সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শতাব্দীটি শেষ হল বড় এলোমেলোভাবে। দেশে আছে বেহাল শাসন। ফালি ফালি কাপড় গাঁট বাঁধা। কোনওটার রং এক নয়। কোনওটা লাল, কোনওটা হলদে, সাদা, নীল, কালো। যেন কার্নিভালের চন্দ্রাতপ। নীচে হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে, রামছাগলের বে। যদি প্রশ্ন করা হয়, বিদায়ী শতাব্দীর তলানিতে কী পেলেন? উত্তর, জালায় রাখা গঙ্গাজলের তলায় যা পাওয়া যায়, মাটি, কাদা, আবর্জনা। ছাঁকা হল সব ওপর দিয়ে, দেবপুজোয় বেরিয়ে গেছে। স্বামীজি, নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ, প্রমুখ মহামানব, কংগ্রেসের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান, গান্ধীজি প্রমুখ প্রকৃত দেশনায়ক, আচার্য পি সি রায়, স্যার বীরেন প্রমুখ শিল্প জনক। শিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ সব ওপর দিক থেকে বেরিয়ে গেলেন। ১৯১৭ থেকে ১৯৪৫ শতাব্দীর জমজমাটি অংশ। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, দেশ বিভাগ, দাঙ্গা, স্বাধীনতা, উন্মদনা, নবনব আবিষ্কার, পরিশেষে স্যাটিলাইট, কম্পিউটার, গ্লোবালাইজেশন। নতুন ধরনের জীবন, মনন ও বিশ্বাসের অভ্যুদয়। পুরোনো আদর্শের পতন ও আদর্শশূন্যতার অভ্যুত্থান। নিৎসের কথায়—God is dead. যে বরণডালাটি হাতে নিয়ে শতাব্দীকে স্বাগত জানাচ্ছি তাতে সাজানো আছে, ত্রাস, সন্ত্রাস, ঘটনা দুর্ঘটনা, হত্যা, ধর্ষণ, রোধ, অবরোধ, ব্যাধি, ভাইরাস, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া, চুরি, ছিনতাই, সুপরিকল্পিত ডাকাতি, দলীয় সংঘর্ষ, অপহরণ, নারী নির্যাতন, প্রতিষ্ঠান বৈকল্য, অজস্র মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও অনর্গল বক্তৃতা, অপরিসীম অবহেলা, ক্ষমাহীন দুর্নীতি, দুর্ব্যবহার।
মানুষের কাছেই তো মানুষের প্রত্যাশা। অতীতে মানুষই তো আমাদের উপহার দিয়েছে Age of Agriculture, Age of Industrialisation. Age of Renainsance, বিদায়ী শতাব্দীকে বলা হয়েছে Age of Anxiety, শেষের দিকটায় Age of Terror, মৃত্যুকে, মরণকে সড়গড় করে তোলার সাধনা। শেক্সপীয়ারে হ্যামলেটের মতো বলতে ইচ্ছে করবে—The time is out of joint, O Cursed Spite. That ever I was born to set it right.
শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুর উদ্যানবাটীতে কালশেষে প্রার্থনা করেছিলেন 'তোমাদের চৈতন্য হোক।'
এই শতাব্দীর কাছে একটিই প্রত্যাশা—চৈতন্য। ১৮৩২ সালে মহাকবি গ্যেটে মৃত্যুর মুহূর্তপূর্বে শেষ যে কথাটি বলেছিলেন—Mehr Licht. Mehr Licht, More light. গ্যেটের আর একটি উক্তি—All theory, dear friend, is grey, but the precious tree of life is green. মতবাদের ঠেলায় প্রাণ আমাদের ওষ্ঠাগত, ধূসর মতবাদ, অমূল্য জীবনের রং যে সবুজ। ভুলে বসে আছি সে কথা। গ্যেটের আর একটি বর্ণনা শতাব্দীর দেউড়িতে দাঁড়িয়ে মনে আসছে, যেন শ্রীকৃষ্ণের জন্মচিত্র, আঁধার রাতে বাসুদেব বিদ্যুতের চমকিত আলোয় নবজাত শিশুটিকে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে যমুনা পার হচ্ছেন—Who rides so late through the night and storm. It is the father with his child. শতাব্দী নামক শিশুটির পিতা মানব গোষ্ঠী। সম্ভাবনাময় করার দায়িত্ব মানুষের। দেশটা লালুবাবুর নয়, কল্যাণবাবুর নয়। দেশ হল মানুষের। কয়েকটি শুভশক্তির সমন্বয়ে দেশের উন্নতি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, মানবতা, দেশাত্মবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, চরিত্র, উদার ধর্ম।
নেচে, গেয়ে আবাহন জানানোটাই সব নয়। দেখতে হবে কোন সুরে নাচছি, কোন গান গাইছি। এই শতাব্দী যে সুরে শেষ হচ্ছে, সে সুর হল এলোমেলো করে দে মা—লুটেপুটে খাই। চালাকি, ওপর চালাকি, ধূর্তামি। এই শতাব্দীর কাছে একটি প্রার্থনা, হয় সব শেয়ালগুলোকে বাঘ করে দাও, না হয় প্রকৃত মানুষ করে দাও। বদমাইশি আর ছ্যাঁচড়ামি ভালো লাগে না। সনাতন চাহিদা তো একটাই—'আমার ছেলে যেন থাকে দুধেভাতে'। মানুষগুলো যেন সৎ হয়। এখন তো সর্বত্র প্রতারকের রাজত্ব চলছে। মানুষ শান্তি চায়, প্রাোফেশনের নামে শেষের দিকটায় যা হয়ে গেল তার অবসান চাই। সমৃদ্ধিতে আফ্রিকার হাল, ক্রাইমে আমেরিকা। কথায় কথায় একটি কথা লেখাপড়া শিখলে কী হবে, চালু হতে হবে। চালিয়াত আমরা অনেক দেখেছি, একালে দেখছি চালুদের। চাকা ছাড়াই চলছে। আর চিনেছে টাকা। এইভাবেই যদি চলে, তাহলে আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই, যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন। এই কালের হিসেব যে মহামানবের আগমনে, তাঁকেই তো আমরা ক্রশে ঝুলিয়েছি। সেইটিই তো আমাদের পাওনা—Bear your own cross, তবে, স্বামী বিবেকানন্দের তিনটি ভবিষ্যৎবাণীর দুটি অভ্রান্তভাবে মিলেছে। তৃতীয়টি হল—এবার কেন্দ্র ভারত!
ইতিহাসকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, ইতিহাস রাজন্যবর্গের কর্মকাণ্ড নয়, ইতিহাস হল 'টিচার'। মহাশিক্ষক-মহাবিচারক। শিলারের কথায়, Die Weltgeschichte ist das weltgericht. The world’s history is the world’s judgement. কালের বিচার। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর অসাধারণ বিচার ক্ষমতায় ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, মার্কস জার্মানিতে যে বিপ্লবটি হওয়ার কথা বলেছেন, সেই বিপ্লব প্রথমে ঘটবে রাশিয়ায়, পরে চিনদেশে। এ দুটি দেশে গণবিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। হলও তাই। বলেছিলেন, পঞ্চাশ বছরের মধ্যে অভাবনীয়ভাবে ভারত স্বাধীন হবে। তাই হয়েছে। মানুষের অতীত মানুষের ভবিষ্যতের কথা বলে। তা হলে এ দেশেও কি বিপ্লব আসন্ন। একবিংশ শতকে কি আমরা স্বামীজির ভারতকে পাব। উজ্জ্বল মহান এক ভারত। ভারতে বিপ্লব নয় Not revolution but evolution. বিপ্লবের বদলে বিকাশ। A process of 'levelling up' and no 'levelling down' ভাঙচুর করে পৈশাচিক পথে ওপরতলাটাকে নীচেরতলায় নামিয়ে আনা নয়, নীচেরতলাটাকে বিকাশের পথে ওপরে আনা। শ্রমজীবী মানুষদের শিক্ষায়-দীক্ষায় গরিমা দান করা। একেই তিনি বলেছেন, শূদ্র জাগরণ। সারদা দেবীর একটি অসাধারণ উক্তি--'ভাঙতে সবাই পারে, গড়তে পারে কজনে?'
সাতচল্লিশে ক্ষমতা হস্তান্তর হল। যে যার বসে গেল বাঞ্ছিত গদিতে। শুরু হয়ে গেল গোছগাছ। আত্মসাৎ-এর হীন নীতির নাম হল রাজনীতি। মাথাচাড়া দিয়ে উঠল গুণ্ডারাজ। শতাব্দীর শেষপাদে হাওলা, গাওলা। তুমি রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বের করলে, আমরা বফর্স বের করব। নির্বাচন হল প্রহসন। প্রেমের বদলে বোমা।
মিলেনিয়াম হল মিডিয়া ইস্যু। নিউইয়র্কের আলোর বল কলকাতায় নামবে প্রথমে। বহত নাচা, গানা—লেকিন, রাস্তার গহ্বরগুলো কে বোজাবে। কর্পোরেশনের যে অন্য একটা নাম হয়ে গেল। কে বাঁচাবে মানুষকে ম্যালিগন্যান্ট মেলেরিয়া, ভাইরাল ফিবারের হাত থেকে। কোন গ্রহের পুলিশ এসে অপরাধ দমন করবে! শিক্ষা আর চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্গতি কোন লেকচারে, কার লেকচারে ঊর্ধ্বগতি পাবে। কে খুলবে বন্ধ কলকারখানার মরচেধরা তালা! কে দেবে হাজার হাজার বেকারকে জীবিকার সন্ধান! কোন ইজম। কেউ তো জানে না বিকাশের ঠিকানা। ঝুলি ঝোলায় এইসব ভরে নিরানব্বইয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ, 'যারা দিনগত পাপক্ষয় করে'—তারা দুহাজারে ঢুকবে। তারপর? সেই থোড়বড়ি খাড়া, খাড়াবড়ি থোড়।
তাহলে হতাশা? না। স্বামীজির তৃতীয় ভবিষ্যৎবাণী মিলবে অপর দুটির মতো। 'নূতন ভারত বেরুক লাঙল ধরে, চাষার কুটীর ভেদ করে, জেলে, মালা মুচি মেথরে ঝুপড়ির মধ্য থেকে। বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে। বেরুক কারখানা থেকে, হাট থেকে , বাজার থেকে। বেরুক ঝোপ, জঙ্গল, পাহাড়, পর্বত থেকে। এরা সহস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে—তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। সনাতন দু:খ ভোগ করেছে, তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি। এরা একমুঠো ছাতু খেয়ে দুনিয়া উলটে দিতে পারবে, আধখানা রুটি পেলে ত্রৈলোক্যে এদের তেজ ধরবে না, এরা রক্তবীজের প্রাণসম্পন্ন। আর পেয়েছে অদ্ভুত সদাচারবল, যা ত্রৈলোক্যে নাই। এত শান্তি, এত প্রীতি, এত ভালোবাসা, এত মুখটি চুপ করে দিনরাত খাটো এবং কার্যকালে সিংহের বিক্রম!! অতীতের কঙ্কাল চায়। এই সামনে তোমার উত্তরাধিকারী ভবিষ্যৎ ভারত।'
স্বামীজি সচেতন করছেন, ' তোমরা হাজার হাজার সমিতি গঠন করতে পারো, বিশ হাজার রাজনীতিক সম্মেলন করতে পারো, পঞ্চাশ হাজার শিক্ষালয় স্থাপন করতে পারো-এ সবে কিছুই ফল হবে না, যতদিন না তোমাদের ভিতরে সেই সহানুভূতি, সেই প্রেম আবির্ভুত হয়, যতদিন না তোমাদের ভিতর সেই হৃদয় জাগ্রত হয়, যে হৃদয় সকলের জন্য অনুভব করে।'
স্বামীজির মতো আমাদেরও প্রাথর্না, আলো, আলো নিয়ে এসো। দরিদ্রের কাছে আলো নিয়ে চলো, ধনীর কাছে নিয়ে এসো আরও অধিক আলো—কারণ দরিদ্রের চেয়ে তার আলোর প্রয়োজন বেশি। জ্ঞানের আলো।'
এই শতাব্দী যেন হয়—বিবেকানন্দ সেনচুরি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন