অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
মুকুন্দরাম ছিল দাদাদের ক্রিকেট টিমের ভীষণ মেজাজি ক্যাপ্টেন৷ ওর তাড়নায় খেলার মাঠে গল্পগুজব করবার উপায় ছিল না৷ ও বলত ম্যাচের দিনে মাঠে নেবে খেলার সময় বল ফসকে যাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে অন্যমনস্কতা৷ নেট প্র্যাকটিসে ব্যাট করবার সময়ও এধার-ওধার তাকালে তার কাছে প্লেয়ারদের ধমক খেতে হত৷ ম্যাচের দিনে বেজায় গম্ভীর হয়ে যেত৷ ভাবখানা যেন মরণ-বাঁচন যুদ্ধের সেনাপতি৷ যতক্ষণ না খেলায় জিত হচ্ছে কেউ তার মুখে হাসি দেখত না৷ আর হার হলে সে সারা সপ্তাহ মনমরা হয়ে থাকত৷
আমি তখন স্কুলে পড়ি৷ বয়সের অনুপাতে দেখতে বড়ো ছিলাম বলে দাদাদের ক্লাবে তরুণ সভ্যদের মধ্যে ভিড়ে যেতাম৷ প্র্যাকটিসের সময় দূরে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বা বড়ো জোর বল করতে পেতাম, ব্যাট করার সৌভাগ্য হয়নি কোনোদিন৷ ম্যাচ খেলায় চান্স পাওয়া ছিল স্বপ্নমাত্র৷
একবার একটা বড়ো ম্যাচ৷ খেলার দিন মাঠে গিয়ে দেখি মুকুন্দরাম পাগলের মতো ছুটোছুটি করছে৷ শুনলাম শেষ মুহূর্তে খবর এসেছে যে দু-জন খেলোয়াড় আগের রাত্রে বিয়ের ভোজ খেয়ে অসুস্থ৷ আসতে পারবে কি না সন্দেহ৷ আমার সাদা প্যান্ট পরা ছিল বলে ক্যাপ্টেনের সামনে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম যদি ফিল্ডিংয়ে বদলি হিসেবে সুনজরে পড়ি৷
টসে জিতে মুকুন্দরামের মনে একটু ভরসা এল৷ সে বিপক্ষ দলকে ব্যাট করতে পাঠাবে মনস্থ করে আমাকে জুতো বদল করে আসতে নির্দেশ দিয়ে বলল, 'ফজল মহম্মদ আসা পর্যন্ত সাবস্টিট্যুট খাট৷'
আমি তো সেইটুকু সৌভাগ্যেই কৃতার্থ৷ বুঝলাম প্র্যাকটিসের সময় বেগার খাটা বৃথা হয়নি৷
বিপক্ষ দল দুই উইকেট হারিয়ে নব্বই রান তুলে ফেলল৷ মুকুন্দরামের মেজাজ তিরিক্ষি৷ পরপর দুটো বাই বাউন্ড্রি হয়ে যেতে উইকেট রক্ষক জোর ধমক খেল৷ ম্যাটিংয়ের নীচে এক জায়গায় কিছু একটা ছিল যে জন্যে এক-একটা বল গড়াচ্ছিল বা লাফাচ্ছিল৷ একটা ফাস্ট বল হঠাৎ লাফাতেই উইকেট কিপারের ভুরু কেটে রক্তারক্তি৷ তার বদলে আর কেউ উইকেটের পিছনে দাঁড়াতে রাজি হচ্ছে না দেখে আমি ভরসা করে ক্যাপ্টেনকে জানালাম যে স্কুলের টিমে আমি নিয়মিত উইকেট কিপিং করে থাকি! মুকুন্দরাম নিজের টিমের খেলোয়াড়দের ওপর চটে থাকবে৷ বলে ফেলল, 'শাবাশ, দেখো হুশিয়ারসে-'৷ যা আশা করেছিলাম তাই হল৷ ও ভুলেই গিয়ে থাকবে যে এবার আমাকে বাধ্য হয়ে ব্যাটিং করতে দিতে হবে৷ উইকেট কিপারের সাবস্টিট্যুট হয় না৷ প্যাড গ্লাভস পরিয়ে দিল পাঁচজনে৷ মন্দ বল আটকালাম না৷ একটা ক্যাচও ধরলাম৷
ওরা ঘণ্টা তিনেক খেলে ৯ উইকেটে ২১৫ রান তুলল৷ তারপর লাঞ্চ৷ দু-জন বদলির একজন তো ভাগ্যগুণে কায়েমি হয়ে গেল৷ বিরতির পর মুকুন্দের খামখেয়ালে দশজন ফিল্ডিং করতে লাগলাম৷
আমাদের দলে মুকুন্দ আর আবদুল মজিদ ছিল সেঞ্চুরি ব্যাটসম্যান৷ তা ছাড়া আরও তিন-চারজন মোটামুটি ভালো ব্যাট করে৷ যে দু-জন আসতে পারেনি তাদের একজন ভালো মারিয়ে খেলোয়াড়৷ অন্যজন বোলার৷ একদিনের খেলাতে সে এখন না এলেও চলে৷
যাই হোক লাঞ্চের পর ওরা ২১৭ রানে আউট হয়ে গেল৷ এমন কিছু বেশি রান নয়৷ কিন্তু মুকুন্দরাম আর ক্লাবের অন্য চাঁইরা দুশ্চিন্তায় পড়ল কারণ ব্যাট চালানেওয়ালা তো ওই নয় জন৷ আমি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ি না৷ আর অসুস্থ ভালো ব্যাটসমানের কোনো খবর নেই৷
এরা কেউ জানে না আমি মোম্বাসায় থাকতে স্কুলের টিমের হয়ে সব চেয়ে বেশি রান তুলতাম৷ বাবা নাইরোবিতে বদলি হয়ে আসা পর্যন্ত আমি খেলা দেখাবার সুযোগ পাইনি৷
সেদিন ঘণ্টা খানেক খেলার পর সকলের মুখ চুন হয়ে গেল৷ মুকুন্দরাম ও মজিদ দু-জনেই আউট৷ বোর্ডে রান সংখ্যা চার উইকেটে মাত্র সত্তর৷ মুকুন্দ দশ নম্বরে আমার নাম লিখে তার সাইকেলটায় চড়ে ফজল মহম্মদকে তুলে আনতে গেল৷ নব্বুই রানে সাত উইকেট৷ আমি প্যাড পরলাম৷ তখনও মুকুন্দরামের দেখা নাই৷ গুজব শুনলাম ক্লাবের সেক্রেটারি মুলজিভাইর কাছে খবর এসেছে যে সে নাকি মোহন সিং নামে একজন শিখ মিলিটারি ঘোড়ার ডাক্তারকে পাঠাচ্ছে৷ ভালো ব্যাট করে৷ সে আমার আগে ব্যাট করতে নামবে৷ ততক্ষণ যেন কোনো রকমে ঠেকিয়ে রাখা হয়৷ আট উইকেটে হল এক-শো দশ৷ আমি মাঠে নামবার সময় দেখি উল্কা বেগে একটা সাইকেল আসছে৷ আরোহীর পরনে সাদা প্যান্ট, মাথায় পাগড়ি৷ পা চালিয়ে ক্রিজে গিয়ে তাড়াতাড়ি গার্ড নিলাম৷
ওভারের বাকি বলের দুটোকে ঠেকিয়ে তৃতীয়টিকে লেটকাট করে বাউন্ড্রির বাইরে পাঠিয়ে দিলাম এবং শেষ বলটাকে লাফাতে দেখে হুক করে চার রান৷ আমার এই হঠকারিতায় ভিন্ন দিকের ব্যাটসম্যানের চক্ষু তো ছানাবড়া৷ বোধকরি তারই জোরে সে পরের ওভারের প্রথম বলটাই উঁচু ক্যাচ দিয়ে বিদায় নিল৷ আমি দিক বদল করে নিলাম৷
দেখি একজন দাড়িওয়ালা অচেনা শিখ ব্যাট হাতে একটু খুঁড়িয়ে হেঁটে ক্রিজে আসছে কিন্তু কোনো রানার নেয়নি৷ আর একটা মাত্র উইকেট বাকি৷ ফিল্ডাররা আমাকে ঘিরে দাঁড়াল৷ ফাস্ট বোলারকে সরিয়ে ওদের স্পিন বোলারকে আনা হল৷ আমি এগিয়ে সোজা ড্রাইভ করে প্রথম বলটাকে বাউন্ড্রির বাইরে পাঠিয়ে দিতে হর্ষধ্বনি উঠল৷ কিন্তু নবাগত শিখ খেলোয়াড় সে মার তারিফ না করে এগিয়ে এসে বলল, 'স্টেডি'৷ হাড়পিত্তি জ্বলে গেল৷ একটা ঝাঁজালো গন্ধ নাকে এল৷ মদ খেয়ে এসেছে নাকি? তা ছাড়া চোখে-মুখে যেন কর্তৃত্বের ভাব৷
ওকে অগ্রাহ্য করে লেগ গ্লান্স আর লেটকাট মেরেও আরও ছয় রান করে স্কয়্যার বাউন্ড্রির দিকে একটা উঁচু ক্যাচ তুলে দিলাম৷ সৌভাগ্যবশত সেখানে ফিল্ডার ছিল না৷ অনায়াসে তিনটে রান হয়ে যেত কিন্তু সর্দারজি দুটোর বেশি নিল না৷ বুঝলাম যে পরের ওভারটা সে নিজে খেলবার মতলবে আছে৷ ওদের ফিল্ডাররা নতুন লোককে নার্ভাস করে দেবার মতলবে কাছাকাছি ঘিরে দাঁড়াল৷ খোঁড়া লোকের ফুট-ওয়ার্ক দেখে আমি অবাক হলাম৷ লাফ দিয়ে এসে প্রথম বলটাকে ব্রেকের মুখে উড়িয়ে ফেলল প্যাভিলিয়ানের মাথায়৷ পরের মার কভার ড্রাইভ বুলেটের গতিতে৷ তখনও হার অবশ্যম্ভাবী কিন্তু প্যাভিলিয়ান যেন উত্তেজনা আর উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়ল৷ ভাবলাম তাড়ু হিটার-দু-চারবার লম্ফঝম্পের পর তে-কাঠি ছত্রাকারে ফাঁক হয়ে যাবে৷ এদিক চড়চড় করে রান উঠছে দেখে বিপক্ষদলের ক্যাপ্টেন মরিয়া হয়ে নিজের হাতে বল তুলে নিল৷ সে ওভারে সর্দারজি আরও গোটা দুই বাউন্ড্রি মেরে শেষের বলটাকে ফাইন লেগে ঘুরিয়ে দিয়ে একটা রান নেবার মতলবে ছিল, কিন্তু আমি গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে তার পায়ে ব্যথা৷ সে যেন দাঁত খিঁচিয়ে কী বলল৷ আমি কোনো গ্রাহ্য না করে নিজের মতো খেলে গেলাম৷ সে ওভারে দশ রান বাড়ল৷ তারপর সর্দারজির পালা৷ আমি তার খেলার কায়দা দেখে মুগ্ধ৷ পায়ের আঘাত ভুলে সে নেচে নেচে প্রতিটি বলকে ফিল্ডারদের ব্যূহ ভেদ করে বাউন্ড্রি পার করিয়ে দেবার চেষ্টা করছিল৷ পাঁচ বলে বারো রান করে শর্ট রান নিয়ে আমার দিকে আসতে চাইল৷ কিন্তু আমি নট নড়ন-চড়ন নট-কিচ্ছু-নাথিং৷ বললাম, 'নো রিস্ক'৷ ও আমার মুণ্ডুপাত করছে বলে মনে হল৷ রান ক্রমে বাড়তে বাড়তে এক-শো আশির কোঠায় উঠে যেতে আমাদের ক্লাবের কর্তা ব্যক্তিদের বোধ করি নার্ভাস ব্রেক ডাউন হবার উপক্রম হয়েছিল কারণ দূর থেকে দেখতে পেলাম ছেলে ছোকরাদের লাফালাফি চেঁচামেচি করতে বারণ করা হচ্ছে৷
বিপক্ষদল রান বাঁচাবার চেষ্টায় ফিল্ডারদের দূরে দূরে ছড়িয়ে দিয়েছে৷ আমার মারে তেমন জোর নেই দেখে একজন বোলার লোপ্পা লোপ্পা লেগ ব্রেক ফেলতে শুরু করল৷ প্রথম দুটো ছেড়ে দিয়ে তৃতীয়টাকে শর্ট পিচ দেখে ঘুরিয়ে দিলাম স্কয়্যার লেগে৷ ব্যাটের ঠিক জায়গায় লাগেনি৷ দেখি বল আকাশে উড়ছে আর সর্দারজি একেবারে আমার নাকের ডগায় এসে গর্জন ছাড়ছে, 'রান রান-বুড়বাক, হি মে মিস ইট৷' সে আমাকে একরকম টেনে তার নিজের উইকেটে পাঠিয়ে দিল৷ তারপরেই তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বলটা ফিল্ডারের আঙুল বাঁচিয়ে বাউন্ড্রির ওপারে গিয়ে পড়ল৷ বড়ো মাঠে সেই আমার প্রথম ছক্কা৷ ক্রস করে ফিরে আসবার সময় সর্দারজি আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'নো মোর হিটিং-ওয়ান বাই ওয়ান৷'
বললাম, 'তোমার পা-'
ও বলল, 'ভুল যাও-' এরপর দুই দুই করে চার রান করলাম৷ সর্দারজির দান এলে সে একটার পর একটা গড়ানে বাউন্ড্রি মেরে মেরে এক ওভারে ষোলো রান তুলে দিল৷ প্যাভিলিয়ান তখন নিস্তব্ধ৷ উত্তেজনায় আশঙ্কায় আমারও শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এসেছে৷ মাত্র ছ-টা রান বাকি৷ ফিল্ডাররা আবার কাছে এগিয়ে এল৷ আমি তড়পে লাফ দিয়ে লেগে ঘোরাতে গিয়ে মিস করে ক্রিজ থেকে বেরিয়ে যেতে দশজনের কন্ঠে নির্ঘোষ শুনলাম 'হাউস দ্যাট-' দেখি উইকেট ভাঙা৷ লজ্জায় ক্ষোভে মাটিতে মিশে যেতে চাইলাম৷ সর্দারজি দেখি উত্তেজনায় এক খামচা দাড়ি ছিঁড়ে ফেলেছে আর অবাক হয়ে দূরে তাকিয়ে আছে৷ তার পিছনের আম্পায়ার দেখি বাই বাউন্ড্রির সিগনাল দিচ্ছে৷ আরও দেখি সর্দারজি ছেঁড়া দাড়িধরা মুঠোটা পকেটে পুরল৷ আর ভুল করিনি৷ শ্রেষ্ঠ মার হল কভার ড্রাইভ৷
এলোমেলো নানা কথার মধ্যে মনে পড়ে সর্দারজি আনন্দের চোটে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল৷ তার মুখে মদের গন্ধ ছাড়া লক্ষ করেছিলাম বুকময় ছেঁড়া দাড়ি৷
জয়ের উল্লাস ও হুল্লোড়ের মধ্যে কখন মোহন সিং সরে পড়ল এবং মুকুন্দরাম হাজির হল কেউ খেয়াল করেনি৷ মুকুন্দরামকে বলতে শুনলাম যে, সে ফজলের জন্যে ডাক্তার ডাকতে গিয়ে দেরি করে ফেলেছিল, তারপর হেঁটে আসে৷ সাইকেলটাকে নাকি মোহন সিংয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়৷
আমি কিন্তু ড্রেসিংরুমে জুতো বদলাবার সময় দেখতে পাই মুকুন্দরামের কিটব্যাগ থেকে একটা হালকা নীল রঙের পাগড়ি উঁকি মারছে৷ ব্যাগ ফাঁক করে দেখি ভিতরে একরাশ ছেঁড়া চুল তাই থেকে ভুরভুরে মদের গন্ধ বার হচ্ছে৷
সর্দারজিকে আর কখনো দেখিনি৷ সে নাকি সেই রাতেই সুদূর উত্তরে সোমালি প্রদেশে চলে যায়৷
সেই গন্ধটা কিন্তু মদের নয়৷ পরে জেনেছিলাম মেক-আপ স্পিরিট গামের ওইরকম উগ্র গন্ধ হয়৷
বৈশাখ ১৩৮১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন