অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
নতুন সিংহাসনে বসেই, রাজা দেশের যত বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের এক মস্ত সভা আহ্বান করে বললেন, 'দেখুন, সমস্ত পৃথিবীর মানুষের ইতিহাস আমায় একখানা তৈরি করে দিতে হবে৷ সময় যত লাগে লাগুক-কিন্তু কিছু যেন বাদ না যায়৷ একেবারে নিখুঁত হওয়া চাই৷'
কুড়ি বছর পরে একদিন, পণ্ডিতেরা রাজদরবারে এসে হাজির হলেন৷ পেছনে বারোটা উটের পিঠে পাঁচ-শোখানা করে কেতাব!
দলপতি কিছুক্ষণ বক্তৃতা করে, সেই ছ-হাজার পুঁথি রাজার সামনে ধরে দিলেন৷
রাজা রাজকার্যে গলদঘর্ম-ইতিহাসের বহর দেখে তাঁর তো চক্ষুস্থির৷ বললেন, 'দেখুন, যৌবন তো অনেক দিন পেরিয়েছি-এই ছ-হাজার বই পড়বার সময় এ-জীবনে হওয়া অসম্ভব৷ কিন্তু বাদসাদ দিয়ে বইগুলো একটু ছোটো করে আনতে পারবেন না৷'
'আজ্ঞে হাঁ! নিশ্চয় পারব!'
পণ্ডিতেরা বিদায় নিলেন৷
আরও কুড়ি বছর গেল৷ অনেক পরিশ্রমের পর পণ্ডিতেরা ছ-হাজারকে কমিয়ে পনেরো-শোয় দাঁড় করিয়ে, তিনটে উটের পিঠে বোঝাই করে রাজার কাছে এসে উপস্থিত হলেন৷
রাজা বললেন, 'হ্যাঁ, তা কমেছে বটে, কিন্তু আমার বয়স যে অনেক বেড়ে গেছে৷ দেড় হাজার বই পড়বার সময় কি হবে? যদি পারেন তবে আরও কিছু ছোটো করে আনুন৷'
দশ বছর পর পণ্ডিতেরা আবার হাজির-একটা বাচ্চা হাতির পিঠে পাঁচ-শো বই চড়িয়ে৷
রাজা বুড়ো হয়ে গেছেন৷ বললেন, 'আমার মরবার তো আর বেশি দেরি নেই! আরও সংক্ষেপ করুন৷'
পাঁচ বছর পর একজন পণ্ডিত, হাতে একখানা বই নিয়ে লাঠি ভর দিয়ে রাজবাড়িতে এসে উঠলেন৷
একজন রাজকর্মচারী বলল, 'ও, সেই ইতিহাস? তা, শিগগির করুন-রাজা মৃত্যুশয্যায়-'
পণ্ডিত রাজার বিছানার কাছে যেতেই রাজা বললেন, 'হায়! মানুষের ইতিহাস না জেনেই আমায় মরতে হল!'
বুড়ো পণ্ডিত বললেন, 'না না-আমি তিন কথায় সে ইতিহাস আপনাকে বলছি! মানুষ জন্মে-কষ্টভোগ করে-তারপর মরে!'
(পারস্য দেশীয় আখ্যন হইতে)
অগ্রহায়ণ ১৩৩১

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন