সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আশা। পৃথিবীতে আসা আর শুরু হল আশা। শেষে এই বলতে বলতে প্রস্থান—আসার আসা ভবে আসা আসামাত্র হল সার। আশা বস্তুটা কী। অদৃশ্য একটা ব্যাপার ভূতের মতো কাঁধে চেপে থাকে। বায়বীয় এক আরোহী।
অসুখ করেছে, সেরে উঠে আবার হ্যা হ্যা করবে। এটি সঙ্গত আশা। এত ডাক্তার, ওষুধ বিষুধ সুস্থ হওয়ার আশা তো করাই যায়। এই আশা দু ফ্যাঁকড়া, এক ঘরে অসুখ, সে শুয়ে শুয়ে আশা করছে, কবে উঠে বসব। দুই, তার পরিবার, যে শুয়ে আছে সে যদি কৃতী ছাত্র হয়, তিনি যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল সভ্য হন। তাহলে আশা, দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে তৈরি হবে আতঙ্ক। ডাকো ডাক্তার আরও বড় ডাক্তার, চলো দৈবজ্ঞের কাছে, পেড়ে আনো কোষ্ঠী, চলো মন্দিরে, লাগা মানত। টাকা কোনও ব্যাপার নয়। দরকার হলে, ধার, বাড়ি বিক্রি, গয়না বিক্রি। এর পেছনেও প্রচ্ছন্ন আশা। যদি একবার ঝেড়ে উঠতে পারে তাহলে কী হবে। কৃতী ছাত্র যে সে তরতর করে সাফল্যের বৈতরণী বেয়ে, মাসে দশ, বিশ, বারো, কড়ি, উপার্জনের কত হাজার অঙ্কে উঠে যাবে, কে বলতে পারে। তখন সল্টলেকে বাহারি ডিজাইনে বাড়ি হবে। একতলা থেকে দোতলা ঝোলা সিঁড়ি। পালিশ করা মেঝে। মেগা বাথরুমে খোকা ডুবে যাওয়া বাথটাব। হাত ঝাপটা টেলিফোন শাওয়ার। ডবল বেড সাইজের ডিনার টেবিল। সব দিক খোলা। রোদ আর বাতাসের হুটোপাটি। নানা রকমের পরিচ্ছন্ন গাছের বাহার। দুটো রঙিন টিভি। একতলায় একটা, দোতলায় একটা। ঢাউস মিউজিক সিস্টেম প্রহরে প্রহরে গান ছড়িয়ে দেবে। এই হল আশার দীর্ঘ যাত্রা।
তিনি যদি সামান্য বেতনের গৃহকর্তা হন, তাহলেও আশা হবে—লোকটা আগে বেঁচে উঠুক। তারপর আবার সব হবে একটু একটু করে। এই তো আর তিন বছর পরেই একটা প্রাোমোশন হবে বলছিল। এই মানুষটিও তো মশারির মতো। গোটা পরিবার ভেতরে আশ্রিত। ছিঁড়ে গেলেই মুশকিল। বাইপাস, ট্র্যানসপ্ল্যান্টা যে ভাবেই হোক বাঁচতে হবে। প্রয়োজন হলে জোড়াতালি দিয়েই চালাতে হবে।
আশা সবসময় প্রত্যাশার পেছনে ছোটে। ছেলে মানুষ হবে। মানুষ হবে অমানুষ হতে পারে। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কেটে পড়তে পারে। কারণ, সেও তো আশার পেছনে ছুটছে। বড় চাকরি, ভালো ফ্ল্যাট, ওষ্ঠ রঞ্জিত আঁতেল সুন্দরী বধূ। বিপুল ধনী, সর্বজ্ঞ, জগৎ নিয়ন্ত্রণকারী শ্বশুর, মিনি মিনি ঘিনি ঘিনি নাক তোলা শাশুড়ি। গোটা দুয়েক মাফিয়া টাইপের, ফুলো ফুলো জ্যাকেট পরা শালা। প্রজাপতির মতো ভাসমান শ্যালিকা। স্ট্যাটাসে চড়ার আশায় পুত্র করেছে পদাঘাত।
বেকার গৃহকর্তার আশা দু-পথে দৌড়তে পারে। এক, ভগবান, এইবার আশা করছি তুমি আমাকে তুলে নেবে। অথবা, বিনা চিকিৎসায় পড়ে আছি ঈশ্বর। কৃপা করে, স্বপ্নে ওষুধ খাইয়ে এ যাত্রা তুলে দাও। এত হেনস্তাতেও, ছোট ছেলেটা বড় ভালোবাসে। তার মানুষ হওয়াটা দেখে যাই। শুরু হল আশার হাতছানি। ছোট ছেলে বড় হবে, ব্যাবসা করবে, সুন্দর ফুটফুটে পুত্রবধূ। একটি কথা বলা পাখির মতো নাতনি।
বেকার গৃহকর্তার পরিবার পরিজনের আশা—স্ত্রী উদাসীন। এমন লোকের থাকা না-থাকা, দুই-ই সমান। বড় ছেলের আশা, বুড়ো যদি টেঁসে যায়, তাহলে শ্মশান থেকে ফিরে, উত্তরের ঘর থেকে সব মালমশলা নিয়ে ঢুকে পড়ব এই দক্ষিণের ঘরটায়। লাস্ট সিকস্টি ইয়ারস বুড়ো এটাকে দখলে রেখেছে। অশৌচের শোকের মধ্যেই দখল নিতে হবে, তা না হলে মেজ ঢুকে পড়বে।
হায় আশা! আশা কুহকিনী!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন