সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভদ্রলোক উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরছেন। তপসে, তপসে কোথায় পাই?
কষিত কনক-কান্তি কমনীয় কায়।
গাল ভরা গোঁফদাড়ি তপস্বীর প্রায়।।
মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে।
মোহন মণির প্রভা, ননীর শরীরে।।
নতুন জামাতাকে তপসের ফ্রাই খাওয়াবার জন্য ভদ্রলোক হন্যে হয়ে মাছের বাজারে ঘুরছেন। কেতাবি প্রথায় জামাই বাবাজীবনের সেবা করবেন এমন নিষ্ঠা ক'জন শ্বশুরের আছে। ছেড়ে দিন না মশাই। বেশ পাকা পোনাতেই এ বারের কাজ চালান। এ কালের জামাই মাছের ব্যাপারে অত খুঁতখুঁতে হবে বলে মনে হয় না।
ভুল হয়েছিল। ভদ্রলোক শ্বশুর নন। শ্যালক। ভগিনীপতির আতঙ্কে যথার্থই আতঙ্কিত। পান থেকে চুন খসলে ব্রাদার-ইন-ল কিছু হয় তো বলবেন না, ভগিনী পাঁচ কথা শুনিয়ে ছাড়বেন। বিয়ে করে দাদা এখন বউদির কথায় ওঠবোস করে। ওয়ান পাইস ফাদার মাদার।
রিটায়ার্ড শ্বশুরমশাই উদাস মুখে বসে আছেন। হাতে পাঁচনের মতো চায়ের কাপ। চোখের সামনে একটি লগার মতো ফর্দ। কল্পতরুর সবচেয়ে উঁচু ডালে যে ক'টি নোট ফল ঝুলছে এই ফর্দ-লগা সেই দিকেই উঁচু হচ্ছে। গৃহিনী আর কী বোঝেন? ভোরের কাকের মতো কপচেই চলেছেন, বেশ বড় সাইজের চিংড়ি গোটা বারো অবশ্যই আনবে। মালাইকারিটা আমার হাতে খোলে ভালো। তা তো খোলে, এদিকে আমার কোল যে খালি হয়ে এসেছে। ভাঁড়ে মা ভবানী, তাহাতে আপনি। বড় বাবাজীবনের তো শুনেছি অ্যালার্জি, তাকে আর চিংড়ি নাই বা খাওয়ালে।
বাবাজীবনের সকলের স্ট্যাটাস সমান নয়। পুরোনো জামাই আর নতুন জামাইয়ে অনেক তফাৎ। পুরোনো জামাইয়ের তেমন পালিশ থাকে না। মদ যত পুরোনো হয়, তত তার কদর বাড়ে। জামাই পুরোনো হলে তাঁকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আর তত আদিখ্যেতা হয় না। মেয়েরও আর বাপের বাড়ির দিকে সে রকম ছোঁকো টান থাকে না। নিজের সংসারেই ভরাডুবি। ছেলে, মেয়ে, এডুকেশন, স্বামীর কেরিয়ার, ট্র্যানসফার, জমি, বাড়ি। মেয়ের ভূমিকা তখন শাসনের মতো। না, ওকে আর অতটা পায়েস দিও না, মা। শোনো, যদি পায়েস খাও, তো রসগোল্লা আর ছোঁবে না। তুমি জানো না মা, ওর মিষ্টি খাওয়া একদম বারণ।
আহা, এক দিন তো।
না, একদিনও না। হিসেব করে খেতে হবে। নিয়ম ইজ নিয়ম। একবার শুয়ে পড়লে ম্যাও তো আমাকেই সামলাতে হবে।
নতুন জামাইকে নিয়ে শ্যালিকাদের ভীষণ মাতামাতি। জামাই সানগ্লাস পরে ছাদের আলসেতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বাতাসে চুল উড়ছে। শরীরের চারপাশে বিলিতি সেন্ট আর দামি সিগারেটের সুবাস গুম মেরে আছে। পুরোনো জামাই, কানন দেবী আর ছবি বিশ্বাসের কথা বলেন। নতুন জামাইয়ের মুখে ফেলিনি আর ত্রুফো। সবে বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর কালিম্পঙে হনিমুনে গিয়েছিলেন। পুরোনো জামাই বিয়েতে সাতদিন মাত্র ছুটি পেয়েছিলেন। কবজিতে দুব্বো বেঁধেই অফিস করেছেন। বউকে সেই যে সাঁতরাগাছির সাবেক বাড়িতে ডাম্প করেছেন, সেইখানেই তিনি কুললক্ষ্মী হয়ে পড়ে আছেন আজ বিশ বছর।
নতুন জামাই প্যান্টু পরা শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে আড় বাঁশির বদলে সিগারেট। শ্যালিকারা প্রায় জাপটে ধরে আছেন। কিলিক, কিলিক ছবি উঠছে। আশপাশের বাড়ির জানালায় কৌতূহলী দর্শক। ফিস ফিস গলা : ওই দেখ, রেখার বর। কী সুন্দর, কী সুন্দর, ভীষণ ম্যানলি!
এদিকে বড় জামাই অধীর, নীচে তাকিয়াসীন। সঙ্গী শ্বশুর মশাই। চিন্তায় ভবিষ্যৎ, কথায় যত বাস্তব সমস্যা! মেয়ের বিয়ের ইনশিওরেন্স করেছ? করোনি। সে কী হে? করে ফেল করে ফেল। ওটা আর নেগলেক্ট করো না। মিনিমাম পঞ্চাশ হাজার নিয়ে নামবে।
অ্যাঁ, এখন পঞ্চাশ হাজার রেট যাচ্ছে! মনে মনে ভাবেন, ইস কী ড্যাম চিপেই না আমাকে ম্যানেজ করেছিলেন। একেবারে জলের দামে।
সত্যবাবুর বাড়িতে মেয়ে-জামাই তো আসবেই। সেই সঙ্গে আসবে দুটো বিচ্ছু। ভঙ্গুর যা কিছু আছে, তাদের নাগালের বাইরে সরাবার কাজে তিনি ব্যতিব্যস্ত। গতবার এসে আস্ত একটা আলনা চুরমার করে দিয়ে গেছে। সাধের ফুলদানি পাউডার হয়েছে। হাতের কাছে কাঁচি ছিল। বিছানার চাদর ঝালর করে রেখে গেছে। ও:, দুটো নাতি হয়েছে বটে। যেন দুটো ডিনামাইট। মেয়ের ছেলে, আর ছেলের ছেলেতে হাতাহাতি। ছেলের শ্বশুর বাড়ি শিলচরে। সহজে যাওয়ার উপায় নেই। মানিঅর্ডারেই জামাই ষষ্ঠী। বাবাজীবন, ল্যাংড়া আম কিনিয়া খাইও। পছন্দমতো একটি দিশি ধুতি ও মিহি গেঞ্জি কিনিয়া পরিধান করিও। বেয়াই মশাইকে আস্ত দুটি জলভরা তালশাঁস আমাদের নাম করিয়া খাওয়াইও। বেয়ানকে বড় এক কৌটো কিলাপাতি জর্দা কিনিয়া দিও।
বাসের পেছন দিকে দুই জামাই ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছেন। অপরাধীর মতো মুখ করে। অফিসযাত্রীরা জামাইদের তেমন ভালো নজরে দেখেন না। স্পষ্টই বলেন, ওই এলেন ডেরিডামরি নিয়ে। ষষ্ঠীর জামাইকে চিনতে অসুবিধে হয় না। একেবারে পেটেন্ট চেহারা। কনডাকটারকে ফিসফিস করে বলছেন, সামনে তিনজন। আজ দুজনেই পুরো টিকিট কিনেছেন। এমনকি, কোলের বাচ্চাটারও। সহযাত্রীরা রেগে আছেন। টিকিট নিয়ে ঝামেলা হলে শুধু কনডাকটর নয়, বাসসুদ্ধ সকলে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দেবে। একজন আর একজনকে করুণ কণ্ঠে বললেন, কী গেরো বলুন তো, এই বোঝা নারকেলডাঙায় নামিয়ে দিয়ে, তারপর ছুটতে হবে।
অন্যজন বললেন, আপনার তো মশাই নারকেলডাঙা, আমাকে এই লোড নামাতে হবে ঠাকুর পুকুরে, তারপর ফিরে আসতে হবে ডালহাউসিতে।
আপনার স্টেট না সেন্টার?
স্টেট।
তা হলে তো বেঁচে গেলেন। হাফ ছুটি। আমার আবার সেন্টার।
বিশ্বনাথ আর জগন্নাথ, এক বাড়ির দুই জামাই। বিশ্বনাথ দক্ষিণপন্থী, জগন্নাথ বাম। গতবার দুজনে প্রায় হাতাহাতি হওয়ার জোগাড়। জামাই ষষ্ঠী যে এমন পলিটিক্যাল চেহারা নেবে, কে জানত। ঝপ করে আলো নিবে গেল। অন্ধকারে পাখির মতো দুই জামাইয়ের ঝটাপটি। ইনি বলেন উনি অপদার্থ, উনি বলেন ইনি অপদার্থ। শ্বশুরমশাই কেবল বলতে থাকেন, আহা বাবাজীবন, গদি পড়ে রইল রাইটার্সে, পাওয়ার প্ল্যান্ট সাঁওতালডিতে, তোমরা কেন খুনোখুনি করছ?
জগন্নাথ তেড়ে উঠলেন, থামুন মশাই, দেশের এই হালের জন্য দায়ী কংগ্রেস।
বিশ্বনাথ বললেন, আজ্ঞে না, দায়ী অপদার্থ লেফট ফ্রণ্ট। জগা, তোর মগজ ধোলাই হয়ে গেছে।
মুখ সামলে বিশুদা, আমার নাম জগা নয়, জগন্নাথ।
শ্বশুরমশাই বললেন, আচ্ছা জ্বালা রে বাবা। অন্ধকারে শুরু হল শুম্ভ-নিশুম্ভের লড়াই। হ্যাঁ গা, তোমার সেই বিখ্যাত চালভাজা দু'বাটি দিয়ে যাও তো। এরা মুখটাকে অন্যভাবে ব্যস্ত রাখুক।
দুই মেয়ে বললেন, দুটোকেই বাইরে বের করে দাও, বাবা।
এবারে তাই আলাদা ব্যবস্থা। দুজনে দু'ঘরে বসবেন। রাজনীতির অবস্থা আরও ঘোলাটে হয়েছে। লাশ না পড়ে যায়! ষষ্ঠীর দিন মেয়ে না বিধবা হয়।
পরেশবাবু সন্দেশ খেতে সাহস পাচ্ছেন না। গতবারের কথা মনে পড়ছে। সন্দেশে সাতদিন ন্যাপথলিনের ঢেঁকুর ছেড়েছিল। শাশুড়ি ঠাকরুণ দেরাজে রেখেছিলেন। ছোট মেয়ের বিয়েতে বেশ কিছু বেঁচেছিল, মাল স্টোর করা ছিল ষষ্ঠীর জন্যে। হাত একটু এগোয়, আবার পেছিয়ে আসে।
শাশুড়ি ঠাকরুণ হাসি হাসি মুখে বলতে থাকেন, কী হল, খেয়ে নাও বাবা, খেয়ে নাও বাবা।
জামাই শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেন, ন্যাপথলিন আমার পেটে সহ্য হয় না, মা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন