সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমাদের একটা বাড়ি ছিল। বাড়িটা খুব পুরোনো। আমরা থাকতে থাকতে সেটা আরও পুরোনো হল। বেশ বড় বাড়ি। এ-মাথা থেকে ও-মাথা। কিছু কিছু ঘরে সারাদিন চিন চিন করে বালি ঝরে পড়ত। ভেন্টিলেটারে চড়াই পাখির বাসা। সারাদিন তাদের কিঁচ কিঁচ, কাঁচি দিয়ে কাপড় কাটার শব্দের মতো ডাক। বাড়িটার পেছনে ছিল গঙ্গা। সারাদিন ভিজে ভিজে বাতাস। দেওয়ালে দেওয়ালে নোনা ধরা। যেন নানা দেশের ম্যাপ। আমরা ভাই বোনেরা নানা দেশ খুঁজে পেতুম সেই ম্যাপে। কোনওটা অস্ট্রেলিয়া, কোনওটা গ্রেট ব্রিটেন, জাপান। গঙ্গার দিকে ঝোপঝাপ একটা বাগান ছিল। বর্ষায় গঙ্গায় যখন ভরা জোয়ার, তখন বাগানে জল চলে আসত। ছোট ছোট, ঝোপঝাড় গাছগুলো সব ডুবে যেত জলে। একটা কদম গাছ ছিল। মনে হত, নাইতে নেমেছে জলে। এক গাছ গোল গোল ফুল। আমরা কল্পনার চোখে সেই গাছে শ্রীকৃষ্ণকে যেন দেখতে পেতুম, ডালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন। বাগানটা জলে ডুবে গেলে আমরা পায়ে সরষের তেল মেখে সেই জলে ছপ ছপ করে খেলতে নামতুম। মাঝে মাঝে হলুদ সাপ জলে লাট খেত। আমরা একটুও ভয় পেতুম না। জানা ছিল, জলে বিষধর সাপ থাকে না। অনেক মাছ ঢুকে পড়ত বাগানে। বেশিরভাগই আড় ট্যাংরা। ছোট ছোট চিংড়ি তিড়িং বিড়িং করে লাফাত। জল নেমে গেলে পলি পড়ে থাকত। মিহি চিকচিকে। বিজবিজ করত ছোট ছোট কাকড়া। দু-একটা চিংড়িও লাফাত। পাতার ঝোপে অসহায় আড় ট্যাংরা। আমরা কোনওটিই ধরতুম না। আড় ট্যাংরা তো খেতেই নেই। ওরা নোংরা খায়। একবার একটা বিশাল ময়াল সাপ কোথা থেকে চলে এসেছিল। জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, সাপটা খুব ভালো মানুষ। ওকে ভয় পাওয়া উচিত হবে না। বাগানের এককোণে ঝাঁকড়া একটা বকুলের ছায়ায় ছোট, একানে একটা ঘর ছিল। এক সময় এক সাধু থাকতেন ওই ঘরে। জোয়ারের জল ওই ঘরে ঢুকে পড়ত। একটা পাথরের বেদি ছিল। বেদিটা জলে ডুবুডুবু হয়ে থাকত। আমরা তার ওপর উঠে খেলা করতুম। জল ভরা ঘরে কথা বললে বেশ গমগম করত। আমাদের মজা লাগত। সাপটা ওই ঘরেই আশ্রয় নিয়েছিল। পুরো একটা দিন ছিল। আমরা দুধ খেতে দিয়েছিলুম। খেয়েছিল। মনে হয় পেট ভরেনি। অতবড় সাপ। ছোট এক বাটি দুধ। কী হবে! নস্যি। ছোট একটা ছাগল দিলে গিলে ফেলত। ময়ালটা দিনের জোয়ারে এসে রাতের জোয়ারে চলে গেল। সেই থেকে ঘরটার নাম হয়ে গেল ময়াল গুহা। বাগানটায় এত কিছু ছিল, তবু আমরা নির্ভয়ে যেতুম। কেউ আমাদের কিছু বলতেন না। বাবা বলতেন, বিপদের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তা না হলে মানুষ ভীতু হয়ে যায়। জীবন জিনিসটা খুব সহজ নয়। কত কী হবে! কত কী ঘটবে!
আমাদের সেই বাড়িটার নীচের তলায় অনেক ঘর ছিল। সেই ঘরগুলো আমরা ব্যবহার করতুম না। করার প্রয়োজন হত না। তালাবন্ধ পড়ে থাকত বারো মাস। আমরা থাকতুম দোতলায়। আমাদের একতলায় ইঁদারার মতো বড় একটা কুয়ো ছিল। সেই কুয়োর সঙ্গে সুড়ঙ্গ পথে গঙ্গার যোগ ছিল। গঙ্গায় জোয়ার এলে, জোয়ারের জল কুয়োয় এসে ঢুকত। হুড় হুড় করে ভরে যেত। বর্ষায় উপচে পড়ত। তখন ঘটি, বাটি ডুবিয়ে জল তোলা যেত, দড়ি বালতির প্রয়োজন হত না। বাড়িটা এমন কায়দায় তৈরি ছিল, ঘরের মধ্যে ঘর, তার মধ্যে ঘর। সে বেশ মজা। আমাদের লুকোচুরি খেলার খুব সুবিধে হত। কে কোথায় লুকিয়ে আছি সহজে ধরা যেত না। অনেক ঘরের কোন ঘরে? সেই ঘরটা আবার কোনও ঘরে ঢুকে আছে!
ছাতটা খুব বিশাল ছিল। খেলার মাঠের মতো। পশ্চিমে গঙ্গা। ছাতে উঠলে ওপারটা পরিষ্কার দেখা যেত অনেক দূর পর্যন্ত। ঘাট, মন্দির, বাগান বাড়ি। ছাতে একটা চমৎকার ঘর ছিল। সেই ঘরে সাদা চাদরপাতা একটা বিছানা ছিল। কারও শরীর খারাপ, মন খারাপ হলে, কোনও কারণে রাগ হলে, এই ঘরে এসে শুয়ে থাকত। সবাই বলত গোঁসা ঘর। আমরা যখন কানমলা বা চড়চাপড় একটা দুটো খেতুম, খেতুম যে না, তা তো নয়, ছোটদের একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করবেই, আর বড়দের ধৈর্য কম হবেই, আর বাঁদর, গাধা, উল্লুক বলবেই। তাতেও রাগ না কমলে, কান ধরে টান, গালে ছোটমতো একটা চড়। তাইতেও রাগ না কমলে গাধার গাঁট্টার তেহাই। চড় চাপড় বা ছাগল, গাধা, বাঁদর বললে আমাদের তেমন রাগ হত না। হনুমান বললে খুশিই হতুম। জানতুম, ওটা রাগ নয়, ভীষণ একট আদর। উল্লুক শব্দটায় আমাদের ঘোরতর আপত্তি ছিল। জিনিসটাকে আমরা কখনও কোথাও দেখিনি। আমাদের বাগানে হনুমান আসত। রাস্তায় বাঁদর নাচাত। স্কুলের মাঠে গাধাও চরত। উল্লুক জিনিসটা আমরা চোখে দেখিনি। উল্লুকের 'লুক' কেমন জানা ছিল না। ভাল্লুক হলে আপত্তি ছিল না। ভালো 'লুক' মানে ভাল্লুক। উৎকট 'লুক' মানে উল্লুক। উল্লুকের সঙ্গে কানমলা খুবই অপমানজনক। যেমন ঝোলে গাঁদাল পাতা। আর উল্লুক কথাটা বেশি ব্যবহার করতেন আমাদের কাকা আর মাস্টারমশাই। যাকে বলতেন, সে অমনি গোঁসা ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিত। অতবড় বাড়ি। অত ছেলেমেয়ে, লোকজন। গোঁসাঘরে কে চলে গেল তখনই কারও খেয়াল হত না। ধরা পড়ত খাওয়ার সময়। গুনে গুনে পাত পড়ত। একটা কেন খালি! খোঁজ, কোথায় গেল। প্রথমেই গোঁসা ঘরে অনুসন্ধান। উপুড় হয়ে পড়ে আছে বিছানায়।
—চল, মা ডাকছে, খেতে দিয়েছে।
—যা যা, খাব না।
—চল।
—যাব না আ আ।
কথায় আছে, ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে। হাত ধরে টানতে গেল। খামচাখামচি, ঝটাপটি। কেস আরও খারাপ দিকে চলে গেল। সে ফিরে গিয়ে, যা নয় তাই বলে নালিশ করে দিলে, আমাকে লাথি মেরেছে। গালে আঁচড়ে দিয়েছে। বলেছে, যা যা, মা আমার সব করবে। মায়ের মেজাজ সেই সময় ভালো থাকলে কিছু নয়। মা নিজেই গিয়ে অভিমান ভাঙিয়ে নিয়ে আসবে। অভিমানীর তখন এক আলাদা ডাঁট, যেন জামাই বসছেন খেতে। সবচেয়ে বড় মাছের টুকরোটা তার পাতে। চার চামচে চাটনি বেশি। মানে বেশি আদর, বেশি খাতির। তিনি যেন খেতে বসে সকলকে ধন্য করেছেন। আর যদি মায়ের মেজাজ চড়া থাকে, তাহলে হয়ে গেল। মা সমান ঝাঁঝিয়ে বলবে, না খাবে না খাবে। কদিন আর না খেয়ে থাকবে! পেটে জ্বালা ধরলে ঠিক নেমে আসবে। আমার দিদি একবার টানা তিন দিন ওই গোঁসাঘরেই ছিল। দিদির কানের একটা দুল অসাবধানে কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। মা দিদিকে বলেছিল, পেতনি। এই পেতনি কথাটা দিদি খুব অপছন্দ করত। বাঁদরি বললে তেমন রাগ করত না। গাধী বললেও না। দিদিকে দেখতে তো খুব সুন্দর ছিল! তাই পেতনি বললে ভীষণ রেগে যেত। আর মা দিদিকে মাসে অন্তত একবার পেতনি বলবেই। ভূত বললেও হয়। ভূতরা না কি সবাই পুরুষ। দিদি গোঁসাঘরে চলে গেল। খাওয়ার সময় মা বললে, 'যা মহারানিকে ডেকে আন।' ডাকতে গেলুম। দিদি ঝাঁঝিয়ে উঠল, 'পেতনিরা ভাত খায় না। মাঝরাতে পেঁচা ধরে খায়। যা, তোর মাকে বল গে যা।' আমি এসে মাকে বললুম। একটু বাড়িয়েই বললুম, 'তোমার মেয়েকে তুমিই ডেকে আনো। আমাকে মিচকে পটাশ, দালাল, এই সব বলেছে।' মা বললে, 'তা তো বলবেই। কী যুগ পড়েছ দেখতে হবে তো। অন্যায় করব আবার চোখও রাঙাব। যদ্দিন ইচ্ছে, তদ্দিন না খেয়ে থাক। পেটের জ্বালা ধরলে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আসবে।' আমি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কথাটা দিদিকে গিয়ে রিপোর্ট করে দিলুম। একটা শব্দ বেশি যোগ করে। ল্যাজের জায়গায় বললুম, 'কুকুরের মতো ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আসবে।' ব্যাপারটা খুব ঘোরালো হয়ে গেল। দিদির দুদিন উপোস, মায়েরও দু'দিন। মেয়ে না খেলে মা খায় কী করে। শেষে দিদি দেওয়ালে লিখলে—'আর একবার সাধিলেই খাই।' তিন দিনের দিন জ্যাঠাইমা স্পেশাল রান্না করে মা আর মেয়েকে পাশাপাশি বসিয়ে আদর করে খাওয়ালেন। সরু চালের ভাত, মাছের ঝোল। আমড়ার অম্বল, পোস্ত। আমরা সবাই জানলা দিয়ে উঁকি মেরে মেরে দেখতে লাগলুম দু'জনের অনশন ভঙ্গের দৃশ্য। কাকিমা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছেন। মহাত্মা গান্ধি, দিনের পর দিন অনশন করতেন। অনশন-ভঙ্গের দিন রামধুন গাওয়া হত। তোরাও সবাই মিলে গা, রঘুপতি রাঘব রাজা রাম। মা আর মেয়ের সে কী ভাব! মেয়ের পাত থেকে মা কাঁচা লঙ্কা তুলে নিচ্ছে।
অনেক খাট-পালঙ্ক ছিল তবু আমাদের শোয়ার ব্যবস্থা ছিল মেঝেতে। বাবা বলতেন, ছাত্রছাত্রীরা সব ব্রহ্মচর্য পালন করবে। একটু কষ্টে থাকবে। সাধারণ খাবার খাবে। বাবুগিরি করবে না। সত্য কথা বলবে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠবে। দুপুরে ঘুমোবে না। ছোট ছোট করে চুল ছাটবে। দশ আনা ছ'আনা ছাঁট চলবে না। তার মানে কিছু বড় কিছু ছোট চলবে না। সব সমান মাপ। সেই ছাঁটের নাম ছল, কদমছাঁট। একটা বিশাল বড় ঘর ছিল। সেইটাকে বলা হত দক্ষিণের ঘর। সেই ঘরে মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত লম্বা, সাতটা জানলা আর তিনটে দরজা ছিল। সেই ঘরটাকে বলা হত হলঘর। সেই দূর অতীতে যাঁরা বাড়িটা তৈরি করেছিলেন, তাঁরা এই হলঘরে বসে, নাচ, গান, বাজনা করতেন। সেই ঘরের মেঝেতে মা একটা ঢালাও বিছানা করে দিতেন। একটা করে মাথার বালিশ। তাঁবুর মতো বিশাল এক মশারি, টান-টান করে খাটানো। সেই বিছানায় আমরা সবক'টা ভাইবোন পাশাপাশি। মাঝে মধ্যে গৃহযুদ্ধের মতো, মশারির মধ্যে আমাদের মশারিযুদ্ধ হত। শুরুটা হত খুব সামান্যভাবে। পায়ে পায়ে লড়াই। শেষে হাতাহাতি। সব শেষে মশারির দড়ি ফড়ি ছিঁড়ে প্রলয়কাণ্ড! সেইখানেই শেষ নয়। শেষের পরেও একটা শেষ থাকত, যেটাকে বলে অবশেষ। সেই অবশেষে বড়দের আগমন। প্রথমে যে শুরু করেছিল তাকে সনাক্তকরণ। বিচার। সাক্ষীসাবুদ। আত্মপক্ষ সমর্থনে দোষীর হাঁউমাউ। সব শেষে বিচারকের রায়। বাঁদরটার সাতদিন সব খেলাধুলো বন্ধ। সকাল থেকে রাত শুধু পড়বে আর কড়া কড়া অঙ্ক কষবে।
সেই মেঝের বিছানায় বালিশে মাথা রেখে শুতে শুতে দিদি একদিন আবিষ্কার করলে, ঘরটার নীচে যে তালাবন্ধ ঘরটা, সেই ঘরে কে যেন একটানা সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে চলেছে। তখন অনেক রাত। দিদি আমাকে ফিশফিশ করে ডাকছে, 'বিলু, বিলু, বালিশে কান পেতে শোন।' হ্যাঁ, সত্যিই তাই। এক একজন ভারী গলায় মন্ত্র পড়ছে। পর পর তিনদিন একই সময়ে আমরা সেই শব্দটা শুনলুম। মাঝরাত থেকে শুরু করে সেই ভোর পর্যন্ত। দিদি খুব সাহসী ছিল। চারদিনের দিন দিদি বললে, 'চল বিলু, আমরা দেখে আসি। ব্যাপারটা কী!'
আমি বললুম, 'আমার ভীষণ ভয় করবে।'
'ভয় করবে? তুই না ছেলে? চল, পা টিপে টিপে, টর্চ হাতে যাব। আমি তো আছি।' পাঁচ সেলের টর্চ হাতে দিদি আগে আগে, পায়ে পায়ে আমি। দিদির ফ্রকের পেছনটা ধরে আছি। মনে হচ্ছে ঘুরে ঘুরে প্যাঁচালো সিঁড়ি দিয়ে অন্ধকারের পাতকুয়োয় নেমে চলেছি আলোর রেখা ধরে। নীচেটা হিম হিম। সাতশো ঝিঁঝিঁ পোকা একসঙ্গে ডাকছে। অন্ধকার যেন কাঁপছে। বাইরে গঙ্গার দিকের বাগানে কদমের ডালে বসে ডাকছে প্যাঁচা, যেন রাতের অন্ধকার করাত দিয়ে কাটছে। গাছের পাতায় বাতাসের ঝুপঝাপ শব্দ। লম্বা একটি গলি। দু'পাশে রক। সারি সারি তালাবন্ধ ঘর। ওপর থেকে যে ঘরটায় মন্ত্রপাঠ হচ্ছিল বলে ধারণা, সেই ঘরের দরজায় কিন্তু বিশাল একটা পেতলের তালা ঝুলছে দেখা গেল। ভয়ে বুকটা ছাঁত করে উঠল। দিদি পা টিপে টিপে এগোচ্ছে। নিজে দরজায় কান রাখল। অনেকক্ষণ ধরে কী শুনল! আমাকে ইশারায় ডেকে কান পেতে শুনতে বলল। ঘরের ভেতরে সত্যিই অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে। যেন দশবারোটা ডুমো ভোমরা একসঙ্গে ভোম ভোম করছে। গভীর গম্ভীর ওঙ্কার ধ্বনির মতো। দিদি টর্চ নিবিয়ে রেখেছে। ঘোর অন্ধকারে গায়ে গা লাগিয়ে, দরজায় কান পেতে দুজনে শুনছি। ভীষণ ভয় করছে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, শীত করছে। দরজার পাশেই একটা জানলা ছিল। ভেতর থেকে বন্ধ। দিদি কী মনে করে জানলাটা ঠেলতেই একটা পাল্লা হড়াস করে খুলে গেল। এত সহজে খুলে যাবে ভাবতেও পারিনি। সুন্দর একটা গন্ধ বেরিয়ে এল খোলা জানলা দিয়ে। অন্ধকারে উঁকি মেরে মনে হল, ঘরের মেঝেতে কেউ বসে আছেন। সাদা মতো। শব্দটা সেই মূর্তি থেকেই আসছে। দিদি ঝট করে টর্চলাইটটা টিপল। হঠাৎ আলোয় ঘরটা যেন চমকে উঠল। আমরা অবাক হয়ে দেখলুম ঘরের মেঝেতে একটা আসন পাতা রয়েছে, আর কোথাও কিছু নেই। মানুষের মূর্তি আমাদের চোখের ভুল। দিদি যেই টর্চটা নেবাল, সঙ্গে সঙ্গে মনে হল মূর্তিটা আছে। আলোয় নেই, অন্ধকারে আছে। ভয়ে শরীর পাথরের মতো হয়ে গেছে। দিদিও বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ছুটে পালিয়ে আসতে পারছি না। পা দুটো যেন মেঝেতে থাম হয়ে গেছে। হঠাৎ কে যেন খুব ভারি গলায় পরিষ্কার বললে, 'যাও, শুয়ে পড়ো'। আমরা কাঁপতে কাঁপতে ওপরে এসে, দুজনে জড়ামড়ি করে শুয়ে পড়লুম।
পরের দিন সকালে গিয়ে দেখি, জানলাটা বন্ধ হয়ে গেছে। দিদি মাকে জিগ্যেস করলে, 'ওই ঘরটা কোনওদিন খোলো না কেন মা!'
'ওই ঘরে বসে তোদের দাদু সাধনা করতেন। মৃত্যুর সময় বলে গিয়েছিলেন, বারোটা বছর ওর ঘর যেন খোলা না হয়। কেউ যেন না ঢোকে। এখনও দু'বছর বাকি আছে। দু'বছর পরে ওই ঘর খুলে পুজো হবে!'
এদিকে আমাদের কী হল, রাতের ঘুম চলে গেল। মাঝরাতে বাড়ির সবাই যখন সুখে ঘুমোচ্ছে, তখন আমি আর দিদি টর্চ হাতে পা টিপে টিপে, আস্তে আস্তে নীচে নেমে যেতুম। সেই ঘর। সেই শব্দ। আমাদের আর ভয় করত না। জানলাটা খোলা মাত্রই সুন্দর একটা গন্ধ। অন্ধকার আসনে শ্বেত মূর্তি। আমরা অপেক্ষা করে থাকতুম, যদি কোনও কণ্ঠস্বর আসে। সেই প্রথম দিনের মতো, 'যাও, শুয়ে পড়ো।'
এসেছিল কণ্ঠস্বর। সে এক ভয়ংকর ইঙ্গিত। 'তোমাদের বাড়িটা থাকবে না। গঙ্গা গ্রাস করবে।'
আমরা সে কথা বিশ্বাস করিনি। এতকালের এত বড় একটা বাড়ি জলে চলে যাবে। দিদি মাকে বললে। মা বললে বাবাকে। বাবা জ্যাঠামশাইকে। জ্যাঠামশাই কাকাবাবুকে। সবাই বললেন, 'গঙ্গা যদি নেনই আমাদের তো কিছু করার নেই। গঙ্গার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।'
সত্যিই তাই। প্রবল জোয়ারে একটু একটু করে পাড় ভাঙতে ভাঙতে প্রথমে গেল সেই সাধুর কুঠিয়া। ভাদ্রমাসের অবামস্যার রাত। ভাদ্রমাসে গঙ্গায় ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসে। বিশাল তার শক্তি। পর পর দুটো ঢেউ আসে। একটা ষাঁড় আর একটা ষাঁড়ী। সেই রাতে বান এল। প্রথম ঢেউয়ের আঘাতেই কুঠিয়ার পাড় ভেঙে গেল। দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে ঘরটা ধসে পড়ল ধুস করে। আমরা আমাদের ছাতে দাঁড়িয়ে দেখলুম। বেদিওয়ালা অমন সুন্দর ঘরটা ঝুপ করে জলে পড়ে গেল। ঘোলা জল পাক মেরে ছুটে চলেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। সেই বছরেই বাগানাটার তিনের চার অংশ গঙ্গায় চলে গেল। বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে আনলেন। তিনি সব দেখে বললেন, কিছু করার নেই। গঙ্গা পুব দিকে সরে আসছে। পশ্চিমে চর, পুবে ভাঙন। তিন লাখ টাকা খরচ করে বাঁধাতে পারেন, তবে টাকাটা জলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
মাঝরাতে আমি আর দিদি একদিন সেই ঘরের জানলা খুলে দাদুর অস্পষ্ট, ঝাপসা মূর্তিকে বললুম, 'আমাদের এমন সুন্দর বাড়িটা গঙ্গায় চলে যাবে? আপনি কিছু করবেন না! আমাদের কদমগাছ, বকুল গাছ, বেল গাছ, পিটুলি গাছ! খেলার মাঠের মতো আমাদের অত বড় ছাত! দক্ষিণের হলঘর। ঘরের ভেতর ঘর।'
কোনও উত্তর নেই।
'আর দু'বছর পরে আপনার ঘর তাহলে কে খুলবে!'
এইবার পরিষ্কার শোনা গেল, 'আমার ঘর খুলবেন মা গঙ্গা। আমার সাধনা, আমার আত্মা তিনি ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন সাগরে।'
সেই দিনের কথা মনে আছে। আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছি। তিন চারটে লরিতে আমাদের সব মাল উঠেছে। আমাদের একশো বছরের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি দূরে, ঘিঞ্জি একটা জায়গায়, যেখানে অনেক লোক, সারাদিন অনেক গাড়ি, দোকান পাট, কলকোলাহল। যেখানে গাছ নেই, পরিষ্কার বাতাস নেই। সারাদিন একটা কারখানার চিমনি ভুসভুস করে ভুসো ধোঁয়া ছাড়ে আকাশে।
কত দিন হয়ে গেল, সেইসব দিনের কথা। যেখানে আমাদের বাড়িটা ছিল সেখানে এখন গঙ্গা। একটা ফেরিঘাট হয়েছে। কত যাত্রী রোজ এপার ওপার করে। আর দাদুর ঘরটা যেখানে ছিল, সেইখানে হয়েছে টিকিটঘর। পারে যাওয়ার টিকিট মেলে সেই ঘরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন