সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সাগর, সে তো বিশাল। পৃথিবীর তিনের চার ভাগই জল। কিন্তু পৃথিবীর জ্ঞান-সাগর আরও বিশাল, অনেক গভীর। সেই সাগরে সন্তরণ করলে কোথা থেকে যে কোথায় চলে যাওয়া যায়! একটা গল্প শোন যাক—
গভীর রাত। একটি চোর চুরি করতে বেরিয়েছে। এক গৃহস্থের বাড়ির দোতলার কার্নিসে উঠে জানালার ফ্রেম ধরে ঘরে ঢুকতে যাবে, ফ্রেম খুলে জানলাসুদ্ধ চোর সোজা মাটিতে। ঠ্যাং গেল ভেঙে।
চোর আবার এমনই চোর, সোজা কোর্টে গিয়ে বাড়ির মালিকের নামে ক্ষতিপূরণের একটি মামলা ঠুকে দিলে। বাড়ির মালিক এজলাসে জজসাহেবকে বললেন, 'জানালার আমি কী জানি! ধর্মাবতার! জানালা তো বসিয়ে গেছে ছুতোর মিস্ত্রী। সে-ই তো তাহলে প্রকৃত অপরাধী। সাজা দিতে হলে তাকেই ধরে আনুন।'
ছুতোর এসে বললে, 'আমার কী দোষ। রাজমিস্ত্রীকে ধরুন। সে কেন ঠিকমতো ফাঁক রাখেনি।'
রাজমিস্ত্রী বললে, 'ধর্মামতার! এর জন্যে আমি দায়ী নই, দায়ী এক সুন্দরী রমণী। আমি যখন ভারায় উঠে কাজ করছিলুম তখন সে নীচের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে কাজ করছিলুম। গাঁথনিটা তাই বেঁকে গেল।'
সেই মহিলাকে আদালতে ধরে আনা হল।
মহিলা বলল, 'হুজুর! এমনি আমার দিকে কেউ কখনও তাকায় না, তবে সেদিন আমি এমন একটা শাড়ি পরেছিলুম, যার বাহারে লোক না তাকিয়ে পারে না। ওই শাড়ি যে ছাপিয়েছে, সেই রংকারই তাহলে দায়ী।'
জজসাহেব বললেন, 'অ্যায়, আসল অপরাধীকে এইবার পাওয়া গেছে। ধরে আন তাকে।'
রংকার এল। দেখা গেল, সে আর কেউ নয়, ওই মহিলারই স্বামী। শুধু তাই নয়, সেই ওই ঠ্যাং ভাঙা চোর।
এটি একটি 'সুফী' গল্প। যার গভীর অর্থ হল, সেই এক। একেরই খেলা। অর্থ, অনর্থের মালিক সেই এক। বড় সুন্দর ভাব। আমাদের হিন্দু দর্শন, আমাদের বেদান্তের সহজ সরল রূপ। একই বহু হয়ে বিশ্বপটে লীলা করছেন। আর একটি কাহিনি আমাদের আরও কাছাকাছি, 'আমি ভ্রমণ করতে করতে এক নগরে এলাম। অপরিচিত মানুষ দেখে সবাই আমাকে ঘিরে প্রশ্ন করতে লাগল,
তুমি আসছ কোথা থেকে পথিক?
যাচ্ছ কোথায়?
তোমার ভ্রমণসঙ্গী কারা?
তোমার বংশ পরিচয়?
তোমার উত্তরাধিকার?
তুমি উইল করে তোমার পরবর্তী প্রজন্মকে কী দান করে যাবে?
তুমি কাদের বুঝেছ?
তোমাকে কারা বুঝেছে?
তোমার ধর্মমত কী?
কে সমস্ত মতের অধিকারী?
কার কোনও ধর্মমত নেই?
সমস্ত শুনে, আমার জবাব হল,
তোমাদের কাছে যা বহু তা আসলে এক।
তোমাদের কাছে যা সহজ, তা সহজ নয়।
তোমাদের কাছে যা জটিল, তা কিন্তু খুব সহজ।
এককথায় সব প্রশ্নের একটিই সহজ উত্তর, সবই সেই 'তিনি'।
কঠিন তত্ব কত সহজ হতে পারে, কত সহজ করে বলা যেতে পারে নীচের প্রসঙ্গটি তার প্রমাণ,
উটকে জিগ্যেস করলুম, 'তুমি চড়াই ভালোবাস না উতরাই। কোন পথ তোমার পছন্দ?'
উট বললে, 'ওসব আমার ধর্তব্যের মধ্যে নেই। আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, বোঝা। কতটা ভার আমাকে বইতে হবে।'
সংসার মার্গে সংসারী আমি, ভারবাহী। পথ যে দিকেই যাক আমাকে ভার বইতে হবে। সেইটাই আমার নিয়তি।
কেমন সুন্দর, সুন্দর সব কথা,
হীরে পাঁকে পড়ে থাকলেও মূল্যবান হীরে। আর পথের ধুলো উড়ে স্বর্গে গেলেও সেই ধুলোই। একটা নেকড়ে বাঘের বাচ্চা বড় হলে নেকড়ে বাঘই হবে, মানুষ তাকে যতই তোয়াজ করুক না কেন!
সুফী সাধনের উক্তি, দ্যাখো, এই গর্ব কোরো না যে, তোমার কোনও অহংকার নেই। আমি অহংকার জয় করেছি। এমন র্গব ভুলেও কোরো না। কারণ, এ এমন এক বস্তু যেন, an ant's foot on a black stone in a dark night. অন্ধকার রাতে কালোপাথরে একটি পিঁপড়ের পদচিহ্ন। আবার এও ভেব না যে, এটিকে সহজে বের করা যাবে। অতি দুরুহ কাজ। কীরকম? ছুঁচ দিয়ে পৃথিবীর ভূমি থেকে একটি পর্বতকে খুঁটে তোলার মতোই দু:সাধ্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন