সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও তো, অনাহারে মৃত্যু আর অপুষ্টিতে মৃত্যুর মধ্যে তফাত কী?'
'অনাহারে থাকলে সাত দিনে মৃত্যু! অর্ধাহারে তিন-চার বছর ধুকধুক। আর ঘাসপাতা কচুরিপানা খেয়ে থাকলে কঙ্কালসার একটা অস্তিত্ব। নিজেকে খেয়ে যতদিন বেঁচে থাকা যায়।'
'পুষ্টি কাকে বলে?'
'সুষম আহার। ব্যালেনসড ডায়াট। প্রাোটিন, ক্যালোরি, ভিটামিন, মিনার্যালস, এনার্জি, স্ট্রেংথ। টগবগে একটা মানুষ। সেই মানুষটার মধ্যে ঘোড়া থাকবে, বাঘ থাকবে, সিংহ থাকবে, সামান্য পরিমাণে শেয়াল থাকবে।'
'হাতি?'
'না, হাতি মোটা। রোগা হাতি থাকতে পারে।'
'রোগা হাতি মানে ছুঁচো?'
'দ্যাটস রাইট। তরকারিতে সামান্য হিং দিলে স্বাদ বাড়ে। সেইরকম সামান্য ছুঁচো থাকলে চরিত্রে একটা মজা আসে। উপকারী মানুষের চেয়ে ক্ষতিকারক মানুষের খাতির বেশি। এটা স্বীকার করো তো! সেদিন পাড়ার মুদির দোকানে আমাদের মাস্টারমশাই অন্তত বিশবার বললেন, বাবা আমাকে এক প্যাকেট হলুদ দাও। কেউ শুনছেই না। এমন সময় একটা সাইকেল রিকশা এল। পিছনে বাঁ দিকে কাত মেরে বসে আছে আমাদের পাড়ার বিখ্যাত মস্তান ঠোঁটকাটা রাজু। বাঁ হাতটা বাড়িয়ে জড়ানো গলায় একবার শুধু বললে,
'অ্যায়, একটা দেশলাই।'
লাফিয়ে উঠল দোকানের মালিক, 'ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার'। তিনদিক থেকে তিনজন অ্যাসিস্টেন্ট পড়ি-কী-মরি করে দৌড়ে এল তিন প্যাকেট দেশলাই নিয়ে। রাজু যাওয়ার সময় মহাবাক্য উচ্চারণ করল, 'রেডি, রেখো, রাত্তিরে এসে নিয়ে যাবে।' মুদি মোহিত হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। যেন ভাব এসে গিয়েছে।'
'কী রেডি রাখবে?'
'কী আবার, মাসকাবারি তোলা, দেবতার পুজো। এদিকে রিয়্যাল স্যার তখনও বলে চলেছেন, ভাই, এক প্যাকেট হলুদ, হলুদ, এক প্যাকেট ভাই।' কেউ শুনছেই না। তা হলে শিক্ষাটা কী হল? চরিত্র তৈরি করতে হয়। ভালো মানুষ! উপোস করে মরে। জন্তু জানোয়াররা উপোস করে? অপুষ্টিতে মরে? নেভার। স্লোগানটা ভুলে গেলে? দিবারাত্র কানের কাছে হেঁকে যাচ্ছে—লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই। স্লোগানের এমন এফেক্ট, আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লাথি ছুড়ি, আমার বউ প্রায় দিনই খাট থেকে ধপাস। এতকাল যে বেঁচে আছি, সে তো আমার বউয়ের সঙ্গে লড়াই করে।'
'আমি কোথায় একটা গ্রিক প্রবাদ পড়েছিলুম, Marriage is the only evil that men pray for.’
'শোনো, লড়াই বাড়িতে, লড়াই অফিসে, লড়াই পার্টিতে। লড়াই সর্বত্র।'
'পার্টির নাম করছ? বলেছি না পার্টির বিরুদ্ধে কোনও কথা বলবে না।'
'আরে ধুর, এ পার্টি সে পার্টি নয়। মদের পার্টি, ককটেল পার্টি।'
'তা হলেও। আমার পিসেমশাইয়ের নাম ছিল হরি। আমার পিসিমা স্বামীর নাম নিত না। খঞ্জনি বাজিয়ে মহানাম করতেন। ফরে কৃষ্ণ, ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, কৃষ্ণ ফরে ফরে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন