কে উদার?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

চাইলেই যাঁর কাছে পাওয়া যায়। বড় বিপদে পড়েছি কাকাবাবু। যাঁরা দান করেন, সাহায্য করেন তাঁরা তো দাতা। সাহায্যকারী। পরোপকারী। উদারতা হল মানুষের মনের একটা অবস্থা। একই লুচি। একই উপাদানে তৈরি। কোনওটা ফুলকো কোনওটা চ্যাপ্টা। ফুলকো মনের মানুষকেই বোধহয় উদার বলা যায়। ভেতরে অনেকটা বাতাস থাকবে। পরিসর থাকবে। ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। জানালা দরজা বন্ধ ঘর আর খোলামেলা ঘর।

উদারের বিপরীত শব্দ সংকীর্ণ। যাঁর টাকা আছে, তিনি দান করতেই পারেন।

'ট্যাক্সরিলিফ' পাওয়া যায় বলে অনেক ধনী অকাতরে দান করেন। ইংরেজিতে বলবে, 'চ্যারিটি'। মন্দির করে দিচ্ছেন, দাতব্য চিকিৎসালয়, প্রাইমারি স্কুল। নাম হচ্ছে। লোকে দাতা বলছে। বেশ একটা সুখ সুখ ভাব। এইসব মানুষ ব্রিটিশ আমলে 'রায় বাহাদুর' খেতাব পেতেন।

বিপন্ন মানুষের জন্যে তাঁদের বুক ফেটে যেত না। গরিবদের তাঁরা ঘৃণা করতেন। নিম্ন বর্ণের মানুষদের বলতেন, ছোট লোক।

দয়ার সাগর একজনেই ছিলেন—ঈশ্বরচন্দ্র। আর একজন দেশবন্ধু। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। এঁরা দিয়েই ফতুর, গোপনে দান। ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন সায়াহ্নের একটি ঘটনা। অনেক ঘটনার একটি। দান, সেবা, উপকারের প্রতিদানে কিছুই পাননি। পেয়েছেন শত্রুতা, সমালোচনা, মামলা-মোকদ্দমা বীরসিংহ গ্রামের পৈতৃক বাসভবনটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ বিদ্যাসাগর মশাইকে বললেন, এইবার একটা পাকা বাড়ি করে ফেলুন। ঈশ্বরচন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন, 'গরিব বামুনের ছেলের পাকা বাড়ি? লোকে শুনলে হাসবে যে। কোনওরকমে মাথা গোঁজবার একটু স্থান হলেই হবে।'

মাকে বললেন, সবই তো শেষ হল। তুমি আমার সঙ্গে কলকাতায় চলো। বিদ্যাসাগর জননী বললেন, তা কী করে হয়? যে জায়গায় আমি এতকাল রয়েছি, মানুষের দু:খ-কষ্টে পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি, ছাত্রদের বিপদ আর ক্লেশের সময় আগলাচ্ছি, অতিথি অভ্যাগতদের পরিচর্যা করছি—এই সব দায়িত্ব ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে কী হবে?

বিদ্যাসাগর মশাইয়ের জীবনী লিখতে বসিনি। একালের মানুষের মনোবৃত্তি, নতুন জীবনদর্শন পাশে ফেলতে চইছি। একালের কথা হল—তুমি দু:খে আছ, তা থাক। আমি কেন সুখে থাকব না? চারপাশে ঝুপড়ি, ছেঁড়া কাঁথার ঝলঝলে সংসার, তার মাঝে ঝকঝকে একটি সুবৃহৎ বাড়ি। দরজায় গাড়ি বাঁধা। ভেতরে ধুমধাম। ভুরু কোঁচকানো ভারী চেহারার লোকজনের আনাগোনা। বস্তিটা হল 'ন্যুইসেনস'। তবে কী জানো, কাজের লোকের অভাব নেই। সেই ব্যাপারে আমরা ফরচ্যুনেট।

আহা 'ফরচ্যুনেট' কী ছিরি।

স্বাধীনতা প্রবীণ হয়ে গেল, এই মানুষদের দু-এক ধাপ উপরে তোলার চেষ্টা করলে হয় না?

ডোন্ট বি সিলি! আমরা বিদ্যাসাগরও নই, বিবেকানন্দও নই। ওসব আদিখ্যেতা এ কালে চলে না।

ওই যে বলেছিল, ক্লাসলেস সোসাইটি হবে! যে বলেছিল তার কাছে যাও।

উদারতা আর প্রতিযোগিতা পাশাপাশি থাকে কী করে? এ কি সোনার পাথরবাটি! যে দেশে অতীত থেকে তাড়া করে আছে একটি কথা—'আপনি বাঁচলে বাপের নাম', সে দেশে উদারতা? কুঁজো ব্যক্তি কখনও চিৎ হয়ে শুতে পারবে! শুলেও ডোঙা-থালার মতো বন বন ঘুরবে। একালের সদা উদ্বিগ্ন যুবকের একটিই চিন্তা,—'কেরিয়ার'। যেমন তেমন হলে চলবে না, প্রচুর টাকা রোজগারের সুযোগ চাই। ছুটছে আর বলছে, টাকা, টাকা। সৎপথ, অসৎপথ, নো ম্যাটার, বস্তা বস্তা, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

টাকার কদর চিরকালই ছিল। তবে একথাও ছিল—বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। শিক্ষা এবং জ্ঞান মানুষকে উদার করে, আদরণীয় করে। সংকীর্ণতাটাকে খুলে দেয়। ভেতরের আকাশটাকে বড়ো করে দেয়। উদারতা হল একটা 'প্রিজম'-এর মতো। তার অনেক কোণ, যেমন, দয়া, মায়া, সেবা, সংবেদনশীলতা, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ত্যাগ, সহমর্মিতা। শুধু দান নয়, গ্রহণও একটা গুণ। অন্যের ধর্ম, মত, পথ, বক্তব্য, চিন্তাভাবনা গ্রহণ করাটাও উদারতা।

শ্রীরামকৃষ্ণ একটি সুন্দর বিশেষণ ব্যবহার করতেন—'মতুয়ার বুদ্ধি'। যার ইংরেজি হবে—dogmation. অর্থাৎ গোঁড়ামি। আমার ঘড়িই ঠিক, তোমার ঘড়ি বেঠিক। আমার মতই মত। আমার পথই পথ। হু আর ইউ। আজকাল একটা চলিত শব্দ এসেছে। মতুয়াদের অভিধানে। সেটি হল ফালতু। তিনি ছাড়া সব ফালতু।

শিক্ষায়, নানারকম ট্রেনিং-এ মনে একটা উদার উদার ভাব আসতে পারে। সে ভাব আবার চলেও যেতে পারে। অভিনয়ের চরিত্র আর আসল চরিত্র এক নয়। কতদিন আমি সাজাহানকে বাজার করতে দেখেছি। যে বেগুনটাতেই হাত দি, বলেন, ও বেগুনটা আমি চোখ দিয়ে বেছে রেখেছি। অনেক দেখেশুনে একটা ফুলকপি তোলা মাত্রই তিনি বললেন, ওটা আমি দেখে রেখেছি। সন্ধেবেলা রংমহলে এই মানুষটি সাজাহান সাজবেন। তাজমহল তৈরি করবেন। অভিনয় দেখে দর্শকরা ফটাফট হাততালি দেবেন।

এখন জিনের কথা শুনে ফেলেছি। উদারতা মনে হয় জেনেটিক। মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এতখানি একটা মন। 'আমার আমার' বলে সব কিছু আঁকড়ে ধরতে চায় না। তার ভেতরে অনেকটা 'স্পেস' থাকে—পরিসর। তার ভাবখানা, 'বসুধৈব কুটুম্বকম'। সবাই তার আপন। কী নেবে? নিয়ে যাও না।

একটা সুন্দর গল্প আছে। একজন আর একজনের কাছে এসে বললে, 'ভাই। তোমার মইটা কিছুক্ষণের জন্যে দেবে একবার।' সে বললে, 'বাবা মইটা সিন্দুকে রেখে গেছে। চাবি তার কাছে।' লোকটি এই কথা শুনে চলে গেল। কিছুদিন পরে ওই লোকটি ওই লোকটির কাছে গিয়ে বললে, 'ভাই। তোমার জালটা একবার দেবে, বাড়িতে কুটুম এসেছে। পুকুর থেকে মাছ ধরব।' ওই লোকটি বললে, 'ভাই! জাল কী করে দোব! জালে যে বাবা সরষে বেঁধে রেখে গেছে।'

একবার ভোরের ট্রেনে কোথায় যেন যাচ্ছি। সামনের আসনে এক ভদ্রলোক বেশ ফলাও করে খুলে খবরের কাগজ পড়ছেন। পেছনে দিকটা আমার চোখের সামনে। আমি উঁকি মেরে পড়ার চেষ্টা করছি। ভদ্রলোক কাগজের উপর দিয়ে আমাকে এক নজর একটু দেখে নিলেন। পরক্ষণেই খড়মড় করে কাগজটা মুড়ে নিজের পাছার তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে জানলার বাইরে ছুটে চলা প্রকৃতি দেখতে লাগলেন। আমার বেশ মজা লাগল।

এই কাগজ কেস আরও আছে। আমার এক বড়লোক বাল্যবন্ধুর বাড়িতে সেকালের প্রায় সব কাগজই আসত। আমাদের বাড়ির পরের পরের বাড়িটাই ছিল তাদের। আমার বন্ধুকে বলে, বেলা দুটো নাগাদ একটা কাগজ বাড়িতে নিয়ে আসতুম। তারপর ঝট করে পড়ে, তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ ফেরত দিয়ে আসতুম।

একদিন তার বাবার সামনে পড়ে গেলুম। তিনি খুব ভারিক্কি চাল বললেন, 'এই যে শোনো, অত কাগজ পড়া কী? কাগজ পড়লে চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। পড়ার বই পড়ো, পড়ার বই।'

একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা শেডের তলায়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। কিছুটা দূরে আমাদের বাড়ি। দেখতে পাচ্ছি, যেতে পারছি না। এমন সময় এক ভদ্রলোক একটা ছাতা মাথায় দিয়ে আসছেন। আমি যেদিকে যাব সেই দিকেই যাচ্ছেন। আমি ছুটে গিয়ে তাঁর ছাতার তলায় মাথাটা গুঁজে দিলুম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভটাস করে ছাতাটা বন্ধ করে দিলেন। কোনও কথা নয়। অ্যাকশন। দুজনেই ভিজে যাব। দু'কদম দূরেই আমার বাড়ি। তিনি কতদূর যাবেন কে জানে? ভিজবেন তবু আর একজনকে আশ্রয় দেবেন না।

এইরকম আরও একটা উদাহরণ আছে। আমাদের পাড়ায় আরও অনেক বড়লোক ছিলেন। সে যুগে রেডিয়ো খুব কম বাড়িতেই থাকত। এইরকম এক বড়লোকের বাড়িতে বিশাল একটি রেডিয়ো সেট ছিল। তখন রোজ রাতে যে কোনও এক বড় শিল্পীর খেয়াল গান পরিবেশিত হত, যেমন বড়ে গোলাম আলি, এ টি কানন, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, চিন্ময় লাহিড়ি, আরও অনেকে। তাঁদের সেই বিশাল রেডিয়ো কাম রেডিয়োগ্রামটি বাইরের দিকের একটি ঘরে ছিল। গমগম আওয়াজ।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। গ্রীষ্মের রাত। ভারী সুন্দর। পশ্চিম থেকে আসছে ফুরফুরে গঙ্গার বাতাস। বড়ে গোলাম আলি গাইছেন দরবারি। ঘরের লাগোয়া রাস্তার দিকের উঁচু রকে বসে মোহিত হয়ে গান শুনছি আমি আর আমার সঙ্গীত রসিক এক বন্ধু। ঘরে মৃদু একটি আলো জ্বলছে। ঘরে কেউ একজন আছেন। আধখোলা জানলা দিয়ে ফুরফুর করে বেরিয়ে আসছে গোলাপি রঙের ধোঁয়া। ম্যাক্রোপোল সিগারেটের সুন্দর কোকো গন্ধ।

এতকাল আমরা নীরবে নি:শব্দে গান শুনতাম। সেদিন আলিসাহেবের একটা কাজ শুনে আমরা আহা! আহা! করে উঠেছি! জোরে নয়। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে একটা হাত এগিয়ে এল জানলার পাল্লার দিকে। খটাস করে শব্দ। বন্ধ হল জানলা। তবু শুনতে পাচ্ছি। পরক্ষণেই রেডিয়ো বন্ধ। মধ্যরাতের জনশূন্য পথ। দূরে কোথাও একপাল কুকুর তারস্বরে চিৎকার করছে।

বাসের পাদানিতে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। আর একজন ধাবন্ত বাসে লাফিয়ে উঠেছেন। একটি পা কোনওরকমে পাদানির একটি সামান্য অংশে স্থান পেয়েছে। শরীর আর আর একটি পা বাসের গতির সঙ্গে পতাকার মতো উড়ছে। দণ্ডায়মান ব্যক্তিটি কিছুতেই তাঁকে আর একটি পা রেখে নিরাপদ হওয়ার সুযোগ দেবেন না। সেই মুহূর্তে তিনি এক পাদপীঠের অধীশ্বর। কৌরবপক্ষীয় দুর্যোধন। বিনা রণে না দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। কঠোর মুখ। উদাস দৃষ্টি। পৃথিবীর বাইরের কোনও মহারাজ। কলকাতার স্টেটবাস পরিদর্শনে এসেছেন। এই গানটি এমন মানুষকে উপহার দেওয়া যেতে পারে—বোম্বাইসে আয়া মেরা দোস্ত। দোস্তকো সেলাম কর।

আমার চোখের সামনে অতি সুখের, অতি সম্পন্ন একটি যৌথ পরিবার ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। শেষ যুদ্ধ—'তারের লড়াই।' লড়াইটা আমার চোখের সামনে প্রায়ই ঘটত। বিশাল বাড়ির বিশাল ছাত। পারিবারিক শান্তিরক্ষার জন্যে চারপাশে চারটি তার। একটিতে রোদে ঝুলবে বড়োর পরিবারের জামাকাপড়। অন্যদিকে মেজর। আর একটিতে সেজর। মেজর তার পূর্বদিকে। সেজর পশ্চিমে। সেজর তারে অনেকক্ষণ রোদ থাকে। সূর্যের উদয় অস্তের মতো, মেজর জামাকাপড় সেজর তারে চলে আসে। সেজর তার খালি থাকলেও তিনি এসে টান মেরে সব ফেলে দেবেন ছাতের ধুলোয়। নো, আই ওন্ট অ্যালাউ-উ-উ। তারে ইনফেকশন হয়ে যাবে। শরীরে কার কী ইনফেকশন আছে, কে বলতে পারে। ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে গা চুলকোয়!

ইনফেকশন? তোর বাপের ইনফেকশন। তোর চোদ্দো-গুষ্টির ইনফেকশন। নীরদ সি চৌধুরি ঠিকই লিখেছিলেন, ঝগড়ার সময় শিক্ষিত বাঙালিরাও শালীনতা ভুলে অশিক্ষিত বর্বর হয়ে যায়। ইনফেকশন ক্রমশই ঠেলে উপর দিকে উঠতে লাগল। শেষে পাকড়াও করল সেজর প্রপিতামহকে। তাঁর নাকি রক্ষিতা ছিল। বাংলায় তখন জমিদারি আমল। রক্ষিতা মানেই সিফিলিস। সেই কারণেই সেজর বংশের অনেকে ট্যারা। সেজ নিজেও না কি লক্ষ্মী ট্যারা। অনেকক্ষণ তাকালেই বোঝা যায়।

তারের যুদ্ধ ছাত থেকে নীচে নেমে সোজা আদালতে। তিনটি পাঁচিল উঠল। ওই যৌথ ছাতেই ভাগা ভাগা ফুল গাছের টব। এ জল পায় তো ও জল পায় না। কারণ টবের মালিক প্রতিপক্ষ। এরপরে আরও মজা আছে। ভিখিরি এসে চেল্লাচ্ছে। পাড়ার লোক অতিষ্ঠ। কিছু দিয়ে দিলেই শান্তি হয়। ব্যাপারটা কী? ও বড়োর তরফের। মেজরও নয়, সেজরও নয়। বড়োরা সপরিবারে তীর্থে। কে বললে, যা হয় দিয়ে শান্তি করো না। না, আইন ইজ আইন। যার ভিখিরি তার ভিখিরি। কুলপুরোহিতকে তিনখণ্ড করা যাবে না। সমস্যাটা রয়েই গেছে। উদারতার আর একটি অভিজ্ঞতা, দুই ভাই লড়ালড়ি করে হাঁড়ি আলাদা হয়েছে—গুমোট শান্তি বিরাজ করছে। পাড়ায় একটাই গমকল। দু'পরিবারেরই গম যায় সেখানে আটা হতে। ব্যাগগুলো আজকাল প্রায় একইরকম দেখতে। গম ভরতি ব্যাগ রেখে আসা হয়, পরে আটা ভরতি ব্যাগ ফিরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে আসে না, দু-একদিন পরে আসে।

ছোট ভাই ব্যাগ নিয়ে ঢোকামাত্রই বউ তেড়ে উঠল, 'এ কী! এ তো গণেশ! আমাদের শিব! এটা ওদের।'

ব্যাগের গায়ে গণেশ আঁকা। গণেশ বড় ভাইয়ের। শিব ছোট ভাইয়ের। পাশেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। একুশটা ধাপ ভাঙলেই বড় ভাইয়ের এলাকা। ব্যাগটা দিয়ে এলেই হত। তা হবে না। সাত কেজি ওজনের ব্যাগটা সাত মিনিট হেঁটে দোকানে ফিরে গেল। ব্র্যাভো। চালিয়ে যাও লড়াই।

একটা গল্প আছে, ভগবান এসেছেন। খুশি হয়ে বলছেন, বর চাও, তবে একটা কথা, তুমি যা পাবে তার ডবল পাবে তোমার প্রতিবেশী। লোকটি বললে, প্রভু! আমার একটা চোখ কানা করে দিন। ভগবান অবাক। সে আবার কী?

আজ্ঞে হ্যাঁ প্রভু, তাহলে আমার প্রতিবেশীর দুটো চোখ কানা হয়ে যাবে। মানুষ যখন মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়, লক্ষ করলে দেখা যাবে, শিশুটির হাত মুষ্টিবদ্ধ থাকে। প্রবেশ, অর্থাৎ জগতে প্রবেশ করছে হাত মুঠো করে। যেন এই ধারণা নিয়ে আসছে—এ জগৎ আমার, একমাত্র আমারই। আবার এই জগৎ ছেড়ে যখন চিরবিদায় নিচ্ছে তখন হাত আর মুষ্টিবদ্ধ থাকে না, খোলা। মৃতদেহ যেন বলতে চাইছে, দেখ হে, সঙ্গে করে কিছুই নিয়ে যাওয়া গেল না।

ইন্দিরা গান্ধী একবার সুন্দর কথা বলেছিলেন, মুঠো হাতে করমর্দন করা যায় না।

একালের মনোবিদগণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেক ধরনের মধ্যে একটি ধরনের উল্লেখ করে বলছেন—'ক্লোজড টাইপ' দরজা জানলা বন্ধ গুমোট ঘরের মতো। কিছু নিতেও পারে না, কিছু দিতেও পারে না। গটগট করে পৃথিবীতে এল, থপ থপ করে ঠুক ঠুক করে ফ্যালফ্যালে করে এদিকে ওদিকে তাকাতে তাকাতে বেরিয়ে গেল। তিনটে কৃত্য ফেলে রেখে—আহার, নিদ্রা, মৈথুন।

দুজন গল্প করতে করতে চলেছে। এক অন্ধ এসে ভিক্ষে চাইলে। একজন সঙ্গে সঙ্গে কিছু পয়সা তাকে দান করল। আর একজন ধমকে উঠল, ওই তো দিয়েছে। একজন দিলেই হবে।

অন্ধ ভিক্ষুক ঠুক ঠুক করে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পরেই যমদূত এসে হাজির। যে ভিক্ষুকটিকে পয়সা দিয়েছিল তাকে বললে, 'আমাকে দেখে ভয় পেয়ো না, তোমার এই উদারতার জন্যে আরও পঞ্চাশ বছর বাঁচবে। আর তুমি?'

যে কিছু দেয়নি, তাকে যমদূত বললে, 'তোমার দিন শেষ হয়ে এসেছে।' লোকটি বললে, 'আমি ছুটে গিয়ে কিছু দিয়ে আসি না।'

যমদূত মুচকি হেসে বললে, 'তাতে কিছু হবে না বাছা। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার আগে দেখে নিতে হয়, নৌকায় ফুটোফাটা কিছু আছে কি না। একবার ভেসে পড়ালে আর মেরামত করা যায় না।'

গল্প নয়, বাস্তব একটা ঘটনা। শুক্রবার, নামাজের বার। নিষ্ঠাবান এক মুসলমান ভদ্রলোক অপরাহ্ন বেলায় মসজিদে চলেছেন। নামাজ করবেন। যেতে যেতে দেখলেন, পথের একধারে দুর্ঘটনায় আহত এক ব্যক্তি অবহেলায় পড়ে আছেন। দুপাশ দিয়ে উদাসীন জীবন-স্রোত হু হু বয়ে চলেছে। আহত, সংজ্ঞাহীন মানুষটির দিকে কারও নজর নেই। ভদ্রলোক থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু লোকের দৃষ্টি পড়ল। তাঁরাও দাঁড়িয়ে গেলেন। মুসলমান ভদ্রলোকটি প্রথমে ভাবছিলেন, আহত মানুষটির জন্যে কী করা যায়। এইবার যেই কিছু মানুষের জমায়েত হল, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিন্তা ঘুরে গেল। নামাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আরও অনেকে এসে গেছে। এখন যা করার তারাই তো করবে।

ভদ্রলোক মসজিদে এসে প্রার্থনা শুরু করলেন। বহু চেষ্টা করেও মন বসাতে পারলেন না। একটা অপরাধ বোধ। আহত মানুষটি পথের ধারে পড়ে রইল। আর আমি এখানে প্রার্থনায় বসেছি ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্যে। বিপন্ন মানুষের প্রতি যে উদাসীন ঈশ্বর কি প্রার্থনা শোনেন? ঈশ্বর কি এমন মানুষের সেবা গ্রহণ করবেন!

ইসলামের ভূমি থেকেই সুফি ধর্মের উদ্ভব। সুফিরা বলেন, মানুষের সেবাই হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সেবাই হল শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। আজমীরের শ্রেষ্ঠ সাধক, শেখ মৈনুদ্দিন চিস্তি একটি সুন্দর উপদেশ রেখে গেছেন, 'নদীর মতো উদার হওয়ার চেষ্টা করো, সূর্য কিরণের মতো বিশ্বজোড়া উদ্ভাস আনার চেষ্টা করো চরিত্রে, আর পৃথিবীর মতো আতিথেয়তা অভ্যাস করো।

ধর্ম হঠাৎ এমন অনুদার হয়ে গেল কী করে? কেন এত হানাহানি? রাজনীতিই বা কেন এত রক্তাক্ত? রাম আর রহিমের সম্পর্ক কাদের কৃপায় এমন বিষাক্ত হল?

এত উদারতা চারপাশে! উদার অর্থনীতি, উদার সমাজনীতি, উদার ধর্মনীতি, উদার মতবাদ। সবই উদার। উদার গণহত্যা। গণহত্যার এই উদারতার দাতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হিটলার সায়েবের বৈজ্ঞানিক ইহুদি নিধন। জাপানের কামিকাজের ঘরোয়া রূপ একালের মানব বোমা। মানুষ মারাটাকে কত বৈজ্ঞানিক করা যায়!

সাধনার শেষ নেই। ফরাসিদের লেজার গাইডেড মিসাইল একালের যুদ্ধের ধরন পালটেছে। কতরকমের উদ্ভাবন, ব্যাংক বাস্টার, ক্লাস্টার বম্ব। পাইলটলেস ফ্যান্টম বিমান। স্টারওয়ার। আমেরিকান সেন্টারে সন্ত্রাসবাদীরা যে অস্ত্র থেকে গুলি চালিয়েছিল, তার স্পিড হল ৫.৪ সেকেন্ডে ৫৪ রাউন্ড গুলি। কলকাতায় এমন অস্ত্র আগে কখনও ব্যবহার হয়নি। উদার পথে এমন অস্ত্র দেশে ঢুকছে। রিভালভার পকেটে পকেটে। ইভটিজিংকে আরও উদার করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

উদার ড্রাইভিং-এর গুণে কে কখন উদার আকাশে পৌঁছে গিয়ে মুক্তির আনন্দে খিল খিল করে হাসবে কেউ জানে না। উদার ফ্যাশনের কৃপায় শয়নকক্ষের সাজ পথে নেমেছে। আটপৌরে সেকেলে লোকের মহাসমস্যা—মা, তোমার কোন দিকে তাকাব। সর্বত্রই যখন এত উদারতা, তোমার পোশাক কেন তোমার প্রতি এত অনুদার?

গাড়ি চালানো যেমন শিখতে হয়, উদারতাও সেইরকম অনুশীলন করতে হয়। পারিবারিক জীবনশালায় সেই শিক্ষার গুরু। শিক্ষায় সংস্কার কিছুটা জন্মায়। শৈশব থেকেই মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হয়, সমাজ বলে একটা ক্ষেত্র আছে, সেই ক্ষেত্রে ষাঁড়ের মতো গুঁতিয়ে বিচরণ করলে তোমাকে লোকে মানুষ বলবে না। চলিত বাংলায় একটা কথা আছে—একলষেঁড়ে।

সেদিন কোনও কাজে নামি একটি স্কুলে গেছি। প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মা তাঁর শিশুটিকে ভীষণ বকছেন—তুই কেন দেখালি? তোর খাতা কেন তুই ওকে দেখালি?

নিষ্পাপ শিশুটির চোখে মুখে বিস্ময়—দেখালে কী হয়?

হেরে যায়। মানুষ হেরে যায়।

খেলার জগতে একটা কথা আছে—'কিলার ইনস্টিংকট। প্রতিদ্বন্দ্বীকে মেরে ফেলব, খেয়ে ফেলব, কেটে ফেলব। টেনিস র‌্যাকেট থেকে বল আসছে একশো চল্লিশে। প্রতিপক্ষ তুলতে চাইছে একশো পঞ্চাশে। টাইসন চাইছেন এক ঘুষিতে প্রতিদ্বন্দ্বীর চোয়াল ঝুলিয়ে দিতে।

মেজর জেনারেল যুদ্ধক্ষেত্রে দয়া দেখানোর জন্যে উদার হলে হারবেন। বুলেট চালানোয় উদার হতে হবে। পুলিশকে হতে হবে ডাণ্ডায় উদার। রাজা কী হবেন? লেখা আছে—প্রজাদরদি। তা হয় না। 'রুলারস আর অলওয়েজ রুলারস হোয়াট এভার মে বি দি সিস্টেম।' পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করো, নিজের পুঁজি বাড়াতে অসুবিধে কোথায়? আশিভাগ মানুষ দুবেলা খেতে পায় না বলে আমি ছাতুর তাল খেয়ে আন্ত্রিকে মরব না কি?

মানুষ বড়লোকের বড়লোকী চাল দেখতে ভালোবাসে। পরাধীনতা মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। ইংরেজের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া পোশাক, টয়লেট পেপার পড়ে আছে এখনও। সায়েব হতে ভালোবাসি। সে হওয়াটা কেমন, নিষ্ঠুর, ক্ষমতালোভী, ভোগবাদী, স্বার্থপর, হাই ব্রাউ। যারা হতে পারে না তারা সমীহ করে। নেটিভ স্টেটের রাজারা এখনও নির্বাচনে দাঁড়ালে বিপুল ভোটে জেতেন। হতদরিদ্র দেশের মুখ্যমন্ত্রী মেয়ের বিয়েতে কোটি টাকা খরচ করেন। শীর্ণ মানুষ, ছিন্ন বসনে জলুস দেখেন। গাছতলায় বসে বিড়ি আর চুটিয়া সহযোগে একমাস ধরে গল্প করেন।

একজন উদার হলে আর একজনের কী লাভ? হুতোম যেমন বলেছিলেন, সেইরকম না কি? একটি বড়লোকের ছেলে মাতাল হলে, মদ ধরলে আর পাঁচটি মাতাল প্রতিপালিত হয়। বাবুর উদারতায় সন্ধেটি বেশ ভালো কাটে।

সঙ্গে সাবু, মিছরি, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ বিদ্যাসাগর মশাই ঘুরছেন। কে অসুস্থ, ওষুধ জোটেনি, কার জোটেনি পথ্য! অর্থাভাবে কার লেখাপড়া বন্ধ। আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রসারিত তাঁর উদারতা—বাল্য বিধবাদের উপর হিন্দু ধর্মের কেন এই অত্যাচার!

রাজা রামমোহন দেখছেন, জ্যান্ত স্ত্রীটিকে স্বামীর চিতায় তুলে দেওয়া হয়েছে জোর করে। তুমি পুড়ে ছাই হয়ে সতীর পুণ্য অর্জন করো। বাজাও ঢোল, খোলে তোলো বোল। নৃত্য করো হিন্দুধর্মের প্রভুরা।

শ্রীরামকৃষ্ণ লোকান্তরিত। তাঁর সাক্ষাৎ পার্ষদদের অনেকেই পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতেন। শুধু ধর্মের অবস্থা নয় জনজীবনের অবস্থাও দেখেছেন। পরাধীন ভারতের আমজনতার অবস্থা।

স্বামী অখণ্ডানন্দ জামনগরে এক ধর্মপ্রাণ শেঠজির বাড়িতে অতিথি হয়েছেন। শেঠজি উদার। তাঁর পরিবারবর্গ ভয়ংকর। সন্ন্যাসীর প্রভাবে শেঠজি আরও অন্যরকম হয়ে যাচ্ছেন। সন্ন্যাসীর কথায় ওঠেন বসেন। একটা মন্দির করবেন। প্রচুর টাকা সেবায় নষ্ট হচ্ছে। তখন অন্তরালে পরিকল্পনা হল, সন্ন্যাসীকে কিছু দিয়ে মেরে ফেল। কফির সঙ্গে জয়পালের বীজ। অখণ্ডানন্দজি দেখছেন, কফির উপর তেলের মতো কী ভাসছে। চুমুক দিয়ে দেখলেন—স্বাদ ঝাল ঝাল। ভাবলেন, বাটনার হাত লেগেছে, ঘিয়ের স্পর্শ। খাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর থেকেই শুরু হল প্রচণ্ড দাস্ত। চারদিন উত্থানশক্তি রহিত।

সন্ন্যাসী ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন না। জানতেন তাঁকে যিনি উদ্ধার করলেন, সেই ঝণ্ডুভট বিঠঠলজি। তিনি ছিলেন আয়ুর্বেদাচার্য। বিশাল মনের অধিকারী দেবতার মতো এক মানুষ। স্বামী বিবেকানন্দর সঙ্গেও তাঁর মিলন হয়েছিল জুনাগড়ে।

স্বামীজি বলেছিলেন, 'অনেক দাতা দেখেছি, কিন্তু ঝণ্ডুভট বিঠঠলজির মতো দায়ালু পুরুষ কোথাও দেখিনি।' শেঠজির বাড়িতে অখণ্ডানন্দজির সঙ্গে ভটজির যখন আলাপ হচ্ছে, তখন বাংলায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনদীপ নিবছে। ভটজি বললেন, তাঁর একটা জীবনী আনান। অখণ্ডানন্দজি আনালেন বিদ্যাসাগর জীবনী। রোজ সেই জীবনী পাঠ হত। ভটজি শুনতেন কাঁদতেন।

ভটজির কথা কেন? সত্তর বছরের বৃদ্ধ ভাইজি রন্তিদেব কথিত একটি শ্লোক রোজ আবৃত্তি করতেন। তখন তাঁর দুচোখ বেয়ে জল গড়াত। শ্লোকটি হল,

কো নু ন স্যাদুপায়োহত্র যেনাহং সর্বদেহিনাম।

অন্ত: প্রবিশ্য সততং ভবেয়ং দু:খভারভাক।।

মানে হল, এই সংসারে এমন কী উপায় আছে, যে উপায়ে আমি সকল দু:খী প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে তাদের দু:খ নিজেই ভোগ করতে পারি? সেই থেকে এই শ্লোকটি হয়েছিল স্বামী অখণ্ডানন্দজির জীবন মন্ত্র। ভটজির মুখে শোনা আর একটি শ্লোকও তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। শ্লোকটির ভাবার্থ—এমন স্বর্গ বা বৈকুণ্ঠ চাই না যেখানে মানুষের সেবা করার কোনও সুযোগ নেই। স্বামী বিবেকানন্দ এটি শুনে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।

আমেরিকায় ধনীর গৃহের বিশাল পালঙ্ক। উত্তম শয্যায় শয়ন করতে পারছেন না। কার্পেটেই বিশ্রাম—ভারত, ভারতের মানুষ, ছিঁড়ে খাওয়া দারিদ্র্যের কথা মনে পড়ছে। 'যে দেশে কোটি কোটি মানুষ মহুয়ার ফুল খেয়ে থাকে, আর দশ বিশ লাখ সাধু আর ক্রোড় দশকে ব্রাহ্মণ ওই গরিবদের চুষে খায়, আর তাদের উন্নতির কোনও চেষ্টা করে না, সে কী দেশ না নরক! সে ধর্ম না পৈশাচ নৃত্য!'

স্বামীজি ভারতের অসহায়, দরিদ্র, অনুন্নত মানুষদের জন্যে নিজেকে জ্বালিয়ে দিচ্ছেন। এই নাও আমার অস্থি, আমার ছাই। সব শাস্ত্র আর পুরাণাদি ঘেঁটে এইটি আমি পেয়েছি,

সর্বশাস্ত্রপুরাণেষু ব্যাসস্য বচনদ্বয়ম।

পরোপকার: পুণ্যায় পাপায় পর পীড়নম।।

পরোপকারে পুণ্য, পরপীড়নে পাপ।

স্বামীজি আমাদের রোগটা ধরেছিলেন, 'জেলাসি', হিংসুটেপনা।' বলছেন, 'আমাদের মতো দুনিয়ায় কেউ নেই। আর্যবংশ!!! কোথায় বংশ তা জানি না...একলাখ লোকের দাবানিতে ৩০০ মিলিয়ান কুকুরের মতো ঘোরে আর তারা 'আর্য বংশ'!!!!

জনে জনে, মনে মনে উদারতার একটি বিন্দুও যদি থাকত। কোথাও আছে, বেশিরভাগই নেই। কোনও কালেই কি ছিল? চিরকালের একই কথা গিভ অ্যান্ড টেক। ফেল কড়ি মাখো তেল। হিজ হিজ, হুজ হুজ।

মৈমনসিংহ জেলার একটি প্রাচীন লোককাহিনি—এক ব্রাহ্মণ ভগবানের খোঁজে বেরিয়েছেন। সেই ভগবানের নাম—হরিসংকট। পথের ধারে একটি সুপারি গাছ মানুষের ভাষায় কথা কয়ে উঠল—ব্রাহ্মণ। ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হলে জিগ্যেস কোরো তো, মাথায় পাতার বোঝা, ফলের ভার। একটা পাতা, কি ফল কখনও ঝরে পড়ে না। এই ওজন মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এক ঠ্যাঙে। বছরের পর বছর। কবে এই পাপের বোঝা মাথা থেকে নামবে!

এর পরেই দেখা হল এক স্ত্রীলোকের সঙ্গে। তার পেছনে একটা পিঁড়ে আটকে আছে। স্ত্রীলোক বললে, ও ঠাকুর! তোমার ঠাকুরকে জিগ্যেস কোরো তো কোন পাপে আমার এই দশা।

আর এক স্ত্রীলোকের সঙ্গে দেখা। ব্রাহ্মণী বললে, ঠাকুরকে জিগ্যেস কোরো তো কোন পাপে আমার এই ঠোঁটের চুন কিছুতেই উঠছে না?

ব্রাহ্মণ হাঁটছেন, তো হাঁটছেন। এইবার একটি লোকের সঙ্গে দেখা। তার মাথায় বিশাল একটি বোঝা। লোকটি বললে, ভগবানের খোঁজে বেরিয়েছ? তা বেশ! দেখা হলে একটি কথা জিগ্যেস কোরো—কোন পাপে আমার মাথায় এই বোঝা নামানো যায় না!

পথিক চলেছে ঈশ্বরের খোঁজে। ক্লান্ত, শ্রান্ত। আর পারে না। একটি নদী। বসে পড়ল সেই নদীর ধারে। এমন সময় অতি বৃদ্ধ একটি লোক লাঠিতে ভর দিয়ে ঠুকঠুক করে সামনে দাঁড়ালেন। প্রশ্ন করলেন, তুমি কে? এখানে এই ভাবে পড়ে আছ কেন?

ব্রাহ্মণ তার সাংসারিক দু:খ-কষ্টের কথা সবিস্তারে জানাল। ভগবানের দর্শনে ঘুরে ঘুরে আমার এই দশা। তাঁকে প্রশ্ন করব যদি দেখা পাই, কেন আমাকে এই শাস্তি দিলেন—সব দিয়ে সব কেড়ে নিলেন!

বৃদ্ধ বললেন, ওঠো! উঠে দাঁড়াও। যার খোঁজ করছ, আমিই সেই। অনেক কথার পর ব্রাহ্মণ সুপুরি গাছের প্রশ্নটি নিবেদন করল।

বৃদ্ধ ভগবান বললেন, এই গাছ পূর্বজন্মে মানুষ ছিল। একটি মেয়ে পুজোর জন্যে একটি সুপুরি চেয়েছিল। সুপুরি থাকা সত্বেও সে দেয়নি। তাই আজ তার এই অবস্থা।

আর ওই, যার মাথার বোঝা নামানো যায় না, পূর্বজন্মে একজন তাকে বলেছিল, ভাই একটু হাত লাগাও তো। মাথা থেকে ঝাঁকাটা নামাই। সে শুনেছিল, কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়ায়নি।

যার পেছনে পিঁড়ে, পূর্বজন্মে সে ছিল বড়লোকের বাড়ির অহঙ্কারী বউ। বাড়িতে কেউ এলে তাকে বসতে বলত না। সেই অহংকারের ফল ভোগ করছে এই জন্মে।

যার ঠোঁটে অক্ষয় চুনের ফোঁটা সে আগের জন্মে কী করত! পরনিন্দা, বাদ-বিবাদ। এই জন্মে তাঁর ঠোঁটে মার্কা মেরে দিয়েছি।

প্রাচীন এই রূপকে একটিই ইঙ্গিত—মানুষ মানুষের কাছ থেকে উদারতা চায়। দশটা টাকা দেওয়া যেতে পারে মনের দরজার তালা খোলা সহজ নয়। দূরকে করিল নিকট বন্ধু, পরকে করিলে ভাই।

গাড়ির চালককে ডিশে সাজিয়ে মিষ্টি দিতে যাচ্ছে, মালিক শিউরে উঠলেন, না, না, না, না, ড্রাইভারকে অত খাতির কীসের! এর নাম ক্লাসলেস সোসাইটি! যার হাতে স্টিয়ারিং, মরণ-বাঁচন, সে লোকটা মানুষ নয়, ড্রাইভার! মুটে, মজুর, চামার, চণ্ডাল—বিভাজন সব 'মোর মনে'। বড়লোক! কিন্তু মনটা ছোট। অর্থে বড়লোক, মনে ছোটলোক।

একটু সরে বসলে আর একজন বসতে পারে। সরব না। একটু উদার হলে পরিবারে শান্তি আসে। হব না। হাত বাড়ালেই আর একটা হাত এগিয়ে আসে। বাড়াব না। আধুনিক জীবন এক 'প্রিকেরিয়াস জার্নি'। প্রচণ্ড গতিশীল এক যানের পাদানিতে ঝুলে আছি।

ছোট একটা টেবিল। ডোমে ঢাকা একটি টেবিল ল্যাম্প। ছোট্ট একটি আলোর বৃত্ত। তার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আমার আলো আমার আলো। তোমার আলো, তোমার আলো।

অন্ধকার রাত। পাঁচশো বছর আগের রাত। একটি মিছিল আসছে। প্রত্যেকের হাতে মশাল, কণ্ঠে হরিনাম। শত শত খোলে বাজছে মহাবোল। মিছিল পরিচালনা করছেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। অনুদার কাজিকে ধর্মের উদারতা শিক্ষা দেবেন। কাজি-শাসনের কুর্সি ছেড়ে নেমে এলেন প্রেমের সুরধুনীতে। ইতিহাস।

মশাল আজও আছে। মহাপ্রভু নেই। গুজরাত জ্বলছে। যিস দেশমে গঙ্গা বহতি হ্যায়। সেই দেশেই সমান্তরাল বইছে রক্তের নদী। তার অনেক শাখা-প্রশাখা। মৃত শিশুটিকে কোলে নিয়ে নির্যাতিত মাতার ভারত চিত্র। আলোর বদলে আগুন। জলের বদলে রক্ত। পোড়া মাটির বাহার।

'উদারতা' বিষয়টি বিষয়ের মতোই বিশাল। একটা বই লেখা যায়। এতটা উদারতা সম্পাদক মহাশয় সহ্য করবেন না। শেষ কথাটি 'অ্যানা ফ্রাংক'-এর। ইতিহাস এই ফুলটিকে সাজিয়ে রাখবে চিরকাল, মৃত্যুর পদতলে শাশ্বত জীবন-পদ্ম। ডায়েরির একটি পাতায় এই আশ্বাস—Inspite of everything I shall believe that people are really good at heart.

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%