পুরস্কার

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

ভোর না হতে সতু নরেনকে ঠেলাঠেলি করতে লাগল, 'দাদা! দাদা! সকাল হয়েছে, উঠবে না?' দাদা সবে একটা কড়া ধমক দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল যে আজ দাদামশায়ের আসবার কথা-অমনি সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল৷ সতুবাবু বিছানায় শুয়ে শুয়ে চেঁচাতে আরম্ভ করল, 'ও দিদি! ছোটদি! শিগগির ওঠো-মাকে ডাকো৷' দিদি ঝংকার দিয়ে উঠল, 'হ্যাঁ গো হ্যাঁ, আমরা অনেকক্ষণ উঠেছি, এখন তোমরা শিগগির উঠলেই হয়-বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাঁকডাক হচ্ছে দেখো না!' 'বারে বা, নিজেরা কখন চুপচাপ উঠে গিয়েছ, আমাদের ডাকতে পারনি বুঝি? বেশ যাহোক!' বলে অপ্রস্তুত হয়ে সতুও তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল৷

রমা, নরেন, সত্যেন তিনজনে খেতে বসলে, মা জিজ্ঞাসা করলেন, 'বীণা কই?' রমা বলল, 'বীণার কি এক্ষুনি হবে? তার উঠতে, মুখ ধুতে তিন ঘণ্টা৷' সতু বলে উঠল, 'সত্যি, ছোটদি এমন ঢিলা-চটপট কিছু যদি করতে পারে৷' এমন সময় খুকুকে কোলে নিয়ে বীণা এল, তখন মা খুশি হয়ে বললেন, 'দেখো তো, তোমরা যে যার কাজ সেরে এলে আর বীণা খুকুকে মুখ ধুইয়ে, কাপড় পরিয়ে এনেছে, কাজেই ওর দেরি হয়েছে৷ নাও, এখন সব শিগগির খেয়ে নাও-এখনই তোমাদের দাদামশাই আসবেন৷'

একটু পরেই ছেলে-মেয়েরা দেখল, গাড়ির মাথায় একরাশ জিনিস চাপিয়ে, তাদের বাবা দাদামশাইকে নিয়ে হাজির৷ বাক্স-প্যাঁটরা, মিঠাইয়ের হাঁড়ি, ফলের ঝুড়ি সব নামানো হলে, প্রণাম ও আদর করার ঘটা শেষ হলে, দাদামশাই খেয়ে-দেয়ে ঠান্ডা হয়ে নাতি-নাতনিদের নিয়ে গল্প করতে বসলেন, তাদের যার জন্য যা এনেছেন বের করে দিলেন-রমা রান্না শিখছে, তার জন্য একটা স্টোভ ও ছোটো এক সেট সুন্দর সুন্দর বাসন এসেছে; নরেনের পড়ায় খুব ঝোঁক, প্রতি বৎসর প্রাইজ পায়-তার জন্য ছোট্ট একটি বইয়ের আলমারি; বীণা সেলাই ভালোবাসে, তার জন্য সুন্দর একটি সেলাইয়ের বাক্স-তাতে ছুঁচ, সুতো, কাঁচি থেকে আরম্ভ করে কত রকম সেলাইয়ের সরঞ্জাম রয়েছে; সতুর জন্য ঢাল, তরোয়াল, বন্দুক-সে কিনা বড়ো হয়ে খুব বীরপুরুষ হবে, তাই৷ খুকু আগে দাদামশাইয়ের দাড়ি আর চশমা দেখে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু একটা সুন্দর পুতুল আর রঙিন পাখি পেয়ে, সেও 'দাদু'র সঙ্গে ভাব করে ফেলল৷ জিনিসগুলি দিয়ে দাদামশাই বললেন, 'যে যা ভালোবাস শুনেছি, সেইরকম তার উপযুক্ত জিনিস এনেছি৷ আর একটা খুব ভালো জিনিস আছে, সেটা এখন দেখাব না৷ এক মাস পরে যখন আমি চলে যাব, তখন সেটা দিয়ে যাব৷ তোমাদের মধ্যে যে আমাকে সব চেয়ে খুশি করতে পারবে সে-ই সেটা পাবে৷' চার ভাই বোনে এক সঙ্গে বলে উঠল, 'কী করলে তুমি খুশি হও দাদু?' 'তা তো আমি বলব না-সেটা তোমাদের নিজেদের বুঝে নিতে হবে৷'

সেই রাত্রে চারজন পরামর্শ করে অনেক মাথা ঘামিয়ে স্থির করল যে, 'দাদু, চারজনকে চাররকম জিনিস দিয়েছেন তার মানেই হচ্ছে এই যে, তিনি দেখতে চান কে কীরকম সেই জিনিসের সদ্ব্যবহার করে৷'

পরদিন সকাল থেকেই রমা মহোৎসাহে স্টোভ জ্বালিয়ে খাবার করতে আরম্ভ করল৷ নরেন ভোরে উঠেই পড়ায় মন দিল; সে প্রতিজ্ঞা করেছে এবার পরীক্ষায় সব বিষয়েই ফার্স্ট হবে৷ বীণা ঠিক করল, তার দাদামশাইকে খুব সুন্দর করে একখানা পশমের আসন বুনে দেবে৷ মুশকিল হল সতুর-সে বেচারা যে হঠাৎ কী বীরত্ব দেখিয়ে দাদুকে খুশি করে দেবে, তা সে ভেবেই পাচ্ছে না৷ দাদু যদি পুকুরে ডুবুডুবু কিংবা ছাত থেকে পড়ো-পড়ো হন, কিংবা বাড়িতে আগুন লাগে, নয় তো চোর ডাকাত পড়ে, তবে বরং তার বাহাদুরি দেখাবার সুযোগ ঘটতে পারে৷ কিন্তু দাদু তো ঘরের মধ্যে স্নান করেন, ভুলেও ন্যাড়া ছাতে পা বাড়ান না, অন্য বাড়ির দাদুদের মতন তামাকও খান না৷ মা-ও আবার তেমনি-ছেলেপিলের ভয়ে রাতদিন আলো বাতি সামলিয়ে বেড়ান৷ শোবার আগে বাবা নিজে দেখেশুনে চারদিক বন্ধ করেন, আর বুড়ি ঝিটা সারারাত জেগে থেকে কোথাও টুঁ শব্দটি হলে, 'কে রে?' করে এমন তেড়ে ওঠে, যে, চোর ডাকাত তো দূরের কথা-বেড়াল কুকুরটি পর্যন্ত ঘেঁষতে চায় না৷ সবাই এমন অন্যায় রকম হুঁশিয়ার হলে কি আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটবার আশা থাকে? সতুর দুঃখের কথা শুনে নরেন আর রমা তো হেসেই খুন-তাদের ঠাট্টাতে বেচারার আরও কান্না পেল৷ তখন বীণা বলল, 'তুই এক কাজ কর না-খুব exercise করে, গায়ে জোর কর৷ তোর মুখে তো খুব সাহস, কিন্তু এদিকে যে তালপাতার সেপাই-গায়ে জোর না হলে-কাজে সাহস দেখাবি কী করে?' ছোটদির কথায় সতু উঠেপড়ে ব্যায়াম করতে লেগে গেল৷

ছোটদি নিজে কিন্তু সেলাইয়ের বিশেষ কিছু করতে পারল না৷ সকালে উঠে দেখে ঝি-র অসুখ করেছে তাই মা বড়ো ব্যস্ত-সে খানিকক্ষণ খুকুকে রাখল, বিছানা তুলে, ঘর পরিষ্কার করল, বাবার আপিসের কাপড়চোপড় ঠিক করে দিল, তাঁর জামার বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছিল সেটা লাগিয়ে দিল, তারপর খুকুকে স্নান করাতে নিয়ে গেল৷ প্রায় খুকুর মতোই বড়ো বীণার একটা পুতুল ছিল, সেটাকে স্নান করাতে তার বড্ড ভালো লাগত; কিন্তু এই জ্যান্ত পুতুলটিকে স্নান করানো যে এমন মুশকিল, সেটা তার জানা ছিল না-খুকু তেল ফেলে, সাবান চেটে, জল ছিটিয়ে, ছোট্ট দিদিটিকে অস্থির করে তুলল৷

দশটার সময় দাদু আর বাবা, নরেন আর সত্যেনকে নিয়ে খেতে বসল, রমা পরিবেশন করল-তার হাতের রান্না খেয়ে সবাই খুব ভালো বললেন৷ নরেন দু-মিনিটে স্নান সেরে বড়ো বড়ো গ্রাস কপকপ করে গিলতে লাগল৷ তার বাবা বললেন, 'অত তাড়াতাড়ি খেয়ো না-হজম হবে না৷' 'আজ বড্ড দেরি হয়ে গেছে, তাই', বলে নরেন কোনোরকমে ভাত গিলে ঊর্ধ্বশ্বাসে স্কুলে ছুটল-তার চেহারাটা ঠিক যেন ঝোড়ো কাকের মতো৷ আর সতুর চেহারাখানা আরও চমৎকার-মুখ লাল, গায়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে-হাঁপাচ্ছে আর খাচ্ছে-জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, সে এতক্ষণ 'স্যান্ডো' করছিল৷

নরেন ও সতু স্কুলে যাবার পর রমা আর বীণাও খেয়ে-দেয়ে নিজেদের স্কুলে গেল৷ টিফিনের ছুটির সময় বীণা তার সেলাই নিয়ে বসল, অমনি কতগুলি মেয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলল-কেউ সেলাই ধরে টানে, কেউ পশম ঘাঁটে, কেউ হাজাররকম প্রশ্ন করে৷ এরকম 'লোক দেখানো' কাজ রমা পছন্দ করে না-সে মনে মনে বীণার উপর একটু বিরক্ত হল৷ তারপর ছুটি হতেই বীণা যখন 'দিদি, একটু দাঁড়াও না' বলে সেলাইয়ের শিক্ষয়িত্রীর ঘরে ঢুকে দেরি করে দিল, তখন রমা ভারি চটে গেল৷ মিনিট পাঁচেক পরে বীণা বেরোতেই তাকে খুব করে শুনিয়ে দিল, 'আচ্ছা স্বার্থপর মেয়ে যাহোক! সেলাই দেখাতে যাওয়া হয়েছিল বুঝি? নিজের সেলাইটাই হল কাজ, আর আমার রান্নাটা কাজ নয়, না? কত দেরি হয়ে গেল, গিয়ে দাদুর জল খাবার ঠিক করে দিতে হবে না বুঝি আমার?' এই বলে সে ছুটে রওনা হল৷

নরেন আর সতুও তখন স্কুল থেকে ফিরছে, পথে এদের ছুটতে দেখে তারাও 'রেস' দিয়ে ছুটল৷ নরেন সকলের আগে, তারপর রমা; সতু বীণাকে ছাড়িয়ে সবে রমার কাছাকাছি এসেছে, এমন সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল৷ বীণা তার হাত ধরে তুলতেই 'আঃ ছাড়ো' বলে সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার ছুটল৷ বীণা তার পিছনে পিছনে এল-যদিও সে ইচ্ছা করলেই অনায়াসে সতুকে ছাড়িয়ে যেতে পারত৷ বাড়ি এসে সতু বলল, 'দাদা ফার্স্ট, দিদি সেকেন্ড, আমি থার্ড আর ছোটদি লাস্ট! মাগো, ছোটদিটা এমন ঢিলে-কোনো কাজের নয়৷' ছোটদি হেসে বলল, 'আচ্ছা গো পালোয়ানজি, এখন এসো তো তোমার পা-টা ধুয়ে একটু জলপট্টি দিয়ে দিই?'

জলখাবার খেয়েই নরেন তার ঘরে খিল দিতে দিতে মাকে বলল, 'রাত্রে খাবার সময়ের আগে যেন কেউ তাকে বিরক্ত না করে৷' মা বললেন, 'অত পোড়ো না বাবা, অসুখ করবে৷ এখন একটু বেড়িয়ে এসে, সন্ধ্যা বেলা পড়তে বোসো৷' 'না মা, এ কয়দিন আর কিছু করব না-পরীক্ষার আর মোটে পনেরো দিন আছে, এবারে দেখো সবটাতেই ফার্স্ট প্রাইজ পাই কি না!' সতু বলল, 'আর আমি পাব স্পোর্টস-এর ফার্স্ট প্রাইজ! ছোটদিকে তো হারিয়ে দিয়েছিই, দিদিকেও হারাতে পারতাম, যদি পায়ে না লাগত৷ আজ স্কুলে ফণীটা এসেছিল আমার সঙ্গে লাগতে-এমনি ল্যাং মারলাম তার ঠ্যাঙে, যে একেবারে চিতপটাং হয়ে পড়ল৷' 'আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেও যে চিতপটাং হয়েছিলে সে কথাটি যে বড়ো বললে না?' নরেনের কথাতে থতোমতো খেয়ে সতুবাবু মাঠে খেলতে পালাল৷

রমাকে মা বললেন, 'এবেলা তুমি আর আগুনের ধারে এসো না,' তাই সে একখানা 'মিষ্টান্ন-পাক' বই নিয়ে পড়তে বসল৷ বীণাও সেলাই নিয়ে তার পাশে গিয়ে বসল, কিন্তু তার সেলাইয়ে মন বসল না-এই খুকি কাঁদল, ওই বাবা আপিস থেকে ফিরলেন, মা বুঝি কাকে ডাকলেন, এমনি নানান ছুতো করে সে বার বার উঠে আসে; শেষে রমা বিরক্ত হয়ে বলল, 'তোর হয়েছে কী যে, অমন উশখুশ করছিস? নিজেও মন দিয়ে স্থির হয়ে বসে কিছু করবি না, অন্যকেও কিছু করতে দিবি না নাকি? এমন স্বার্থপর হিংসুটে মেয়ে দেখিনি৷'

সন্ধ্যার সময় বাবা যখন বসে বিশ্রাম করছিলেন তখন বীণা আস্তে আস্তে গিয়ে বলল, 'বাবা, এই বইটার কথা তুমি কাল বলছিলে কি?' বই দেখে বাবা অবাক হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ মা, এই বই তো আমি কোথাও পাইনি-তুমি কোত্থেকে পেলে?' 'আমাদের সেলাইয়ের টিচারের কাছে দেখেছিলাম; তাই আজ তাঁর কাছ থেকে চেয়ে আনলাম৷' বাবা কত খুশি হলেন দেখে, বীণা বই আনতে গিয়ে দিদির কাছে বকুনি খাওয়ার দুঃখ ভুলে গেল৷

রাত্রে ভাই-বোনে কথা উঠল-কার কাজ কতদূর হল৷ রমা আজ দু-রকম নতুন খাবার করেছে, দুটো তরকারি রাঁধতে শিখেছে-সবগুলোরই খুব সুখ্যাতি হয়েছে৷ নরেন ক্লাসে আগাগোড়া ফার্স্ট ছিল-একটিও ভুল করেনি৷ সতু সকালে একঘণ্টা স্যান্ডো করেছে আর বিকালে একঘণ্টা কুস্তি করছে, ছোটদিকে তো হারিয়েছেই, বড়দিকেও আরেকটু হলেই হারাত৷ (ফণীকে ল্যাং মারার কথাটা দাদার ভয়ে আর বলা হল না)৷ বীণা চুপ করে রইল-তার তো সেলাই কিছুই প্রায় হয়নি৷ দাদা আর দিদি বলল, 'প্রথম দিনে যা নমুনা দেখালে, এমনি করলেই হয়েছে আর কি! তবেই খুব প্রাইজ পেয়েছ৷'

এমনি করে দিন যায়-রমা রোজই নতুন কিছু রান্না করে, দু-বেলা রকম রকম খাবার করে, নিজের হাতে সাজিয়ে দাদুকে খাওয়ায়৷ তাতে যদিও অনেক সময়ে অন্য কাজ গোল হয়ে যায়-হয়তো পড়া শেখা হয় না, কাপড়চোপড় হয়তো অগোছালো হয়ে পড়ে থাকে, বইগুলো এদিক-ওদিক হারিয়ে যায়, মেজাজটাও মাঝে মাঝে একটু বিগড়িয়ে যায়-কিন্তু এই আসল কাজটিতে তার কখনো গোল হয় না৷ নরেন তার পড়ার জন্য আহার-নিদ্রা একরকম ছেড়েছে বললেই হয়-ভোরে উঠে সেই সে আরম্ভ হয়, রাত্রে যতক্ষণ চোখ চাইতে পারে ততক্ষণ চলে৷ মা-বাবা অত পড়তে মানা করেন, বন্ধুরা এসে একটু খেলতে বা বেড়াতে যাবার জন্য টানাটানি করে, নিজেরও কত সময়ে মনটা ছটফট করে ওঠে, শরীরটা বড়োই ক্লান্ত বোধ হয়-তবু তার প্রতিজ্ঞা অটল৷ সতুও মহা উৎসাহে রোজ ডাম্বেল ও মুগুর ভাঁজে, পুকুরে সাঁতার শেখে, কুস্তি করে এবং গায়ের জোরের পরীক্ষাটা করে-বাড়িতে খুকুর উপরে আর স্কুলে সবচেয়ে ছোটো ছেলেদের উপরে৷ বীণাও সেলাই করেছে কিন্তু ওদের মতো ভালোভাবে পেরে উঠছে না৷ দোষটা অবিশ্যি তারই-সে কেন দাদা ও দিদির মতো নিজের কাজে মন দেয় না? তার যেমন চঞ্চল স্বভাব তাই সে স্থির হয়ে বসে কিছু করতে পারে না-একবার একাজে একবার সেকাজে দৌড়োয়৷ তা ছাড়া, সে বোকার মতো খাটে বলেই তো লোকে তাকে দিয়ে বেগার খাটায়-শুধু বাড়ির নয়, পাড়ার লোকের ফরমাস খেটে সে মরে কেন? এ বিষয়ে তাকে অনেক উপদেশ দিয়ে দিয়ে শেষে রমা আর নরেন তার ভরসা ছেড়ে দিল৷ বীণাও দেখল যে দিদি আর দাদার যেরকম বুদ্ধি, তাতে তার আর প্রাইজ পাবার কোনোই আশা নাই৷ তবু যখনই অবসর হত, তখনই সে সেলাই নিয়ে বসত৷ কিন্তু তার হাতে ছুঁচসুতো দেখলেই সবাইয়ের মনে পড়ে যেত-কার জামার বোতামটা পড়ে গিয়েছে, কার কাপড়ে খোঁচা লেগেছে, কার পকেটটা ফুটো হয়েছে৷

দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেল৷ যাবার আগের দিন দাদামশাই নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসে গল্প করছেন-কাল তাদের ছেড়ে যাবেন বলে তাঁর মনটা খারাপ লাগছে৷ চারটি ভাই-বোনেরও মন কেমন করছে, তবে তাদের বেশি ভাবনা হচ্ছে সেই প্রাইজটার জন্য৷ দাদু যে বলেছিলেন যাবার সময় প্রাইজ দিয়ে যাবেন-সকলেই তো তাঁকে খুশি করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে, এখন কার ভাগ্যে কী হয়! দু-চার কথার পর দাদু বললেন, 'হাঁ-তোমাদের তো একটা প্রাইজ দেবার কথা আছে! আচ্ছা, তবে দেখা যাক, কে কেমন খুশি করেছ-

'রমা, তোমার রান্না খেয়ে আমি বড়ো খুশি হয়েছি৷ এতরকম রাঁধতে ও খাবার করতে, এমন যত্ন করে খাওয়াতে, তোমার মতন কেন-তোমার চেয়ে ঢের বড়ো মেয়েরাও অনেকেই পারে না, তুমি দেখছি পাকা রাঁধুনি হয়ে উঠেছ! কিন্তু দিদি, একটি কথা তোমাকে বলি-শুধু রেঁধে খাওয়ালেই তো হয় না! তুমি হলে বাড়ির বড়োমেয়ে তুমি মায়ের সাহায্য করবে, ভাই বোনদের প্রতি ভালোবাসা না দেখিয়ে রেষারেষির ভাবটাই বেশি দেখিয়েছ৷ মায়ের কাজের সাহায্য যেটুকু করেছে তাও নিজের স্বার্থের জন্যই, তাঁর সুবিধার জন্য নয়৷ পড়াতেও তুমি অন্যবারের চেয়ে এবার ঢের নীচে হয়েছ৷ রান্নাটা একটু কম ভালো করেও যদি তুমি এসব দিকে আরেকটু ভালো করতে, তবেই আমি খুশি হতাম৷

'নরেন, তুমি পরীক্ষায় সব বিষয়ে ফার্স্ট হয়েছ শুনে খুশি হলাম৷ আশা করি যত বড়ো হবে, ততই লেখাপড়ায় বেশি উন্নতি করতে পারবে৷ কিন্তু তোমার শরীরের দশাটা একবার ভাবছ কি? এর মধ্যেই যে তোমার চোখ খারাপ, মাথা ঘোরা শুরু হল, তারপর শরীর যখন একেবারে মাটি হবে, তখন বিদ্যের বোঝা নিয়ে করবে কী? বাবা-মা যে এত বলেন তবু তুমি কথা শোনো না, তাঁদের মতো হিতাকাঙ্খী তোমার কেউ নেই জেনো৷

'আর সতু, তুমি হচ্ছ ঠিক দাদার উলটো-একেবারে দস্যি ডানপিটে৷ লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পর্ক নাই, রাতদিন হুড়োহুড়ি, বড়োদের মানো না, আর ছোটোদের মারধর করে বীরত্ব ফলাও-শুধু গায়ের জোর নিয়ে কি মুটে মজুর হবে, না ডাকাত হবে? সতু যদি শরীরের উন্নতির সঙ্গে মনের উন্নতির দিকে একটু দৃষ্টি দাও, আর নরেন যদি শরীরের উন্নতির দিকে একটু দৃষ্টি দাও, তবেই আমি সুখী হই৷

'বীণার সেলাইটা যে খুব ভালো হয়েছে, তা নয়-এর চেয়ে আরও ভালো বোধ হয় সে করতে পারত, যদি কেবল সেলাইয়ের দিকে মন দিত৷ কিন্তু সে যে আর সব ভুলে কেবল প্রাইজ পাওয়ার দিকেই মন দেয়নি, তাতেই আমি বেশি খুশি হয়েছি৷ তার বুদ্ধি হয় তো তোমাদের চেয়ে কিছু কম থাকতে পারে, কিন্তু তবু তো সে চেষ্টা করে পড়াশোনা ও সেলাই বেশ ভালোই করেছে৷ শুধু তাই নয়, সে তোমাদের মতো কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেনি-বাবা-মায়ের কত সাহায্য করেছে, ছোটো ভাই-বোনকে যত্ন করেছে, কত লোকের কত খুঁটিনাটি কাজ করে দিয়েছে৷ তোমরা বড়ো হলেও যা তোমাদের খেয়াল থাকেনি, সে ছোটো হলেও সে সব কাজ করে তোমাদের ত্রুটি সেরে দিয়েছে৷ তোমাদের একটু অন্য কাজ পড়লে তোমরা 'পড়ার ক্ষতি হবে, রান্না শেখা হবে না' বলে কত বিরক্ত হয়েছ, বীণা কিন্তু সর্বদা হাসিমুখে সব কাজ করেছে৷ বীণাকে বোকা মনে করে তোমরা কত ঠাট্টা কর, কত কথা শোনাও কিন্তু বলো তো, তোমাদের বিদ্যাবুদ্ধির মূল্য বেশি, নাকি তার সুন্দর স্বভাবটির মূল্য বেশি? আমি তো তার স্বভাব দেখেই সব চেয়ে খুশি হয়েছি, আর তোমরাও যদি তার মতন হও তবে আরও খুশি হব৷'

বীণা তো স্বপ্নেও ভাবেনি যে, সে প্রাইজ পাবে-তার সেলাইটা তো তেমন কিছুই ভালো হয়নি-কাজেই দাদু যখন তার হাতে ছোট্ট একটি বাক্স দিলেন, তখন সে অবাক হয়ে গেল৷ বাক্সটি খুলে দেখল, সুন্দর ছোট্ট একটি সোনার ঘড়ি৷ দাদু বললেন, 'এটাকে যত্ন করে রাখবে-বড়ো হয়ে যখন এটা ব্যবহার করবে, তখনই দাদুকে মনে করবে, কেমন? আশা করি আমি আবার যখন আসব, তখন রমা নরেন আর সতুও আমাকে এমনি খুশি করে দেবে৷'

বীণার এত বেশি আনন্দ হয়েছিল যে, সে কোনো কথাই বলতে পারল না কিন্তু মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল যে দাদুর জিনিসটা খুব যত্ন করে রাখবে, আর এই পুরস্কারের উপযুক্ত থাকতে চেষ্টা করবে৷ রমা নরেন আর সতুও ঠিক করল, যে আসছে বছর যখন দাদু আসবেন, তখন তাদের প্রতিও তিনি যাতে এমনি খুশি হন, তাই করবে৷

চৈত্র ১৩২৯

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%