মা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

জাম্বো জেটের মতোই, জাম্বো খাট। দোতলার ঘরের প্রায় আধখানা জুড়ে বুক পেতে রেখেছে। সেই খাটের আবার বাহার কত। চারপাশে সানমাইকার 'লেয়ার'। দুপাশে, মাথার দিকে দুটো ফোকর। কাচ ফুঁড়ে দুধের মতো আলো ঠিকরোয়। শুধু একটি সুইচ টেপার মামলা। বিমান ছোট মতো একটা প্রেম করে সুমিতাকে বিয়ে করেছিল। প্রেম মানে, মেয়েটিকে পছন্দ হওয়ার পর শ্বশুর মশাইয়ের 'পারমিশন' নিয়ে বিয়ের আগে বউকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছিল।

আজকাল হচ্ছে এইরকম। নতুন নতুন এইসব নিয়ম চালু হয়েছে। এ যেন সেই নতুন জুতোর 'ট্রায়াল'। পরে বহু দূর যাওয়ার আগে কাছাকাছি একটু ঘুরে বেড়ানো। ফোস্কাটোস্কা যা হওয়ার হয়ে গেল। সয়ে গেল পায়ে। আড় ভেঙে গেল। পায়ের গঠন অনুসারে দুমড়ে মুচড়ে একেবারে ফিট। এবারে যেখানে যাবে যাও মহা ফুর্তিসে। বিমান সেইরকমই একটা কিছু করেছিল। ছাত্রজীবন থেকেই তার একটু প্রেমট্রেম করার ইচ্ছে হয়েছিল। সাহসে কুলোয়নি। ভেবেছিল সে এগোতে না পারলেও, কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে অপর পক্ষ থেকে। তেড়ে ব্যায়াম করে দেহটা বেশ ভালোই বাগিয়েছিল। মেয়েদের সামনে দম বন্ধ করে বুকটাকে আরও চওড়া করে ট্রাইসেপ, বাইসেপ দেখাতে দেখাতে চলে যেত। তাতে ঘোড়ার ডিম হত। কেউ ফিরেও তাকাত না, প্রেমপত্র লেখা তো দূরের কথা। কমোন রুমের সামনে কচি কদম গাছের তলায় নানা ডিজাইনের মেয়েরা নিজেদের মধ্যে জটলা করত। হ্যাংলা 'ডিসপেপটিক' চেহারার ছেলেরাই প্রেমের বাজার 'ক্যাপচার' করে বসেছিল। চোখে সব পুরু কাঁচের চশমা। হজমের অসুখ। ছুকু ছুকু চা খায়। ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে, তালব্য শ'কে ডবল তালব্য করে উচ্চারণ করে। নাকি সুরে কবিতা কপচায়। মলিয়েয়ার বোদলেয়ার প্রুস্ত। নিজের দেশের খবর তেমন রাখেই না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে না, বলে 'টাগোর'। এইসব কাটের ছেলেদেরই মেয়েরা বেশি পছন্দ করে।

অম্বল চোঁয়া ঢেঁকুর, হেডেক লিভার হালকা কাশি মাঝে মাঝে ছিঁৎ করে হাঁচি, আমরা এমন ছেলে ভীষণ ভালোবাসি। বিমানের প্রাণের বন্ধুরা বলেছিল, ব্যায়ামটা একটু বেশি হয়ে গেছে ভাই। এই শরীরে প্রেম পেতে হলে ইউ. এস. এ-তে যেতে হবে। এ 'ফ্রেমে' এদেশে প্রেম হবে না। আমেরিকায় ওরা মানুষকে 'গাই' বলে। 'গুড গাই', 'ব্যাড গাই'। তুই বরং দাড়ি রেখে দ্যাখ কী হয়। বিমান প্রথমে ফ্রেঞ্চকাট করল। ফ্রেঞ্চকাট মুখ নিলে না। কেমন যেন ডউরে কলার মোচার মতো হয়ে গেল মুখটা। চারপাশ দিয়ে কামিয়ে দাড়িটাকে যখন বের করে আনত তখন মনে হত হবিষ্যি খাওয়া বিধবা। সে এক উলটো উৎপত্তি হল। তখন বিমান চাপ দাড়ি রাখল। চাপদাড়িতে তাকে দেখতে হল হেমিংওয়ের মতো। বন্ধুরা বললে, এ দেশে তোর আর প্রেম হবে না। তুই বিহারে যা। কোনও ভোজপুরি প্রেমিকা জোটে কি না দ্যাখ। বিমানের তখন থেকেই বেশ ভুঁড়ির লক্ষণ দেখা দিচ্ছিল। ডন বৈঠক মারা শরীর। সাংঘাতিক ক্ষিদের জোর। সকালে আড়াইশো গ্রাম ছোলা মারে। মায়ের আদুরে ছেলে। রাতে একবাটি ক্ষীর রেগুলার বরাদ্দ। যেই ব্যায়ামে ভাঁটা পড়ে হুহু করে ভুঁড়ি বাড়ে। জামা ঠেলে বেরিয়ে আসে সামনে। মেয়েদের 'ম' ও জানে না বিমান। মেয়েরা ভুঁড়ি একেবারে সহ্য করতে পারে না। নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করে, পেটটা যেন দশমাসের করে রেখেছে। চেহারার ছিরি দ্যাখো। বিমানের ছাত্রজীবনটা বেকার কেটে গেল। সহপাঠিনী সেবাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। ধারালো কাঠ কাঠ চেহারা। মোমের মতো গায়ের রং। যখন চোখ তুলে তাকাত মনে হত দূর সমুদ্রের নাবিক লাইটহাউসের আলো দেখছে। সেবাকে সে একশোটা চিঠি লিখেছিল। সাহস করে একটাও হাতে ধরাতে পারেনি। সেবার বাবা ছিলেন ডি. এম। ভয় হত যদি হতকড়া পরিয়ে ছেড়ে দেন। বিমান গ্রে সায়েবের এলিজি পড়েছিল, কত ফুল অলক্ষে ফুটে নিভৃতে ঝরে যায়। আসলে প্রেম জিনিসটা সাহসী মানুষের 'সাবজেক্ট'। প্রেমিকার মুখোমুখি হতে হলে বাঘশিকারীর সাহস চাই। বিমান একটা বোম্বাই শরীর অর্জন করলেও ভীতু ছিল। ভীষণ ভীতু। সিনেমা হলে পাশের আসনের অপরিচিতা এক মহিলার হাতে অসাবধানে একবার হাত ঠেকিয়ে ফেলেছিল, একশো বার 'সরি' বলার পর মহিলা উত্যক্ত হয়ে বলেছিলেন, ডাকব, টিকিট চেকারকে ডাকব, আপনি আমাকে 'টিজ' করছেন। বিমান আরও ভয় পেয়ে বলেছিল, মা কালীর দিব্যি আমার কোনও বদমতলব ছিল না। হাতটা সরাতে গিয়ে লেগে গেছে। মহিলা শেষে মহাবিরক্ত হয়ে বিমানের হাতে একটা চকোলেট দিয়ে বললেন, দয়া করে এটা মুখে ভরে ফেলুন। বিমান তখনও বলে চলেছে, বিশ্বাস করুন, আমার বাবা ছিলেন রেলের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। বোধহয় বোঝাতে চেয়েছিল, হেডমাস্টার মশাইয়ের ছেলে জেনেশুনে অচেনা মহিলার হাতে অকারণে খোঁচা মারতে পারে না। ওদিকে সিনেমা বেশ কয়েক শো ফুট হড়কে গেছে। বিমানের ওপাশের ভদ্রলোক বিমানের বকবকানির উত্তরে বলে উঠলেন, তাতে আমার বাবার কী? চুপ করে বসবেন না গলায় 'হাফমুন' দেব!

এই বিমান, দেড়েল বিমান ভালো চাকরিতে ঢুকেও প্রেম ভুলতে পারল না। জীবনের একটা অভাববোধ। জীবন্ত একটা মেয়ে, যার নিশ্বাস পড়ে, বুক ওঠানামা করে, তার পাশে পাশে ঘুরছে, বিয়ে করা বউ নয় কিন্তু! টাটকা একটা মেয়ে। তার সঙ্গে সিনেমায়। কাঁধে কাঁধ। হাতে হাত। ময়দানে গাছতলায় বসে মুক্তোর মতো দাঁতে কুটুস কুটুস করে সে ঘাস কাটছে, চাঁপার কলি আঙুলে ধরে। যখন উঠে আসছে মনে হচ্ছে কেউ যেন জায়গাটায় লনমোয়ার চালিয়ে গেছে। এক কেজি চিনে বাদামের খোলা পড়ে আছে। ঝরা শিশিরের মতো ঝরা প্রেম। সেসব কিছুই হল না। বুকভরা বেদনা। একমুখ দাড়ি। ভুঁড়ো একটা পেট। একগাদা টাকা মাইনে। বিমান ইঞ্জিনিয়ার। রোজ অফিস যায়। রোজ বাড়ি আসে। সেবা সেনকে স্বপ্নে দেখে। সেবা তিরিশ জন প্রেমিককে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাত। কেউ তার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিত। কেউ তার মুখে আইসক্রিম পুরে দিত। কেউ তার সিল্কের শাড়ি বয়ে নিয়ে যেত শালকরের কাছে। সেই বৃত্তে বিমান ছিল না। অথচ বিমান সেবার খোঁপায় দেওয়ার জন্যে ছাদে চন্দ্রমল্লিকা করেছিল।

পশ্চিমবাংলার বিয়ের বাজারে বেকারদেরও চাহিদা। পড়তে পায় না। হটকেক। বলে বিয়ে করলেই ভাগ্য ফিরে যাবে। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে পাত্রী টেনে আনে। চাকুরিরতা পাত্রী চাই। অসবর্ণে আপত্তি নাই। দাবিশূন্য। পাত্র সমাজসেবী। বারোয়ারি পুজো চালায়। পাড়ায় সুপ্রতিষ্ঠিত। পিতা সরকারি চাকুরে। উপরি আছে। সেই পশ্চিমবাংলায় কতদিন বিমান পাশবালিশ সঙ্গী করে রাত কাটাতে পারে। বিমান অবশ্য হতাশায় ওই সময়ে আর একটু হলেই কবি হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েদের নিষ্ঠুরতায় প্রেমিক হতে না পারলেও, কবি হওয়া কে আটকায়। তার দাড়ি ছিল। এক নম্বর প্লাস পয়েন্ট। হাতের লেখা দুর্বোধ্য। দুনম্বর পয়েন্ট। বাংলা সাধারণ বানানও তার ভুল হত। বাড়িতে 'র' হবে না 'ড়' বসে বসে ভাবত। শেষে লিখত গৃহ। তিন নম্বর পয়েন্ট। জীবনের নি:সঙ্গতার কথা ভেবে তিন লাইন লিখে ফেলেছিল, যতদূর যাও, কেউ না থাকুক, চটিই তোমার সঙ্গী হবে। চটিকে চটিও না। স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেলে পকেটে রেখো কাঁটা পেরেক। হাতুড়ি কোথাও না কোথাও অবশ্যই পাবে। চটিকে চটিও না। জীবনসঙ্গী হবে।

বিমানের এক মাসি তাঁর কাজই হল বিয়ে দিয়ে বেড়ানো। পুণ্য ব্রতও বলা চলে। বুড়ো বুড়ো ষাঁড় হয়ে ঘুরে বেড়াবে তাঁর দু চক্ষের বিষ। এতে সব চরিত্র খারাপ হয়ে যায়। বিয়ের বয়েস পেরিয়ে গেলে মেয়েদের স্বাস্থ্য ক্ষয়া ক্ষয়া হয়ে যায়। ত্বকের চেকনাই কমে যায়। সেই মাসি তাঁর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের ডাগুর-ডুগুর মেয়ের ছবি এনে বিমানকে বললেন, দ্যাখো তো বুড়ো মনে ধরে কি না? বিমান চমকে উঠল, একেবারে সেবা সেনের দ্বিতীয় সংস্করণ। চাঁচা-ছোলা চেহারা। সব ব্যাপারে নাক গলাবার মতো লম্বা একটা নাক। রাগি রাগি দুটো চোখ। দেখলেই মনে হচ্ছে, ফ্যাঁস করে ছোবল মারবে। পাতলা দুটো ঠোঁট। সামান্য লম্বাটে মুখ। যেন অভিমান করে আছে। এক কথায় বিমান কাত। মাসি ভাবস্থ বিমানকে বললেন, এখন একটু রোগার দিকেই আছে। তবে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, বিয়ের জল পড়ার তিন মাসের মধ্যেই মুটিয়ে যাবে। মোটার বংশ। যেমন মায়ের গতর সেইরকম বাপের। একটু সাবধানে প্রতিপালন কোরো। গাছের গোড়ায় বেশি সার ঢেলো না। ঘি, তেল মিষ্টির দিকে একটু নজর রেখো। দেখবে একেবারে মেমসায়েবের মতো ফিগার থাকবে। সকাল বিকাল একটু বেড়াতে নিয়ে যাবে। তেতো খাওয়াবে। বছরে একবার করে বায়ু পরিবর্তন। মোটা গদার মতো বউ আমার দুচক্ষের বিষ। আজকাল শুনেছি আমেরিকায় মেয়েরা ডাম্বল ভাঁজছে। তোমার বারবেল ডাম্বল দুইই আছে। কেবল একটা জাঙ্গিয়া কিনে দেবে। বিমানের মাসি চোখটাকে সামান্য তেরছা করলেন। নি:সন্তান মহিলা। কথায় কথায় একটু আদিরসের দিকে যাওয়ার প্রবণতা।

বিমান এক রবিবার মেয়ে দেখে এল। নেশা ধরে গেল চোখে। নীল ফিনফিনে শাড়ি। লম্বা কালো চুল। টানা টানা ছলছলে চোখ। যেন সিনেমার নায়িকা চোখে গ্লিসারিন দিয়েছে। হাত দুটো যেন শালুক ফুলের ডাঁটা। মেয়ে দেখার সময় বিমানের মাসি মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মেয়ের মাও সুন্দরী, তবে গুজিয়া খেয়ে খেয়ে একটু মোটার দিকে চলে গেছেন। পৃথিবীতে তাঁর এখন একটিই দুর্বলতা নিমাই মোদকের গুজিয়া। স্বামীর ফার্নিচার তৈরির কারখানা। বিশাল রোজগার। ঘুরছেন ফিরছেন আর হাত আড়াল করে মুখে টুপ করে একটা গুজিয়া ফেলে দিচ্ছেন। বিমানের মাসি যেন দূর থেকে নিজের আঁকা ছবির ক্যানভাস দেখাচ্ছেন। বিমানকে বললেন, কী কেমন দেখছ। কান দুটো দেখেছ? এই দ্যাখো, চুল সরিয়ে কান বের করলেন। টুলটুল দুল দুলছে। গজকর্ণ নয়। বুদ্ধকর্ণ। লতি দেখেছ! প্রায় ছ'ইঞ্চি ঝুল। লতিটাই দেড় ইঞ্চি। ভারী সুলক্ষণ। এইরকম কান হলে মানুষ উদার হয়। তোমার আর কিছু দেখার আছে? বিমান একটা আঙুল তুলে মাসিকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বললেন, লাজুক মুখে, দাঁত! দাঁত দেখতে ইচ্ছে করছে। মাসি বললেন, তুমি কি ডেন্টিস্ট। ও মেয়ে, একবার দাঁত খিচোও তো।

দেখে আসার তিন-চারদিন পরে বিমান একটা প্রেমপত্র লিখে বসল। সুমিতা অবাক। এমনও হয় না কি! বিয়ের বাজারে বিমানের দর তখন ক্রমশই বাড়ছে। চাকরিতে তখন তার খুব সুনাম। ভিক্টোরিয়ার মাথার ওপরের পরী ঘোরাবার কমিটিতে তার নাম ঢুকেছে। বাড়ছে হু হু করে; সুমিতার মা বললেন, শিগগির উত্তর লেখ, বেশ ইনিয়ে বিনিয়ে। মাছটাকে চারে ভেড়া। ফসকে না যায়। সুমিতার মা এইভাবে অবশ্য বলেননি, তবে তাঁর মনের ভাবটা এইরকমই ছিল। বিমানের মতো ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে কম ভাগ্যের কথা। বিমানের বলতে গেলে কেউ নেই। একান্নবর্তী পরিবারে থাকে। আরও তিন ভাই আছে। বিমানের বড়। তিন ভাইয়ের তিন হাঁড়ি। বিমানের ব্যবস্থা সেজোর সঙ্গে। সেজো বিমানের মতোই ভোলেভালে। কুচুটে নয়। সেজোর বউটা একটু পাগলি পাগলি। এই রাগছে এই হাসছে। কোনও একসময় নাচত। সংসার এখন নাচাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিমানের ঘরে এসে আপন মনে ঘুরে ঘুরে নাচে। বিমান তখন হয় তো কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং করছে। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে সেজ বউদির দিকে। সেজ বউদি নাচতে নাচতে হঠাৎ একসময় পেছন থেকে বিমানের গলা জড়িয়ে ধরে আচমকা। বাচ্চা মেয়ের মতো বিমানের চওড়া পিঠে শরীর এলিয়ে দিয়ে দোল খেতে থাকে। বিমানের ড্রইং-এর বারোটা বেজে যায়। লাইন-ফাইন বেঁকেচুরে একাকার। সেজবউদি কুটুস করে বিমানের কান কামড়ে দেয়। দাড়িতে গাল ঘষে আর বলে—কী সুড়সুড়ি লাগছে গো, কী সুড়সুড়ি! বিমানের পিতা চলে যাওয়ার পর ভাইয়েরা মাকে সামনে রেখে বাড়িটার চারভাগ করে নিয়েছে। বিমান দোতলায় রাস্তার দিকের একটা বারান্দা ঘেরা ঘর পেয়েছে আর পেয়েছে ঠিক তার তলার ঘরটাও। ভাগটা এই ভাবেই হয়েছে। ভাইয়েদের মধ্যে এই নিয়ে কোনও খেয়োখেয়ি হয়নি। তিন বছর হল মা চলে গেছেন। ফাঁকা মাঠ। মরুদ্যান এই সেজ বউদি। গলাটা ভালো। রবীন্দ্রসংগীত করত। এখন গুনগুন করে।

এমন একটি মুক্তপুরুষকে জামাই করা কম ভাগ্যের কথা। শীতের শুরুতেই শেষ করতে হবে। সুমিতার দুটো মারাত্মক ব্যামো আছে টনসিল আর অ্যালার্জি। শীত বাড়ে টনসিল বাড়ে। খ্যাঁক খ্যাঁক ছাগুলে কাশি। যারা শোনে তাদের বিরক্তি ধরে যায়। অ্যালার্জিও শীত-অ্যালার্জি। ফরসা শরীরে লাল লাল গুটি বেরোয়। পায়ের কাছে। হাতের তালুতে। পিঠে। চিড়বিড় করে চুলকোতে থাকে। যত চুলকোয় তত লাল হয়। ও ওষুধ বিষুধে তেমন কোনও কাজ হয় না। চিকিৎসক বলেছেন, এ হল গিয়ে মেন্টাল কেস। এই বয়েসের মেয়েদের নানা ব্যাপারে হয়। বিয়ে দিলেই দেখবেন সব ভিরকুটি চলে গেছে। সুমিতার মা ভাবেন, আমরাও তো এই বয়েস পেরিয়ে এসেছি। আমাদের কালে তো এইসব ছিল না।

বিমান একটা চিঠি পেল দিন-তিনেকের মধ্যে। মধুর আমন্ত্রণ। আসুন না একদিন আমাদের বাড়িতে। বাড়ির পেছনে এটা ঝিল আছে। ঝিলে বক আসে। জলপিপি। মাছ ঘাই মারে। আম, জাম, লিচু গাছ আছে। কৃষ্ণচূড়া, কদম। বাবার ছিপ আছে হুইল আছে। ইচ্ছে করলে মাছ ধরতে পারেন সারা দিন। সুমিতা সাধ্যমতো সাহিত্য করে করে চিঠি দিয়েছে। বিভূতিভূষণ তার প্রিয় সাহিত্যিক। চিঠিতে তাঁরই প্রভাব। আরও দুচার লাইন লেখার ইচ্ছে ছিল। লোডশেডিং হয়ে গেল। ল্যাম্প জ্বেলে ইতি লিখে শুয়ে পড়ল।

বিয়ের আগেই বিমানের দরজা খুলে গেল। বিমান ঠিক গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে নয়। গুছিয়ে, বেঁধে ছেঁদে কথা বলতে পারে না বলে কম কথা বলে। চিঠিটা পাওয়ার পর বিমানের গলায় সুর এল। বাথরুমে জল পড়ছে বিমান গান গাইছে তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ উঁ হুঁ। জলজ্যান্ত একটা মেয়ে তাকে চিঠি লিখেছে। সম্বোধনটা তেমন রোমান্টিক হয়নি। পাওনাদারের মতো প্রিয় বিমানবাবু। ইতি সুমিতা না লিখে ইতি তোমার সুমিতা লিখলে জিনিসটা আরও জমে যেত। 'যাকগে সামথিং ইজ বেটার দ্যান নাথিং'।

কলকাতার প্রেমিক-প্রেমিকাদের যতগুলি বিচরণভূমি আছে বিমান মনে মনে ঠিক করার চেষ্টা করল, ভূতঘাট, জগন্নাথঘাট। না ও দুটো জায়গা প্রেমের স্পট নয়। ওখানে যত বেতো আর হাঁপানি রুগির ভিড়। তেল মালিশ আর বুটপালিশওয়ালার ভিড়। ওই লাইনে আর একটা ঘাট আছে। কিছুতেই নাম মনে আসছে না। সেজো বউদিকেই শেষে জিগ্যেস করল, একমাত্র প্রাণের বন্ধু। অ্যাডভাইসার। সেজ বউদি জীবনে একবারই প্রেম করেছিলেন। অতিশয় লুক্কায়িত ব্যাপার। কাক পক্ষীও টের পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু সেজ বউদির মা ঠিক পেয়েছিলেন। সব মায়েরই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভয়ানক সজাগ। সিগারেট খাওয়া প্রেম করা স্বামীদের পরনারীতে গমন, সকলের চোখে ধুলো দেওয়া যায়, যায় না মায়ের চোখে। সেজ বউদি তিনমাস গৃহবন্দি। আর সেজ বউদির বাবা পাগলের মতো ছেলের খোঁজ করতে করতে সেজদাকে ধরে ফেললেন। প্রেমের সমাধি তীরে সেজদা এখন হাবসী খোজা। বিমান ঘটনাটা জানে না, জীবনে জানতেও পারবে না। পারলে সেজদাকে সে বেল্লিক বলত।

সেজ বউদি বলে দিলেন, ভূতঘাট নয়, প্রিনস অফ ওয়েলস ঘাট। ম্যান অফ ওয়ার জেটি। পানিঘাট। স্ট্র্যান্ড ব্যাংক রোড। নৌকো। বিমানের খুব ইচ্ছে নির্জন জায়গায় শেষ সন্ধ্যায় বসে বসে প্রেম করবে। প্রথমে আসবে ছিনতাই পার্টি। ফিল্ম কায়দায় মারামারি। মেরে একেবারে পাট পাট করে দেবে। বিমান মারামারি খুব সুন্দর পারে। একেবারে ছবির মতো। বংশগত গুণ। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এরপর একদিন পুলিশ ধরবে! সারারাত দুজনে লকআপে কাটাবে। কী রোমান্টিক ব্যাপার! প্রেম হো তো অ্যায়সা। কেলেঙ্কারি ছাড়া প্রেম জমে না। এই শ্রীকৃষ্ণের কেসটাই দ্যাখো না। অবতার পুরুষ। অর্জুনের সারথি কাম অ্যাডভাইজার। অত বড় একটা গীতা গড়গড় করে আওড়েছিলেন। হাঁ করে দেখিয়ে দিলেন গোটা বিশ্বটা তাঁর দাঁতে আটকে আছে চিউইং গামের মতো। শ্রীকৃষ্ণ যদি রাধার মাকে, রাধার ননদকে বলতেন, দ্যাখো বাপু, রাধাকে আমি ভালোবাসি। আর রাধাকে যদি বলতেন, যাও ডিভোর্স করে পুঁটলি পোঁটলা নিয়ে চলে এসো, তাহলে কিছু করার ছিল! তাহলে কে বাজাত বাঁশী। কে লিখত গীতগোবিন্দ। বৈষ্ণব পদকর্তাদের কী অবস্থা হত! কীর্তনীয়ারা কেমন করে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে গাইতেন, রাধার কি হইল অন্তরে ব্যাথা! রা'র পরে ধা, ধা'র পরে রা। ধারা রাধা। লীলাখেলাই হল জীবন। একটু লুকোচুরি। কলঙ্ক, কেলেঙ্কারি।

বিমান একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে সুমিতাকে পাশে বসিয়ে সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াল। সুমিতাকে যত কাছে টানে সুমিতা ততই সরে যায় জানালার দিকে। শেষে বিমানকে বলতেই হল, প্রেমের একটা ব্যাকরণ আছে। গায়ে গা লাগিয়ে বসতে হয়। কাঁধে মাথা রাখতে হয়। বিপজ্জনক নানারকম কাণ্ড করতে হয়। সুমিতা বলেছিল, আপনার সঙ্গে আমার প্রেম। আমাদের তো বিয়ে হবে। প্রেমের কী আছে! প্রেম করলে মা ভীষণ রাগ করবে। বাবা জুতোপেটা! বিমান বলেছিল, আমি তো সেইটাই চাই। তোমাকে আগে জয় করব প্রেম দিয়ে তারপর রসিয়ে বিয়ে করে ঘরে সেট করে দোব। তুমি কি প্রেম ছাড়া ড্রাই বিয়ে করতে চাও। তুমি চাঁদ চাও না কোর্মা। আমি কোর্মা চাই। আমি প্রেমের ভিখারি, প্রেম বিলায় কে নদীয়ায়!

সুমিতা তখনই বুঝেছিল, নাট বল্টু ঢিলে আছে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পাকা মাথা হলেও ব্যাবহারিক বুদ্ধিতে এক নম্বরের গবেট। আবার এও বুঝেছিল দেড়েলটাকে চরাতে সুবিধা হবে। ওঠ বললে ওঠ। বোস বললে বোস। মাঝে মাঝে আড় চোখে বিমানের দিকে তাকাচ্ছিল। সরল একটা মুখ। বেশ স্বাস্থ্যবান, তবে ওই দাড়ির জঙ্গলটাকে নামাতে হবে। লোমে, যে কোনও লোম জাতীয় জিনিসে সুমিতার অ্যালার্জি আছে। ভীষণ বেড়াল ভালোবাসে; কিন্তু কোলে বেড়াল নেবার আগে পঁচিশ মিলিগ্রাম অ্যাণ্টি অ্যালারজিক ট্যাবলেট খেতে হয়। তা বলে বিমানের গালে গাল ঘষার আগেও সেই একই জিনিস করতে হবে। সে তো সম্ভব নয়। দাড়ি আর গোঁফ দুটোকেই শেষ করতে হবে। মনে মনে বিমানকে সে ভালোই বেসে ফেলল। এইসব ছেলে বেশ আন্তরিক হয়। জীবনে সুখ আর শান্তি দুটোই পাওয়া যায়। রেসকোর্সের কাছাকাছি সুমিতা নিজের ইচ্ছাতেই বেশ কিছুটা সরে এল বিমানের দিকে। আর বিমান ভয়ে সরতে চাইল তার দিকে। দরজায় সেঁটে গেল। সুমিতা বললেন, কী হল! দরজা লক করা আছে তো! দেখবেন পড়ে যাবেন না। আপনার ভয় করছে?

—না মানে, আপনি সরে আসছেন তো!

—আপনি বলছেন আমাকে?

সুমিতা সাহসী মেয়ে। সাহস পেয়ে গেছে। একালের মেয়েরা বোকা বোকা ছেলেদের চেয়ে একটু চালুই হয়। বিমান আমতা আমতা করে বললে—তুমি বললে আপনি যদি রেগে যান!

—সারা জীবন আপনি বলবেন?

—না, তা কেন। কাছাকাছি এলেই ফট করে একদিন তুমি বেরিয়ে আসবে।

—যেমন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়!

—বা:, আপনি কবি!

—তিরিশটা কবিতা বেরিয়েছে। বড় পত্রিকাতেও বেরিয়েছে।

—কী হবে! আমার যে কিছুই বেরোয়নি।

—আপনার হাত থেকে ব্রিজের নকশা বেরোবে। বেরোবে ড্যাম, রিজার্ভায়ার।

সুমিতা বিমানকে দরজার সঙ্গে চেপটে থাকতে দেখে হাত ধরে তার দিকে টেনে আনল। বিমান কাঁপছে। মুখের চেহারা পালটে গেছে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছে। সুমিতা জিগ্যেস করলে—হল কী?

বিমান উত্তরে, তিন-চারবার ঢোঁক গেলার চেষ্টা করল। গলা শুকিয়ে কাঠ। বিমান বেশ বুঝতে পারল, ভূত আর নারী একধরনের জিনিস, অন্তত তার কাছে। শেষ রাতে সোনারপুর মামার বাড়িতে একবার মাঝরাতে ভূত দেখে তার এই অবস্থা হয়েছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো।

সুমিতা বললে—জল খাবেন?

বিমান বললে—জ।

তারা ভিক্টোরিয়ার সামনে নেমে পড়ল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তারা যখন জলার ধারে পৌঁছল তখন বিমানের গলা ভিজে উঠেছে। সরোবরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠল—কী সুন্দর।

বিমানের বিয়ে হয়ে গেল। সেজ বউদির ভীষণ ক্ষোভ, গালপাট্টা দাড়ির জন্য লবঙ্গ দিয়ে সারা মুখে চন্দনের টিপ পরানো গেল না। সুমিতা জানত বাসরে বিমান তার গালের কাছে গাল আনবে; কারণ বিমানের ভয় ভেঙে গেছে। পঁচিশ মিলিগ্রাম অ্যান্টি অ্যালার্জিক ট্যাবলেট খেয়ে পিঁড়েতে বসেছিল। শুভদৃষ্টির সময় চাদরের তলায় আর চোখ খুলতে পারে না কিছুতেই। গোটা তিনেক হাই উঠে গেল বড় বড়। হাই জিনিসটা সংক্রামক। বিমানেরও সমসংখ্যক হাই উঠল। হাই তোলাতুলি করে দুজনে বেরিয়ে এল চাদরের তলা থেকে। তারপর, সুমিতা হাই তোলে, বিমানও হাই তোলে, পুরোহিতমশাই হাই তোলেন, সম্প্রদান করতে বসে সুমিতার মামা হাই তোলেন। মামার চিরকালের অভ্যাস, শব্দ করে হাই তোলা। তিনি প্রতিটি হাইয়ের শেষে বলতে লাগলেন—আ: বাবা, বাবা। মন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে মন্দ শোনাল না। পুরোহিতমশাই আবার টুসকি মারেন। খালি পেটে অ্যান্টি অ্যালাজিক। একসময় সুমিতার নাক ডাকতে লাগল। সবাই বললে, কখনও উপোস করেনি তো, মেয়ে আমাদের ক্লান্ত হয়ে পড়েছে গো!

বিমানের সঙ্গে বাসর জাগল সুমিতার বান্ধবীরা। বিমান সারারাত তাদের অ্যাঙ্গেল বোঝাল, সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি বোঝাল। তাদের একটু আদিরসের দিকেই যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। বিমানের কোল ঘেঁষে অঘোর ঘুমোচ্ছে সুন্দরী সুমিতা। বুকের আঁচল সরে গেছে। লাল বেনারসীর ব্লাউজ। এক জোড়া লাল আপেল। বিমান বোকা হলেও ফলমূল তার ভালোই লাগে। সুমিতার বান্ধবীদের জন্যে ফলার করতে পারছে না। মন যত দুর্বল হচ্ছে বিমান ততই চলে যাচ্ছে জটিলতর গণিতের দিকে। শেষে একটি মেয়ে বললে, আপনি কি অঙ্ক ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, ইডেনগার্ডেন।

বিমান বোকার মতো বলে বসল—যেসব পাহাড়ে সিঁড়ি থাকে, সেইসব পাহাড়ে উঠতে পারি।

—পাহাড়ে কখনও হাত বুলিয়েছেন?

—না। আমি দূর থেকে পাহাড় দেখেছি। আমার ভালো লাগে সমুদ্র।

—সাঁতার জানেন?

—তা জানি।

—বেশ, ভালোই হবে। ডোবার ভয় তাহলে নেই। সুইমিং কস্টুম আছে?

—না ভাই।

—এবার তাহলে কিনতে হবে।

—বিমানের মনে হয়েছিল, মেয়েগুলো সোজা ভাষায় কথা বলছে না। হেঁয়ালি করছে। কথার খোলসে অন্য কথা আছে। এইভাবেই রাত ভোর হল। সুমিতা সকালে উঠেই সোজাসুজি বললে—বাড়ি গিয়েই তোমাকে দাড়ি ফেলতে হবে, ফুলশয্যায় আমার হাঁপানির টান উঠবে।

—তোমার হাঁপানি আছে?

—অ্যালার্জি। কুকুর বেড়ালের লোমে, কম্বলে।

—আমাদের বাড়িতে বেড়াল কুকুর নেই।

—তুমি!

—আমি কি ওই শ্রেণিতে পড়ি?

—তোমার দাড়ি। দেখলে না অ্যান্টি অ্যালার্জিক খেয়ে কাল আমার কী হল!

বিমান স্ত্রীর অনুরোধে সেইদিনই জঙ্গল সাফ করে ফেলল। প্রথমে মনটা কেমন একটু বিষণ্ণ হয়ে গেল। সেই ছাত্রজীবনের সঙ্গী। গালে চেপে ঘুরছিল। তারপর ভাবলে, দাড়ি তো আর এমনি রাখেনি। একটা কারণ ছিল। কাননে কুসুমকলি কেন? ভ্রমরা, বাহারি প্রজাপতি আকর্ষণ করার জন্যে। এ দাড়ি তো আর ধর্মীয় দাড়ি নয়। প্রেমের দাড়ি। প্রেমিকা লাল শাড়ি পরে বসে আছে খাটে।

বিমানের সেজ বউদি তেমন খুশি হতে পারলেন না। বিমানের বিয়েটাকে তিনি ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। প্রাণের বন্ধুটিকে বিসর্জন দিতে হল। ছেলেগুলো এত গবেট, পরিষ্কার করে বলে না দিলে মেয়েদের মনের কথা পড়তেই পারে না। একেবারে নিরক্ষর। প্রেম একটু পরকীয়া, সামান্য লুকোচুরি অল্প একটু পাপের ছোঁয়া না থাকলে হয়! দরজা বন্ধ করলুম, খাটে গিয়ে শুলুম, আলো নেবালুম, বউকে জড়িয়ে ধরলুম। এর মধ্যে কোনও ইয়ে আছে! প্রায় অফিস যাওয়ার মতো, আরও ভালো উপমা বাথরুমে যাওয়ার মতো। সেই আলো নেবা, বর্ষার ঝোড়ো সন্ধ্যা জীবনে আসবে না। সেই দাড়িতে গাল ঘষা। বিমানের ভয়, সেজদা দেখে ফেললে একেবারে বেইজ্জত হয়ে যাবে বউদি। বিমান তাকে বলত, তরুণী ইরানী বালা। রোজগেরে ছেলে বিয়ে করেছে বেশ করেছে। তা বলে বউয়ের কথায় দাড়ি বিসর্জন। এক রাতেই বউয়ের ভেড়া বনে গেল। অবশ্য ছেলেটা একটু ভেড়াটে মার্কাই ছিল। ভেড়াটে মার্কা ছিল বলেই ভালো লাগত। যা খুশি তাই করানো যেত।

সেই বউদি দাড়ি বর্জিত বিমানকে দেখে বললেন, মোটেই ভালো দেখাচ্ছে না। তোমার সর্বনাশ করে দিল। ঠিক যেন মেনি বেড়ালটি। একেই তোমার দেহের তুলনায় মুখটা একটু চোপসানো। মাথায় তুলছ তোল, পরে সামাল দিতে পারবে না। শোনো, প্রেমিকা এক জিনিস বউ আর এক জিনিস। প্রেমিকা থাকে বইয়ের পাতায় আর বউ থাকে হিসেবের খাতায়। সেজ বউদির কথায় বিমান একটু ঘাবড়ে গেল। বিমানের চোখে সেজ বউদি একজন আদর্শ মহিলা। সেজ বউদি তাকে মেয়েদের অন্তর্জগতের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। সেসব বিস্ময়কর ব্যাপার। যত জানাবে তত পাগল হবে।

বউভাতের রাতে বিমানের শ্বশুরমশাই জামাইকে চিনতে পারেন না। তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ের শুভ বিবাহ হয়েছিল! কে একজন টিপ্পুনি কাটল, বিয়ে হচ্ছিল না বলে দাড়িটা মানসিক রেখেছিলেন, বিয়ে করেই দেবীর চরণে।

সুমিতার বাবা সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলেন। বুঝলেন কাজের বাড়িতে কিছু ফচকে ছোঁড়ার আমদানি হয়েছে। বিমান কিছুই চায়নি, তবু ব্যাবসাদার শ্বশুরমশাই দিয়েছেন অনেক। এক তো খাটেতেই ফাটিয়ে দিয়েছেন। বিমানের ঘরে পাতা রয়েছে, মনে হচ্ছে, এখুনি সম্রাট পঞ্চম জর্জ এসে এক গেলাস জল খেয়ে দুর্গা বলে শুয়ে পড়বেন। কিছু পরেই গিন্নি আসবেন মুখে পান দোক্তা। সাধারণত কর্তারাই আগে আসেন। নিদ্রা যখন মধুর আমেজে সারা শরীর প্রায় ঘিরে ধরেছে তখন গৃহিণী আসেন খাট কাঁপিয়ে। শয়নের প্রাক্কালে শেষ ভূমিকম্প। কারণ রাতের মতো কোম্পানি ক্লোজ হচ্ছে। এসেই কর্তাকে একে খোঁচা মেরে বলেন—সরে শোও। কী বিশ্রী শোয়া! যতদিন যাচ্ছে তত যেন কচি খোকাটি হচ্ছেন। পাশ ফেরো, নাক তো প্রায় ডাকতে শুরু করেছে। নাক নয় তো কামান। দিবসের শেষ তোপটি দেগে তিনি মশারির গোঁজা শুরু করেন। বাঘের মতো হামা দিয়ে দিয়ে। বাজে কোম্পানির খাট হলে জাহাজের মতো দুলতে থাকে। রোলিং, পিচিং দুটোই অনুভব করা যায়। যেন, এম. ভি. রত্নগিরি ভারত মহাসাগরের ভয়ঙ্কর টেন ডিগ্রি চ্যানেলে ঢুকেছে। শ্রী পঞ্চম জর্জ তখন ঘুম জড়ানো গলায় বলতে থাকেন, শ্রী রাধিকে এলে'।

সুমিতার বাবার এই অভিজ্ঞতা আছে। তিনি তাই স্পেশাল খাট দিয়েছেন। দুপাশের দুই ঘুলঘুলি দিয়ে আলো বেরোচ্ছে। ভেতরে আবার ইলেকট্রনিক সিসটেম ভরা। বোতাম টিপলেই মিউজিক। পেয়ার আ রাহা হই, মোরা পেয়ার। খাট আবার সকালে ঘণ্টা বাজিয়ে ঘুম থেকে তুলে দেবে। ওঠো শিশু মুখ ধোও। পরো নিজ বেশ। শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াই হলেও এ খাট নড়বে না। সবাই খাট দেখতে লাগলেন আর বিমানের শ্বশুরমশাইকে জিগ্যেস করতে লাগলেন, কোথা থেকে পেলেন এমন আইডিয়া। একেবারে জাপানি ব্যাপার।

এই খাটেই বিমানের সংসার বড় হল। বিমানের ছেলের আগমন হল। একটি কেন একসঙ্গে চারটি এলেও খাটে জায়গা পড়ে থাকত। চারটে দেওয়াল তুলে দিলে আর একটা ঘর। অতিথি এসেই কিঞ্চিৎ খেলা দেখালেন। সুমিতার স্বভাবটি ততদিনে স্পষ্ট হয়েছে। বউরা সব জল রঙে আঁকা ছবি। না শুকোলে জ্বলজ্বলে হয় না। সুমিতা খুবই ভালো মেয়ে, তবে একটু রাগি। রাগলে চিৎকার করে না গুম মেরে যায়। কথার কনস্টিপেশন। আর তখন সে মাত্রাতিরিক্ত কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলে। তখন আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তখন শরীরের তুলনায় গায়ের জোরও বেড়ে যায় সাংঘাতিক। যেমন, ভাগের বাড়ি, ঠিক আছে যে যার নিজের বিচরণভূমি ছিমছাম রাখবে। রাগত সুমিতা ঝাড়ু চালাতে চালাতে নিজেদের ঘর থেকে সেজ বউদির, সেজ থেকে মেজ, মেজ থেকে বড়তে গিয়ে ঠেকে গেল; কারণ বাড়ি ফুরিয়ে গেছে। দেওয়াল না থাকলে পাশের বাড়িতেই চলে যেত। আর সুমিতা কীসে যে রাগবে আর কীসে রাগবে না বলা কঠিন। কেউ একটার বেশি তিনটে হাঁচলে সুমি ফায়ার। একবারে কেউ কথা বুঝতে না পারলে সে দ্বিতীয়বার আর বলবে না রেগে গিয়ে। খেতে বসে জল চেয়েছে। হেঁচকি উঠছিল। কাজের মেয়েটি শুনতে পায়নি। 'কী বললে মা' খাওয়া ছেড়ে উঠে গেল সুমিতা। বাঁহাতে জল গড়াতে গেল। কসলি উলটে এসে পড়ল পায়ে। সুমিতার সব ভালো, কেবল একটু বেশি মেজাজি। মেজাজ যদি ভালো থাকে সুমিতা দেবী। মেজাজ খাট্টা থাকলে ধারে কাছে না যাওয়াই ভালো। রাগের স্বভাব হল, রাগ ভাঙতে হয়। মিষ্টি মিষ্টি দু'চারটে কথা বলে একটু তোল্লাই দিয়ে দিলেই রাগ জল হয়ে যায়। স্নেহের উষ্ণতা। সুমিতার ক্ষেত্রে কেস উলটো। যত সাধবে, যত বোঝাতে যাবে ততই তার জ্বলুনি বাড়বে। তাকে একা থাকতে দাও। সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে। হয় কয়েক ঘণ্টায়, না হয় কয়েক দিনে। এটাও কোনও নিয়মে পড়ে না। রাগে থাকার সময় তার অনশন। আর সেইসময় সে ঘড়িঘড়ি বিমানকে খেতে দেবে। তুমি খাচ্ছ না, আমিও খাব না, তো বলা চলবে না। তাতে রাগ আরও সাংঘাতিক বেড়ে যাবে। জোর করে মুখে ঠুসে দেবে। জামা খামচে ধরবে। মানে, তখন লোক জড়ো হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। সুমিতার সব ভালো, তবে একটু আড় বোঝা মেয়ে। যেমন, বিমান বলেছিল, খাটটা একটু মারোয়াড়ি টাইপ হয়ে গেছে। সুমিতা তার বাবাকে চিঠি লিখে বসল, তোমার জামাইয়ের খাট পছন্দ হয়নি। তোমার মারোয়াড়ি টেস্ট। খাট নিয়ে যাও। এক জোড়া চৌকি পাঠিয়ে দাও। বিমান বলেছিল, তুমি যখন আস্তে কথা বলো, তোমার গলাটা খুব মিষ্টি শোনায়। সুমিতা বললে, তার মানে আমি যখন জোরে কথা বলি তখন মনে হয় গাধার গলা। বিমান বলেছিল, সেজ বউদির হাতের ডাল রান্না যে খেয়েছে, সে আর ভুলবে না। সুমিতা মাস খানেক ডালই আর বাঁধল না। বিমান বলেছিল, নিতম্ব না থাকলে সিল্কের শাড়ি মানায় না। সুমিতার গড়ন পেটন খুবই ভালো। তবু সিল্কের শাড়ি সব বাকসোয় তোলা হয়ে গেল। বিমান বেচারা তাই এখন ভয়ে মরে। মাঝে মাঝে মনে হয় কথা বলছে বউয়ের সঙ্গে নয় অফিসের বড়কর্তার সঙ্গে।

ছেলেটা হওয়ার পর সুমিতার রাগ আরও বেড়েছে। সে রাগের কোনও মাথামুণ্ডু নেই। মেজ বউদি জিগ্যেস করলেন, তোমার ছেলেটা কেন এত কাঁদে বলো তো! সুমিতা অমনি বললে, যেমন মা তার তেমনি ছেলেই হবে তো। অমনি চিঠি চলে গেল বাপের বাড়িতে। আমার ছেলে কাঁদুনে, বিশ্রী, থার্ড ক্লাস। এদের ঘুম চলে গেছে। আমাকে এসে নিয়ে যাও। চলে গেল বাপের বাড়ি। মেজ বউদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে খাঁচার পাখিকে বললেন, দেখিস, অত দেমাক সহ্য হলে হয়। বড়লোকের বেটি লো, লম্বা লম্বা চুল।

বাপের বাড়িতে গিয়ে ছেলেটার জণ্ডিস হয়ে গেল। যমে মানুষে টানাটানি। বিমানও একটু রেগে ছিল। সংসার এমন জায়গা অহৈতুকী প্রেম, সম্পর্ক টেকে না বেশিদিন। এটা ওটা সেটা নিয়ে লাগবেই লাগবে। এমনকি মশারির ভেতর মশা ঢুকেছে বলে দুজনের ফাটাফাটি হয়ে যেতে পারে। ছেলেবেলায় বিমান কথায় কথায় রেগে যেত। এমন রাগত যে সময় সময় কিছু না পেরে নিজেকেই নিজে খামচে রক্তারক্তি করত। কোনও কিছু চেয়ে না পেলে রাগে ক্ষোভে মাথা ঠুকতে ঠুকতে কপালে তারকেশ্বরের আলু তৈরি করে ফেলতে। এক কবিরাজ দেখেশুনে বললেন, বাবা, পিত্ত কুপিত। তিক্ত সেবন করাও। পরে এক ব্যায়ামবীর বললেন, বদহজমে এইরকম হচ্ছে। ডন বৈঠকি মার, বারবেল ভাঁজ। ব্যায়ামের ফলে বিমানের শরীর ফুলল, মেজাজ হয়ে গেল হিমশীতল। কোনও কারণেই বিমান রাগত না। সেই বিমান অভিমানে তিনদিন বউয়ের কোনও খবর করেনি। এ কেমন মা! ছেলেটা একটু কাঁদুনে হয়েছে ঠিকই। তা মাকে তো সহ্য করতেই হবে। সমিতার তো অদ্ভুত ব্যবহার। হলটা কী! দুজনে পরিপাটি শুয়েছে। মাঝখানে শিশুটি। চোখ যেই বুজিয়েছি, প্রথমে শুরু হল খুঁতখুঁত, তারপর চিল চিৎকার। জীবটি হাতখানেকও বোধহয় হবে না, কী সাংঘাতিক সাউণ্ডবক্স! ইলেকট্রিক হর্নের মতো শব্দ ছাড়ে। সুমিতা উঁউঁ করে যত থাবড়ায় ততই তার দাপট বাড়ে। শেষে মরগে যা বলে উঠে পালায়। সোজা বারান্দায়। সেখানে একটা বেতের মোড়ায় বসে গজগজ, হনুমান, বাঁদর, গাধা, জাম্বুবান। চিল্লেই যাচ্ছে, চিল্লেই যাচ্ছে। ইডিয়েট। বিমানের ঘাড়ে তখন সব দায়িত্ব। শেষে করলে কী! পরপর কয়েকদিন, আর শুলোই না। কী হল! শোবে এসো। কী হবে শুয়ে! বারোটা বাজলেই তো সানাই শুরু হবে। তার চেয়ে বসে থাকাই ভালো। কান্নার ঠেলায় নিজেই খেপে যাচ্ছে অথচ মেজ বউদি বলাতেই দোষ। বিমান ডাক্তারবাবুকে জিগ্যেস করেছিল। তিনি বললেন, কিছু কুকুর থাকে ঘেউ ঘেউয়ে। কিছু বাচ্চা থাকে কাঁদুনে! কী করা যাবে বলুন। বিমান এক জাপান ফেরত ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারকে জিগ্যেস করেছিল—কিছু বেরিয়েছে কি না! যেমন ন্যাপি ভিজে গেলে পিঁক পিঁক সিগন্যাল শোনাবার ব্যবস্থা হয়েছে, সেইরকম কোনও সাইলেনসার। গলায় ফিট করে দেওয়া হল। কমে গেল কান্নার তেজ। না, সেরকম কিছু মার্কেটে আসেনি এখনও।

তিন দিনের দিন খবর এল, কেস সিরিয়াস। বিমানের মন আঁকুপাঁকু করছিলই। সব ফেলে দৌড়ল। ছেলেটাকে প্রায় ইঁদুরের মতো দেখতে হয়ে গেছে। সুমিতা উদভ্রান্ত। বিমান জিগ্যেস করলে।

—কী যা তা খাইয়েছিলে?

—চানাচুর।

সুমিতা বিমানের ওপর রেগেই ছিল। বোকার মতো প্রশ্নের রাগি উত্তর।

বিমান সামলে গেল। নিজের মনেই বললে,—জল থেকে এসেছে।

—কী জল খাইয়েছিলে?

—খাবার জল।

বিমান এরপর আর না বলে পারল না—এ তোমার কীধরনের উত্তর দেওয়ার ছিরি। খাওয়াবার সময় হাতটাত পরিষ্কার করো তো?

—না, তোমার ছেলেকে আমরা মারার তালে ছিলুম।

—তোমার মানে? ছেলে আমাদের দুজনের। যৌথ প্রচেষ্টা। যাই বলো, তোমরা একটু নোংরা আছ। নোংরামি ছাড়া এই অসুখ হতে পারে না। তুমি নিজের হাতে খাওয়াও?

—না, তোমার আর এক বউ এসে খাওয়ায়।

বিমান রেগে গেল। মুখে প্রকাশ করল না। উঠে পড়ল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত করে ঘুরে দাঁড়াল।

—যেভাবেই হোক এ বাড়ির জল দূষিত হয়ে গেছে। আর থাকা চলবে না!

—আমি তা মনে করি না।

—আমি তাই মনে করি।

কিছুক্ষণ এই তর্জা চলল। শেষে বিমান নিজেই থেমে গেল। যে জিনিসটাকে সে সবচেয়ে ভয় করত, দাদা বউদির মাঝরাতের ঝগড়া, সেইটাই দেখা দিচ্ছে তার জীবনে। নকশাল আমলে সে একটা শব্দের সঙ্গে ভীষণ পরিচিত হয়েছিল—অ্যাকশন। দমাদ্দম, বোমা, ধোঁয়া। ধোঁয়া কেটে গেল, তিনটে লাশ। অত কথার কী আছে!

বিমান সুমিতার দিকে তাকাল! মা হয়েছে। আরও সুন্দরী। বেশিক্ষণ তাকালে ভেড়াটা আবার বেরিয়ে আসবে। সন্ধি হয়ে যাবে এখুনি। বিমান রেগে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে গেল বাজারের মোড়ে। বোকাসোকা এক ট্যাক্সি-চালককে পেয়ে গেল। এক কথায় যেতে রাজি। গাড়ি নিয়ে ফিরে এল বিমান। সুমিতা না যাক, সে ফিরে যাবে ছেলেকে নিয়ে। সুমিতা মেয়ে হিসেবে খুবই ভালো, কিন্তু নিজের পাড়ায় এলে তার হাবভাব অন্যরকম। সুমিতার সত্যিই তুলনা হয় না, তবে তার বাবাটা আর মাটা একেবারে ক্যালাস। অলস প্রকৃতির। হেলথ হাইজিনের কোনও জ্ঞান নেই। তা না হলে মাংসর সঙ্গে কেউ পায়েস খায়। কেউ খায়, এক সিটিং-এ এক কৌটো চানাচুর!

বিমান বললে—গাড়ি এনেছি চলো।

—আমি যাব না।

—কারণ?

—এই শরীরে এতটা দূর যেতে গেলে ছেলেটা মরে যাবে।

—এখানে থাকলে সারবে না।

—এখানে ভালো ডাক্তারই দেখছেন।

—আমি আরও ভালো ডাক্তার দেখাতে চাই।

—যা ভালো বোঝো করো।

সুমিতা রেগে বেরিয়ে গেল। বিমান একটু দোনামোনা করে, তোয়ালে সুদ্ধ ঘুমন্ত ছেলেটাকে তুলে নিল। সেই বলে না, খোঁটার জোরে মেড়া লড়ে। সুমিতার সেই অবস্থা। বাবা-মার জোরে লড়ছে। দেখা যাক। মা যদি মারাই যেত, তাহলে কী হত! বিমান নিজেকে ধমক দিল—না না, সে কী ভাবছে! মা মারা গেলে একটা ছেলের কী আর থাকে জীবনে। সুমিতার বাবা আর মা দুজনেই বাড়ি ছিলেন না। কর্তা-গিন্নি ওইরকমই। শখের প্রাণ গড়ের মাঠ। সারাদিনই টোটো কোম্পানি। নাতির কথা কে আর মনে রাখে। একা বালিকার ঘাড়ে চাপিয়ে কেটেছেন। বিমানের অবশ্য সুবিধেই হল। বাধা দেওয়ার কেউ নেই।

সারাটা পথ ট্যাক্সিতে তার কোলে ছেলেটা বেশ ভালোই রইল। এইটুকু টুকু হাত, সেই হাতে আবার মুঠো পািকয়েছে। ব্যাটা যেন বীর হনুমান। দু-একবার হাত-পা ছুঁড়ে একটু খেলার ভাব করল। স্থির চোখে তাকিয়ে রইল বিমানের দিকে। ব্যাটা বাপকে চেনার চেষ্টা করছে। একসময় মনে হল হাসছে। তার মানে বিমানের দলে ভিড়ছে। মুখটা অনেকটা মারাদোনার মতো হয়েছে। বড় ফুটবল প্লেয়ার হলে মন্দ হয় না। ইঞ্জিনিয়ার না হইয়াই ভালো। বড় ঝামেলা। বিমান মুখে চুসুক, চুসুক শব্দ করল। শব্দটা ঠিক হচ্ছে না। হলে খল খল করে হাসত। এরই মাঝে স্টপ স্টপ, বলা সত্বেও এক লিটার জল ছাড়া হয়ে গেল।

সেজ বউদি বললেন, এ কী করলে, দুধের বাচ্চাটাকে গোঁয়ার্তুমি করে নিয়ে এলে! সামলাবে কী করে!

—তুমি তো আছ।

—অ এখন আমি আছি! সোহাগের বেলায় সুমিতা, আর প্রেম টকে গেলেই সেজ বউদি।

—তুমি বউদি আমাকে একটু মদত দাও তো সুমিতার খুব তেল হয়েছে ইলিশ মাছের মতো।

তোমাকে তখনই বলেছিলুম। অত মাথায় তুলো না। তোমার দাদাদের দেখে শেখো।

অনেক দিন পরে বিমান আবার তার সেজ বউদির সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ফিরে পেল। সেজ বউদির জীবনটা ভালোই। একটাই দু:খ, ছেলেপুলে হচ্ছে না। নাহলেই বা ক্ষতি কী। হাজারটা ঝামেলা। অসুখ। কান্না। বড় বাইরে। ছোট বাইরে। ছেলেরা বড় হয়ে গেলে বোঝাই যায় না শৈশবটা কী কেলেঙ্কারিতে কাটে! প্রবীণরা এখনও সুযোগ পেলেই বিমানের ছেলেবেলার কথা বলেন। ইচ্ছে করে বলেন। বিমানকে অপদস্থ করার জন্যে। তুমি আজ ইঞ্জিনিয়ার হতে পারো; কিন্তু ছেলেবেলায় তোমার কেলেঙ্কারির লম্বা ফিরিস্তি আছে। যেমন অনেক বড় বয়েস পর্যন্ত বিমান বুকের দুধ খেত। বিমানের এক পিসিমা এখনও জীবিত আছেন। তাঁর একটি ছেলে হয়ে মারা গিয়েছিল। বিমান তখন শিশু। শিশু বিমান পিসিমার দুধ খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। করেছে, করেছে, এখনও সে কাহিনি ঢাক পিটিয়ে বলতে হবে কেন? আরও আছে। পেট আলগা পেটুক বিমানের নানা লজ্জার গল্প। পারিবারিক সম্মেলনে আজও শুনতে হয় মাথা নীচু করে। দামড়া বিমানকে শুনতে হয় শিশু বিমানের কাহিনি।

রাত যত বাড়ে, বিমানের ব্যাটা তত খুঁত খুঁত করে। গা-টাও সামান্য গরম। রাতজাগা ছেলে। প্যাঁচার বংশধর। রাত এগারোটায় শুরু হল চিল চিৎকার। নাচিয়ে, দুলিয়ে কোনওভাবেই ছেলেকে ভোলানো যায় না। কোলের কাছে আনলে বুকে মুখ ঘষতে থাকে। মাকে খুঁজছে। খুঁজছে। মায়ের বুক। বিমানের ব্যাটা। স্বভাব তো একইরকমের হবে। বাপকা ব্যাটা।

বিমান ভীষণ সমস্যায় পড়ে গেল। এ তোমার গিয়ে ব্রিজ তৈরি নয়, ড্যাম বাঁধা নয়, মা-খোঁজা শিশুটিকে শান্ত করা। বিমান ছেলেকে দুহাতের ওপর ফেলে মোচার খোলার মতো দোলাচ্ছে। বারান্দায় পায়চারি চলেছে। মুখে শব্দ করছে—আঁ, আঁ, আঁয়, আঁয়। অতই সোজা। লোকে তাহলে যুগযুগ ধরে মা খুঁজত না ছেলে মানুষ করার জন্যে। পায়চারি করতে করতে ইঞ্জিনিয়ার বিমানের মনে হল, ঈশ্বরের তৈরি পুরুষ যন্ত্রটি অসম্পূর্ণ। বুকে এক জোড়া স্তন ফিট করে দিলে মহাভারত কী এমন অশুদ্ধ হত! ঈশ্বর নিজেই মহিলাসক্ত। তা না হলে এমন দুই দুই করলেন কেন? স্বর্গে ফিরে গিয়ে একটা আন্দোলন করতে হবে। কম্পিউটারের মতো নেকস্ট জেনারেশন মানুষের ডিজাইন চেঞ্জ করাতে হবে। মেয়েরা ওই একটা অ্যাডভান্টেজের জোরে চিরটা কাল ছড়ি ঘুরিয়ে গেল। বুকে ধরে বসে আছে শিশুর খাদ্য, রোগীর পথ্য।

ছেলে শেষে এমন চেল্লাতে শুরু করল, বিলেত হলে প্রতিবেশীরা পুলিশ ডাকত। এদেশ বলেই সহ্য করা যাচ্ছে। এর মাঝে একবার সামনের বাড়ির প্রতিবেশী বারান্দায় বেরিয়ে এসে বলে গেলেন—আপনারও বারোটা বাজল, আমাদেরও বারোটা বাজল। বিমান খুব অপমানিত বোধ করছে। বাচ্চাটার হল কী! ভূতে ধরেছে! খেলুম দেলুম, তোফা রাবার ক্লথে কাঁথার বিছানায় শুয়ে রাত কাবার করে দিলুম—তা না, চ্যাঁ হ্যাঁ চ্যাঁ হ্যাঁ। ব্যাটা ছেলে হলে হবে কী! মায়ের পক্ষে। ওই কাল ভোরেই যার বাচ্চা তাকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে এসো, মাথা হেঁট করে। পরাজয়! বিমান ছেলের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল—এই তুই আমার বাচ্চা না! আমি হেরে যাই এইটাই তুই চাইছিস! ছেলে আরও জোরে চিৎকার ছাড়ল! বিমান সঙ্গে সঙ্গে বললে—না না, তুই সুমিতার বাচ্চা।

বিমানের মনে হচ্ছিল—এ এমন এক সমস্যা যার কোনও সমাধান নেই। দুম করে ফেলে দিয়ে পালাবে সে উপায়ও নেই। এ যেন নিজের লেজে নিজেই আগুন লাগিয়ে বসে আছে। বিমান আরও জোরে জোরে দোলাতে লাগল। তার একটা উপলব্ধি হল সেই মুহূর্তে—প্রেম ভালো, খুবই ভালো, গড়ের মাঠে, গঙ্গার ধারে। বিয়ে মন্দের ভালো, ছেলেপুলে অতি কুৎসিত ব্যাপার। সৃষ্টি ধ্বংস হয় হোক; তবু ঈশ্বরের ফাঁদে পা না দেওয়া ভালো।

ছেলের চিৎকারে সারা পরিবার ছুটে এল। মেজ বউদি বললেন—বাথটবে বসিয়ে দাও পেট ফেঁপেছে। তিনি একই সঙ্গে মেজদাকে দাবড়ালেন খাট ছাড়লেন তো অমনি ঠোঁটে সিগারেট। ফ্যালো, ফেলে দাও। বড় বউদির বাত। বাত বড় মজার জিনিস হয় মুখে, না হয় হাঁটুতে। তিনি হাঁটু ধরে ককাঁতে ককাঁতে এলেন! সিস্টেম দেখে স্পেস্যালিস্টের মতো রায় দিলেন—অ, এ যে দেখছি মাইয়ের নেশা। তা সে জিনিস যখন নেই কড়ে আঙুলে মধু মাখিয়ে ঠোঁটের কাছে ধরো দিকি।

বিমান ড্রাগ অ্যাডিক্ট শুনেছে, মাই অ্যাডিক্ট তো শোনেনি! জীবনে শিক্ষার কতই না বাকি আছে। পথ দিয়ে যাচ্ছিল, মাঝরাতের মাতাল। মুখ তুলে বলে গেলে—ফায়ার ব্রিগেডে খপর দাও! ভোলা মন। সব শেষে এলেন সেজ বউদি। তিনি পড়েছিলেন স্বামীর খপ্পরে। মুক্তি পেয়ে ছুটে এসেছেন। এসেই ভিড় হটিয়ে দিলেন। বড় বউদি পূর্বের কায়দায় ফিরে যেতে যেতে বললেন—অ্যায়, এইবার ঠিক লোক এসে গেছে। মেজদা বললেন—দি ম্যান।

বড়দা কারেকশন করলেন—দি ওম্যান।

বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে সেজবউদি সরে গেলেন একপাশে আড়ালে। হঠাৎ কান্না থেমে গেল। থামার আগে অদ্ভুত শব্দ হল। বাচ্চাটা এতক্ষণ টা-টা করছিল। জন্তুটা অদ্ভুত এক শব্দ করল। পরম তৃপ্তির শব্দ। ভালোমানুষ সেজদা খুশির গলায় বললেন—আসল জিনিস ঢুকেছে।

মেজ বউদি অমনি টুক করে ছোবল মেরে দিলেন আসল জায়গায়—কতক্ষণ! নেই তো কিছু শুকনো। পরিবেশটা কেমন যেন হয়ে গেল। কাল ভুজঙ্গ দংশিল যারে। এতক্ষণের কান্না থামার ফলে চারপাশে নেমে এসেছে অপ্রাকৃত নিস্তব্ধতা। পথ দিয়ে তিনটে কুকুর ছুটে গেল। পায়ের শব্দ! ঘরের কোণে আঁচলের তলায় শিশুটিকে বুকে নিয়ে বসে আছেন সেজ বউদি। অসীম সুন্দরী এক মহিলা যেন ম্যাডোনা। চোখের দুকোলে জল।

বিমান খুব কাছে গিয়ে বললে—তুমি কাঁদছ বউদি?

এই কথাটুকুর অপেক্ষাতেই যেন জলটুকু দুলছিল! গাল বেয়ে গড়িয়ে এল ফোঁটা, ফোঁটা, ফোঁটা।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%