অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
খেলতে যাচ্ছিলাম মফস্সলের একটা জায়গায়৷
ট্রেনে দলের সবাই ছিল৷ কিন্তু আমরা যে কামরায় উঠেছিলাম তাতে ছিলাম দলের মাত্র চার জন, আমি, নরেশ, সুকোমল আর সুধাংশু৷
শনিবার ৩টায় ট্রেন৷ আমরা একটু আগেই এসেছিলাম, তখনও গাড়িতে ভিড় হয় নাই; কিন্তু জানিতাম অফিস-ফেরত যাত্রীবাবুরা সব যখন এসে পড়বে তখন আর তিল ধারনের স্থান থাকবে না৷ তাই আমি একটা শতরঞ্চ বিছিয়ে একটু হাত-পা মেলে বসবার জোগাড় করছিলাম৷
সুধাংশু আমাকে একটা ঠেলা মেরে বলল, 'ওহে বিনয়, আমাদের এ ট্রেন কি বালিগাছা ধরবে?'
আমি বললাম, 'হাঁ৷ কিন্তু কেন বলো দেখি? ছোটো-বড়ো এত স্টেশন থাকতে বালিগাছার কথা হঠাৎ তোমার মনে এল কেন?'
সে বলল, 'ছোটোবেলা থেকেই বালিগাছা দেখবার একটা আগ্রহ আছে ভাই৷ আর সেটা নেহাত অহেতুকও নয়৷'
নরেশ বলল, 'তাহলে হেতুটাই আগে শুনতে হয়৷'
ততক্ষণ আমার শতরঞ্চ বিছানো হয়েছে এবং সকলে আরাম করে বসেছে৷ সুধাংশু চোখ থেকে চশমা জোড়া নামিয়ে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, 'সে শোনবার মতো বটে৷ জানো তো আমি সেন্ট থমাস হাই স্কুলে পড়তাম৷ সেখানে এক মাস্টার ছিলেন, তাঁর নাম ছিল- নামটা আর নাই বললাম; বললে তোমরাও চিনে ফেলবে৷ তাঁর বাড়ি ছিল অই বালিগাছায়৷
'স্কুলের এতগুলি মাস্টার থাকতে তাঁর নামটা এতদিন পরেও মনে আছে কেন সেই কথাই বলছি, শোন৷-
'পড়াতে তিনি পারতেন না মোটেই৷ পারতেন আমাদের ধরে নানা ছুতোয় মারতে৷ আবার তেমনি ছিলেন তিনি গল্পবাজ আর চালিয়াত৷
'তাঁর গল্পগুলি আমাদেরও নেহাত মন্দ লাগত না৷ বরং পড়ার চেয়ে তাঁর আজগুবি গল্প শুনতেই আমরা বেশি ভালোবাসতাম৷
'সেদিন আমাদের ক্লাসের প্রথম ঘণ্টা তাঁর৷
'আমাদের স্কুলের নিয়ম তো জানো? ছেলেরা যে ক্রমে ক্লাসে ঢুকবে সেই ক্রমেই বসবে৷ আমি যখন ক্লাসে পৌঁছোলাম তখন ক্লাসে অধিকাংশ ছেলেই এসে গেছে, কাজেই আমাকে বাধ্য হয়ে পেছনের দিকের একটা বেঞ্চে বসতে হল৷
'জানি না কী কারণে তিনি আমায় একটু খারাপ চক্ষে দেখতেন৷ প্রবল প্রতাপান্বিত মাস্টারির আসনে বসে আমার মতো দুর্বল ও মুখচোরা ছেলেদের অঙ্গে বাক্যবাণ ছুড়ে ছুড়ে মজা দেখা ছিল তাঁর ভারি প্রিয় কাজ৷ বাক্য-জ্বালায় আমি যখন অস্থির হয়ে উঠতাম, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত, কান রাঙা হয়ে রক্ত বাহির হতে চাইত, তখন সার্থক লক্ষ্য ভেদের আনন্দে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত৷
'সেদিন আমি দেরিতে এসেছি, সুতরাং সে সুযোগ হেলায় হারাতে অর্থাৎ আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করবার সুযোগ ছেড়ে দিতে তিনি মোটেই রাজি ছিলেন না৷
'আমি সবে বইগুলি রেখে বসতে যাচ্ছি অমনি মাস্টারমশায় ডাকলেন, কীরে সুধাং-অ্যাং-
'তিনি আমাকে এইরকমই ডাকতেন৷ আমি ফিরে বললাম, স্যার!
'তোদের বাড়ি নাকি লুচি ডুবে গিয়েছিল? বল সত্যি কি না৷
'আমি জানতাম, তিনি আমার উপর দিয়ে রহস্যের পরীক্ষা চালাচ্ছেন৷ তাই জবাব না দিয়ে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ দুই কান দিয়ে যেন আগুন বার হতে লাগল৷
'মাস্টারমশায় জবাবের জন্য অপেক্ষা না করেই অন্যান্য ছেলেদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, জানিস, ওদের বাড়ি ভোজ ছিল৷ ময়রা যখন ঘিয়ের কড়াতে প্রথম লুচি ছেড়ে দেয়, ও ছিল কাছে দাঁড়িয়ে-কতক্ষণে লুচি হবে আর সে খাবে৷ তাই সে যখন দেখল কড়াতে পড়ে লুচি ডুবে যাচ্ছে তখন তার ভেউ ভেউ সে কী কান্না! ময়রারা বুঝতে না পেরে ওকে জিজ্ঞাসা করল-কী হল খোকাবাবু, কাঁদছ কেন? গায়ে গরম ঘি লাগল না কি? সরে দাঁড়াও৷ ও বললে-নাঁ নাঁ, ঘিঁ পঁড়ে নাঁই, লুঁচিঁ ডুঁবে গেঁছেঁ!
'মাস্টারমশায় নাকি সুরে এমনি কথাগুলি বললেন যে ক্লাসের ছেলেরা সবাই হেসে উঠল৷ আমার অবস্থা অবর্ণনীয়৷ সীতা দেবী যখন পাতাল প্রবেশের জন্য কাতর প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর তখনকার লজ্জা আমার লজ্জার চাইতে বেশি হয়েছিল কি না জানি না৷
'এমন সময় দপ্তরি এসে সংবাদ দিয়ে গেল যে সেক্রেটারি স্কুল দেখতে আসছেন৷ মাস্টারমহাশয় তটস্থ হয়ে উঠলেন৷ কী করবেন যেন স্থির করতে পারছেন না৷ তারপর যখন হঠাৎ দেখলেন যে সেক্রেটারির ভাইপো আমারও পরে ক্লাসে এসে সব শেষের বেঞ্চিতে বসে আছে তখন তো তাঁর চক্ষুস্থির৷ এইবার বুঝি গেল চাকরি৷
'কিন্তু তার মতো উপস্থিত বুঝি এ পর্যন্ত কারও দেখলাম না৷ হটা কাকে বলে তা তিনি জানেন না৷
'হঠাৎ ক্লাসের সবাইকে সম্বোধন করে তিনি বলে উঠলেন, এই শোনো- শোনো-শোনো৷ আজকে আমি একটা মজা করব৷ প্রশ্ন করব আমি মনে মনে; যার উত্তর ঠিক হবে সেই হবে ফার্স্ট৷ বলে যেন প্রশ্নটাই মনে করবার জন্য একবার তিনি চোখ মিটমিট করলেন, ঢোক গিললেন, তারপর বললেন, হয়েছে৷ কে জবাব দিতে পারিস বল৷
'একজন ছেলে বলল, স্যার, আপনি মনে করেছেন ক্যারাকোরাম পর্বত৷ মাস্টারমশায় মাথা নাড়লেন৷
'আর একজন বলল, আওরঙজেবের ঠাকুরদার নাম কী তাই নিশ্চয় আপনার প্রশ্ন, না স্যার?
'এমনি যার যা মনে এল সে তাই বলল, কিন্তু জবাব আর ঠিক হয় না৷ তুমি, তুমি, বলে হাত নাড়তে নাড়তে মাস্টারমশায় এগিয়েই যেতে লাগলেন, শেষটায় গিয়ে দাঁড়ালেন সেক্রেটারির ভাইপোর কাছে৷
'সে হয়তো প্রস্তুত ছিল না৷ কিন্তু মাস্টারমশায় যখন সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, জবাব তখন একটা দিতে হবেই৷ সুতরাং হয়তো না বুঝেসুঝেই সে বলে উঠল, কমন নাউন স্যার৷
'ব্যস! মাস্টারমশায় তৈরিই ছিলেন৷ বললেন, ঠিক, ঠিক হয়েছে৷ যাও, সকলের ডাইনে গিয়ে বসো৷
'সেক্রেটারির স্কুল দেখা হয়ে গেল, মাস্টারমশায়ের চাকুরি নিয়েও কোনো গোলযোগ ঘটেনি৷ শুধু তাই নয়, আজও তিনি খোশ মেজাজে সেইখানে বিরাজ করছেন এবং আমার মতো গোবেচারিদের মস্তক চর্বণ করছেন৷'
আমরা তন্ময় হয়ে সুধাংশুর কথা শুনছিলাম৷ ইতিমধ্যে কখন যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে টেরও পাইনি৷ তার কথা শেষ হতে দেখি গাড়িতে ঠাসাঠাসি লোক৷ খালি হাত বড়ো কারোরই নয়৷ কারও হাতে দুটো ফুলকপি, কারও হাতে রুমালে-বাঁধা ক-টা নেবু, তার লালচে আভা রুমাল ভেদ করে দেখা যাচ্ছে৷ কেউ-বা নিয়ে চলেছেন মাছ, কেউ নিয়ে যাচ্ছেন এক ঠোঙা বিস্কুট, লজেঞ্চুস বা আর কিছু৷ পুঁটলির আকার দেখে এবং মুখের ভাব দেখে আমরা চার জন ফিসফাস করে আলোচনা করতে লাগলাম, কে আজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আর কেই-বা সপ্তাহ শেষে বাড়ি যাচ্ছে! দু-তিনটা স্টেশন যেতে যেতে ভিড় খানিকটা কমল৷ একটু যেন হাঁফ ছাড়বার জায়গা পেয়ে আরাম বোধ করলাম৷
সুধাংশু বলল, 'ইচ্ছে করে এই কষ্ট৷ যাদের ভাড়ায় যাচ্ছি তারা তো দিয়েছে সেকেন্ড ক্লাসের ভাড়া, পয়সা বাঁচাতে কিনা এলেন থার্ড ক্লাসে! তেমনি মজাটা এখন বেশ টের পাচ্ছেন৷'
নরেশ হঠাৎ বলে উঠল, 'আরে থাম, থাম-সুধাং-অ্যাং-'
উচ্চারণের ভঙ্গিতে গাড়িসুদ্ধ লোক হেসে উঠল৷ সুধাংশু এখনও লাজুক, সুতরাং সে নরেশকে বলতে পারল না যে তার জন্যই এই কষ্ট৷ কারণ নরেশই ছিল পয়সা বাঁচাবার প্রস্তাবের মূল পাণ্ডা৷ চুপ করে সে বসে রইল৷
এমন সময় গাড়ি এসে থামল আর একটা স্টেশনে৷ বাইরে উঁকি মেরে স্টেশনের নাম পড়ে সুধাংশুকে বললাম, 'এইরে সুধাং-অ্যাং-তোর বালিগাছা৷ ভালো করে এইবার দেখে নে৷'
সে সবে সিট হতে উঠেছে অমনি গাড়ির অপর প্রান্তের একটা গোলমালের দিকে আমাদের দৃষ্টি পড়ল৷
একটা লোক বলছে, 'ও মশাই, ভেটকি মাছটা যে আমার৷'
যে লোকটা ভেটকি মাছ আর কপি নিয়ে নামছিল সে বলল, 'বেশ লোক তো আপনি! কপি আমার, আর ভেটকি মাছ আপনার!'
যে লোকটার ভেটকি মাছ সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ যারা নেমে যাচ্ছিল তারা যেন বেশ খুশি হয়েছে এমনি ভাবে হাসতে হাসতে স্ফূর্তির সহিত গেট পার হয়ে যেতে লাগল৷ গাড়ির ভিতরে যারা ছিল তারা শহরের এবং শহরতলির, বিশেষত এই স্থানের লোকেদের চালাকির বিভিন্ন গল্প ফেঁদে বসল৷ ঘটি চোর বাঙালির সৃষ্টি কী করে হয়েছে সেকথাও উঠল৷
সুকোমলটা বরাবরই পেটুক৷ সে হঠাৎ বলে উঠল, 'বিনয়দা, এখানকার ছানার জিলিপি খুব ভালো, আমি শুনেছি৷ খাওয়াও না বিনয়দা!'
আমার জবাব দেবার আগেই সুধাংশু বলল, 'দাঁড়া আমি খাওয়াচ্ছি৷'
সুধাংশুর হাত কখনোই খুব দরাজ নয়, সুতরাং তার কথায় আমি বা সুকোমল কেহই বড়ো একটা ভরসা পেলাম না৷ কিন্তু সে সত্যই জানালা দিয়ে মুখ বার করে 'খাবারওয়ালা' 'খাবারওয়ালা' বলে চেঁচাতে আরম্ভ করে দিল৷
তখন গাড়ি ছাড়ার ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে৷ ডাক শুনে বাক্স মাথায় খাবারওয়ালা যখন এসে পৌঁছোল তখন গাড়ি মোশন দিয়েছে৷ সুধাংশু জানলা গলিয়ে মুখ বার করে ঝুঁকে পড়ে বলল, 'আট আনার জিলিপি দাও৷'
খাবারওয়ালার ভয় ছিল পাছে পয়সা না দিয়েই বাবুরা খেয়ে পালিয়ে যায়৷ তাই সে বলল, 'বাবু পয়সা?'
দিচ্ছি বলে সুধাংশু বুকপকেট থেকে তার মানিব্যাগ টেনে বার করল এবং তড়াক করে খুলে তার মধ্য থেকে বার করল একটা টাকা৷
টাকা দেখে খাবারওয়ালা আট আনার জিলিপি নিয়ে গাড়ির পাদানিতে উঠে পড়ল এবং সুধাংশুর হাতে খাবারের ঠোঙা দিয়ে টাকাটি হাতে নিল৷
সুধাংশু বলল, 'ফেরত পয়সা?'
চলতি ট্রেন থেকে নামতে নামতে সে বলল, 'দিচ্ছি৷'
ততক্ষণে আমাদের গাড়ি প্রায় প্লাটফর্মের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে; গাড়ির বেগও বেশ বেড়েছে৷
যখন খাবারওয়ালা বুঝতে পারল যে বাবুরা আর গাড়ি থেকে নামতে পারবে না, তখন সে সেইখানে দাঁড়িয়ে মুখ ভেংচিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দুলাতে দুলাতে বলতে লাগল, 'গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে, আর-কলা-দেবে-৷'
সুধাংশুও জানালা দিয়ে মুখ বার করে মুখ ভেঙাতে ভেঙাতে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে বলতে লাগল, 'নিগে-যা, মেকি সীসার-অচল টাকা!'
আমরা হেসে লুটিয়ে পড়তে লাগলাম৷ গাড়ির অনেকেও সেই হাসিতে যোগ দিলেন৷ যে ভদ্রলোকটি সাধের ভেটকি মাছ যাওয়ায় মুখ ভার করে বসেছিলেন তিনিও সে হাসিতে যোগ দিলেন৷ বললেন, 'বেশ করেছেন বেটাকে ঠকিয়েছেন৷ এখানকার সব বেটা জুয়াচোর৷'
আমি বললাম, 'ওহে সুধাং-অ্যাং, মতলবটা কি আগে থেকেই ঠাউরে রেখেছিলে?'
জিলিপি খেতে খেতে সে বলল, 'না ভাই, হঠাৎ মাথায় এল৷ যাই হোক আমার বালিগাছাও দেখা হল, অচল টাকাও চলে গেল, আর সুকোমলেরও জিলিপি খাওয়া হল, তোমরাও বাদ গেলে না৷'
তার কথা আমার বিশ্বাস হল না৷ সে ছেলেবেলা থেকে এ গাঁয়ের উপর বিরক্ত ছিল এবং আজ যে সুযোগ পেয়ে গেল এর জন্য সে অপেক্ষা করছিল নিশ্চয়৷
পৌষ ১৩৪১

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন