পদকে নই পদানত

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘পি. এম. আসছেন। পি. এম।' চার লক্ষ টাকা খরচ করে তৈরি করা হয়েছে সুবিশাল এক তোরণ। সারা ভারতে যেখানে যত তোরণ আছে সেইসব তোরণের ডিজাইন জগাখিচুড়ি করে বিরাট এক ভাস্কর এটি নির্মাণ করেছেন দেশলাই কাঠ আর কাগজ জুড়ে। টেম্পোরারি ব্যাপার তো। ঘণ্টা তিনেক পরে এই তোরণের আর কোনও প্রয়োজন থাকবে না। তখন এইটাতে আগুন ধরিয়ে 'বনফায়ার' হবে। অলিম্পিক 'বনফায়ার'। সাতমণ ঘি ঢিলে একটা মহাযজ্ঞও হবে। চলবে তিনদিন।

ভারতবর্ষের নামে সঙ্কল্প করে শুরু হবে 'হুমন'। প্রার্থনা করা হবে পরবর্তী অলিম্পিকে ভারতের খোলনলচে যেন একেবারে খুলে পড়ে। খুলে পড়ে মানে, টেংরি খুলে দৌড়তে হবে। গোল্ড, গোল্ড না হলে সিলভার, সিলভার না হলে ব্রোঞ্জ। তাতে যদি টেংরি কাঁধে করে দেশে ফিরতে হয় সেও ভি আচ্ছা। খালি হাতে ফিরলে পশ্চিমবাংলায় নির্বাসন।

প্রেস অ্যাডভাইসার বিনীতভাবে প্রশ্ন করেছিলেন, 'পি. এম. স্যার পশ্চিমবাংলায় কেন স্যার!'

পি. এম. বলেছিলেন, 'সারা ভারতে ওইটাই একমাত্র রাজ্য যা কেন্দ্রের বাইরে। কেন্দ্রের বাইরে মানে ভারতের বাইরে। সেন্টারের স্টেপডাউন। সৎমায়ের কন্যা। নরক বলা চলে। সারা দিন রাত ওখানে ধেই ধেই নৃত্য আর হরিনাম সংকীর্তন চলেছে। ওখানে রিভলভারধারী পুলিশ মাস্তানের ভয়ে ছুটে পালান। সেখানে পুলিশে চোর ধরে না, চোর পুলিশ ধরে। নেতায় নেতায় লেজ কামড়া কামড়ি হয়। সর্বোচ্চ অফিসার ইউনিয়নের ক্লাস ফোর নেতাকে স্যার বলে সম্বোধন করেন। না করলে তাঁর চেয়ার চলে যায়। সেই রাজ্যের সমস্ত রাজপথ ঢেউ খেলানো। সাত হাত অন্তর পলিটিক্যাল বাম্প। আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিল কোন এক চেম্বারের জুবিলিতে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এসে খবর দিলে, যে পথে যেতে হবে সেই পথে মোট দেড়শোটা পলিটিক্যাল বাম্প আছে।'

'স্ট্রেঞ্জ, পলিটিক্যাল বাম্প, সেটা কী জিনিস।'

'উ:, আপনাদের অজ্ঞতার কোনও সীমা পরিসীমা নেই। পশ্চিম বাংলায় একটা বামজোট দেশ শাসন করছে, জানেন কি তা?'

'ইয়েস স্যার।'

'জানেন কি ওয়েস্ট বেঙ্গলে কোনও গাড়িই ট্রাফিক রুল মানে না। মানানো যায় না। জানেন কি সেখানে গীতা, বেদান্ত, মার্কস, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, সব একসঙ্গে পরিপাক করে একটা হাঁড়িকাবাব তৈরি করেছে। লোক না পোক ভেবে ড্রাইভাররা রোজ দু-দশটাকে জামা পালটে ছেড়ে দেয়।'

'জামা পালটানোটা কী স্যার!'

'অ, আপনি তো আবার ইংলিশ মিডিয়াম। কাল থেকে দু'পাতা করে গীতা পড়ার অভ্যাস করুন। পড়া উচিত। কাজে লাগবে। কবে আছি মশাই কবে নেই। পশ্চিম বাংলার যুবকরা ভারী সুন্দর একটা কথা বলে, মায়ের ভোগে চলে যাওয়া। ব্যাপারটা কী জানেন, মরে যাওয়া। গীতা, বেদান্ত আর মার্কস তিনটিকে ওরা একেবারে গুলে খেয়েছে।

গীতা বলছেন, মৃত্যু বলে কিছু নেই। শরীর হল একটা জামা। সেই জামা পরে আছে একটা আত্মা। এই আত্মা আবার কোনও আত্মা। সেই অখণ্ড আত্মার অংশ। যাকে আমরা বলি পরমাত্মা। আপনি তো আবার ইকনমিকসের লোক। আপনাকে আত্মা বোঝাতে হলে ইকনমিকসের উদাহরণ দিতে হবে। আত্মার ব্যাপারটা বোঝানোর সহজ উপায় হল, আমাদের মনিটারি সিস্টেম।

আমাদের কারেন্সি হল পরমাত্মা, আর এই ষাট কোটি আত্মা হল টাকা, দশ পয়সা, পাঁচ পয়সা, পঁচিশ পয়সা। নানা মূল্যের রেজগি আর কী। সেই একের সঙ্গে যার সম্পর্ক। এক হইতেই বহু, বহু হইতেই এক। আত্মার সর্বাধুনিক মনিটারি ডেফিনিশন। শরীররূপ জামা পরা আত্মা চাকার তলায় পড়া মানে দু:খের কিছু নয়। জামা পালটানো। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আবার নানা জাতে বিভক্ত, যেমন কংগ্রেস, সিপিএম, ফরোয়ার্ড ব্লক, আর এস পি অ্যান্ড সো অন। চাপা পড়লেই আন্দোলন। সঙ্গে সঙ্গে সহজ সমাধান, হাম্প। কংগ্রেস হাম্প, সি পি এম হাম্প, ফরোয়ার্ড ব্লক হাম্প। একে বলে বাম্পাইজম বা হাম্পইজম।'

'তা আপনি স্যার সেই হাম্পের ওপর দিয়ে জাম্প খেতে খেতে গেলেন?'

'না হে না। আমাদের ক্ষৌরকার গিয়ে সব চেঁছে সাফ করে দিয়ে এল। যাক কাল থেকে গীতা পড়বেন। মনে রাখবেন আমাদের পিছনে শমন। পাঞ্জাবে টেররিস্ট। যে কোনওদিন আমাদেরও মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দিতে পারে। গীতাই আমাদের একমাত্র ভরসা। গোরবাচেভও কিছু নয়, বোফোর্সও কিছু নয়। আসল হল সেই, নৈনং ছিন্দন্তি...পরের লাইন, নেকস্ট লাইন, কাম অন, কাম অন।' 'পরের লাইনটা স্যার, দাঁড়ান আমি লিটারারি অ্যাডভাইসারকে ফোন করে জেনে নিচ্ছি।'

'দেখছেন, আপনারা আমাকে ঠিক মতো ব্রিফ করতে পারেন না। এটা আমার ফরেন প্রেস কনফারেন্স হলে, আমার ভাবমূর্তিটা কী দাঁড়াত, একবার ভেবে দেখেছেন? ফাম্বলিং ফর লাইনস। আবার আমাকে একটা রিশাফলিং করতে হবে। আপনার জায়গায় আমাকে গজেন্দ্র গদাধরকে আনতে হবে। না, ছেলেটা হোপলেস। রোহিণী ক্যাটাপুল্টকেই নিয়ে আসি।'

পি. এম. একেবারে খাপ্পা হয়ে আছেন। সর্ব ব্যাপারে তিতিবিরক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে গেছেন। স্বপ্নের ভারত তাঁর দু'হাজার এক অব্দের ভারত, গ্রাইন্ড কনট্রোলের নিয়ন্ত্রণ হারা স্পেসক্র্যাফটের মতো মহাদেশের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে বসেছে। অর্থনীতি ধেবড়ে গেছে। রাজনীতি জেবড়ে গেছে। সমাজনীতি থেবড়ে গেছে। ল অ্যান্ড অর্ডার বমকে গেছে। আদর্শ চটকে গেছে। জাতীয়তা হড়কে গেছে। সম্প্রীতি সড়কে গেছে। সংস্কৃতি ল্যাংটো হয়ে গেছে! আর স্পোর্টস পটকে গেছে। সব যেন মামারবাড়ি ভেবে বসে আছে। তাই তাই তাই মামাবাড়ি যাই। মামি দিল নীল পাখি গীত শুনি ভাই। আমার স্ত্রী কি হোল কানট্রির মামি। ভোট দিয়ে তক্তে বসিয়ে এখন ভোট কম্বল চাপা দিয়ে কিলোবার চেষ্টা। 'ফয়ার' প্রেস অ্যাডভাইসার চমকে উঠে বললেন, 'কোন কামানে স্যার! বোফোর্স গান।'

পি. এম. এমনি মিষ্টি মানুষ। জোর করে দেশ শাসনে বসিয়ে না দিলে এক নম্বর ফিল্মস্টার হতে পারতেন। তখন সাউথের সি. এম.দের জারিজুরি খাটত না। দেবতা সেজে ভোট কামড়ানো বেরিয়ে যেত। সন্ন্যাসী সেজে ত্যাগী ভোগী আর হতে হত না। কিন্তু পি. এম. একবার রেগে গেলে তখন আর তিনি কারোর নন। তখন একমাত্র ফার্স্ট লেডিই তাঁকে সামলাতে পারেন। ক্ল্যাসিক্যাল গান শুনিয়ে, ইতালিয়ান রাগিনীতে। পি. এম. পাথরের মতো মুখ করে প্রেস অ্যাডভাইসারকে বললেন, 'প্রথম গোটা দুয়েক লাইন ভুলে গেছি, মোদ্দা কথা হল, মূর্খরা যত কম কথা বলে ততই তাদের মানায়। আপনি দয়া করে আসুন। রাত হয়েছে। পারেন তো একটু হোম ওয়ার্ক করুন। আপনাদের অজ্ঞতা মানে আমার অজ্ঞতা। ডোন্ট ফরগেট দ্যাট।' রাত আড়াইটের সময় পি. এম. আরাম কেদারায় বসে একটা ডিকটেশন দিলেন, ভারতীয় অলিম্পিক 'কমিটির কাছে', আপনাদের অপদার্থতায় আমার পিণ্ডি চটে গেছে। গদি টানাটানি, আঁকড়াআঁকড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকি সত্য। বিরোধীদের সঙ্গে বক্সিং আমাকে এক মুহূর্তও রিং ছেড়ে বেরোতে দেয় না, ও ভি সত্য; কিন্তু জেনে রাখুন স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডের সব খবর আমি রাখি। আমি ভারতকে যত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি, আপনারা সদলবলে ততই তাকে পেছিয়ে দেওয়ার তালে আছেন। যেদিকটা আমি না দেখব, সেই দিকটাই হড়কে যাবে। আবার সব ব্যাপারে নাক গলাতে গেলে বিরোধীরা সমালোচনা করবেন—ব্যাটা ডিকটেটার। এখন, বোর্ডের মহামান্য সদস্যরা বলুন, সোলে আপনারা কী করে এলেন? বেশ বেড়িয়ে এলেন তাই না। ভালো ফূর্তি হল, কী বলুন। একটা ঘুঁটের মেডেলও বরাতে জুটল না! উত্তম। অতি উত্তম। রাশিয়া হলে আপনাদের কী করা হত জানেন। গুলাগে চালান দেওয়া হত। ভারত বলে বেঁচে গেলেন। কম্যুনিস্ট কানট্রি হলে কামড়ে ছিঁড়ে দিত। এই হল লাল আর সাদার পার্থক্য। এখন দেখছি সাদা দেশে আপনারা সব সফেদ হাতি। যাক, এই শেষ রাতে আমি সিদ্ধান্ত নিলুম খেলার ব্যাপারে আমি নাক গলাব। ঘণ্টা দুয়েক ঘুমোতুম। সেই ঘুমও আমি বিসর্জন দিলুম দেশজননীর স্বার্থে। পুরো সিসটেমটাকে আমি ঢেলে সাজাব। আপনাদের কোনও কথা শুনব না। আপনাদের মুরোদ বোঝা গেছে। আমি এদিকে পলিটিকস করছি, আপনারা করছেন ওদিকে। আমার পলিটিকসে দেশ এগোচ্ছে, আপনাদের পলিটিকসে দেশ পেচোচ্ছে। কী খেলাই খেলছেন। আমাদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমি আরও ঘনিষ্ঠভাবে মিশব। প্রয়োজন হলে আমি নিজেই ট্রেনিং দেব। আমি সব পারি। প্রয়োজনে আমি ডিকটেটার হতে পারি, মাফিয়া হতে পারি, কম্যুনিস্ট হতে পারি। সোলে আপনারা আমার থোবনায় চুনকালি মাখিয়ে এসেছেন। আমি সব কর্মকর্তার টায়ার পাংচার করে দেব। আমি আসছি।'

পি. এম. আসছেন।

কর্মকর্তাদের একমাত্র ভরসা এই তোরণ। আমাদের পি. এম. শো বিজনেস পছন্দ করেন। তোরণটি একেবারে গ্রেটেস্ট শো আর্থ। এক ব্যাটেলিয়ান ব্ল্যাকক্যাট সিকিউরিটি চেক-আপের ঠেলায় তিন-চার জায়গা ড্যামেজ করে দিয়েছে। সেই সব জায়গায় সোল অলিম্পিকের লোগো দিয়ে তালি মারা হয়েছে। পি. এম.-এর পিতৃপুরুষদের বড় বড় ছবি ঝোলানো হয়েছে। লাল গোলাপ দিয়ে চারপাশ লালে লাল করা হয়েছে। গোলাপের প্রতি এই পরিবারের একটা দুর্বলতা আছে। মাতামহের বাটান হোলে শত দু:খের দিনেও একটি লাল গোলাপ গোঁজা থাকত। গোলাপ, সুন্দরী রমণী, হষ্টপুষ্ট ট্যাঁপোর-টোপর শিশু, তিনটি দুর্বলতাই সাজানো হয়েছে। সুন্দরী চিত্রতারকা। বাদ সেধেছে এক ব্যাটেলিয়ান লম্বা লম্বা ব্ল্যাক ক্যাট। কাঠখোট্টা চেহারা। মাথায় ঘাসকাটা চুল। ধূর্ত নেকড়ের মতো মুখ। কমনীয় আয়োজনে বাবলাকাঁটা। কে এক কর্মকর্তা পরামর্শ দিয়েছিলেন ইন্দিরাজীর কণ্ঠস্বর শুনলে রাজীবজী প্রসন্ন হবেন। তাঁর মন বেদনাবিধুর হয়ে উঠবে, তুচ্ছ জাগতিক ব্যাপার থেকে মন চলে যাবে স্বর্গীয় লোকে। সব গলতি মাপ করে দেবেন। আরে ইয়ার খেলমে তো হারজিৎ হায়ই হায়। গেম ইজ এ গেম। এ তো চিন-জাপান যুদ্ধ নয়। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট বিজনেস নয়। রেগনের স্টার-ওয়ার নয়। খেলকুদমে এইসি হোতাই হ্যায়। স্পোর্টসম্যান স্পিরিটি কালটিভেট করো। পি. এম.-কে একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন, যা সারা পৃথিবীর লোক ত্রেতা, দ্বাপর থেকে বলে আসছে। রাম বলেছেন, রাবণ বলেছন, কৃষ্ণ বলেছেন, কর্ণ বলেছেন, যিশু বলেছেন, জরথ্রস্ট্রু বলেছেন। আমার বাবা বলেছেন, বাবার বাবা বলেছেন, তাঁর বাবা বলেছেন, বাপুনে ভি কহা।

'আরে ঘোড়ার ডিম কথাটা কী বলো না। ভ্যানতাড়া না করে।'

'কথাটা হল, ফেলিওর ইজ দি পিলার অফ সাকসেস। ফেল করতে করতে, সাকসেস-এর কুতুব মিনার।'

'কথাটা অবশ্য মন্দ বলোনি ইয়ার। আমার আর একটা ডায়ালগ মনে আসছে। লর্ড কৃষ্ণ বলেছিলেন—কর্মণ্যে ইয়ে, কর্মণ্যে অকর্মণ্যে...।'

'আর চেষ্টা কোরো না, পি. এম. স্যাংস্কৃটে ভেরি স্ট্রং। মনে হয় আদ্য, মধ্য পাশ করা। কথাটা হল, কর্মে তোমার অধিকার, কর্মফলে নয়। সেকেন্ড কথা হল, কর্ম হল যোগের কৌশল। কী যোগ সেটা লর্ড পরিষ্কার করে বলেননি। আমার যদ্দুর মনে হয় ব্যাংক-ব্যালেন্স যোগ। ওদিকে যোগ না হলে শেষ জীবনে চিবোবোটা কী? আখের ছিবড়ে।'

'গেট রেডি। পি. এম. আসছেন।'

ঘোষণা হল। সবাই তটস্থ। সকলেই স্পোর্টস স্যুট পরে এসেছেন। ব্লেজারের বুকে বিভিন্ন পণ্য-প্রস্তুতকারক সংস্থার এমব্লেম। এইটাই বর্তমানের রেওয়াজ। কেউ ব্লেড কোম্পানির। কেউ টিভি। কেউ জুতো। কেউ জাঙ্গিয়া, কেউ পানমশলা।

পরপর একইরকম সাত-আটটা গাড়ি ঝড়ের বেগে তোরণ ফুঁড়ে চলে এল। সাতটা গাড়িতেই সাতজন পি. এম। এর মধ্যে একজন আসল। বাকি ছজন নকল। এর নাম ধোঁকাবাজি। এই দেখে টেরিরিস্টরা ভড়কে যায়। তিনজন কর্মকর্তা তিনদিক থেকে পড়ি কি মরি করে ছুটে গিয়ে তিনজন নকল পি এমকে 'আইয়ে জাঁহাপনা, আইয়ে জাঁহাপনা' বলে গাড়ি থেকে নামাতে গেলেন; ওদিকে আসল পি. এম. পাঁচ নম্বর গাড়ি থেকে নেমে, সিকিউরিটিকে প্রশ্ন করলেন, 'ওরা কারা?'

'তিনজন কর্মকর্তা স্যার।'

'দৌড়টা লক্ষ করলে।'

'ইয়েস স্যার।'

'তিনটেকে আলাদা করে স্টেপলার দিয়ে পিঠে নম্বর সেঁটে একপাশে করে রাখো। নেকস্ট অলিম্পিকে একশো মিটার ইভেনটের জন্যে তিনটেকেই পাঠাব। গোল্ড হয়তো পাবে না; তবে ব্রোঞ্জ একটা আনবেই।'

'সন্দেহ আছে স্যার। এরা মন্ত্রী দেখে দৌড়য়। অলিম্পিক কোর্টে পারবে না স্যার।'

'মন্ত্রী দেখে দৌড়য় মানে?'

'আজ্ঞে মন্ত্রী বিশেষত প্রধানমন্ত্রী হল ভবিষ্যৎ। যে আগে ছুটে গিয়ে নামাতে পারবে তার ভবিষ্যৎ ফিরে যাবে। এই দৌড় দেখে আপনি বিচার করবেন না। এই দৌড়ে ভারতীয়রা অতুলনীয়। এর নাম আখেরের পেছনে দৌড়নো।'

পি. এম. তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'এই টাকার শ্রদ্ধাটা করলে কে? কোন ব্যাবসাদার! এ তো মনে হচ্ছে দু'নম্বরি পয়সার খেল।'

পাশেই এক কর্মকর্তা দাঁড়িয়েছিল। তিনি বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, 'পি. এম. স্যার, এটা প্রাোভাবিয়াল পিলার।'

'সেটা কী বস্তু।'

'আজ্ঞে, ফেলিয়র থেকে সাকসেসের যে পিলার হয়। ফেলিওর ইজ দা পিলার অফ সাকসেস। এটা সেই পিলার।'

'তোমার মুণ্ডু।'

পি. এম. রাগে গনগন করতে করতে সভাকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রায় শ'তিনেক কর্মকর্তা ছুঁচোবাজির মতো এদিক ওদিক দিয়ে ছোটাছুটি শুরু করলেন।

সকলেই চাইছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি আসতে। পরের বারের ব্যবস্থাটা তো আসল স্পোর্টস। অ্যাথলিটদের চেয়ে অফিসিয়াল বড়। তার চেয়ে বড় গম্ভীরমুখো আমলারা।

পি. এম.-এর সামনেই দুই কর্মকর্তাদের ঘুষোঘুষি শুরু হয়ে গেল।

পি. এম. থমকে দাঁড়ালেন। প্রশ্ন করলেন, 'কী হচ্ছে বক্সিং?'

সিকিউরিটি চিফ বললেন, 'দিশি বক্সিং স্যার।'

'দুজনকে আলাদা করে দেখে রাখো, 'পরের বার পাঠানো যাবে।'

'এটা স্যার ইন্টারন্যাশনাল বক্সিং নয়, একে বলে খাবলাখাবলি, নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি, আপনার নজরে আসার জন্যে। এটা স্পোর্টস নয় পলিটিকস।'

'এনাফ অফ পলিটিকস। তুমি আমাকে পলিটিকসের কথা আর মনে করিয়ে দিয়ো না। ঘেন্না ধরে গেছে। মা যে আমাকে কী মুকুট পরিয়ে গেলেন! এ যেন সেই সাপের ছুঁচো গেলা।'

এর মাঝে একজন কোমর সমান উঁচু ডোডোনিয়া ভিসকোসার ঝোপ থেকে এক লাফে টপকে পি. এমের, সামনে এসে হ্যা হ্যা করে হেসে উঠলেন। পি এম থতোমতো খেয়ে বললেন, 'আপনি কী সোলে গিয়েছিলেন?'

'ইয়েস স্যার।'

'কী নিয়ে এলেন?'

'বেশি কিছু পারিনি স্যার। ডলারে টান পড়ে গিয়েছিল। গোটা তিনেক টেপরেকর্ডার, একটা ক্যামেরা, তিন বোতল পারফ্যুম, দশটা শার্ট, দুটো স্যুটকেস ছটা প্যান্টপিস, একটা ইলেকট্রিক সেফটিরেজার, ছ' টিউব শেভিং ফোম, এক ডজন মোজা, কিছু জুয়েলারি, আরও অনেক কিছু, পাগল করে দেওয়ার মতো সব জিনিস। আপনার কাছে একটা অনুরোধ, সামনের বার ওই দৈনিক দশ ডলার পকেট খরচটা অনুগ্রহ করে দশগুণ বাড়িয়ে দেবেন স্যার। তাহলে আমাদের আর কোনও অভিযোগ থাকবে না।'

'আপনি কি হার্ডলসে অংশ নিয়েছিলেন।'

'না তো। আমি তো স্পোর্টসম্যান নই। আমি তো অফিসিয়াল।'

'আই সি।'

পি. এম. হনহন করে সামনে এগিয়ে গেলেন।

এই ধরনের দ্রুত হাঁটায় তাঁর পরিবারে সকলেই অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর দাদু, তাঁর মা।

জনৈক অফিসিয়াল তাঁর পেছনে ছুটতে ছুটতে আর একজনকে বললেন, 'কিছুতেই ধরতে পারছি না। আমাদের পি. এম কেই তো পরের বার অলিম্পিকে পাঠিয়ে দিলে হয়।'

পি. এম. সোজা মঞ্চে গিয়ে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিশ বাইশ কেজি ওজনের বিশাল একটা মালা তাঁর গলায় এসে পড়ল। মুখের নীচের দিকে তলিয়ে গেল ফুলদলে। নাক পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেছে। একটু শ্বাস নেওয়ার জন্যে তিনি ছটফট করে উঠলেন। একজন ব্ল্যাক-ক্যাট ছুটে এসে মালাটা খুলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সভাস্থ সকলে হাততালি দিতে লাগলেন, আর কোরাসে বলতে লাগলেন, 'সেভড সেভড।'

পি. এম. তো, ভীষণ স্মার্ট, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'সেভ দি কানট্রি, নট মি' বলেই তিনি মাইক্রোফোনের টুঁটিটা চেপে ধরে বললেন, 'কে দায়ী! কারা দোষী।' সোলে ভারতের ক্রীড়াপ্রদীপ কারা এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দিলে এল! কোন হতভাগারা!'

'সভার দু'ধারে দু'সার মানুষ বসে আছেন।

মাঝে প্যাসেজ। পি, এম,-এর ডানধারে অফিসিয়াল। বাঁ ধারে অংশগ্রহণকারী অ্যাথলিটরা।

ডানধার একজোটে বলে উঠল, 'আমরা না স্যার।'

পি. এম. বললেন, 'ঠিক এইটাই আমি আশা করেছিলুম। একটা দামি ফুলদানি ভেঙে গেলে বাড়ির সকলে এইরকমই বলে। আমি ভাঙিনি। তবে কি ভূতে ভেঙেছে!'

খেলোয়াড়রা বললেন, 'কর্মকর্তারা দায়ী। দায়ী আমলারা। বিদেশ নিয়ে গিয়ে ওরা আমাদের সঙ্গে ছাগলের মতো ব্যবহার করেছে।'

কর্মকর্তারা চিৎকার করে বললেন, 'মিথ্যেবাদী স্যার। ওদের কেউই আর ফর্মে নেই। সব জাঙ্ক।'

দু'তরফে লেগে লেগ ধুমধাড়াক্কা। এরা বলে তোমরা, ওরা বলে তোমরা।

পি. এম. কিছুক্ষণ সহ্য করলেন। শেষে বললেন, 'স্পোর্টস আর পলিটিকস এক হয়ে গেছে। আর কোনও আশা নেই।' নিজের পি. এ.র দিকে তাকিয়ে বললেন, 'স্ট্যাটিসটিকস প্লিজ। কত টাকার শ্রাদ্ধ আমরা করে এলুম সোলে।'

'অ্যাকচ্যুয়াল ফিগারটা আপনাকে কাল দিতে পারব স্যার, তবে এবারের বাজেটে প্রচুর টাকা ছিল। আমরা কোনও অভাব রাখিনি। একেবারে ঢেলে দিয়েছিলুম।'

'সব তুলে নাও।'

'কী করে তুলব স্যার। সব তো ফুঁকে দিয়ে এসেছে।'

'যে যার ভিটে মাটি বিক্রি করে ইনস্টলমেন্টে টাকা শোধ করুক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমার বারোটা বাজাচ্ছে। রক্ত দিয়ে বক্রেশ্বর বিদ্যুৎ প্রকল্প করছে। আমার মানসম্মান। আমার ফ্যামিলির মানসম্মান নিয়ে টানাটানি। টাকা দিতে না পারে তো এক বালতি করে রক্ত দিয়ে আসুক। কোনও ক্ষমা নেই। কই টাইম ম্যাগাজিনটা দেখি।'

'এই যে স্যার।'

পি. এম. ম্যাগাজিন বাতাসে দুলিয়ে বললেন, 'আমাদের পারফরমেন্স সম্পর্কে আমেরিকার এই কাগজ কী লিখেছে আপনারা পড়েছেন?'

'বিদেশি কাগজ যা-তা লেখেই স্যার। আমাদের পলিটিকস নিয়ে লিখছে, আমাদের স্পোর্টস নিয়ে লিখছে, স্বদেশ কি, কি বিদেশ, সাংবাদিকদের ওই কাজ। আপনি তো জানেনই স্যার। কেন উত্তেজিত হচ্ছেন! আপনি রেগে গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার!'

'আমার রাগার আর দরকার নেই, ভবিষ্যৎ এমনিই অন্ধকার হয়ে গেছে। আমাদের পপুলেশন এখন কত?'

'কয়েকদিন পরে বলব স্যার। ওই টিভির ক্যুইজ কনটেস্ট হবে, শুনে বলে দেব। কোটির খবর আমরা তেমন রাখি না। মানুষের কী দাম স্যার। মানুষ তো আর টাকা নয়। আমার মাস্টারমশাই বলতেন, মাইন্ড ইওর ওন বিজনেস। মানে নিজের ব্যাবসায় মন দাও। ব্যাবসা মানে টাকা। যে ব্যাবসায় কোনও টাকা নেই, তাকে আমার পিতাশ্রী বলতেন, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। আর মাতাশ্রী বলতেন নিজের চরকায় তেল দাও।' পি এম তাঁর উপদেষ্টাকে জিগ্যেস করলেন, 'এ মালটা কে?'

'এইরকম মাল আপনি কত চান স্যার? মালের মালা হয়ে আছে। ছেড়ে দিন ওদের কথা।'

'বেশ ছেড়েই দি। ছাড়তে ছাড়তে তো সবই প্রায় ছেড়ে দিলুম, এইবার গদিটা ছেড়ে দিলেই হয়। কী জ্বালায় যে পড়েছি। আর আমার পলিটিক্যাল স্ট্রং হোল্ড উত্তরপ্রদেশটাই যেতে বসেছে। পাঞ্জাবের তো ওই ক্যাডাভারাস অবস্থা। কোনওরকমে একটা মিলখা সিং ছেড়ে, মার্কেটে ছেড়ে দিলে জার্নালি সিং। কোথায় ডিসকাস ছুঁড়বে, লোহার বল, তা না বোমা ছুঁড়ে আমার ফিউচারের বারোটা বাজাচ্ছে।'

'আপনারা ফিউচার কেন বলছেন স্যার। এইটাই তো ভুল করেন। বলুন দেশের ফিউচার। এই আমি, আমি করেন বলেই জনগণ আপনাকে ভুল বোঝে, ফিউডাল লর্ড বলে। পশ্চিমবঙ্গের এক বিশাল জনসভায় আপনাকে রাবণ বলেছে। আবার বলে কী, রাবণ সীতাকে স্পর্শ করেনি। রাবণ প্রাসাদে, সীতা অশোক কাননে ইনটাক্ট। কিন্তু আপনি রাবণের হাতে সীতা নড়লে, হিহি, হয়ে যেত।'

'কী অসভ্য! স্টপ ইট। স্টপ ইট। স্টপ ইট। এখানে আমরা এসেছি অলিম্পিক নিয়ে আলোচনা করতে। পশ্চিমবঙ্গ আমাকে যা খুশি তাই বলতে পারে, আমার সে স্বাধীনতা দেওয়া আছে। সি এম ইজ মাই ফ্রেন্ড। এটা আমাদের কততম অলিম্পিক গেল?'

'আমার ছেলে জানে!'

'সে কি ছেলের বাপ জানে না?'

'আজকাল স্পোর্টসটা স্যার আর অ্যাডাল্ট সাবজেক্ট নয়। অ্যাডাল্ট সাবজেক্ট হল ফিল্ম, পলিটিকস। স্পোর্টস ছেলেদের একেবারে কণ্ঠস্থ। যতদূর মনে হচ্ছে এটা ছিল চব্বিশতম অলিম্পিক।'

পি. এম. সভার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমরা আজ পর্যন্ত ক'টা পদক পেয়েছি! কাম অন, কাম অন, স্ট্যাটিসটিকস প্লিজ।'

'হকি । হকিতে আমরা পরপর কয়েকবার গোল্ড মেরে দিয়েছি। সোনা আমরা পাইনি এমন অপবাদ কেউ আমাদের দিতে পারবে না কোনও দিন। আওয়ার গ্রেট ধ্যানচাঁদ। আওয়ার উইজার্ড অফ দি স্টিক। হিটলার পর্যন্ত যাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।'

'হোয়্যার ইজ আওয়ার নেকস্ট ধ্যানচাঁদ?'

'প্রতিভার কি ডুপ্লিকেট হয় স্যার! দুটো রাজীবজী হয়, না দুটো ইন্দিরাজী।'

'ওসব তেল তেলে কথা ছাড়ুন। আমাদের সেই একটি মাত্র সোনা, ছাপ্পান্ন সালের পর থেকে নড়বড়ে হয়ে গেছে। আশিতে লাস্ট তারপর কাঁচকলা। এবারে আপনাদের দল কী করে এল।'

'খেলেছে স্যার। হাড্ডাহাড্ডি লড়েছে। তবে জানেন তো, খেলায় হারজিত থাকবেই। আমাদের একটা হিট গানই আছে, কোই জিতা, কোই হারা। একেই বলে স্পোর্টসম্যান স্পিরিট। খেলায় কোনও কিছু সিরিয়াসলি নিতে নেই। পলিটিকসেও তাই। এই ধরুন ইন্দিরাজী হেরে গেলেন। গেলেন গেলেন। পরেরবার জিতে ফিরে এলেন। নো প্রবলেম। আবার আমরা যাব। আবার আমরা খেলব। আবার আমরা যাব। আবার আমরা খেলব।'

'হোয়াট অ্যাবাউট পদক?'

'আবার সেই পদক। আপনাকে দেখছি পদকে পেয়েছে। আমাদের গীতায় আমাদের কৃষ্ণজী বলেছেন, কর্মে তোমার অধিকার নট ইন কর্মফল। এই যে ধরুন সাত সাতটা পরিকল্পনা ভারতের ওপর দিয়ে চলে গেল, তা কী হল, ডিম হল। ফল না হলেও কর্মযোগ তো হল। সেইরকম পদক না হোক ক্রীড়াযোগ তো হল।

পি. এম. জী ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, 'গীতাটাকে বাইরে বের করে দিয়ে এসো।'

দুজন ব্ল্যাক-ক্যাট চ্যাংদোলা করে তাকে বাইরের ঝোপে ফেলে দিতে দিতে বলল, 'ব্যাটা বাঙালি হো গিয়া।'

পি. এম. ততক্ষণে দৌড়বীরদের চেপে ধরেছেন, 'কোথায়, কোথায় আমাদের সেই ফ্লাইং এঞ্জেল। টাইম কীরকম ঝেড়েছে। ভারতের স্বর্ণপদক ভবিষ্যৎ অলিম্পিক ট্র্যাকে সকলের শেষে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আসছে। বুক ওঠানামা করছে হাপরের মতো, চোখ দুটো বেরিয়ে এসেছে ঠেলে। কী খবর তার?'

'সেই গোড়ালির ব্যথা। লণ্ডন সারাতে পারল না। ইন্ডিয়া ইনজেকশন দিয়ে দিয়ে ঝাঁঝরি করে দিল। এক গোড়ালিই তাকে শেষ করে দিল স্যার।'

'গোড়ালি বাজে কথা, আসল কথা বেলুনে একটু বেশি হাওয়া ভরা হয়ে গেছে। একটু বেশি পাবলিসিটি হয়ে গেছে। তিনি এখন দেশে-বিদেশে সংবর্ধনা নিতেই ব্যস্ত। বই বেরিয়ে গেছে। নাম হয়েছে, ধাম হয়েছে, টাকা হয়েছে। আর কে দৌড়য়। তা তিনি এলেন না কেন?'

'ওই যে স্যার গোড়ালির ব্যথা। গোড়ালিতে ননস্টপ কবিরাজি দাঁতের মাজন ঘষে চলেছে।'

'মাজন?'

'ইয়েস স্যার। মাজনে ভয়ংকর দাঁতের ব্যথা ভালো হয়, গোড়ালির ব্যথা ভালো হবে না! এখন আর নেই, আগে বেদেনীরা নাঁকি সুরে হাঁকত, দাঁত ভালো করে, পুকা বের করে।'

'ভারতের হয়ে এখন দৌড়বে কে!'

'বলব স্যার। কথা দিন রাগ করবেন না!'

'বলো, বলো।'

'স্লাইট অশ্লীল।'

'শ্লীল, অশ্লীল রাখো। আমি পি. এম.। আমি মডার্ন ম্যানেজমেন্ট এনেছি। ভারতকে কম্পুটার এজে ঢুকিয়ে দিয়েছি। ভারতমাতার গলায়, আই মিন মাতাশ্রীর গলায় অলিম্পিক স্বর্ণপদক আমাকে দোলাতেই হবে।'

'এবার আমরা কিছু জিয়ার্ডিয়া রোগগ্রস্ত বাঙালিকে পাঠাব। ইভেন্টের আগের দিন রাতে ঠেসে খাওয়াব। ক্ষীর, লুচি, মেঠাই-মণ্ডা সকালে আর বড় বাইরে করতে দেওয়া হবে না। এইবার স্টার্ট পোজিশনে নীচু হয়ে দাঁড়াবে। পেটে চাপ। আর যায় কোথায়। ওদিকে গুড়ুম। এদিকে জিয়ার্ডিয়ার নিম্নবেগ। যাদের জিয়ার্ডিয়া আছে তারা আবার ভয় পেলে বেগ ধরে রাখতে পারে না। দেখবেন এইবার দৌড় কাকে বলে। কোথায় কার্ল লুইস, বেন জনসন। স্পিড কাকে বলে! কোনও ট্রেনিং-এর দরকার নেই। কিচ্ছু নেই। শুধু টাচ লাইনে আসামাত্রই টান মেরে—টু লেভেটারি। অ্যান্ড গোল্ড। সিওর সোনা।'

'তখন যদি না পায়।'

'ও পাবেই স্যার। পেতেই হবে। একেই বলে গোপালভাঁড় টেকনিক।'

'ওয়েট লিফটিং-এর কী হবে। সেখানেও তো আমরা গেছি তলিয়ে।'

'ও আড়াই হাজার ডিম আর আস্ত দুম্বা মারা পালোয়ান দিয়ে হবে না স্যার। আমাদের যেতে হবে কলকাতার বড়বাজারে। ধরে আনতে হবে একডজন মুটে।'

তারা যা লোড তুলতে পারে, আপনার ওই বাহারি রিস্টব্যান্ড পরা, তেল চুকচুকে গালগোব্দা ওয়েট লিফটাররা পারবে না। আপনার কোনও ধারণা আছে স্যার একজন ঘি-চাপাটি-খেকো মারোয়াড়ির ওজন কত? বড়বাজারের মুটে তাকে ঝাঁকায় বসিয়ে অক্লেশে মাথায় তুলে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পর্যন্ত শুধু নিয়ে আসা নয়, সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলায় খাটে শুইয়ে দিয়ে আসতে পারে।'

'যাক। সমস্যার সমাধান। কিন্তু এবার বক্সিং-এ কী হল?'

'আমাদের বক্সারদের কোনও দোষ নেই। ঘুষি তারা ঠিকই চালিয়েছিল। কনট্যাক্ট করাতে পারেনি। সে হল গিয়ে টার্গেটের দোষ। কাওয়ার্ড। কেবল সরে যায়। পিছলে পালায়। টার্গেট স্লিপ করলে ঘুষি কী করবে স্যার!'

'তাহলে?'

'নেকস্ট টাইম আমরা বোম্বের হিরোদের পাঠাব। অমন লাগাতার ঘুষি পৃথিবীর কেউ চালাতে পারে না। একুশটা রিল ধরে কেবল ঘুষি। যে আসছে তাকেই মেরে ফ্ল্যাট করে দিচ্ছে। এবার সেরা হিরোদের পাঠানো হবে। তিনখানা গোল্ড সিওর।'

'ফুটবলে কী করা যায়?'

'টিম আমাদের ঠিকই আছে স্যার, একটাই অভাব। সেটা হল সাপোর্টাররা না মদত দিলে আমাদের টিম খেলতে পারে না, তাও আবার কলকাতার সাপোর্টার পরেরবার টিমের সঙ্গে হাজার দশেক কলকাতার সাপোর্টার পাঠাবেন। এমনিই তো হাজার দুয়েক ফালতু লোক টিমে ঢুকেই পড়ে। আরও হাজার দশেক না হয় ঢুকবে, তবু তো একটা গোল্ড আসবে।'

'টেনিসে কী হবে?'

'নো প্রবলেম। আবার কলকাতা। দমদম আর বরানগর মিউনিসিপ্যালিটির কিছু লোক আর হালকা একটু ট্রেনিং। যারা সারা দিনরাত মশা মারতে পারে তারা টেনিসবলও টেরিফিক মারতে পারাবে। মশা মারায় যা ব্যাকহ্যান্ড আর ফোরহ্যান্ড ড্রাইভ লাগে, আপনার কোনও ধারণা নেই। শুধু সার্ভিসটা একটু শিখিয়ে দিতে হবে।'

'জিমন্যাস্টিকস?'

'আবার কলকাতা। সিটি অফ জিমন্যাস্টিক। ডেলিপ্যাসেঞ্জার আর বাসযাত্রীদের মতো জিমন্যাস্ট পৃথিবীর কোথাও নেই। ওখান থেকে আপনি ভালো রেস্টলারও পেয়ে যাবেন।'

'হাইজাম্প, লংজ্যাম্প আর পোলভল্ট!'

'দিল্লি স্যার! আপনার দলেই ট্যালেন্ট আছে। তারা তো অনবরতই লাফাচ্ছে। এক্স রাজা, মহারাজার দল।'

'তা হলে ক'টা গোল্ড হল?'

'তা মন্দ হল না। দশ বারোটা নিশ্চিত।'

'সাঁতারে কিছু করা যাবে না?'

'কেন যাবে না স্যার! মধ্যবিত্ত মাঙালি। একমাত্র সলিউশন। দু:খসাগরে অমন সাঁতার কোনও জাত কাটতে পারবে না।'

'তাহলে হকিটার একটা ব্যবস্থা করতে পারলে হয়।'

'হয়ে যাবে, আমরা প্ল্যানচেট-এ ধ্যানচাঁদকে ডাকব। স্টিকে তাঁর কী আঠা ছিল জেনে নেব।'

পি.এম.-এর মুখ দেখে মনে হল বেশ সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি মাইক্রোফোনের টুঁটি ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। প্রেস অ্যাডভাইসারকে বললেন, 'একটা রিলিজ দিয়ে দিন, শতাব্দী শেষের ভারতীয় চমক। ফাঁকা বুলি, নয়, বারিগর্ভ, বজ্রগর্ভ মেঘ। পঁচিশতম অলিম্পিক আমাদের। নতুন পরিকল্পনা। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। নতুন বাছাই। পুরোনো ছাঁটাই। আপাতত আমাদের মুঠোয় ষোলোটি গোল্ড। ব্রোঞ্জ বা সিলভারের হিসেব আমরা করছি না। মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার।'

পি এম মাইক্রোফোনের কাছে মুখ এনে শেষ অভিলাষটি জানালেন, 'সর্বত্র এত শুটিং হচ্ছে আমরা একটা গোল্ড..।'

'হবে, হবে স্যার টিভি সিরিয়াল যাঁরা করছেন, তাঁদের মতো শুটিং কেউ করতে পারবে না। ওঁরাই আমাদের গোল্ড এনে দেবেন। বোম্বে না পারুক, বাংলা পারবেই। গম্ভীর মুখ, উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বললেন, 'এ শুটিং কি সেই শুটিং! আই হ্যাভ ডাউটস।'

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%