অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
আমি যখন তোমাদের মতো ছিলাম, অর্থাৎ আমার বয়স যখন তোমাদের বয়সের মতো ছিল, তখন আমাদের বাড়িতে একটি আত্মীয় মাঝে মাঝে আসতেন-তাঁর নাম ধরো, 'রায় মহাশয়'৷ রায় মহাশয় ভারি আমুদে লোক ছিলেন; বয়স ছিল আমার বয়সের মতো বেশি, কিন্তু মনটি ছিল তোমাদের মনের মতো সরল৷ মুখে হাসি লেগেই থাকত, আর কন্ঠে গুনগুন শব্দে গান৷ তামাক খেতে তিনি খুব ভালোবাসতেন; ভুড়ুক ভুড়ুক করে সর্বদাই তামাক খেতেন, আর তার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের মজার মজার গল্প বলে শোনাতেন৷
আজ রায় মহাশয়ের কাছে শোনা একটা গল্প মনে পড়ছে৷ সন্দেশের মারফত তোমাদের সে গল্পটি শুনিয়ে দিই, পুজোর সময়ে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের কাছে সেটি বলে হয়তো একটু আনন্দ পাবে৷
এক ছিল পশ্চিমা সওদাগর, বয়স ছিল তার কম-বেশি ষাট বছর৷ দীর্ঘাকৃতি কৃশ মানুষটির মন ছিল অত্যন্ত সরল; কিন্তু সেই মনের মধ্যে বুদ্ধি বলে যে জিনিসটি থাকে সেটি ছিল একেবারে ভোঁতা, অর্থাৎ সাদা কথায় লোকটি ছিল নেহাত বোকা৷
ব্যাবসাতে লোকসান তাকে প্রায়ই দিতে হয়৷ কাজ শিখতে শিখতে আর পাকা হতে হতেই সে বুড়ো হয়ে গেল৷ লোকে কিছু বললে বলে, 'ব্যাবসা কি সহজ জিনিস রে ভাই? লাভ হঠাৎ করলেই হল আর কি!' বুদ্ধি যে তার ধারালো নয়, এ কথা কিন্তু প্রাণান্তে কারও কাছে সে স্বীকার করে না৷
সকাল বেলা তাড়াতাড়ি স্নানাহার সেরে দিল্লির চাঁদনি চক বাজারে গিয়ে সে তার ছোটোখাটো দোকানটি খুলে বসে৷ তারপর সারাদিন সেখানে বেচাকেনা করে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আসে৷ বাড়ি এসে স্নান করে কিছু খাবারদাবার খেয়ে সে তাড়াতাড়ি বই নিয়ে বসে৷ বই পড়া তার ভারি শখের জিনিস৷
একদিন সন্ধ্যার পর মামুলি নিয়ম মতো সে বই নিয়ে বসেছিল৷ সম্মুখে কাঠের ফ্রেমের উপর একটি বড়ো আকারের উর্দু শ্লোকের বই খোলা; ডান দিকে লম্বা গড়গড়ায় তাওয়া চড়ানো; বাঁ-দিকে কাঠের ডেলকোয় (পিলসুজে) প্রদীপ জ্বলছে৷ সে অনেক দিনের কথা, তখন বিজলি বাতির যুগ নয়, বাড়ি বাড়ি তেলের প্রদীপই জ্বলত৷

সওদাগর মনের আনন্দে দুলে দুলে বই পড়ছিল, একটা শ্লোক পড়ে হঠাৎ তার দোল থেমে গেল, মনের মধ্যে ভারি খটকা লাগল৷ মনে হল-তাই যদি হয়, তাহলে তো অনেক লোকেই তার বিষয়ে অনেক কথাই ভেবেছে! মনে করেছে তার তত বুদ্ধি নেই, মনে করেছে সে একটু বোকা!
যে শ্লোকটা পড়ে সে উদবিগ্ন হয়ে উঠেছিল তার অর্থ হচ্ছে-যে ব্যক্তির দাড়ি দু-মুঠোর চেয়েও বেশি লম্বা হয় সে হয় বোকা৷ এখন সওদাগরের দাড়ির প্রতি একটু বিশেষ যত্ন ছিল, এবং তার ফলে দাড়িটি একটু লম্বাই ছিল৷ কিন্তু তাই বলে কি দু-মুঠোর চেয়েও বেশি?
আগ্রহে এবং উৎকন্ঠায় দু-হাতের দু-মুঠো পাশাপাশি রেখে সওদাগর তার দাড়ি চেপে ধরল; চোখের দিকে বদ্ধ মুঠো তুলে ধরে দেখল, মুঠো ছাড়িয়েও পনেরো-ষোলো গাছা চুল ইঞ্চি দেড়েক বেরিয়ে রয়েছে৷ সর্বনাশ! তাহলে তো এ শ্লোক যারা পড়েছে, তারা তাকে নির্বোধ বলেই মনে করে৷ লজ্জায় ও দুঃখে সওদাগরের দু-চোখে জল ভরে এল৷ লজ্জা কেন বুঝতেই পারছ; দুঃখ-যদি এই এত সাধের দাড়িকে ছোটো করতে হয়! কিন্তু তাই বলে দাড়ির খাতিরে তো আর বুদ্ধিকে ছেঁটে রাখা চলে না! দাড়ি সরেস জিনিস বটে, কিন্তু বুদ্ধি আরও সরেস! ও ছাঁটতেই হবে৷
হাতের কাছে কাঁচি-টাঁচি কিছু ছিল না, বাড়িতেই ছিল কি না সন্দেহ৷ কী করা যায় তাহলে? কী করা যায়? হঠাৎ পড়ল প্রদীপের উপর দৃষ্টি৷ ঠিক হয়েছে, পুড়িয়ে ফেলা যাক-কিন্তু দুর্নাম সৃষ্টিকারী যেটুকু দূষিত অনাবশ্যক অংশ ঠিক ততটুকুই, মুখের শোভাবর্ধনকারী নিরীহ যে অংশ তার একটি চুলও নয়!
প্রাণপণে শক্ত করে দু-হাতের মুঠোয় দাড়ি চেপে ধরে সন্তর্পণে মুখটি বাড়িয়ে সওদাগর দাড়ির ডগাটি প্রদীপের শিখায় সমর্পণ করল৷ শুকনো চুলে আগুন লাগতেই পুড়ে উঠল৷ তারপর চুড়বুড় চুড়বুড় করে এগোতে এগোতে যেই প্রথম মুঠোয় গিয়ে ছ্যাঁকা লেগেছে, অমনি সে 'আঃ ' শব্দ করে হাত ছেড়ে দিয়েছে৷ তারপর চড়বড় চড়বড় করে পুড়তে পুড়তে দ্বিতীয় মুঠোর গায়ে আগুন লাগতেই 'গেলুম' বলে সে হাতও ছেড়ে দিল৷ তখন আর কি! দেখতে দেখতে এক নিমেষে প্রায় সমস্ত দাড়িটি পুড়ে ছাই হয়ে গেল! দু-হাত দিয়ে আগুন নেভাতে গিয়ে একটু একটু যা দাড়ি রয়ে গেল, তাতে মুখের শোভা হল অপূর্ব!
নিকটেই ছিল সওদাগরের মেয়ে, সে বাপের কাতরোক্তি শুনতে পেয়ে ছুটে এল৷
'কী হল বাবা?'
'কিছু নয় মা!' যন্ত্রণায় কিন্তু দুই চোখ জলে ভরা৷
'ওকী বাবা! তোমার দাড়ি কী হল?'
দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে সওদাগর বলল, 'কিছু হয়নি, ঝরে গেছে৷'
'ঝরে গেছে? কী করে ঝরল?'
'দাড়িতে ওষুধ লাগিয়েছিলাম, তাই ঝরে গেছে৷'
'উঁ! গন্ধ কীসের? কী বিশ্রী চুলপোড়া গন্ধ!'
'ও ওষুধের গন্ধ৷ চুল কি পোড়ে মা? পোড়ে না৷ পুড়লেও এত দূর থেকে কখনো পোড়ে? যা তো মা, শিগগির একটু নারকেল তেল নিয়ে আয়৷ উঃ , বড্ড জ্বলছে!'
'কী জ্বলছে বাবা, দাড়ি?'
'দাড়ি নয় মা, মাথা৷ মাথা ঠান্ডা হলে দাড়িও ঠান্ডা হবে!'
সওদাগরের মেয়ে যখন নারিকেল তেল নিয়ে এসে হাজির হল তখন সওদাগর বইখানা বেঁধে ফেলেছে৷ মেয়ের হাতে সেটা দিয়ে বলল, 'এটা আলমারিতে তুলে রাখগে মা, তোরা কখনো যেন খুলে পড়িসনে৷'
মেয়ে চলে গেলে দাড়িতে তেল মাখিয়ে সওদাগর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল৷ মনে মনে বলল, 'বইয়ে যে কথা লেখে তা কি আর মিথ্যে লেখে! দু-মুঠোর বেশি লম্বা যাদের দাড়ি সত্যিই দেখছি তারা বড়ো বেওকুফ হয়৷'
আশ্বিন ১৩৪১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন