায় কাজ করে মাছ হয়েছে?-এখন ঠাকুরের পাছু পাছু ঘুরছে প্রায়শ্চিত্ত করতে-জাল ফেললেই ধরা পড়বে? ওটাই তো প্রায়শ্চিত্ত হল তার৷ এসব শম্ভু বিশ্বাস করতে পারছে না-ভেবে পায় না পরাণে কি চিনতে পারছে-কোন জায়গায় যেতে হবে? এখন দ্যাখো কোনো জবাবই দিচ্ছে না৷ এত প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলল-'র'৷
শেষ পর্যন্ত বোধ হয় পরাণে হদিস করতে পারল৷ হঠাৎই 'এইখেনে!' বলেই উলটো মোচড়ে শালতি ঘুরিয়ে দিয়েছে হোগলা বনের ভেতরে৷ 'পথ কই?' শম্ভুর সে কথার জবাবে যেন ধমকে ওঠে-'কাঁচিটা নে! কাট! কাট!' শম্ভু কাস্তেটা নিয়ে-সামনের হোগলা কাটতে শুরু করে৷ হোগলা কেটে পথ করে ঢোকা কি সোজা? পরাণে বইঠা রেখে লগি হাতে ঠেলছে-শম্ভু কাস্তেটা টানছে-খচাখচ-মুঠোয় ধরে হবে না৷ হয়তো এ পথে নৌকো কখনো ঢোকে-তত যেন ঘন নয় হোগলা বন৷ শম্ভুর মনে হল কিছুদিন আগেই বোধ হয় হোগলা কেটে কেউ পথ করেছিল৷ যেন ডগাকাটা কিছু হোগলাও দেখা যায়৷ আশ্চর্য! ভেতরে কি দিঘি একটা! না, বিলের খানিকটা কারা পরিষ্কার করে রেখেছে চারদিকে হোগলা বন- মাঝখানে অনেকখানি জলের ঠাঁই-মস্ত এক দিঘি যেন৷ অথচ বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই৷ এমন কেন?
জেলেরাই মাছ ধরার জন্য ঝিলের মাঝে মাঝে এমন করে রাখে৷ আরও আছে এমন৷ সরকারি জলা-অন্য কেউ এসে চুপিচুপি মাছ ধরে পালাল৷ এনিয়ে মারামারি, খুনোখুনিও হয় কত৷ শম্ভু কি এখানেই জাল ফেলবে? পরাণে বলে 'চুপ! কারা আসছে! ঠেল! ঠেল!' বইঠা, লগি ঝপাঝপ৷ কারা আর আসবে-যারা খেটেখুটে এই জলা পরিষ্কার করেছে-মাছ ধরার জন্যে-তাদেরই কেউ হবে৷
শালতি কোনাকুনি পার হয়ে ওদিকের হোগলা বনে সেঁধিয়ে গেল৷ পেছন থেকে সাড়া আসছে-'হো-ও-ই! কে র্যা একেনে! মাতাটা পুঁতে দোব না! ধর!' পরাণে হাসে-ধত্তে পারবে না! ওরা একটা মাত্তর নাও৷ হোগলা বনের ভেতর চুপচাপ খানিক বসে থাকে৷ যারা এসেছিল তারা কেউ ধেয়ে এল না৷ এখনও দক্ষিণের হাওয়া-সকালে এমনি বয়৷ বাতাসে পোড়া তামাকের গন্ধ৷ ওরা আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়৷ ওখানটায় দু-চার খেপ জাল ফেলতে পারলে মাছ উঠত নিশ্চয়৷ কিন্তু ঘাবড়াবার কিছু নেই৷ এর ওপাশে একটা চড়া আছে-ওখানে মা মনসার থান-মস্ত দুটো অজগর অজগরনি থাকে-তারও ওদিকে জল কম-কোমর কি বুক অবধি-ওখানে জাল চলবে না তবে ওইটে চলবে-শম্ভুর কোঁচটা দেখায় পরাণে৷ শম্ভু খুশি হয়ে 'শাল গজার কি বোলও দু-একটা পাই!'
বিলের মাঝে মাঝে কোথাও এরকম চর-ছোটো-বড়ো গাছ, নারকেল দু-চারটে আম জাম-বহু পুরোনো একটা মন্দির৷ তার চুড়োয় কোনো সময় একটি অশ্বত্থ গাছ গজিয়ে ছিল-সে গাছ এখন মন্দির ধসিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে-এক বিশাল মহীরুহ! বছর দশেক আগেও এক বুড়ো পূজারি থাকত এখানে৷ তার মাটির ঘরের দুটো দেওয়াল মাত্র দাঁড়িয়ে৷
এপাশে বিলের গভীরতা কম৷ কিন্তু এদিকেই ওই কোণ দিয়ে কালীনদীর লোনা জল জেয়ারের তোড়ে এই বিলেও ঢুকে পড়ে৷ লোনা জলের জন্যই বোধ হয় এদিকে হোগলার তেমন বন নেই-পানাও কম৷ শুধু ধানি ঘাসের সূক্ষ্ম ডগাগুলো জলের ওপরে-শিউরে ওঠা গায়ের মতো রোঁয়া খাড়া৷ এতক্ষণে সূর্য বেশ ওপরে উঠে গেছে৷ মনসার চর ছাড়িয়ে ওরা এগোচ্ছে৷ এখানে মনে হয় মাছের লোভে অনেকেই এরকম নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- সবখানেই নৌকো চলার ছাপ-ঘাসে, দামে৷ কিন্তু এখানে কোথায় যে জাল ফেলবে৷ পরাণে বইঠা তুলে নিল৷ শালতিটা আস্তে আস্তে সরে যায়৷ ওদের চোখ জলের ওপর স্থির-যদি কোথাও বুড়বুড়ি কি সামান্য কাঁপন জলে৷ খিদেও পেয়েছে৷ থলির ভেতরে পুঁটুলিবাঁধা মুড়ি; কিন্তু ওই মুড়ি ছাড়া আর কিছু নেই৷ যতক্ষণ কুসুমগঞ্জে না ফিরছে এই মুড়িই খেতে হবে, তাই খিদের কথা মনে না করাই ভালো৷ কে না জানে খিদের কথা ভাবলেই খিদে বেশি পায়৷
হঠাৎ৷ এত আচমকা শম্ভু ঘাবড়েই গিয়েছিল৷ পরাণে হঠাৎই কোঁচটা তুলে জলের মধ্যে ছুড়ে দিয়েছে-'ইসশা-মার লগি৷'
শম্ভু ঝটপট লগি নামিয়ে ঠেলে দিল শালতিটাকে-কোঁচটা যেখানে জলের মধ্যে আড় হয়ে আছে৷ শাবাশ বটে-ওদ্দুর থেকেই গেঁথে ফেলেছে-শাল মাছ একটা-পরাণের হাতের এক হাত হবে৷
জল কি বাড়ছে? বোধ হয়৷ কালীনদীর ঘোলা জল কোন অদৃশ্য পথে এখানে ঢুকছে- এদিকে বিলের জল ততটা স্বচ্ছ নয়-যেন আরও ঘোলা হয়ে উঠছে৷ ঘাসের মধ্যে কী একটা নড়ছে; জাল তুলতে গিয়ে শম্ভু কোঁচটাই তুলে নিল, তারপর হুপ! কোনোকিছুতে লেগে কোঁচটা পিছলে গেল যেন৷ কী ওটা? ওরে বাবা! মস্তবড়ো কাছিম একটা-একটু ক্ষণের জন্যই দেখা গিয়েছিল তাও পিঠের খানিকটা-সেটুকুই এ্যাতবড়ো! নিশ্চয় হাত দুই চওড়া হবে৷ সমুদ্রের কাছিম এটা, কালীনদী থেকে বিলে ঢুকে পড়েছে৷ পরাণে ঘাড় নাড়ে-'না সমুদ্রের নয়-এই বিলেই কত আছে৷ বুঝলি না-একেনটায় নদী থেকে মাছ আসে যায়- তাই ইনি ঘোত হয়ে বসে আচেন মাছ খাবার জন্যে-গোপাল ঠাকুর!' পরাণে হাসে-হাসে শম্ভুও৷ এ্যাতবড়ো কাছিমটাকে মারতে পারলে নাম হত তার-বাবাও থ হয়ে যেত-'তুই মেরেচিস এ্যাত বড়োটাকে!' আরও সরে এল তারা৷ সত্যি এখানে অনেক মাছ, ছোটো যদিও৷ পরাণে বলে 'জাল মার!' 'দূর! এটুকু টুকু মাচ ধত্তে একেনে এয়েছি নাকি!'
পরাণেই মারল আরও একটা বোয়াল-ওই শম্ভুর কোঁচটা দিয়ে৷ শম্ভুর জেদ চেপে গেছে-চোখ জলের ওপর লেগে আছে-কোথাও যদি এতটুকু সাড়া পাওয়া যায়! বেলা বাড়ছে৷ পরাণে বলে 'ও ই শম্ভু! তু দ্যাক দ্যাক চাদ্দিক ভালো করে৷ এ দুটো তো সইমাকেই দে যেতে হবে-খালি হাতে ঘর যাব নাকি৷' অগত্যা শম্ভু জাল তুলে নিল৷ অজস্র কুঁচো মাছ-নিশ্চয়ই চিংড়ি৷ দু-চারটে বাগদাও আছে অবশ্য৷ তবু হাত খুলুক৷ জালে শম্ভুর কাছে কেউ না৷ তার জাল ছোটো-বাপ একটু-আধটু দেখিয়েছিল বটে, বাকি প্রায় পুরোটাই ওর নিজের হাতে বোনা৷ এ জালে কত মাছ ধরেছে শম্ভু৷ পরাণে লগি ঠেলছে৷ শালতির মাথায় দু-পায়ে সামলে দাঁড়িয়েছে শম্ভু৷ শম্ভু ইশারা করে আস্তে-তারপরেই জাল ছুড়ল-পদ্মপাতার মতো গোল হয়ে জাল পড়ছে৷ পরাণে লগি তুলে নিল৷ জাল টানছে শম্ভু-জলে দু-বার আছড়ে তুলে ফেলল৷ ঠিকই ভেবেছে চিংড়িই উঠেছে একরাশ, আরও সব কুঁচো কাঁচা৷ শালতির খোল জাল ঝাড়তে ঝাড়তে শম্ভু সুর করে ছড়া কাটে-'কচি ছানা যেকেনে মা-রে খোঁজো সেকেনে৷' জাল মাঝে মাঝে ঘাসে আটকে যাচ্ছে-গেঁড়ি গুগলি ঝিনুক উঠে আসছে গাদা গাদা৷ আরও কবার জাল বাইল শম্ভু৷ দু-চারটে নলা মলা বাদে সবই তো কুঁচো-আধ কেজিটাও হবে কি না! পরাণে বলল, 'খালি হাতে যাওয়ার চেয়ে এ ভালো৷' তারপর শালতির মুখ ঘোরায়-'চ ঘর চ!' শম্ভু বিরক্ত হল-'এ্যাকন কী?'
'বাবু খিদে লেগেছে-বেলা দুপহর হলনি!'
'খা না-মুড়ি খা৷'
'মুড়ি খেলেই হবে?'
আর কেউ কোনো কথা বলে না৷ জলে ঘাসে শম্ভুর চোখ ঘুরছে৷ পরাণে ঠোঁট পেঁচিয়ে লগি ঠেলছে৷ মাছ কি এক জায়গায় দাঁড়ায়? পরাণের শালতি চলে-আশপাশ বেশ দূর তক মাছেরা সাড়া পেয়ে যায়৷ ধাড়ি দু-একটার বুড়বুড়ি দেখা গেলেও মারা গেল না৷ শম্ভুর আপশোস-এখন অবধি এমন জায়গা পেল না যেখানে তৈরি মশলা ছড়িয়ে মাছ ধরতে পারে; তিনটে টাকা গেছে ওই মশলাটুকু করতে৷
এখন দুপুর৷ এ সময় নাকি জলে মাছ নড়ে না৷ শম্ভু সায় দিলে পরাণে লগিটা দু-হাত আছড়ে পুঁতে ফেলে৷ একটা হালকা গেরো দিয়ে শালতিটা আটকে, পুঁটুলি খুলল পরাণে৷ শুধু মুড়ি নয়-সইমা কতগুলো নাড়ুও দিয়েছে, আছে পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কাও৷ মুড়ি খেতে খেতে আবার সেই মহাশোলের প্রসঙ্গ ওঠে৷ শম্ভুর সংশয়-'তেনার অতবড়ো শরীরখানা থাকপে কোতায়? জল কই-একেনে তো বুক জলও হবে নি৷' পরাণে গম্ভীর-মাথা নাড়ে-তাঁকে কি সবাই দেখতে পায় নাকি-নাকি রোজই দেখা যায়৷ তিনি কখন কোতায় থাকবেন-সে কেউ বলতে পারে না, হয়তো এ্যাকন একেনেই-আমাদেরই সামনে-কিন্তু . . .' শম্ভুর মুখের দিকে তাকিয়ে পরাণের মুড়ি চিবোনো বন্ধ হয়ে গেল-শম্ভু তাকিয়ে আছে দূরে- স্থির দৃষ্টি-পরাণে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখতে যায়-'উরিব্বাস! ওটা কী করে!' পরাণের গা শিউরে উঠল৷ শম্ভু ততক্ষণে শালতি খুলে লগিতে জোর ঠেলা দিয়েছে, মুড়ির পুঁটুলি এলোমেলো-সেদিকে কে তাকায়৷
কিন্তু কী যে ওরা দেখেছিল-কাছাকাছি যাবার আগেই তা জলে মিলিয়ে গেছে-শুধু জলের ঢেউগুলোই প্রমাণ দিল যাই ছিল-সেটা মস্তবড়ো কিছু৷ শম্ভু ছাড়বে না-যেন ভূতে পেয়েছে; পাগলের মতো লগি ঠেলে চলেছে-পানা দাম, ঘাস ভ্রূক্ষেপ নেই-মাঝে মাঝে নৌকো চলার এলোমেলো পথ৷ এগোতে এগোতে ছোট্ট একটা চর তার পাশ ঘুরতেই তেমনি যেন দিঘি একটা-স্থির জল-গভীর-এ তো বিল নয়-হোগলা কেটে সাফ করা এমনও মনে হয় না৷ লগি চলবে না৷ শম্ভু লগি রেখে দিয়েছে-পরাণেকে বইঠা বাইতে ইশারায় নিষেধ করছে৷ তার চোখ এখন নীচে জলের গভীরে৷ এই কি সেই মহাশোলের ঝাঁক? জলের অনেক নীচে মস্ত মস্ত শরীর নিয়ে কালো পাখনা নেড়ে পাক খাচ্ছে-এগুলো কি সেই লোক মুখের 'দোষ লাগা' যারা ঠাকুরের পিছে পিছে ঘোরে৷
শালতি সামান্য দুলছে৷ শম্ভুর হাতে কোঁচ-কোঁচটাকে এখন আর তেমন ভরসা করতে পারছে না বুঝি-এ মাছ এত বড়ো-এত নীচে এ কোঁচ হয়তো ছুঁতে পারবে না-আর পয়লা মার ফসকালে বাকিদিনে আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না৷ কিন্তু না-অনেক কিছুই মনে পড়ল শম্ভুর! সে যে শম্ভু আরও একবার মনে করাল নিজেকে৷ তারপর যেমন দেখেছে সাধুকাকাকে-ডান পায়ের ওপর ভর রেখে বাঁ-পাটা একটু এগিয়ে কোনাকুনি জলের ভেতর সমস্ত শক্তিতে ছুড়ে মারল কোঁচটাকে-হয়তো 'উফ' এরকম একটা শব্দও বেরিয়ে এল মুখ থেকে৷ কোঁচটা চলে যাচ্ছে অস্পষ্ট বোঝা গেল মাত্র৷ আন্দাজেই ছোড়া৷ বুঝতে পারল না শম্ভু বা পরাণে-জলের নীচে গিয়ে কী আটকে রইল? ভেসে উঠল না কোনোটাই-না কোঁচ, না মাছ৷ শম্ভু ভাবল এবার আর হল না-সুযোগটা চলে গেল! পরাণের কাছে ছোটো হয়ে গেল বোধ হয়৷ এতদিনের আশা-সাধুকাকার কোঁচ! পরাণেটা এরকমই৷ যখন চেঁচাবে, মনে হবে যেন বাঘে ধরেছে ওকে৷ শম্ভু চমকে উঠেছিল৷ 'হুইই যো!' সত্যিই-ওই দূরে ভেসে উঠেছে নাকি কোঁচটা-সাধুকাকার তৈরি-মোম সুতোয় বাঁধা৷ কী আশ্চর্য! জলের ওপর ছটফট করছে-ওটা কী? এক লহমার জন্য শম্ভুর মনে হল-সে ঠাকুর মহাশোলটাকে মেরে বসেছে বুঝি৷ পরাণের বইঠা পড়ছে ঝপাঝপ৷ শম্ভু দু-হাতে জল কাটছে৷ জল ওখানটায় ফেনা হয়ে যাচ্ছে-আছাড়িপিছাড়ি গোল হয়ে কখনো পাক খাচ্ছে৷-এটা কী?
পরাণে ফুর্তিতে লাফিয়ে উঠল-'গজার! গজার!' অনেকক্ষণ ঝটপটাল মাছটা-ক-বার কোঁচটাসুদ্ধ জলের গভীরে ডুব মারল-আবার ভেসে উঠল৷ শম্ভু স্পষ্ট দেখতে পেল সাধুকাকার কোঁচটা মাছটার পিঠের ওপর দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়েছে বুঝি৷ বিশ্বাসই হচ্ছে না-এ্যাতবড়ো মাছটাকে শম্ভুই মেরেছে৷ আরও খানিক ধস্তাধস্তির পরে মাছটা কাত হয়ে খাবি খাচ্ছে৷ শালতিটা একদম কাছে নিয়ে গেল-এখন হাত বাড়িয়ে মাছটাকে ধরাও যায়৷ কোঁচটার শলা বেয়ে সরু রক্তের ধারা উঠছে জলে৷ কী বিশাল বড়ো মাছ-তার হাতের তিন হাতেরও বেশি হবে-গায়ের দু-পাশে সাদা কালো বড়ো বড়ো ফোঁটা৷ শাল মাছ! পরাণে এটাকে গজার বলছে৷ কোঁচসুদ্ধ তুলতে গিয়ে টের পেল মাছটা কীরকম ভারী-শালতি উলটে যেত বোধ হয়-দু-জনে প্রায় বুকে জড়িয়ে তুলে আনল মাছটাকে-'ক-কেজি হয় বলদিনি?' 'পাঁচ-ছ-কেজি হবে৷'-'কী যে বলিস৷ পাঁচ কেজি কি চাট্টিখানি রে৷'
মাছটা খোলের ভেতর শোল নলা বোয়ালের ওপর ঘটোৎকচের মতো শুয়ে পড়েছে৷ মাঝে লেজ আর পাখনা নেড়ে বোঝাতে চাইছিল সে এখনও মরেনি৷
শম্ভুর মুখে হাসির চাইতে গর্বের রংটাই যেন বেশি৷ সে যে শম্ভু, তার সঙ্গে আর কেউ পারে না-পরাণে নিশ্চয়ই সেটা অনুভব করছে-এটাই বোধ হয় তাকে সবচেয়ে আরাম দিচ্ছিল৷ পরাণে বলে 'মুড়িটা খেনি!' শম্ভু বসে পড়ল৷ খোলা পুঁটলি থেকে মুড়ি অনেকটাই পড়ে গেছে-একটা নাড়ু গড়িয়ে মাছগুলোর মধ্যে৷ পরাণে সেটা নিয়ে শাল মাছটার মুখের সামনে ধরে-'খা!' বলে হেসে ওঠে-শম্ভুও হাসে৷
পেটের অনেকটাই খালি৷ মুড়ি কিন্তু দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল-পেটে খিদেটা ঘাটের শ্যাওলার মতো-থেকেই যায়-যতই ঘষ৷ বিলের জল একটু লোনামতো-খাওয়া যায় না৷ শালতিতে বড়দা একটা জলের হাঁড়ি রেখে দিয়েছে-তাতে কদ্দিনের জল কে জানে- আছেও এইটুকু৷ জল ভরার কথা তাদের একবারও মনে হয়নি৷ এতক্ষণ মুড়ি চিবিয়ে গলা এখন শুকনো কাঠ-ওইটুকু জলে দু-জনের দু-ঢোঁকও বুঝি হয় না৷ পরাণে বলে, 'জলদি ঘর চ৷' শম্ভু জবাব দেয় না-সে দেখছে জলের নীচে-যেখানে আলো যেতে যেতে ফুরিয়ে যাচ্ছে-এখন আর সেই মস্ত কালো কালো শরীরগুলোর একটাকেও দেখা যাচ্ছে না৷ হয়তো আরও গভীরে তারা চলে গেছে-হয়তো ওখানেই আছে সেই মহাশোলটা৷ যাকে খানিক আগে দেখেছিল৷ জলের ওপর ভেসে আছে প্রায় একটা মানুষেরই মতো-মতো কেন-বোধ হয় মানুষই নাকি; পলক ফেলতে জলে মিলিয়ে গেল৷
কিন্তু সত্যি জল খাওয়া দরকার৷ হাওয়া গরম হয়ে উঠেছে-ঘাম গড়াচ্ছে গায়ে৷ এখানে খাবার জল কোথায়? যদি অন্য কোনো নৌকোর দেখা পাওয়া যায়৷ কিন্তু গোলমাল লেগে গেল৷ এখানে তারা এল কোনদিক থেকে? মনসার চর যেটাকে ভেবেছিল কাছে গিয়ে দেখা গেল সেটা মনসার চর নয় এবং মনসার চরটা যে কোনদিকে তাও বোঝা গেল না৷ পরাণে বলে, 'দখনে চ-উত্তরে উজিয়ে এনু, তো দখনেতে সে ভুটভুটির রাস্তা পাব৷' কিন্তু দক্ষিণে জলের গভীরতা কম-হোগলা আর ঘাসবন এত ঘন যে এগুনো অসম্ভব৷ পরাণে ঘাবড়ে গেল৷ গলা দিয়ে শব্দ ফুটছে না৷
কিন্তু শম্ভু? সে তখন মনে আনার চেষ্টা করছে যখন একটা মানুষের মতো মাছ বা মাছের মতো মানুষ জলের ওপর ভাসতে দেখে এখানে ছুটে এল-সে মাছ মানুষ বা মানুষ মাছটা নৌকোর কোনদিকে ছিল-ডান হাতে না বাঁয়ে? যদি ডান হতে হয়ে থাকে-তখন মনসার চর ছিল বাঁ-দিকে৷ তার মানে যেদিক থেকে তারা এসেছে ঠিক ঠিক সে দিকেই মনসার চর- চরে পৌঁছে ভটভটির পথ পেতে অসুবিধা হবে না-আর ভটভটির পথ ধরে সোজা দক্ষিণেই হবে কুসুমগঞ্জ৷ এখান থেকে দক্ষিণে যাবার চেষ্টায় তারা কুসুমগঞ্জে কোনোদিন পৌঁছোতে পারবে না৷ জল ওদিকে কম মানে বোধ হয় বিল শেষ৷ গভীর জলে কি আর হোগলা হয়? তাহলে এখন ঠিক হবে পেছিয়ে যাওয়া-আবার সেই কালো গভীর জলে, তা ছাড়িয়ে হোগলার বন, তা পেরিয়ে কালীনদীর জল, ঢোকার মুখে সেই বাওড়-ওরই সামনে সেই মনসার চরে পৌঁছোনো৷ কাজটা সহজ নয়৷ শম্ভু উঠে দাঁড়াল-মনে মনে বোধ হয় বুক চাপড়াল-সে সর্দার শম্ভু৷ মুখে বলল, 'র দিকি৷' তারপর আন্দাজ মতো বইঠা চালাল-বইঠা ফেলে লগি এবং লগি ঠেলতে ঠেলতে হোগলার বন পেরিয়ে মনসার চরের কাছাকাছি চলেও গেল৷
তখন রোদ হেলে গেছে৷ চরে কারা বসে তামাক খাচ্ছে৷ পরাণে ফিসফিস করে বলে 'দূর দে চল৷ মাছ দেখলে কেড়ে নেবে৷' ওরা কিন্তু দূর থেকেই হাঁক পাড়ল, 'কের্যা? কাদের শালতি?'
পরাণে পালটা হাঁক চেঁচায়-'রঘু হালদারের৷' 'কে রঘু হালদার'-'কুসুমগঞ্জের!' খানিক চুপ৷ কে বলছে-'এরাই সকালে মাছ চুরি করতে এয়েছিল নাকি?' আবার হাঁক আসে-'তুই কে? এখেনে কিছু করতে এয়েছিলি নাকি?' আবার হাঁক আসে-'তুই কে? এখেনে কী?'
'রঘু হালদারের সইমার ব্যাটা!' শম্ভু ঝপাঝপ লগি ঠেলে ফের হোগলা বনে ঢুকে গেছে৷ বাতাসে হুমকি ভেসে আসে-'আমাদের ঘেরায় মাছ ধরলে ছাড়বুনি!' পরাণে চেঁচায়- 'সাইনবোট লাগিয়ে দাও কেনে!' ওরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে-'ধর ধর তো-দেখছ কী বদমাশ ছোঁড়া!' পরাণে তেমনি চেঁচিয়ে বলে, 'এসো কেন! দেঁড়িয়ে আচি!' পরাণে হাসছে, গজারটা দেখতে পেলে কেড়ে নিত, বলত, 'আমাদের ঘেরার মাছ৷'
হয়তো একটু বেশি দূর দিয়ে যাবার চেষ্টায় ওরা যখন ভটভটির রাস্তায় এসে পড়ল সন্ধ্যা লাগছে, জলের কিনারে কিনারে অন্ধকার ভাসছে৷ দূর থেকে একটা ভটভটি আসে-নিশ্চয় হরিগঞ্জ থেকে কেনার গাঁ৷ শালতির কাছাকাছি হতে কে টর্চ ফেলল নৌকোয়, 'কী মাচ র্যা?' পরাণে জবাব দিল-'বিকরির নয়৷' 'আরে ব্বাপ কত বড়ো একটা শাল ধরেছে রে ছোঁড়া দুটো৷ আরে দাঁড়াও দাঁড়াও!' ভটভটি আস্তে হয়ে গেল৷ ভরতি লোক৷ 'এই শালটা দিয়ে দে পঞ্চাশটা টাকা দিচ্ছি৷' লোকটার মুখ ভালো দেখা যাচ্ছে না৷ পরাণে বলল, 'বিকরির নয়৷'
'কেন? এর চেয়ে বেশি দাম পাবি?'
পরাণে রেগে গেল-'বলচি না বিকোবে না৷ ঘর নে যাব৷'
'আরে কথা শোন ছোঁড়ার৷ কোথা ঘর তোর?'
'কুসুমগঞ্জ৷'
'কুসুমগঞ্জ? কার বাড়ি?'
'হালদার বাড়ি-রঘু হালদার৷' নামটা নিশ্চয় পরিচিত৷
ভেতর থেকে কে বলল, 'ছেড়ে দ্যান!' কে কাকে জিজ্ঞাসা করছে 'কে রঘু হালদার?' 'বিডিও আপিসের বড়োবাবু' কে যেন উত্তর দেয়৷ যে ভটভটি চালাচ্ছিল সে বলল, 'তুমি ফণীর কে হও?'
'ভাই৷ এটা বড়দার শালতি৷' ভটভটির ইঞ্জিন আবার চালু হল৷ যে চালাচ্ছিল সেই বোধ হয় বলল, 'অনেকদূর চলে এয়েছ তাড়াতাড়ি ঘর যাও-বিল খুব খারাপ জায়গা!'
বইঠা একটা৷ পরাণে প্রাণপণে চালাচ্ছে৷ কিন্তু অন্ধকারে ডান দিকে ঘোরার বাঁকটা ঠাহর করা কঠিন৷ শম্ভু আশ্বাস দেয়-'র৷ একটু বাদে চাঁদ উটপে৷' চাঁদ উঠল-কিন্তু সেই আলোয় সবুজ হোগলা নলখাগড়ার বন নীল জল সবই একাকার৷ সেই বাঁকটা কি পেরিয়ে এল? ভটভটিটা এতক্ষণে বোধ হয় কেনার গাঁ পৌঁছে গেল-ট ট শব্দটা শোনা যাচ্ছে না৷ পরাণে ভাবছে বড়দা ফেরার আগে ঘরে পৌঁছোতে না পারলে বিপদ৷ বইঠা এখন শম্ভুর হাতে-এই মাছটা এখন কী হবে? আজ রাতে আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হবে না-বাপকে দেখানো গেল না কত বড়ো মাছ ধরেছে চিপুরির বিল থেকে৷
জলে যেন আলো জ্বলছে-এখানে ওখানে৷ পরাণে বলে 'দেও,' ইদ্রিস বলত 'জিন'৷ কোণার ঘাটে আটকে জোরে মোচড় মারে বইঠায়-শালতি যেন লাফ দিল জলে৷ নৌকোর ঠিক সামনে জলে একটা আলো ভাসছে যেন-আলোটা কমছে বাড়ছে৷ পরাণে ফিসফিস করে বলে 'সাপধান! পথ ভোলাচ্ছে!' শম্ভুর গলায় থমথম-'ডরাস নাকি?' তেমনি মোচড় দেয় বইঠায়-যেন জলের সঙ্গেই লড়াই লেগেছে ওর-বইঠা ঝপাঝপ মেরেই যাচ্ছে-যেন কখনোই থামবে না-আস্তেও করবে না৷ তবু জলও যেন ফুরায় না-আরও জল-আরও৷ পরাণে বুঝি ভয় পেয়ে গেছে-ঠাকুর দেবতাকে ডাকছে নিশ্চয়৷
আলোটা জলে পাক খাচ্ছে-ডানদিকে ঘুরে যাচ্ছে৷ শম্ভু যেন তেড়ে গেল আলোটাকে-শালতি ছুটেছে৷ পরাণের গলা শুকিয়ে খটখটে৷ সে জানে শম্ভুর সাহস, গায়ের জোর; জানে শম্ভু বাহাদুর৷ কিন্তু জলের ওই আলোকে তেড়ে যায়-এ শম্ভু তো ভয়ংকর৷ একটু আগেও সে দু-হাত দিয়ে জল কাটছিল, হাত তুলে নিল-ভয়ে নাকি? না, এখন মনে হচ্ছে শম্ভুকে সাহায্য করার দরকার নেই৷ ও শম্ভু-ও ঠিক নিয়ে যাবে কুসুমগঞ্জের ঘাটে- নাহয় সারাদিনই লগি ঠেলেছে-নাহয় ভাতই খায়নি-শম্ভু সব পারে৷ পরাণে শালতির সঙ্গে আঠা লেগে জুড়ে গেছে যেন-মনে ভাবে শম্ভুর সঙ্গে আর নয় এমন যাওয়া! একবার বলতে গেল-'যাচ্ছিস কোথায়? কুসুমগঞ্জ ফিরবি না?' কিন্তু চাঁদনির আবছা আলোয় শম্ভুর ঘাম চকচকে মুখ-ঘামভেজা গায়ে আলো পিছলে যাচ্ছে-চোখ-মুখ আবছা- চকচকে, ওকে দেখে কেমন ভয় করছে পরাণের-ও কোনো শব্দই করতে পারল না৷
জলের আলোটা কোথায়? ঝাঁক ঝাঁক জোনাকি যেন আকাশ ছেড়ে জলের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে-হোগলা নলখাগড়ার বন ছেয়ে আছে তাদের ফুল ফুল আলো৷ 'তোদের ঘাটে এয়েচি!' শম্ভুর গলাটা কেমন খসখস করে উঠল-সত্যি! হালদার বাড়ির ঘাট! ঘাটে আলো জ্বলছে-লোকজন দাঁড়িয়ে নৌকোও যেন কয়েকটা!
'সব্বোনাশ!' পরাণের গলা দিয়ে ফসফস করে একটু হাওয়া বেরোল শুধু৷ কাছাকাছি হতে একসঙ্গে কতগুলো টর্চের আলো এসে পড়ল ওদের ওপর-'ওই যে! ওই যে ওরা৷' আট-দশজন লোক দু-খানা নৌকো নিয়ে বেরোচ্ছিল ওদের খুঁজতে৷ বড়দা, ছোড়দা, মেসো, সেই পিসি-সবাই ঘাটে৷ বড়দা কাউকে কিছু বলতে দিল না, শুধু মাছটা দু-হাতে তুলে বলল, 'শাবাশ! এটাকে তুললি কী করে? এ যে অরিজিনাল তেনার ঝাঁকের মাছ!'
সব মাছ হেঁসেলে চলে গেলেও সেই বিশাল শাল বা গজার আঙিনায় পড়ে রইল তেমনি চিত হয়ে৷ তার সামনে পিসি একটা হ্যারিকেন জ্বেলে দিয়ে গেল৷ পাড়ার লোক আসছে তো আসছেই-ভিড়ই হয়ে গেল৷ কেউ বিশ্বাসই করছে না ওটা ওরা মেরেছে৷ আশ্চর্য!
মহাশোল
সইমা কাঁদছিল খুব৷ বকল পরাণেকে, 'এমন কত্তে আচে রে পোড়া কপালে! বাপকে খেয়ে আচিস-তোর যদি কিছু হত? মার কতা কি ভাবিস?-মার কী হত রে অভাগা!' সইমা সে মাছের কপালে তেল সিঁদুর দিল-ধান দুর্বো দিয়ে গড় করল-আর ঝাঁকের মাছ যে অনেক পুণ্যে ঘরে এসেছে৷ সে রাতেই মাছটার দর উঠল একশো পঁচিশ টাকা৷ বড়দা বলল, 'বেচেদি-শম্ভু পরাণের বাড়িতে উপকার হবে-এ তো নিয়ে যাওয়া চলবেনি৷' হাজরাবাবুরা কিনে নিলেন৷ কে বলল 'ছ-কেজির ওপর মাছটা, হাজিপুরে কম করে দেড়-শো৷' বড়দা বলে, 'নে যাবেটা কে?'
রাতে নানারকম রান্না হল-মাছ ভাজা, চচ্চড়ি, ঝোল, টক৷ মেসো আর বড়দার মাঝখানে বসেছে শম্ভু আর পরাণে৷ 'জানো বড়দা, আসচি-দেকি জলের ভেতর আলো জ্বলচে৷' মেসো বলল, 'সে আলো আমিও একবার দেকিচি৷ সরোর সম্বন্ধ এল হবিগঞ্জ থেকে- কানাইকে নে গেলাম৷ বাবার সেই দুই দাঁড়ের নাওটা ছিল-যায় যেন লাপিয়ে লাপিয়ে৷ খেয়ে-দেয়ে ফিরতে অনেক রাত৷ তিন নম্বর ছাড়িয়ে আসচি-দিকি জলে দাউদাউ আগুন-দপ করে জ্বলে উঠে-তারপরেই আর নেই৷' 'ও তো আলেয়া!' বড়দা হেসে ওঠে৷ মেসো খুব রেগে গেল-'কীসের আলেয়া? আলেয়া আমি চিনি নে?'
ভোরে উঠতে হবে ভোরেই ফিরতে হবে-না হলে বাপ ভাববে-পরাণের মাও কাঁদতে শুরু করবে৷ শুয়ে শুয়ে শম্ভু ভাবছে পরাণেকে বলবে কি না কথাটা৷ 'তুই যে আলো দেকেচিস জলে-কী রে ঘুম লাগল নাকি?'
'না, ঘুমোইনি৷ কী বলছিলি আলোর কথা?' পরাণ এপাশ ফেরে৷
'ওই যে আলো দেকেছিস জলে-ওটা আলো ছিল না৷'
'তবে?'
'ওটাই তো মহাশোল৷ পত্থমটা আমো বুজতে পারিনি৷ পরে দেকেচি৷ আর সারাক্ষণ ও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গেছিল কখনো শালতির নীচে-কখনো সামনে৷ ওর পাছু পাছুই তো ঘাটে চলে এলাম৷ আমি কি তোদের বিলের রাস্তা চিনি?'
শারদীয়া ১৪০২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন