মরীচিকা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি এই সব কথা খুব সাহস করে লিখে রেখে যাচ্ছি, আমার পরে যারা আসছে তাদের জন্যে। যদি হাতে আসে অবশ্যই পড়বেন। এই জায়গাটার নাম পৃথিবী। পৃথিবী বিশাল বড় একটা জায়গা। আমরা প্রত্যেকেই এক একটা দেশে আসি। সেই দেশের কোনও এক জেলায় যে কোনও একটা পরিবারে আমাদের আবির্ভাব হয়। কিছুকাল থাকার পর আমরা আর থাকি না। গ্রামবাংলায় বলে, পটল তোলা। আপনাদের সঙ্গে আর আমার কোনও কথা নেই। এইবার আমার কথা ভগবানের সঙ্গে। পৃথিবীতে অনেক জ্ঞানী, গুণী মানুষ আছে, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, তাঁরা সব কাজ ফেলে একটা রহস্যই ভেদ করতে চান, পৃথিবীটা কার? সমাধান কেউই খুঁজে পাননি। মাঝখান থেকে অদৃশ্য একজন বেরিয়ে এসেছেন, যাঁর নাম, ভগবান, গড, আল্লা। তিনিই জীবের অভিভাবক। সে যাই হোক, যাঁকে দেখা যায় না, তিনি থাকলেই বা কি, আর না থাকলেই বা কি! তবু তাঁর জন্যে লেখা রইল এই রচনা।

শুনুন ভগবান, আপনার এই রচনা, যাকে ইংরেজরা বলে 'ক্রিয়েশান', বাঙালিরা বলে 'সৃষ্টি', তার রহস্যটা আমি আমার মতো করে ধরে ফেলেছি। এটা আপনার ব্যাবসা। আপনি একজন চাষা। পৃথিবী আপনার জমিদারি। সকালে যেমন বাড়ি-বাড়ি পলিপ্যাকে করে দুধ দিয়ে যায়, সেইরকম কুড়ি মাইক্রনের একটা পলিপ্যাক, মানে থলেতে, খানিক জল ভরে এতটুকু একটা প্রাণ যার গর্ভে ভরে দেন, তিনি হলেন জননী। ছাগল, গাধা, গরু, ঘোড়া সকলেরই এইরকম জননী আছে।

ইংরেজিতে বলে র-স্টক। চাষা বলেন বীজ। এই বীজ আপনি আকাশ থেকে পাঠান না। পৃথিবীতে 'অটোমেটিক ম্যানুফ্যাকচার' হচ্ছে। কবে কোন কালে হাজার হাজার বছর আগে একজন পুরুষ আর একজন নারীকে আপনার এই পৃথিবীতে একা ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্যই প্রমাণ মাপের দুজনকে নয়। ওই ভ্রূণের আকারেই দুটি গর্ভের প্রয়োজন হয়েছিল।

সেই দুই নারী আবার কে? কোথা থেকে তাঁরা এলেন! একজন পুরুষেরও তো প্রয়োজন। আপনি যে 'প্রসেসে' জীবন সৃষ্টি করেন বিজ্ঞানীরা তা জেনে ফেলেছেন। আপনার কোনও তুলনা নেই ভগবান। আদি রহস্য প্রকৃতই রহস্য। যতই ভাবা যায় ততই মাথা খারাপ হয়ে যায়। প্রথম পুরুষটি কী ভাবে ঝেড়েঝুড়ে মাটি থেকে উঠল। তারপর হাজার হাজার বছর ধরে এক থেকে কোটি হল। জীবনবিজ্ঞানীরা বললেন—ছিলে বাঁদর হলে মানুষ। বাঁদর যদি মানুষই হল, তাহলে পৃথিবী জুড়ে এত বাঁদর পড়ে রইল কী ভাবে! যাক গে, আদি কথা আদিতেই থাক। মানুষ যখন হয়েই গেছি তখন বাঁদরের কথা না ভেবে, মানুষের বাঁদরামির কথাই ভাবি।

মানুষের টানে মানুষ আসে। তাই তো? কে আর শখ করে অনিশ্চয়তায় ভরা এই জায়গায় আসতে চায়! পরিকল্পনাটা অতি অদ্ভুত। এই প্রক্রিয়ায় একটি ছেলে চাই আর একটি মেয়ে চাই। তার অভাব নেই। যেই যৌবন এল, অমনি শুরু হল কোকিলের কুহুকুহু। এ চাইবে ওকে, ও চাইবে একে। এ আবার অভিভাবকদের সহ্য হবে না। মানুষের মধ্যে, যেমন প্যাকেটের মধ্যে সাদা সাদা সিগারেট থাকে সেইরকম চরিত্র নামের একটা সাদা স্টিক কে বা কারা ভরে দিয়েছেন। দেখা যায় না। অদৃশ্য। সমাজপিতারা সেটিকে নিয়ে শাস্ত্র তৈরি করেছেন। সে আজ নয় বহু দিন আগে। সেই শাস্ত্রের নাম নীতিশাস্ত্র। সেই শাস্ত্র অনুসারে, একটা ছেলে যদি একটা মেয়ের সঙ্গে নির্জনে মেলামেশা করে, তাহলে এদেশের ওই শাস্ত্র অনুসারে ছেলেটিকে চরিত্রহীন বলা হবে। এখন দেখতে হবে, অগ্রণীর ভূমিকা কে নিয়েছিল। যদি মেয়েটি নিয়ে থাকে, তাহলে তাকে বল হবে দুশ্চরিত্রা, একেবারে বাজে মেয়ে। ছেলেধরা। একাল প্রেমের কাল। প্রাচীনরা সব মরে হেজে যাচ্ছে। নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পেরে, ধাক্কা খেতে খেতে, অপমানিত হতে হতে, নিজের সংসারে, অথবা বৃদ্ধাশ্রমে হেঁচকি তুলতে তুলতে হাওয়া হয়ে যাচ্ছেন। এখন নিরালা প্রেমের হিড়িক পড়েছে। অবৈধ প্রেমের বাৎসরিক উৎসবের নাম ভ্যালেনটাইনস ডে।

আগে আড়ালে-আবডালে স্ত্রী-পুরুষের মেলামেশা হত। ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাত। কেউ আসছে কি-না! কেউ দেখে ফেললে কি-না! সামান্য একটু ছোঁয়াছুঁয়ি। অল্প-স্বল্প অসংলগ্ন কথা। একসময় অল্প বয়সে মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে চালান করে দিয়ে বাবা, মা নিশ্চিন্ত হত। জেলাশহরের ছেলেরা কলকাতার কলেজে পড়তে আসত। জমিদার পয়সাওলা ঘরের ছেলেরা, রাখাল যেমন গরু চালায় সেইরকম ইয়ার-বকসিদের চরাত। সেতার, সরোদ না সেধে কাম সাধত। মেয়ে শিকারই ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ শিকার।

ভগবানের এই পৃথিবীতে দুটি জিনিস নিয়ে সেই পুরাকাল থেকেই মহা অশান্তি। কামিনী আর কাঞ্চন। এই দুটোর জন্যে আসা, পেলে আনন্দ, না পেলে হতাশা। অবশেষে খেল খতম, পয়সা হজম। আগেও ছিলে না, পরেও নেই। মাঝখানে একটা রেখা। ভল ভল করে ভলকে ভলকে লোক আসছে, কল কল করে কলের জলের মতো বেরিয়ে যাওয়া। এ এক তামাশা। এরই নাম জীবন।

কোনও কোনও শাস্ত্র বলছেন, এটা নেই। এ হল মায়া। আমরা কেউ জন্মাইনি। আর যখন জন্মই হল না, তখন আবার মৃত্যু কীসের? তাও তো বটে! নার্সিং হোমে মিনিটে মিনিটে কারা ট্যাঁ, ট্যাঁ করে উঠছে! আর শ্মশানে, শ্মশানে, 'বলো হরি, হরিবোল', চিৎকারে কী ঢুকছে? শাস্ত্রকে নমস্কার, ভগবানকে নমস্কার। যা হল বললেই হল। ভগবানের নামে সবই চালিয়ে দেওয়া যায়। দশটা হাত, বারোটা হাত। চারটে মাথা, পাঁচটা মাথা। নিজের মুণ্ডু ধড় থেকে খুলে রক্তপান। স্বামীর বুকের ওপর জিভ বের করে উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা। মানুষের মুণ্ডু কেটে গলায় মালা। হাতে ঝুলছে বাঁধাকপির মতো স্পেশাল একটা মুণ্ডু। চেনার চেষ্টা করি, লোকটা কে? বাঙালি না অবাঙালি? পাপী অথবা পুণ্যবান? মাঝে মাঝে মনে হয় মায়ের হাতের মুণ্ডুটা আমারই মুণ্ডু। এটা ভাবলে আমার বেশ গর্ব হয়। আর কিছু না হোক মা কালীর হাতের কাটা মুণ্ডু তো হতে পেরেছি! ভগবানের পৃথিবীতে যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন কালীমন্দিরে মায়ের হাতে আমার মুণ্ডুটি ঝুলে থাকবে। ঈশ্বর যদি আমাকে মানুষ না করে ছাগল করতেন তাহলে কোনও এক বাজারে আমাকে কেটেকুটে ঠ্যাঙে বেঁধে ঝুলিয়ে দিত একশো কুড়ি টাকা কেজি। ওই একবারই ঝুলতুম, চিরকাল এইভাবে মায়ের হাতে দোল খাবার সুযোগ হত না।

মানুষ কেন জন্মায় এর ওপর আমি একটা থিসিস লিখতে চাই। মানুষ দুভাবে আসে। এক প্রেমের পথ ধরে। আর এক ঘৃণার পথ ধরে। দুটি চরিত্র চাই, ক আর খ। ক হল একটি ছেলে, আর খ হলো একটি মেয়ে। ধরা যাক ক কলেজে পড়ে। আর খ-ও সেই কলেজে পড়ে। খ একদিন সালোয়ারকামিজ পরে ওড়না উড়িয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে হেঁটে গেল। ক তেমন ভাবে দেখল না কিন্তু দেখল। এরপর ক চলে গেল তার বাড়িতে। বইপত্তর খুলে পড়তে বসল। হঠাৎ দেখল সেই মেয়েটা তার বইয়ের পাতার ওপর দিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে গেল। আবার কিছুক্ষণ পরে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেল। ক মনে মনে বললে, এই কী হচ্ছে? সামনে পরীক্ষা, ভীষণ প্রতিযোগিতা, ভালো রেজাল্ট করতেই হবে। তা না হলে দৌড় থেকে ছিটকে যাব। কেরিয়ারের বারোটা বেজে যাবে। তোমাকে আমি চিনি না, কেন তুমি আমাকে এইভাবে আক্রমণ করছ?

ক জানে না তার ভেতরে অদৃশ্য অনেক বাদ্যযন্ত্র আছে। কোনটা কেন বাজে ক জানে না। জানার চেষ্টাও করে না। এইবার হল কি ক-র ভীষণ ভালো লাগতে লাগল। একটা মেয়ের কাছে ইতিহাস দর্শন অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞান, পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান কিছুই কিছু নয়। মেয়েটি এইবার তার বইয়ের ডানদিকের পাতার ওপর বসে পড়ল। ক দেখছে টিকলো নাক ছোট্ট কপাল লম্বা লম্বা চুল দুষ্টু দুষ্টু চোখ গোল গোল হাত ভরাট বুক গাঢ় নিতম্ব। ক অসুস্থ হয়ে পড়ল। মনে হতে লাগল একটা ছেলে আর একটা মেয়ে—এরই নাম সংসার! আর অনেক সংসার নিয়ে এই পৃথিবী। কোন রাজা কবে কোন রাজ্য জয় করেছেন, কোন নেতা ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কোন রাজনৈতিক দল কোন দলকে খাবলে-খুবলে দিয়েছে এইসব জেনে কী হবে। একটা মন যদি আর একটা মনের কাছাকাছি এসে পরস্পর পরস্পরকে জয় করতে পারে তাহলে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কী আছে! জ্ঞান তো একটাই, এই অচেনা পৃথিবীতে তুমি আমার আর আমি তোমার।

সেদিন হয়তো বসন্তকাল। মাঘের শেষ ফাল্গুনের শুরু। আবার দ্বাদশীর চাঁদ আকাশে। তিনতলার ঘর। সামনে খোলা জানলা। একটা ফাঁকা মাঠ। বড় বড় কয়েকটা গাছ। মাঠের ওপারে একজোড়া রেললাইন। বাঁদিকে একটা মন্দিরের চূড়া। তার ওপর চাঁদের আলো উপুড় হয়ে আছে। ডানদিকে স্টেশন। সিগনালের আলো। শেষ ট্রেন যাচ্ছে। কারা সব চলেছে কোথা থেকে কোথায়।

ক হঠাৎ কবি হয়ে গেল। পড়ছিল বিজ্ঞান, সে সব ঠেলে সরিয়ে দিল। ক বুঝতেও পারল না এসব ঈশ্বরেরই চক্রান্ত। তিনি নিজেই তো এক বাউন্ডুলে প্রেমিক! স্রষ্টাকে তো প্রেমিক হতেই হবে। তাঁর সেই ইচ্ছাটাই তো মানুষের ভেতরে বসে আছে। তা না হলে মেয়েদের এত সুন্দর করার কী প্রয়োজন ছিল? ক-কে কাবু করার জন্যেই তো খ-এর সৃষ্টি। যেতে যেতে একবার মাত্র তাকিয়ে ছিল। ক হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ পড়তে শুরু করল। তিনিও তো এক প্রেমিক। অবশ্য প্রেমটাকে দেহের ফ্রেম থেকে বের করে এনে জগতের বিশাল ক্যানভাসে আটকে দিয়েছিলেন নি:সঙ্গ উজ্জ্বল সন্ধ্যাতারার মতো। ক পড়ছে—

পাগল বসন্তদিন

কতবার অতিথির বেশে

তোমার আমার দ্বারে

বীণা হাতে এসেছিল হেসে

লয়ে তার কত গীত,

কত মন্ত্র মন ভুলাবার—

জাদু করিবার কত

পুষ্পপত্র আয়োজন ভার!

রাত যত গড়াচ্ছে আমাদের এই চরিত্র ক্রমশই একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। এখন দেখতে হবে খ-এর অবস্থাটা কী? সে হয়তো ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। কারণ একটাই—তারা শুধু চলে যায়, নাড়িয়ে দিয়ে যায়। নড়ে ওঠে ছেলেরা। তারা যেন বলতে চায়, 'প্রেমের হাতে ধরা দেব তাই রয়েছি বসে।' এই প্রেমের ব্যাপারটা কাব্য থেকে জ্যামিতিতে চলে যেতে পারে। হয়ে গেল একটা ত্রিভুজ। ওই খ-কে আর একটি ছেলে ভালোবাসতে পারে। হয়ে গেল ক খ গ মার্কা একটা ত্রিভুজ। এবার টানাটানি ফাটাফাটি।

এই ক-এর কলেজেই তার ওপরের ক্লাসে একটি ছেলে পড়ত। লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো। অধ্যাপকদের অতি প্রিয়। একদিন সকালে কলেজের সামনে পার্কে তার মৃতদেহ পাওয়া গেল। পার্কের বেঞ্চির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, ডান হাতটা পাশে ঝুলে পড়েছে। একটা আঙুল ছুঁয়ে আছে ঘাস। সারারাত শিশির পড়েছে তার শরীরের ওপর। প্রশান্ত নিদ্রা। সে তার সহপাঠিনী রেবাকে ভালোবাসত। রেবা কোনও অজানা কারণে ওই ক্লাসেরই শঙ্করকে ভালোবাসত। শঙ্কর আবার ভালোবাসত রেখাকে। রেখা ভালোবাসত অতনুকে। অতনু ভালোবাসত রমাকে। ইংরেজিতে একে বলে লুজ এন্ড। সবাই প্রেমের মধ্যে রয়েছে কিন্তু গাঁট বাঁধছে না। প্রেমের এই এক মহা সমস্যা। ধোঁয়ার মতো, কিছুতেই বোতলে ভরা যায় না।

প্রেমের আরও এক সমস্যা—অভিভাবক। মেয়ের বাবার ছেলের ঘর পছন্দ হচ্ছে না। আবার ছেলের বাবার মেয়েটির চালচলন পছন্দ হচ্ছে না। আলোচনায় এই রকমের কথা শোনা যায়—ওই মেয়ে! ও কোনওদিন ভালো হত পারে না। ওর মা হল ছেলেধরা আর বাপটা পরস্ত্রীকাতর। তা না হলে এই বয়েসের একটা লোক চুলে কলপ, মুখে পাউডার! চোখের তলা দুটো দেখেছ! প্যাড তৈরি হয়ে গেছে! তার মানে ভুঁড়িতে কত মাল ঢুকছে বুঝতে পারছ! আর মা-টাকে দেখেছ? ববছাঁট চুল, ঠোঁটে লিপস্টিক—মেয়ের বয়েসের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছে। না না, এই ফ্যামিলির মেয়েরা কোনওদিনই সুবিধের হবে না। আমাদের ছেলেটার পালক ছাড়িয়ে তন্দুরি বানিয়ে দেবে। ছেলের মা বলবেন—সুব্রত যদি এই বিয়ে করে তাহলে বউ ওই সদর দিয়ে ঢুকবে, আমি খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে যাব। কত্তা বললেন—তুমি চলে গেলে আমি থাকব কোথায়? গিন্নি বললেন, তুমি ছেলের বউয়ের পায়ে তেল দিয়ে যদ্দিন পারো চালাবে তারপরে চলে আসবে আমার কাছে—সেই ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো! কত্তা বললেন, তুমি যাবে কোথায়? গিন্নি বলবেন, শ্মশানে। কত্তা জিগ্যেস করবেন, জ্যান্ত থাকবে না পেত্নি—না জিগ্যেস করছি এই কারণে তালে আমাকে তো ভূত হয়ে যেতে হবে—জ্যান্ত গেলে তো ঘাড় মটকে দেবে। এতদিন দাঁত দিয়ে চিবিয়েছ, ঘাড়ে হাত দেওয়ার সাহস হয়নি। গিন্নি একগাল হেসে বললেন—না গো, আমাদের কালের প্রেম সে যেন ছাইচাপা আগুন। তোমার অপেক্ষায় আমি শ্যাওড়া গাছে পা ঝুলিয়ে বসে থাকব। তবে একটা কথা জেনে রাখো গলায় দড়ি না দিলে ভূত হওয়া যায় না। আমি একটা শাড়ি রেখে যাব। গলায় দড়ি না দিলে সেইটাই গলায় দিও। কত্তা প্রেমে উদ্বেল হয়ে বলবেন—মালিনী এত প্রেম তোমার ভেতর! তাহলে এসো না দুজনেই একসঙ্গে ঝুলে পড়ি। শাড়ির এদিকে আমার গলা আর ওদিকে তোমার গলা। গিন্নি বলবেন—তাহলেই হয়েছে, মরব আমি, তোমার সত্তর কেজি আর আমার চল্লিশ কেজি। তুমি মাটিতেই থাকবে মাঝখান থেকে আমিই ঝুলে মরব। আমি তোমার অর্ধাঙ্গিণী আর হতে পারলুম কই। এক-চতুর্থাঙ্গিনী হয়ে রইলুম।

একালে এক একটি পথ খুব খুলেছে। সে পথটি হল দুজনে মিলে সোজা চলে যাও ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে। বিয়ে করে বসে পড়ো পাশাপাশি, বন্ধুবান্ধবরা সাপোর্ট করবে। অভিভাবকরা ওল্ড ফুলস! ঈশ্বরের এই সৃষ্টিতে বিয়ের মতো বেপরোয়া ব্যাপার আর দুটি নেই। অনেকটা গলায় দড়ি দেওয়ার মতো ঝুলে পড়ো—পিছে দেখা যায় গা। এই ব্যাপারটা নিয়ে সাহিত্যে খুব রগড়ারগড়ি আছে। মেয়েটি বড়লোকের ঘরের হতে পারে। ছেলেটি মধ্যবিত্ত। তাহলেই সিনেমার প্লট—বড়লোকের মেয়ে গরিবের ছেলেকে বিয়ে করেছে। এইবার বড়লোকের মেয়েটির অন্য একটি তেঁএটে মার্কা বড়লোকের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সে হয়ে গেল ভিলেন। হিন্দি ছবি হলে মেয়েটিকে একদিন গুণ্ডা দিয়ে তুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। অথবা তার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হত।

আর ছেলেটি যদি বড়লোকের হয় তাহলে সে অবশ্যই তেজ্যপুত্র হবে। আর মেয়েটি তখন তার সঙ্গে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামবে। এমনও হতে পারে ছেলেটি কোথাও চাকরি না পেয়ে কুলিগিরি করছে। আর মেয়েটি হয়েছে বড়লোকের বাড়ির আয়া। সেখানে একদিন বাড়ির কত্তা রেপ করার চেষ্টা করবে। যখন প্রায় ঠেসে ধরেছে তখনই এন্ট্রি নেবে অমিতাভ বচ্চন। ঘুষির পর ঘুষি। কত্তা শিবনেত্র। সামনে ঝুলছে আধহাত জিভ। মরে গেলে পরের জন্মে নির্ঘাৎ একটি লেড়ি কুকুর।

তাহলে প্রেমের পরিণতি কী? পরীক্ষায় যদি এমন কোনও প্রশ্ন আসে, তাহলে উত্তর হবে এইরকম—হয় বিবাহ না হয় বিরহ। এই জগতে বহু বিরহী লোক আমি দেখেছি। বেশ একটা ভারিক্কি ভাব, মুখে একটা মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রাখেন, অনেকেই বেপরোয়া সমাজসেবা করেন। বছরে একবার ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। আর সমস্ত মানুষের দিকে অদ্ভুত একটা করুণার দৃষ্টিতে তাকান। যাঁরা তাঁকে জানেন তাঁরা বলেন ওঁর জীবনে মস্ত বড় একটা ট্র্যাজেডি আছে। যেন ট্র্যাজিক হিরো এইরকম একজনকে ধরে বসলে এটিই মানা যাবে—যৌবনে কোনও একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন কিন্তু বিয়ে হয়নি। অভিমানে আর বিয়েও করেননি। একা একা জীবন কাটাচ্ছেন। আর এইটাই তাঁর অহঙ্কার। ল্যাজকাটা শিয়ালদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ল্যাজওলা শৃগাল। এইরকম লোক ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক মানুষে পরিণত হন। এঁদের শেষটা কী হয় জানা যায় না।

আমরা এবার ক-এর কাছে আসি। ধরা যাক ক অনেক কসরৎ করে খ-কে বিয়ে করে ফেলল। পৃথিবীর নিয়মে জীবিকার ক্ষেত্রে দুজনেই নেমে পড়তে পারে। অথবা একজনে আর সেই একজন হল ক। ক আর খ দুজনেই যদি চাকরি করে তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই ক আর খ-এর মাঝখানে একটি ফাঁক তৈরি হবে। সেই ফাঁকের নাম সন্দেহ। খ সারাদিন বাড়ি থাকে না। কর্মের জগতে নানা পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা। ক-এর চেয়ে খ দ্রুত ওপরে উঠছে—কেন উঠছে? কী কারণ? এই কারণের ভাবনা সবসময়েই এক রাস্তাতেই ছোটে। সেটি হলো খ মহিলা। তাকে ঘিরে আছে কিছু পুরুষ। তাদের মধ্যে একটি পুরুষের প্রতিপত্তি অনেক বেশি। খ-এর বাড়ি ফিরতে ক্রমশই দেরি হয়। মাঝে মাঝে তাকে পার্টিতে যেতে হয়। সাজপোশাক ক্রমশই আকর্ষণীয় হচ্ছে। ভালো ভালো উপহার নিয়ে আসছে। কারণটা কী? জিগ্যেস করলেই অশান্তি। ক্রমশই কারণ জিগ্যেস করার প্রবণতা কমে আসছে। কারণ একটাই, সেটি হল টাকা। প্রেম এখন লোকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এইরকম বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে—সুন্দরী শিক্ষিতা চাকুরিজীবী পাত্রী চাই। পাত্র সরকারি অফিসার। এখন ঈশ্বরের এই দুনিয়াটাকে চালাচ্ছে একটি গোলাকার বস্তু, যার নাম টাকা। টাকায় সব কিছু হজম হয়ে যায়।

তা সে যাই হোক, আসল গল্পটা হল একটি পুরুষ আর একটি রমণী। ক আর খ। কয়েক বছরের ব্যবধানে ট্যাঁ করে অবতীর্ণ হবে একটি গ। আজকাল ওই একটিতেই সবাই সন্তুষ্ট। হঠাৎ আর একটিও হতে পারে। তাহলে সংসারটা দাঁড়াল ক খ গ ঘ। এইবার সম্ভাবনাটা এইরকম হতে পারে—একটি ছেলে একটি মেয়ে অথবা দুটি মেয়ে। আমাদের ঈশ্বর সংখ্যার দিকে নজর রেখে আদিকাল থেকেই এই ব্যবস্থা করে করেছেন—কৃষির ফল শাকসবজি ধান গম। আর প্রেমের ফল গোটাকতক মানুষ। কোনও কোনও ধর্মে পঞ্চাশ-ষাটটা ছেলেমেয়ে হয়ে যেতে পারে। তার কিছু মরে কিছু বাঁচে। যারা বাঁচে তারা বড় হয়ে মানুষ মারে। এদের ধর্মই হল মানুষ হয়ে মানুষ মারা। মাঝখানে একটা পোস্টার, সেটি হল ধর্মীয় বিদ্বেষ।

সবাই নাকি ঈশ্বর—ভগবানের সৃষ্টি। ভগবানের কাছ থেকে এসে ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়া। সাপের ডিম থেকে সাপ বেরোয়। পাখির ডিম থেকে পাখি। মানুষের ডিম থেকে রাক্ষস বেরোয় কী করে? মুলোর মতো দাঁত, গোল গোল চোখ, বড় বড় নখ। বাইরে সব দেবতার মতো, ভেতরে দানব। কোথাও যাত্রীবোঝাই ট্রেনে পেট্রল বোমা ছুঁড়ে আগুন ধরাচ্ছে। অ্যাসিড ছুঁড়ছে। জমিতে মাইন পেতে রাখছে। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র চালিয়ে নিরীহ মানুষদের ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। কচি কচি শিশুদের আগুনে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর হ্যা হ্যা করে হাসছে। ঈশ্বরকে তো আর দেখা যাবে না। প্রশ্নও করা যাবে না। তবে উত্তর দিয়েই রেখেছেন। তাঁর অসাধারণ এই সৃষ্টিতে কেউ কংস, কেউ কৃষ্ণ।

না, সবার আগে আমার জানার দরকার, আমি কোন কারণে, কী কারণে এসেছি, কোথা থেকে এসেছি? ধ্যান করো, ধ্যন করলে জানতে পারবে, কেউ আমাকে বলেছিলেন। এক ঋষি এলেন।

কে আপনি?

ব্যাসদেব। তোমার কৌতূহলের উত্তর দিতে এসেছি। ভালো করে শোনো— তোমার ওই দেহই সর্বদু:খের মূল। তোমার 'তুমি'টা ওই দেহের মধ্যে আষ্টেপৃষ্টে দু:খ, যন্ত্রণার ফাঁসে জড়িয়ে ত্রাহি ত্রাহি করছে।

প্রভু! আমি তো ইচ্ছে করে আসিনি ফর্ম ফিল-আপ করে! আমার জন্মের কারণ কি আমি?

আজ্ঞে হ্যাঁ, তোমার কর্মের ফল!

আমার কর্মের ফল? তা হলে আমি আমার আদিতে চলে যাই! আমাকে প্রথম কে এই কলে ঢুকিয়েছিল! সেই প্রথম পিতা কে? কর্মফল তো তার।

আমার কথাটা আমি বলে যাই, তারপর তুমি বসে বসে তর্ক করো ছোকরা। 'আমি'—এরই নাম অহঙ্কার। যেই 'আমি' বললে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল তোমার কর্ম। আমি করেছি, করছি, করব, একে বলে অবিদ্যা। লাল টকটকে গরম লোহা দেখেছ? অহংকার হলো ঠিক সেইরকম। সেই উত্তাপই হল তোমার প্রাণ।

এই অহংকারের জন্যে মানুষ নিজেকে মনে করে, সে একটা দেহ। আর সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হয় সুখ, দু:খ, জন্ম, মরণ। এসে যায় সংসার। দেহ খোলে আমির অহঙ্কার। সেই 'আমি'র নানা কর্ম ও কর্মফল। ভালো কাজের ভালো ফল, খারাপ কাজের খারাপ ফল। ভালো কর্মের পুণ্যে স্বর্গে গমন। মহাসুখ। পুণ্য যেন টাকা। সঞ্চিত অর্থ। স্বর্গে খরচ হচ্ছে। একদিন সব শেষ। তখন নিজের অনিচ্ছাতেই স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতন। এইবার সেই পতনের বিস্তারিত শোনো—প্রথমে পড়বে চন্দ্রমণ্ডলে। সেখানে তুমি যেন একটি শিশিরবিন্দু। এইবার যা ঘটবে তা ঘটবে গভীর রাতে। নিস্তব্ধ চরাচর। নিদ্রিত মানুষ। চারপাশে চাঁদের আলোক ফিনিক ফুটছে। চাঁদের আলোর রশ্মি ধরে ঝাঁকে ঝাঁকে শিশিরবিন্দু পৃথিবীতে নেমে আসছে নি:শব্দে।

পড়ছে কোথায়? ধানের শীষে। ধান থেকে চাল। চাল থেকে অন্ন। সেই অন্ন পুরুষের পরিপাকে বীর্য। এইবার নারীর প্রয়োজন। বীর্যধারী পুরুষের স্ত্রীসঙ্গে রমণীয় রমণ। ঋতুকালে স্ত্রীযোনিতে বীর্য সিঞ্চন। রজ আর বীর্যের মিলনে জরায়ুতে তৈরি হল কলল বা ভ্রূণ।

তুমি এলে। একটি 'আমি', একটি 'তুমি'র মিলনে তৈরি হল 'সে'। 'ক' আর 'খ', এসে গেল 'গ'। এইবার ঘড়ি চালু হল জরায়ুতে। টিক টিক ঘড়ি যদি ঠিক ঠিক চলে তাহলে পাঁচ রাত পরে তুমি একটি বুদ্বুদের আকার পাবে। অর্থাৎ তোমাকে ধারণ করে তোমার মা হলেন অন্ত:সত্বা। সাত রাত পরে তৈরি হল ডিমের মতো ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ড। মাংসপিণ্ড মানে পেশি। পনেরো দিনের মধ্যেই সেই পেশিপিণ্ডে রক্ত আসবে। রুধির পূর্ণ হবে। পঁচিশটি রাত্রি পার হলে ওই পিণ্ডে একটি অঙ্কুর বেরবে। যেমন ভিজে ছোলায় কল বেরোয়। এক মাস পরে তৈরি হবে গলা, মাথা, কাঁধ, পিঠ আর পেট। দু'মাসের মধ্যে এসে যাবে হাত পা, শরীরের দুটো পাশ, কোমর, হাঁটু। এ একেবারে অনিবার্য পরিণতি। এর কোনও ব্যতিক্রম হওয়ার উপায় নেই।

তিন মাসের মধ্যে শরীরের সমস্ত গাঁট তৈরি হয়ে যাবে। চার মাসে হাত আর পায়ের সব কটা আঙুল। পাঁচ মাসে তৈরি হয়ে যাবে নাক, কান, চোখ, দাঁত, নখ ও গুহ্যস্থান। ছ'মাসে পড়া মাত্রই কানের ফুটো স্পষ্ট হবে। এই মাসেই প্রকাশিত হবে স্ত্রী-পুরুষ ভেদে যোনি ও নাভি। সাত মাসে ফুটবে গায়ের রোম। মাথায় আসবে চুল। আট মাসে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একেবারে স্পষ্ট।

ইতিমধ্যে পাঁচ মাসেই তার চৈতন্য হয়ে গেছে। এই অবস্থায় সে খাদ্য পাচ্ছে কী ভাবে। নিজের নাভির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরু সুতোর মতো মায়ের একটি নাড়ি। মায়ের অন্নরসে গর্ভস্থ সন্তান পুষ্ট হয়। এই সময়েই তার পূর্বজন্মের সব কথা স্মরণে আসে। এর পর দশ মাসে এই জঠর যন্ত্রণার সমাপ্তি। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পালা।

ঋষি মানুষের জন্মবৃত্তান্ত জানিয়ে গেলেন। জানা রইল। এইটুকু বোঝা গেল, স্বর্গ হইতে চন্দ্রে পতন, তারপর শিশিরের মতো ঝরে পড়া। এক একটি শিশিরবিন্দু এক একটি ধান। আমি ধান্য, তুমিও ধান্য। বা:, চমৎকার। অন্নময় এই জগৎ, অন্নই প্রাণ, প্রাণই অন্ন। প্রাণবায়ু এই শরীর ত্যাগ করে মহাশূন্যের মহাবায়ুর অনন্ত প্রবাহের সঙ্গে মিশে যাবে একদিন। নশ্বরদেহ ছাই হয়ে যাবে আগুনে। ঋষির উপদেশ, স্মরণ করো ওঁ-ব্রহ্ম, স্মরণ করো কৃতকর্ম—তোমার কী করার ছিল, আর তুমি কী করেছ। তোমার ওই দেহ এল কোথা থেকে? মাটি, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ—এই পাঁচটি উপাদান। তুমি ভূত হলে, অদ্ভুত হলে, তারপর ভূত হয়ে গেলে। শরীরটা আর রইল না কায়ার বদলে ছায়া।

এসব বড় কথা ভাবলেও হয়, না ভাবলেও হয়। সংবাদপত্রে যা থাকে সেইটাই তো আমাদের জীবনকথা। ভারী মজার কথা। প্রথম পাতায় ট্রেন জ্বলছে। গোটা দশেক লোক পেট্রলবোমা মেরেছে, অ্যাসিড ছুঁড়েছে, কুপিয়েছে, খুঁচিয়েছে। অসহায় একদল নারী, পুরুষ, শিশু দলা পাকিয়ে কয়লা হয়ে গেছে। যারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড করল, আর যারা নিহত হল, তারা কে? তারা কারা? ঋষিবর! জবাব চাই, জবাব দাও। জানি কী বলবেন! প্রাজ্ঞ আত্মা, তিনিই সর্বেশ্বর, সকলের প্রভু, নিয়ন্তা, সর্বশক্তিমান। তিনি সর্বজ্ঞ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কিছু আছে কি যা তিনি জানেন না? তিনি অন্তর্যামী। বাইরের জগতে আছেন, আবার দেহজগতের ভেতরেও আছেন। আমাদের পরিচালনা করছেন।

গুজরাতে ট্রেন পুড়ল। আমেদাবাদে বদলা নিল একদল উন্মত্ত মানুষ। ঋষিবর! এইবার বলুন। জানি কী বলবেন—যাবতীয় বস্তুর উৎপত্তিস্থল এই আত্মা। যাবতীয় বস্তুর লয়স্থানও এই আত্মা। ঘটনায় শিহরিত, আতঙ্কিত হতে হতে বলি, ওঁ শান্তি: শান্তি: শান্তি:।

তা এই অপূর্ব পৃথিবী হাজার বছর আগে যা ছিল, যেমন ছিল, আজও তাই আছে, ভবিষ্যতেও সেই একই রকম থাকবে। সাজগোজ পালটাবে। রাতকে দিন করবে আলোর কেরামতি। এক মাসের পথ ছ'ঘণ্টায় যাওয়া যাবে কনকর্ড বিমানে। দোকানের বাহার যতই খুলুক, পণ্য সেই এক, চাল, ডাল, তেল, নুন, গম, জামা, কাপড়, জুতো। উলঙ্গ মানুষও মানুষ, প্যান্টুল পরা মানুষও মানুষ। স্বভাব সেই এক। সাপ সাপই থাকবে, বাঘ বাঘ। নানারকম ওষুধ বেরলেও অসুখ থাকবে। ওষুধ যত শক্তিশালী হবে, রোগও পাল্লা দিয়ে শক্তিশালী হবে। মানুষ মানুষকে লাঠিপেটা করে মারত, মারবে। একটু আধুনিক করার জন্যে, এ. কে. ফর্টিসেভেন ব্যবহার করবে। যা ছিল, তাই থাকবে।

ঈশ্বর! আপনার পৃথিবীতে নতুন কী করতে পেরেছেন বা পারবেন! মানুষ পুতুল নিয়ে বিরাট এক বালকের খেলা। মানুষের মডেল তো আর পালটাবে না! তবে একটা খেলা জবর খেলা, সেটি হল স্মৃতি মুছে দিয়ে মানুষকে পাঠানো। শিশু, কিশোর, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ, মৃত্যু। এই বড় হতে হতে, জানতে জানতে আগুনের দিকে এগোনো।

চার বৃদ্ধ যখন এক জায়গায়, তখন এইরকম কথা হতে পারে একটি শিশুকে দেখে, আমরাও একসময় এইরকমই ছিলুম। বলবেন—পবিত্র শিশু। শিশুরাই ভগবান। বক্তব্যকে পরিষ্কার করার জন্যে ইংরেজিতে একজন বলবেন--ইনোসেন্ট চাইল্ডহুড। আর একজন টেক্কা দেওয়ার জন্যে বলেবেন—কিংডাম অফ দি গড ইজ ওনলি অ্যাটেন্ড বাই এ চাইল্ড। আর এক বৃদ্ধ ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ছানি পড়া মরা মরা চোখে পথ দিয়ে চলে যাওয়া মেয়ের বয়সি এক সুন্দরী রমণীর দিকে তাকিয়ে অতীত ভাববেন—ফাল্গুন। বসন্ত। সানাই। রজনী আমোদিত রজনীগন্ধার গন্ধে। সালঙ্কারা মেয়েদের চটুল হাসিতে কাচ ভাঙার শব্দ! শোলার টোপরে অভ্রের চমক। শাড়ির কত রং—লাল, ফিরোজা, মেরুন, পিঙ্ক, ব্লু, জর্দা। নিটোল নিতম্ব, উদ্ধত বর্তুল বক্ষ, হাঁসের মতো গলা, শালুকের মতো হাত।

যা:, আর কদিন পরেই মরে যেতে হবে? সুখের দিন বুঝি প্রজাপতি। বিয়ের রাতের মেয়েটি সংসারে এসে স্বপ্নহারা! মনের রং বাইরে এলেই বিবর্ণ। আগুনে সব ঝলসে যায়। তবু এই তাঁর চক্রান্ত। বৃদ্ধ হয়ে জীবনকে চেনার আগেই যৌবন জড়াবে সাতপাকে।

আমি টেন, সে এইট। হঠাৎ মনে হয়েছিল, লেখাপড়াটা নীল আকাশের নীচেই জমবে ভালো। এমন কথা তারও মনে হয়েছিল অবশ্যই। এ বাঁশিতে চিরকালই যে ফুঁ দেয় সে বসে থাকে অন্য লোকে, কাব্য-কুসুমের মহা আয়োজনে। সে বসন্তের কোকিল হয়ে ডাকে। নদী হয়ে চাঁদের আলোয় অভ্র ছড়ায়। সে এলোচুল হয়ে চওড়া পিঠে স্বপ্ন ছড়ায়। সে ডুরে শাড়ি হয়ে তারে দোল খায়। সে মনভোলানো হাসি হয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে।

আবক্ষ পাঁচিলের ওপাশে আমি প্রথমে তার খোঁপা দেখেছিলুম। তখন আমি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় মজে আছি। ভেতরটা কেমন যেন উটের মতো হয়ে গেল। সাহারায় মরুদ্যান দেখছে। বিশাল আকাশ হয়ে গেল। ছোট্ট চিল হল। দিঘি, হল, পদ্ম হল। ছাত থেকে আর নামতেই ইচ্ছে করে না। যদি আবার আসে। যদি তাকায় একবার। ভাইব্রেশানে ভাইব্রেশানে মিলবেই। সেও ছটফট করছিল। সমস্যা ছিল একটাই। কে আগে কথা বলবে। লজ্জা ব্যবধান।

অবশেষে এক গোধূলি লগ্নে যা থাকে বরাতে আমিই প্রশ্ন করলুম কাঁপা কাঁপা গলায়, 'তোমার পরীক্ষা কবে?'

কী বাজে, বোকা প্রশ্ন। এইসব ব্যাপারে কথার কোনও মূল্য নেই। যা হয় একটা শব্দ হলেই হল। ইয়া হু, বলে চিৎকার করলেও ধরা যেত কে কি বলতে চাইছে। মেয়েটি পাঁচিলের কাছে সরে এসে মিষ্টি হেসে বলেছিল, 'নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে।'

এত বয়েস হল আমার, তবু সেই সব দিনের সব কথা আমার মনে আছে। সাত দিন আগের কথা আমার মনে থাকছে না। অ্যালঝাইমারস ডিজিজ। নাম ভুলে যাচ্ছি, ঠিকানা ভুলে যাচ্ছি। বইয়ের নাম ভুলে যাচ্ছি। যত ভুলছি, অতীত তত স্পষ্ট হচ্ছে। বুড়োরা বলছে বুড়োদের না কি এইরকমই হয়। অতীতে বিচরণ করে।

'তোমার নাম ছন্দা!'

'আমার দিদির নাম ছন্দা, আমার নাম তন্দ্রা।'

'সুন্দর নামটা তোমার।'

'মাসিমা রেখেছেন।'

ফুলের যেমন গন্ধ থাকে। চাঁপা, জুঁই, গোলাপ, করবী, রকমারি গন্ধ। মেয়েদেরও, বিশেষ করে কিশোরীদেরও সেইরকম নিজস্ব গন্ধ থাকে। মানুষও তো প্রাণী। প্রাণ আছে যার। বাঘের গন্ধ, ভাল্লুকের গন্ধ, পাখির নরম নরম গন্ধ, প্রজাপতির পাতা পাতা গন্ধ। তন্দ্রার গন্ধ ভেসে আসছিল। চুলের, ফ্রকের, শরীরের। এতদিন পরেও কোথাও সেইরকম গন্ধে নাকে এলে থমকে যাই। আমার প্রথম প্রেম ফিরে আসে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যথেমেটিকস, ইকনমিকস, এসব হল বিষয়কে বোঝার বৈষয়িক ব্যবস্থা। অবিষয়কে বুঝতে হলে হৃদয় খুলতে হবে। বেঁচে থাকার একটা বহির্মহল, অন্দরমহল আছে। জুতো খুলে মন্দিরে ঢোকার মতো, বিষয় ফেলে ঢুকতে হবে। সেখানে অকারণে কান্না, অকারণে হাসি।

মেয়েতে ছেলেতে ঘনিষ্ঠতা জানাজানি হবেই। উনুনে আগুন, ফোড়ন দিয়ে ডাল সাঁতলানো প্রতিবেশীরা জানবেই। একদিন রাতে একপশলা উপদেশ বৃষ্টি হল। ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপ:। মই দেখেছ, মই। ধাপে ধাপে। স্কুল। লেটার। কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্লাস। ডক্টরেট। চাকরি। পাকা চাকরি। সম্বন্ধ। বিবাহ। তখন তুমি লাইসেন্স হোল্ডার। একটা ঘর পেলে, একটা বউ পেলে। বিছানা, বালিশ, মশারি। তখন তুমি রাতে দরজা বন্ধ করতে পারো। সবাই জানে। তা জানুক। এইটাই নিয়ম। তখন তোমার অপবাদ রটবে না। সবাই জানে, তোমরা একই বিছানায় পাশাপাশি শোবে, কাছাকাছি হবে, ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর। তোমরা প্রেমের কথা বলবে। যে স্টিয়ারিং ধরেছে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, যে একটা মেয়েকে নিভৃতে ধরেছে তার ম্যারেজ লাইসেন্স আছে।

শোনো ছোকরা, তুমি বখে গেছ। ওই ছাতই হবে তোমার কেরিয়ারের সমাধি। একটা মেয়ের জন্যে তোমার জীবনে নেমে আসবে সর্বনাশ। কী আছে বাবা একটা মেয়েতে!

বয়েস যখন কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা রাখছে। চোখ দুটো যখন মণির মতো ঝকঝকে উজ্জ্বল, চুল কুচকুচে কালো, দাঁত ধবধবে সাদা, টুকটুকে লাল লিভার যা খায় তাই হজম করে। হৃদয় নতুন পাম্পের মতো রক্ত তোলে আর নামায়, ফুসফুস দমভোর বাতাস টানতে পারে, সেই বয়েসটায় তোমরা ফিরে যাও তবেই বুঝতে পারবে প্রেমিকা মেয়ে নয়, নদী, নীল আকাশ, বনানী, পাহাড়, ঝরনা, হোমানল, আশ্রয়, নির্ভরতা, সেবা, প্রতীক্ষা। বয়স্কের ঘোলাটে চোখে বোঝা যাবে না। সে চোখে মেয়ে হল পাপ। পুরুষের সর্বনাশ।

যাবতীয় উপদেশে কাজ হল না কিছুই। লুকোচুরিটাই বাড়ল। কখন একবার দেখা হবে, কোন ছলে। পাঁচিলের ওপাশ থেকে একটা হাত এগিয়ে এল, এক মুঠো লজেন্স। কখনও ছোট্ট একটা চিঠি। লেখার শেষে ফুটনোট, পড়ে ছিঁড়ে ফ্যালো।

এই যে এখন আমি যে জায়গাটায় বসে আছি বুড়ো হনুমানের মতো জরাগ্রস্ত শরীর নিয়ে, চারপাশে মুড়ি ছড়িয়ে, এই জায়গায় বসে বসে সেই দূর অতীতে আমি তন্দ্রাকে দেখতুম। ফ্রক ছেড়ে শাড়ি। বিনুনির বদলে খোঁপা। দেখতে দেখতে সে মেয়ে থেকে মহিলা। কলেজে ঢুকল। আর তখনই পরিবর্তনটা এল। কিশোরী থেকে যুবতী। মন হল বিষয়ী। দূরে সরছে। ছাতে কদাচিৎ ওঠে। পথে দেখা হলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। অনেক ভেবেচিন্তে মনে হয় ঠিকই সে করেছিল, প্রেমের চেয়ে বিষয় বড়।

তা ঠিক। কী-ই বা আছে আমার। তখনও ছিল না, এখনও তাই। তন্দ্রা বুঝেছিল, ছেলেটা কেরিয়ার তৈরি করতে পারবে না। সে এলেম নেই। ছাতটা আছে, পাঁচিলটা আছে, বাড়িটা আছে, স্মৃতি আছে। আর কিছুই নেই। তন্দ্রার দুই ভাই বসবাস করছে। বড় ভাইয়ের মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছে। রাস্তার একপাশ দিয়ে মাথা নীচু করে হাঁটে। সোজা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ঘুরে গিয়ে উলটো দিকে হাঁটা শুরু করে। ভদ্রলোক বড় অমায়িক ছিলেন। আমরা প্রায় সমবয়সি। কখনও পথেঘাটে দেখা হলে, কাছাকাছি সরে এসে কানে কানে বলে, মনে আছে তো! ভোলোনি।

বুঝতে পারি না, কী বলতে চাইছে! এইরকম নাকি, তন্দ্রাকে ভোলোনি? মনের ব্যাপার মানুষ সহজে ভুলতে পারে না। মন বেলাভূমি নয়, প্ল্যাস্টার অফ প্যারিসের ছাঁচ।

একজন আছে, যে আমার দেখাশোনা করে। সে আমার কল্পনা। যখন যা সাজাই তাই সাজে। কখনও মা, কখনও দিদি, কখনও স্ত্রী, কখনও বন্ধু। পরামর্শ করি, হুকুম করি, আবদার করি। হেরে যাব নাকি? মানুষের কাছে হাত পাতব, করুণা চাইব? কখনওই না।

এই যে সন্ধে হয়ে আসছে, একটু শীত শীত। আমার স্ত্রী এসে গায়ে একটা চাদর ফেলে দেবে। কাঁচাপাকা চুল। চোখে চশমা। প্রসন্ন হাসি। বয়েস হলেও বয়েসের ভারে নুয়ে পড়েনি। চাদরটা গুছিয়ে দিতে দিতে স্বগতোক্তির মতো বলবে, আর মিনিট পনেরো, তারপর ঘরে যাবে। কার্তিকের হিম গায়ে লাগাবে না। বয়েস হচ্ছে। ভুলে যেয়ো না।

আমি জানি এই বুড়োর জন্যে এই সাবধানবাণী বাতাসে ভাসছে, আমাকে ধরে নিতে হবে রেডিয়ো হয়ে। এমনি কত বাণীও আমার জন্যে আছে এই ইথার তরঙ্গে। ছেলেবেলায় ওই পাশের মাঠে যেখানে এখন নব্য বড়লোকদের ফ্ল্যাট উঠেছে সারসার, সেখানে যখন ডাংগুলি খেলতুম, তখন বাবা এসে শাসন করতেন, লেখাপড়া করে বড় হও তারপর গুলি খেলার অনেক সময় পাবে। এই ছাতে যখন ফ্যাঁচাত ফ্যাঁচাত করে সিকিতে ঘুড়ি হ্যাঁচকাতুম তখনও সেই এক শাসন, আগে কোনও রকমে বড় হও, তারপর যত খুশি ঘুড়ি উড়িয়ো, কেউ কিছু বলবে না। আমার বউ বলত, যতদিন আমি আছি ততদিন আমার কথা শুনে চলতে হবে, যখন আমি থাকব না তখন যা খুশি তাই কোরো। তা কি করা যায়? প্রেমের শাসন, প্রেমের শৃঙ্খল সোনার চেন হয়ে গলায় ঝোলে। কিছু করতে গেলেই মনে পড়ে যায়। যখন বেঁচে ছিল অবাধ্যতা করেছি। দু:খ দিয়েছি। এখন নেই। সে তো বাইরে নেই, বসে আছে ভেতরে। গাড়ির আরোহী এখন স্বয়ং চালক। ঈশ্বরকে একটা কারণে ধন্যবাদ, মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে এসেছিলুম বলেই না মায়াকে জানতে পারলুম, মোহিনী মায়া। আমি আমার শাসনকর্তাদের আকাশের দিকে তাকিয়ে এখন বলতে পারি, অভিভাবকগণ! আপনাদের কোনওরকম অসম্মান না করে নিবেদন করছি—

এখন আমার বয়েস হয়েছে, বুড়ো হয়ে গেছি। এখন আমি না ডাংগুলি খেলব, না ঘুড়ি ওড়াব, না যা খুশি তাই করব। তেঁতুলের আচার খাব। গরম আলুর চপ। না সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে সপ্তমী পুজোর দিন তন্দ্রাকে নিষিদ্ধ চুম্বন। ভিজে ভিজে ঠোঁট, হিলহিলে জিভ। তন্দ্রা দু'হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরেছিল। বুকে বুক লেগে গিয়েছিল। বিপুল আনন্দে আমাদের শরীর কাঁপছিল। কঠিন শাসনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে দুই কারাবাসী। পুজোর হুল্লোড়ে সবাই মেতে আছে। ঢাক বাজছে বারোয়ারিতলার প্যান্ডেলে। ছাড়তে ইচ্ছে করছে না, আবার ভয়ও করছে। কার্তিকের প্রথম। ছাদের মাথায় আকাশপ্রদীপ। সপ্তমীর ফাঁলি চাঁদ। অবাক শিশুর চোখের মতো একটা তারা। হাতির মতো শরতের একখণ্ড মেঘ। হঠাৎ কার কাশির শব্দ। দুজনের বন্ধন ছিটকে গেল। তন্দ্রা পালাল পাঁচিল টপকে। ভালো ছেলের মতো মুখ করে নেমে এলুম নীচে। তখন সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুদের বলতে ইচ্ছে করেছিল। গল্প নয়, সত্য এক প্রেমের কাহিনি। সে যুগে একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের ভাব-ভালোবাসা হওয়া এখনকার মতো অত সহজ ছিল না।

নির্জন ছাত স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছে। ছাতটার বয়েসও তো কম হল না। রোদে পুড়ে জলে ভিজে কালো হয়ে গেছে। স্মৃতির গুঁড়ো জমে আছে কোণে কোণে। কতকাল আগে বিশাল এক প্যান্ডেল খাটানো হয়েছিল এই ছাতে। বুড়োর তখন পাটভাঙা যৌবন। চাকরিবাকরি করছে। বিয়ে হচ্ছে। ছোটকত্তা বৃদ্ধ হয়েছেন, মেজকত্তা বিদায় জানিয়েছেন পৃথিবীকে। তাঁর শ্রাদ্ধেও অনুরূপ একটা প্যান্ডেল হয়েছিল। তফাৎ এই, সেটায় শোক, এইটায় আনন্দ। লোকজনে বাড়ি ভরে গেছে। প্যান্ডেলের একপাশে হালুইকরের কেরামতি চলেছে। পোলাও তৈরি হচ্ছে। বিশাল পেতলের হাঁড়ির মুখে একটা ঢাকনা তার ওপর চাপাচ্ছে জ্বলন্ত কাঠকয়লা। একটা চালের গায়ে আর একটা চাল লাগবে না, এমন তরিবাদির জিনিস নামাতে হলে এই কায়দা। জায়ফল আর জাফরানের সুগন্ধ। বিদ্যাসাগরী চটি পায়ে দিয়ে ছোটকর্তা সুপারভাইস করছেন। সার সার জলের ড্রামে কেওড়া দেওয়া জল। শীতকাল, নভেম্বরের শেষ। কমলালেবুর চাটনি হবে। দু'জন কমলালেবু ছাড়াচ্ছে। গন্ধে ইডেনে ক্রিকেটের কথা মনে পড়ছে। ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিজয় হাজারে, মার্চেন্ট, মানকড়। কাঠের বারকোশে দরবেশ পাকানো হচ্ছে পেস্তা, বাদাম, কিশমিশ দিয়ে। বাচ্চারা ছোঁক ছোঁক করছে যদি একটু পাওয়া যায়। কিন্তু কড়া পাহারা।

এই ছাতে সেদিন কী ব্যস্ততা। ইলেকট্রিকের লোক লাইন টানছে। ডেকরেটারের লোক ঝালর ঝোলাচ্ছে। বাঁশে ভেলভেট মুড়ছে। ফুলের লোক মালা দোলাচ্ছে। যে জল তুলছিল সে শিস দিচ্ছিল হিন্দি গানের সুরে, জিয়া বেকারার হায় সোই বাহার হায়। ছোটকত্তা এক ধমক লাগালেন। ছেলেটা একটু ফচকে মতো ছিল। সে হাসতে হাসতে বলেছিল, ছোটবাবু এটা বিয়েবাড়ি, ছেরাদ্দবাড়ি নয় গো। ছোটকত্তা ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

সকাল থেকেই উদ্বেগ চলছিল, দই আসছে না, দই আসছে না। হঠাৎ চিৎকার উঠল, এসেছে এসেছে। স্পেশাল দই। একটু দূর থেকে আসছে। ছোটকত্তা বিশেষত্বটা তাঁর বন্ধুকে বোঝাচ্ছেন। ভাঁড় উপুড় করলেও দই পড়বে না। প্রত্যেকটা হাঁড়ির গায়ে খড়ি দিয়ে ওজন লেখা।

এই বুড়ো সেদিন কী করছে! বোকা বোকা, লাজুক লাজুক মুখে ঘুরছে। মাঝে মাঝে বউয়ের ঘরের সামনে দিয়ে অকারণে যাওয়া-আসা করছে। মেয়েরা ঘিরে বসে আছে। রকম রকম মেয়ে। উচ্ছলিত হাসির শব্দ। চুড়ির রিনিঝিনি। একবার এক ফাঁকে একটু চোখাচোখি হয়েছিল। সে যেন পাতা সরিয়ে ফুল দেখার মতো।

অনেক রাতে নিমন্ত্রিতরা যখন সবাই চলে গেলেন, তখন পরিবারের সবাই বসল আহারে। নতুন বউ একপাশে। তাকে সবাই আদর করে খাওয়াচ্ছে। মাথায় একচিলতে ঘোমটা। ছোট্ট কপালে টিকলি। ফরসা মুখে লাল চন্দনের ফুটকি সাজ লাল বেনারসি, জড়ির পাড়। গোল হাতে সোনার চুড়ি। সবাই সাধছে। খাও, একটু খাও।

এই বুড়ো দূরে বসে ভাবছে। ওই আমার বউ। আমার পান্থপাদপ। যেন জীবনের সব পাওনা মিটে গেল। আর বাকি রইল না কিছু। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, শ্রমনীতি, ইতিহাস, ভূগোল, সব অবান্তর। বিশাল, জটিল পৃথিবী ছোট হয়ে ঢুকে গেল চার দেওয়ালে। সেগুনের খাট, কাপাসের তোশক, সুতির চাদর, সাদা মশারি, মৃদু আলো, একজন নারী, অনর্গল কথা, অপরিমিত ভালোবাসা। একটা গাছ একটু ছায়া। আকাশ ধরেছে জলাশয়। আ। তাই এত দু:খ—

অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়।

কণাটুকু যদি হারায়, তা লয়ে প্রাণ করে 'হায় হায়'।।

নদীতটসম কেবলই বৃথাই প্রবাহ আঁকড়ি রাখিবারে চাই,

একে একে বুকে আঘাত করিয়া ঢেউগুলি কোথা ধায়।।

এইসব ঠুনকো জিনিসের বাজারি বিশ্বে কোনও দাম নেই। এ আমাদের বিলাসিতা। আমেরিকার বুড়ো এসব ভাবে না। ভাববে না। এই বাঙালি বুড়ো বসে বসে এইসব ভাববে। বুকটা কেমন করবে। চোখ ছলছল। দু:খে কত সুখ! তাই না! অতীতের ফ্রেমে ভাবনার ছবি। সেই রাত।

ছোটকত্তা সাধারণত ইমোশনাল হন না, সেই রাতে হঠাৎ একটা হাতলওলা চেয়ার দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। মেজকত্তা সেই চেয়ারটায় বসতেন। কেবলই বলতে লাগলেন, আজ যদি মেজদা বেঁচে থাকত! আর সেই মুহূর্তে নতুন বউ ঘোমটা-টোমটা খুলে এগিয়ে এল শ্বশুরমশাইয়ের কাছে। লজ্জা, সংকোচ কিচ্ছু নেই। হাত ধরে নিয়ে চলল ঘরের দিকে। একেই হয়তো বলে, হাল ধরা। আধঘণ্টা পরে ঘরে শোনা গেল হাসি। দুজনের হাসি। ছোটকত্তা বারে বারে বলছেন, ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল। প্রবীণরা একটু অসন্তুষ্ট হলেন ঠিকই। বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি, তাড়াতাড়ি হয়ে গেল।

সেই রাতের সেই ছাতটাকে আমি দেখতে পাচ্ছি। এমন হাহাকারের মতো ফাঁকা ছিল না। চারপাশ ঘেরা। তবে রাত একটার সময় মনে হচ্ছিল, জীবনে যা একবারই হয় সেই মধুর ঘটনাটা শেষ হয়ে গেল। ফটফটে আলোয় তেড়াবেঁকা পড়ে আছে টেবিল-চেয়ার। ছেঁড়া কাগজ। ঝুড়িতে ভাঙা, টুকরো লুচি। একটা ট্রেতে বিধ্বস্ত কয়েকটা চপ। একটা নিটোল কমলাভোগ পড়ে আছে একে কোণে। কার খোঁপা থেকে খুলে পড়ে গেছে গোড়ের মালা।

হঠাৎ পাঁচিলের ওপাশে একটা মূর্তি দেখা গেল। প্রায় অন্ধকারে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। সেই পাগল বড় ভাই। বলে উঠল, 'এই যে মনে আছে তো! ভোলোনি।'

ভুলব কেন, আমার সেই টেবিল-ঘড়ি আজও চলছে। শুধু তার অসুখটা গেল না।

আরও কিছুক্ষণ বসা যেত, পাগলের ভয়ে পালিয়ে এলুম। ওই সামান্য কথাটাই আমাকে অসুস্থ করে তোলে। ও কি আমার সেই প্রথম প্রেম, নারীর বিশ্বাসঘাকতার কথাটাই মনে করিয়ে দিতে চায়! লোকটা হ্যামলেট না কী, বলতে চাইছে, Frailty, thy name is woman! না আরও গভীর কথা। ভোলোনি তো ভাই। যাওয়ার দিন এগিয়ে আসছে।

ঈশ্বর সেই রাতটা দাও না ফিরিয়ে

আর একটিবার

যারা ছিল বড় আপনার

সানাই ছাড়ুক একটু সুর

রজনীর গন্ধ মধুর।।

একটা বড় স্টিলের আলমারির সামনে দাঁড়ালুম। খুলতে ভয় করে। মহাকাব্য। দু:খ-সুখ সবই ভরা আছে। খোলামাত্রই বেরিয়ে পড়বে। আমার জামাকাপড়, তার জামাকাপড়। সেই সেটটাও আছে। ফুলশয্যার রাত লেগে আছে। রজনীগন্ধার গন্ধ। কে তার মাথায় ছড়িয়ে দিয়েছিল অভ্র। তার কুঁচি খুঁজে পাওয়া যাবে অনুসন্ধানে। সাটিনের অন্তর্বাসে এখনও ধরা আছে যৌবনের উত্তাপ। চারটে অ্যালবামে বিভিন্ন সময়ের ছবি। এক প্যাকেট চিঠি আছে রোদ-বৃষ্টির মতো। আরও সব স্মৃতি আছে। সময় চলে গেছে পাশ কাটিয়ে। পাগলামি আমার, পাল্লার ভেতর দিকে দু'লাইন সংস্কৃত শ্লোক কাগজে লিখে সেঁটে রেখেছি,

হস্তমুৎক্ষিপ্য যাতোহসি বলাৎকৃষ্ণ কিমদ্ভুতম।

হৃদয়াযদি নির্যাসি পৌরুষং গণয়ামি তে।।

বিল্বমঙ্গলে পেয়েছিলুম। বৃন্দাবন। অন্ধ বিল্বমঙ্গল বসে আছেন ব্রহ্মকুণ্ডে। চড়চড়ে রোদ। অভুক্ত। শ্রীকৃষ্ণ এলেন গোপবালকের ছদ্মবেশে। বড় দয়া হয়েছে। বলছেন সাধু! রোদে কেন? ছায়ায় এসো, মা খাবার পাঠিয়েছে, তুমি খাবে তো! সাধু বুঝতে পেরেছেন, কে এই বালক, এমন যার গলা, গায়ে যার এত সুগন্ধ।

বিল্বমঙ্গল বলছেন, অন্ধ আমি, চোখে দেখি না, তুমি আমার হাত ধরে নিয়ে চলো। বালকবেশী শ্রীকৃষ্ণ দূর থেকে একটা আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছেন, ধরো সাধু।

আমি দেখছি না, বড় কিছু দাও। তোমার হাতটা বাড়াও।

যেই হাতটা এগিয়ে দিয়েছেন খপ করে চেপে ধরেছেন বিল্বমঙ্গল, আর তো ছাড়ব না, তোমাকে যে আমি চিনে ফেলেছি প্রভু।

শ্রীকৃষ্ণ তখন ছল করে বলছেন, আ:, ছাড়ো ছাড়ো, আমার যে লাগছে। বিল্বমঙ্গল সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ তখন দূরে সরে গিয়ে হাসছেন। বিল্বমঙ্গল সেই সময় ওই শ্লোকটি বলছেন, গিরিশচন্দ্র বাংলা করেছেন,

ছলে হাত ছিনাইলে

পৌরুষ কি তাহে তব?

পারো যদি হৃদয় হইতে পলাইতে

তবে তো তোমারে গণি।

এই কথাটা আমি তাকে বলছি, যে স্মৃতি হয়ে বসবাস করছে লোহার আলমারিতে। হৃদয় থেকে পালাতে পেরেছ?

নীল চাদরটা বের করলুম। শীত শীত করছে। আলোয় ধরেছে বাদুলে পোকা। মৃদু হলেও আসবে শীত।

আর একটু পরেই অপরেশ আসবে। থিয়েটারে ঐতিহাসিক পালায় এক সময়ে খুব নাম করেছিল। তার বিখ্যাত অভিনয় সাজাহান। রাতের পর রাত মঞ্চ কাঁপিয়েছে, দর্শকদের কাঁদিয়েছে। সেই সময় পেশাদারি মঞ্চে মাঝে মাঝে কম্বিনেশান নাইট হতো। বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। কে কাকে টেক্কা মেরে যেতে পারে। অপরেশের পাশে সবাই ম্লান। থিয়েটার আর নেই। সব পুড়ে গেছে। সন্ধে হলেই পাদপ্রদীপের সামনে দাঁড়াবার জন্যে অপরেশ ছটফট করে। চন্দ্রগুপ্ত, সাজাহান, ভাস্করপণ্ডিত, কার্ভালো, মাইকেল, বিদ্যাসাগর, একের পর এক চরিত্র ঘাড়ে চাপে।

স্টেজ নেই, বোতল আছে স্মৃতি আছে। আমি বেশ বুঝতে পারি, রাতটা ওর কাছে এক বিভীষিকা। থিয়েটারেরই এক সুন্দরী রত্নাবলীর সঙ্গে থাকত। তিনি হঠাৎ আত্মহত্যা করলেন। যৌবন ফুরিয়ে যাচ্ছে দেখে পালালেন। এই রকমই ব্যাখ্যা। সাধারণের ভাবনা সরল পথে চলে। তিনি সুইসাইড নোটে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা লিখে রেখে গিয়েছিলেন। অপরেশ সেটিকে বাঁধিয়ে রেখেছে—

ভালোবাসা এসেছিল

এমন সে নি:শব্দ চরণে

তারে স্বপ্ন হয়েছিল মনে

দিইনি আসন বসিবার।

বিদায় সে নিল যবে, খুলিতেই দ্বার

শব্দ তার পেয়ে,

ফিরায়ে ডাকিতে গেনু ধেয়ে।

তখন সে স্বপ্ন কায়াহীন।

নিশীথে বিলীন—

দূরপথে তার দীপশিখা

একটি রক্তিম মরীচিকা।

শ্মশানে গিয়েছিলুম। সন্ধ্যার আকাশে চিতার লকলকে আগুনকে মনে হয়েছিল রক্তিম মরীচিকা। চোখের সামনে আগুনে ছাই হচ্ছে সুন্দর একটি দেহ, একটি প্রতিভা। যা এতদিন দগ্ধ হচ্ছিল লালসার আগুনে। অপরেশ যদি নাও আসে প্রতাপ আসবে।

প্রতাপ, আমার বাল্যবন্ধু, আজকাল প্রায়ই একটু রাতের দিকে আসে। গ্রেট প্রতাপ। আসার কারণ আছে। স্বার্থ ছাড়া একালে কে কার কাছে আসে। হৃষ্টপুষ্ট সামান্য কারণাসক্ত প্রতাপ আসে আমার মগজ ধোলাই করতে। এসেই বলবে, 'ইউ আর কিলিং ইওরসেলফ। এই বয়েসে বিদেশে একটা মানুষ নতুন করে জীবন শুরু করে...আর তুমি কী করছ। ব্রুডিং অ্যান্ড ব্রুডিং। ভূতের মতো এঘরে ওঘরে, ছাতে ঘুরে বেড়াচ্ছ। ছাতে পায়রা থাকে, মানুষ তোমার মতো সারাদিন থাকে না।'

'আমি নিজের মতো করে একটা জীবন বেছে নিয়েছি, এতে কার কী অসুবিধে হচ্ছে ভাই!'

'এই মুহূর্তে তোমার জীবনে একজন নারীর প্রয়োজন। এই বয়েসটা খুব সাংঘাতিক।'

'আমার কামনা-বাসনা সব মরে গেছে।'

প্রতাপ হইহই করে হাসবে। বিশ্বাস করবে না। ওর ধারণা, যায়, তবে চিতায় উঠলে, তার আগে নয়। নেভার। অবদমিত কাম অনেকরকম চেহারা নিতে পারে। পাগলও হয়ে যেতে পারে। যেমন হয়েছে তন্দ্রার বড় ভাই। বয়েসকালে বিয়ে করলে আজ এই অবস্থা হত না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে।

প্রতাপ বলবে, 'আমাকে দ্যাখো। এই বয়সে মেন্টালি, ফিজিক্যালি কত ফিট। নো সুগার, নো প্রেসার, নর্মাল হার্ট। সিক্রেটটা কী? আমি সবসময় বাঁচতে চাই। মৃত্যুর কথা একেবারেই ভাবি না। তুমি যে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছ, তার প্রমাণ তোমার এই ঘড়ি। ঘড়িটাকে কোলে করে বসে আছ সারাদিন। কী পাও ঘড়িটার কাছ থেকে?'

'শুনবে কী পাই? অনন্তকালের পায়ের শব্দ। শিশুকাল, কৈশোর, যৌবনকাল থেকে প্রৌঢ়কাল অনাগত কাল। মহাকালের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে রেখেছি ভাই। বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে উঠেছেন ব্রহ্মা। বিষ্ণু হলেন ত্রিকাল, সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়। সময়ের নাড়ির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে রেখেছি।'

'রাবিশ! আমার সঙ্গে চলো। এক পেগ খাও, একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি, একটু ফুর্তি করো, দেখবে বাস্তবে ফিরে এসেছ?'

প্রতাপের ধান্দা খুব ভালো। রিয়েল এস্টেটের বিজনেস করে। রোজই এসে আমাকে একটা টোপ খাওয়াবার চেষ্টা করে। বাড়িটা আমাকে বেচে দাও। এখানে একটা ফ্ল্যাট তুলি। দাম তো পাবেই, প্লাস একটা ওয়েল ফারনিশড ফ্ল্যাট। টাকাটা ফিকসড করে দাও, তোফা মাঞ্জায় জীবন কাটাও। সন্ধের দিকে টিভি দেখতে দেখতে দু'পেগ বিলিতি খাও, একজন বান্ধবী যোগাড় করে নাও। ল্যাং খেয়ে উলটে পড়েছ, ঝেড়েঝুড়ে উঠে দেখিয়ে দাও, আগের চেয়েও ভালো আছ।'

'প্রতাপ দি গ্রেট, আমি কি খুব দু:খে আছি?'

'ইউ হ্যাভ নো ফিউচার।'

'তা হলে শোনো প্রতাপ, সংস্কৃতকে বাংলা করে বলি!—'

'কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে অর্জুন সখা কৃষ্ণকে বলছেন, হে গোবিন্দ, আমাদের রাজ্যে কী প্রয়োজন, সুখভোগ আর জীবনধারণেরই বা কী প্রয়োজন, সবই যদি গেল, সবাইই যদি গেল, একা রাজ্যসুখ ভোগ করে লাভ কী!'

'আবার একটা রাবিশ। ভোগ করার জন্যে এসেছি, চুটিয়ে ভোগ করে যাব। তোমার মস্তিষ্কে অনেক আবর্জনা ঢুকেছে। ও আর সহজে বেরোবে না। তুমি তাহলে একটা কাজ করো। বাড়িটা আমাকে দাও। নেট বিশ লাখ। এখানে একটা ভালো ওল্ড এজ হোম হয়েছে। গঙ্গার ধারে। টাটকা নতুন। এককালীন জমা পঞ্চাশ হাজার, মাসে মাসে এগারোশো, অল ফাউন্ড। জায়গা এখনও আছে। সেইখানে থাকো। বি ক্লেভার। ডোন্ট বি এ ফুল। টাকার ভ্যালু বুঝতে শেখো। এই বাড়ি কি তোমাকে কোনও ইনকাম দিচ্ছে। বরং এটাকে রাখতে গিয়ে তোমার খরচ হচ্ছে। মেনটেন করতে না পারলে ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাবে। চামচিকের আড়ত।'

এমন একটা ভাব দেখালুম যেন বিশ লাখের টোপটা গিলেছি। প্রতাপের ফোলাফোলা মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। প্রতাপের এক পাঞ্জাবি পার্টনার আছেন, তিনি এই অঞ্চলটাকে একটা লিটল পাঞ্জাব করে তুলতে চাইছেন। শালা বাঙালির জন্যে কোথায় কোন জেরুজালেম তৈরি হচ্ছে কে জানে। এইসব পয়সাওলা অবাঙালিদের চোখে বাঙালি এখন চাকরবাকরের জাত। প্রতাপ যখন ভেবেই নিয়েছে, এইবার আমি ভাঙছি, তখনই আমি বললুম, 'ছাত, ছাতের তলায় বিশাল এক যৌথ পরিবার বাসা বেঁধেছিল, সে আজ নয়, অনেক বছর আগে। তখন রাস্তায় গ্যাসের আলো জ্বলত। মানুষ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেত ঘোড়ার গাড়িতে। এই ছাতের তলায় জমা আছে তিন পুরুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহের স্মৃতি। ওরা কেঁদেছে, হেসেছে, মান-অভিমান করেছে। স্থূলে না থাক সবাই সূক্ষ্মে আছে। শেষ প্রতিনিধি এইখানেই মরবে। তোমার এই বৃদ্ধনিবাসে নয়। জায়গাটা আমি দেখে এসেছি। গঙ্গার ধারে। অতি সুন্দর। নতুন বাড়ি। পশ্চিমের জানালায় গেরুয়া গঙ্গা। জানালা খুললে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ধাপধাপ বাগান চলে গেছে গঙ্গার কিনারা পর্যন্ত। মাঝারি মাপের ঘরে এক জোড়া বিছানা, চমৎকার আধুনিক টয়লেট ঝকঝক করছে। এক এক ঘরে দু'জনের স্থান। নতুন একটা মন্দির আছে, চিকিৎসাকেন্দ্র। দেখে এসেছি সব। অনেকেই এসে বসবাস করছেন। পয়সাওলা পরিবারের প্রতিনিধিরা। কেউ ছিলেন সম্মানিতা শিক্ষিকা, কেউ খ্যাতিমান সাংবাদিক। কিন্তু ভাই, সবাই এক একটা ঘড়ি। টিকটিক করে এগিয়ে চলেছেন সূর্যাস্তের দিকে। সার সার বসে আছেন সবাই পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে। দিন ছোট, রাত বড়, জীবনের শীতকাল। প্রতাপ বলতে পারো, পাঁচতারা হোটেল কেন বাড়ি হয় না? আর মন্দির কাকে বলে?'

গম্ভীর মুখে প্রতাপ বললে, 'জানি না।'

প্রতাপের আগ্রহ কমে গেছে। প্রতাপ এইসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। জীবনের দুটো জিনিস সে বোঝে, ভোগ আর অর্থ। মনে হচ্ছে, পালাতে পারলে বাঁচে।

'ছাতের তলায় সংসার না পাতলে গৃহ হয় না। জন্ম হবে, বিবাহ হবে, মৃত্যু হবে। শাঁখ বাজবে, উলু দেবে, শোকের কান্না উঠবে। মঙ্গলকাজে দেওয়ালে পুতুল আঁকবেন পুরোহিত। উনুনে আগুন পড়বে, রান্নার গন্ধ ছড়াবে বাড়িতে। জ্বর হলে ডাক্তার আসবেন। আরোগ্য সত্যনারায়ণ। সন্ধ্যার প্রদীপ পড়বে ঠাকুরঘরে। ছাতের তারে শাড়ি দুলবে বাতাসে। তবে, তবেই হবে গৃহ। নয় তো হোটেল, পান্থশালা। আর চূড়ার তলায় লাখ টাকা দামের মূর্তি রাখলেই মন্দির হয় না জমাতে হয় সময়। সময়ই দেবতা। যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস হাতে নিয়ে ভক্তের দল আসবে। ভিখারি আসবে, কুকুর আসবে, পাগল আসবে, গরু আসবে, মাতাল আসবে, লম্পট আসবে, সতী আসবে, অসতী আসবে, তবেই হবে মন্দির।'

প্রতাপ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। চেয়ার ঠেলার শব্দ শুনেই মনে হল রেগে গেছে। অসহ্য লাগছে আমাকে। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললে, 'রাবিশ। ওয়েস্ট অফ টাইম।' চলে গেল জোরে জোরে পা ফেলে। লোকটা কী বোকা। বিশ লাখ টাকা বেঁচে গেল, থ্যাংকস বললে না একবারও।

এই এত বড় বাড়িতে রাতের বেলাটাতেই একটু ভয় ভয় করে। নানারকম শব্দটব্দ হয়। সেইসব শব্দের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। চেষ্টা করেও পাইনি। নীচেটা অন্ধকার। দোতলায় আমি একা। ভূত আমি বিশ্বাস করি। দু-একবার দর্শনও পেয়েছি। এই বাড়িতে নয়। বাইরে বেড়াতে গিয়ে। কেউ বিশ্বাস করে না, আবার ভয়ও পায়।

এই পাড়ায় আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। কোনও কারণ নেই, অকারণেই আমার ভালো চায়, আমি ভালো আছি দেখতে চায়। পৃথিবীতে ঝড়তি-পড়তি এখনও কিছু বোকা লোক আছে। তার বড় মেয়ে বি. এ. পড়ছে। মাঝে মাঝে এসে ইংরিজিটা পড়ে যায়। আসার কোনও সময় নেই। বুড়োর কাছে যে-কোনও সময়েই আসা যায়।

সে আছে। বেশ মিশুকে মেয়ে। একাল সেকাল মিলিয়ে একটা মিক্সচার তৈরি হয়েছে। বেশ কর্মঠ। যখনই আসে আমার অনেক কাজ করে দেয়। এলোমেলো ঘর গুছিয়ে দেয়। বইপত্তরের ধুলো ঝেড়ে দেয়। কখনও স্টোভ জ্বেলে কিছু একটা তৈরি করে দেয়। চা করে খাওয়ায়। মজার মজার কথা বলে। গুনগুন করে গান গায়। প্রথম প্রথম আপনি বলত, এখন তুমি বলে। আধুনিকরা আপনি বলাটা অপছন্দ করে। তুমি শুনতে আমারও ভালো লাগে। মানুষ মানুষকে টানে। কাছে আসতে চায়। মানুষের স্বভাব। মেয়েটির নাম, অচলা। আমি এখন তাকে তুই বলি।

বুড়োটাকে নিয়ে সে খেলা করে। এক অর্থে শিক্ষক হলেও আমি তার বন্ধুর মতো। ওই যে বলেছি পৃথিবীতে বন্ধুত্বের মতো সম্পর্ক নেই। ঘাসের মতো স্নেহ নেই, সমস্ত অবহেলা ঘাস ঢেকে দেয়। পরিত্যক্ত, বিস্তৃত সমাধি ঘাসে ভরে যায়। বৃষ্টির মতো সমাজবাদী কেউ নেই। মেঘের মতো উদারতা কারও নেই, আগুনের মতো সংস্কারমুক্ত।

অচলা আমার চুলে চিরুনি বোলাতে বোলাতে বলেছিল, 'এখনও ভালোই আছে। ভাবছি কলপ দিয়ে তোমাকে আর একবার পিঁড়েতে বসাব।'

'পাত্রী কোথায় পাবি?'

'রং মাখা বুড়ি অনেক আছে, প্রায়ই চোখে পড়ে। তোমার চল্লিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি, গৃহকর্মে সুনিপুণ। তোমার পাত্রীর অভাব হবে না। বুকের ছাতিটা এমন কপাটের মতো করলে কী করে? কলেজ জীবনে প্রেম করার জন্যে বারবেল ভাঁজতে বুঝি?'

'আরে না, দু:খ সইতে হবে বলে ভগবান বুকটা চওড়া করে দিয়েছেন।'

একদিন এল উল নিয়ে, 'দেখো এই বুড়োটে রংটা তোমার পছন্দ কি না?'

'আমার পছন্দে কী হবে?'

'সোয়েটারটা তো তোমারই হবে না অন্য কারও!'

'আমার সোয়েটার?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ। জীবনে তো কেউ করে দিলে না, আমি একটা করে দি।'

'তুই এতগুলো টাকা আমার জন্যে খরচ করলি।'

'পড়িয়ে শোধ কোরো। এখন বসে বসে গোলা পাকাও, আমি চা করি। বিকেলে চা-টা কিছু জুটেছে?'

'ভুলে গেছি।'

'ভুলে গেছি মানে? খেয়ে ভুলে গেছ, না ভুলে খাওনি? প্রথমটা হলে ভীমরতি। দ্বিতীয়টা হলে দার্শনিক। কোনটা?'

'দ্বিতীয়টা।'

'ওষুধ এনে দিয়েছিলুম, খাচ্ছ, না ভুলে বসে আছ!'

'মনে পড়লে খাই, ভুলে গেলে খাই না।'

'সত্যিই তোমার বিয়ে দিতে হবে। তোমার মতো অবাধ্য ছেলেকে চব্বিশ ঘণ্টা শাসনে রাখা দরকার।'

আর একদিন এল, হাতে একটা ঠোঙা, 'তোমার পেটের খবর কী!'

'সারা জীবনের শত্রু মিত্র হবে কী করে! কেবল এটা খাব, ওটা খাব করছে। বুড়ো বয়েসের লোভ।'

'এখন তোমার কী খেতে ইচ্ছে করছে? সত্যি বলবে।'

'হিং-এর কচুরি।'

অচলা লাফিয়ে উঠল, 'মাইরি বলছ?'

'মাইরি।'

'কী টেলিপ্যাথি দ্যাখো। আমি এনেছি, গরম ভাজছিল।'

আজকাল একটুতেই চোখে জল আসে। সামলাতে পারি না। নার্ভ দুর্বল হচ্ছে।

গত রবিবার সকালে এসে মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে ঝুলটুল ঝাড়লে। টুলে উঠে পাখার ব্লেড পরিষ্কার করছে, বললুম, 'পড়ে মরিস না যেন।'

হাসতে হাসতে উত্তর দিলে, 'তুমি আছ কী করতে? পড়ার মতো হলে ধরবে।'

'তুই আমার জন্যে এত করিস কেন? কেউ তো করে না।'

'আগের জন্মের সম্পর্ক ছিল। মোটা মাথায় এটাও ঢোকে না।'

প্রতাপ চলে যাওয়ার কিছু পরেই অচলা এল। গম্ভীর। তার দীর্ঘ শরীর কিছুটা শ্লথ। খাটে আমার মুখোমুখি বসল। তাকিয়ে আছে ফ্যাল-ফ্যাল করে। ধারালো মুখ। খাড়া নাক। টানা টানা চোখ। লঘু গলায় জিগ্যেস করলুম, 'কী হল সখী?'

অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখলুম, চোখে জল ওতলাতে ওতলাতে একেবারে উপচে দু'গালে বেয়ে ঝরঝর করে পড়তে লাগল। কাচের শারসিতে বৃষ্টির জলের মতো।

অপ্রস্তুত আমি। 'কী হল অচলা! কেউ কিছু বলেছে।'

হুমড়ি খেয়ে আমার কোলে পড়ল। রাখব না, রাখব না করেও চওড়া পিঠে হাতে রাখলুম। অচলা কান্নার আবেগে ফুলছে। খোঁপা ভেঙে পড়েছে। অনেক চেষ্টার পর বললে, 'আমার বিয়ে।'

'সে তো আনন্দের কথা রে! ভীষণ আনন্দের। আমার নাচতে ইচ্ছে করছে।'

অচলা আমার কোলে মুখ গুঁজেই বললে, 'তোমাকে ছেড়ে আমি থাকব কী করে!'

মেয়েটা বয়সে বড় হলেও অভিজ্ঞতায় বড় হয়নি। যে কথাটা বললে সেই কথাটার মতো 'কথার কথা' আর দুটো নেই। আমরা সকলেই সকলকে ছেড়ে থাকতে পারি। একদিন দু'দিন একটু খালি খালি লাগে তারপর ঠিক হয়ে যায়। যুবতী জানে না, এই বুড়ো জানে। বুড়ো এও জানে, শূন্যতার মতো পূর্ণতা নেই। একটা পাত্র, জল ভরছি, একের চার ভরতি, তিনের চার ভরতি, পরিপূর্ণ করে দিলেও ছলকে পড়ে যাবে, উবে যাবে; কিন্তু শূন্যতা একেবারে পরিপূর্ণ। তুমি যখন আছ, তখন আমার ভেতরে তুমি আংশিক আছ। তুমি যখন নেই তখন তুমি পুরোটাই আছ। বাইরে থাকাটা থাকা নয়, ভেতরে থাকাটাই প্রকৃত থাকা। অচলা মুখ তুলে আঁচলে চোখ মুছল। বললে, 'তোমার খারাপ লাগছে না!'

'লাগলেও কিছু করার নেই। আমার শূন্যতার গভীরতা আরও বাড়ল।'

'কিছু করা যায় না?'

'কিছুই করা যায় না।'

অচলা আরও কিছুক্ষণ বসার পর উঠল, 'তোমার সোয়েটার হয়ে গেছে।'

'শীতও আসছে।'

অচলা চলে গেল ধীরে পায়ে। দেখছি আমি পেছন থেকে। হঠাৎ মনে হল, চলে গেল না, অচলা সানাই হয়ে গেল। দূর থেকে ভেসে যাওয়া সানাইয়ের সুর। ভয় পাচ্ছে। মেয়েদের বিয়ে হল ঘুড়ি, অচেনা আকাশে উড়ে যাওয়া।

এই যে দেনেওলা ভগবান, লেনেওলা ভগবান! শুনে রাখো—তোমার বহুত অহংকার, মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করো, রাজা করো, ফকির করো, একটা কথা জেনে রাখো, মানুষ তোমার পৃথিবীতে আসে না, মানুষ আসে মানুষের হৃদয়ে। প্রেমে বড় হয়, অবশেষে চিতার আগুনে দগ্ধ হয়। তোমারই রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখা তোমার অদৃশ্য সিংহাসনে বসে, বিশ্বজোড়া কান পেতে শোনো,

তোমার উৎসব-ধারা যাওয়া-আসা দুকুল ধ্বনিয়া

ছুটে চলে যায়।

তোমার নর্তকী দল বিরহ মিলন ঝঞ্ঝনিয়া

খঞ্জনী বাজায়।

স্মৃতি-বিস্মৃতির ছন্দ-আন্দোলনে উত্তাল ছন্দিত

মুক্তি আর বন্ধ দোঁহে নৃত্য করে নূপুর-মন্দ্রিত

দু:খ আর সুখ

বিশ্বের হৃৎপিণ্ড সেই দ্বন্দ্ববেগে নিয়ত স্পন্দিত

করে ধুক ধুক।।

আপনি ভালো থাকুন। খেলে যান! মাঠ আপনার, বল আপনার, নিয়ম আপনার। বাঁশি আপনার, ফুঁ আপনার।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%