সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রথম পাতা : আমার গবেষণার বিষয়। সেদিন রাতে কী হল কে জানে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল এর সীমা কোথায়! দূর আরও দূর তারপর আরও দূর। অসীম। এই অসীমের মাঝে আমরা ক্ষুদ্র জীবজগৎ সসীমদেহে আবদ্ধ। চলছি, ফিরছি, হাসছি, কাঁদছি, তারপর সবশেষে কোথায় যাচ্ছি! তাহলে জীবন কী! মৃত্যুতেই কি জীবনের শেষ! জীবন কি তাহলে জাগতিক উপাদানেই তৈরি? যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী! জীবন আর দেহ কি এক? একের বিনাশ অপরের বিনাশ?
জীবন কি তাহলে তৈরি করা য়ায়? কে বলবে, কে জবাব দেবে? আমি জানি—সারা বিশ্বে এক শ্রেণির লোক নিভৃতে গিরি কন্দরে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফিরছেন। আকুল হয়ে বলছেন—'আত্মানাং বিদ্ধি' Know thyself.
আমিও জানব, জগৎকে জানাব। যন্ত্র দিয়ে প্রমাণ করব।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা : আমার ল্যাবরেটারি। গবেষণা কক্ষ—কাটগ্লাসের দেওয়াল। মেঝে স্টিল-প্লেটের। তার ওপর জুট ম্যাটিং। ছাদ অ্যালুমিনিয়ামের। ঘরের উত্তাপ শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি, যে উত্তাপে জল প্রায় জমে বরফ হয়ে যায়। আমার গবেষণা কৃত্রিম উপায়ে এই উত্তাপ নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভরশীল। সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে ফিকে নীল আলো।
এই ঘর মেরুপ্রদেশের মতন শীতল। কী আশ্চর্য! ঘরের বাইরে বৈশাখের বিষুব উত্তাপ আর ঘরের ভিতর! ওভারকোট, ফেল্ট ক্যাপ, গরম দস্তানা ছাড়া ঢোকাই যায় না।
তৃতীয় পৃষ্ঠা : গবেষণা উপকরণ সংগ্রহ। এই গ্রামের অধিবাসীরা আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। ঠিক আছে তাদের নিরক্ষরতাই আমার কাছে শাপে বর! অর্থ অনেক ক্ষেত্রে নিরক্ষরকে বশে আনে।
সারা সকাল অনেক চেষ্টায় একটি নারী কঙ্কাল জোগাড় করেছি। এর মৃত্যু হয়েছিল আত্মহত্যায়।
এইবার চাই টাটকা মাংস, মনুষ্য মাংস কোথায় পাই? চাই নর-শোণিত, তাই বা কোথায়? দেখা যাক—
চতুর্থ পৃষ্ঠা : কাল আমার গবেষণা কক্ষে ছোট্ট একটা গবেষণা করলুম। মানুষের মাংসের পরিবর্তে বানর-দেহের উপরকার লোমশূন্য ভিতরের মাংস ব্যবহার করা যেতে পারে। অতএব মাংস সমস্যার সমাধান হল। এ গ্রামে বানরের অভাব নেই।
রক্ত? দরিদ্র গ্রামবাসীরা প্রচুর অর্থের লোভে রক্ত দিতে রাজি হয়েছে। তাদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে আমার খেয়াল চরিতার্থ করতে হচ্ছে। দু:খিত।
পঞ্চম পৃষ্ঠা : মানুষের আয়ু অল্প। অসীম বিশ্ব আর সেই বিশ্বকে আয়ত্তে আনতে কত জন্মই না কেটে যাবে! পুনর্জন্ম যদি সত্য হয় তাহলে দেহ গেলে জন্মাবে কে? জীবন? তাহলে জীবন কি জাগতিক উপাদানে তৈরি নয়? জানো, জানো সেই সত্যকে!
কাল গভীর রাতে জীবজগৎ যখন ঘুমে অচেতন থাকবে তখন আমার ল্যাবরেটারির হিমশীতল কক্ষে শুরু হবে বিচিত্র গবেষণা। সে গবেষণার সাক্ষী কেউ থাকবে না। যদি আমি সফল হই সেই সাফল্যের ইতিহাস বিশ্ববাসী শুনবে আমার তৈরি মানুষের মুখ থেকে।
ষষ্ঠ পৃষ্ঠা : আমার গবেষণার ভিত্তি। এই মানুষের শরীরে হৃদপিণ্ডটাই জীবনের উৎস। সেটা থেমে গেলেই মৃত্যু। হৃদপিণ্ড থেকে উষ্ণ শোণিতের স্রোত ধারা শরীরে জীবনের সাড়া তুলে অসংখ্য শিরা উপশিরার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রক্ত যেখানে যায় না সে স্থান পঙ্গু, সে স্থানের কোনও অনুভূতি নেই।
সপ্তম পৃষ্ঠা : রাত একটা। নিথর নিস্তব্ধ বিশ্ব প্রকৃতি। চারিপার্শ্বে তার অসীমের বেড়া। আমার হিমশীতল ল্যাবরেটারি কক্ষ। অ্যালুমিনিয়ামের ছাদে যে কড়া, তার থেকে বেল্ট দিয়ে ঝোলানো নারী কঙ্কাল। কুমার যেমন প্রতিমা গড়বার আগে কাঠামো খাড়া করে, এই কঙ্কালও তেমনি কাঠামো।
সামনে টেবিলে কাচের জারে ইথারে ভিজানো বানরের হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস। কাচের ট্রেতে অসংখ্য ছোট বড় সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম শিরা, উপশিরা কৃত্রিম উপায়ে রবার থেকে তৈরি। মোমের ট্রেতে পর পর সাজানো অসংখ্য স্লাইস করা টাটকা বানর মাংস ও গ্রন্থি। এরা পচবে না অনেকদিন, টাটকা থাকবে—কারণ হিমশীতল এই কক্ষ। আর এই হিমশীলতাই আমার গবেষণার সাফল্যের একটা অঙ্গ।
কী বিচিত্র আমার গবেষণাগার। চারিপার্শ্বে আমার মৃত্যু, যাদের এক করলেই জীবন। তাই কি!
অষ্টম পৃষ্ঠা : দিন যায়। অসীম অধ্যবসায়ে গড়ে ওঠে আমার মানসী। আমি ভাস্কর নই। ক্ষমা করো আমাকে, তোমার মুখের আদল যেমনটি হওয়ার কথা তেমনটি দিতে পারছি না। তোমার চোখ যতটা টানা হওয়ার কথা ততটা হল না। তোমার গাত্রাবরণ যতটা শুভ্র করতে চেয়েছি ততটা হয়নি। প্রতিমা তৈরি করেছি কিন্তু দক্ষ ভাস্করের দেহ সৌষ্ঠব তাকে দিতে পারিনি। আমায় ক্ষমা করো।
নবম পৃষ্ঠা : গভীর রাত। কাল রাত ভোরে বিশ্ববাসী হয়তো শুনবে আশ্চর্য অচিন্তনীয় এক আবিষ্কারের কথা। হয়তো কাল থেকে খুলে যাবে তাদের সামনে নূতন যুগের দরজা। নয়তো এই গতানুগতিক যুগ প্রবাহই চলবে আরও প্রবহমানকাল ধরে। এই হিমশীতল কক্ষ থেকে এই প্রতিমাকে এইবার নিয়ে যেতে হবে পাশের কক্ষে। উষ্ণ শোণিত স্রোত প্রবাহিত হবে এর ধমনীতে ধমনীতে—তারপর! সত্যই কি পাব জীবনের সাড়া?
দশম পৃষ্ঠা : আমার প্রতিমাকে প্রথমে দেওয়া হল ২০ ব্লাড প্রেসার। হৃদপিণ্ডকে কৃত্রিম উপায়ে সঞ্চালিত করেছি। কিন্তু কোথায় জীবনের সাড়া!
৪০ ব্লাড প্রেসার—হাতের কবজিতে নাড়ির স্বাভাবিক গতি। সে গতিতে মানুষকে জীবিত বলা যেতে পারে। নাসিকা প্রান্তে মৃদু স্বাভাবিক শ্বাস, প্রশ্বাস। তবে কি তুমি জীবিত হলে! এই তো তোমার বাম বক্ষ প্রান্তে হৃদপিণ্ডের মৃদু ধুক ধুক ধ্বনি! তোমার ঠোঁট কি ওই নড়ছে! তোমার আঁখি পল্লব কি কাঁপছে! না কই সে সবতো কিছুই হচ্ছে না! অথচ আমি ডাক্তার, আমি জানি তুমি এই মুহূর্তে জীবিত কিন্তু তোমাতে জীবনের অভিব্যক্তি কই?
প্রথম পরীক্ষা : হাতের আঙুলে ছুচ ফোঁটালাম। তাজা রক্ত। কে বলবে তুমি মৃত! তোমার মুখে তো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নেই?
দ্বিতীয় পরীক্ষা : বার্নারের আগুন আঙুলের ডগায় ঠেকালুম। অল্প স্পর্শ, মুখের ভাব অবিকৃত। অধিকক্ষণের স্পর্শ, আঙুল পুড়ে গেল, চামড়া পোড়ার উৎকট গন্ধ। কী আশ্চর্য! তবুও মুখের ভাব অবিকৃত।
তৃতীয় পরীক্ষা : ওপর চোয়াল ও নীচের চোয়ালে কোনও তেজ নেই। খুলে দিতে আপনি বুজে যাচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষ স্বইচ্ছায় এদের চালনা করতে পারে।
মাথায় আমার হাজার চিন্তা, হাজার প্রশ্নের ভিড়। তোমার জীবন রয়েছে, যাকে আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে জীবন বলে, কিন্তু জীবনের সাড়া নেই। তোমার অনুভূতি কোথায়? তোমার ইচ্ছা কোথায়? এইতো আমার প্রগাঢ় আলিঙ্গনে তুমি বাঁধা, তোমার মতো নারী এই আলিঙ্গনে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু তুমি? তোমার দেহে উষ্ণ উত্তাপ, কিন্তু তার চাঞ্চল্য কই। তবে আমরা যাকে জীবন বলি, আমরা যাকে জীবিত বলি, তার ভিতর কি জীবন ছাড়াও আরও একটা জিনিস আছে যা এই জীবিত শরীরকে চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়? এই শরীর জীবনের অভিব্যক্তি ঘটায়। যার অনুভূতি এই জীবিত দেহ ভর করে ফুটে ওঠে। তবে কি আত্মার অস্তিত্ব সত্য। হে সাধক! যুগ যুগ ধরে তোমাদের তপস্যা কি তা হলে বিফলে যায় না! বিজ্ঞান যা এতদিন অবিশ্বাস করেছে তা কি তবে সত্য?
একাদশ পৃষ্ঠা : সকাল। কাল রাতের পোড়া আঙুলে ঘা। নিশ্চয়ই তুমি জীবিত। কিন্তু এ কী, তুমি দাঁড়াতে পারলে না, তোমার বন্ধন মুক্ত করা মাত্র পড়ে গেলে। দাঁড়াবার ইচ্ছা আমি তোমাকে কেমন করে দেব? জীবন থেকে শক্তি আসছে না, আসছে না ইচ্ছা। কী থেকে আসবে! আত্মার অস্তিত্ব, বেদের সেই অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ জ্যোতির্ময় পুরুষের অস্তিত্ব তবে কি বিনা প্রমাণেই মানতে হবে!
দ্বাদশ পৃষ্ঠা : গভীর রাত। এ রহস্যের মীমাংসায় আমার জীবনপণ করলুম। আজ সকালে আমার কৃতী ছাত্র গৌতমকে খবর দিয়েছি, সে দু-একদিনের মধ্যেই এসে পড়বে।
আমার মানসী প্রতিমাকে উষ্ণ ঘরের চেয়ারে বসিয়েছি, হাতে তার দিয়েছি খোলা কলম, সামনে দিয়েছি সাদা কাগজ। আমি যাব পাশের ঠান্ডা ঘরে, সেখানে মৃত্যুর দ্বারা আমার আত্মাকে দেহবিমুক্ত করব, তারপর জীবনের পরপারে যদি কিছু থাকে, আমার মানসী প্রতিমাকে দিয়ে লিখিয়ে যাব। রাত দুটো...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন