অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
তোমরা কি মাকড়সাকে ভয় পাও? আমি জানি ছোটো ছেলেরাই মাকড়সাকে ভয় করে৷ কিন্তু আমাদের 'নেড়ু' এত যে বুড়ো ঢেঁকি হয়েছে তবু তার মাকড়সার ভয় আর গেল না৷ যদি কোনো ঘরে একটা মাকড়সা দেখা যায়, তাহলে কার সাধ্যি নেড়ুকে সে ঘরে ঢোকায়৷ যতক্ষণ না সেই মাকড়সাকে একেবারে গুঁড়িয়ে ছাতু করা হবে ততক্ষণ নেড়ুর আর শান্তি নাই৷ যদি কেউ তার কানের কাছে এসে শুধু বলে 'মা-ক-ঈ' তাহলেই তো হয়েছে, চেঁচিয়ে-মেচিয়ে সে একেবারে হুলুস্থুল বাধিয়ে তুলবে৷ আর মাকড়সা বাবাজিও নেড়ুকে চিনে বসেছে৷ যত মাকড়সার গুষ্টি, আর মাকড়সার মামা খুড়ো মেসো পিসে, সব কি নেড়ুর উপর লাফিয়ে পড়ে? একবার নেড়ু এক বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গেছে৷ পোলাও মাংসে চর্ব্যে চোষ্যে পাতাখানা একেবারে ভরে গিয়েছে, নেড়ু তো জিভের জল সামলাতে পারে না৷ হাঁ করে সে হাত বাড়িয়ে যেমনি নাকি খেতে যাবে অমনি এক চিৎকার৷ পাশের লোকেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, লোকজন সব দৌড়ে এসে নেড়ুকে তুলে জল দেয় বাতাস করে৷ একজন বলল, 'নিশ্চয় গলায় কাঁটা লেগেছে'-বলেই সে গলার মধ্যে আঙুল ঢোকাতে গেছে৷ তখন নেড়ু অনেক কষ্টে বলে উঠল, 'মা-মা-মাকড়সা-পোলাওয়ের পাশ দিয়ে একটা মাকড়সা হেঁটে গেল'৷ শুনে সবাই যত হাসে, অভিমানে নেড়ুর গাল ততই ফুলে ফুঁপিয়ে ওঠে৷
ক্লাসের ছেলেরাও যখন-তখন নেড়ুকে জ্বালায়৷ একদিন নেড়ুর বন্ধু বুড়ো বলল, 'ভাই, আজ তোর জন্য এক কৌটো মশলা এনেছি, খাবি?' নেড়ু তো মহা খুশি৷ সে যেমন কৌটোখানি খুলেছে ওমনি কিলবিলিয়ে দুটো মাকড়সা তার গায়ের উপর লাফিয়ে পড়েছে৷ নেড়ু তো বেঞ্চি ডিঙিয়ে কালি উলটিয়ে বই ছিটিয়ে 'ফিট' হবার জোগাড় করে আর কি! মশলা খাওয়া তো চুলোয় গেল, লাভের মধ্যে কালি উলটানোর দরুণ এক ঘণ্টা কোণে দাঁড় খেতে হল৷
সব চেয়ে মজা হয়েছে, একদিন তো নেড়ুবাবু স্নানের ঘরে স্নান করতে ঢুকেছেন, হঠাৎ তার হাউমাউ কান্না আর চিৎকারেতে ঘরদালান সব কেঁপে উঠল৷ পাশের উঠোনে কতকগুলি রাজমিস্ত্রি কাজ করছিল, তারা সব দৌড়ে এল, ঠাকুর রান্না চড়িয়েছিল, সে তো 'কঁড় হউছি' বলে রান্না ফেলে লাফিয়ে এল, বাড়ির লোকে সব তো হাজির হলই, বাইরের কয়েকটি ভদ্রলোকের নেমন্তন্ন ছিল, তাঁরা পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন৷
সবাই বাইরে থেকে জিজ্ঞাসা করে, 'কী হয়েছে রে নেড়ু?' নেড়ুর আর কোনো কথাটি নাই, কেবল চিৎকার৷ নেড়ুর বড়ো দাদা ধমক দিয়ে বললেন, 'কী হয়েছে কী, দরজাটা খোল না দেখি৷' নেড়ু তখন বলে উঠল, 'দরজা খোলা যাচ্ছে না, দরজার ওপর মা-ক-ড়-সা৷' দাদা বলল, 'মাকড়সা তো কী হয়েছে? তাড়িয়ে দে না৷' নেড়ু বলল, 'ওই ওই-ওই আমার দিকে তাকিয়ে আছে! তুমি শিগগির একটা মই দিয়ে দরজার উপরের ফাঁক দিয়ে ঢোকো৷' শেষটায় সত্যি সত্যি নেড়ুর দাদাকে তাই করতে হল৷ নেড়ুর মা তখন নেড়ুকে কত বকলেন, বললেন যে, 'মাকড়সা তাকিয়ে থাকলে কী হয় বাপু?' নেড়ু অনেকক্ষণ পরে বলল, 'আমি দেখেছি মাকড়সা যার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, তার হাত-পা কেমন অবশ হয়ে যেতে থাকে, শেষটায় অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে৷ এরকম করে মাকড়সা মানুষকে 'হিপনোটাইস' করতে পারে, আমি যদি না চেঁচাতাম নিশ্চয় আমাকেও 'হিপনোটাইস' করে ফেলত৷'
তোমরা ভাবছ এটা একটা গল্প৷ কিন্তু তা নয়, এর মধ্যে অনেকখানিই সত্যি৷ তবে যার কথা বলছি, তার নামটা অবশ্য নেড়ু নয়৷ তার নাম হচ্ছে-থাক, আর নাম করে দরকার নেই৷
শ্রাবণ ১৩২৬

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন