অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বিভুর গল্প লিখতে খুব ভালো লাগে৷ একটা ছোটো গল্প লিখে সাহিত্য-সম্পাদক আশুদার হাতে দিয়েছিল৷ ভেবেছিল, গল্পটা আশুদার ভালো লাগলে ছাপা হবে তখন সকলে জানতে পারবেন৷ ছাপা না হলে কেউ জানতেও পারতেন না৷
কিন্তু নিউজ এডিটর ঠিক জানতে পারলেন৷ সন্ধ্যে বেলায় রিপোর্টার সাব এডিটরে ভরা অফিস, তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিজয়দাকে বললেন, 'বুঝলেন বিজয়বাবু, বিভুবাবু আজকাল গল্পও লিখছেন!'
শ্যামদার নিউজটা লিখে দিতে গিয়ে বিভু কলেজের প্রথম ক্লাসটা মিস করছে৷ দ্বিতীয় ক্লাসের আগে পৌঁছোবার জন্য ও উঠব উঠব করছিল, তখনই নিউজ এডিটর কথাটা বললেন৷
বিভু মাথা নীচু করে বসে আছে৷ লজ্জায় মুখ-চোখ লাল৷ যেন বিরাট একটা অপরাধ করে ধরা পড়ে গেছে৷ ওর মনে হল, গোটা ডিপার্টমেন্ট ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে৷ আশুদার ওপর রাগ হয় বিভুর৷ গল্পটা ভালো লাগেনি, ছাপবেন না৷ ব্যাস ফুরিয়ে গেল৷ নিউজ এডিটরকে বলার কী দরকার৷ হঠাৎ নিউজ এডিটরের পরের কথা কানে যেতে চমকে উঠল বিভু, 'তা গল্পটা ভালোই লিখেছে বুঝলেন বিজয়বাবু৷'
'আপনি পড়েছেন?' বিজয়বাবুর প্রশ্ন৷
'বিভুর নাম দেখে পড়ে ফেললাম৷ সানডে ম্যাগাজিনের ট্রায়াল রানের পর একটা কপি দেখতে দিয়ে গিয়েছিল সে৷ তা আমি বলেছিলাম, বিভু ছেলেমানুষ আপনি ওকে একটু বুঝিয়ে বলুন, গল্প লিখতে যতটা সময় ও খরচ করছে সেই সময়ে সে যদি দু-একটা জব্বর খবর জোগাড় করে আনে তাহলে যে কাগজের উপকার হয়৷'
গল্পটা ছাপা হচ্ছে জেনে বিভুর খুব ভালো লাগছিল, ও সংকোচে মুখ তুলতে পারছিল না৷ সুনীলদা বলল, 'তুই মুখ নীচু করে বসে আছিস কেন? কোনো অন্যায় তো করিসনি৷' তখনই নিউজ এডিটরের খাস বেয়ারা এসে সানডে ম্যাগাজিনটা বিভুর হাতে দিয়ে বলল, 'এন ই দিয়েছেন৷'
বিভু তাড়াতাড়ি পাতা উলটে দেখল, গল্পটা কী সুন্দর ছবি দিয়ে ছাপা হয়েছে৷ ছবি এঁকেছেন সমীর সরকার৷ সমীর সরকারের নাম বিভু জানে৷ সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার গল্পের ছবিও সমীর সরকার একবার এঁকেছেন৷ সেই সমীর সরকার ওর গল্পের ছবির ইলাসট্রেশন করেছেন৷ সকলকে দেখায়৷ হঠাৎ বিজয়দার ডাক কানে এল, 'বিভু কাগজটা একটু নিয়ে এসো তো, দেখি কেমন গল্প লিখেছ৷'
'ভালো হয়নি বিজয়দা৷' বিভু মিনমিন করে উত্তর দেয়৷
'না হোক দেখি একবার৷'
বিভু কাগজটা বিজয়দার হাতে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে৷ কখন যে আজ ছাড়া পাবে কে জানে! বিজয়দা উলটে-পালটে দেখে চাপা গলায় বললেন, 'বিভু একটা ভালো খবর জোগাড় করে ফেলো৷ এন ই-র মেজাজ ঠিক করার জন্যে দারুণ একটা খবর তোমায় দিতেই হবে৷ কথা মনে রেখো৷ পারলে কালই . . .৷'
বিভু বুঝল, গল্প পড়াটা আসল নয়, এই কথাটা বলার জন্যেই বিজয়দা ডেকেছেন৷ ও বলল, 'আমি চেষ্টা করব বিজয়দা৷'
'চেষ্টা নয় একটা ভালো খবর কাল তোমায় জোগাড় করতেই হবে৷'
'আমি যাব বিজয়দা? এখন গেলে তিনটে ক্লাস করতে পারব৷'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ যাও৷ খবরটার কথা কিন্তু ভুলো না৷'
'দেখি, কাল-কিছু পাই কি না৷'
বিভু তাড়াতাড়ি কলেজে পৌঁছোতে চাইছে৷ ওর হাতে সানডে ম্যাগাজিনটা৷ ওর গল্প ছাপা হচ্ছে, বন্ধুদের দেখাতে হবে তো! কিন্তু গল্প ছাপা হবার সব আনন্দ মাঠে মারা গেল৷ কাল একটা ভালো খবর চাই, নিউজ এডিটরের কড়া গলার স্বর বিভু যেন শুনতে পায়৷ এবার অনুরোধটা চিফ রিপোর্টারের৷
পরদিন সকালে বিভু বেরোবে বেরোবে করছে দমদম থেকে দিদির ফোন এল৷ দিদি বললেন, 'বিভু একবার বেহালায় গিয়ে সোনাদা আর গৌরীদিকে একটা খবর দিয়ে আসবি?'
'আজ! আজ যে আমার একটা জরুরি খবরের জন্যে একজায়গায় যেতে হবে৷ খুব জরুরি খবর৷'
'এখানে তোর জামাইবাবুর মার খুব বাড়াবাড়ি চলছে৷ গৌরীকে দেখতে চাইছেন৷'
'ফোন করে দিলে হয় না!'
'ওদের ফোন সেই কবে থেকে খারাপ৷ ফোন ঠিক থাকলে কি আর তোকে খোশামোদ করতাম!'
বুঝলাম, আজ আর নিস্তার নেই৷ দিদি চটেছেন৷ মেজদাকে যে বলব সে উপায় নেই৷ মেজদা হাসপাতালে৷ বললাম, 'বেহালায় যেতে যদি একটু বেলা হয় ক্ষতি নেই তো?'
'না, তা নেই৷ তবে আগে খবর পেলে ওরা হয়তো আজই আসতে পারে৷'
আজ যে আসতে পারবে না সে আমি জানি৷ সোনাদা অফিসে চলে গেছেন ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যাবে৷ সে কথা আমি আর মুখে বললাম না৷ বললাম, 'দেখি, যত তাড়াতাড়ি পারি যাচ্ছি৷'
ভেবেছিলাম মেজদার বন্ধু হোম সেক্রেটারি ঘটকদার বাড়ি হানা দেব৷ সে আর হবে না৷ ভালো একটা খবরও আজ জোগাড় করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না৷ মাথায় কিচ্ছু আসছে না৷ আমাদের মানে রিপোর্টারদের সব সময় মনে করিয়ে দেওয়া হয়, চোখ-কান খুলে চলবে৷ খবর ঠিক ভেসে আসবে৷ আমি তো চোখ-কান খুলেই রেখেছি, খবর ভেসে আসছে কই, শ্যামদারা কেমন খবরের গন্ধ পান৷ আমি পাই না কেন কে জানে৷ কিন্তু আজ কী হবে! একবার মনে হল, আজ আর অফিসে যাব না৷ কথা মনে হতেই নিজের ওপর বিরক্তি লাগে৷ এ তো নিজের কাছ থেকে, খবরের কাছ থেকে পালানো৷ সাংবাদিকরা কখনো কোনো কিছু থেকে পালায় না৷ ফেস করে৷ তাহলে? খবর পাই ভালো, না পেলেও আমি অফিসে যাব৷ তারপর যা হবার হবে-নিউজ এডিটর যদি কথা শোনান, শোনাবেন!
তাড়াতাড়ি চান করে খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷ ঠিক করলাম বাসে ময়দানে যাব৷ তারপর ট্রামে৷ গড়ের মাঠের ওপর দিয়ে ট্রাম যখন হু-হু করে ছোটে তখন ভীষণ ভালো লাগে৷ ম্যানটনের আগের স্টপেজে নেমে একটু পিছিয়ে এসে বাঁ-দিকের গলির মধ্যে সোনাদাদের বাড়ি৷ আমি যখন পৌঁছোলাম গৌরীদিরা তখন খেতে বসে গেছেন৷ আমায় দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি এই সময়ে?'
বললাম, 'তোমরা খেয়ে নাও৷ তারপর বলছি৷'
'কোনো খারাপ খবর?'
'না, না! তুমি খেয়ে নাও৷'
'ধ্যাস, খাওয়া যায় কখনো? তুমি বলো, কী বলতে এসেছ৷'
'বলছি তো তেমন কিছু নয়৷'
'না, আগে বলো৷ আমি সব সইতে পারব৷'
'এই মুহূর্তে তো বলার মতো কিছু নেই৷'
'এই যে বললে খারাপ খবর নয়!'
'খারাপ খবর তো তেমন কিছু নয়৷ মাসিমার শরীর খারাপ হয়েছ জান তো?'
'হ্যাঁ জানি৷'
'এখন আর একটু বেশি খারাপ হয়েছে৷ তোমায় দেখতে চাইছেন৷'
'ওর আসতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে, তাহলে তো আর যাওয়া যাবে না৷ কাল যাব৷ আমাদের ফোন খারাপ৷ তুমি একটু জানিয়ে দিয়ো৷'
'ফোন খারাপ বলেই তো আসতে হল! আমি দিদিকে বলে দেব, আমি তাহলে উঠি!'
'সে কী! একটু বোসো৷ মিষ্টি-টিষ্টি খেয়ে তবে যাবে৷ এখানে কোনো দোকান থেকে কিছু কিনে খাবে না!'
'কেন?'
'সে সাংঘাতিক ব্যাপার৷ দুটো দোকান থেকে কীসব মিশিয়ে সরষের তেল বিক্রি করেছে৷ অনেক লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ তিরিশ-চল্লিশ জনকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে৷'
'কী বলছ, এ তো বিরাট খবর৷' নিউজের গন্ধ পেয়ে আমি নড়েচড়ে বসলাম৷ জিজ্ঞেস করলাম, 'দোকান দুটো কোথায়?'
'ওই তো মোড়ের মাথায়! সকাল থেকে হইচই হচ্ছে! পাড়ার ছেলেরা দোকান দুটো বন্ধ করে দিয়েছে৷ পুলিশ দোকানের মালিকদের ধরে নিয়ে গেছে৷'
'কেউ মারা যায়নি তো?'
'মারা যায়নি৷ তবে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷'
'কখন থেকে গোলমাল চলছে?'
'তা দশটা-টশটা হবে৷'
ততক্ষণে আমি ঠিক করে ফেলেছি আমায় কী করতে হবে৷
গৌরীদি ছাড়লেন না৷ মিষ্টি-টিষ্টি খাইয়ে দিলেন৷ আমি তাড়াতাড়ি করে খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷ মোড়ের মাথায় ওইরকম কোনো দোকান না দেখে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, 'বাজে তেল বিক্রি করে ধরা পড়ছে যে দোকান সে দুটো কোথায়?'
ভদ্রলোক কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বাজে তেল নয়, বিষ তেল৷ তা তোমার দরকার কী? তোমায় দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না!'
'আমায় আপনি আগে দেখেননি৷' সোনাদার নাম বলে আমি বললাম, 'আমি ওঁর বাড়িতে এসেছি৷ বিষ তেল বলছেন যখন, তখন কেউ মারা গেছেন বোধ হয়!'
'এখনও যায়নি, তবে যাবে৷'
'কোন হাসপাতালে আছে তারা?'
'জেনে কী করবে, দেখতে যাবে?'
'তা তো যেতেই হবে৷'
'মানে? আমার সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে!'
ভদ্রলোকের মেজাজ চড়ে যাচ্ছে দেখে আমি তাড়াতাড়ি পকেট থেকে আইডেনটিটি কার্ডটা বের করে ওকে দেখালাম৷ কার্ডে আমার ছবি৷ অশোক স্তম্ভ দেওয়া সরকারি পরিচয়-পত্র-হোম ডিপার্টমেন্ট থেকে ইস্যু করা৷
'ওটা কীসের কার্ড?'
'আমার পরিচয়পত্র৷ সরকারি৷ আমি একজন রিপোর্টার৷'
'রিপোর্টার . . . তুমি? এইটুকু ছেলে . . .'
'দোকান দুটো কোথায় একটু বলে দিন-আমার সময় নষ্ট হচ্ছে৷'
ততক্ষণে দু-চারজন লোক এসে পাশে দাঁড়িয়েছে৷ কয়েকটি ছেলেও ছিল৷ তাদের একজন বলল, 'আমার সঙ্গে আসুন! আমি নিয়ে যাচ্ছি৷'
আমি ছেলেটির সঙ্গে এগিয়ে যেতে যেতে শুনতে পেলাম একজন বলছেন, 'ছেলেটা গুল মারছে না তো! এইটুকু ছেলে রিপোর্টার হতে পারে!'
ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল৷ তার চোখে সন্দেহের দৃষ্টি দেখে বললাম, 'এ ভুল সবাই করে৷ ওঁদের দোষ নেই৷ আমি তো এখনও কলেজে পড়ছি৷'
'কোন কলেজ, কোন ইয়ার?'
'সিটি মেন৷ এবার ফোর্থ ইয়ারে উঠব৷'
'আমিও তো তাই৷ তবে আশুতোষে . . . নাম সোমেন ঘোষ!'
'তাহলে তো আমরা তুমি বলতে পারি৷'
আমার কথা শেষ হল না, ছেলেটা বলল, 'তোমার নাম কী?'
'বিভু রায়৷'
'দৈনিক সমাচার?'
'হ্যাঁ! ও সব কথা থাক, এখন একটু ডিটেলসে বলো দেখি!'
'শোনো, ওই দুটো দোকান থেকে গত ক-দিন ধরে বিষ তেল বিক্রি করছে৷ ওই তেল খেয়ে ইতিমধ্যে প্রায় শ-খানেক লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ জনা পনেরো-কুড়ির অবস্থা সংকটজনক . . . ওই যে দোকান দুটো! পুলিশ সিল করে দিয়ে গেছে৷'
দোকান দুটোর সামনে তখনও বেশ ভিড়৷ আমার ছোট্ট ক্যামেরা দিয়ে চটপট দোকান দুটোর ছবি তুলে নিয়ে নতুন বন্ধুকে গিয়ে বললাম, যাদের বাড়ি থেকে বেশি অসুস্থ হয়েছে সেরকম একটা বাড়িতে নিয়ে যেতে পার?
'বস্তিতে কিন্তু! পেছনের বস্তিটা দেখছ, ওখান থেকেই বেশি খদ্দের আসে এই দোকান দুটোয়৷ আমি একটা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি, যে বাড়িতে একজন ছাড়া সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ যে সুস্থ আছে তার এক সপ্তাহ ওপর জ্বর৷ ভাত-টাত খাচ্ছে না বলে বেঁচে গেছে৷'
ওই বাড়ি থেকে দারুণ হিউম্যান স্টোরি পাওয়া গেল৷ নামধাম সব বিভু লিখে নিল৷ তিনজন নাকি মর মর৷ ডাক্তারবাবুরা বলেছেন, বাঁচলেও সম্পূর্ণ সুস্থ আর কখনোই হতে পারবে না৷
বস্তির ঘরে ঘরে কান্নার রোল৷ সোমেনকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ার ক-জন বয়স্ক লোকের সঙ্গে কথা বললাম৷ এলাকার কাউন্সিলরের সাক্ষাৎকার নিয়ে থানায় গেলাম৷ ওসির সঙ্গে দেখা করতে উনি সহযোগিতাই করলেন৷ পুলিশের বক্তব্য নোট করে নেওয়ার পর বললাম, 'একটা অনুরোধ করব?'
ওসি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, 'অনুরোধটি কী আগে শুনি৷'
'তেমন কিছু নয়, দুই গণশত্রুর ছবি তুলে নেব?'
'ওরা লকআপে৷ সেখানে ছবি তোলার পারমিশান দেওয়া যাবে না৷'
'তার মানে আপনি চান না, দেশের শত্রুদের মানুষ চিনে রাখুক৷'
'হোয়াট ডু ইউ মিন?'
আমার উত্তর শুনে ওসি কড়া চোখে আমার দিকে তাকালেন৷
'ভেরি সিম্পল৷ আপনি আমায় ছবি তোলার পারমিশানটুকু শুধু দিন৷ এই সব স্টোরিতে ছবি মাস্ট৷ সেই ছবি দেবার মালিক শুধু আপনিই৷ কেউ জানতেও পারবে না, অথচ আপনার একটা বিশাল সোসাল ওয়ার্ক করা হয়ে যাবে . . .'
'জ্ঞান দিচ্ছ নাকি ভাই৷ তা দাও৷ তা কীভাবে ওদের ছবি তুলতে চাও?'
'আপনি ওদের ডেকে পাঠান৷ আমি এই ঘরেই ওদের ছবি তুলে নেব৷ প্লিজ আমায় হেল্প করুন৷ ওদের ছবি না পেলে রিপোর্টটা ঠিক দাঁড়াবে না৷ তা ছাড়া ওদের মুখ থেকে দু-একটা কথা বের করতে হবে তো৷'
'সর্বনাশ৷ তুমি ভাই কেটে পড়ো৷'
'লালবাজার থেকে পারমিশান আনলে দেবেন তো?'
'সে তো দিতেই হবে৷'
'ঠিক আছে আমি অনুমতি আনিয়ে নিচ্ছি৷ আপনার টেলিফোনটা একটু ব্যবহার করতে পারি?'
'তা পার! কিন্তু কাকে ফোন করবে?'
'খোদ হোম সেক্রেটারিকে!'
কথা বলতে বলতে মোবাইলে ঘটকদাকে ধরে ফেললাম, 'ঘটকদা আমি বুনো৷ . . . বেহালা থানা থেকে! . . . না না সে সব কিছু নয় . . . তোমায় একটা উপকার করতে হবে . . . আমি দুটো ক্রিমিনালের ছবি তুলে নিতে চাই৷ ওসিকে একটু বলে দাও না . . . কী বললে তোমার বলাটা ঠিক নয় পুলিশ কমিশনারকে বলে দিচ্ছ . . . ঠিক আছে থানায় ফোন করতে বলো৷ আমি ওয়েট করছি৷'
কথা শুনতে শুনতে ওসির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছিল৷ বললেন, 'হোম সেক্রেটারি তোমার রিলেটিভ নাকি?'
'রিলেটিভের চেয়ে বেশি৷ একথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? রেডি থাকুন এক্ষুনি পি সি-র ফোন আসবে৷'
'আর ফোনের দরকার নেই ভাই৷ আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, আপনি ছবি তুলে নিন৷' তুমি থেকে বিভু প্রমোশান পেয়ে আপনি হয়ে গেল৷
ওসির কথা শেষ হতে-না-হতেই ফোনটা ঝন ঝন শব্দ করে বেজে উঠল, বিভু ভালোভাবে জানে, ফোনটা কার৷ ওসি ফোনটা তুলে নিয়ে সাড়া দিতেই ও-প্রান্ত থেকে পিসি-র গলার স্বর শোনা গেল৷ বিভুর নাম বলে ওসিকে বললেন-যা হেল্প দরকার যেন উনি করে দেন৷
'হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ হ্যাঁ, ওর যা দরকার আমি স্যার এক্ষুনি করে দিচ্ছি৷ না স্যার, ওঁর কোনো অসুবিধে হবে না৷'
ফোনটা রেখে ওসি সেকেন্ড অফিসারকে ডাকলেন, 'স্যারের জন্য এক্ষুনি চা মিষ্টি আনতে বলুন আর কাউকে দিয়ে তেলের দোকানের মালিক দুটোকে এখানে পাঠিয়ে দিন৷ যান যান, স্যার অনেকক্ষণ বসে আছেন৷'
'না, না, ওসব দরকার নেই৷ লোক দুটোকে নিয়ে আসুন তাহলেই হবে৷ ওদের সঙ্গে একটু কথা বলব৷'
আর কোনো অসুবিধা হল না৷ দুই দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে ওদের দু-জনের ছবি তুলে নিয়ে বিভু উঠে দাঁড়াতেই ওসি বললেন, 'স্যার, একটু বসুন চা-টা এল বলে৷'
'ওসব থাক৷ আপনি আমায় আর একটা ইনফরমেশান দিন৷ অসুস্থ লোকগুলো কোন হাসপাতালে আছে?'
'যাদের অবস্থা ভালো নয় তারা সব পিজিতে৷ জনা-চারেক বাঙ্গুরে আর দু-জন এখানকার নার্সিং হোমে৷'
'আমি তাহলে একবার নার্সিং হোমে যাই৷'
'দাঁড়ান স্যার, আমি একজন ইন্সপেক্টারকে সঙ্গে দিচ্ছি৷ তাতে আপনার সুবিধে হবে৷
'সুনীলবাবু, আপনি স্যারের সঙ্গে যান৷ প্রথমে নার্সিং হোম তারপর পিজি৷ জিপসিটা নেবেন৷ দেখবেন ওঁর যেন কোনো অসুবিধে না হয়৷'
জিপটা থানা থেকে বেরোতেই সুনীলবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার একটা কৌতূহল মেটাবেন?'
আমি হাসিমুখে তাকালাম, 'কী ব্যাপার, বলুন৷'
'না, ওসি তো আপনাকে পাত্তা দিচ্ছিলেন না৷ তারপর হঠাৎ কী হল?'
'কী আর হবে, বাধ্য হয়ে আমাকে ওপর মহলের হেল্প নিতে হল!'
'ওপর মহল?'
'ওই আর কি, হোম সেক্রেটারি, পিসি . . .'
'ওরে বাব্বা! আপনি তো ডেঞ্জারেস লোক মশাই৷ দেখে তো বাচ্চা ছেলে মনে হয়৷'
'সেটাই তো ঠিক-আমি কলেজে পড়ি৷'
'মাই গুডনেস, এদিকে আবার রিপোর্টার৷'
সঙ্গে একজন পুলিশ অফিসার থাকায় সুবিধেই হল৷ নার্সিং হোমে ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে কথা বলে দারুণ তথ্য পেল বিভু৷ বিষ তেল খেয়ে অসুস্থ চারজনের প্রাণের আশঙ্কা কেটে গেলেও ওদের প্রত্যেকেরই প্যারালিসিসের সিম্পটম দেখা যাচ্ছে৷ সারা জীবন ওদের পঙ্গু হয়ে থাকতে হতে পারে৷ ভালো হবার অর্থাৎ সম্পূর্ণ সুস্থ হবার চান্স কম৷ পিজির ডাক্তারবাবুরাও একই কথা বললেন৷ সেই সঙ্গে একটা দুঃসংবাদ দিলেন, এদের যা অবস্থা তাতে মরে গেলেই বেঁচে যেত৷
'কেন?'
'অল্পবয়স্ক কিছু ছেলে-মেয়ে আছে তাদের সারাজীবন পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে৷ কাজকর্ম কিছু করতে পারবে না৷ এ কত বড়ো শাস্তি বলুন দেখি৷ ওদের প্রত্যেকের ড্রিপ চলছে, অক্সিজেন দিতে হচ্ছে কয়েকজনকে৷'
'কেউ মারা যেতে পারে?'
'বললাম তো, মারা গেলেই এরা বেঁচে যাবে৷'
'তার মানে এদের কারও মারা যাবার চান্স নেই?'
'সে কথা তো বলিনি, কয়েকজনের অবস্থা খুবই খারাপ৷ এনি মোমেন্ট এক্সপায়ার করতে পারে৷ রাত্তিরে ফোন করলে বলে দিতে পারব৷'
হাসপাতাল থেকে বিভু যখন বেরিয়ে এল তখন ঘড়ির কাঁটা ছ-টার ঘর ছুঁই ছুঁই৷ সূর্যদেব হাওড়ার দিকে গাছগাছালির আড়ালে ডুব দিলেন বলে৷ পিজি আর ময়দানের গাছে গাছে পাখিদের ঘরে ফেরার তাড়া চেঁচামেচি৷ রবীন্দ্রসদনের সামনে ফ্লাইওভার তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে৷ বাস-টাস বন্ধ; সুনীলবাবু বললেন, 'আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিই?'
'না, না-আপনি ফিরে যান৷ আমার জন্যে আপনার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে৷'
'ওসি আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিতে বলেছেন৷'
'বেহালায় টেনশন আছে৷ সকালে তো থানার সামনে স্থানীয় লোক বিক্ষোভ দেখিয়েছিল৷ আবার গোলমাল হতে পারে৷ তাহলে কিন্তু খবর দেবেন!'
'সে আর বলতে! তাহলে আমি ফিরে যাব? আপনার অসুবিধে হবে না তো?'
'কী যে বলেন৷ থ্যাঙ্ক ইউ ফর কোঅপারেশন৷'
'ওয়েলকাম ইউ স্যার!' সুনীলবাবু চলে গেলেন৷ জিপসিটা চোখের আড়ালে চলে যেতেই বিভু অফিসের পথ ধরল৷
বিভু যখন অফিস পৌঁছোল তখন প্রায় সাতটা বাজে৷ বিজয়দারই চোখ সবার আগে ওর ওপর পড়েছিল৷ বললেন, 'বিভুবাবু তাহলে অফিসে এলেন৷ এত রাত দেখে ভেবেছিলাম বুঝি ডুব মারলেন৷'
বিভু বিজয়দার কাছে জিজ্ঞেস করল, 'কানাইদা আসেননি? অফিসে দেখছি না তো?'
কানাইদা দক্ষিণ ২৪ পরগনার করেসপনডেন্ট৷ বেহালা ওঁর বিটেই-'উনি কোনো খবর করেছেন কি না জানার দরকার৷'
বিজয়দা বললেন, 'আজ বিশেষ কোনো খবর নেই বলে সন্ধ্যে বেলায় চলে গেছে৷ তা ওকে খুঁজছ কেন?'
'না, মানে, বেহালায় একটা বড়ো খবর . . . উনি কি কিছু দিয়েছেন?'
'বেহালার খবর৷ কই না তো! কানাই তো কিছু দেয়নি৷ তা খবরটা কী?'
'বিভুর তো আজ একটা বড়ো খবর দেবার কথা! কিছু বলছে নাকি বিজয়বাবু?'
'হ্যাঁ, বেহালার কী একটা খবরের কথা বলছে৷ কানাইকে খুঁজছিল ও কিছু দিয়েছে কি না জানতে চাইছিল৷'
'দ্যাটস গুড৷ বেহালা কানাইয়ের বিট ও জানে৷ তা খবরটা কী?'
'বিষ তেল খেয়ে দেড়-শোর ওপর মানুষ অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে, কয়েকজন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে৷ থানায় বিক্ষোভ, গণ অবস্থান৷ দু-টি দোকানের মালিক গ্রেপ্তার৷ ওই অঞ্চলের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত৷'
'বল কী, এ তো বিরাট খবর! ক-টা স্টোরি দেবে?'
'মিনিমাম চারটে৷ পাঁচটা হতে পারে৷'
'ছবির কী হবে?'
'আমি কয়েকটা তুলেছি৷ ভালো হবে না৷'
'যা হবে তাই যথেষ্ট৷ নৃপেনকে ডাকছি, রোলটা ডেভালাপ করুক, তুমি লিখতে শুরু করে দাও৷ এইটাই লিড নিউজ হবে৷'
বিভু নিজের সিটে গিয়ে বসতেই শ্যামদা বললেন, 'এন ই কী বলছিলেন রে?'
'মেন নিউজ চাইছিলেন৷'
'তোর কাছে মেন নিউজ? কোথা থেকে এলি?'
'বেহালা৷'
'বেহালা! ওটা তো কানাইয়ের বিট! ও তো বেহালার কোনো খবরের কথা বলল না৷'
বিভু আর কথা বাড়াল না৷ দ্রুত লিখতে লাগল৷ মেন নিউজটা একটু বড়ো করে লিখতে হবে৷ কী লিখবে, অফিসে আসতে আসতে বিভু তা ঠিক করে নিয়েছে৷ মনে মনে একটা হেডিং ঠিক করে নিয়েছে বিভু, বেহালায় বিষ তেল খেয়ে দেড়শতাধিক মানুষ অসুস্থ, সংকটজনক অবস্থায় কুড়ি জন, থানায় বিক্ষোভ, দুই দোকানদার গ্রেপ্তার৷ দ্বিতীয় স্টোরি, ওই অঞ্চলের মানুষের মনে আতঙ্ক, তৃতীয় : দুই দোকানদারের সাক্ষাৎকার ও ওসির বক্তব্য, চতুর্থ: হাসপাতালের দৃশ্য, পঞ্চম : ডাক্তারদের মতে সকলেই পঙ্গু হয়ে যাবে৷
পাঁচটা স্টোরি লিখতে লিখতে ন-টা বেজে গেল৷ ইতিমধ্যে ছবিগুলোর প্রিন্ট হয়ে গেছে৷ নৃপেন এসে ক্যাপশান করিয়ে নিয়ে গেছে৷ ছবিগুলো ভালোই এসেছে৷ নিউজ এডিটর নিজে পেজ ওয়ানের জন্য তিনটে ছবি বেছে নিয়েছেন৷ বাকি ছবি দুটো যাবে ভেতরের পাতায়৷
বিভু উঠে গিয়ে বিজয়দার হাতে নিউজগুলো দিল৷ নিউজগুলোর সাজেসটিভ হেডিং দেখতে দেখতে বিজয়দা নিজের মনে বললেন, 'এত বড়ো ঘটনা ঘটে গেছে৷ কানাই কোনো খবরই পায়নি৷ আশ্চর্য!'
কল্যাণ আজ সারাদিন রাইটার্সে ছিল৷ তাকে ডাকলেন বিজয়দা-বললেন, 'কল্যাণ বেহালার ব্যাপারে কেউ কোনো খবর দেননি?'
'না বিজয়দা!'
'তোমার সঙ্গে ফুড মিনিস্টারের দেখা হয়েছে আজ?'
'হ্যাঁ, কীসব গম কেনার কথা বলছিলেন৷'
'আশ্চর্য, রাইটার্সেও কেউ কিছু জানে না৷ নেহাত ছবিগুলো সঙ্গে আছে তাই, নাহলে বিভুর খবরটা বিশ্বাস করতে চাইত না৷ এত বড়ো ঘটনা-কেউ কিছু জানল না এটাই-বা কী করে হবে!' বিভুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি বেহালায় কখন গিয়েছিলে?'
'তা তখন প্রায় একটা বাজে! তারপর থানায় গিয়ে কাজ সারতে সারতে সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছিল৷' ওসি সঙ্গে একজন অফিসারকে দিয়ে দিয়েছিলেন বলে নার্সিং হোম আর হাসপাতালে ও যে খানিকটা বাড়তি সুবিধে পেয়েছিল সে কথাও জানায় বিভু৷
'অতবড়ো একটা ঘটনা ঘটে গেছে তুমি জানলে কী করে?'
'আমি এক আত্মীয়র বাড়ি গিয়েছিলাম৷ ওখানেই প্রথম শুনি৷ তারপর একে ওকে জিজ্ঞেস করে আর সাক্ষাৎকার নিয়ে ডিটেলস পেয়ে গেছি৷ কিন্তু এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন বিজয়দা?'
'কানাই কেন খবরটা পেল না তাই ভাবছিলাম৷ রাইটার্সে কোনো খবর নেই৷ ব্যাপারটা কেমন যেন একটু ফিশি লাগছে৷'
'তা লাগতে পারে, তবে খবরটার একটা শব্দও যে বানানো নয় তা আমি জোর গলায় বলতে পারি৷'
'না, না সে কথা নয়৷ আমি ভাবছিলাম, এত বড়ো খবর আর কেউ কিছু পেল না, এটা অবাক হবার বিষয় নয়?'
'আমাদের কাগজের দিক দিয়ে তো ভালো৷'
'তা ঠিক! যদি স্কুপ হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই৷'
প্রায় তাই হল৷ বিভুর খবর প্রায় স্কুপ৷ একটা কাগজে শুধু ছোটো একটা নিউজ ছিল, তেল খেয়ে অসুস্থ-তাও ভেতরের পাতায়৷ ব্যাপারটা যে এত মারাত্মক ছোট্ট ওই খবরটা পড়ে তা বোঝার উপায় ছিল না৷
প্রথম ফোনটা এল ঘটকদার, 'হ্যাঁরে, এত বড়ো খবর আমায় একটু জানালি না তো?'
'আমি ভেবেছিলাম তোমরা জান৷ থানায় বিক্ষোভ হল-তাও লালবাজারে জানায়নি৷ আমি তো ভাবতেই পারছি না৷'
'তুই আজ যাবি নাকি? দু-জন মিনিস্টার যাবেন৷ সি এম ডিটেলস রিপোর্ট চেয়েছেন, থ্যাঙ্ক গড, এখনও কেউ মারা যায়নি৷'
সাউথ ২৪ পরগনা কানাইদার বিট৷ তাই আমি আর ও মুখো হচ্ছি না৷ আজ তাড়াতাড়ি কলেজে যাব৷ প্রথম ক্লাসটা না করলে নয়৷ অনেকদিন কামাই হয়ে গেছে৷
ঘটকদা ফোন রাখতেই টেলিফোনটা আবার বেজে উঠল৷ নিউজ এডিটরের ফোন, 'কনগ্রাচুলেশন্স৷ দারুণ খবর হয়েছে৷ কানাই ফোন করেছিল৷ ওকে ফলোআপ করতে বলেছি৷ কাল খুব খাটাখাটনি গেছে৷ আজ একটু বিশ্রাম নাও৷ বিকেল বেলায় অফিসে এসো৷ তারপর কলেজে চলে যেয়ো৷'
বিভু ভীষণ অবাক হল৷ নিউজ এডিটর তো খবর ছাড়া কিছু বোঝেন না৷ তিনি বিশ্রাম নিতে বললেন৷ বিভুর মনে হল, নিউজটা তাহলে খুব খেয়েছে!
অগ্রহায়ণ ১৪১০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন