সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

যাক প্রেম জিনিসটা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। অমন একটা সূক্ষ্ম সুন্দর স্বর্গীয় অনুভূতি! এখন সব দেহ, বিলকুল দেহ। এখন হাতে হাত ধরা মানে ধরাই। স্থূল একটা যান্ত্রিক বন্ধন মাত্র। সে হাতের আঙুলে, আঙুলে হৃদয় নেই। সে ধরায় তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য অবশ্যই একটা থাকে তবে বিধেয় কিছু থাকে না। আজকাল একটা কথাই সার হয়েছে, যদ্দিন আছ ভোগ করে নাও। ভোগ কে করবে? দেহ করবে। অতএব তাকে খিলাও খেলাও। অত:পর খুব যাচ্ছেতাই ভাষায় বলতে হয়, কেলিয়ে যাও। হৃদয় মানে প্রেম নয়। একটা মাংসল পাম্প। ইংরেজরা একটা 'হার্ভ' নাম দিয়েছে 'হার্ট।' সেই 'হার্টে' আবার বাইপাস', 'পেসমেকার'। কার হার্ট কে চালাচ্ছে! পেসমেকার বসানো ব্যক্তি পটল তুললেই হইহই—আগে ডাক্তার ডেকে মালটা খুলে নে। বুকের ইনসাইড পকেটে সত্তর হাজার টাকার ইতালিয়ান মাল। মৃত্যুর আগে দশটা বছর সংসারে কিছুই দেয়নি। পি এফ-এর হাফ বুকে ঢুকিয়ে ঘুরছিল। জনে জনে জ্ঞানদান করতে করতে শেষে অজ্ঞান। বউ থমকে বসেছিল, লাফিয়ে উঠল, হাফে ছাড়লে পঁয়ত্রিশ হাজার!
মোটা মোটা টাকা বড়লোকরা আজকাল দান করে সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানে। সে দান মানুষের দু:খে বিগলিত হয়ে নয়। ট্যাক্স রিলিফের জন্যে। কাঁড়িকাঁড়ি কালো টাকা রাখবে কোথায়! পেটে মাল বেশি ঢুকলে উলটি হয়, সিন্দুকে গাদা টাকা ঢুকলে একই ব্যাপার, উগরে দাও। দশ পার্সেন্ট লোক খেয়ে খেয়ে মরে গেল, বাকি কী খাব, কী খাব করে কলজে কঙ্কালসার।
বিশ্বমানবের এখন একটাই ধর্ম, উদাসীনতা। নিজের প্রতি উদাসীনতা, অপরের প্রতি উদাসীনতা। আমি আমার, তুমি তোমার কেউ কারও নয়রে বাপ। তুমি মরো আমি আয়েস করে দেখি, অথবা আমি মরি তুমি আয়েস করে দ্যাখো। আমি প্রচুর বাজার করে ফিরি, তুমি তোমার নোনালাগা বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকো ফ্যালফ্যালে ভ্যালেভ্যালে হয়ে। আমার ছেলে সাকার, তোমার ছেলে বেকার। অথবা বিপরীত। এখন জীবন দর্শনটা এই দাঁড়িয়েছে, তুমি মরছ মরো, আমি বাঁচি। তুমি অসহায়, আমি তোমার সহায় হতে যাবো কোন উদারতায়!
আজকাল মানুষ মানুষের দিকে এমন চোখে তাকায় যেন রাস্তার কুকুর। সভ্যতা ভদ্রতার পুরোনো আদল ঘুচে গেছে। শ্রদ্ধা বহুকালই হাওয়া। খাতির সেইখানেই যেখানে স্বার্থের আদানপ্রদান। আর ততদিনই যতদিন স্বার্থ থাকবে।
নিষ্প্রাণ এই মানব সভ্যতা। একটা মানুষে আর একটা মোটর গাড়িতে আকার আকৃতিগত পার্থক্য ছাড়া আর কোনও পার্থক্য রইল না বোধ হয়। ইঞ্জিন, ডিস্ট্রিবিউটার, এসি পাম্প, ফ্যান, ফ্যানবেল্ট, র্যাডিয়েটার, শক অ্যাবসর্ববার। মানুষের হার্ট, লাংস, কিডনি, শিরা, উপশিরা, মাথা, মাথার বনেট। মুখগহ্বরের অন্তরালে এসোফেগাস। মোটরের পেছন দিকে ক্যাপ খুলে পেট্রল বা ডিজেল ঢালা হয়। সেইটাই পুড়ে ইঞ্জিনে পাওয়ার জোগাবে। পিস্টন ঘুরবে, চাকা চলবে। মানুষ মুখ দিয়ে পেটের ফুয়েল ট্যাঙ্কে সলিড লিকুইড ঢোকাবে। স্টম্যাকে তৈরি হবে কাইলস। খাদ্য বিভাজিত হবে, বর্জিত হবে পায়ু পথে। মোটরের এগজস্টের মতো মানুষের এগজস্ট, সেখানেও ফিট করা আছে একটি সাইলেনসার। নয়তো বায়ু নি:সরণের বিকট শব্দে স্যুটেড বুটেড বাবুদের প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যেত।
মোটর সেলফ স্টার্ট নিয়ে ছুটল। মানুষও তাই। স্টার্ট। ধান্দা শুরু। মোটরে মানুষের আসনে একজন চালক থাকে স্টিয়ারিং-এ। মানুষের চালক বসে আছে মানুষের ভেতরে। সেই 'সফারে'র নাম 'ইচ্ছা'। সেই চালক 'ইচ্ছা' মাল খেয়ে 'আউট'। তার হাতে স্টিয়ারিং। ফল! ক্র্যাশ। পাঁইপাঁই ছোটো, ধাঁই ধাঁই মরো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন