অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক ছিল ধোপা তার নাম হাবু৷ তার ছিল এক গাধা৷ ধোপারা যেমন গাধার পিঠে কাপড়ের বস্তা দিয়ে নিয়ে যায় সেও তেমনি করত৷ তাই নিয়ে তার গিন্নি কত ঠাট্টা কত বকাবকি করত তার ঠিক নেই৷ বলত, 'দেখো রাজবাড়ির ধোপার কেমন সুন্দর ঘোড়া-সে ঘোড়ায় করে কাপড় নিয়ে যায় তার ছেলেরাও কখনো কখনো তার উপর সওয়ার হয়ে বেড়িয়ে বেড়ায় আর তোমার কিনা এই গাধা নিয়েই কারবার-তোমার হল কী?' সে বেচারা গিন্নির লাঞ্ছনায় তিতি-বিরক্ত হয়ে স্থির করল এবার যেন তেন প্রকারেণ একটা ঘোড়া কিনতে হবে৷ এক মাসে তার অনেক কষ্টে ৫টি টাকা জমেছিল৷ সেই টাকা ক-টি হাতে করে বাজারময় ঘুরে বেড়াতে লাগল৷ যার কাছে ঘোড়া কেনবার কথা বলে সেই তাকে হাঁকিয়ে দেয়-বলে, '৫ টাকায় আবার ঘোড়া কিনতে এসেছে, মিনসের রকম দেখো না?'
সে মুখ চুন করে বাড়ি ফিরছে, এমন সময় একজন নাপিতের সঙ্গে দেখা হল৷ নাপিত জিজ্ঞাসা করল, 'কেন ভাই তোমার কী হয়েছে? অমন মুখভার করে চলেছ কোথায়?' হাবু বলল, 'আর ভাই কী বলব-আমি একটা ঘোড়া কিনতে চাই-ঘোড়া না হলে আমার গিন্নি আমাকে খেয়েই ফেলবে-আমি যার কাছে কিনতে যাই সেই আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়৷ আমি কত খেটেখুটে এই ৫ টাকা জমালুম-সবটাই কড়ায়-গণ্ডায় দিতে প্রস্তুত তবু কেউ আমার কথায় কান দেয় না৷ কী করি বলো দেখি নাপিত ভায়া?' নাপিত বলল, 'তা ভাবনা কীসের? আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি৷ তোমাকে ঘোড়া না দিতে পারি ঘোড়ার ডিম এনে দিচ্ছি-সে ডিম ফুটলে এমন সুন্দর বাচ্চা হবে যে, যে দেখবে তার তাক লেগে যাবে৷ তুমি একটু বসো আমি এখনই তোমাকে এনে দিচ্ছি৷'
কাছেই নাপিতের কুঁড়ে ঘর ছিল, সেখানে গিয়ে বেশ একটা বড়ো কুমড়ো বের করল, তার উপর ভালো করে চুন মাখিয়ে ধোপার কাছে এনে হাজির, 'এই দেখো ভাই, তোমার জন্য ডিম এনেছি৷ এর দাম অনেক, কিন্তু বন্ধুতার খাতিরে তোমাকে সস্তা দিচ্ছি, আমাকে এই ৫ টাকা দিলেই হবে৷ এটা ৭-৮ দিন রোদ্দুরে রাখতে হবে, তারপর ফুটলে এর থেকে এমন ঘোড়ার বাচ্চা বেরোবে যে তুমি তখনই তার উপর চড়ে দৌড়ে বেড়াতে পারবে৷' এই বলে হাবুর কাছ থেকে পঞ্চমুদ্রা নিয়ে পিটটান দিল৷
হাবু তো ভারি খুশি, সে তখুনি ডিম মাথায় করে নিয়ে চলল৷ যেতে যেতে তার মনে নানান খেয়াল উঠতে লাগল-কেমন সুন্দর বাচ্চা হবে-যখন বড়ো হয়ে তার উপর চড়ে বেড়াব আর যখন টক টক করে গিন্নির সামনে দিয়ে চড়ে যাব, তাকে দেখে অবাক হয়ে যাবে৷ আর আমাকে খোঁটা দিতে পারবে না৷ বলতে বলতে সে সত্যই এমন দ্রুতবেগে ছুটল যে ডিমটা মাথা থেকে পড়ে ছরকুটে গেল৷
সেই সময় কাছ থেকে একটা শেয়াল যাচ্ছিল৷ তাকে দেখে হাবু ভাবল, 'এই বুঝি বাচ্চা বেরিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে'-এই ভেবে তার পিছনে পিছনে ছুটল, এই ধরে আর কি৷ যখন ধর ধর হল তখন শেয়ালটা দুই পায়ের মধ্যে লেজ গুটিয়ে দে ছুট৷ তাকে হাবু আর ধরতে পারল না৷ কাজেই খালি হাতে ঘরে ফিরে যেতে হল৷ মাথা হেঁট করে গিন্নির কাছে গিয়ে উপস্থিত৷ বৃত্তান্তটা শুনে গিন্নি জ্বলেপুড়ে মরেন আর কি৷ 'এই বুঝি তোমার ঘোড়া৷ ধিক তোমাকে! টাকা যা কিছু কষ্টেসৃষ্টে জমিয়েছিলে তাও জলে ঢেলে এলে৷ আমাদের এ মাসটা চালানো ভার৷ হাবার গাধাই সাজে-ঘোড়া কিনতে যাওয়া তার পক্ষে বামনের চাঁদে হাত বাড়াবার মতন৷ আমি আগেই জানতুম তুমি হাজার মাথা খুঁড়লেও তার কোনো ফল হবে না৷'
এদিকে শেয়াল ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে তার বাড়ি পৌঁছোল আর পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে ধোপার কথা রাষ্ট্র করে দিল৷ শেয়ালদের এক খণ্ড সভা বসল৷ পরে অনেক মন্ত্রণার পর শেয়ালের যুক্তিতে যা স্থির হল সভাপতি বলে দিলেন৷
প্রথমে এই, যে দিনের বেলায় বেরোতে হলে শেয়ালদের ন্যাজ গুটিয়ে বেড়াতে হবে৷
দ্বিতীয় এই, যে সকাল-সন্ধ্যা যে যত পার চেঁচিয়ে ডাক ছাড়বে আর যখনই হোক এক জনের ডাক শুনলে দশজনে তাতে যোগ দিয়ে সকলকে সাবধান করে দেবে৷ এই নিয়মে না চললে ধোপার হাতে কোনোদিন তোমাদের প্রাণটা খোয়াতে হবে তা বলা যায় না৷ সেই অবধি শেয়ালদের মধ্যে এই নিয়মগুলি চলিত হয়ে গেল৷
ধোপা যদিও আপনার ঘরে গিন্নির কাছে অপদস্থ কিন্তু শেয়াল মহলে তার খুব মান, তার নামে সকলেই সশঙ্কিত৷
জ্যৈষ্ঠ ১৩২০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন