গরিবের দান

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

শান্তিরাম পথ দিয়ে যায় আর ভাবে, জগতে কোনো কাজই আর তাকে দিয়ে হল না৷ এত গরিব সে, যে তার দোরে ভিখারি এলে, একমুঠো চাল তাকে দেবার শক্তি তার নেই৷ পথের পাশে ছাল-ছাড়ানো নারকোলের মতো শুকনো টিংটিঙে কুকুরগুলি ঘুরে বেড়ায়, কোথাও একটু খাবার পায় না, শান্তিরাম দেখে আর ওদের দুঃখে কাঁদে৷ কিন্তু সব চেয়ে দুঃখ হয় আজকাল তার এই পথটা দিয়ে যেতে৷ গাঁয়ের জমিদার মস্ত বড়ো লোক, মেলাই তাঁর টাকা৷ যেমনি বড়ো জমিদার, তেমনি বিরাট তার দানখয়রাতের ফর্দ৷ সেই জমিদার এবার অনেক টাকা খরচ করে এক দেবমন্দির তুলছেন; লোকজন, ইট, কাঠ, সুরকি, বালি, শ্বেতপাথরে গাঁ বোঝাই হয়ে গেছে৷ বিরাট সুন্দর বাড়ি উঠছে৷

বাগদির ছেলে সে, তায় গরিব, এই মন্দিরের কাছাকাছি যেতেও তার ভরসা হয় না৷ কিন্তু ভগবানের কাজ করতে তার এত ইচ্ছা করে! তার বুধি গাই তো গাঁয়ের সবই চেনে, আপন মনে সে মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে ঘাস খেতে চলে যায়; শান্তিরাম মস্ত বড়ো একটা বট গাছের ছায়ায় বসে বসে সেই দালান দেখে আর ভাবে-কেমন করে সে সাহায্য করবে দেবতার মন্দির গড়ে তুলতে৷

ভিন গাঁ থেকে গাড়ি বোঝাই মাটি আসে রোজ৷ গোরুগুলি পরিশ্রমে আধমরা হয়ে ধুঁকতে থাকে, শান্তিরাম ভাবে-হায়, এই অবোধ প্রাণীরাও ভগবানের কাজ এত করতে পারে, কিন্তু সে কী করছে! হঠাৎ তার মনে হল-নাই-বা পারল সে ওইসব কারিগরদের মতো মোট বইতে, কাজ করতে; কিন্তু ওই গোরুদের তো আর জাত নেই, সে যদি তাদের রোজ ঘাস খাওয়ায়, তবে ভগবান নিশ্চয়ই খুশি হবেন৷ গোরুগুলি সুস্থ থাকলে তবে তো তারা ভালো করে কাজ করবে৷ সেদিন থেকে রোজ তার কাজ হল তাই-সারাদিন ধরে সে ঘাস কেটে জমায়, পরদিন গোরুদের খেতে দেয়৷ তার চোখের সামনে সাদা মার্বেল পাথরের সুন্দর সুন্দর মন্দির গড়ে ওঠে৷ সে মনে মনে ভাবে, এর মধ্যে তারও একটু কাজ যেন আছে৷

এমনিভাবে, ভিতরের মন্দিরের বেদি তৈরি হল, সামনের সেগুন কাঠের মস্ত মস্ত দরজা হল, উপরে প্রকাণ্ড গম্বুজ হল; দেয়ালে আঁটকানো হল রামায়ণ মহাভারতের গল্পগাথা, শ্রীকৃষ্ণ শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন কথা৷ সামনের মোটা মোটা থামগুলি সুন্দর কারুকার্যে চমৎকার হয়ে উঠল৷

শান্তিরাম রোজ দেখে আর ভাবে, এই থাম, এই মন্দির, ওই বেদি, সব যেন তাকে দেখে হাসে; পাখি, গাছপালা, বাতাস সবাই যেন তাকে শোনাবার জন্য গান গায়৷ ভগবানের কাজ করছে সে! এমনি করে, শান্তিরাম গাছপালায়, মাঠেঘাটে একটা নতুন আনন্দের আমেজ পেয়ে খুশি হয়ে উঠে৷ জীবন যে তারও আনন্দময় হয়ে ওঠে, সেও যেন চেষ্টা করলে অনেক কাজ করতে পারে৷ আজ যে সব তার দিকে-এই গাছপালা, আলো, হাওয়া সব৷

একদিন মন্দির গড়া শেষ হল, বেদিতে সোনার কাজ করে লিখে দেওয়া হল জমিদারের নাম-তাঁরই টাকায় গড়া এই মন্দির! চমৎকার একখানা দামি সিল্ক দিয়ে বেদি ঢাকা, উপরের মুরলীধর শ্রীকৃষ্ণ মূর্তি, সুন্দর একটা মখমলে ঢাকা৷ আজ ঠাকুরমশায় এসে, সেই মখমল খুলে দিয়ে, বেদির কাপড় তুলে নিয়ে মন্দিরে বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করবেন৷ দেশ-বিদেশে গেল জমিদারের নিমন্ত্রণ৷ ব্রাহ্মণে পণ্ডিতে সামনের মাঠ ভরে গেল৷ বিরাট ব্যাপার! শান্তিরাম দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে অছে৷ দূর থেকে ভগবানের আশীর্বাদ চাওয়া ছাড়া তার আর কী-ই বা করবার আছে!

সময় হয়ে এল৷ গাঁয়ের সবাই ছুটল মন্দিরে৷ জমিদার গর্বভরে সবার দিকে চাইলেন- কী বিরাট তাঁর কীর্তি!

পুরোহিত বিগ্রহের কাপড় খুললেন, তারপর তুললেন বেদির কাপড়৷

ও কী! সবাই বিস্ময়ে অবাক হয়ে দেখল বেদির উপর লেখা রয়েছে-এই মন্দির তুলেছে বাগদিপাড়ার শান্তিরাম!

পুরোহিত অবাক, জমিদার অবাক, অভ্যাগত সকলে অবাক!

ভগবান উপরে দাঁড়িয়ে হাসলেন-সত্যকারের দান তো হল তারই, যার দান আসে হৃদয় থেকে; অর্থে, দম্ভে-ভরা দান তো ভগবান নেন না৷

বুঝল সবাই৷ পুরোহিত বিগ্রহের মুখে দেখলেন প্রেমের চিহ্ন৷ বেরিয়ে গিয়ে, শান্তিরামকে বুকে করে নিয়ে মন্দিরে ঢুকলেন৷

কার্তিক ১৩৩৯

Cov73
সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%