অশোককুমার মিত্র, প্রসাদরঞ্জন রায়
এক দর্জি৷ তার খুব নাম ডাক, এমনকী বাদশার দরবারেও খুব খাতির৷ বাদশার যত পোশাক-আশাক সেই তোয়ের করে৷
তার এক কামার বন্ধু আছে৷ সে রাতদিন লোহা পেটে আর কাস্তে কোদাল গড়ায়৷ দুই জনে খুব ভাব৷
একদিন দুইজনে তর্ক লেগেছে৷ দর্জি বলছে, 'আমি বড়ো৷' কামার বলছে, 'আমি বড়ো৷' কিছুতেই আর এর মীমাংসা হয় না৷ খাঁটি বিচার পেতে হলে বাদশার কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ কাজেই শেষকালে তারা চলল বাদশার কাছে৷ বাদশা বললেন, 'তোমরা দু-জনেই বলছ, নিজে বড়ো৷ এর মীমাংসা তো শুধু কথায় হয় না, কাজে দেখাতে হবে৷ তোমরা কে কী কাজ করতে পারো তার প্রমাণ দেখাতে হবে, তবেই বিচার চলবে৷'
দু-জনেই রাজি হয়ে ঘরে ফিরে এল৷
উজির-নাজির পাত্র-মিত্র নিয়ে মস্ত সভা করে বাদশা বসেছেন৷ কামার আর দর্জিও এসেছে৷ তাদের কাজের পরীক্ষা হবে৷ কামার একটা লোহার শাল মাছ আর তার ছোটো পোনা তৈরি করে এনেছিল৷ সেগুলো একটা চৌবাচ্চার মধ্যে ছেড়ে দিল৷ কী আশ্চর্য! ছেড়ে দিতেই সেই লোহার মাছগুলো চুলবুল করে বেড়াতে লাগল৷ বাদশা উজির-নাজির সভাসদগণ তো অবাক৷ সকলে হাজার মুখে তার তারিফ করতে লাগলেন৷
তারপর, এবার দর্জির পালা৷ দর্জি কাপড়ের একটা ময়ূর তৈরি করে এনেছে-এমন সব রংবেরঙের কাপড় যে, নকল ময়ূর বলে ধরতে পারা যায় না৷ দর্জি তখন ময়ূরকে ছেড়ে দিল৷ কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার! ময়ূরটা পেখম মেলে নাচতে লাগল; তারপর গিয়ে ডানার ঝাপটা দিয়ে শাল মাছটাকে ওপরে তুলে খেয়ে ফেলল৷ আর পোনাগুলোকে তো খুঁজেই পাওয়া গেল না৷ পাত্র-মিত্র উজির-নাজির সকলে জয়জয়কার দিয়ে উঠল৷
বাদশা কিন্তু প্রশংসা করলেন না৷ বললেন, 'কাপড়ের ময়ূরের প্রাণ হয়েছে, লোহার শাল মাছেরও তো প্রাণ ছিল, সুতরাং দু-জনেই সমান গুণী৷ এতে দর্জি প্রশংসা পাবার যোগ্য নয়৷' সকলে বললেন, 'ঠিক ঠিক৷'
দর্জি বলল, 'বাদশা নামদার, আমার ময়ূরের আরও একটা ক্ষমতা আছে-বারো দিনের ছেলে যদি কোথাও পাওয়া যায়, আমায় আনিয়ে দিন, ময়ূর পিঠের ওপরে নিয়ে উড়ে যাবে৷'
বাদশার হুকুমে তখনই সিপাই-পাইক ছুটল৷ খোঁজ খোঁজ সারা রাজ্য তোলপাড় করে ফেলল, কোথাও বারো দিনের শিশু ছেলে পাওয়া গেল না৷ সিপাই-পাইক এসে সে কথা বাদশাকে খবর দিল৷ বাদশা বললেন, 'আমার ঘরে বারো দিনের ছেলে আছে; তাকেই নিয়ে এসো৷'
আঁতুড় ঘরে বারো দিনের বাদশাজাদা বেগম সাহেবার কোল আলো করে আছে! সিপাই-পাইকরা এসে বাদশার হুকুম জানিয়ে তাকে নিয়ে গেল৷ দর্জি হাত পেতে তাকে কোলে নিয়ে ময়ূরের পিঠে শুইয়ে দিল৷ বাদশাকে বলল, 'শাহানশাহ, গোলামের বেয়াদবি মাফ করবেন৷ ময়ূর এই শিশুকে নিয়ে উড়ে যাবে-কিন্তু যদি ফিরে না আসে-তাতে আমার কোনো কসুর নেই৷'
বাদশা খানিকক্ষণ কী ভাবলেন৷ তারপর বললেন, 'বেশ, তাই৷'
দর্জি তখন ময়ূরকে ইঙ্গিত করতেই ময়ূরটা উড়ে উঠে সাত বার সেখানেই ঘুরল, তারপর প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে কোথায় যে উড়ে চলে গেল তার আর দিশে পাওয়া গেল না৷
বাদশা বললেন, 'দর্জির ক্ষমতাই বেশি, সুতরাং সে-ই বড়ো৷' নিজের পরাজয়ে কামার বেচারির মুখ কালো হয়ে গেল৷ দর্জি খুশি মনে বাদশাকে কুর্নিশ জানাল৷
এক মালিনী৷ তার মালঞ্চ শুকিয়ে গেছে৷ বারো বৎসর তাতে ফুল ফোটে না-দোয়েল শ্যামা শিস দেয় না৷ মালঞ্চে কত আগাছা জন্মেছে, কাঁটায় পথ ঢেকেছে৷ সাপ-শিয়ালের বাসা, বারো বৎসর সেখানে মানুষের পা পড়ে না৷ বাদশার মহলে মালিনী ফুল জোগাতে পারে না৷ সুতরাং কষ্টে তার দিন যায়৷
সেদিন ভোর হতে-না-হতে হাজার মৌমাছি আর ভ্রমরের গুঞ্জনে তার ঘুম ভেঙে গেল৷ ব্যাপার কী! মালিনী ধড়মড় করে কবাট খুলে বাইরে এসে একেবারে অবাক৷ রংবেরঙের লাখো ফুলের আভায় মালঞ্চ উজ্জ্বল৷ তার মুখে হাসি, চোখে হাসি-কী করবে ভেবে পায় না৷ পড়শিদের ডেকে দেখাতে লাগল৷ পড়শিরা বলল, 'মালিনী, তোর বরাত ফিরেছে৷'
ধুলোয় ভরা মাকড়সার বাসা ফুলের সাজিটা ঝেড়ে মুছে এনে ফুল তুলতে লাগল৷ এ গাছের একটা ও গাছের দুটো-সাজিটা প্রায় ভরে ভরে, এমনি সময়ে তার নজর পড়ল- এক সোনার চাঁদ শিশু এক ময়ূরের বুকের কাছে শুয়ে হাত-পা নেড়ে খেলা করছে৷ এত রূপ যে তার দিকে চাইলে চোখ ধেঁধে যায়৷ কোনো দেবতা না পরি তার সাথে ছলনা করছে৷ মালিনী ফুলের সাজিটা একপাশে ফেলে দিয়ে সাততাড়াতাড়ি গিয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে ময়ূরটাকে সাথে করে ঘরে এল৷
পড়শিরা সুধাল, 'এ ছেলে কার, কোথায় পেলি?' মালিনী মিথ্যা কথা বলল, 'এ আমার বোনপো৷ সাতকুলে তো কেউ নেই; বোন মারা যাবার সময়ে একে আমায় দিয়ে গেছে৷'
মালিনীর আর কোনো কষ্ট নেই৷ বাদশার মহলে রোজ রোজ ফুল জোগায়৷ ঘি খায় আর দুধ দিয়ে হাত ধোয়৷
বাদশাজাদা মালিনীর আদরযত্নে ষোলো কলার চাঁদের মতন দিন দিন বাড়তে থাকে৷ মালিনী সোহাগ করে তার নাম রাখল 'রাফান'৷ ছ-সাত বছর যেতে না যেতে মালিনী তখন রাফানকে লিখতে পড়তে পাঠাল৷
রাতের পর দিন, আর দিনের পর রাত, এমনি করে প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর৷ রাফান লেখাপড়া শিখে রূপে গুণে বড়ো হয়ে উঠল৷
সেই দেশের বাদশার মেয়ে শাহজাদি তুলাবতী পরম সুন্দরী৷ মেয়ের বয়স হয়েছে তবু তার বিয়ের কথা বাদশার মনেই নেই৷ রংমহলের সাত দেউড়ির পর যে মহল-সেই মহলের সাততলায় দাসী-বাঁদি নিয়ে সে থাকে৷ চাঁদ সূর্য ছাড়া অপর কারও মুখ তার দেখবার উপায় নেই৷ বাদশার হুকুম-কোনো পুরুষমানুষ সে মহলে গেলে বিনা বিচারে তার শিরচ্ছেদ৷
বাদশাজাদি তুলাবতীকে মালিনী ফুল জোগায়৷ মালিনীর কাছে তুলাবতীর রূপ-গুণের কথা রোজ রোজ রাফান শুনতে পায়৷ একদিন সে একটা বিনি সূতার মালা গেঁথে মালিনীকে বলল, 'মাসি, এই মালাটা তুমি আজ বাদশাজাদিকে দিয়ে এসো৷' মালিনী মালা দেখে মনে মনে খুশি হল, কিন্তু মুখে বলল, 'তুই কি মালা গাঁথতে জানিস? এ কি মালা হয়েছে না কিছু! ও আমি পারব না৷ শেষে বাদশা অসন্তুষ্ট হোক আর আমার চাকরিটা যাক!'
রাফান বলল, 'না, কিছু বলবে না মাসি, তুমি নিয়ে যাও৷' তার পীড়াপীড়িতে মালিনী আর কী করে, অগত্যা অন্যান্য ফুলের সাথে সেই মালাগাছটাও বাদশাজাদিকে দিয়ে এল৷
পরদিন আবার মালিনী ফুল নিয়ে যেতেই বাদশার মহলে তার ডাক পড়ল৷ মালিনী যেতেই বাদশা বললেন, 'মালিনী, বল তো এ মালা কে গেঁথেছে?' বলে রাফানের গাঁথা গতকালকার সেই মালাটা বের করে তাকে দেখালেন৷
মালা দেখেই মালিনীর মুখ শুকিয়ে গেল৷ না জানি কী অপরাধ-কী ত্রুটি বা হয়েছে৷ সে থতমত খেয়ে ভয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল৷
মালিনীর ভয় দেখে বাদশা তাকে অভয় দিয়ে বললেন, 'তোর কোনো ভয় নেই মালিনী, আমি কিছু বলব না৷ তুই আজ তেরো বছর আমাকে ফুল জোগাচ্ছিস, ফুলের মালা গাঁথছিস, কিন্তু এমনি করে বিনি সূতায় মালা গাঁথতে তো তোকে কোনো দিন দেখিনি৷ এ ক্ষমতা তোর হবে না৷ বল সত্যি করে, কে গেঁথেছে-আমি তোকে বকশিশ দেব৷'
পুরস্কারের লোভে মালিনীর মাথা বিগড়ে গেল৷ সে শেষ অবধি গোপন করতে পারল না৷ বলল, 'আমার এক বোনপো আছে, তার নাম রাফান-সেই গেঁথেছে৷' বাদশা বললেন, 'তাকে এক দিন নিয়ে এসো, আমি দেখব৷'
পরদিন রাফানকে আর ময়ূরকে সাথে করে মালিনী বাদশার দরবারে এসে সেলাম দিল৷ রাফানের দিকে চেয়ে বাদশা অবাক হয়ে গেলেন৷ এত সৌন্দর্য মালিনীর বোনপোর কী করে হয় তাই তিনি ভাবতে লাগলেন৷ তারপর মালিনীকে বিদায় দিয়ে রাফানকে বাদশা নিজের খাসকামরায় নিয়ে এলেন৷ জিজ্ঞাসা করলেন, 'মালিনী কি তোমার আপন মাসি?'
রাফান বলার আগেই ময়ূর তার জবাব দিল৷ বলল যে, সে সত্যি সত্যিই মালিনীর বোনপো নয়, পুব দেশের বাদশার ছেলে৷ সেখান থেকে কপাল দোষে কী করে সে মালিনীর মালঞ্চে এল-সব কাহিনি ময়ূর একে একে বলে গেল৷
বাদশা সব কথাই খুব গম্ভীর হয়ে শুনলেন৷ শুনে খুবই খুশি হলেন৷ তিনি মালিনীর বাড়িতে রাফানকে আর যেতে দিলেন না, নিজের প্রাসাদেই খুব খাতিরযত্ন করে রেখে দিলেন৷ তারপর বাদশা আর বেগম দু-জনে অনেক ভাবলেন-অনেক চিন্তা করলেন৷ তারপর, খুব ধুমধাম আমোদ-আহ্লাদ করে রাফানের সাথে তুলাবতীর বিয়ে দিলেন৷
দিন যায় দিন আসে৷ বাপ মা-র কথা শুনে অবধি রাফানের মনটা তাঁদের দেখবার জন্য ছটফট করে৷ একদিন কথাটা সে ময়ূরের কাছে পাড়ল৷ ময়ূর অমনি রাজি হয়ে গেল৷ একদিন শ্বশুর আর শাশুড়ির কাছে বিদায় নিয়ে সে ময়ূর চড়ে দেশে রওনা হল৷
এত উঁচু দিয়ে ময়ূরটা উড়ে চলেছে যে, মেঘ এসে গায়ে লাগতে লাগল৷ এইসব দেখছে আর বাদশাজাদি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠছে৷ কিন্তু তার আবার ভয়ও করছে-কী জানি হঠাৎ যদি ময়ূরের ওপর থেকে নীচের মাটিতেই পড়ে যায়, তাহলে হাড়গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে৷
যেতে যেতে একটা চর৷ সেই চরের ওপরে এসে ময়ূরটা নামল৷ সে চরে না আছে লোকজন না আছে কিছু৷ মানুষজন কেউ কোনোদিন এসেছে কি না তারও কোনো চিহ্ন নেই৷ যেদিকে তাকানো যায়-শুধু বালি আর বালি, তারপরে সমুদ্দুরের নীল জল চারিদিকে থইথই করছে৷ সেই চরে তুলাবতীর দু-টি যমজ ছেলে হল৷
আহা! ছেলে তো নয় যেন পূর্ণিমার চাঁদ! তুলাবতী ছেলে দুটোর চাঁদ মুখের দিকে চেয়ে সব ভুলে গেল৷
কিন্তু খাবারদাবার তো কিছুই নেই৷ সেই জনশূন্য চরে কেই-বা দানাপানি দেয়-আর কেই-বা তাঁদের পানে ফিরে তাকায়৷ রাফান তুলাবতীকে বলেকয়ে বুঝিয়ে ময়ূরে চড়ে গ্রামের দিকে গেল-একটু দুধ-টুধ, একটু খাবার আনতে পারে কি না৷
ময়ূর যেখানে এসে নামল, সে গাঁয়ে এক গেরস্থের বাড়িতে সেদিন খুব ভোজ হচ্ছিল৷রাফান পাড়াময় ঘুরেফিরে, কোথাও কিছু না পেয়ে সেই বাড়িতে গিয়ে উঠল৷ ময়ূরটাকে একটা বট গাছের ওপরে বসিয়ে রেখে গেল৷ মনে ভাবল, চেয়েচিন্তে কিছু সংগ্রহ করে সেই বট গাছতলায় এসে ময়ূরে চড়ে ফিরে যাবে৷
এমন সময়, সেই বট গাছতলার পথ দিয়ে এক তিরন্দাজ শিকারি চলেছে৷ সে ময়ূরটাকে দেখতে পেয়ে তাকে লক্ষ করে তির ছুড়তে লাগল৷ তির লাগতেই ময়ূরটা নীচে পড়ে গিয়ে ছটফট করে মরে গেল৷ শিকারি ময়ূরটাকে আর নিল না, সে তাকে অমনি অবস্থাতেই ফেলে রেখে চলে গেল৷
ওদিকে খাবারদাবার নিয়ে এসে রাফান ময়ূরটাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল৷ সে বুক চাপড়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল৷ সেই সাতসমুদ্দুরের চরায় সে ফিরবে কী করে! খাবারদাবার সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে পাগলের মতন হয়ে ছুটে চলল৷ কোথায়-বা তার স্ত্রী, কোথায়-বা ছেলে দুটো, আর কোথায়-বা সে!
এক প্রহর যায়, দুই প্রহর যায়-তুলাবতী স্বামীর পথের দিকে চেয়ে বসে রয়েছে৷ কিন্তু স্বামী তো আর আসে না৷ মাথার ওপরে রোদ্দুর আগুন ঢালছে আর ওদিকে খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে৷ সে আর কী করবে? অনেকক্ষণ পথ চেয়ে বসে থেকে যখন দেখল যে, স্বামী আর কিছুতেই এল না, তখন সে মহা ফাঁপরে পড়ল৷ বালুর চরার ওপরে কচি ছেলে দুটোকে শুইয়ে রেখে সে কাপড়চোপড়গুলো নিয়ে সমুদ্দুরের জলে ধুতে গেল, ঠিক সেই সময় সেখান দিয়ে এক দুষ্টু সওদাগর চলেছে বাণিজ্য করতে৷ তুলাবতীকে দেখে সে তাকে ধরে জোর করে পানসিতে তুলে নিয়ে নিজের দেশের দিকে চলল৷ তুলাবতীর কান্নাকাটি কিছুই সে শুনল না৷
এদিকে হয়েছে কী-এক গোয়ালার গোরু রোজ সেই চরায় চরতে আসে৷ ছেলে দু-টিকে দেখে তার কী মনে হল, সে তাদের দুধ খাইয়ে গেল৷ এমনি করে রোজই দুধ খাইয়ে যায়! তাই গোয়ালে দুধ দোহালে তার আর আগের মতন দুধ হয় না, রোজই দুধ একটু কম হয়৷ গোয়ালা বেচারি কিছুই ভেবে ঠাহর করতে পারল না৷ মনে করল, একদিন সে গোরুটার পিছু পিছু গিয়ে দেখবে, কোথায় গোরুটা সারাদিন কী করে৷
পরদিন গোরুটা ছেড়ে দিয়ে সে পিছু নিল৷ গোরুটা নদী সাঁতরে একটা চরে গিয়ে উঠল৷ গোয়ালাটা নজর করে দেখল-গোরুটা নীচু হয়ে কাকে যেন দুধ খাওয়াচ্ছে৷ সেও তখন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে চরে গিয়ে হাজির হল৷
দুটো ছেলে! আহা কী রূপ! যেন আকাশের চাঁদ খসে পড়েছে৷ গোয়ালার আর চোখের পাতা পড়ে না৷ সে তাড়াতাড়ি ছেলে দুটোকে বুকে তুলে নিয়ে ঘরে এল৷ গোয়ালিনি যেন সাত রাজার ধন মানিক কুড়িয়ে পেল৷ তারা আদর করে শিশু দুটোকে লালনপালন করতে লাগল৷
সুখে হোক দুঃখে হোক দিন বসে থাকে না, একরকম করে কেটেই যায়৷ তুলাবতীর দিনও কোনোরকমে কাটছে৷ এমনি করে বারো বৎসর গেল৷ সেই সওদাগর উৎপাত শুরু করে দিল-যেমন করেই হোক-শিগগির তাকে শাদি করা চাই৷
একদিন তার আয়োজনও হল৷ বহু দেশের নবাব-বাদশা আমির-ওমরাহদের নিয়ে এক মস্ত বড়ো সভা বসল৷
এ দিকে সেই যে বাদশাজাদা রাফান-সে তো তার ছেলে দুটো আর তুলাবতীকে হারিয়ে একেবারে পাগলের মতন হয়েছে৷ রাতদিন কেবল তুলাবতীর কথা ভেবে কাঁদে৷ সেই সভায় পাগলের মতন ছেঁড়াখোঁড়া কাপড়জামা নিয়ে সেও একটি কোণে এসে চুপটি করে বসেছে৷ ভেবেছে, কোনো ভোজ-টোজ হবে বোধ হয়৷
তুলাবতী অন্দরমহলের জানলা থেকে উঁকি দিয়ে লোক দেখছিল৷ হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়েই চমকে উঠল-এই তো তার স্বামী! সে ধীর ভাবে সভায় এসে হাজির হল৷ সভায় আমির-ওমরাহদের ডেকে ধীর গলায় বলল, 'আমার একটা নালিশ আছে-আপনারা বিচার করুন৷' সকলে বলল, 'কী নালিশ বলুন৷'
তুলাবতী বলল, 'আমার স্বামী এখনও বেঁচে আছেন৷ তিনি থাকতে আমি আরেক জনকে কী করে বিয়ে করি?'
সকলে বলল, 'ঠিক, ঠিক! তা আপনার স্বামী কোথায় আছেন?'
তুলাবতী বলল, 'তিনি এখানেই আছেন৷'
সওদাগর এবং অন্য সকলে চমকে উঠল৷ বলল, 'কোথায়?' তুলাবতী তখন রাফানের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে নমস্কার করল৷ রাফানও এমন হঠাৎ স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল৷
সকলে সেই পাগলের মতন লোকটাকে দেখে বলল, 'এই আপনার স্বামী! কী ব্যাপার?' যা যা ঘটেছিল তুলাবতী তখন সকল কথা তাদের কাছে বলে গেল৷ তাদের ছেলে দুটো যে সেই সুমুদ্দুরের চরায় না খেতে পেয়ে মরে গেছে-এই কথা বলে সে কাঁদতে লাগল৷
ঠিক সেই সময়ে সভার মাঝখান থেকে দুটো ছেলে এসে তুলাবতী আর রাফানকে প্রণাম করল৷ মায়ের প্রাণ, তখনই দেখেই তাদের চিনতে পারল৷ কিন্তু তবু হঠাৎ না জেনে না শুনে কী করে ছেলে বলে মেনে নেয়৷
তখন সেই ময়ূরটা প্যাঁক প্যাঁক করে উড়ে সভার মাঝখানে এসে নামল৷ বলল, 'আমি মরিনি৷ তির লেগে কাতর হয়ে পড়েছিলাম, এক দরবেশ আমাকে জিইয়ে দিয়েছে৷ . . . এ দুটো আপনাদের সেই ছেলে, গোয়ালার ঘরে এরা মানুষ হয়েছে৷'
তুলাবতী আর রাফান ছেলে দুটোকে বুকে জড়িয়ে ধরল৷ সকলে আনন্দে জয়জয়কার দিয়ে উঠল৷ বাদশা নবাব যাঁরা নিমন্ত্রণে এসেছিলেন, তাঁরা সেই দুষ্টুবুদ্ধি সওদাগরকে বন্দি করে যাবজ্জীবনের জন্যে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দিলেন৷
তুলাবতী আর ছেলে দুটোকে নিয়ে শাহজাদা রাফান দেশে রওনা হল৷
সেই যে বাদশা আর বেগম, তাঁরা তো বুড়ো হয়ে গেছেন৷ তাঁদের আর ছেলেপুলে হয়নি৷ একমাত্র সেই বারো দিনের ছেলেকে হারিয়ে অবধি তাঁদের মনে সুখশান্তি নেই৷
একদিন ময়ূরতক্তে বসে বাদশা বিচারআচার করছেন, হঠাৎ এমনি সময়ে রাফান, তার স্ত্রী ছেলে দুটো আর ময়ূর-সবাই এসে বাদশাকে সেলাম করল৷ বাদশা তো চিনতেই পারেন না৷ ময়ূরের মুখে তাদের পরিচয় পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেললেন৷ মহল থেকে বেগম ছুটে এলেন৷
তারপর?-
তারপর আর কী! বছর কয়েক পরে বুড়ো বাদশা আর বেগম দু-জনেই মারা গেলেন৷ শাহজাদা রাফান তখন বাদশা হয়ে ছেলেপুলে আর তুলাবতীকে নিয়ে মনের সুখে রাজত্ব করতে লাগল৷
চৈত্র ১৩৩৯

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন