অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
হিমালয়ের খুব গহন অঞ্চলে দু-জন লোক ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ একজন খুব রোগা, লম্বা আর শুকনো চেহারার বুড়ো৷ আর একজন বেশ শক্ত, সমর্থ, জোয়ান কিন্তু তার মাথার চুলের মাঝখানে একটা গোল গর্ত৷ কেউ একসময় তার মাথায় ওই জায়গায় চুল কেটে নিয়েছিল, সেখানে আর চুল গজায়নি৷
হিমালয়ের এরকম জায়গায় কোনো মানুষজন দেখা যায় না৷ পরপর বিরাট বিরাট পাহাড়, যেন একেবারে আকাশচুম্বী, আর মাঝে মাঝে উপত্যকা৷ এ ছাড়া দারুণ গভীর সব খাদও আছে৷ পাহাড়ের চূড়াগুলোয় বরফ কিন্তু মাঝামাঝি জায়গায় বেশ ঘন জঙ্গল৷ সেই জঙ্গলের মধ্যেই থাকে ওই লোক দু-জন৷ ওদের বাড়িঘর কিছু নেই৷ রাত্তির বেলা গাছতলায় ঘুমোয় আর সারাদিন টোটো করে ঘোরে৷
এখানকার জঙ্গলে ফলমূল বিশেষ পাওয়া যায় না৷ যা পাওয়া যায়, তাও খাওয়া যায় না, এমন বিস্বাদ৷ তবে কিছু খরগোশ আর হরিণ আছে৷ ওরা তাই মেরে খায়৷ বুড়ো লোকটির আর শিকার করার ক্ষমতা নেই, জোয়ানটির কাঁধে ঝোলে ধনুক আর কয়েকটা তির-ভরতি তূণীর৷ এমনি জামাকাপড়ও নেই ওদের, গাছের বাকল দিয়ে কোনোরকমে পোশাক বানিয়েছে৷
পরপর দু-দিন ওরা কোনো শিকার খুঁজে পায়নি৷ পেট জ্বলছে খিদেয়৷ এক জঙ্গল থেকে আর এক জঙ্গলে এসে ওদের মনে হচ্ছে সব জন্তুজানোয়ার বুঝি ওদের ভয়ে নিরুদ্দেশে চলে গেছে৷
জোয়ানটি বলল, 'মামা, আর যে পারি না৷'
বুড়ো লোকটি বলল, 'ওরে আশু, আমিই কি আর পারছি! কিন্তু উপায় তো নেই, বেঁচে থাকতে হবেই, আর বাঁচতে হলে খাদ্যও খুঁজতে হবে৷'
আশু বলল, 'এই বনজঙ্গল আর ভালো লাগে না৷ চলো, যেখানে মানুষজন আছে, সেখানে যাই!'
মামা বলল, 'খবরদার না! ও কথাও বলিস না! লোকজনরা যদি আমাদের চিনে ফেলে? তবে সর্বনাশ হবে!'
আশু বলল, 'এতকাল পরে আমাদের কে চিনবে? ওঃ খিদেয় আমার পেট একেবারে পুড়ে যাচ্ছে চিঁ-হিঁ হিঁ-হিঁ৷'
মামা চমকে উঠে বললেন, 'ওকী! অমন শব্দ করছিস কেন?'
'খিদে পেলে আমার অমন হয়!'
'না, না, ছি! অমন করতে নেই! ছোটোবেলায় তোর ওই দোষ ছিল, অনেক কষ্টে সারিয়েছি!'
'চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ, মামা, আমি আর পারছি না, চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ৷'
'আরে ছি ছি ছি ছি, অমন করে না৷ চল চল, খাদ্য খুঁজে দেখি৷'
আরও কিছুক্ষণ বনে বনে ঘুরল ওরা৷ তারপর মামাই বেশি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা একটা গাছের গুঁড়ির ওপর৷
সঙ্গেসঙ্গে গাছের গুঁড়িটা নড়ে উঠল!
মামা উলটে চিৎপাত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল, ভাগনে আশু তার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে তুলে ফেলল৷ মামা বলে উঠল, 'ওরে বাপ রে, এটা কী রে?'
সেটা আসলে একটা ময়াল সাপ৷ বনের শুকনো পাতায় তার মুখটা ঢাকা পড়ে আছে৷ এবার সে সরাৎ করে মাথাটা ঘুরিয়ে আনল এদিকে৷
ভাগনে আর মামা দু-জনেই কিছুটা সরে দাঁড়িয়েছে৷ মামা প্রথমে চমকে উঠেছিল, কিন্তু এখন আর মুখে বেশি ভয়ের চিহ্ন নেই৷
ভাগনে ধনুকে তির জুড়ে বলল, 'মামা, আজ এই সাপটাকে মেরে তারপর এটাকে পুড়িয়ে খাবে?'
মামা বলল, 'আরে ছি ছি, রাম রাম! আমরা উচ্চ বংশের লোক, ব্রাহ্মণ, আমরা কখনো অসভ্য বুনো লোকদের মতন সাপ খেতে পারি!'
ভাগনে বলল, 'এখানে কে আমাদের দেখতে যাচ্ছে৷'
মামা বলল, 'তা ছাড়া এই সাপটা কোনো শাপগ্রস্ত মুনি-ঋষি কিংবা বিশিষ্ট লোক কি না তাই বা কে জানে৷ ওকে মেরে কাজ নেই৷'
এমন সময় সাপটা মুখ ঘুরিয়ে এনে মামার একখানা পা কামড়ে ধরল৷
মামা তাতে একটুও ভয় না পেয়ে হাসতে হাসতে বলল, 'ওরে, তাহলে এটা মুনি-ঋষি নয়, আসল সাপ!'
ভাগনে তখন সাপটার মাথায় একটা ধারাল তির ছুড়ল৷ সাপটা অমনি মামার পা ছেড়ে দিয়ে ছটফট করতে লাগল যন্ত্রণায়৷
ভাগনে সাপটাকে একেবারে মেরে ফেলবার জন্যে আর একটা তির ছুড়তে যাচ্ছিল, মামা তাকে বাধা দিয়ে বলল, 'ওরে আশু থাক, থাক! আর মারবার দরকার নেই৷ আমরা সত্যিই তো আর সাপ খাব না৷ চল৷'
সাপটা যে মামার পায়ে কামড়ে দিয়েছে, তাতেও মামার পায়ে একটুও দাঁত বসেনি, রক্তও বেরোয়নি৷
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাগনেকে মামা টানতে টানতে নিয়ে গেল সেখান থেকে৷
আরও প্রায় দু-ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে কিছুই না পেয়ে বিরক্ত আর ক্লান্ত হয়ে ওরা একটা খাদের ধারে বসল৷ তারপরই চমকে উঠল একটা গাছের দিকে তাকিয়ে৷
গাছটা উঠেছে একেবারে খাদের ধার ঘেঁষে৷ গাছটা বেশ বড়ো, লম্বা ধরনের, সোজা উঠে গেছে৷ নীচে কোনো ডালপালা নেই, একেবারে ডগার কাছে দু-টিমাত্র ডাল, তাতে কয়েকটি ফল ফলে আছে৷ গাছটাকে দেখতে অনেকটা ইউক্যালিপটাস গাছের মতন, আর ফলগুলো আমের মতন৷ এমন আশ্চর্য গাছ এই জঙ্গলে আর একটাও নেই৷
মামা বলে উঠল, 'আরে!'
ভাগনে বলল, 'এতক্ষণে বাঁচলুম, এবার খিদে মেটাব, চিঁ-হিঁ-হিঁ৷'
মামা বলল, 'চুপ কর৷ এটা কী গাছ জানিস? বহু ভাগ্যে এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়৷ এর নাম মৃতসঞ্জীবনী৷ এ গাছের ফল খেলে মরা মানুষ বেঁচে ওঠে৷'
ভাগনে বলল, 'মরা মানুষের কথা আমরা জানি না৷ এই ফল খেলে আমাদের পেট তো ভরবে৷ চিঁ-হিঁ-হিঁ!'
মামা বলল, 'ছিঃ, আশু, এমন আওয়াজ করে না৷ ফলগুলো কী করে পাড়া হবে, সেই কথা ভাব৷ ওই একট ফল খেলেই আমাদের পেট ভরে যাবে৷'
গাছটায় ওঠা অসম্ভব৷ নীচে কোনো ডালপালা নেই, গা-টা মসৃণ৷ ফলগুলো এমন পাকা পাকা রসে ভরা যে দেখলেই লোভ হয়৷
ভাগনে বলল, 'সে আমি ব্যবস্থা করছি৷'
সে অমনি ধনুকে তির জুড়ল৷ তারপর এক চোখ বন্ধ করে ছুড়ল তির৷ ভাগনের হাতের টিপ বেশ ভালোই, তিরটা গিয়ে বিঁধল একটা ফলে৷ কিন্তু ফল-সমেত তির মাটিতে না পড়ে গিয়ে পড়ল খাদে৷ ভাগনে বলল, 'এই রে৷'
মামা বলল, 'ইস অমন দামি ফল তুই নষ্ট করলি?'
তির দিয়ে ফল পাড়ায় সুবিধে হবে না৷ তাহলে কী করা যায়? গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে দু-জন ওপরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল৷
ভাগনে বলল, 'মামা, এক কাজ করা যাক৷ তুমি আমার কাঁধের ওপর দাঁড়াও৷ তাহলে তুমি ঠিক হাত পেয়ে যাবে৷'
মামা বলল, 'ওরে বাপরে, এই বুড়ো শরীর নিয়ে তা কি আমি পারব?'
ভাগনে বলল, 'তাহলে তোমার কাঁধে আমি উঠি?'
মামা বলল, 'ওরে না, না, তোর ভার আমি সইতে পারব না৷ তার চেয়ে আমিই উঠছি বরং৷'
ভাগনে তখন হাঁটু গেড়ে বসল, মামা তার দু-কাঁধে পা দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ ব্যালান্স রাখবার জন্য মামা এক হাতে খামচে ধরল ভাগনের মাথার চুল৷ তাতে চুলের মাঝখানের গর্তটাতেও হাত লেগে গেল৷
ভাগনে বলল, 'উঁহুহু, ওখানে হাত দিয়ো না৷ ওখানে হাত দিলে এখনও ব্যথা লাগে৷'
তারপর ভাগনে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল৷ মামা এক হাতে গাছটা ধরে অন্য হাত বাড়িয়ে দিল ওপরের দিকে৷ তাতেও ঠিক হাত পাওয়া যায় না৷ মামা ডিঙ্গি মেরে আর একটু উঁচু হবার চেষ্টা করতে তার আঙুলের ডগা ছুঁয়ে গেল একটা ফলকে৷ কিন্তু ধরা যায় না৷
ভাগনে জিজ্ঞেস করল, 'হয়েছে?'
মামা বলল, 'আর একটু উঁচু৷'
ভাগনে আঙুলে ভর দিয়ে আর একটু উঁচু হল৷ মামা তখন দু-হাত তুলে গাছের একটা ডাল ধরবার চেষ্টা করল কোনোক্রমে৷
ফলসুদ্ধ একটা ছোটো ডাল ধরামাত্রই সেটা ভেঙে গেল মটাস করে, তাল সামলাতে না পেরে মামাও পড়ে গেল হুড়মুড়িয়ে৷
ভাগনে চোখ কপালে তুলে দেখল, একটা ফল দু-হাতে নিয়ে মামা পড়ে যাচ্ছে খাদের মধ্যে৷ ভাগনে হাত বাড়িয়েও কিছু করতে পারল না!
সে খাদ যে কত গভীর তা চোখে দেখে বোঝা যায় না৷ নীচের দিকটা মিশমিশে অন্ধকার৷ ভাগনে হায় হায় করে উঠল৷
ফল খাওয়া তো হবেই না, সে তার মামাকেও হারাল৷ মামা যতই বুড়ো হোক, তবু তো একজন কথা বলার সঙ্গী ছিল৷ এখন তাকে একা থাকতে হবে৷
সে কেঁদে চেঁচিয়ে উঠল, 'মামা-!'
অমনি খাদের বহু নীচ থেকে খুব অস্পষ্ট গলায় উত্তর এল, 'আশু-৷'
ওরকম খাদে পড়ে গেলে কোনো মানুষ কিছুতেই বাঁচতে পারে না৷ কিন্তু মামা বেঁচে আছে৷
ভাগনে আবার চেঁচাল, 'মামা, তুমি কোথায়?'
মামা সেইরকম বহুদূর থেকে উত্তর দিল, 'আমি এখানে৷ ওপরে উঠার উপায় নেই, খাড়া পাহাড়!'
ভাগনে বলল, 'আমিই বা নামব কী করে?'
মামা বলল, 'তুই নামতে পারবি না! বি-দা-য়! আ-র আ-মা-দে-র দে-খা হ-বে না৷'
ভাগনে বলল, 'মামা, আমি যেকোনো উপায়ে হোক তোমায় উদ্ধার করব৷ তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই!'
খিদে তেষ্টা ভুলে গিয়ে ভাগনে দৌড়োতে লাগল উলটো দিকে ফিরে৷ তার একটা কথা মনে পড়েছে৷ মামাকে উদ্ধার করার সেই একটা মাত্র উপায়ই আছে৷
এখান থেকে তিনখানা পাহাড় পেরিয়ে যেতে হবে৷ অত দূরে তারা বহু বছর যায়নি৷ মামাই বারণ করত সব সময়৷ ওখানে বিপক্ষ দলের একজন থাকে৷ এখন বাধ্য হয়েই তার কাছ থেকে সাহায্য চাইতে হবে৷
এক-একটা পাহাড় পেরিয়ে যেতে লাগল ভাগনে৷ মাঝখানে একটা ঝরনার জল খেয়ে পেট ভরিয়ে নিল৷ একসময় মাথার ওপর দিয়ে একটা এরোপে×ন যেতে দেখে সে লুকিয়ে পড়ল ঝোপের মধ্যে৷ সে এরোপ্লেনের শব্দে ভয় পায় না বটে, কিন্তু তাকে কেউ দেখে ফেলুক, এটা সে চায় না৷
শেষ পর্যন্ত তিনখানা পাহাড় ডিঙিয়ে সে উপস্থিত হল একটা উপত্যকায়৷ সেখানে একটা ঝরনার পাশে গাছের ছায়ায় একটি ছোট্ট বাঁদর শুয়ে আছে৷
ভালো করে দেখলে অবশ্য বোঝা যায়, সেটি বাঁদর নয়, হনুমান৷ মুখটি কালো, চার পায়ের হাতের পাঞ্জাও কালো, লেজটি বেশ লম্বা৷
হনুমানটি ঘুমিয়ে ছিল৷ ভাগনে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে হাত জোড় করে কাতর গলায় ডাকল, 'প্রভু! প্রভু!'
দু-তিনবার ডাকার পর হনুমানটি চোখ মেলে বলল, 'আঃ ! কে রে বিরক্ত করে!'
হনুমানটি সত্যিই মানুষের মতন কথা বলতে পারে৷ কারণ ইনি যে-সে হনুমান নন, ইনি রামায়ণের সেই হনুমান৷ রামচন্দ্রের সেবক৷ এঁর তো মৃত্যু নেই, ইনি অমর, যতকাল পৃথিবী থাকবে, ততকাল ইনিও বেঁচে থাকবেন৷ আগে এঁর শরীরটা ছিল ইলাস্টিক, ইচ্ছে মতন বড়ো কিংবা ছোটো করা যেত৷ বহুকাল কেটে গেছে বলে এখন এঁর শরীরের কলকবজায় মরচে পড়েছে, এখন আর শরীরটা বড়ো হয় না৷
হনুমানের প্রশ্ন শুনে ভাগনে বলল, 'আজ্ঞে আমি দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা৷'
হনুমান বললেন, 'আমায় এখানে জ্বালাতে এসেছ কেন?'
'আজ্ঞে আমার বড়ো বিপদ৷'
'তোমার বিপদ তাতে আমি কী করব৷ যাও, যাও৷'
'প্রভু, আমি বহুদূর থেকে এসেছি, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর, চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ৷'
'কী আপদ! এটা আবার এখানে এত উৎকট শব্দ করে কেন? যা, যা!'

'প্রভু, আমার মামা খাদে পড়ে গেছেন! তাকে আপনি বাঁচান! ইয়ে, মানে বাঁচাতে হবে না, উদ্ধার-'
'তোমার মামা খাদে পড়েছেন, বেশ করেছেন৷ আমি তাকে উদ্ধার করতে যাব কেন? তোমার মামাটা কে?'
'আমার মামার নাম কৃপ৷ একসময় ছিলেন মহাবীর৷ কৌরব-পাণ্ডবদের পাঠশালায় অস্ত্র শিখিয়েছেন৷'
'হু:৷ ভারি তো মহাবীর৷ কোন যুদ্ধটা তিনি জিতেছেন শুনি? তাকে উদ্ধার করার কী দায় পড়েছে আমার?'
'প্রভু আমরা তো মোট সাতজন আছি৷ আমরা যদি পরস্পরকে বিপদের সময় সাহায্য না করি, তাহলে কে করবে বলুন? এতদিন পরও শত্রুতা মনে রাখতে আছে?'
'তা সাতজন যখন আছে, তখন অন্য কারোর কাছে যাও না৷ আমাকে বিরক্ত করছ কেন?'
'আর কার কাছে যাব বলুন৷ আমাদের মধ্যে বলি আছেন পাতালে৷ আর ব্যাসদেব সকলের ঠাকুরদা, অতি বুড়ো মানুষ, তাঁকে কি খাদে নামতে বলা যায়? তা ছাড়া, শুনেছি তিনি থাকেন কাশীতে৷ বিভীষণ আছেন শ্রীলঙ্কায়৷ পরশুরাম দক্ষিণ সমুদ্রতীরে তপস্যা করতে চলে গেছেন, এদিকে আর আসেন না৷ রইলাম বাকি আমরা তিনজন৷ এখন আপনি যদি সাহায্য না করেন-'
'আমি এত বুড়ো হয়েছি, আমার গায়ে আর শক্তি নেই৷ নড়তেচড়তেই পারি না, আমি যাব খাদে নামতে!'
অশ্বত্থামা এবার রেগে গিয়ে ধনুকে বাণ জুড়ে বলল, 'তবে রে ব্যাটা, হনুমান, এত করে বলছি, তবু তুই যাবি না? তাহলে তোকে মেরেই শেষ করব৷'
হনুমান চোখ পিটপিট করে একটু দেখলেন অশ্বত্থামাকে৷ তারপর হঠাৎ তাঁর লেজটা দিয়ে অশ্বত্থামার গলায় তিন পাক জড়িয়ে তাঁকে হ্যাঁচকা টানে মাটিতে ফেলে দিলেন৷
আস্তে আস্তে চিবিয়ে চিবিয়ে হনুমান বললেন, 'বুড়ো হয়েছি বলে কি গায়ে একটুও শক্তি নেই যে তোর মতন একটা চুনোপুঁটিকেও ঢিঁট করতে পারব না?'
লেজের পাকে বন্দি অবস্থায় অসহায় ভাবে অশ্বত্থামা হনুমানের স্তব করতে লাগল৷ সে বলল, 'হে প্রভু, আপনাকে একটু উত্তেজিত করার জন্যই আমি মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছিলাম৷ নইলে আপনাকে ভয় দেখাব এমন সাধ্য কী আমার৷ আপনি মহা শক্তিমান, আপনি জন্মাবার পরই আকাশের সূর্যকে একটা ফল ভেবে এক লাফে ধরতে গিয়েছিলেন, আপনি এক লাফে সমুদ্র লঙ্ঘন করেছিলেন, আপনার মতো মহাবীর আর কেউ নেই . . .' ইত্যাদি!
প্রশংসা শুনে একটু খুশি হলেন হনুমান৷
তারপর অশ্বত্থামার গলায় তাঁর লেজের পাক একটু আলগা করে বললেন, 'হ্যাঁ, একসময় ওসব করেছি বটে, কিন্তু এখন আর লাফঝাঁপ দিতে ভালো লাগে না৷ মরণ নেই, তাই কোনো রকমে বেঁচে আছি৷'
অশ্বত্থামা বলল, 'কিন্তু আপনি ছাড়া কেউ পারবে না আমার মামাকে বাঁচাতে৷ আপনি লঙ্কা থেকে লাফিয়ে মন্দার পাহাড়ে গিয়েছিলেন, আর হিমালয়ের একটা খাদ লাফানো তো আপনার কাছে নস্যি৷ ছোট্ট একটা লাফ দিলেই হবে৷'
হনুমান জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় সে পড়েছে?'
অশ্বত্থামা হাত তুলে তিনটে পাহাড় দূরে জায়গাটা দেখালেন৷
হনুমান বললেন, 'ওরে বাবা, অতদূর আমি হাঁটতেই পারব না, হাঁটুতে দারুণ ব্যাথা৷'
'আজ্ঞে, হাঁটতে হবে কেন? আপনি এক লাফেই তো পৌঁছে যেতে পারেন৷'
'বুড়ো বয়সে যখন-তখন কেউ তিড়িং তিড়িং করে লাফায়? একবার লাফালে সেই ঢের৷ আমি যদি-বা লাফিয়ে যাই, তুই যাবি কী করে?'
'আপনি যদি আমায় পিঠে করে নিয়ে যান৷'
'লজ্জা করল না ওই কথাটা বলতে? আমি বুড়ো মানুষ, তোর মতন একটা জোয়ানকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যাব? তুই যদি আমায় ঘাড়ে করে নিয়ে যাস, তাহলে যেতে পারি৷'
শেষ পর্যন্ত তাই করতে হল, হনুমান কিছুতেই হেঁটে বা লাফিয়ে যেতে রাজি নয়৷ অশ্বত্থামা তাকে কাঁধে করে সেই তিনখানা পাহাড় ডিঙিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পরদিন সকালে পৌঁছোল খাদটার কাছে৷
অমররা কিছুতেই মরবে না, কৃপ বেঁচে আছে ঠিকই, তবু জ্ঞান আছে কি না জানবার জন্য অশ্বত্থামা ডাকল, 'মামা-'
খাদের তলা থেকে উত্তর এল, 'আশু, আমায় এখান থেকে তোল, এখানে বড্ড পিঁপড়ে-'
অশ্বত্থামা বলল, 'মামা, ভয় নেই, ব্যবস্থা হয়ে গেছে, হনুমানজি এসেছেন৷'
হনুমান ততক্ষণ দেখলেন গাছটাকে৷ বয়সের জন্য চোখ ঘোলাটে হয়ে গেছে, সব জিনিস ভালো দেখতে পান না৷ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা মৃতসঞ্জীবনী গাছ না?'
অশ্বত্থামা বলল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ, এই গাছের ফল পাড়তে গিয়েই তো-'
হনুমান অমনি এক লাফে গাছটায় উঠতে গেলেন৷
কিন্তু কী কাণ্ড, হনুমান মোটে গাছটার আধখানা উঁচু পর্যন্ত উঠতে পারলেন, তারপরই পড়ে গেলেন ধপ করে৷ আর একটু হলেই খাদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছিলেন৷
হনুমান বললেন, 'ইস, দেখলি কী অবস্থা হয়েছে আমার৷ এইটুকুও লাফাতে পারি না৷ খাদ থেকে তোর মামাকে তুলব কী করে?'
অশ্বত্থামা নিরাশ হয়ে বলল, 'তাহলে কী হবে?'
'দেখছি কী ব্যবস্থা করা যায়!'
হনুমান গাছটা দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন, আর আস্তে আস্তে উঠতে লাগলেন গাছটা বেয়ে৷ নিজের জাতের এই পুরোনো অভ্যেসটা তিনি এখনও ভোলেননি৷ ক্রমে একেবারে উঠে গেলেন গাছের ডগায়৷
একটা ফল ছিঁড়ে কামড়েই তিনি বললেন, 'আঃ , কী অপূর্ব স্বাদ!'
অশ্বত্থামা লোভীর মতন বলল, 'প্রভু, আমায় একটা দিন৷ আপনি ছুড়ে দিন, আমি লুফে নেব৷'
হনুমান এক ধমক দিয়ে বললেন, 'দাঁড়া বাপু! আমি আগে পেট ভরে খেয়ে নিই৷ এক হাজার বছর কিছু খাইনি, শুধু রাম নাম জপ করে খিদে মিটিয়েছি৷'
এক-এক করে সে গাছের সব ক-টা ফলই খেয়ে ফেললেন তিনি৷ অমনি তাঁর শরীরটাও বড়ো হতে লাগল মৃতসঞ্জীবনী ফলের গুণে৷ তিনি বিশাল হয়ে গেলেন এবং এমন গর্জন করে উঠলেন যে সমস্ত বন কেঁপে উঠল৷
তারপর লাফিয়ে নীচে নেমে এসে অশ্বত্থামাকে নিজের এক বগলের মধ্যে চেপে ধরলেন৷
অশ্বত্থামা বলল, 'একী, একী! আপনি আমায় একটাও ফল দিলেন না৷'
হনুমান বললেন, 'চল৷'
তারপর অশ্বত্থামাকে বগলে চেপে রেখেই তিনি এক লাফে চলে এলেন খাদের তলায়৷
সেখানটায় একেবারে মিশমিশে অন্ধকার৷ কেউ কারোকে দেখতে পাচ্ছে না৷ শব্দ শুনে কৃপ বললেন, 'ওরে আশু, এসেছিস? হনুমানকে পাওয়া গেছে, আর চিন্তা নেই৷ ওই গাছের ফলগুলো যে কী সুন্দর, কী মিষ্টি তোকে কী বলব৷ একটা ফল খেয়েই আমার গায়ে যেন অনেক জোর বেড়ে গেছে৷ হনুমান আমাদের ফলগুলো পেড়ে দেবে, নিশ্চয়ই দেবে, তাই না হনুমান?'
হনুমানের বগলের চাপে অশ্বত্থামার প্রায় দম আটকে আসার মতন অবস্থা৷ সে চিঁ চিঁ করে বলল, 'মামা, উনি সব ফলগুলো খেয়ে ফেলেছেন৷ চিঁ-হিঁ-হি-হি৷'
হনুমান বললেন, 'কী আপদ, এটা ঘোড়ার মতন ডাকে কেন? এটা মানুষ না ঘোড়া?'
কৃপ বললেন, 'আপনি জানেন না, জন্মাবার সময়ই ও ঘোড়ার মতন ডেকে উঠেছিল বলেই তো ওর নাম অশ্বত্থামা রাখা হয়েছিল৷ অনেকদিন এরকম ডাকেনি, আবার শুরু করেছে৷ ও হনুমান, তুমি ফলগুলো সব খেয়ে ফেলেছ, অ্যাঁ?'
হনুমান বললেন, 'বেশ করেছি৷'
অশ্বত্থামা বললেন, 'ও হনুমানজি প্রভু, ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন, আমার লাগছে- চিঁ-হিঁ-হি-হি৷'
হনুমান প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে বললেন, 'চোপ!'
তারপরেই তিনি কৃপকে উদ্দেশ্য করে পেল্লায় এক চড় কষালেন৷
কৃপ বললেন, 'একী!'
হনুমান বললেন, 'এখন আমার সব মনে পড়ে গেছে৷ ভীম আমার সম্পর্কে ভাই হয়৷ সেই হিসেবে সব পাণ্ডবরাই আমার ভাই৷ তোমরা পাণ্ডবদের সঙ্গে শত্রুতা করেছিলে৷ শুধু তাই নয়, পাঁচটা কচি কচি ছেলে তারা যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন তাদের গলা টিপে মেরে ফেলেছিল এই পাষণ্ড অশ্বত্থামা৷ আর তুমি কৃপ, তখন তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিলে৷ আমার ভাইপোদের তোমরা মেরেছিলে, আজ আমিও তোমাদের গলা টিপে মেরে ফেলব৷'
কৃপ বললেন, 'ওসব পুরোনো কথা আর এখন কেন মনে করছ ভাই? যা হবার তা তো হয়ে গেছে অনেক কাল আগে৷ তা ছাড়া আমাদের কী মরণ আছে যে তুমি মারবে?'
হনুমান বললেন, 'তাহলে তুমি এই খাদের মধ্যে অন্ধকারে নরকে থাক৷ আমি এর অন্য ব্যবস্থা করছি৷'
কৃপ কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, 'ও হনুমান ভাই, আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না, এখানে ভীষণ পিঁপড়ে, আমায় সর্বক্ষণ কামড়াচ্ছে৷'
'নরকেও এরকম পিঁপড়ে থাকে৷'
এই বলেই হনুমান 'হুপ' শব্দ করে একলাফে উঠে এলেন খাদের ওপরে৷ তারপর সেখান থেকে আর এক লাফে চলে এলেন কাশ্মীরে৷ সেখানে পির পাঞ্জাল পর্বতমালার একটা চূড়ায় এসে নেমে হনুমান অশ্বত্থামাকে বগল থেকে মুক্ত করলেন৷
অশ্বত্থামা বললেন, 'এ কোথায় এলাম, চিঁ-হিঁ-'
হনুমান বললেন, 'তোকে খুব ভালো জায়গায় এনেছি, আঙুল দিয়ে অনেক নীচের একটা উপত্যকা দেখিয়ে বললেন, ওখানে কী ঘুরে বেড়াচ্ছে, দেখছিস?'
অশ্বত্থামা বলল, 'ঘোড়া মনে হচ্ছে৷'
হনুমান বললেন, 'হ্যাঁ, ওখানে একজাতের খুব ভালো ঘোড়া থাকে৷ কোনো মানুষ আজ পর্যন্ত ওদের ধরতে পারেনি, কারণ ওখানে কেউ নামতে পারে না৷ আর যদি-বা নামে, উঠতে পারে না৷ শিশু হত্যাকারী পশু তুই চিরকাল ওই ঘোড়াদের সঙ্গে থাকবি৷ ভীম তোর মাথার চুল কেটে মণি কেড়ে নিয়েছিল, তাতেও তোর ঠিক শাস্তি হয়নি৷ আমি তোকে এই শাস্তি দিলাম৷'
অশ্বত্থামা বাধা দেবার আগে হনুমান তার ঘাড় ধরে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিলেন যে, সে ছিটকে পড়ে গিয়ে গড়াতে লাগল-গড়াতে গড়াতে একেবারে সেই অনেক নীচের উপত্যকায় গিয়ে পড়ল৷ ওখান থেকে আর উঠতে পারবে না কোনোদিন৷
সন্তুষ্ট মনে হনুমান 'জয় রাম' বলে এক লাফ দিয়ে আবার ফিরে এলেন হিমালয়ে, সেই ঝরনাটার ধারে, তাঁর নিজের জায়গায়!
শারদীয়া ১৩৮৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন