সেজমামার চন্দ্রযাত্রা

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

আমার ছোটোকাকা মাঝে মাঝে আমাদের বলেন, 'এই যে তোরা আজকাল চাঁদে যাওয়া নিয়ে এত নাচানাচি করিস, সে কথা শুনলে আমার হাসি পায়৷ কই, এত খরচাপাতি, খবরের কাগজে লেখালেখি করেও তো শুনলাম না কেউ চাঁদে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে! তোরা আবার এটাকে বৈজ্ঞানিক যুগ বলিস, ছোঃ!'

আমরা তখন বলি, 'তার মানে? কী বলতে চাও খুলেই বলো না৷'

ছোটোকাকা বলেন, 'তার মানেটা খুবই সোজা৷ চাঁদে যাওয়াটা কিছু একটা তেমন আজকালকার ব্যাপারও নয়৷ পঞ্চাশ বছর আগে আমি নিজেই তো একরকম বলতে গেলে চাঁদে ঘুরে এসেছি৷'

আমরা তো অবাক!-'একরকম বলতে গেলে কী? গেছিলে, না যাওনি?'

ছোটোকাকা বইয়ের পাতার কোনা মুড়ে রেখে পা গুটিয়ে বসে বললেন, 'তাহলে দেখছি সব কথাই খুলে বলতে হয়৷ শোনো তবে৷ বয়স আমার তখন বারো-তেরো হবে, পুজোর ছুটিতে গেলাম মামাবাড়িতে৷ সেজোমামা অনেক করে লিখেছেন৷ এমনিতেই আমি কোথাও গেলে সেখানকার লোকরা খুব যে খুশি হয় বলে মনে হয় না, আর সেজোমামা তো নয়ই৷ তা ছাড়া দিদিমা সারাক্ষণই এটা-ওটা দেন, খাওয়া-দাওয়া ভালো, পুকুরে ছিপ ফেললেই এই মোটা মোটা মাছ, গাছে চড়লেই ডাঁসা পেয়ারা৷ না যাবার কোনো কারণই ছিল না৷

'সেখানে পৌঁছে দেখি সেজোমামা কোত্থেকে একটা লড়ঝড়ে মোটরগাড়ি জোগাড় করে আমাকে নিতে স্টেশনে এসেছেন৷ আমাকে দেখেই, মাথা থেকে পা অবধি চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, আগের চেয়ে যেন একটু ভারী ভারী লাগছে! হ্যাঁরে, তোর ওজন কত রে?

'কিছুদিন আগেই ইশকুলে সবাইকে ওজন করেছে৷ বললাম, আটত্রিশ সেরের সামান্য বেশি৷

'সেজোমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, আবার বেশি কেন? সে যাকগে, ওতেই হবে, এখন গাড়িতে ওঠ, চল তোকে একজায়গায় নিয়ে যাই, খুব ভালো খাওয়ায় তারা৷

'সেজোমামাকে গাড়ি চালাতে দেখে আমি তো অবাক, তুমি আবার গাড়ি চালাতে পার নাকি?

'সেজোমামা বেজায় রেগে গেলেন, কী যে বলিস! আরে এই সামান্য একটা গাড়িও চালাতে পারব না? বলে কিনা যে আমি-যাকগে, চল তো এখন৷

'সোজা নিয়ে গেলেন কুণাল মিত্তিরের রহস্যময় বাড়িতে৷ ও বাড়ির ভেতরে এখানকার কেউ কখনো যায়নি, কুণাল মিত্তিরের নাম সবাই জানে, তবে তাকে কেউ চোখে দেখেনি৷ একটা উঁচু টিলার উপরে অদ্ভুত বাড়ি, বাড়ির চারিদিকে দেড়-মানুষ-উঁচু পাঁচিল, তার ওপরে কাঁটাতারের বেড়া, দেয়াল কেটে লোহার গেট বসানো, সে সর্বদাই বন্ধ থাকে৷ শোনা যায় কুণাল মিত্তির নাকি নানারকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন, সে-সব সাধারণের জন্য নয়, অতি গোপন ও গুহ্যভাবে করতে হয়৷

'প্রকাণ্ড টিলাটার গা বেয়ে যদি চড়া যায়, ওপরটা চ্যাপটা, সবটা ঘিরে পাঁচিল, আশেপাশে কোনো গাছগাছড়াও নেই যে তাতে চড়ে পাঁচিলের ভেতরে দেখা যাবে৷ তার ওপর মাঝে মাঝে ভেতর থেকে বাড়ি-কাঁপানো গর্জন শোনা যায়, লোকে বলে নাকি দু-জোড়া ডালকুত্তা দিনরাত ছাড়া থাকে৷ মোট কথা, কেউ ওদিকে বড়ো একটা যায় না৷ চারদিকে দু-তিন মাইলের মধ্যে কারও বসতিও নেই৷ ফাঁকা মাঠ আগাছায় ভরা৷

'সেইখানে তো গেলেন আমাকে নিয়ে সেজোমামা৷ আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে গাঁ গাঁ করতে করতে গাড়িটা তো টিলার উপরে চড়ল৷ তারপর প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন বাজাতেই লোহার দরজা গেল খুলে৷ আমরাও ভেতরে গেলাম৷ অবাক হয়ে দেখি চমৎকার ফুলবাগান, একতলা লম্বা একটি বাড়ি, তার বারান্দায় একটা বড়ো কালো বেড়াল সোজা হয়ে বসে সবুজ চোখ দিয়ে আমাদের দেখছে৷ একটা উঁচু দাঁড়ে নীল কাকাতুয়াও একদৃষ্টে আমাদের দিকে চেয়ে আছে৷ আমাদের বলছি কেন, আসলে আমাকে দেখছে৷

'অমনি চারদিক থেকে দলে দলে চাকর-বাকর ছুটে এসে মহা খাতির করে আমাদের নামাল৷ বারান্দা থেকে একজন ভদ্রলোকও এগিয়ে এলেন, ফর্সা কোঁকড়া চুল, বেঁটে মোটা, বয়স বেশি নয়৷ আমি সেজোমামাকে ফিসফিস করে বললাম, ওই নাকি সেই বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কুণাল মিত্তির যাকে কেউ চোখে দেখেনি৷

'শুনতে পেয়ে ভদ্রলোক চটে গেলেন, কেউ চোখে দেখেনি আবার কী, আমি বিলক্ষণ দেখেছি৷ বিশ্রী দেখতে৷

'সেজোমামা বললেন, আহা, বড়ো কথা বলিস৷ ওই তোর দোষ৷ কিছু মনে কোরো না, মনোহর-উনি কুণাল মিত্তির হতে যাবেন কেন, কুণাল মিত্তির ওঁর বাবা, ওঁর নাম মনোহর মিত্তির, আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়েছি৷ একদিন উনি ওঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হবেন৷ জানিস তো, মিত্তিররা কীরকম চালাক হয়৷

'মনোহরবাবু তাই শুনে ছোটো গোঁফটাকে একটু নেড়ে বললেন, আর তুমিও তার চেয়ে খুব বেশি কম বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হবে না৷-কী যেন নাম তোমার বললে?

'বললাম, আগে বলিনি, এখন বলছি-ইন্দ্র৷

'খুশি হয়ে বললেন, ইন্দ্র? তা ইন্দ্রই বটে, চাঁদের মাটিতে প্রথম পা দেবার গৌরব হবে যার, সে ইন্দ্রের চেয়ে কোন দিক দিয়ে কম বল দিকিনি৷

'চারপাশের লোকজনেরা বলতে লাগল, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই৷

'আমার তো চক্ষু ছানাবড়া৷ চাঁদে যাব নাকি আমি?

'বললাম, সে আমার যেতে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু একা যাব না৷ তা ছাড়া, আবার ফিরে আসব তো? ডিসেম্বরে আমার ক্রিকেট ম্যাচের সিট বলা আছে কিন্তু৷

'সেজোমামা আর মনোহরবাবু মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন৷ শেষটা মনোহরবাবু বললেন, তা হ্যাঁ-তা ফিরে আসবে বই কী, যাবে আর আসবে না, সে কি একটা কথা হল নাকি! কিন্তু আর দেরি কীসের জন্য? চলো তো দেখি ইন্দ্র, আমার সঙ্গে৷

'গেলাম বাগান পেরিয়ে একটা ঘেরা জায়গায়৷ তার মাথার ওপর দিয়ে লম্বা একটা কী বেরিয়ে রয়েছে, বিকেলের পড়ন্ত রোদে চিকচিক করছে, আগাটা ক্রমশ ছুঁচলো হয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে৷

'বেড়ার দরজা চাবি দিয়ে খুলে মনোহরবাবু সরে দাঁড়ালেন, আমিই আগে ঢুকলাম৷

'গিয়ে যা দেখলাম সে আর কী বলব৷ আগাগোড়া অ্যালুমিনিয়ামের মতো কী ধাতু দিয়ে তৈরি কী একটা বিশাল যন্ত্র, অবিকল উড়ুক্কু মাছের মতো দেখতে, তবে ডানাগুলো অনেক ছোটো আর পিছন দিকে বেঁকিয়ে বসানো৷ দেখলেই বোঝা যায় যে একবার ছেড়ে দিলেই অমনি সুড়ুত করে তিরের মতো ওপরে উঠে, নীল আকাশের মধ্যে সেঁধিয়ে যাবে৷ চাঁদে যাওয়া এর পক্ষে সেরকম কিছুই শক্ত হবে না৷

'নীচে একটা গোল প্ল্যাটফর্ম ওটাকে চারদিকে ঘিরে আছে, সেটাই প্রায় একতলার সমান উঁচু হবে, তারও নীচে যন্ত্রটার আরও অনেকখানি রয়েছে৷ রুপোলি গায়ে কালো দিয়ে লেখা 'ধূমকেতু'৷ আর একজোড়া এই বড়ো বড়ো চোখ আঁকা৷ আশেপাশে কতরকম যন্ত্র দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, বোঝা গেল-একবার সেইগুলো খুলে দিলেই আর দেখতে হবে না৷

মনোহরবাবু চোখ ছোটো করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, পকেটে কী? ওরকম ঝুলে আছে যে? ও হবে না, যতটা সম্ভব হালকা হওয়া চাই৷ এই বেদে, দেখ তো ওর পকেটে কী৷

বেদে বলে লোকটা এগিয়ে আসতেই বললাম, এই খবরদার, তাহলে কিন্তু চাঁদে যাব না বলে রাখলাম৷ মনোহরবাবু মহা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ওরকম করিসনে বাপ, চাঁদে যাবি না কী রে? তুই না গেলে কে যাবে বল দিকিনি? কেউ রাজিও হবে না, তা ছাড়া তোর প্যান্টের মাপে সব তৈরি৷ এখন না গেলে যে আমার জীবনের সব কাজ ব্যর্থ হয়ে যাবে! বলছি আমার শালাকে বলে তোকে মোহনবাগান ক্লাবের লাইফ-মেম্বর করে দেব৷

'ওঁর হাত ধরে বললাম, দেবে তো ঠিক? বাবা! সেজোমামা কত চেষ্টা করেও হতে পারেনি৷ শেষটা কিন্তু অন্যরকম বললে-

'মনোহরবাবু রেগে উঠলেন, বলছি করে দেব, আবার অত কথা কীসের? ফিরে তো এসো আগে৷

'বেদে বললে, যদি আসো!

'মনোহরবাবু তাকে এক ধমক দিলেন, তোমাকে অত কথা বলতে কে বলেছে বাছা? যাও, নীচে গিয়ে পাওয়ার লাগাও দিকিনি, নইলে-

'বেদে অমনি একটা ছোটো সিঁড়ি দিয়ে যন্ত্রের তলায় চলে গেল৷

'সেজোমামা মনোহরবাবুকে বললেন, ফিরে আসার কলকবজাগুলো ওকে বুঝিয়ে দিয়ো, মনোহর৷

'মনোহরবাবু বললেন, ও কি ওর বাবা-মার একমাত্র সন্তান?

'আমি বললাম, আরে না না, আমার দুটো ভাই, দুটো বোন৷-আচ্ছা, লাইফ-মেম্বর করে দেবেন তো? কারণ বাবা হয়তো চাঁদা দেবেন না৷

'মনোহরবাবু বললেন, তাই দেব৷ পকেটে কী আছে বের করে এইখানে রাখো তো দেখি৷

'মেশিনের তলা থেকে একটা ঘড়ঘড় শব্দ শুরু হল, তারপর কেমন শোঁ শোঁ করতে লাগল৷ মনোহরবাবু একবার নিজের হাতঘড়িটা দেখে নিলেন৷ আমি পকেট থেকে লাট্টু লেত্তি ইয়ো-ইয়ো রুমাল নীল গুলি রুমেনিয়ার দুটো ডাকটিকিট-মনাদা দিয়েছিল-আধঠোঙা নরম ঝাল ছোলা ভাজা টর্চ আমার বড়ো গুলতিটা আর এক কৌটো শট, বের করে রাখলাম৷ মনোহরবাবু তো অবাক!

'এসব কিচ্ছু নেবার দরকার নেই, শুধু ওজন বাড়ানো৷ খালি এই নোট বই আর পেনসিলটা নেবে৷ কী দেখবে না দেখবে, শরীরে কেমন বোধ করবে, সব টুকে রাখবে৷ আর এই হাতঘড়িটা নেবে, এতে সেকেন্ডের কাঁটা, তারিখের কাঁটা সব দেওয়া আছে৷ সব লিখবে, কখন পৌঁছোলে ইত্যাদি-ও কী হল, চলে যাচ্ছ যে?

'আমি বললাম, গুলতি শট না দিলে আমি যাব না৷ ওদের নিয়ে আমি রাত্রে শুই পর্যন্ত৷

'সেজোমামা বললেন, থাকগে মনোহর, এখন মনে হচ্ছে তুমি বরং আর কাউকে দেখো৷

Cov112

'মনোহরবাবু বললেন, বেশ, তাহলে আমার হাজার টাকা ফিরিয়ে দাও, আমি এক্ষুনি অন্য লোক দেখছি৷

'সেজোমামা চুপ৷ আমি বললাম, তাতে কী হয়েছে, সেজোমামা? আমার গুলতি দিলেই আমি যাব৷ অবিশ্যি বড্ড খিদে পেয়েছে, তাই আগে খানিকটা খেয়েও নেব৷ আর বলেছি তো-একা যাব না৷

'মনোহরবাবু চটে গেলেন, একা যাব না আবার কী? জানিস, ওই কাকাতুয়াটা আর বেড়ালটা দু-তিনবার একা গেছে, কিচ্ছু বলেনি৷

'বললাম, চাঁদ অবধি গেছে?

'মনোহরবাবু বললেন, চাঁদ অবধি গেছে কি না বুঝতে পারা যাচ্ছে না বলেই তো তোমাকে পাঠানো হচ্ছে৷ নিদেন তোমার খাতা-পেনসিলটা ওই যে ছোটো হাউই মতন দেখছ, ওটাতে পুরে ফেলে দিতে পারবে তো, নিজে যদি নেহাতই-আচ্ছা সে যাকগে, এখন এই বড়িটা খাও দিকিনি, কেমন পেট ভরে যায় দেখো৷

'বলে আমার মুখে একটা হলদে বড়ি কী পুরে দিলেন, সে যে কী আশ্চর্য বড়ি আর কী বলব৷ খেতেই মনে হল আমি লুচি মাংস চপ কাটলেট ভেটকি-ফ্রাই চিংড়িমাছের মালাইকারি রাবড়ি কেক চকলেট ছাঁচিপান সব খাচ্ছি৷ একেবারে পেট ভরে গেল৷ সেই বড়ির শিশিটা আমার হাতে দিয়ে মনোহরবাবু বললেন, এই নাও একমাসের খোরাক৷ একটার বেশি দুটো বড়ি, কোনোদিন খেয়ো না, খেলেই পেটের অসুখ করবে, মোটা হয়ে যাবে, যন্ত্রের ভেতর আঁটবে না৷ এসো, এই আরাম কেদারাটাতে এবার বসে পড়ো দিকিনি৷ হাওয়ার কোনো অভাব হবে না, এমন কল করেছি ভেতরে তোমার নিশ্বাসই আবার অক্সিজেন হয়ে যাবে৷

'বলে সেই লম্বা চোঙার মতন যন্ত্রটার গায়ে একটা দরজা খুলে, আমাকে একটা চমৎকার হাওয়ার গদি-আঁটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন আর মাথার ওপর দিয়ে একটা অদ্ভুত পোশাক গলিয়ে পরিয়ে দিয়ে কোমরে চেয়ারের সঙ্গে বগলেস এঁটে দিলেন৷ মুখের জায়গাটা বোধ হয় অভ্র দিয়ে তৈরি, সব দেখতে পাচ্ছিলাম৷ নাকের কাছে ছ্যাঁদা, নিশ্বাস নিতে পারছিলাম৷ তারপর দেখি সেজোমামা তাড়াতাড়ি আমার জিনিসপত্র নিজের পকেটে ভরছেন৷ চেঁচিয়ে বললাম, গুলতি দিলে না? গুলতি না দিলে যাব না বলেছি না!

'অভ্রের মুখোশের ভেতর থেকে কথা শোনা গেল কি না জানি না৷ কিন্তু সেজোমামার বোধ হয় একটু মন কেমন করছিল, কাছে এসে কী যেন বলতে লাগলেন, একবর্ণ শুনতে পেলাম না, যন্ত্রের শোঁ শোঁ গোঁ গোঁতে কান ঝালাপালা! দারুণ রেগে গিয়ে সেজোমামার কাছা আঁকড়ে ধরে চেঁচাতে লাগলাম, দাও বলছি, গুলতি না নিয়ে আমি কোত্থাও যাই না৷

'এদিকে মনোহরবাবু বার বার ঘড়ি দেখছেন, যন্ত্রটা কেঁপে কেঁপে দুলে দুলে উঠছে, অথচ আমি এমন করে সেজোমামার কাছা আঁকড়েছি যে দরজাটা এঁটে দেওয়া যাচ্ছে না৷ শেষটা হঠাৎ রেগেমেগে ঠেলে সেজোমামাকেসুদ্ধু ভেতরে পুরে দিয়ে মনোহরবাবু দরজা এঁটে দিলেন৷

'বাবা! দিব্যি ফাঁকা ছিল ভেতরটা, সেজোমামা ঢোকাতে একেবারে ঠেসাঠেসি হয়ে গেল, নড়বার-চড়বার জো রইল না৷ দরজা বন্ধ করাতে বাইরের শব্দ আর কানে আসছিল না, সেজোমামা চিৎকার করতে লাগলেন, ও মনোহর, ফেরবার কল শিখিয়ে দিলে না যে, ফিরব কী করে?

'তা কে কার কথা শোনে৷ ভীষণ জোরে ফুলে উঠে বোঁ করে যন্ত্রটা আকাশে উড়ে গেল৷ একবার মনে হল চারদিকে চোখ-ঝলসানো আলো, তারপরেই মনে হল ঘোর অন্ধকার৷

'যখন জ্ঞান ফিরে এল বুঝলাম চাঁদে পৌঁছে গেছি৷ যন্ত্রটা আর নড়ছে না চড়ছে না, কাত হয়ে পড়ে আছে, আমি বসে বসেই শুয়ে আছি, সেজোমামা আমার তলায় একটু একটু নড়ছেন-চড়ছেন৷ মুখ তুলে কানের কাছে বললেন, আমার ডান পকেটে তোর টর্চটা আছে, দেখ তো নাগাল পাস কি না৷

'বুঝলাম ওঁর নিজের হাত নাড়বার জায়গা নেই৷ হাতড়ে হাতড়ে ঠিক পেলাম৷ ভয়ে ভয়ে জ্বালালাম, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যন্ত্রের ভেতরটা ভালো করে দেখলাম, ভেতরকার কলকবজা সব ঠিক আছে, যে যার জায়গায় আটকানো৷ হাত দিয়ে আমার বাঁ-পাশের জিপ ফাসনার খুলে মুখোশ নামিয়ে ফেললাম৷

'অমনি এক ঝলকা ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগল৷ আঃ , চাঁদের বাতাসই আলাদা রে, এ পৃথিবীতে সেরকমটি হয় না৷

'সেজোমামা বললেন, বেড়ে খাসা কল বানিয়েছে তো মনোহর৷ বলেছিল যে নামবার সময় এতটুকু ঝাঁকানি লাগবে না, এতটুকু ভাঙবে না, টসকাবে না৷

'আমি এদিকে টর্চ ঘুরিয়ে দেখি, পড়বার সময় কাত হয়ে যাওয়াতে দরজার বাইরের ছিটকিনি গেছে খুলে, দরজা এখন হাঁ!

'বললাম সে কথা সেজোমামাকে, কিন্তু আমি না সরলে তাঁর তো নড়বার উপায় নেই৷ তখন কোমরের বগলেস খুলে সেজোমামার পেটের ওপরে দুই পা রেখে এক লাফে যন্ত্র থেকে বেরিয়ে পড়া আমার কাছে কিছুই নয়৷ পৃথিবীতে যখন থাকতাম এর চেয়ে কত উঁচু উঁচু জায়গা থেকে লাফাতে হয়েছে৷ সেজোমামা শুধু একটু কোঁত করে উঠলেন৷

'বেরিয়ে বুঝলাম বোধ হয় চাঁদের কোনো একটা নিভে-যাওয়া আগ্নেয়গিরির মুখের মধ্যে পড়ে গেছি৷ চারদিকে মনে হল নরম ঘাস, মাথার ওপর তারাও দেখতে পেলাম, আবার এক কোনা দিয়ে বোধ হয় আমাদের এই পৃথিবীটাকেই একবার একটু দেখতে পেলাম৷ ঠিক যেন আরেকটা চাঁদ৷ মনে হল আফ্রিকাটাকে যেন একটু একটু দেখতে পেলাম৷ তারপরেই আবার সেটা টুক করে ডুবে গেল৷

'তখন কানে এল যন্ত্রের ভেতর থেকে সেজোমামা মহা চেঁচামেচি লাগিয়েছেন, টর্চের আলো দেখা, আমিও নামব৷

'অনেক কষ্টে নামলেন, নেমে আমার পাশে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসেই বললেন, খিদেয় পেট জ্বলে গেল, সেই বড়ি একটা দে না৷

'টের পেলাম আমারও বেজায় খিদে পেয়েছে, দু-জনে দুটো বড়ি খেলাম, তারপর ঘাসের ওপর শুয়ে থেকে থেকে অন্ধকারটা একটু চোখ-সওয়া হয়ে এল৷ আমরা যে একটা বেশ বড়ো গর্তের মতো জায়গাতে শুয়ে আছি সে বিষয় কোনো সন্দেহ নেই, ঠিক যেন একটা বিরাট পেয়ালার মধ্যে রয়েছি৷ একটু একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছিল৷

'সেজোমামা বললেন, কী রে, উঠে একটু দেখবি না?

'বললাম, ভোর হোক আগে৷

'সেজোমামা বললেন, আবার ভোর কী রে? এটা যদি চাঁদের উলটো পিঠ হয়ে থাকে তা হলে তো ভোরই হবে না৷

'একেবারে উঠে বসলাম৷-তাই-ই নিশ্চয় সেজোমামা৷ এ পিঠটাতে তো সর্বদা আলো থাকে৷ দিনের বেলাও তাই দেখেছি, রাতেও দেখেছি৷

'ফোঁস৷

'তিন হাত লাফিয়ে উঠলাম৷ ফোঁস করল কী? তবে কি চাঁদে হিংস্র জন্তুও আছে? বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল৷ কিন্তু স্পষ্ট শুনলাম জন্তুটা কচর-পচর করে নরম ঘাসগুলোকে ছিঁড়ে খাচ্ছে৷

'সেজোমামা বললেন, তবে কোনো ভয় নেই৷ ওরা নিরামিষ খায়৷

'আবার শুনলাম জোরে একটা ফোঁস, তারপর আরও ফোঁস ফোঁস৷ আমার মোটেই ভালো লাগল না৷ সেজোমামা কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, কী হবে রে?

'কী আবার হবে? এক নিমেষে গুলতিতে শট লাগিয়ে শব্দ লক্ষ করে দিলাম ছেড়ে৷ অমনি সে যে কী বিকট চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল সে আর কী বলব৷ একটা কেন, মনে হল এক লাখ জানোয়ার একসঙ্গে চেঁচাচ্ছে! সেই চেঁচানি শুনে চাঁদের মানুষেরা জেগে উঠে সব বড়ো বড়ো মশাল নিয়ে দেখি পেয়ালার একদিকের কানা বেয়ে নামছে৷ কী হিংস্র সব চেহারা! কী ষণ্ডা, পৃথিবীর মানুষদের চেয়ে তিনগুণ জোরালো৷ আর সে কী গর্জন, কান ফেটে যায়৷

আর এক মিনিটও অপেক্ষা করলাম না৷ তারা হয়তো ওই অন্ধকারে আমাদের দেখতে পেল না৷ পড়ি-মরি প্রাণপণ ছুটে অন্য ধারের ঘাসে ঢাকা ঢালু দেয়াল বেয়ে পিঁপড়ের মতো আমরা উঠে গেলাম৷ শরীরে আর এতটুকু ক্লান্তি বোধ করলাম না৷

'ওপরে উঠেই ছুট লাগালাম৷ আন্দাজে অন্ধকারের মধ্যে দু-পা না যেতেই চাঁদের পাহাড়ের গা বেয়ে ঝুপ করে খানিকটা পড়েই গড়াতে লাগলাম৷

'সব সইতে পারি বুঝলি, শুধু ওই গড়ানিটা আমার সহ্য হয় না৷ তখুনি মুচ্ছো গেলাম৷

'আবার যখন জ্ঞান ফিরে এল, দেখি সেজোমামা আমার মুখে-চোখে ঠান্ডা জল ছিটোচ্ছেন৷ আমি নড়ে উঠতেই বললেন, বাপ, বেঁচে আছিস তাহলে? দাঁড়া, গাড়িটা আনি, আর এখানে নয়, চল একেবারে ভোরের গাড়িটা ধরা যাক৷

'সেজোমামা গাড়ি আনতে গেলেন, আমি একটা পাথরে ঠেসান দিয়ে বসে ভাবতে লাগলাম৷ আস্তে আস্তে মাথাটা খানিকটা পরিষ্কার হয়ে এলে বুঝলাম, কুণাল মিত্তিরদের টিলার নীচেই এসে পড়েছি৷ সেজোমামা গাড়ি আনলে বললাম, কী আশ্চর্য, না সেজোমামা? যেখান থেকে চাঁদে গেলাম আবার ঠিক সেই একই জায়গায় এসে নামলাম৷

'সেজোমামা বললেন, আশ্চর্য বই কী৷ আমরা যে বেঁচে আছি সেটা আরও আশ্চর্য!

'তাই তো, যন্ত্রটা তো চাঁদেই পড়ে আছে৷ পকেট হাতড়াতে লাগলাম৷ সেজোমামা বললেন, আবার কী?

'কেন, সব লিখে রাখতে হবে না? ওখানে ঠান্ডা বাতাস আছে, জন্তু মানুষ সব আছে-

'সেজোমামা বললেন, সে আমি মনোহরকে বলে দেবখন৷ আর দেখ, এসব কথা খবরদার বাড়িতে বলবি নে৷

'বাবা-মারা আমাদের দেখে অবাক৷-একী, কাল গেলে, আজই ফিরে এলে?

'সেজোমামা বললেন, সেখানে মহামারী লেগেছে৷ আমাকে আজই ফিরে ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে৷ এদিকে আমি কাউকে কিছু বলতে পারছি না, পেট ফেঁপে মরি আর কি!'

ছোটোকাকা থামলে আমরা বললাম, 'তবে কেন বললে একরকম বলতে গেলে চাঁদে গেছিলে?'

ছোটোকাকা বললেন, 'তার কারণ এই ঘটনার মাস চারেক বাদে মা হাতে করে সেজোমামার একটা চিঠি নিয়ে বাবাকে বললেন, শোনো একবার কাণ্ড৷ ওই যে আমাদের কুণাল মিত্তিরের ছেলে মনোহর না, সে নাকি এক উড়োজাহাজ বানিয়ে, যেখানে কুণাল মিত্তিরের গবেষণা-গোরুরা চরছিল সেখানে নামিয়ে একাকার কাণ্ড করেছে৷ কুণাল মিত্তির দারুণ রেগে ওকে চাকরি দিয়ে বোম্বাই পাঠিয়েছেন৷

'বাবা বললেন, গবেষণা-গোরু আবার কী জিনিস?

'মা বললেন, ওমা, তাও জান না? কুণাল মিত্তির একরকম বড়ি বানিয়েছেন, তাতে সব রকম পুষ্টিকর জিনিস আছে, সে খেলেই পেট ভরে যায়৷ ওই টিলার মাথায় খানিকটা জায়গাকে পুকুরের মতো করে কেটে, অবিশ্যি তাতে জল নেই, সেখানে গোরুগুলো ছাড়া থাকত, ওই বড়ি খেত আর মন ভালো করবার জন্য একটু একটু ঘাসও চিবুত৷ বাইশ সের দুধ দিত এক-একটা৷ ব্যাটা লক্ষ্মীছাড়া মনোহর সেইখানে উড়োজাহাজ নামিয়েছে৷ ব্যস, আর যাবে কোথা, গোরুরা সব দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে৷ কুণাল মিত্তির রেগে টং! ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে, এখন বলে নাকি ছেলের কোনো দোষ নেই, চমৎকার উড়োজাহাজ করেছে, কিন্তু পাড়ার কয়েকটা দুষ্টু লোক মিলেই নাকি ওর মাথাটা খেল৷ শুনলে একবার কথা!'

'আমি আস্তে আস্তে সেখান থেকে উঠে গিয়ে গুলতিটা বের করে কাকদের মারতে লাগলাম৷

'হ্যাঁ রে, তোরা এখনও বসে রয়েছিস যে, আমাকে কি বইটা শেষ করতে দিবি না?'

এই বলে ছোটোকাকা আবার পা মেলে দিয়ে বই পড়তে লাগলেন৷

আশ্বিন ১৩৬৮

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%