সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রবীণেরা বলেন—যা করবে একটু ভেবেচিন্তে করবে। নি:সন্দেহে উত্তম উপদেশ। ইংরেজিতে ছেলেবেলা থেকেই শুনে আসছি, লুক বিফোর ইউ লিপ। লাফাবার আগে তাকিয়ে দেখো। এই উপদেশ, এই নীতিবাক্যটি সত্যই যদি মেনে চলতে হয় তাহলে আমাদের বর্তমান জীবনটা কেমন হবে! দেখাটাই হবে, জীবনে লাফানোটা আর কোনওদিনই সম্ভব হবে না।
বাসের জন্যে সারাদিন স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একের পর এক বাদুড়ঝোলা বাস আসবে, একটু থেমেই ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যাবে। সার্কাসের একজন হিরো কখন সামনের গেটে, কখন পেছনের গেটে বাঁদর ঝোলা খেলা দেখাবে, গগন ফাটানো চিৎকার করতে করতে—ডালহাউসি, ডালহাউসি। চিন্তা বলবে উঠো না। ঝোলার কায়দাটা তোমার তখনও তেমন রপ্ত হয়নি। এই বয়েসে রপ্ত করতে পারবে তেমন কোনও আশাও নেই। অতএব একপাশে চুপটি করে অপেক্ষা করো। সারাদিনে তেমন গাড়ি আর আসবেই না, যে গাড়িতে চিন্তাশীল মানুষ উঠতে পারে। সুতরাং জীবিকায় জলাঞ্জলি দিয়ে ছড়িহাতে গঙ্গার ধারে পায়চারি করে কাটাও। জীবিকা পড়ে রইল বি বা দি বাগে, পকেট শূন্য, পেটে ভিজে গামছা। চিন্তার ফল হবে উপোস।
চিন্তা করলে সংসার জীবনে কোনও মধ্যবিত্তের প্রবেশ সম্ভব নয়। সংসার মানে বিবাহ। বিবাহ মানে দায়িত্ব। দায়িত্ব রাখতে খরচ। খরচ যোগাতে উপার্জন। সুতরাং চিরকুমার। ঘরে ঘরে বাড়ুক, ওদিকে ছেলে বাড়ুক। মাঝখানে চিন্তার বেড়া। সে যুগ নেই, সে বিশ্বাসও নেই যে স্বয়ং জগন্মাতা এসে ভাঙা বেড়াটি বেঁধে দিয়ে যাবেন। অতএব দুপক্ষই মুখোমুখি বসে থাকুক। জ্ঞানী বলেছেন—চিন্তা করে কাজ করবে। চিন্তা বলেছে এই বাজারে সংসর মানেই ন্যাজে গোবরে। তাহলে হয় হিন্দি ছবি দেখে হাসফাস করো, বলো, পরানডারে গামছা দিয়া বাঁধি, আর নয়তো বেদ, উপনিষদ, চণ্ডী পড়ে মনটাকে সংসার থেকে দূরে সরিয়ে রাখো, অথবা দুরারোগ্য, যন্ত্রণাদায়ক কোনও অসুখকে শরীরে ধরে আনো জামাই আদরে। সংসার ভুলে নিজের অসুখের সেবা করো। ঋষি বলেছেন—সেবাই পরম ধর্ম।
সংসারের ব্যাপারে চিন্তা-টিন্তা সব সময় সঠিক পথে চলে না। চিন্তারও কিছু ঘুরপাক থাকে। মতিচ্ছন্ন মানুষেরও নিজের মতো কিছু চিন্তা থাকে। পাত্রীপক্ষ ছেলে ধরার জন্যে বড়োই উদগ্রীব। ইঁদুর তো বছর বছরই কলে পড়ছে। তবুও কি তার চেতনা হয়! কলে বাঁধা রুটির লোভে ঢুকবেই, টুকটুক করে ঠোকরাবেই তারপর ঝপাৎ করে বন্ধ করে যাওয়া কলে পড়ে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপবেই। ইঁদুরের নিয়তি কীসের! এই আমাকে দ্যাখো। ষাট টাকা মাইনেতে সাহস করে সংসার করেছি। দুটি মেয়েকে যথাসাধ্য দিয়ে পারও করেছি। এই তিন নম্বরে এসে যা একটু নাকাল হচ্ছি। তোমরা সবাই যদি বেঁকে বসে থাকো বাবাজীবনরা, আমরা যাই কোথা। তোমরা সব ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, ভবিষ্যৎ কি দেখা যায় শীতের সকালের মতো। নেমে পড়তে হয়। কে বলতে পারে স্ত্রী ভাগ্যে তোমার বরাত ফিরেও যেতে পারে। সব মেয়ের মধ্যে আবার এই ছোট মেয়েটিই পয়মন্ত। জন্মাতেই আমার ফাইভ রুপিজ মাইনে বেড়েছিল। তোমার কম সে কম ফিফটি বাড়বে। তবে আর কি, দুটো বড় বেবিফুডের দাম আগাম পেয়ে গেলে। এরপর যদি একটি কি দুটি পয়মন্ত ছেলে কি মেয়ের বাপ হতে পারো তাহলেই এল. ডি. থেকে ইউ. ডি.।
বেকার ছেলেও বিজ্ঞাপন দিতে পারে—মরেছি আর মরতে কী! শেষমেশ বিবাহ করিয়া ভাগ্য ফিরাইতে চাই। যৌতুক হিসেবে নগদ অর্থে মতি নাই। খেঁমদি হোক, পেঁচি হোক, সঙ্গে একটি চাকুরি থাকিলেই আগামী মাঘে ঝুলিয়া পড়িব।
চাকরি নাই বাবাজীবন, তবে চাকুরে মেয়ে আছে। বয়স একটু বেশি। মাথায় সামান্য টাক। আরও বাড়ার আগেই পিঁড়েতে বসাতে চাই। চিন্তা তখন বলবে—আধুনিক নীতিবাক্যটি হল—লিপ বিফোর ইউ লুক। কে বলতে পারে খাদে পড়েও তো মানুষ বেঁচে যেতে পারে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন