গৃহসুখ শাস্ত্র

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রত্নতাত্বিকরা অনুসন্ধান করতে করতে নানা জিনিস আবিষ্কার করেন। পুরাতাত্বিকরা খুঁজতে খুঁজতে অতীতের অনেক দুর্লভ বস্তু পেয়ে যান। আমি একটি প্রাচীন পুঁথি পেয়েছি, যেটিকে শাস্ত্রের পর্যায়ে ফেলা যায়। গৃহসুখ শাস্ত্র। মানুষের সুখ থাকবেই। পরিবারও থাকবে। পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা। শান্তি যেমন থাকবে, অশান্তিও থাকবে। অশান্তির মাত্রাই বেশি। এই অশান্তি হ্রাসের উপায়! আমাদের অনেকেরই জানা নেই। এই শাস্ত্রে অপার পারিবারিক প্রশান্তি বজায় রাখার রণকৌশল শেখানো হয়েছে।

পরিসংখ্যানে প্রকাশ, সব অশান্তির উৎস স্বামী-স্ত্রী। পাঁচ মিনিটে ভালোবাসা পঞ্চাশ মিনিট সরব কাজিয়া। ছেলে আর ছেলের বউ থামল তো, শুরু করলেন, দাদা, বউদি। তাঁরা শেষ করলেন তো শুরু করলেন বাবা মা।

প্রশ্ন হল, স্ত্রী কেন স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করেন?

তার আগে জানা দরকার, স্ত্রী কীভাবে হয়। কোনও মেয়ে জন্মেই স্ত্রী হতে পারে না। স্ত্রী লোক হয়ে জন্মায়। তারপর ব্যাঙাচি যেমন লেজ খসে ব্যাং হয়, সেইরকম স্ত্রীলোকের লোক খসে স্ত্রী হয়। লোক জিনিসটা কী? পিতৃলোক ছেড়ে শ্বশুরালোকে আগমনই হল লোক খসা। জন্মসূত্রে পাওয়া টাইটেল-মাইটেল সব গেল। ঘোষ হল বোস। চাটুজ্যে হল মুকুজ্যে। নিজের বাবা, মা ভেসে গেল। শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে নিয়েই ব্যস্ত।

।। স্ত্রী হয় কীভাবে ।।

সাবেক প্রথা হল, মেয়ে চড়চড় করে বেড়ে উঠবে কলাগাছের মতো। যাকে বলে যুবতী। শুদ্ধ বাংলায় অরক্ষণীয়া। বাপ, মা কেমন করে বুঝবেন, মেয়েকে আর রক্ষা করা যাচ্ছে না, অরক্ষণীয়া। সেই এক প্রাকৃতিক খেলা, 'বনে যখন ফুটল কুসুম।' ফুল ফুটলে ভ্রমর এসে ভোঁ ভোঁ করবে। লোক থমকে দাঁড়াবে। আড়ে আড়ে তাকাবে। মওকা পেলেই যুবকরা এদিক ওদিক তাকিয়ে সিক করে সিটি মেরে বসবে। অপ্রতিরোধ্য ব্যাপার। কবিতা করে বলতে হলে বলতে হয়, 'ছেলেদের কাজ ছেলেরা করছে/টেরিফিক সিটি মেরেছে।' কাগজের গুলি-ফুলি ছুড়ে মারতে পারে। সাইকেলে চেপে চক্কর মেরে যেতে পারে, ফুলের চারপাশে প্রজাপতির মতো। ইলি বিলি করে এসের মতো, জেডের মতো কেরামতি করতে গিয়ে সাইকেল-মাইকেল নিয়ে নর্দমায় পড়ে যেতে পারে। শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। করবেই তো। করবেই তো। যৌবনের খেলা। That is in the game. এদেরই মধ্যে মেয়েটির হয়তো ভালো লেগে যেতে পারে কারোকে। তখনই জমবে মজা। বারে বারে চলে যায় জানালার কাছে/তাকায় উদাস চোখে আকাশের পানে/মেজাজ কখনও ভীষণ ভালো, যেন দয়াময়ী/কখনও সপ্তমে বাঁধা, খেঁকি জ্বালাময়ী/তখনই বুঝিয়া লহ/মেয়ে পড়িয়াছে প্রেমে।

মেয়ের যখন এমত বেপথ অবস্থা, তখনই শুরু হবে গৃহিনীর তাড়া। ছেলে ধর, ছেলে ধর, পার কর নাইয়া। এইবার ছেলে কী করে ধরা হবে। সে কী মাছ ধরা।

মেয়ের জন্য শাঁসে জলে পুষ্ট একটি ছেলে ধরার একালের সহজ পদ্ধতি হল, কাগজে বিজ্ঞাপন, পাত্র-পাত্রীর স্তম্ভে, অথবা বিজ্ঞাপন দেখে পাঁজা-পাঁজা চিঠি পড়া। গিন্নি লিখবেন, কত্তা পোস্ট করে আসবেন। এমনও হতে পারে, তাঁরা জানেন, মেয়ে তার পছন্দের একটি ছেলের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। করলেও পিতা, মাতার অধিকার বোধ, কর্তৃত্ব বোধ যাবে কোথায়। তুমি বিয়ে করবে কী? এত স্বাধীনতা তো ভালো নয়। আমরা দেখে শুনে বাজিয়ে বুজিয়ে ছেলে কিনে আনব। তারপর তুমি যত পারো প্রেম করো। বিজ্ঞাপন যদি দিতে হয় তাহলেই আসে খরচের প্রশ্ন। কম খরচের বিজ্ঞাপনের সাঙ্কেতিক ভাষার উদাহরণ : কন্যা, বি. এ, দ: রা:, পাঁ: ফু:, ব: কুড়ি, উ: শ্যাম, গা: জানে, ব্রা: পাত্র চাই, ব্যাঙ্ককর্মী, সরকারি চাকুরি, নিজেদের বাড়ি থাকলে ভালো হয়।

সঙ্কেত ভাঙলে দাঁড়াবে, মেয়ে বি. এ পাশ, দক্ষিণ রাঢ়ী, উচ্চতা পাঁচফুট, বয়েস কুড়ি, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, গান জানে, ব্রাহ্মণ পাত্র চাই, ব্যাঙ্কের কর্মী অথবা সরকারি চাকুরি ও নিজেদের বাড়ি থাকলে ভালো হয়।

কন্যাপক্ষ অবশ্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের হার না জেনেই আধপাতার এক সাহিত্য রচনা করে নিয়ে যাবেন। বিশেষণের ছড়াছড়ি। এক বিশেষ্যকে বিশেষ করতে গিয়ে শত বিশেষণ। গৃহকর্মে সুনিপুণা, রন্ধন পটিয়সী, সূচি শিল্পে সুদক্ষা, সেবাপরায়ণা, দরদী, মরমী, হাসলে টোল পড়ে গালে, পটলচেরা চোখ, মুক্তদন্তী, পাতলা ওষ্ঠী, যার কোনওটাই সত্য নয়।

বিজ্ঞাপন কর্মী বলবেন ছাঁটুন, ছাঁটুন, কদম ছাঁট মারুন, বিজ্ঞাপনেই তো দেউলে হবেন। সব বিসর্গ রাখুন। বেশি বিশেষণ চড়ালে বিশেষ্য বিশেষ বিশ্বাস আসবে না। একালের মেয়েদের সঙ্গে ছুঁচ সুতোর কোনও সম্পর্ক নেই। একী দিদিমার বিয়ে। নৃত্য, গীত? কেন দুনম্বরি করবেন? পরে এই নিয়ে অশান্তি হবে। পটলচেরা চোখ হয় মহীশূরের মেয়েদের, বাংলায় সব আলুচেরা। মুক্তোর মতো দাঁত কাব্যে হয়, বাস্তবে বেশিরভাগই গলাল। গজেন্দ্রগামিনী বললে ভুল বুঝবে, ভাববে গুজরাতী হাতি, সেবাপরায়ণা বলে মেয়ের বিপদ বাড়াবেন না। শ্বশুর, শ্বাশুড়ি থাকলে বেচারা মারা পড়বে। রন্ধন পটিয়সী। মেয়ে কোনওদিন হেঁসেলে ঢুকেছে? মশাই মেয়েদের যে গুণ অতীতে প্রশংসার ছিল, আধুনিকদের বেলায় সেসব নিন্দের। আধুনিক বিশেষণ হল, চটপটে, ছটফটে, কথার কই ফোটে মুখে। ভীষণ হিসেবি, এক পয়সায় মরে বাঁচে। হৃদয় আছে, সে হৃদয় হল টুলুপাম্প, শুধু রক্ত ছোটায় শরীরে। দয়া, মায়া নেই বললেই চলে।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%