অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
চাংরিপোতা থেকে হরিনাভির গঙ্গার ঘাট বড়োজোর দেড়-দু ক্রোশ পথ৷ এ পথটুকু হাঁটতেই সার্বভৌম মশায়ের পায়ে ঝিনঝিন ধরে গেল৷ বড্ড বয়স হয়ে গেছে৷ ছেলেবেলায় হারজিচণ্ডীতলার মাঠ, গোড়ের খাল, ঠাকুরজি পুকুর পেরিয়ে কালীখেত সুতানুটি অবধি হেঁটে যেতেন তুড়ি মেরে৷ পালকি আর নৌকো থাকলেও পয়সা লাগত বলে চড়তেন না৷ আর আজকালকার বাবুদের তো এপাড়া থেকে ওপাড়া যেতেও পালকি চাই৷ পোড়ারমুখো সাহেবরা আবার ঘোড়ায় টানা হাওয়া গাড়ি বার করে ছেলেছোকরাদের মাথা খেয়েছে৷ তবিলে কড়ি থাকলে অমন আরও কত কী বার হবে! তালপাতার ছাতাখানা পুরোনো হয়ে প্রায় খসে পড়ছে, এবার নতুন আর একখানা না হলেই নয়৷ খড়মটাও পালটানো দরকার৷ পাঠশালের চাল ছাইবার খড়ও চাই কয়েক কাহন৷ চাই বললেই তো হবে না৷ তার জন্য কড়িও চাই ঢের৷ শুধু তাঁরই নয়, এ তল্লাটের আরও দশ-বিশটা পাঠশালে ওই একই অবস্থা৷ পালাজ্বরে গাঁয়ের পর গাঁ উজাড়, পোড়ো আসবে কোত্থেকে৷ বারুইপুরের সদর কাছারিতে এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এসেছে৷ নৈহাটির চাটুয্যে৷ বড়ো ভালো ছোকরা৷ এত বড়ো চাকুরে তার কোনো দেমাক নেই৷ ওই ভরসা৷ চাটুয্যে ছোকরা কথা দিয়েছে কোম্পানি না করলে ও নিজের থেকেই সাহায্য করবে৷ আহা বেঁচে থাক, এটুক ভরসাই বা কে দেয় আজকাল৷
এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে টুক টুক করে হাঁটছেন বুড়ো মানুষটা৷ পথে দেখা হল দুকড়ি ডোমের সাথে৷ দুকড়ির ছায়া হয়ে সেঁটে আছে ওর ছেলে পরাণ৷ পথের ধুলোর ওপরেই সাষ্টাঙ্গ পেন্নাম করলে দুকড়ি৷ তাড়ির গন্ধে বাতাস ভরপুর৷
'পেন্নাম হই গো পণ্ডিতমশাই৷'
'ওরে ধুলোর ওপর গড়াসনা, বেঁচে থাক বেঁচে থাক৷ শরীর গতিক ভালো তো?'
'আপনাদের কিপায় ভালোই আজ্ঞা৷ বউটার সান্নিপাতিক হয়ে যাই যাই হয়েছিল, দয়াময়ী সতীমায়ের থানে হত্যে দেবার পর থেকে অষুধ ধরতেছে৷ কবরেজ মশাই আজ্ঞা করেছেন গেল হপ্তায় ঠিক হয়ে যাবেখন৷'
দয়াময়ী সতীমায়ের কথা শুনে সার্বভৌম ঠাকুর আনমনা হয়ে পড়লেন৷ চোখের কোনায় জল৷ ছেলেবেলায় দয়াময়ী ঠাকরুণকে সতী হতে দেখেছেন তিনি৷ দশ বছরের কচি মেয়েটাকে কড়া সিদ্ধি খাইয়ে বুড়ো বরের সাথে চিতায় পুড়িয়ে মেরেছিল সামন্তরা৷ ধর্মের নামে কত বড়ো অন্যায়! তাঁর নিজেরও তখন দশ-বারো, দয়াময়ীর খেলার সাথি৷ দয়াময়ীর বুড়ি সতীনের ছেলে পিতেম্বর সামন্ত সেই চিতার ওপর মঠ বানিয়েছিল৷ টাকাকড়ির মুখে আগুন! আশি বচ্ছর আগেকার সেই তুমুল ঢাক ঢোলের শব্দ আজও তাঁকে অসাড় করে দেয়৷ রাগে আপাদমস্তক জ্বলতে থাকে৷ দয়াময়ীর পর আর কেউ সতী হয়নি, এ গাঁয়ে ছোকরা পণ্ডিতের দল লাঠি হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল৷
'হত্যে দিয়ে আর মন্তর দিয়ে কিছু হয় না রে ব্যাটা, কবরেজের ওষুধই সব৷ সান্নিপাতিক বড়ো সাধারণ অসুখ নয়! সাবধানে রাখিস৷'
বেলা পড়ে আসছে৷ হেমন্তের বিকেলে বাতাসে শীত শীত ভাব৷ গঙ্গার জলে জোয়ারের বান লেগেছে৷ বুড়ো বট গাছের ছায়ায় চওড়া বাঁধানো ঘাটে বসে হাঁপ ছাড়লেন নব্বই বছরের ভবনাথ সার্বভৌম৷ লাল কাপড়ে যত্ন করে বাঁধা তলপি কপালে বুকে ঠেকিয়ে নামিয়ে রাখলেন পাশে৷ দেড়-শো বছরের পুরোনো চণ্ডীমঙ্গলের পুঁথি আছে এতে৷ ভবনাথের ভুরু কোঁচকানো৷ দুকড়িকে বলা হয়নি৷ কথাটা গেল হপ্তায় নয়, বলতে হবে 'আসছে হপ্তায়'৷ বামুন কায়েতরাই ভুল করে, এ হতভাগ্য তো ডোম৷ এদের লেখাপড়া শেখাবে কে?
'নমস্কার পণ্ডিতমশাই৷'
অবেলায় নজর ঠিক থাকে না, তবু গলার আওয়াজে চিনতে পারলেন ভবনাথ৷
'আরে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মশাই! আসতে আজ্ঞা হোক, আসতে আজ্ঞা হোক!'
'ঠাকুরদা৷ দয়া করে আপনি আজ্ঞে করবেন না৷ তার চাইতে গাল বাড়িয়ে দিচ্ছি, চড় মারুন একটা৷'
'আয় আয় বোস৷ তুই তোকারি করলেই কি আর পাণ্ডিত্য কমবে তোর! তুই আমার বিদ্যার জাহাজ৷'
'আর তোমার বিদ্যের সাগরটি কী রকমের?'
'কে, ঈশ্বর! ওরে বাবা ও তো জলবিছুটি, বুনো ওল৷ মাথাটি দেখেছিস৷ কসুরে জই! ওর তো আজ আসবার কথা এখেনে৷ এত দেরি তো করে না সে!'
'বলেছে যখন আসবেই৷ হাঁটা পথে পটলডাঙা থেকে হরিনাভি, অনেকটা দূর৷ তোমার তলপিতে আজ কার অধিষ্ঠান? মনসা, কালিকা না চণ্ডী?'
'ওদিকে নজর দিসনে ছোঁড়া৷ ঈশ্বরের বায়না করা আছে৷'
'কার রচনা?'
'তার নামের জায়গাটি উই বা ইঁদুরে রসিকতা করে খেয়ে রেখেছে, অবশ্য মূল অংশটা ঠিক আছে এখনও৷ দেড়-শো বছরের প্রাচীন পুঁথি, চণ্ডীমঙ্গল৷'
'কালকেতু ফুল্লরা!'
'ফুল্লরার বারোমাস্যার জায়গাটি খাসা! ঠিক যেন আমাদের ঘরের ঠাকুরানিদের চোপা থেকে তুলে সাজানো৷ পদকর্তার গিন্নিটি নির্ঘাৎ কুঁজলে ছিল৷ আহা;
'আষাঢ়ে রবির রথ চলে মন্দগতি৷
ক্ষুধায় আকুল হই লোটাই আক্ষি ক্ষিতি৷
ক্ষণে ক্ষণে ঊর্ধে আক্ষি চারিদিকে চাহি৷
হেন সাধ করে সনে অন্য জাতি যাই৷'
'জয় মা কালী ঘ্যাচাং!'
কচি গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে পরাণ৷ কলাগাছের থোরের গায়ে কাঠের টুকরোর ঘা পড়ছে ধপাধপ৷ পরনের ত্যানাটুকু কোথায় গেছে কে জানে৷ কালো হাড় জিরজিরে শরীরে তেজের অবশ্য কমতি নেই৷ কম নেই কাদা মাটিও৷ হুঁকোর কলকিতে ফুঁ দিতে দিতে হাসছে দুকড়ি৷
'চুপ করবি রে ছোঁড়া!'
'পাঁঠা বলি দিচ্ছি যে!'
'এখন চুপ কর৷ কালীপুজোর দেরি আছে আরও এক হপ্তা, তখন পাঁঠাবলি দিস৷'
হুঁকোর মাথায় কলকি চড়িয়ে কলাপাতের নল বসিয়ে একটু দূর থেকে হাত বাড়াল দুকড়ি৷
'বাবাঠাকুর, আজ্ঞা হোক৷'
ভবনাথ হাত বাড়িয়ে হুঁকো নিলেন৷ গুর গুর করে শব্দ হচ্ছে৷ আবছা অন্ধকারে কালচে দেখাচ্ছে গঙ্গার ঘোলা জলে দুলন্ত কলসির দাম৷ তারা ফুটে উঠছে একটি দু-টি৷ হুঁকোর নীলচে ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে হেমন্তের জোলো বাতাসে৷ একটা বজরা ভেসে যাচ্ছে সুতানুটি কলকাতার দিকে৷ বজরার জানলায় লন্ঠন জ্বলছে৷ লালচে আলোয় কে একজন সাহেবি পোশাকের মানুষ মাথা নীচু করে বসে আছেন৷ দুই পণ্ডিত চেয়ে দেখলেন৷ বজরার গুনটানা মাঝি একটু বসল এসে ঘাটের পৈঠেতে৷
'কে যায় হে মাঝির পো?'
'বারুইপুরের কাছারিসাহেব আজ্ঞা৷'
আবার উঠে হাঁটা দিয়েছে মাঝি৷ বজরা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে ঘর ফিরতি ক্লান্ত রাজহাঁসের মতো৷ দেখতে দেখতে ডাইনে রাজপুর জগদ্দলের ঘাট পেরিয়ে গেল৷ জানলার আলো এখনও দেখা যায় মিটমিটে আকাশ পিদিমের মতো৷ ছোটো হতে হতে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে৷ আলো নেই আর একটুও৷ আকাশে অগুন্তি তারা ফুটে উঠেছে৷ রাজপুর শ্মশানে চিতা জ্বলে উঠল কারও৷ আকাশে আগুনের ফুলকি উড়ছে, উড়ছে অনেক জোনাকিও৷ গঙ্গার ওপাড়ে মানিকপুর৷ কয়েক ঘর লোকের বাস সেখানে৷ তাদের ঘরে সাঁঝবাতি জ্বলে উঠল৷ গেরস্তঘরের শাঁখে ফুঁ পড়ল৷
দ্বারকানাথের দিকে হুঁকো বাড়িয়ে দিলেন ভবনাথ৷ দ্বারকানাথের দাড়ি উড়ছে ফুরফুর বাতাসে৷ কলকের টানে টানে উলপে ওঠা আগুনে আনমনা চোখ দু-টি দেখা যায়৷ গলার স্বর চাপা গম্ভীর৷
'বঙ্কিম চাটুয্যে মশাই কলকেতা চললেন৷ এই অবেলায়, কে জানে কী কারণ? কোম্পানির বড়ো কুটুমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তো ভালো নয় একেবারেই৷ বেশিদিন এখানে তাঁকে পাব বলে মনে হয় না ঠাকুরদা৷'
'ঠিকই আন্দাজ করেছ৷'
অন্ধকারে চেহারা দেখা যায় না, যেন আর একটা জমাট অন্ধকার এসে বসল গা ঘেঁষে৷ মাথায় খাটো, গলার আওয়াজ রুক্ষ আর জোরালো৷ ভবনাথ নড়েচড়ে বসলেন৷
'কে গো, ঈশ্বরচন্দ্র মশাই নাকি? স্বাগতম!'
'প্রণাম নাও ঠাকুরদা, বেঁচে আছ দেখছি৷ একটুও টসকাওনি!'
'বুড়ো আরও বিশ বছর বাঁচবে৷ তারপর কী বলছিলি?'
'বলছি ঠিকই ধরেছ৷ বঙ্কিম বোধ হয় চাকরিতে ইস্তফা দিলেন৷ অবশেষে ভালো করে বললে কোম্পানি চাকরি ছাড়তে বাধ্য করল৷'
'সে কী!' বৃদ্ধ সার্বভৌম বিচলিত হলেন৷ দ্বারকানাথ নড়েচড়ে বসলেন৷
'ছোকরার মর্যাদাবোধ খুব৷ রসবোধেরও তুলনা নেই৷ তবে লেখায় এখনও বড়ো ম্লেচ্ছভাব৷'
'চাটুয্যের পোকে চিনি অনেকদিন৷ ভারি মিশুকে৷ আমার তালপাতার চটির মাথা কেমন বেঁকে বেঁকে যায়৷ বঙ্কিম আমায় বললে, 'বিদ্যেসাগর মশায়ের চটি তো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে স্বর্গবাসি হতে চাইছে'৷'
'তুই কী বললি?'
'আমি বললাম 'চট্টোপাধ্যায় বুড়ো হলেই বঙ্কিম হয়'৷' দুই পণ্ডিত হা-হা করে হাসছেন৷ বেদম হয়ে হাসলেন ভবনাথ৷
'রসিক বটে! তা কোম্পানি তো হাতে ময়লা কাটছে, সাদা শকুনের দল যাকে বলে৷'
'দেরি আমার এ জন্যেই৷ ঝগড়া করে এলেম সাহেবগুলোর সঙ্গে৷ চব্বিশ পরগনা অন্ধকার হয়ে গেল হে!'
'একে কি এঁটে উঠতে পারবে সায়েবরা? মামলা করবে না?'
'ওকে ওর কথা ভাবতে দাও ঠাকুরদা৷ বঙ্কিমের ধাত আলাদা৷ শান দেয়া ইস্পাত৷ ঠাকুরদা আমার চণ্ডীমঙ্গল?'
ভবনাথ অন্ধকারে তলপি বাড়িয়ে দিলেন৷ ঈশ্বর দু-হাতে যত্ন করে মাথায় ঠেকিয়ে পাশে রেখে গুছিয়ে বসলেন৷ ভবনাথ নরম হাতে ছুঁলেন ঈশ্বরকে৷
'এত দেরি করে এলি যে, কলকেতা ফিরবি কী করে?'
'কাল ফিরব৷ তোমাদের সঙ্গে কথা আছে ঢের৷ দ্বারকা দুকড়িকে পাঠাও তো, পালকিতে আলো এনেছি, নিয়ে আসুক৷
'পালকি কোথায়?'
'রাজপুরের ঘাটে৷ পালকি চড়তে দেখলে বুড়োটা গাল দেয় বলে এ অবধি আনতে ভরসা পাইনি৷ দোখনো বুড়োর ঝাঁঝ খুব৷'
পরানকে পণ্ডিতমশাইদের পাশে বসিয়ে দুকড়ি গেল আলো আনতে৷ রাত হলেই পরানের জারিজুরি খতম৷ ঢুলে পড়ছে ঘুমে৷ ঈশ্বর ওকে দ্বারকার কাছ থেকে নিজের কোলের কাছটিতে নিয়ে বসালেন৷ ভবনাথ দ্বারকার সাথে চোখাচুখি করে মুচকি হাসলেন৷
'বিদ্যেসাগর, পোলাটি কিন্তু চণ্ডালের৷'
'আরে আমরা তিনমূর্তিই বুঝি বড্ড বামুন? জাতপাত মানো না বলে তোমাদের চতুষ্পাঠিতেও তো পোড়ো পাঠাতে চায় না লোকে৷ ডোমের হাতে হুঁকো খাও৷'
'বেশ করি জাত মানি না৷ মানুষে মানুষে ভেদ থাকা উচিত শুধু জ্ঞান আর অজ্ঞানে, বোধ আর নির্বোধে৷'
আকাশ থেকে তারা খসে পড়ল একটা৷ কথা নেই কারও মুখে৷ গঙ্গায় বুঝি জোয়ার এল, ছলছলাৎ শব্দ নৈঃশব্দ বাড়িয়ে দিচ্ছে৷
পরানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ঈশ্বর পণ্ডিত৷ ঘুমিয়ে কাদা পরান৷
'আমার নতুন বই করছি এদের সবার জন্য৷ বাংলার হরফ, বানান, চলতি কথা লিখতে শেখা এসব ব্যাপার আর কি৷ নাম দিয়েছি 'বর্ণপরিচয়'৷ বামুনের তবিলের তালপাতা নয়, কাগজে ছাপা বই হবে৷ সব জাতের ছেলে-মেয়েরা পড়বে৷'
'তালপাতের মতো টিকবে তো?'
'টিকবে টিকবে৷ তা ছাড়া দু-চারখানি না ছিঁড়লে আমার বিক্রি বাড়বে কী করে৷'
'ব্যাটা বামুন-ব্যাপারী!'
'ওরে শালা, বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী৷ দু-বোনের ভাব না হলে লেখাপড়া এগোবে?'
দুকড়ি ফিরে এল আলো নিয়ে৷ পিছু পিছু যমদূতের মতো পালকি বেহারাদের সর্দার ধরনী সাঁতরা, হাতে সড়কি মাথায় পাগ৷ তার লাল চোখ, গম্ভীর আওয়াজ৷
'বেহারাদের রেতে থাকবার ব্যবস্থা করে এলাম আজ্ঞা৷ আমি এলাম আপনাকে পাহারা দিতে, জায়গা তো ভালো নয়৷'
'কোনো দরকার নেই, তুই যা৷ বাড়ির বাইরে যেতে বারণ করিস, বড়ো শেয়ালের ভয় আছে এদিককার জঙ্গলে৷ দুকড়ি চকমকি আন৷'
হেমন্তের রাত বাড়ছে৷ দূরে দূরে শেয়ালের ডাক শোনা যায়৷ ঘাটের পৈঠের গায়ে ভরা জোয়ারের ঢেউ ভাঙছে কুল কুল৷ বিন্দু বিন্দু হিম জমা হচ্ছে গাছের পাতায় পাতায়৷
ঘাটের ফাঁকা চত্বরে তিন পণ্ডিত বাতি ঘিরে গুছিয়ে বসেছেন৷ দুকড়ি নতুন করে কলকে সাজাচ্ছে৷ ন্যাংটা শিশু পরান ঘুমিয়ে পড়েছে ঈশ্বরের চাদরের ওপর, ভবনাথের কোলে তার মাথা৷ কাঁধের ঝোলা থেকে নতুন লেখা কাগজের তাড়া বার করছেন ঈশ্বর৷ মুখপাতে খয়েরের রঙে বড়ো করে লেখা 'বর্ণপরিচয়'৷
দ্বারকা আস্তে আস্তে ঠেলা দিলেন পরানের গায়ে৷
'ওঠ বাবা ওঠ৷ পড়তে হবে যে!'
বড়ো বড়ো চোখ করে উঠে বসেছে পরান৷ চোখ কচলাচ্ছে কচি দু-হাতে৷ কাঁপা কাঁপা প্রদীপের আলোয় মন্দির কাঁপছে, ছায়া কাঁপছে৷ ঈশ্বর পণ্ডিত বলছেন;
'বল তো পরান, আমার সাথে সাথে বল-
'কাক ডাকিতেছে৷
গোরু চরিতেছে৷
পাখি উড়িতেছে৷
জল পড়িতেছে৷
পাতা নড়িতেছে৷'
বৈশাখ ১৪১৫

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন