সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

খাওয়া-পরার সমস্যা মিটে গেলেই শুরু হয় আসল সমস্যা। একটা লোহার গজালের চেয়ে অসংখ্য আলপিনের যন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি, যাকে বলে শরশয্যা। যত টাক বাড়ে তত অশান্তি বাড়ে।
এক বড়লোককে একদিন খুব চিন্তিত দেখে প্রশ্ন করলুম, 'খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। কী হল গোপালদা, শেয়ারের দাম পড়ে গেল না কী?'
তিনি বললেন, 'আরে শেয়ারের দাম আজ পড়লে কাল উঠবে; কিন্তু এই যে রোজ ভুসভুস করে চুল পড়ে যাচ্ছে, সে কী আর উঠবে!'
'আপনার মাথায় যা চুল রোজ একশোটা করে পড়ে গেলেও টাক পড়তে মিনিমাম তিরিশটা বছর। আর টাক তো পুরুষের ব্যক্তিত্ব।'
'আরে ভাই আমার চুল নয়, আমার গিন্নির চুল। ভয়ে চিরুনি ঠেকাতে পারছে না।'
'নার্ভাস ব্রেকডাউন। এমন কোনও জিনিস নেই যা মাথায় লাগাচ্ছে না। আরও কেলেঙ্কারি কার পরামর্শে জানি না কপালের ওপরটা ব্লেড দিয়ে চেঁচে সাফ করে দিয়েছে। তাতে কীরকম দেখতে হয়েছে জানো, একেবারে লেডি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এখন আমাকে আদেশ হয়েছে, টাটকা গরম গোবর জোগাড় করে আনতে হবে। আমি বলেছিলুম, সে আমি কোথায় পাব! বললে, পয়সা ফেললে গণ্ডারের গোদুগ্ধ পাওয়া যায়।'
'বউদি ঠিকই বলেছেন, আপনার পয়সার অভাব নেই। আমার সঙ্গে চলুন একটা নধর গরু কিনে দিচ্ছি, ঘণ্টায়, ঘণ্টায় ধোঁয়া ওঠা গরম টাটকা গোময় বউদির মাথাময়।'
'গরুটাকে রাখব কোথায়?'
'কেন? গাড়ি রাখার গ্যারেজ করেছেন, গরুরও গ্যারেজ হবে।'
'পাবলিক আপত্তি করবে। এই পশ এলাকায় গোয়াল চলবে না।'
'বেশ তারও উপায় আছে। ক্রেন দিয়ে গরুটাকে ছাতে তুলে দোব। তার জন্যে একটু বড় মাপের একটা টয়লেট করে দিন। একটা শাওয়ার।'
'আরে ভাই রসিকতা করছ করো, টাকের বেদনা তুমি কী বুঝবে। মানুষ মেনে নেয় ঠিকই তবে জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়। চুল একটা কত বড় শোভা। চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা। জীবনানন্দ। যুগ যুগ ধরে কেশ নিয়ে কত কবিতা।'
আর এক বড়লোকের সঙ্গে দেখা হলেই দু-চারটি এদিক সেদিক কথার পর সেই এক অভিযোগ, 'বুঝলে, একালে রাবড়ির কোয়ালিটি বড় পড়ে গেছে। সেকালের মতো চৌকো চৌকো সরঅলা রাবড়ি আর পাওয়া যায় না। সারা কলকাতার রাবড়ির স্যাম্পেল টেস্ট করে দেখলুম, রাবড়ি খাওয়াটা ছাড়াতেই হবে। ফুলকো লুচির খোসা দিয়ে পোয়াটাক রাবড়ি!'
'মানুষের ভাত জুটছে না, ইনি রাবড়ির শোকে অধীর।'
কত্তা-গিন্নী দুজনেই আধপাগলা হয়ে ঘুরছেন। ব্যাপার কী। মাথামোটা ছেলেটিকে কলকাতার দামি স্কুলে ভরতি করতে পারছেন না। যার সঙ্গে দেখা হয় তাকেও পাগলা করে ছাড়েন, 'সোর্স, সোর্স জানা আছে ভাই!' এনি অ্যামাউন্ট। প্রয়োজন হলে দেশের প্রপার্টিটা বেচে দোব।'
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। ওদিকে দুজনের নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছিল। একজন আর একজনকে জিগ্যেস করেছে, 'কী রে রেশনে চিনি আছে।' সে বলেছে 'আছে আছে'। সঙ্গে সঙ্গে একজন লাফিয়ে চলে গেল, 'আছে আছে, সোর্স আছে।'
'ধ্যার মশাই কীসের সোর্স। রেশানে চিনি আছে।'
বোঝাতে গেলুম, 'মাথাটাই সব, স্কুলে কী হবে! পঞ্চাননতলা স্কুল থেকেও ভালো ছেলে বেরোয়।'
কে কার কথা শোনে। সোর্স সোর্স করে হার্ট-অ্যাটাক হয়ে গেল। যাকে মানুষ করার জন্যে পাগল, সে সারাদিন ঘাড় উঁচু করে টিভির সামনে বসে থাকে। কার্টুনের সামনে এক জ্যান্ত কার্টুন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন