ভবানন্দের কাশীযাত্রা

অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়

পুরাকালে, মানে অনেক কাল আগে, একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন৷ সংসারে তাঁর কেউ ছিল না, একলা মানুষ, শুধু পড়াশোনা পূজা-অর্চনা নিয়ে থাকতেন৷ যার ফলে তিনি ত্রিকালজ্ঞ হয়েছিলেন৷ ত্রিকালজ্ঞ মানে ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান তিনই তিনি জ্ঞাত ছিলেন৷ তা বলে গণক নন৷ পড়াশোনা করে পৃথিবীর ইতিহাস তিনি জেনেছিলেন এবং বর্তমান কালে কোথায় কী ঘটছে তাও তিনি খবর রাখতেন; এর ফলে দুইকে মিলিয়ে আগামী কালে কী ঘটবে তাও তিনি নিভুÍলভাবে বুঝতেন, বলতে পারতেন৷ বয়স অনেক হয়েছিল৷ একদিন বুঝলেন-শরীর যেন খারাপ হচ্ছে ঘন ঘন৷ সুতরাং তিনি নিভুÍল ভাবে বুঝলেন, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই মারা যাবেন৷ তখন মনে মনে চিন্তা করলেন-আমরা মৃত্যুর সময় তীর্থে যাই, সেইখানে মারা যাওয়াটা ভাগ্য বলে মনে করি৷ ভগবানকে ভাবতে হয় না চেষ্টা করে-ভগবানের মন্দির, তাঁর নাম, তাঁর পূজার ধূপ-দীপ ফুলের গন্ধে সেখানকার বাতাস ভরে থাকে৷ সেখানে মৃত্যু সৌভাগ্য৷ তীর্থের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তীর্থ কাশী৷ এখন তাহলে আমার কাশী যাওয়া উচিত৷ কিন্তু-কিন্তু কাশী তো অনেক পথ৷ এবং তীর্থস্থল হলেও বিদেশ৷ পথে বিপদ হতে পারে, সেখানেও পৌঁছে রোগ হলে একলা পড়ে থাকতে হবে৷ একজন লোকের দরকার৷ যে পথে সঙ্গী হবে এবং সেখানেও কাছে থাকবে, কথাবার্তা বলবে, রোগে একটু জলও মুখে দিতে পারবে৷ কিন্তু কে যাবে? আমার নাহয় কেউ নেই৷ অন্যের তো তা নয়! ঘরবাড়ি ছেলেপুলে আছে-তারা তাদের ফেলে যেতে চাইবে কেন? হঠাৎ মনে পড়ে গেল তাঁর এক বন্ধু আছে, ভবানন্দ ভারী, লেখাপড়া শেখেনি, ভার বয়ে খায়, তাই তাকে লোকে খেতাব দিয়েছে 'ভারী'; আর যেখানেই থাক না কেন, তার মুখে হাসি লেগেই থাকে৷ তাই লোকে তাকে বলে 'ভবানন্দ'৷ বিয়ে-টিয়ে করেনি, সংসারে তাঁরই মতো কেউ নেই, বয়সও তাঁরই সমান, ছেলেবেলার বন্ধু৷ এই ভবানন্দ ভারী যদি সঙ্গে যায় তবে বড়ো ভালো হয়৷ যাবার সময় মোট-টোটগুলি বইতেও পারবে৷ সর্বত্রই আনন্দ তার, সুতরাং বলবে না ঘরের জন্য, গাঁয়ের জন্য মন কেমন করছে৷ আর ছেলেবেলার বন্ধু, বেশ প্রাণ খুলে কথাবার্তা হবে৷ এই ভেবে তিনি চলে গেলেন ভবানন্দের আস্তানায় সন্ধ্যে বেলায়৷ একটি গাছতলায় ছোটো একখানা চালা ঘর৷ ভবানন্দ চালেডালে খিচুড়ি চাপিয়েছিল৷ তিনি ডাকলেন, 'ভবানন্দ ভাই, বাড়ি রয়েছ?'

ভবানন্দ হেসে বলল, 'ভবানন্দকে ভাই ডাকছ, দাদাঠাকুর তুমি নিশ্চয়ই, এসো এসো৷'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'ভবানন্দ একটি কথা বলছি৷'

'বলো৷'

তখন ব্রাহ্মণ তাঁর কথাটি বলে বললেন, 'দেখো ভাই, তোমারও বয়স হয়েছে৷ চলো না৷ যাবে আমার সঙ্গে? আমি প্রতিজ্ঞা করছি যদি কাশীতে তোমার অসুখ করে তবে আমি তোমার সেবা করব৷ যদি আমার আগে মারা যাও তবে তোমার সৎকার করব৷ আর আমি আগে যদি মারা যাই, অসুখ করে, তবে তুমি সেবা করবে, মারা গেলে সৎকার করবে৷ আমার সঙ্গে আমি কিছু টাকা নিয়ে যাব, সে টাকা তোমাকে দিয়ে যাব৷ ওই টাকায় তুমি বাকি দিনগুলো কাটাবে? দেখো, রাজি?'

ভবানন্দ বলল, 'ভবানন্দ ভারী মোট বয়ে খেতে পারবে, ভবানন্দের সর্বত্র সদাই আনন্দ, সুখে আনন্দ দুঃখে আনন্দ; ভবানন্দের কাছে দুঃখের ভাগ্যে কাঁচকলা৷ ভিক্ষেও করে খেতে ভবানন্দের বাধবে না৷ সেসব কথা ভুয়ো কথা৷ আসল শর্ত শোনো, সেই শর্ত মানলে যাব, নইলে যাব না৷'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'বলো৷'

ভবানন্দ ভারী বলল, 'ভারীর বল আছে, ভার বয়, ভয় নাই৷ ভবানন্দের আনন্দ আছে, সুখের অভাব হয় না৷ কিন্তু বিদ্যে নাই, মুখ্যু৷ তুমি পণ্ডিত, লোকে বলে-ত্রিকালজ্ঞ, সব জান৷ কাশী যাব, যেতে হবে অনেক পথ, পথে বন আছে, পাহাড় আছে, গ্রাম আছে, শহর আছে, কতরকমের মানুষ আছে, কত জন্তু আছে, পক্ষী আছে, কত ঘটনা ঘটবে৷ এর মধ্যে যা আমার আশ্চর্য ঠেকবে, বুঝতে পারব না, কিন্তু বুঝতে বাসনা হবে, আমি তোমাকে বলব কী ব্যাপার, বুঝিয়ে দাও৷ তোমাকে কিন্তু সেই দণ্ডে তৎক্ষণাৎ বুঝিয়ে দিতে হবে৷ যদি বুঝিয়ে না দাও কি না দিতে পার তাহলে সেইখান থেকে ভবানন্দ ভারী কাঁধের ভার পথে নামিয়ে দেবে উলটো মুখে পাড়ি, সটান এসে হাজির হবে বাড়ি৷ কাজ নাই তার কাশীতে৷ বুঝেছ?

ব্রাহ্মণ হেসে বললেন, 'বুঝেছি৷'

ভারী বলল, 'রাজি?'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'রাজি না হয়ে উপায় কী? রাজি৷'

'বেশ, চলো৷ শুধু খিচুড়িটা নামার অপেক্ষা৷ খেয়ে নিলেই তৈরি৷'

ব্রাহ্মণ আবার হেসে ফেললেন৷ বললেন, 'না আজ না৷ সাত দিন পর৷'

'বেশ৷'

সাত দিন পর ব্রাহ্মণ আর ভবানন্দ ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লেন৷ সবে কাক ডাকছে, কোকিল ডাকছে বাসায় বসে; বাসা ছাড়েনি৷ ওঁরা গ্রামকে প্রণাম করে বেরোলেন৷ ভবানন্দের মাথায় মোট৷ ব্রাহ্মণের বগলে ছাতা, হাতে লাঠি৷ ভবানন্দ গান ধরে দিলে-

'কাশীর পেঁড়া ও পেয়ারা, কী মিষ্টি,

পেঁড়া বানায় ময়রাতে, পেয়ারা বিশ্বনাথের ছিষ্টি৷'

এইভাবে চলেন দু-জনে৷ এক ক্রোশ, দু-ক্রোশ, পাঁচ ক্রোশ৷ দুপুর হলে রোদ উঠলে পথের ধারে চটিতে ঘরভাড়া নিয়ে স্নান আহার করেন, একটু বিশ্রাম করে রোদ্দুর পড়লে আবার রওনা দেন; রাত্রে অন্য চটিতে খেয়েদেয়ে ঘুমোন, আবার ভোর ভোর উঠে রওনা হন৷ এইভাবে একদিন দু-দিন তিনদিন কেটে গেল৷ চারদিনের দিন সেদিন খুব রোদ্দুর উঠেছে, রাস্তাটাও ন্যাড়া মানে দু-পাশে গাছপালা নেই, গ্রাম বা বসতিও নেই-ওঁরা চলছেন তো চলছেনই৷ চলতে চলতে একটা চড়াইয়ের উপরে উঠে নজরে এল ঢালের নীচে সামনে মস্ত একটা শহর৷ দু-জনে ভারি ক্লান্ত৷ ব্রাহ্মণের তো কথা নেই, ভবানন্দ ভারী পর্যন্ত গান থামিয়েছে৷ কাশীর পেঁড়া-পেয়ারার কথাও ভুলে গেছে৷ এতক্ষণে সে বলল, 'বাবা বাঁচলাম৷ চলো দাদাঠাকুর, পা চালিয়ে৷'

এসে দু-জনে হাজির হলেন এক সিংহদ্বারের সামনে৷ একটা গেট৷ গেটটার দু-দিকে দুটো থাম৷ উপরে খিলান৷ থাম দুটো বেশ মোটা, চৌকো গড়নের-দুটোর গায়েই দুটো কাচ লাগানো প্রকাণ্ড তাক৷ একটা থামের তাকের উপর বাঘ-নখের মতো অস্ত্র, তার পাশে বড়ো বড়ো সত্যকার নখ, তার পাশে ভীষণাকৃতি মুখোশ-রাক্ষসের মুখ-তাতে তেমনি দাঁত লাগানো৷ ভীষণ গদা, অগ্নিমুখ বাণ, তলোয়ার, আর একটা মস্ত কাচের পাত্রে স্বচ্ছ আরকে ডুবানো একটা মরা রাক্ষসের দেহ৷ নীচে লেখা-অভিশাপ৷ আর একদিকের থামের মধ্যের তাকে একটি একতারা, একছড়া তুলসীকাঠের মালা, একখানি কাপড় আর চাদর, একটি সিংহাসনের উপর রাখা রয়েছে৷ নীচে লেখা-শাপমোচন৷

অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ভবানন্দ ভারী, 'দাদাঠাকুর!'

ক্লান্ত ব্রাহ্মণ বললেন, 'কী ভবানন্দ?'

'এ তো ভারি আশ্চর্য!'

ব্রাহ্মণ সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন-দেখে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন-সঙ্গেসঙ্গে একটু আশ্চর্য স্বর্গীয় হাসিও মুখে ফুটে উঠল৷ তিনি বললেন, 'হ্যাঁ আশ্চর্য৷ সত্যই সব থেকে বড়ো আশ্চর্য ভবানন্দ!'

'এর কারণ? এই লেখার মানে? বলো দাদাঠাকুর৷ তুমি তো ত্রিকালজ্ঞ৷'

'হ্যাঁ রে জানি আমি৷ জানি৷ কিন্তু এই রোদে দাঁড়িয়ে নয়৷ চল, শহরে গিয়ে কোনো চটিতে-'

'তা হলে রইল তোমার মোট৷'

'ভবানন্দ? খিদে পায়নি? তেষ্টা পায়নি?'

'পেয়েছে৷ কিন্তু জানবার আগে ওসব রুচবে না৷'

'এখুনি বলতে হবে? দাঁড়িয়ে?'

'তা নাহয় বোসো৷ কিন্তু এখুনি৷'

পথের ধারে থামগুলোকে সামনে রেখে বসলেন দু-জনে৷

ব্রাহ্মণ বলতে লাগলেন, 'অনেক কাল-কত কাল তার হিসেব ঠিক কেউ বলতে পারে না ভবানন্দ৷ হিসেব কষতে গিয়ে বার বার হিসেব ভুল হয়েছে৷ কখনো লক্ষ বছর দাঁড়ায়, কখনো দশ হাজার বিশ হাজার৷ কখনো একশো, কখনো দাঁড়ায় দশ-বিশ দিন আগে৷ কেউ বলে বার বারই এমনি ঘটে-এমনি ঘটছে বলে হিসেব এমনি দাঁড়ায়৷'

ভবানন্দ বলল, 'হিসেব বাদ দাও৷ দশের বেশি হলে আমার মাথা ঘোরে৷ গুনতে জানিনে৷ মেরে-কেটে কুড়ি৷ এক-শো গুনতে হলে পাঁচ কুড়ি না সাজিয়ে ধরতে পারিনে৷ তুমি ব্যাপারটা বলো৷'

'এই নগর, এটি হল এই রাজ্যের রাজধানী৷ তখন শুধুই বন-শুধুই বন চারিদিকে৷ বনের ভিতর একটি রাজ্য৷ এই দেশের মানুষদের পূর্বপুরুষেরা বাস করত৷ তখন বনে ফল ছিল, নদীতে জল ছিল, মাঠে চাষ হত, ফসল ফলত৷ লোকেরা হাসত খেলত গান করত সুখে স্বচ্ছন্দে থাকত৷ মাঝে মাঝে বন থেকে জন্তু আসত, তারা দল বেঁধে তাদের তাড়াত৷ মানুষে মানুষে ঝগড়াও হত৷ কিন্তু নিয়ম ছিল-যা নিয়ম তাই ন্যায়৷ সেই ন্যায় অনুসারে প্রবীণেরা বিচার করে দিত৷ সবাই তা মেনে নিত৷ মারামারি বা যুদ্ধ হত৷ তারও নিয়ম ছিল৷ যুদ্ধ হবে সমানে সমানে৷ যুদ্ধ হবে সামনাসামনি৷ রাত্রে যুদ্ধ হবে না৷ তলোয়ারে তলোয়ারে যুদ্ধ হবে৷ তলোয়ারে-লাঠিতে, লাঠিতে-শুধুহাতে হবে না৷ একজনের সঙ্গে একজনের যুদ্ধ; পাঁচজনের নয়৷ যুদ্ধে কেউ মারা গেলে যে তাকে মারত সে তার সৎকার করত৷ শুধু তাই নয়-তার তর্পণ করত শ্রাদ্ধ করত৷ শুধু এই রাজ্যেই নয়-পাশাপাশি রাজ্যেও এই নিয়ম ছিল৷

'হঠাৎ গোলমাল ঘটল৷'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'বুঝলি ভবানন্দ-সংসারে পাপ হল শয়তান৷ তার বড়ো দুঃখ-তার স্থান হয় না-সে ঠাঁই পায় না কোথাও৷

'সে রাজ্যের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়৷ কেবল ঘোরে৷ কী করে কোন ফাঁকে ঢুকতে পারবে! একদিন তার চোখে পড়ল-অনেকটা দূরে একটা আশ্চর্য রাজ্য৷ বন-পাহাড়৷ কিন্তু রাশি রাশি মণি-রত্ন-সোনা ছড়ানো রয়েছে মাটির উপর৷ নদীর জলে মাটি ধুয়ে গিয়েছে৷ তার কিনারায় চোখে পড়ে, স্তরে স্তরে থাকে থাকে সোনা হিরে পান্না নীলা ঝকমক করছে৷ পাপের চোখ দুটো ঝকমক করে উঠল৷ এই তো!

'কিছু মণি-রত্ন-সোনা নিয়ে সে এল এই দেশে-মণি-রত্ন-সোনা চাই!

'লোকে তার ডালা দেখে অবাক হয়ে গেল৷

'কী দাম?

'দাম আর কী? যা দেবে৷ আমি তো কুড়িয়ে এনেছি৷ নাও যার যা পছন্দ৷ যা পার দাও৷ লোকে নিয়ে গেল, যে যা পারল নিয়ে এবং দিয়ে৷ যাবার সময় বলল-যাও না, ওই পথে অনেকটা দূর, সেখানে ছড়ানো রাশি রাশি!

'ছড়ানো? রাশি রাশি?

'হ্যাঁ৷

'আমাদের নিয়ে যাবে?

'যাব৷ চলো!

'সঙ্গেসঙ্গে ঢেঁড়া পড়ল, চলো চলো৷ কাল যেতে হবে সেই দেশে৷

'তাই গেল৷ ভেঙে পড়ল গিয়ে সেখানে! আরম্ভ হল খোঁড়ার কাজ-সোনা মণি তোলার কাজ! তুলছে তারা সোনা-মণি-মাণিক্য৷ হঠাৎ একদিন দেখল আর একদিক থেকে আর-এক দেশের লোক আসছে৷ তাদেরও নিয়ে এসেছে-সেই পাপ৷ এদের এখানে রেখে সে আর-একদেশের লোক নিয়ে এসেছ৷

'এরা বলল-বাঃ, এ কী? এ তো আমাদের জায়গা!

'তারা বলল-বাঃ, তা কী করে হবে? এ তো পতিত জায়গা! তোমরা ও দিকটায় খুঁড়ছ৷ আমরা এদিকটা খুঁড়ব৷

'হল খানিকটা কথার ঝগড়া৷ তারপর নিয়মানুযায়ী যুদ্ধ৷ কেউ হারে না, কেউ জেতে না৷ যুদ্ধ চলে৷ একদিন পাপ একদলকে এসে বলল, তোমরা কী? শুধু হাতাহাতি করছ৷ লাঠালাঠি করছ৷ তলোয়ারে তলোয়ারে ঠোকাঠুকি করছ৷ তার থেকে আমি বাঘনখ দিচ্ছি, তাই দিয়ে দাও না মল্লযুদ্ধের সময় পেটটা ফেঁড়ে!

'সে যে অন্যায় হবে, পাপ হবে৷ অধর্ম হবে৷

'অধর্ম হবে! তবে ধর্ম করে হারো, মরো৷ বাড়ি চলে যাও৷ ওরা সব নিক দখল করে৷

'তাই তো৷

'পাপ আবার বলল-ধর্ম করলে কী হয়?

'পুণ্য হয়৷

'পুণ্য হলে কী হয়!

'সগগে যায়৷

'সগগ কোথায়?

'তা জানি না৷

'হ্যাঁ গো, মরে যেতে হয় বল তোমরা৷

'হ্যাঁ৷

'সব মিথ্যে কথা৷ সব মিথ্যে৷

'মিথ্যে?

'হ্যাঁ৷ সত্য যা তা চোখে দেখা যায়, হাতে ছোঁওয়া যায়৷ এই সোনা সত্যি, এই হিরে সত্যি, এই মণি সত্যি, মানিক সত্যি৷ স্বর্গ নরক চোখে কেউ দেখেনি৷ সব মিথ্যে সব মিথ্যে৷

'ঠিক৷ ঠিক৷ ঠিক বলেছ৷ কাল থেকে চালাও বাঘনখ৷

'ওদেশের লোকের কাছেও গিয়ে তাই বলল৷ পর দিন থেকে আরম্ভ হল নতুন যুদ্ধ৷ ওরা পেয়েছিল ছুরি৷ এরা বাঘনখ৷ ওরা ছুরি নিয়ে যুদ্ধ শুরু করল৷

'সন্ধ্যায় দেখা গেল-মরেছে প্রায় সমান সমান৷ কিছু কম-বেশি৷ তারপর শুরু হল রাত্রে যুদ্ধ৷ গাছের উপর উঠে আগুনের গোলা ছোঁড়া হতে লাগল৷ ক্রমে এ দেশ জয়ী হল৷ ওদের দেশের লোকদের কতক ধরে আনল৷ তারা ক্রীতদাস হল৷ এদের দেশে ধন সম্পদ মণি মাণিক্য সোনায় ভরে উঠল৷ কিন্তু আরও চাই৷ চলো পৃথিবী খুঁজব৷ এমন দেশ নিশ্চয় আরও আছে৷

'পাপ বলল-আছে, নিশ্চয় আছে৷ কিন্তু আরও দেশের মানুষ আছে৷ তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে৷ তার জন্য তৈরি হয়ে বের হও৷

'ঠিক কথা৷ ডাকো পণ্ডিতদের৷

'পণ্ডিতরা এল৷ তাদের রাজা বলল, শুনুন পণ্ডিতগণ৷ পৃথিবীর যেখানে যত ধনরত্ন আছে আমরা জয় করে আনবার জন্য বের হব৷ যুদ্ধ করে জিততে হবে সকল দেশকে৷ আপনারা এই ধরনের অস্ত্র বের করুন৷ বাঘনখের মতো, ছুরির মতো৷ আর এমন তলোয়ার এমন গদা এমন মুষল তৈরি করুন যাতে থেকে আগুন বের হয়৷ আর সমস্ত লোক শুধু যুদ্ধকৌশল শেখো; আর মনকে এমন করে তৈরি করো যেন মানুষ মারতে বুক না কাঁপে৷ মরতেও ভয় না হয়৷ শুধু চিৎকার করো আমরাই শ্রেষ্ঠ আমরাই বিধাতা, আমরাই সমস্ত সুখ সমস্ত সম্পদের মালিক৷

'তাই আরম্ভ হয়ে গেল৷ দিবারাত্র মানুষ করে ওই চিৎকার৷ বড়ো বড়ো গদা নিয়ে মুষল নিয়ে আস্ফালন করে, বনে যায়, মারে সেই গদা জন্তুর মাথায়, চুরমার হয়ে যায় জন্তুর মাথা৷ ক্রীতদাসদের ডেকে আনে, তাদের চাবকায়, বলে, বল বল, তোমরা শ্রেষ্ঠ তোমরা বিধাতা৷ কেউ যদি বলে তা কেন বলব? তা তো নয়৷ সঙ্গেসঙ্গে মুষল দিয়ে ভেঙে দেয় তার বুকের পাঁজরা৷ দাঁতে দাঁত টিপে ক্রোধে দম্ভে চোখ রক্তবর্ণ করে নিজেরাও চিৎকার করে ওই বনে৷

'শুধু একটি পরিবার এতে যোগ দেয় না৷ তারা ঘরে বসে এর জন্য দুঃখ পায়, কাঁদে৷ সেটি রাজার ছোটো মেয়ে আর স্বামী৷ তারা কিছুতেই এতে সায় দিতে পারে না৷ ছোটো মেয়ের স্বামী, ছোটো জামাই সে ছিল অকেজো লোক, সেই গাইতো গান৷ গায়ক ছিল৷

'রাজার কানে এ খবর গোপন রইল না৷ কোটাল এসে কানে তুলল৷ মহারাজ, এত বড়ো দেশব্যাপী সাধনা চলছে আর ছোটো জামাই রাজা ঘরে বসে এর জন্যে কাঁদছেন৷

'বল কী?

'হ্যাঁ মহারাজ৷ বিশ্বাস না হয় ডাকুন, ডেকে পরীক্ষা করুন৷

'রাজা তাকে ডাকলেন পরদিন সভায়৷ প্রশ্ন করলেন-তুমি দেশের এত বড়ো যে আয়োজন চলছে এতে যোগ দিচ্ছ তো নিয়মিত?

'ছোটো জামাইটি শুধু গায়ক এবং দুর্বলচিত্তই নয়, সে ছিল সত্যবাদী৷ সে বলল-না মহারাজ!

'না? কেন?

'আমার সাধনার মধ্যে আমি অবকাশ পাই না৷

'কী তোমার সাধনা?

'গানের৷

'গানের? কী গান তুমি গাও৷ গাও তো শুনি!

'গায়ক গান ধরল-আমাকে সকল লোভ জয় করবার শক্তি দাও৷ আমাকে নির্লোভ করো-হে রাজাধিরাজ৷ আমার সকল ভয় দূর করে নির্ভয় করো হে মৃত্যুঞ্জয় অভয়দাতা৷ আমাকে রাক্ষসত্ব থেকে রক্ষা করো, হে চিরকোমল হে চিরসুন্দর৷ আমার অন্তর মানুষের প্রেমে জীবের প্রেমে পূর্ণ করো-হে পূর্ণ পুরুষ৷

'গর্জে উঠল রাজা-কে তোমার রাজাধিরাজ? কে তোমার মৃত্যুঞ্জয় অভয়দাতা? কে তোমার চিরসুন্দর? কে তোমার পূর্ণ পুরুষ? আমি?

'না মহারাজ৷ তিনি আপনারও রাজাধিরাজ৷ ভগবান৷

'ভালো৷ রাক্ষসত্ব থেকে রক্ষা পেতে চাও৷ সে রাক্ষসত্ব কী?

'দেশে যার সাধনা চলছে, মহারাজ, তাই!

'ভয়? ভয়টা কীসের? কাকে তোমার? আমাকে? দণ্ডের?

'না মহারাজ, তার থেকেও বড়ো ভয় লোভের এবং পাপকে!

'রাজা ডাকলেন-ঘাতক!

'ঘাতক এসে দাঁড়াল৷ রাজা সভাসদদের বললেন, আমাদের এই বীর্যের সাধনায়-এ পশ্চাৎপদ কাপুরুষ৷ আমাদের এ নিন্দা করে৷ এ ব্যক্তি রাজদ্রোহী দেশদ্রোহী৷ এক অস্তিত্বহীন অস্তিত্বে বিশ্বাসী৷ এ ব্যক্তি দুর্বল এবং মূর্খ৷ কী বলেন আপনারা?

'ক্রোধে দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ করে ভয়ংকর মুখে সকলে বললে-নিশ্চয়৷ নিঃসন্দেহে!

'এর আমি শাস্তিবিধান করব৷ মৃত্যুদণ্ড৷ কী বলেন?

'সাধু সাধু মহারাজ৷ এমন দৃঢ়চিত্ত না হলে রাজা! এমন রাজা নায়ক না হলে জাতি কি কখনো শ্রেষ্ঠ হতে পারে?

'রাজা বললেন জামাইকে-আমি তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম৷ ডাকো তোমার মৃত্যুঞ্জয়কে৷ আসুন তিনি দেখি!

'না মহারাজ, তা আমি ডাকব না৷ তাঁকে শুধু ডেকে বলে যাব-প্রভু, আমার পিতৃতুল্য শ্বশুরকে এবং আমার জাতির মানুষকে তুমি রাক্ষসত্ব থেকে রক্ষা করো৷

'রাক্ষসত্ব?

'হ্যাঁ মহারাজ৷ আসছে৷ আমিও দেখতে পাচ্ছি৷ জাতিটা রাক্ষসে পরিণত হবে আমার মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গে৷

'রাজা বললেন-তবে ঘাতক, এই মুহূর্তে এই রাজসভায় একে হত্যা করো৷ রাক্ষসত্বের জন্য মুহূর্তের বিলম্ব আমার সহ্য হচ্ছে না৷

'মুহূর্তে ঘাতকের খড়্গ উঠল৷ নামল৷ রাজজামাতার মাথা ছিটকে পড়ল৷ রক্তে রাজসভা রক্তাক্ত হয়ে গেল৷ সঙ্গেসঙ্গে আশ্চর্য ক্রিয়া হল৷ সকলের কন্ঠ থেকে এক বিকট উল×াসধ্বনি বের হল৷ তার সঙ্গেসঙ্গে তাদের দেহ বাড়তে লাগল, মুখ চোখ দাঁত নখে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটল৷ এ ওর মুখের দিকে চায়, ও এর মুখের দিকে চায়৷ একী একী একী!

'সমস্ত রাজ্য জুড়ে ধ্বনি উঠল-একী!

সমস্ত রাজ্য হয়ে গেল রাক্ষস৷

'আনো, মদ আনো-আনো ভারে ভারে মাংস, আনো প্রমোদ, আনো বিলাস৷ আনো অস্ত্র, সাজাও সৈন্য৷ রাবণের মতো বিশ্বজয় করব!

'মধ্যরাত্রে রাজার ঘুম ভেঙে গেল৷ শুনলেন নারীকন্ঠে কে গাইছে সেই গান-

'আমার সকল ভয়কে দূর করো হে মৃত্যুঞ্জয়৷ আমাকে রাক্ষসত্ব থেকে রক্ষা করো হে চিরসুন্দর চির পবিত্র!

'রাজা চিৎকার করে উঠল-কল্যাণী!

'কল্যাণী রাজার ছোটো মেয়ের নাম৷ তাই তো, তার কথা তো মনে হয়নি৷ কোটাল, নিয়ে এসো৷ কল্যাণীকে নিয়ে এসো৷

'কোটাল ছুটে গেল৷ ফিরে এসে বলল, মহারাজ, তাকে তো পেলাম না৷ তিনি আমাদের প্রমত্ত ঘুমের মধ্যে কোথায় চলে গেছেন৷

'চলে গেছেন?

'হ্যাঁ৷

'কল্যাণী চলে গেল? রাজার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল৷

'কোটাল বলল-মদ আনব?

'না৷ বসে থাকতে থাকতে চিৎকার করে উঠল রাজা-কল্যাণী, ফিরে আয়৷

'কে যেন ফিসফিস করে বলল-তোমাদের রাক্ষসত্ব যেদিন মোচন হবে সেদিন সে ফিরবে৷

'সে কবে?

'যেদিন সত্যকারের মানুষ এসে এ রাজ্যে পদার্পণ করবে এবং তোমাকে জয় করবে সেই দিন৷

'কিন্তু তুমি কে?

'আমি এ দেশের দেবতা-বিবেক৷ আমি বিদায় নিয়ে যাচ্ছি৷ যাবার সময় বলে যাচ্ছি-

'রাজা চিৎকার করে উঠল-দেখো তো কোটাল, কে কোথা থেকে লুকিয়ে কথা কয়?

'তন্নতন্ন করে খুঁজল কোটাল৷ বলল-কেউ তো নেই মহারাজ!

'উত্তম! সকাল বেলাতেই তুমি কাউকে পাঠাবে-আমাদের পাশের রাজ্য থেকে মানুষ নিয়ে এসো৷

'যে আজ্ঞে মহারাজ৷

'পরদিন মানুষকে ধরে আনা হল৷

'রাজা বললেন-আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে তোমাকে৷

'সে ভয়ে চিৎকার করে উঠল-হে মহারাজ, তুমি অজেয়৷ আমি কী যুদ্ধ করব তোমার সঙ্গে?

'তবে হার মানো! স্বীকার করো আমার শ্রেষ্ঠত্ব!

'তুমি শ্রেষ্ঠ-তুমি শ্রেষ্ঠ-তুমি শ্রেষ্ঠ!

'দাও, একে ধনরত্ন দাও৷ এবং দাসখত লিখে নাও৷ বলে হা-হা করে হেসে উঠল রাজা৷

'এমনি করে দিনের পর দিন৷ রোজ মানুষ ধরে আনে, স্বেচ্ছায়ও আসে, দাসখত লিখে দিয়ে ধনরত্ন নিয়ে ফিরে যায়৷ দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর৷ অন্যদিকে বিশ্বপৃথিবীর বুক চিরে উঠছে রাশি রাশি সম্পদ৷ আর অস্ত্রের পর অস্ত্র নির্মাণ চলছে৷ অজেয়ত্ব বজায় রাখতে হবে৷

'চলে গেল ষোলো বছর৷ ষোলো বছর পরও সেই একধারায় চলছিল রাজ্য৷ মানুষ এসে দাসখত লিখে ধনরত্ন প্রসাদ নিয়ে চলে যায়৷ সকাল হতে-না-হতে এই যে তোরণ-এরই দরজায় মানুষের ভিড় জমে৷ তারা জয়ধ্বনি তোলে-জয় রক্ষরাজের জয়৷ তুমি শ্রেষ্ঠ তুমি শ্রেষ্ঠ তুমি শ্রেষ্ঠ!

'ষোলো বছর পর সেদিন সকালে তাদের কন্ঠস্বর থামতেই ধ্বনি উঠল-জয় মৃত্যুঞ্জয়ের জয়, জয় অভয়ংকরের জয়! যে নির্লোভ সেই শ্রেষ্ঠ৷ যে মানুষ সেই শ্রেষ্ঠ৷ যে ভয়হীন সেই শ্রেষ্ঠ!

'ভীষণ হুংকার উঠল রাক্ষস-প্রহরীদের কন্ঠে-কে? কে? কে রে হতভাগ্য?

'ষোলো বছরের একটি ছেলে এগিয়ে এল, প্রসন্ন প্রশান্ত কন্ঠস্বরে বলল-আমি৷

'রাক্ষস-প্রহরীরাও হতবাক হয়ে গেল বিস্ময়ে৷ সুন্দর সুঠামগঠন একটি কিশোর, হাতে বীণা, গলায় মালা আর উত্তরীয়৷ পরনে শুভ্রশুচি বস্ত্র, ঠোঁটে হাসি৷ সে বলছে এই কথা!

'একজন বলল-কী বললি? কার জয়!

'সে প্রসন্ন হেসে বলল-মৃত্যুঞ্জয়ের জয়! অভয়ংকরের জয়!

'আর একজন প্রশ্ন করল-কে শ্রেষ্ঠ?

'যে নির্লোভ সেই শ্রেষ্ঠ৷ যে ভয়হীন সেই শ্রেষ্ঠ৷ যে মানুষ সেই শ্রেষ্ঠ!

সে কি আমি?

'রথ এসে দাঁড়াল৷ রাজা নামল৷ সংবাদটা ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে পৌঁছে গেছে রাজপুরী পর্যন্ত৷ রাজা মুক্ত অসি হাতে এসে উপস্থিত হয়েছেন-বর্বর বুদ্ধিহীন বালক! যা বলেছিস প্রত্যাহার কর!

'তা কেমন করে করব? মিথ্যা বলা হবে যে!

'মিথ্যা বলা হবে? আমি শ্রেষ্ঠ নই? এত সম্পদ এত প্রাসাদ এত সুখ কোথাও দেখেছিস?

'সম্পদ দিয়ে কি মৃত্যুকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়? প্রাসাদে যারা বাস করে তারা কি মরে না? আর সুখ? বলো তো রাজা তুমি এখানকার শ্রেষ্ঠ প্রাসাদে বাস করো, তুমি তো রাজা, তোমার সুখ কত? সুখ কি আছে? চিন্তা থাকলে সুখ থাকে না৷ তোমার চিন্তা নেই? অহরহ চিন্তা করো কি না-ভাব কি না কখন কে তোমার রাজ্য থেকে সমৃদ্ধ হবে-অধিক শক্তিশালী হবে৷ বলো?

'রাজা গর্জে উঠল-জানিস আমার কত শক্তি, কত অস্ত্র-

'হেসে উঠল বালক-কত শক্তি তোমার? যেসব অদ্ভুত অস্ত্র তোমার আছে তাতে তোমার মৃত্যু হয় না?

'কী? এর অর্থ কী?

'অর্থ সহজ৷ ভেবে দেখো যেসব অস্ত্র তুমি তৈরি করেছ অন্যকে মারবার জন্যে তা কি তুমি সহ্য করতে পার? তাতে কি তোমার মৃত্যু হবে না? যদি হয় রাজা, তবে এই অস্ত্র তুমি যখন তৈরি করেছ অন্যেও তা তখন তৈরি করতে পারে এবং তোমাদের উপর প্রয়োগ করতে পারে! পারে না?

'রাজার ক্রোধের সীমা রইল না, সে বলল-ওরে মূর্খ এর জন্য তোকে হত্যা করব আমি৷

'এই সত্য কথার জন্য আমাকে হত্যা করবে?

'হ্যাঁ৷ যে আমাকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার না করবে তাকে আমি হত্যা করব৷ তোর অস্ত্র থাকে তো যুদ্ধ কর৷

'অস্ত্র আমার নেই৷

'তবে এখনও স্বীকার কর৷

'না৷ তুমি রাক্ষস-স্বভাব পেয়েছ৷ তুমি লুব্ধ, তুমি উদ্ধত, তুমি ভীত৷

'তোর ভয় নেই?

'না৷ কারণ আমি মানুষ৷

'অস্ত্র তুলল রাজা-তবে এই তার শাস্তি!

'ছেলেটি বুক পেতে দাঁড়াল৷ রাজার অস্ত্র নামল৷ বুকে লাগল৷ রক্ত ঝরতে লাগল৷ বালক পড়ে গিয়েও গাইতে লাগল-

'আমাকে লোভ জয় করতে শক্তি দিয়েছ, আমাকে নির্লোভ করেছ, হে রাজাধিরাজ৷ তুমি ধন্য৷ আমাকে অভয় দিয়ে নির্ভয় করেছ-হে অভয়ংকর মৃত্যুঞ্জয় তুমি ধন্য৷

'রাজার বুকের ভিতরটা তোলপাড় করে উঠল-এ কে? এ কে? এ কোন গান?

'সমস্ত লোকের বুকও সঙ্গেসঙ্গে তোলপাড় করে উঠল৷ এ কী গান-এ কে?

'কী সুন্দর গান-কী সুন্দর বালক!

'রাজার চোখে জল এসেছে-সেই জলে-ধোওয়া চোখে তিনি কী দেখছেন? এ কার মুখ?

'ছেলেটির কন্ঠ ক্ষীণ হয়ে এসেছে তবু গাইছে-আমাকে রাক্ষসত্ব থেকে রক্ষা করেছ হে সুন্দর-তুমি ধন্য হে প্রভু, বিশ্বের যেখানে রাক্ষসত্ব আছে-তাকে তোমার স্পর্শে অমৃত করো মনুষ্যত্বে পরিণত করো৷

'দরদর ধারায় চোখ থেকে জল নামল রাজার৷ তিনি চিৎকার করে উঠলেন-কল্যাণী- কল্যাণী-কল্যাণী মা!

'কল্যাণী এসে দাঁড়াল! তপস্বিনী৷

'বাবা!

'এ কে?

'আমার ছেলে৷ তোমার দৌহিত্র!

Cov123

'বুক চাপড়ে কেঁদে উঠল রাজা, হায়-হায়-হায়৷ সারা রাজ্য হায় হায় ধ্বনিতে ভরে উঠল৷ চোখের জলে ভাসতে লাগল সকল বুক৷

'দেখতে দেখতে রাক্ষসত্বের মোচন হল৷

'রাজা শুধু আছাড় খেয়ে পড়ে আর উঠলেন না৷

'এদিকের তাকে রাজার সেই দেহ রেখেছে আরকে ডুবিয়ে৷ ওই সেই মারণাস্ত্র৷ ওদিকে সেই দৌহিত্রের উত্তরীয় বস্ত্র বীণা৷ সিংহাসনে রেখে দিয়েছে৷ মানুষ রাক্ষস হয় কর্মদোষে ভবানন্দ-আবার মানুষই তাকে মুক্ত করে! তাই-তাই রয়েছে ফাটকে৷ এ যত স্বাভাবিক ভবানন্দ, তত আশ্চর্য৷ এখন চলো চটিতে গিয়ে রান্নাবান্না করি-হাতমুখ ধুই৷'

'কাশী কত দূর দাদাঠাকুর?'

'অনেক৷'

'চলো, জলদি চলো৷ রান্না সেরে খেয়ে নিয়ে আবার চলো৷ দেখব আরও কত আশ্চর্য পথে অপেক্ষা করে আছে৷'

'পেয়ারা পেঁড়া?'

'সে তো কাশী পৌঁছে৷ শেষ আশ্চর্য৷'

আশ্বিন ১৩৬৯

সকল অধ্যায়
১.
চাং
২.
হাবুর বাবুগিরি
৩.
ভবম হাজাম
৪.
হুড়ুকবাজ সিং
৫.
হাতির ভয়
৬.
বোকা তাঁতি
৭.
ঝানু চোর চানু
৮.
বাঘ মামা
৯.
শ্বেতব্রাহ্মণের উপাখ্যান
১০.
এক হল দুই
১১.
রামভজনের ঘোড়া কেনা
১২.
দাশুর কীর্তি
১৩.
বুনো মোষ পোষমানা
১৪.
ষর্ণশের্ণ
১৫.
নেড়ুর ভয়
১৬.
হেঁড়ে-গর্জন দৈত্য
১৭.
চোর আর ঠগ
১৮.
আলি ভুলির দেশে
১৯.
বড়ো গদাই আর ছোটো গদাই
২০.
পুরস্কার
২১.
হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি
২২.
ঠেকে শেখা
২৩.
যুদ্ধের গল্প
২৪.
বন্ধুর দান
২৫.
মানুষের ইতিহাস
২৬.
সূর্যমুখীর কথা
২৭.
ন্যাপলা
২৮.
খেয়ালহারা
২৯.
পরিবর্তন
৩০.
আচ্ছা জব্দ
৩১.
সে
৩২.
মিষ্টি মুখ
৩৩.
চিচিং ফাঁক
৩৪.
অপরূপ রাজ্য
৩৫.
গরিবের দান
৩৬.
চোর ধরা
৩৭.
ময়ূরপঙ্খি
৩৮.
সম্পাদকের সমস্যা
৩৯.
তাইতো
৪০.
লাঠি-সমস্যা
৪১.
খুকির নাম
৪২.
স্বপ্নাদ্য ঔষধ
৪৩.
অজানা কুটুম
৪৪.
রায় মহাশয়ের গল্প
৪৫.
সমরের ষড়যন্ত্র
৪৬.
সুধাং-অ্যাং
৪৭.
ফাঁকিবাজের শিক্ষা
৪৮.
ঘঙ্গোপাধ্যায়
৪৯.
নিশুর বিপদ
৫০.
ফুটবল ম্যাচ
৫১.
এক ভাল্লুকের গল্প
৫২.
কৃপাময়
৫৩.
সেজমামার চন্দ্রযাত্রা
৫৪.
রূপসায়রী
৫৫.
দুই পড়শি
৫৬.
সন্দেশের চিঠি
৫৭.
সদাশিবের ঘোড়া-ঘোড়া কাণ্ড
৫৮.
ভবানন্দের কাশীযাত্রা
৫৯.
প্রথম পুরস্কার
৬০.
কালো মানিক
৬১.
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা
৬২.
গোবিন্দ গোয়েন্দা
৬৩.
দুগ্যো সদ্দার
৬৪.
ক্যাপ্টেন মুকুন্দরাম
৬৫.
অসমঞ্জবাবুর কুকুর
৬৬.
পিপীলিকা আতঙ্ক
৬৭.
মরুপ্রাসাদের রহস্য
৬৮.
সাতজনের তিনজন
৬৯.
গোরুর বিচার
৭০.
সংস্কার
৭১.
গঙ্গোত্রীর মহাপুরুষ
৭২.
মিনিয়েচারের বোম্বাই যাত্রা
৭৩.
চিতা কাহিনি
৭৪.
বটুকেশ্বরের আবির্ভাব
৭৫.
নিবারণের সমস্যা
৭৬.
ফোর্থ টেস্ট
৭৭.
টাক এবং ছড়ি রহস্য
৭৮.
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং
৭৯.
ভোটরঙ্গ
৮০.
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
৮১.
পাগলা গণেশ
৮২.
সেতু বন্ধন
৮৩.
চিপুরি বিলের মহাশোল
৮৪.
রামেশ্বরের অসমাপ্ত কাজ
৮৫.
বলো তো কে এসেছিল ডিনারে
৮৬.
বোকা রাজার বুদ্ধিমতী রানি
৮৭.
টিপলুর ইতিহাস চর্চা
৮৮.
সোনার মেডেল উধাও
৮৯.
তুতানের বন্ধু
৯০.
ভূত মরলে কী হয়
৯১.
কথারা সব বেরিয়ে পড়েছিল
৯২.
বড়দার কবে ভালো লাগবে
৯৩.
শিবের অসাধ্যি
৯৪.
জয়রামের সিন্দুক
৯৫.
সংবাদের নেপথ্যে
৯৬.
নাড়কান্ডার নানাকাণ্ড
৯৭.
করণপুরার টাঁড়
৯৮.
সাঁঝবাতি
৯৯.
ক্রিকেট খেলার উপকারিতা
১০০.
অলক্ষ্যে হাসে মহাকাল
১০১.
লেখক-পরিচিতি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%