অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
বড়োমামা প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে নীচে থেকে ওপরে উঠে এলেন৷ এমন চেহারা এর আগে আর কখনো দেখিনি৷ কপালের ডান পাশটা ফুলে টাঁপা লাল৷ দু-হাতের কনুইয়ের কাছ পর্যন্ত কুঁচোকুঁচো খড় বড়ো বড়ো লোমের সঙ্গে আটকে আছে৷ চোখ দুটো লাল টকটকে৷ গাঢ় নীল রঙের সিল্কের লুঙ্গি একটু উঁচু করে পরা৷ পায়ে কালো ওয়াটার-প্রুফ জুতো৷
ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে বড়োমামা দোতলার ঢাকা বারান্দায় উঠে এলেন৷ ঝলমলে রোদ জাফরির নকশা পেতে রেখেছে ঝকঝকে লাল মেঝের ওপর৷ দূর কোণে মেজোমামা বসে বসে ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করছিলেন৷ আমি তাঁর ফাইফরমাস খাটছিলুম৷ 'এটা দে, ওটা দে৷'
মেজোমামার কোলের ওপর ক্যামেরা৷ হাতে হলদে রঙের ফ্ল্যানেলের টুকরো৷ চোখ আর ক্যামেরার দিকে নেই, বড়োমামার দিকে৷ মেজোমামা হঠাৎ বললেন, 'স্টপ৷ ঠিক ওই জায়গাতেই এক সেকেন্ড৷ আমি চট করে তোমার একটা স্ন্যাপ নিয়ে নি৷ তোমাকে ঠিক দিশি কাউবয়ের মতো দেখাচ্ছে৷ বেড়ে দেখতে হয়েছ তো! কী করে হল?'
বড়োমামা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, 'শাট আপ৷ শা-আট আ-আপ!'
মেজোমামা ফিসফিস করে আমাকে বললেন, 'সাবজেক্টটা ভালো ছিল তবে একটু খেপে আছে৷'
বড়োমামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে বললেন, 'কাম হিয়ার৷ কুইক৷'
'শুনে আসি মেজোমামা৷'
'হ্যাঁ, শুনে আয়৷ কেসটা কী আমাকে জানিয়ে যাবি৷'
'আচ্ছা৷'
ঘরে ঢুকতেই বড়োমামা বললেন, 'কী হবে?'
'কীসের কী হবে?'
'জুতো পরে ঢুকে পড়েছি যে!'
'ও কিছু হবে না৷'
'এটা যে রাস্তার জুতো৷ কুশি দেখলে খ্যাঁক খ্যাঁক করবে৷'
'মাসিমা তো এখন ধারে-কাছে নেই৷'
'মেজেতে যে দাগ পড়ে গেল৷'
'আমি পা দিয়ে পালিশ করে দিচ্ছি৷'
'আমি যে দাঁড়িয়ে পড়েছি!'
'চলতে চান তো চলেফিরে বেড়ান না৷ অসুবিধে কীসের!'
'যেদিকে যাব সেই দিকেই তো দাগ পড়ে যাবে!'
'জুতো খুলে ফেলুন৷'
'ইয়েস, দ্যাটস রাইট৷'
বড়োমামা জুতো খোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বারকতক নেচে নিলেন৷ লাল চকচকে মেঝেতে নাচে জুতোর নকশা তৈরি হল৷
'দেখলি, দেখলি! সাধে কুশি আমার ওপর রেগে যায়! রেগে যাবার অনেক কারণ আছে! পৃথিবীতে কোনো কিছুই কি সহজ নয় রে!'
'জুতোটা না খুলে অমন করে নাচছেন কেন?'
বড়োমামা রেগে উঠলেন, 'আমি কি ইচ্ছে করে নাচছি৷ আমাকে নাচাচ্ছে যে! রবারের জুতো পরে একবার দেখ না৷ পরা সহজ, তারপর পা থেকে আর খুলতে চায় না৷ ক্রীতদাসের জাত৷ পায়ে ধরে বসে থাকতে চায়৷'
'এখন তাহলে কী হবে! সারাদিন এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?'
'আমি বরং দাগে দাগ মিলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই৷ তুই ওই মারকিউরোক্রোমের শিশি আর খানিকটা তুলো নিয়ে আয়৷ ও, না৷'
'কী হল আবার?'
'বাইরে তো উনি ক্যামেরা তাক করে বসে আছেন৷ এখুনি ফট করে একটা ছবি তুলে এত বড়ো করে বাঁধিয়ে রাখবেন৷'
'তাহলে আপনি ওই চেয়ারটায় বসুন, আমি পা থেকে জুতো দু-পাটি খুলে দি৷'
'না, দেখে ফেলবে৷'
'দেখলে কী হয়েছে? আর কেই-বা দেখবে?'
'ও বাবা, দেখলে কী হয়েছে! হোল বাড়িতে হইচই পড়ে যাবে৷ নবাব সিরাজউদ্দৌলা ভাগনেকে দিয়ে জুতো খোলাচ্ছে! মনে নেই সেদিনের কথা৷ তোকে বলেছিলুম পিঠে একটু তেল ঘষে দিবি, সেই নিয়ে কত রকমের কথা!'
'তাহলে আমি চেয়ারটাকে টেনে আনি, আপনি বসে বসে খুলে ফেলুন৷'
'অগত্যা তাই করতে হবে৷ আমার আবার জুতোয় হাত দিতে কীরকম গা ঘিনঘিন করে৷ পায়ের জিনিস পায়ে পায়েই খোলা উচিত৷ আমারই সাবধান হওয়া উচিত ছিল, এটা হল সন্ধ্যের জুতো, সকালের নয়৷'
'সে আবার কী, জুতোর আবার সকাল-সন্ধ্যে আছে নাকি?'
'জুতোর নেই৷ শরীরের আছে৷ সারারাত ঘুমের পর সকালের শরীর হল ফুলো ফুলো, তাজা! মুখ ফুলো, চোখ ফুলো, হাত ফুলো, পা ফুলো৷ শরীর যত সন্ধ্যের দিকে এগোচ্ছে তত শুকোচ্ছে, চুপসে যাচ্ছে৷ এসব হল অ্যানাটমি ফিজিওলজির ব্যাপার৷ ডাক্তার হলে বুঝতে পারতিস৷'
বড়োমামা ডাক্তার৷ চেয়ারটাকে প্রথমে দু-হাতে তুলে আনার চেষ্টা করলুম৷ বেজায় ভারী৷ এখন টেনে আনার চেষ্টা করলুম৷ ঘষটাতে ঘষটাতে আসছি তেলা মেঝের ওপর দিয়ে৷ চেয়ার ঠেলতে বেশ মজা লাগে৷ ইচ্ছে করেই বেশ একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনছি৷ সোজা রাস্তায় আনছি না৷ পথ ফুরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি!
'একী, একী, অ্যাঁ ঘরের এ কী অবস্থা, তুই সারা ঘরে চেয়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন! বসার জায়গা পাচ্ছিস না! ও মাগো, মেজেটার কী অবস্থা!'
দরজার সামনে মাসিমা৷ আমি যেখানে যেভাবে ছিলুম সেইভাবে, বড়োমামাও সেই একইভাবে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে৷
বড়োমামা চোখ দুটো কেবল বুজিয়ে ফেলেছেন৷ এটা বড়োমামার নিজস্ব টেকনিক৷ ভয় পেলেই তো চোখ বুজিয়ে ফেলা৷
সেই চোখ বোজানো অবস্থাতেই বড়োমামা বললেন, 'কুশি, আমি আহত৷'
'তোমাকে কিছু বললেই তো তুমি আহত!'
'আমি সেভাবে আহত নই, এই দেখো আমার কপাল৷'
বড়োমামা মাসিমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ কপালটা এর মধ্যে আরও ফুলেছে৷ থেঁতো হয়ে গেছে৷
'তোমার কপালে এই সবই লেখা আছে আমরা জানতুম!'
'হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস৷' মাসিমার পাশে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছেন৷ হাতে ক্যামেরা৷
মেজোমামাকে দেখেই বড়োমামা লাফিয়ে উঠলেন, 'ও, নো নো-নো ফটোগ্রাফ৷'
'ছোট্ট করে একটা৷ ফ্যামিলি অ্যালবামে মানাবে ভালো৷
মাসিমা মেজোমামাকে থামিয়ে দিলেন, 'রাখো তো তোমার ক্যামেরা৷ আগে ছবি তোলা শেখো৷ ঠ্যার ঠ্যার করে হাত কাঁপে, ফোকাস করতে পার না! কেবল পয়সা নষ্ট!'
'হাত কাঁপে! আমার হাত কাঁপে?'
'হ্যাঁ, কাঁপে৷ ছবি না তুলে তোমার কম্পাউন্ডার হওয়া উচিত ছিল৷ জল দিয়ে পেনিসিলিন গোলাবার জন্য কসরত করার দরকার হত না, তোমার কাঁপা হাতে শিশিটা ধরিয়ে দিলেই আপনি গুলে যেত!'
মেজোমামা একটু মুষড়ে গেলেও হেরে যেতে প্রস্তুত নন৷ আমার মামারা সহজে হারতে চান না৷ মেজোমামা বললেন, 'আমি যখন রেগে যাই তখনই আমার হাত কাঁপে, তা না হলে আমার হাত ল্যাম্পপোস্টের মতোই স্টেডি৷'
'তোমার সবসময়েই হাত কাঁপে, তাহলে বুঝতে হবে সবসময়েই রেগে আছ৷ কথা বাড়িয়ো না, যা করছিলে তাই করোগে যাও৷'
মাসিমাকে সুবিধে করতে না পেরে মেজোমামা বড়োমামার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলেন৷
'আহা, তোমার কপালটা বেশ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে বড়দা৷ কীসে ঠুকলে অমন করে!'
বড়োমামা যেন হালে পানি পেলেন৷ মাসিমা যেভাবে তাকিয়ে আছেন, একমাত্র কপালের জোরেই বড়োমামা বাঁচতে পারেন৷
'ঠোকা? ঠোকাঠুকির মধ্যে আমি নেই৷ ওই লক্ষ্মীছাড়া! যার নাম রাখা হয়েছিল লক্ষ্মী, সেই লক্ষ্মী পেছনের পায়ে ঝেড়েছে এক লাথি৷'
আমি চেয়ারটা যেখানে ছিল সেইখানেই চতুষ্পদ করে রেখে, ওষুধ আর তুলো নিয়ে মাসিমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ আমাকেও তো একটা বাঁচার রাস্তা বের করতে হবে৷ সারা মেঝেতে চেয়ার টানার লম্বা লম্বা দাগ৷
'এই নিন মাসিমা, ওষুধ৷'
মাসিমা ওষুধ আর তুলোটা হাতে নিয়ে বড়োমামাকে ধমকের সুরে বললেন, 'তুমি সাতসকালে গোরুর কাছে কী করতে গিয়েছিলে? তোমার অন্য কোনো কাজ ছিল না!'
মেজোমামা বললেন, 'হ্যাঁ, ঠিকই তো, তোমার অন্য কোনো কাজ ছিল না! তুমি কি পশু-চিকিৎসক? তুমি তো মনুষ্য-চিকিৎসক!'
বড়োমামা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'নাও, কথা শোনো দু-জনের৷ যা হয় একটা কিছু বলে দিলেই হল! তোরা জানিস না...'
'কী জানতে হবে?' মাসিমা তুলোয় লাল ওষুধ লাগালেন৷
'তোরা জানিস না, আমার সব ক-টা কাজের লোক পালিয়ে গেছে৷ মালী গন, কুকুরগুলোকে যে দেখত সেই বিশে ব্যাটা হাওয়া৷ গোরুটাকে যে দেখত সেই রামখেলোয়ান সরে পড়েছে৷ দেন হু উইল বেল দ্যা ক্যাট? তোমরাই বলো?'
'ইংরেজিটা ঠিক হল না বড়দা৷' অধ্যাপক মেজোমামা আবার বানান ভুল, ভাষার ব্যবহারের ভুল একেবারেই সহ্য করতে পারেন না৷
'তোমার অবশ্য দোষ নেই৷ তুমি তো লিটারেচারের লোক নও৷ সারা জীবন প্রেসক্রিপসানই লিখে গেলে, টিডি, বিডি৷ তোমার বলা উচিত ছিল...৷'
মাসিমা কটমট করে মেজোমামার দিকে তাকাতেই মেজোমামা আমতা-আমতা করে চুপ হয়ে গেলেন, যেন গান শেষ হল, 'না, মানে ভুল, মানে বেল মানে, ক্যাট দি বেল মানে, না না বেল দি ক্যাট মানে...'
মাসিমা আবার তাকাতেই মেজোমামার রেকর্ড একেবারেই থেমে গেল৷
'দেখি কপালটা নীচু কর৷ ওঃ লম্বা বটে! তাল গাছ৷'
বড়োমামা অভ্যর্থনা সভার সভাপতির মতো কপালে যেন তিলক নিচ্ছেন৷:
মাসিমা একহাতে বড়োমামার মাথার পেছন দিকটা ধরে সামনে ঝুঁকিয়ে আর এক হাতে অ্যান্টিসেপটিক ভেজানো তুলো থ্যাঁতলানো কপালে চেপে ধরেছেন৷ বড়োমামার যেন চুল কাটা হচ্ছে সেলুনে৷ তুলোটা কপালে চেপে ধরতেই বড়োমামা বিশাল একটা চিৎকার ছাড়লেন৷ মানুষ উঁচু ছাদ থেকে পড়ে :যাবার সময়েই অমন চিৎকার করে৷ চিৎকার শুনেই কোথা থেকে ছুটে এল:বড়োমামার কুকুরদের অন্যতম, সবচেয়ে দুর্দান্ত স্প্যানিয়েল, 'ঝড়ু'৷ সবকটা কুকুরের বাংলা নাম৷ ঝড়ু, সুকু, ডাকু৷
ঝড়ু বড়োমামাকে বাঁচাতে এসেছে৷ সামনের থাবার ওপর মুখ নামিয়ে, ঝিঁকি মেরে মেরে, বার কতক ঘেউ ঘেউ করে খুব খানিকটা বকাঝকা করল৷ যখন দেখল মাসিমা তবু তার প্রভুকে ছাড়ছে না, তখন শাড়ির আঁচল ধরে হিড়হিড় করে টানতে শুরু করল৷ ফাইন লাগছিল ব্যাপারটা৷ ঝড়ুর মুখটা ভারি সুন্দর৷ সেই মুখে আঁচলের আধখানা, পেছনের দু-পায়ে ভর রেখে, মুখটা সামান্য ওপরে তুলে, টান টান, টানাটানি, টাগ অফ ওয়ার৷
বড়োমামার কপাল ততক্ষণে মেরামত হয়ে গেছে৷ মাসিমার দু-হাত এখন মুক্ত৷ দু-হাতে আঁচল ধরে টানছেন৷ নতুন শাড়ি৷ সহজে ছিঁড়ছে না, কুকুরেও ছাড়ছে না৷ মেজোমামা তারিফ করে বললেন, 'ডগ ইজ এ ফেথফুল অ্যানিম্যাল৷ প্রভুভক্ত জীব৷'
'প্রভুভক্তি আমি ঘুচিয়ে দিচ্ছি৷ এই, লাঠিটা নিয়ে আয় তো৷'
লাঠির নাম শুনে ঝড়ু একটু থমকে দাঁড়াল, তারপর চোখ দুটো আধবোজা করে যেমন টানছিল তেমনি টানতে লাগল, ঝটকা মারতে লাগল, খোঁটায় বাঁধা প্রাণীর মতো অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল৷ বড়োমামা একটু সামলেছেন৷ মুখ দেখে মনে হল ঝড়ুর বীরত্ব ও প্রভুভক্তিতে বেশ গর্বিত, তবে লাঠি থেকে বাঁচাতে হবে৷ ভক্তেরই তো ভগবান! বড়োমামা শাসনের সুরে বললেন, 'ঝড়ু, ঝড়ু, ছেড়ে দাও, নো অসভ্যতা৷'
উত্তরে ঝড়ু আরও মরিয়া হয়ে মাসিমার আঁচলে হ্যাঁচকা টান মারতে লাগল৷ মেজোমামা বললেন, 'ঝাড়ু ছাড়া ঝড়ুর কিছু করতে পারবে না৷ কুকুরের সঙ্গে কুকুরের ল্যাঙ্গোয়েজেই কথা বলতে হবে৷' বড়োমামা কুকুরের পক্ষেই গেলেন, 'আসলে কী হয়েছে জানিস, কুকুরের তো বাঁকা বাঁকা দাঁত, কুশির শাড়িটা তাঁতের জ্যালজেলে, দাঁতে আটকে গেছে৷ ও টানছে না, ও দাঁত থেকে খুলে ফেলার জন্য ছটফট করছে৷ দেখি, কাঁচিটা দেখি, এ কেসটা হল সার্জারির কেস৷'
মাসিমা বললেন, 'শাড়িটার দাম জান? সেভেনটি-সিক্স৷ সার্জারি নয় লাথি৷'
মাসিমা সত্যি সত্যি একটা লাথি চালালেন৷ ঝড়ুর গায়ে লাগল না, কিন্তু ভয়ে ছেড়ে দিল৷ শাড়ির আঁচলটা ফুটো ফুটো, চিবানো চিবানো৷ মাসিমার চোখে জল এসে গেছে৷
'আজই নতুন শাড়িটা সবে ভেঙে পরলুম, হতচ্ছাড়া, জানোয়ার কুকুর৷ শাড়িটার কী সুন্দর রং ছিল!' মাসিমার কাঁদো-কাঁদো গলা শুনে মেজোমামা বললেন, 'ছিল বলছিস কেন, এখনও তো সুন্দর রংই রয়েছে! জলে পড়লে রং ওঠে, কুকুর ধরলে রং উঠবে কেন?'
বড়োমামা বললেন, 'বারো হাত শাড়ির হাতখানেক কেটে ফেলে দিলেও এগারো হাত থাকে৷ যেকোনো মহিলার পক্ষে এগারো হাতই যথেষ্ট৷ কী বল?'
মেজোমামা বললেন, 'ইয়েস ইয়েস৷ ইলেভেন ইয়ার্ডস'-
'তোমার ইংরেজিটা শুদ্ধ করো, ইয়ার্ড মানে গজ, হাত নয়৷' বড়োমামা হঠাৎ সুযোগ পেয়ে গেছেন৷
নীচে 'হাম্বা' করে একটা শব্দ শোনা গেল, 'গোরু খুলে গেছে, ওমা গোরু খুলে গেছে, গোরু যাঃ যাঃ, হায় গো, ডাঁটার ঝাড়টা নিয়ে পালাল গো!'
'কী হল মানুর মা!' মাসিমা শাড়ির শোক ভুলে সিঁড়ির দিকে দৌড়োলেন৷
মেজোমামা বললেন, 'দাদা, তোমার ভিটামিন বি-কমপ্লেকস গবায় নঃম হয়ে গেল৷ আসল কাটোয়ার ডেঙ্গো ছিল৷'
বড়োমামা বললেন, 'নো ক্ষমা, আর ক্ষমা করা চলে না, সেই লাইনটা, অন্যায় যে করে অন্যায় সে সহে-'
আমরা সদলে নীচের উঠোনে নেমে এলাম৷ মাসিমার পেছনে ঝুলছে কুকুরের চিবোনো আঁচল৷ পেছনে আমি৷ আমার পেছনে বড়োমামা৷ বড়োমামার পেছনে মেজোমামা৷
লক্ষ্মীছাড়া লক্ষ্মী উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চোখ বুজিয়ে ডেঙ্গোর ঝাড় চিবোচ্ছে৷ এত চিৎকার, চেঁচামেচি, কোনোদিকে কোনো দৃকপাত নেই৷ নিজের কাজ করে যাচ্ছে আপন মনে৷ ডাঁটাঝাড়ের আধখানা চলে গেছে গলায়, বাকি অংশটা ইঞ্চি ইঞ্চি করে ঢুকছে৷ মাসিমা সেই বাড়তি অংশটা ধরে টানাটানি শুরু করলেন৷ যতটুকু পারা যায় উদ্ধারের চেষ্টা৷
মেজোমামা গম্ভীর গলায় বললেন, 'ছেড়ে দে কুশি৷ পারবি না৷ বোভাইন-টিথের স্ট্রাকচার জানা থাকলে তুই আর চেষ্টা করতিস না৷ গোরুর ওপর আর নীচের পাটিতে ক-টা দাঁত, কী ভাবে সাজানো থাকে জানিস?'
মাসিমা বললেন, 'তোমরা জানো, আমার জেনে দরকার নেই৷' মাসিমা পাতা ধরে টানতে লাগলেন৷ লক্ষ্মী চিবিয়েই চলেছে৷ এক ঝটকায় মাসিমাকে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে টলমল করে দিয়ে লক্ষ্মী পেছন ফিরে দাঁড়াল৷ ন্যাজটা মাঝে মাঝে দুলছে৷ বিরক্তি ভালো লাগছে না তার৷ শান্তিতে কাটোয়ার ডাঁটা চিবোতে চায়৷ গোরুটাকে দেখতে ছবির গোরুর মতো৷ সাদা ধবধবে গায়ের রং৷ ন্যাজের দিকটা চামরের মতো৷ ডগাটা কালো৷ শিং দুটো তেলা৷ চোখ দুটো বড়োবড়ো, ভাসা ভাসা৷
'বড়োমামা, আপনার গোরুটাকে ভারি সুন্দর দেখতে৷'
'অতি অসভ্য গোরু৷ একগুঁয়ে অবুঝ৷ গোরুর সম্পর্কে আমার ধারণা পালটে দিয়েছে৷ মানুষের চেয়েও অসভ্য!' মাসিমা কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়েছেন৷ সামলে নিলেও ভীষণ রেগে গেছেন৷
'অনেকদিন তোমাকে বলেছি দাদা, তোমার এই গোরু কুকুর এসব হাটাও৷ বাড়িতে টেঁকা যায় না৷ এ আমাদের কম সর্বনাশ করেছে! আদরে আদরে বাঁদর তৈরি হয়েছে৷'
বড়োমামা বললেন, 'আর মায়া নয়, আজই একে বিদায় করতে হবে৷ মানুর মা, আজই, এখনই তুমি এটাকে নিয়ে যাও৷'
'আমি গোরু নিয়ে কী করব দাদাবাবু! আমার নিজেরই থাকার জায়গা নেই৷ চাল নেই, চুলো নেই৷'
'কেন, তোমার বাড়ির পাশের মাঠে বেঁধে রেখে দেবে৷ যখন দুধ হবে দুধ খাবে, দই খাবে, ক্ষীর খাবে, চেহারা ফিরে যাবে৷'
মেজোমামা বললেন, 'মাঝে মাঝে লাথিও খাবে৷ সভ্যতা এতবছর এগিয়ে গেল, গোরু কিন্তু সেই গোরুই রয়ে গেল৷ প্যালিওলিথিক গোরু, নিওলিথিক গোরু আর এই স্পেস-এজ গোরু, বিবর্তনের ধারাটা কত স্লো দেখেছ দাদা৷ আমরা কত অসম্ভবকে সম্ভব করলুম! গোরু কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল, তার তরল দুধকে আমরা গুঁড়ো করে টিনে ভরে ফেলব?'
উঠোনে একটা বাঁধানো বসার জায়গা ছিল, বড়োমামা তার ওপর বসে পড়লেন৷ চুল উড়ছে৷ কপালের একটা পাশ গোলাপি৷ ফর্সা চেহারায় বেশ মানিয়েছে৷ মাসিমা ডাঁটা উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়ে ভীষণ যেন রেগে গেলেন৷ সকালে বাজার এসেছে৷ মানুর মা সব ধুয়ে ধুয়ে রেখেছে৷ আলু, পটল, কুমড়ো, কাঁচালঙ্কা, পাতিলেবু৷
'এই নে সব খা, সৃষ্টি খা, তুইই খা৷' ঝুড়িসুদ্ধ সব টান মেরে মাসিমা লক্ষ্মীর মুখের সামনে ছড়িয়ে দিলেন৷
লক্ষ্মী খুব চালাক গোরু, ভেবেছিলুম পটলের সঙ্গে লঙ্কা চিবিয়ে আর একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে৷ লক্ষ্মী জানে কোনটার পর কী খেতে হয়৷ সে কুমড়োটা মুখে পুরেছে৷ ডেঙ্গো শাক কুমড়ো দিয়েই রাঁধে৷ এরপরই হয়তো আলু আর পটল খাবে, সঙ্গে একটা কাঁচালঙ্কা৷ পেটে গিয়ে হয়ে যাবে আলু পটলের ডালনা৷
মেজোমামা বললেন, 'শিশু আর গোরু বুদ্ধিবৃত্তিতে সমান স্তরের প্রাণী৷ যা পাবে তাই মুখে পুরবে৷ যত রকমের অপকর্ম আছে নির্বিবাদে করে যাবে৷ হ্যাঁ, শিশু আর গোরু এক জিনিস, সেম থিংস, চেহারা ছাড়া সব এক৷'
বড়োমামা বললেন, 'তাহলে দেখো, সেই শিশু স্নেহ পায় বলেই মানুষ হয়৷ গোরুর বেলায় উলটো৷ গোরু স্নেহ পায় না, তাই বড়ো হয়েও গোরুর গোরুমি যায় না৷ হ্যাঁরে বাংলাটা ঠিক হল তো?'
'কী বললে, গোরুমি! বাঁদর-বাঁদরামি, পাগল-পাগলামি, ছাগল-ছাগলামি, গোরু থেকে বোধ হয় গররামি হবে৷ সংস্কৃত গো শব্দ থেকে উৎপত্তি৷ গো, আর রামি৷'
'আমরা কত স্বার্থপর দেখো? গোরু মানেই আমাদের কাছে দুধ, মাখন, ছানা, দই, রসগোল্লা, গব্য ঘৃত, ফুলকো লুচি!'
হঠাৎ লক্ষ্মী একটা লাফ মারল৷ বালতি, ঝুড়ি সব উলটেপালটে, সেই ছোট্ট উঠোনে টাট্টু ঘোড়ার মতো গোল হয়ে ছুটতে লাগল৷ মাসিমা রান্নাঘরে ঢুকে পড়লেন৷ মেজোমামা দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ধাপে, বড়োমামা যে বেদিটায় বসেছিলেন সেইটার ওপর উঠে দাঁড়ালেন৷
দোতলার বারান্দা থেকে আমি বললুম, 'ওর ঝাল লেগেছে বড়োমামা, কাঁচালঙ্কা খেয়েছে৷'
'একটু পরেই রতন আসবে৷'
রতনের খাটাল আছে৷ মাসিমাই রতনের কথাটা বললেন৷ বড়োমামা যেন ধড়ে প্রাণ পেলেন৷ বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ কুশি! রতনের ওখানে থাকলে লক্ষ্মীটি মানুষ হবে, সঙ্গী পাবে৷ একটা প্রতিযোগিতার ভাব আসবে৷ আর পাঁচটা গোরুকে দুধ দিতে দেখলে নিজের দুধ দেবার ইচ্ছে হবে৷'
মেজোমামা বললেন, 'ইয়েস, কম্পিটিশন৷ প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকলে গোরু ভালো রেজাল্ট দেখাতে পারবে৷'
লক্ষ্মী সেজেগুজে রেডি হল৷ নীল নাইলনের দড়ি৷ গোয়াল থেকে উঠোনে এসেছে, একটু পরেই সদর দিয়ে বেরিয়ে যাবে৷
'বাবু আছেন, ডাক্তারবাবু?' ওই যে রতন এসে গেছে৷ গায়ে হলদেটে ফতুয়া৷ নীচের দিকে দুটো পকেট, নানারকম জিনিসে ফুলে আছে৷ লুঙ্গিটা একটু উঁচু করে পরা৷ কালো তেল চুকচুকে রং, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল৷
'এসো রতন এসো৷' ধরা ধরা গলায় রতনকে ডাকলেন৷
'বাঃ লক্ষ্মী তো লক্ষ্মীই, বেশ চেহারাটি! গোরু হলে এইরকম গোরু হওয়াই উচিত৷'
'একটা রিকোয়েস্ট রতন, তুমি নজর দিয়ো না৷'
'হাসালেন ডাক্তারবাবু, ও তো এখন থেকে আমার নজরেই থাকবে৷ আমি চেহারা-ফেহারা বুঝি না, আমি বুঝি দুদ৷ দুদ দিলে খাতির, না দিলে জুতো৷'
'জুতো মানে, গোরুকে জুতো পেটা?'
'না, না, হিন্দুর ছেলে গোরুকে জুতো মারতে পারি? মহাপাপ! গোরু মেরে জুতো তৈরি হবে৷'
বড়োমামা চমকে উঠে লক্ষ্মীর পিঠে আঙুল ঠেকালেন৷ তার গা-টা কেঁপে উঠল থিরথির করে৷ ন্যাজটা দুলে উঠল চামরের মতো৷

'অবাক হবার কী আছে এতে!' রতন বলল, 'এত জুতো তাহলে আসবে কোথা থেকে? লাখ লাখ জোড়া পা, লাখ লাখ জোড়া জুতো৷ বুঝলেন ডাক্তারবাবু, গোরু বড়ো উপকারী জন্তু!' রতন লক্ষ্মীর পিঠে হাত রেখে বলল, 'এই দেখুন চামড়া, কমসে কম এক-শো জোড়া জুতো হবে৷ এই শিং আর পায়ের খুর থেকে কেজি খানেক সিরিশ তৈরি হবে৷ তারপর হাড়৷ হাড় থেকে তৈরি হবে বোন মিল৷ গোরু কি মানুষ? মরল আর পুড়ে ছাই হল?'
বড়োমামা রতনের কথা শুনে লক্ষ্মীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন৷ চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে৷ রতন তখনও শেষ করেনি কথা৷
'ওই জন্যে আমরা করি কী, ফুকো দি৷'
'ফুকো? সে আবার কী?'
'ডাক্তারবাবু, বিজ্ঞানের কম উন্নতি হয়েছে? ফুকো হল ইঞ্জেকশন৷'
'ও ইঞ্জেকশন৷' বড়োমামা খুশি হলেন, 'ভালো ভালো, গোরুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখলে দেশের স্বাস্থ্য ভালো হবে৷'
'সে ইঞ্জেকশন নয়, দুধ বাড়াবার ইঞ্জেকশন৷ যে গোরু আড়াই দেয় সে দেবে পাঁচ, যে পাঁচ দেয় সে দেবে দশ৷ ডবল ডবল দুধ, ডবল ডবল রোজগার, হ্যা হ্যা৷'
'ম্যাজিক নাকি? সে তো জল মেশালেই দুধ বাড়ে!'
'তা বাড়ে, তবে দুধ বাড়লে জল বাড়ে, সব মিলিয়ে আরও বাড়ে৷ ফুকো দিলে গোরুর রক্তটাই দুধ হয়ে বেরিয়ে আসে৷ হিসেব করুন না, একটা গোরু দশ বছর বেঁচে আড়াই সের দুধ দেওয়া লাভের, না পাঁচ বছর বেঁচে পাঁচ সের দেওয়া লাভের? নিজে তো খাইয়ে দেখেছেন, গোরুর খোরাক তো জানেন? যত তাড়াতাড়ি পার সব দুধ শুষে নিয়ে, জ্যান্ত কঙ্কালটাকে কষাইখানায় পাঠিয়ে দাও৷ হ্যা হ্যা৷ চল লক্ষ্মী চল৷'
'বেরোও! গেট আউট,' বড়োমামা পা থেকে জুতো খুলে হাতে নিয়েছেন৷ চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল৷ 'চামার, তুমি গোরুরও অধম৷ নিকালো, আভি নিকালো৷'
বড়োমামা ঠকঠক করে কাঁপছেন৷ মাসিমা দৌড়ে এসে বড়োমামাকে ধরেছেন৷ রতন বলছে, 'কী হল, হঠাৎ! বেলাড পেসার মনে হচ্ছে!' মেজোমামা ইশারা করে রতনকে চলে যেতে বলছেন৷ লক্ষ্মী গোরু হলেও তার বোধশক্তি আছে৷ লম্বা জিভ দিয়ে বড়োমামার পিঠ চেটে দিচ্ছে৷ তবে ওই, সামান্য একটু ভুল করে ফেলল৷ বড়োমামার পৈতেটা তার মুখে৷ সে আর কী হবে! মানুষের কাজেও তো অনেক ভুল থাকে৷
শারদীয়া ১৩৮৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন